

অলংকরণ: রমিত
সোনাতুয়া পাখি (মতান্তরে সন্ধ্যা পাখি) এবং দক্ষিণারঞ্জন বিদ্যারত্নের সাথে আমার আলাপ কাকতালীয়ভাবে। তখন সাংবাদিকের চাকরিটা ছেড়ে আমি অন্য কিছু করার চেষ্টা করছি। সকালের দিকটা কাটত শিবসুন্দর লাইব্রেরিতে বসে চারপাঁচটা খবরের কাগজ আর দেশি-বিদেশি ম্যাগাজিন উল্টে পাল্টে। উল্টোতে উল্টোতে হাই উঠত, ধীরে ধীরে হাইয়ের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়তে বাড়তে মিনিট-দুয়েকের ব্যবধানে পৌঁছোলে সোমনাথবাবু - মধ্যবয়স্ক লাইব্রেরিয়ান – অনেকটা দুধ, আর অনেকটা চিনি দিয়ে এককাপ চা এনে ঠক করে রাখতেন আমার সামনে। তারপরই আঙুল তুলতেন বাথরুমের দিকে। বাথরুম থেকে ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে রাস্তায় এসে দাঁড়াতাম। সিগারেট খাবো কি খাবো না সে নিয়ে দ্বন্দ্ব চলত কিছুক্ষণ। কোনোদিন সিগারেট জিতত, কোনোদিন ওয়ালেট।
সেদিন প্রথম হাই তোলার সঙ্গে সঙ্গে একটা পাখার ঝটপটানি শুনে তাড়াতাড়ি হাইটা চাপা দিয়ে মাথার ওপর তাকালাম। সোনাতুয়া পাখিটা জানলা থেকে উড়ে লাইব্রেরির প্রকাণ্ড হল ঘরের মধ্যে গোল হয়ে পাক খেল কয়েকবার, তারপর টুক করে গিয়ে বসল ভারততত্ত্বের বইয়ের সারির একেবারে মাথায়। চোখের ওপরে লম্বা লম্বা হলুদ জলের ফোঁটার মতো দাগগুলো দেখেই বুঝলাম ওটা সোনাতুয়া পাখি।
বোঝার কথা যদিও ছিল না। পশু-পাখির ব্যাপারে জ্ঞান ও আগ্রহ আমার বরাবরই সীমিত, সোনাতুয়া পাখির ব্যাপারে জানার একমাত্র কারণ আমার কলেজের বন্ধু অনুরাধা। সোনাতুয়া পাখি নিয়ে গবেষণা করতে বহুদিন ও মহারাষ্ট্র আর উত্তরাখন্ডের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছে। সেসব ফিল্ড ওয়ার্ক থেকে ফিরলে আমি ঝালমুড়ি খেতে খেতে শুনেছি নানারকম পাখি, ব্যাঙ, সাপেদের ব্যাপার-স্যাপার। ফার্গুসন কলেজের মাঠে বাবু হয়ে বসে অনুরাধা সোনাতুয়া পাখির ছবি দেখিয়ে বলেছিল, সন্ধ্যেবেলা সূর্যাস্তের সময় শহরের আলো জ্বলে উঠলে ওরা ঠিকমতো পথ ঠাওর করতে পারে না। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, মানে ওদেরও চোখ ধাঁধিয়ে যায়? অনুরাধা বুড়ো আঙুল আর তর্জনী ঘষে তুড়ি মেরে বলেছিল - এক্সাক্টলি!
পশুপাখির জীবনযাত্রার সুখ-সংকটের ব্যাপারে আমার জ্ঞান খুবই কম - ছোটবেলার ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক আর ডিসকভারি চ্যানেলের হাত ধরে যেটুকু হয় আর কি। সিংহের হরিণ ধরা, বুনো কুকুরের শিকারের টেকনিক, কুমিরের অতর্কিত আক্রমণের ভিডিও দেখতে দেখতে মায়ের ডিনার সাজানোর আগেই ঘুমিয়ে পড়তাম সোফার ওপর। কিন্তু ফার্গুসন কলেজের মাঠে বসে অনুরাধা যখন বলত সোনাতুয়ার মতো পরিযায়ী পাখিদের গল্প, আমি কড়কড়ে ভাজা পেঁয়াজিতে কামড় দিয়ে চোখ বড়ো বড়ো করে শুনতাম। ঝাল লঙ্কায় কামড় দিয়ে নাকের জল হাতের চেটোয় মুছে জিজ্ঞেস করতাম, ‘ভারত থেকে আফ্রিকা যায় আরব সাগর পেরিয়ে? বলিস কী? মাঝে ঘুম পেলে? জল তেষ্টা পেলে?’ অনুরাধা বলেছিল পুনের আশেপাশের বেশ কয়েকটা টিলায় এসব পরিযায়ী পাখিরা এসে বসে। টিলাগুলোর বায়োডাইভার্সিটি রক্ষা করার জন্য জায়গাগুলোকে সংরক্ষণ করা জরুরি। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে কথাও বলেছিল ও কয়েকবার। লাভের লাভ কিছু হয়নি। তারপর পোস্টডকের অফার পেয়ে ক্যালগেরি চলে যাওয়ার পর ওর সঙ্গে আমার যোগাযোগও ক্রমে ক্ষীণ হতে হতে বন্ধই হয়ে যায় বলতে গেলে। বন্ধুদের আলাপে অনুরাধার কথা উঠলেই এখন আমার সেই সোনাতুয়া পাখির ছবির কথা মনে পড়ে।
সেই সোনাতুয়া পাখি আমার কুমির-সুলভ হাইটাকে বন্ধ করিয়ে গিয়ে বসেছিল লাইব্রেরির একটা বুকসেলফের মাথায়- একটা কাত হওয়া বইয়ের ওপর। বইটার গা থেকে খুঁটে খুঁটে পোকা খাচ্ছিল, না পাতা ছিঁড়ছিল বলা কঠিন। সেই সময়ে সোমনাথবাবু যতদূর সম্ভব আমার জন্যই চা বিস্কুট আনছিলেন। হঠাৎ বুকসেলফের মাথায় সোনাতুয়া পাখিটাকে দেখে তড়িঘড়ি বিস্কুট ছুঁড়ে মারতেই বিচ্ছিরি কান্ডটা হয়। পাখিটা ঝটপটিয়ে ওড়ে আর ফ্যানের ব্লেড নিমেষে আড়াআড়ি কেটে দেয় ওটার গলা।
জমাদার প্রমোদ পাখিটাকে খবরের কাগজে মুড়ে নিয়ে গেলে আমি বুকসেলফ থেকে বইটা তুলে দেখেছিলাম। যে বইয়ের ওপর সোনাতুয়া পাখিটা বসেছিল, তার লেখকের নাম দক্ষিণারঞ্জন বিদ্যারত্ন। সোনাতুয়া পাখি, দক্ষিণারঞ্জন, রুহুগাঁও আর আমি- এই চার-চারটি ব্যাপার কীভাবে যেন এক সুতোয় বাঁধা হয়ে শিবসুন্দর লাইব্রেরির টিমটিমে আলোর এক বিন্দুতে এসে মিলল- ভাবতে গেলে এখন গায়ে কাঁটা দেয়। তবে দক্ষিণারঞ্জনকে দিয়েই আলাপ শুরু করা যাক।
প্রায় তিরিশ বছর আগে পণ্ডিত দক্ষিণারঞ্জন বিদ্যারত্ন, প্রায় জীবনের শেষ বয়সে এসে বইটা লেখেন। হিন্দু ধর্মের ব্যাপকতা ও নিহিত বহুস্বর প্রমাণ করার নেপথ্যে বইটার আশু অবদান তখনও বোঝা যায়নি। সত্যি বলতে প্রথম দশ বছরে বিক্রিবাটা খুবই কম ছিল। ফলে ছশো পাতার মোটকা বইটি যে তাঁর পকেট ভারি করতে পারেনি তা বলাই বাহুল্য। রোজগারের অন্যান্য উপায়ও তাঁর আয়ত্তাধীন ছিল বলে মনে হয় না। শেষে, সম্ভবত অনাহারজনিত কারণেই, পুনের উপান্তে একটা এক-কামরার ঘরে তাঁকে সম্পূর্ণ নগ্ন ও মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
বিয়ে-থা তিনি করেননি, আত্মীয়স্বজনও ছিল না। মৃতদেহ উদ্ধারের সময় বাড়িতেও উল্লেখযোগ্য কিছুই প্রায় পাওয়া যায়নি। পুলিশের খাতায় যা পাওয়া গিয়েছিল তা মোটামুটি এরকম- এক, বান্ডিল করা খবরের কাগজ- যার পাতায় পাতায় লাল কালি দিয়ে হয় বিদঘুটে সব মুখের ছবি, নয় গোল গোল করে কিছু শব্দ কেটে দেওয়া। দুই, দু-তিন রকম আলাদা আলাদা সাইজের পেতলের ঘটি- সেগুলো শেষ কয়েকদিনে ব্যবহার হয়েছে বলেই পুলিশ মনে করেছিল, যদিও এক জল খাওয়া ছাড়া কী কাজে ব্যবহৃত হতে পারে- তা বোঝা ছিল প্রায় অসাধ্য। পুলিশ সে চেষ্টাও করেনি। তিন নম্বর জিনিসটা ছিল গাঁজার কল্কে। এই মালটা যে ব্যবহার করা হত, সে ব্যাপারে মনে করাকরির কিছু নেই। ঘরের গন্ধই যথেষ্ট ছিল।
চতুর্থ ছিল এক দিস্তা কাগজ সুতো দিয়ে বেঁধে তৈরি করা খাতা। মৃতদেহের মাথার কাছে বালিশের মতো রাখা খাতাটায় কখনও মারাঠি, কখনও সংস্কৃতে খুব ক্ষুদি ক্ষুদি অক্ষরে অনেক কিছু লেখা ছিল। কিছু জায়গায় লেখা দুর্বোধ্য; হাতের লেখার কারণে। কোনো কোনো জায়গায় অর্থের অভাবে। পাশাপাশি কিছু শব্দ যেন কেউ খুব তাড়াহুড়ো করে বসিয়ে গেছে, বা আরও পরিষ্কার করে বললে কিছু ভারী ভারী শব্দ যেন নিজেদের মধ্যে মিউজিকাল চেয়ার খেলতে খেলতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়েছে একেক জন একেক লাইনে! তার চেয়েও আশ্চর্যের ব্যাপার, খাতার প্রায় মাঝখান থেকে উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো এক রেখেও, ধরনটা হঠাৎ গেছে বদলে। রচনাধর্মী লেখার বদলে তা হয়ে উঠেছে অনেকটা কথোপকথনের মতো। দক্ষিণারঞ্জন কারও সাথে কথা বলতেন, নাকি এই কথোপকথন নেহাতই কল্পনাপ্রসূত সেই নিয়ে আলোচনা প্রথমটা একেবারেই হয়নি। তার একটা কারণ এই যে, কথোপকথনের মাথামুণ্ডু পুলিশ কিছুই বোঝেনি। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণারঞ্জন বিদ্যারত্ন ওয়াজ নো ওয়ান। তাঁর নাম তখন প্রায় কেউই জানত না।
দক্ষিণারঞ্জনের খাতাটা কীভাবে যে বিলাসের কাছে পৌঁছোল, সে বিষয়ে অনেক খোঁজ-খবর করেও আমি অন্তত কিছু পাইনি। কিন্তু সেটা যে পৌঁছেছিল এক চৈত্র মাসের শেষের দিকে- সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত। তখন দক্ষিণারঞ্জনের মৃত্যুর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে। ওই হতশ্রী খাতার আয়ু যে এত দীর্ঘ তা ওই পুলিশ অফিসারদের কেউই আন্দাজ করে উঠতে পারেননি। পাতাগুলো তখন আরও হলুদ হয়েছে, লেখাগুলো আরও খানিক আবছা। আবছা হলেও একেবারে অপাঠ্য নয়।
অপাঠ্য নয় ঠিক, তবে পাঠ করার কোনো কারণও আমি দেখতে পাইনে। বাট বিলাস খান্ডলকার ওয়াজ নট আ কমন ম্যান। সে তখন সবে তিরিশে পড়েছে। পুনের বেশ কিছুটা বাইরে একটা নিরীহ গ্রাম-পঞ্চায়েতের একমাত্র মন্দিরে সে ছিল একমাত্র পুরোহিত। আমি তখনকার কথা বলছি, কুড়ি-পঁচিশ বছর আগেকার কথা, এখন তো পুনে শহর ফুলতে ফুলতে এই গ্রাম-পঞ্চায়েতটাকে কবেই গিলে ফেলেছে! আড়াই কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এই ছোট্ট অঞ্চলে এখন চার-চারটে মন্দির! পুরোহিত ছাড়াও আছে পুরোহিতের ‘সহায়ক’- সহজ বাংলায় অ্যাসিস্ট্যান্ট পুরোহিত। সে সময়ে এসব ছিল না। ব্রাহ্মণই ছিল হয়তো তিন-চার ঘর। অবশ্য এই পরিসংখ্যান আমার অনুমানমাত্র।
যাই হোক, দক্ষিণারঞ্জনের ওই খাতাটা নিয়ে বিলাস কেন লাফালাফি শুরু করল বলা কঠিন। কয়েকজন বলে তার স্বপ্নে নাকি ঈশ্বর দেখা দেন। ঈশ্বর ঠিক কী বলেছিলেন আমরা জানি না, কিন্তু বিলাস যে নাওয়া খাওয়া ভুলে মন্দিরের বাইরের চাতালে দুপুরের মিঠে রোদে বসে খাতাটা পড়ার চেষ্টা করেছিল টানা দেড় মাস- এটা প্রত্যক্ষদর্শীরা অনেকেই বলেছে। সেই সময় কেউ প্রসাদ নিতে এলে, কেউ মানত করতে এলে বিলাস কুকুর তাড়ানোর মতো তাড়িয়ে দিত। সেই নিয়ে একটা ক্ষোভও যে মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছিল- তা আমি ইন্টারভিউয়ের সময় বেশ টের পেয়েছি। তবে তখনকার দিনে ব্রাহ্মণদের ওরকম দুম-দাম মন্দির থেকে তাড়ানো যেত না। তাছাড়া পুনের বুকে কর্পোরেট কালচার ওই সময়ে তখনও আজকের মতো স্ট্যাম্প মেরে দেয়নি, ফলত চাকরি তার বহালই ছিল।
অথবা এও হতে পারে যে চাকরি যাওয়ার আগেই বিলাস খান্ডলকারের ইউরেকা মোমেন্ট এসে গিয়েছিল। একদিন সে উদ্বাহু হয়ে ঘোষণা করল দক্ষিণারঞ্জন বিদ্যারত্নের খাতাটা সে পড়ে ফেলেছে। এতে, ন্যাচারালি, মানুষের উৎসাহিত হওয়ার কথা নয়। তারা দক্ষিণারঞ্জনকে চেনে না। দু’দিন পর সকালের আরতির সময়, সকল আশীর্বাদ-প্রার্থীর কাছে বিলাস নিজের থিসিসটা পেশ করল। যার মোদ্দা কথাটা হল দক্ষিণারঞ্জনের খাতার কথোপকথন ইজ নাথিং বাট ঈশ্বরের সাথে সংলাপ।
ব্যাস, এরপর খেলা যে জমে যাবে তাতে আর আশ্চর্য কী? কিছু লোকজন এসে খাতায় উঁকি দিয়ে দেখতে চাইল, যারা দিল তারা কিছু উদ্ধার করতে পারল না। ফলে সংলাপের ডিভিনিটি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তারা মাথা নাড়তে নাড়তে ফিরে যেতে লাগল। বলে দিতে হয় না যে রাতারাতি বিলাস একেবারে সেলিব্রিটি হয়ে গেল, এই শ’তিনেক লোকের গ্রাম-পঞ্চায়েতে যেরকম হয় আর কি! বিলাসও ভাবখানা এমন করল যেন দক্ষিণারঞ্জনের বদলে সংলাপটা ঈশ্বর তার সাথেই করেছেন!
ব্যাপারটা কেউ কেউ অবশ্য ধরিয়ে দিতে গিয়েছিল, স্থানীয় লোকের মুখঝামটার চোটে ল্যাজ গুটিয়ে পালিয়ে এসেছে। তারপর আরেকটু সাহস নিয়ে তারা জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, ঈশ্বরের সাথে সংলাপ হয়েছে মানলাম। কিন্তু ঈশ্বর বলেছেনটা কী? আমাদের গ্রামের ব্যাপারে কিছু বলেছেন কি?
এবার লোকেরা ভাবল, তাই তো! এটাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি! জিজ্ঞেস করতে বিলাস বলল- সবুর করো। জানতে পারবে।
সেবারই পূর্ণিমার দিন বিলাস প্রথম রুহুগাঁওয়ের কথা বলে।
ঠিক বললাম না। বিলাস পশ্চিমদিকে হাত তুলে বলেছিল, ওই দিকে হেঁটে যেতে যেতে একটা টিলার ওপর ঘন গাছগাছালির মধ্যে এমন একটা জায়গা পাবে যেখানে বর্ষার জল জমে পুকুরের মতো হয়ে থাকে। আর সেই পুকুরে দূর থেকে যদি পরিযায়ী পাখিরা আসে জল খেতে তবে তার পাশে ঈশ্বর মন্দির বানাতে বলেছেন।
লোকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, কিসের মন্দির? বিলাস বিরক্ত হয়ে বলল- ঠাকুরের মন্দির। লোকেরা বলল- না না, বাবা, বলছি কোন ঠাকুরের মন্দির?
বিলাস চালাক চালাক হেসে বলল- জৈন মন্দির। ঠাকুর বলেছেন পাঁচ হাজার বছর আগে ওখানে জৈন ভিক্ষুরা বসে ধ্যান করত।
সেকি, হিন্দু মন্দির না? মিরাকেল আর মন্দিরের গন্ধে ইতোমধ্যে সর্বভারতীয় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের লোকেরা চলে এসেছে। তারা বেজায় হতাশ হল। তারা ভেবেছিল হবে হয় রাম-মন্দির, নয় গণপতির মন্দির। শিব মন্দির হলেও অসুবিধে নেই। নিদেনপক্ষে বিষ্ণু হতে পারত! মঞ্চের সভাপতি দুজন লোককে ফিট করে গেলেন। বিলাসকে চোখে চোখে রাখার জন্য।
ঈশ্বর-দক্ষিণারঞ্জন সংলাপ আবিষ্কার এর মাস তিনেক পরের কথা। গ্রামের লোক বিলাসকে চেপে ধরতে সে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে চলল ঈশ্বরের প্রমিসড প্লট খুঁজে বার করার জন্য। রুহুগাঁও পৌঁছে সম্ভবত সে কিছুটা ক্লান্তও হয়ে থাকবে, ক্ষুধার্তও হয়ে থাকবে- কারণ পথ খুব একটা কম নয়। এর ফলে, বা দৈব সাহায্যে, যেভাবেই হোক, রুহুগাঁও স্বপ্নাদেশের সেই জমি বলে চিহ্নিত হয়।
এরপরের ঘটনার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না। এক হিন্দু জাগরণ মঞ্চের পুণে শাখার কার্যনির্বাহী সমিতি ছাড়া। বিলাসকে তারা প্রথম থেকেই একটু সন্দেহের চোখে দেখছিল। এরকম খামখেয়ালি আর তারকাটা লোককে রাজনীতির লোকেরা সাধারণত দলে টানতে চায় না। তাদের ধারণা যে সত্যি সেটা বোঝা গেল যখন বিলাস বলতে শুরু করল- হিংসা হিংসা, চারিদিকে খুব হিংসা! সমাজের মধ্যে হিংসা, ধর্মের মধ্যে হিংসা, প্রকৃতির মধ্যে হিংসা। ভগবান আর নিতে পারছে না গো। ভগবান আমাদের অহিংসায় দীক্ষা নিতে বলেছেন। চামচা মারফত এটুকু শুনে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের লোকেরা ভেবেছিল- এই রে! এ মালটা তো গান্ধীবাদী লাইনের কথা বলছে। মালটা কংগ্রেসের পোঁতা বোম না তো?
কিছুদিন পর চামচা জানালো, সমস্যা অন্যরকম। বিলাস নাকি জনে জনে ডেকে ডেকে বলছে সর্বব্যাপ্ত হিংসা থেকে বাঁচতে তোমরা জৈন হয়ে যাও। অর্থাৎ জীবহত্যা মহাপাপ, উপরন্তু মূলোৎপাটন করে কোনো সব্জি খাওয়া চলবে না। ফলে আলু বাদ, গাজর বাদ, বিট বাদ... তার বদলে প্রচুর পরিমাণে কাঁচকলা, মটরশুঁটি। প্রথম দিকে লোকেরা ঘাবড়ে গেল। দেহাতি মানুষের এমনিই খিদে বেশি, খাবার কম। ভাতের থালার কম্পোজিশন পাল্টে যেতে পারে ভেবে খানিক তারা কনফিউজড হয়ে রইল। কিন্তু পরলোকের ভাবনাও তো তাদের ভাবতে হয়! এই পৃথিবীতে তাদের আর আছে কী? ভগবান যখন দূত-মারফত বলছেন তখন কি আর অমান্য করা যায়? এটুকু শুনে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের লোকেরা হেসে বললেন, আচ্ছা তাতে আপত্তি কী? জৈন-বৌদ্ধ সব হিন্দু ধর্মেরই রকমফের। ধুতি-পঞ্জাবি ছেড়ে জিন্স-সানগ্লাস পরা দাদুর মতো ব্যাপার ছিল একসময়। একটু ফ্যাশনেবল হিন্দুধর্মকে ওসব নামে ডাকা হত। চামচা বলল, আরে না না। পুরুৎমশায় আমাদের গ্রামের মন্দিরটাকেও পাল্টে ফেলতে চাইছে। ভেতর থেকে শিবের মূর্তি কোদাল দিয়ে ভেঙে ফেলেছে। হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সভাপতি বলল, এ কাজটা ভালো করেনি। না করলেই পারত। মূর্তি ভাঙা কোনো কাজের কথা না। ভ্যান্ডালিজম। নজর রাখো। দেখো আর কী কী বলে। বেগতিক কিছু দেখলেই খবর দেবে।
পরের সপ্তাহে বিলাস বলতে শুরু করল, সে আবার স্বপ্নাদেশ পেয়েছে। ঈশ্বর বলেছেন হিন্দুও তার সন্তান, মুসলমানও তার সন্তান। দুইই আসলে এক। হিন্দু-মুসলমানে আর ঝগড়া কোরো না। খবরটা পৌঁছোতে সভাপতি এবার পায়চারি শুরু করলেন। শিবমূর্তি ভেঙে হিন্দু মন্দিরকে জৈন করার ঘটনা না হয় তাও মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু ব্যাপারটা যে এদিকে ঘুরবে তিনি আগে ভাবেননি। মঞ্চের সম্পাদক টেবিলে কিল মেরে বললেন, আগেই বোঝা উচিত ছিল। কোথাকার কে পাগল-ছাগল স্বপ্নে কী নাকি দেখে আবোল-তাবোল বকতে শুরু করেছে বলে কী আমরাও এসবে প্রশ্রয় দেবো? যেদিন শিবের মূর্তি ভাঙা হল সেদিনই অ্যাকশন নেওয়া উচিত ছিল। এখনও অ্যাকশন না নিলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের ভুগতে হবে, এই বলে রাখলুম।
এরও দিন সাতেক পর হঠাৎ একদিন সকাল গড়িয়ে দুপুর পড়ল, অথচ বিলাস মন্দিরে এল না। সবাই ভাবল বুঝি শরীর খারাপ। বাড়ি গিয়ে দেখল দরজা খোলা, বিলাস নেই। একদিন গেল, দুদিন গেল বিলাস এল না। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করল- আচ্ছা, বিলাসের ঘরে কেমন যেন সব অগোছালো দেখলুম না? যেন কিছুটা ধ্বস্তাধস্তি হয়েছে। অন্যরা বলল, হেঃ, বিলাসের সাথে ধ্বস্তাধস্তি করা অত সোজা? ভগবান আছে না? হিন্দু জাগরণ মঞ্চের হোতারা এসে বলল, বিলাস বোধহয় তীর্থ করতে গেছে। কবে ফিরবে সেকি কেউ বলতে পারে? তবে এ-কদিনের জন্য তোমাদের জন্য অন্য পুরোহিত এনে দিই গে। আছে একজন আমাদের চেনা, সেও খুব জ্ঞানী, সেও ঈশ্বরের স্বপ্নাদেশ পেয়েছে।
নতুন পুরোহিত এল অন্য গ্রাম থেকে। এসেই মন্দিরের চাতালে পদ্মসনে বসে রইলেন ঘণ্টাখানেক। তারপর বললেন, বাছারা, ভগবান আমার ডাকে সাড়া দিয়েছেন, আমার সাথে কথা বলেছেন। তোমাদের গ্রামের অনেক উন্নতি হবে- যদি তোমরা নিজেদের ঠিক পথে চালনা করতে পারো।
লোকে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল- কী বললেন ঈশ্বর?
নতুন পুরোহিত বলল- বললেন হিন্দুদের জাগ্রত হতে হবে। জ্ঞানচক্ষুর উন্মোচন হলে হিন্দুরা জেগে উঠবে। এখন তারা ঘুমিয়ে আছে। এই সুযোগে পাপীরা, মিথ্যাবাদীরা, মুসলমানরা পৃথিবী দখল করার চেষ্টা করবে। তাই ভগবান আমাকে বলছেন- হিন্দুদের ঘুম থেকে জাগাতে। গুরুদায়িত্ব দিয়েছেন আমার ওপর।
গ্রামবাসীরা পড়ল মহা ফ্যাসাদে। ভগবান দুজনকে দুরকম বলবেন কেন তারা কিছুতেই বুঝতে পারে না। একজন আমতা আমতা করে বলল- বিলাস পুরুৎ যে বলেছিল হিংসার পথ না নিতে, নিরামিষ খেতে, তার মধ্যে আবার গাজর, আলু না খেতে...
নতুন পুরোহিত হেসে বলল- তা তো বটেই। নিরামিষ খাও। গাজর আলু অল্প অল্প খেয়ো না হয়। বেশি না খাওয়াই ভালো।
আরেকজন গ্রামবাসী জিজ্ঞেস করল, আর ওই দীনরঞ্জনের খাতায় লেখা মন্দির? রুহুগাঁওয়ের জৈন মন্দির?
নতুন পুরোহিত স্মিত হেসে বলল- জরুর হবে, জরুর হবে।
স্মিত হাসি, বা মেরুদণ্ড টানটান করে পদ্মাসনে বসে ঘণ্টাব্যাপী ধ্যান কিন্তু গ্রামের মানুষের মন টানল না তেমন করে। তারা যেন খামখেয়ালি, বদমেজাজি বিলাস খান্ডলকারকেই খুঁজে চলেছে। এর মধ্যেই কে যেন বলল, বিলাস খান্ডলকারকে সাতরাপুরে দেখা গেছে। ফুল যোগী হয়ে গেছেন। ওখানকার জৈনদের জ্বর-ব্যাধি সারিয়ে দিচ্ছেন একবার ছুঁয়েই।
এসব টুকরো-টুকরো খবর কানে আসতে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের লোকেরা ঠিক করল রুহুগাঁওয়ের মন্দিরটা চটপট বানিয়ে উৎসর্গ করে ফেলতে হবে বিলাসের নামে। তাহলে গ্রামের মানুষকে বশ করা কঠিন হবে না। সম্পাদক মশাই বুদ্ধি দিলেন- জৈন মন্দির না বলে ওটাকে বিলাসবাবার মন্দিরও বলা যেতে পারে। এলাকার লোকেদের একটা এনটাইটেলমেন্টও তৈরি হবে। ছ’মাসে একবার সবাইকে বাসে করে পুজো দিতে নিয়ে গেলে আর কথাই নেই। পুরো এলাকা তাদের হাতের মুঠোয়। এসব খবর আবার ছড়িয়ে পড়তেও সময় লাগে না, দূর দূর থেকে লোকে আসবে পুজো দিতে।
তখন বর্ষা সবে শুরু হয়েছে। মহারাষ্ট্রের পাহাড়ি টিলাগুলোর তখন সম্ভোগের সময়। রুখা বাদামি পাহাড় বর্ষার সামান্য টোকায় নিমেষে সবুজ হয়ে ওঠে, যেন এইটুকু ইশারার জন্যই তারা অপেক্ষা করছিল। অভিশাপ কাটিয়ে বেচারাদের সাকুল্যে এই তিনমাস জেগে ওঠা। কে বলে বর্ষা বিরহের ঋতু? এইসব ছোট-বড়ো টিলার কাছে বর্ষা হল সম্ভোগ ও স্বাধীনতার ঋতু। কামোদ্দীপ্ত উচ্ছৃঙ্খলতায় মহারাষ্ট্রের টিলাগুলো চোখ-জুড়ানো চুল খুলে পরিযায়ী পাখিদের ডাকে। স্বাধীনতার ঋতু ধীরে ধীরে পার হয়ে যায়। উজ্জ্বল সবুজ ত্বক দিনে দিনে আবার ফ্যাকাশে হতে হতে একসময় হেজিয়ে শুকনো মাটি হয়ে যায়। রুহুগাঁও এদের মধ্যে এক হয়েও একটু আলাদা। কেবল ঘাস, আগাছা ছাড়াও সেখানে আছে অনেক বড়ো বড়ো গাছ। শোনা যায় ব্রিটিশ আমলের কোন এক সাহেব নাকি এখানে শিকার করতে আসতেন। রুহুগাঁওয়ের প্রেমে পড়ে তিনি নাকি বিভিন্ন জায়গা থেকে গাছের চারা এনে সেখানে পুঁততেন। একশ বছরেরও পুরনো গাছ রুহুগাঁওয়ে খুব কম নেই- তবে সেসব সেই সাহেবেরই পোঁতা কিনা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। টিলার ঠিক মাঝখান দিয়ে দিয়ে স্থানীয় আদিবাসীদের পায়ে হাঁটা যে পথ, তা সম্ভবত সাহেবের সময়ও ছিল- পথের পাশে পাথরের গায়ে ইংরেজিতে খোদাই করা রুহুগাঁও নামটা দেখে আমার অন্তত তাই মনে হয়েছে।
আদিবাসী ঘর বড়ো-জোড় পঞ্চাশ-ষাট ঘর! টিলার একদিকে তাদের গ্রাম, চাষের ক্ষেত। গোটা মহারাষ্ট্র জুড়েই ছোটো-বড়ো আদিবাসী গ্রাম ছড়িয়ে আছে এখানে ওখানে। সেরকম গ্রামের খোঁজে আপনাকে বেশিদূর যেতে হবে না। খোদ পুনের উপকণ্ঠেই যে কত ছিল একসময়! কত আদিবাসী জমি যে সরকারের নাকের নীচ থেকে বেদখল হয়ে গেল, তারও হিসেব একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই পাওয়া যায়। ফলে হিন্দু জাগরণ মঞ্চের লোকেরা যখন মন্দিরের জমি সরেজমিনে করতে এল, তখন আদিবাসীরা দূর থেকে কিছুটা ভয়, কিছুটা সন্দেহ নিয়ে দেখতে লাগল।
ব্যাপারটা পরিষ্কার করে দিতে সাধারণ সম্পাদক এক চামচাকে দিয়ে বলে পাঠাল- চিন্তা কোরো না, তোমাদের জমি দখল হচ্ছে না। ছোট্ট একটা মন্দির হবে, ব্যাস। আদিবাসীরা খুশিই হল শুনে। মন্দির মানে পুজো, ভক্তদের আনাগোনা। তবে মন্দিরের বাইরে পেয়ারা, কামরাঙা, মালবেরি, শসা কেটে তার ওপর লাল লঙ্কার গুঁড়ো ছড়িয়ে বিক্রি করতে পারবে তাদের মেয়েরা। উপরি রোজগারের আশায় তাদের মন ডগমগ করতে লাগল।
হিন্দু জাগরণ মঞ্চের তখন অনেক কাজ। মন্দির বানানোর আগে ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন করতে হবে, তার আগে চাই সরকারি অনুমতি। তাতে অসুবিধে হওয়ার কথা ছিল না, সরকারে তো তাদেরই গুরুভাইয়েরা। মন্দির তৈরিতে সরকারের খুব উৎসাহ। কিন্তু বাধ সাধল কিছু আমলা। তারা বলতে লাগল- রুহুগাঁওয়ের টিলা নাকি ইকোলজিকালি সেন্সিটিভ জায়গা! সেখানে বায়োডাইভার্সিটি পার্ক করার একটা কথা চলছিল সরকারি সহায়তায়। তার জন্যে পরিবেশ মন্ত্রকের যুগ্মসচিব প্রায় মাস-ছয়েক আগেই একটা কমিটি তৈরি করেছেন। পার্কের জন্য এক-দফা রেকমেন্ডেশনও পাওয়া গেছে। সাবিত্রীভাই পুনে ইউনিভার্সিটির কয়েকজন অধ্যাপক মিলে পরিযায়ী পাখিদের একটা লম্বা তালিকা তৈরি করেছেন। পর্যটন মন্ত্রী তাদেরকে ধমকে ধামকে, কমিটিতে মূল্যবান অবদানের জন্য মোটাসোটা অনারারিয়াম দিয়ে, মন্দির তৈরির অনুমতি দিয়ে দিলেন। বাকী বলতে রইল শুধু হেভিওয়েট কিছু লোককে আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা।
জৈন মন্দির যখন জৈনদের হর্তা-কর্তাদের নিশ্চয়ই ডাকা উচিত! যত গণ্যমান্য লোকেদের ডাকা হবে রাজনৈতিকভাবে ততই ফায়দা। প্রথমে লিস্ট করা হল উনিশ জনের, তারপর ব্যবস্থাপনার হিসেব করে কেটে-কুটে এগারোজন। আর বিলাস খান্ডালকারের গ্রাম থেকে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে জনা বিশ-পঁচিশ হলেই চলবে।
সমস্যাটা হল অন্য জায়গায়। শুধু তো মন্দির না, আমন্ত্রণপত্রে গোটা টেকড়িটাকেই জৈন পুণ্যলোক বলে লেখা হল। হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সভাপতি একটু আপত্তি করছিলেন বটে, কিন্তু সাধারন সম্পাদক জোর গলায় বললেন- স্যর, একটা কথা আছে- যদি করি গল্প তো কেন করি অল্প? বুঝলেন না? কোনটা চলবে সেটা ভাবা দরকার, কোনটা ঠিক সেটা ভেবে সময় নষ্ট করার মানে হয়? তারপর সরে এসে নিজের মনে বিড়বিড় করে বললেন- একটা গোটা মানুষকে গুপি করে দিলুম, আর একটা জমি তো নস্যি!
এতেও সমস্যা ছিল না। ভুঁইফুঁড়ে সমস্যা দেখা দিল ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিন। সে দিনটা যে আবার ডড্ডা মারার উপাসনারও দিন সেকথা কেউ জানত না, জানার কথাও না।
ডড্ডা মারার কথা নিশ্চয়ই শোনেননি? শুধু আপনি কেন, হিন্দু জাগরণ মঞ্চের একটি সদস্যও শোনেনি। বিলাস খান্ডলকারের হারিয়ে যাওয়ার প্রায় এক বছর পর ঘটনাটার তদন্ত করতে গিয়ে আমিও সেই প্রথম ডড্ডা মারার কথা শুনলাম।
রুহুগাঁওয়ের আদিবাসীদের প্রধান উপাস্য হল ডড্ডামারা। বাংলায় অনুবাদ করলে হয় বটগাছ। আপনি যদি পুনে থেকে একটা গাড়ি নিয়ে রুহুগাঁও ঘুরে আসেন, তবে টেকড়ির নাভির কাছে গাড়ি রেখে পশ্চিমের পায়ে হাঁটা পথে মিনিট কুড়ি গেলে পাবেন একটা নাতিদীর্ঘ বটগাছ। বিরাট না হলেও প্রাচীণ সে বিলক্ষণ। সেই বট গাছের দেবতাই হলেন ডড্ডামারা। এসব মঞ্চের লোকেরা জানত না। তারা ভেবেছিল বটগাছ যখন আছে, তখন মন্দিরও সেখানেই হোক। তাতে একটা ডিভাইন ফিল আসবে। একজন শেষবার মিনমিন করে বলেছিল, আদিবাসীরা যখন আছে, একবার তাদের সাথেও কথা বলা হোক। অনুমতি নেওয়ার ব্যাপার না, তবে একবার জানানো প্রয়োজন। সবাই বলল সরকারি অনুমতির কাগজ যখন এসেই গেছে তখন আর অন্য কারো সাথে কথা বলতে হবে কেন? আদিবাসীরা কি টেকড়ির মালিক নাকি?
ফলে গণ্যমান্য হিন্দু, জৈন কেউকেটাদের নিয়ে এসে সেদিন ওরা দেখল বটগাছের চারপাশে বড়ো একটা বৃত্ত করে, বেড়া দিয়ে, ঘিরে, ডড্ডামারার উপাসনার আয়োজন হয়েছে। বৃত্তের একদিকে বাঁশের মাচা বাঁধা। সেই মাচার ওপর একজন যুবক খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছে তির ধনুক নিয়ে। অন্যদিকে একটা জলজ্যান্ত মুরগিকে দানা খাওয়ানো হচ্ছে খুব যত্ন করে। রীতিটা বুঝতে কারোরই দেরি হল না। তির ছুঁড়ে মুরগিটাকে মারতে পারলেই উদযাপন শুরু। কিন্তু সে হতে কতক্ষণ? এক জৈন কেউকেটা মঞ্চের সভাপতির দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললেন- এটা কি হচ্ছে?
সভাপতি বললেন- আসলে এটা আগে থেকে জানা ছিল না! ওদের নিশ্চয়ই বেশি সময় লাগবে না। মুরগিটা কোতল করে ফেললেই তো হয়ে গেল!
জৈন কেউকেটা বললেন- কোতল করে ফেললে হয়ে গেল? আমন্ত্রণপত্রে কি লিখেছিলেন মনে নেই? এই টিলাটাকে জৈন পূণ্যলোক বলে ঘোষণা করার কথা হল না?
হ্যাঁ, তাই হবে। কিছু আদিবাসী এখানে থাকে, তারা নিজেদের মতো থাকবে।
জৈন কেউকেটা এবার গলা যথাসম্ভব ভারী করে বললেন- জৈন ধর্মটা সম্পর্কে কিছু ধারণা আছে? আমাদের যে পশুহত্যা মানা, পশুহত্যা কেন, যেকোনো প্রাণীর হত্যাই যে মানা, সেটা এনফোর্স করবেন কী করে? জৈন মন্দিরের জমির ওপরে কিছু লোক এসে ভগবানের উপাসনার নামে প্রাণীহত্যা করে যাবে? নাঃ, এটা আমরা অ্যালাউ করতে পারব না! সরি, আপনাদের যে ডোনেশনটা দেওয়ার কথা হয়েছিল সেটা নিয়েও না এগোনোই স্বাভাবিক, বুঝতেই পারছেন।
ডোনেশন হারানোর সম্ভাবনায় সভাপতির মাথায় বাজ পড়ল। তিনি অপরাধী অপরাধী মুখ করে বললেন, আদিবাসীদের তাড়িয়ে দিই কী করে বলুন তো? মানছি ওরা বর্বর, এখনও সভ্য হয়নি, কিন্তু ভাবুন, এখানে ওরা কত প্রজন্ম ধরে আছে! ধরুন, গোটা টিলা না হয় আমরা ছেড়েই দিলাম। মন্দিরটা তো করি! মন্দিরের চারপাশে পাঁচশ মিটার জায়গা না হয় প্রাণীহত্যা নিষিদ্ধ করে দেবোখন। জৈন কেউকেটা বড়ো মোলায়েম ভাবে মাথা নাড়ালেন। অর্থাৎ তাঁরাও বিনয়ের সাথে অনড়। হয় চিঠির প্রতিশ্রুতি মতো গোটা টিলা, নইলে এই ঠনঠনিয়া জনশূন্যপুরে খালি একটা মন্দির উজিয়ে কোনো লাভ নেই।
সাদা হাফ-কুর্তা, সাদা পাজামা আর পাম-সু পরা জৈন তালেবররা সবাই কঠোরভাবে জীবহত্যা-বিরোধী, একই সাথে ধুরন্ধর ব্যাবসায়ী। লাভ-ক্ষতির হিসেব তারা সহজেই করে নিয়েছেন। স্ট্যান্ড-অ্যালোন মন্দিরে তাদের সায় নেই, তাদের প্রয়োজন গোটা টিলা। ধর্ম ও বাণিজ্য জুড়ে জুড়ে তপোবন-তুল্য মালা গাঁথা তাদের পক্ষে নেহাতই জলভাত!
সভাপতি কপালের ঘাম মুছে সেক্রেটারিকে বললেন, তোমাকে আগেই বলেছিলাম এসব লিখো না। শুধু মন্দির লিখলে এসব ঝামেলা পোহাতে হত না। সেক্রেটারি উল্টে দাঁত কিড়মিড় করে বললেন- এই জন্যই এসব জৈন-টৈনদের নিয়ে আসতে নেই। আগেই বলেছিলাম, এই হিন্দু-জৈন ভাই ভাই ব্যাপারতা স্রেফ একটা বুজরুকি ছাড়া কিছু নয়! কিছু হিন্দুত্ববাদী নেতা গুজরাত থেকে উঠেছে বলে তাদের পিরিত থাকতে পারে, তাই বলে আমাদেরও জৈনদের মাথায় তুলে নাচতে হবে?
সভাপতি মাথা চুলকে বললেন, আরে সব গন্ডগোল তো করল বিলাস। আগেই ওকে ব্যবস্থা করা উচিৎ ছিল। কিন্তু কী করব ভাই? ভুল না হয় করে ফেলেছি। তুমি একটু সামলে দাও না!
সেক্রেটারি করিতকর্মা লোক। তুলনায় সভাপতি মহাশয় বেশ হাঁদা টাইপের, ডিসাস্টার ম্যানেজমেন্টে লবডঙ্কা। তিনি যখন ঠোঁট কামড়িয়ে মাথা চুলকোচ্ছেন, সেক্রেটারি দলের লোকেদের দিয়ে কয়েকটা চেয়ার পেতে লম্বা ছাতার ছাউনি করে দিয়েছেন। একদিকে বট গাছের থেকে আধ মাইল দূরে খানিকটা সমতল জায়গা খুঁজে অতিথিদের বসিয়ে চা খাওয়ানো, অন্যদিকে চলছে আদিবাসীদের সাথে সমঝোতার প্রস্তুতি। ঠিক হল প্রথমে দলেরই দু-জনকে পাঠানো হবে, কথা-টথা বলে যদি মিটে যায় তাহলে তো কথাই নেই। সেক্রেটারি গোঁফে তা দিতে দিতে বললেন, মিটে কী আর এত সহজে যায়? এমনি এমনি মেটে না। নির্ঝঞ্ঝাটে মেটাতে চাইলে কড়ি ফেলতে হবে বাবাজীবন; আর ঝঞ্ঝাটে আপত্তি না থাকলে... তিনি তাঁর লিকলিকে কঙ্কালসার হাতটাকে তুলে বাইসেপে চাপড় মেরে দেখালেন। সভাপতি দাড়ি চুলকে বললেন, অতিথিদের সামনে বলপ্রয়োগ? তার চেয়ে বরং কড়ি ফেলাই ভালো। কত ফেলি বলুন তো? লাখ দু’খানেক?
সেক্রেটারি প্রায় ধমকই দিতে যাচ্ছিলেন। শুধুমাত্র সভাপতির বয়স ও সম্মান বিবেচনা করে মুখের কথাটা গিলে নিলেন। তারপর আলতো করে বললেন, এক লাখই যথেষ্ট হবে বোধহয়, বুঝলেন? তারপর লাগলে না হয় দেখা যাবে!
দলের তিনজন ষণ্ডামার্কা লোককে বাছা হল। সেক্রেটারি তাদের একজনকে ধমক দিয়ে বললেন, সভাপতির সামনে গুটকা চিবুচ্ছিস কোন সাহসে, হতভাগা? যা, ফেলে আয় এক্ষুনি! তারপর সভাপতির দিকে ফিরে বললেন, এদের আমি বুঝিয়ে সুঝিয়ে বলছি’খন। আপনি যান, গিয়ে একটু অতিথিদের দেখভাল করুন গে। ওঁরা আবার অধৈর্য হয়ে গেলে মুশকিল!
সভাপতি চলে গেলে তিনজকে নিয়ে সেক্রেটারি আড়ালে এসে দাঁড়ালেন। ‘শোন, কাজটা হলে ভালো মালকড়ি চোষা যাবে। কাউকে বলিস না’।
লোক তিনটে বিশ্বস্ত, সেক্রেটারি হয়ে ওঠার অনেক আগে থেকে তাঁর ছায়াসঙ্গী। অনেক ক্ষীরের হিসেব, ঘোলের হিসেব তারা জানে। সেক্রেটারির কথায় তারা দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে ঘিরে এল।
সেক্রেটারি হিসেবটা বুঝিয়ে দিলেন, আদিবাসীদের তিরিশ হাজারে রাজি করাতে পারলে তিনজন পাবে পনেরো হাজার করে। সেক্রেটারি নিজে পঁচিশ। এক লাখ তো সভাপতি মঞ্জুর করতে এখনই রাজি। একটু ঠেলা দিলে আরও কুড়ি তিরিশ হাজার ব্যবস্থা করা কঠিন হবে না।
ষণ্ডামার্কা লোকতিনটে হাতা-গুটিয়ে রেডি, গোটানো হাতার নীচ দিয়ে তাদের ফোলানো শিরা আর শিবাজীর ট্যাটু দেখে সেক্রেটারি চোখ পাকিয়ে বললেন, প্রথমেই থ্রেট দিবি না হারামজাদা। এরা তোদের বস্তির দিনমজুর না।
একজন বলল- বস্তির দিনমজুরদের কব্জা করা সহজ না বাবু। জোট বাঁধলে ওরা বিছের মতো, পিষে মরার আগে হুল ফুটিয়ে বিষ ঢুকিয়ে দেবে। কড়া নজর রাখতে হয় বাবু। তুলনায় এরা তো দুধভাত।
শুনে সেক্রেটারি বললেন, তা বটে!
কিন্তু ব্যাপারটা সত্যিই দুধভাতের মতো সুপাচ্য হল না। আদিবাসীরা প্রথমে বিনীতভাবে বলল- না সাহেব, আমাদের বাপ-ঠাকুরদারা সবাই ডড্ডামারার উপাসনা করতেন এভাবে। এটাই আমাদের রীতি, সাহেব। পয়সা নিলে পুজো বন্ধ করলে ডড্ডামারা কষ্ট পাবে।
লোক-তিনটে নিজেদের মধ্যে তাকালো। একটা কথা না বলেও এই চাহনি দিয়ে অসংখ্যবার তারা একে অপরকে পাঠিয়েছে, যুদ্ধের সংকেত। তারা আদিবাসীদের বলল, তোমাদের বাপ ঠাকুরদার ঠাকুর এই বটগাছ? আজ রাতেই এই বটগাছ উপড়ে ফেলতে পারি আমরা, সেটা জানো তো।
আদিবাসী দলপতি বলল, ডড্ডামারাকে কেউ হত্যা করতে পারে না, সাহেব। উপড়ে ফেলতে পারে না।
এরপর ঘটনা সংক্ষিপ্ত- গুন্ডাদের একজন পকেট থেকে ফস করে ছুরি বার করে আদিবাসী দলপতির গলায় ধরতেই কোথা থেকে একটা তীর এসে তার পায়ের পাতায় বিধল। ব্যাপারটা কেউ আন্দাজ করতে পারেনি, এমনকি দূরে গাছের ফাঁক থেকে পর্যবেক্ষণ করা সেক্রেটারি সমেত।
সমস্বরে উলুধ্বনি দিয়ে উঠল আদিবাসীরা। তার সাথে হই হই আওয়াজ। সভাপতি ছুটে এলেন। সেক্রেটারি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, গেস্টদের হোটেলে নিয়ে যান মশাই। এখানে তো সোজা আঙুলে ঘি উঠল না। অন্য উপায় দেখতে হবে।
জৈন কেউকেটারা রেগে বোম। যদিও হিংসার মতো রাগের প্রকাশও তাঁদের অনভিপ্রেত। সভাপতির দিকে একবারও না তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে তাঁরা উঠে পড়লেন। মুখগুলো থমথমে।
বোঝা গেল হোটেলে তাঁরা থাকবেন না। এই হিংসার বাতাবরণের মধ্যে জৈন পূণ্যভূমি তাঁরা তৈরি করতে রাজি নন। তাঁরা যখন পুনে ফিরে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠছেন, তখন একটা মুরগির পরিত্রাহী ডাক একমুহূর্তের জন্য শোনা গিয়েছিল। শোনা যায় তখন নাকি সেক্রেটারি তাঁর লিকলিকে শরীরটা তালপাতার মতো কাঁপিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে বলেছিলেনন, ডড্ডামারার উৎসব তো শেষ হল। এবার রামচন্দ্রের উপাসনা শুরু হবে বাছারা!
এর পরে যে ঠিক কী ঘটেছিল সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেছে, জৈন অতিথিরা সেদিনই প্রজেক্ট ক্যানসেল করে পাততাড়ি গুটিয়েছিল। কেউ বলে- না, টেকড়ি তাদের পছন্দ হয়েছিল। সেই কারণে সে’দিন চলে গেলেও প্রোপোজাল তখনও টেবিল থেকে সরেনি। যাওয়ার আগে পর্যন্ত বলেছিল, পয়সা খরচা করতে তারা কার্পণ্য করবে না; শুধু দাবি ছিল- গোটা টিলাটাই তাদের চাই। আবার কেউ এরকমও বলেছে- আদিবাসীদের রিহ্যাবিলিটেশনের ব্যবস্থা করতেও তারা রাজি হয়েছিল।
পরের দিন কাগজে খবর বেরোলো রুহুগাঁও নিয়ে। আমি, সত্যি বলছি, সেই প্রথম জানলাম রুহুগাঁও বলে একটা জায়গা আছে। খবরের একটা কাটিং আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে এখনও আছে। হেডলাইনে ছিল- ‘রুহুগাঁওয়ের আদিবাসী জমিতে আগুন’! তার নীচে সাব-ক্যাপশনে লেখা ছিল দশ-বারো ঘর আদিবাসীর বাড়ি ভষ্মীভূত। একজন মৃত, তিনজন নিখোঁজ। কীভাবে হল? কাগজ বলে, পুলিশের প্রাথমিক অনুমান- জমি বা সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব।
আমাদের কাগজ থেকে সেদিন আমাকেই পাঠানো হয়েছিল খবর করার জন্য। ঘটনাটায় আমার প্রথম যোগ সেদিনই। খবর আর কী করব, রুহুগাঁওতে ঢুকতেই পারিনি। পুলিশ কর্ডন করে রেখেছিল। বলেছিল- সুরক্ষার অভাবে যেতে দেওয়া যাচ্ছে না। কাগজও বিশেষ পাত্তা দেয়নি। বিষয়টা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলে বাবুদের মনেই হয়নি। হয়ত সেই কারণেই আমাকে পাঠিয়েছিল খবর করার জন্য।
তখন চাকরিতে ঢুকেছি এক বছরও হয়নি। মনে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট হওয়ার বাসনা অথচ হাতে কাজ যা ছিল সবই খুচরো আর নিষ্প্রাণ- যে ধরনের কাজে সফলতাও নেই ব্যর্থতাও নেই, শুধু দুপুর-রাস্তার মতো তৃষ্ণার্ত অথচ গতিবান, লরি চলে যাওয়ার পর ধুলোর মতো সামান্য ঢেউ খাওয়া দৈনন্দিনতা মাখামাখি খবর! এক পুনের শতাব্দী প্রাচীণ দশটা রেস্টুরেন্ট নিয়ে খবর করেছিলাম- ওই মন্দের ভালো ধরা যায়। ভালো কাজের আশায় এডিটরের কাছে ঘ্যানঘ্যান করতে সেদিন তিনি বিরক্ত হয়েই পাঠিয়েছিলেন রুহুগাঁও কভার করতে।
না, রুহুগাঁও নিয়ে কাগজ দুদিন পর আর উৎসাহ দেখায়নি। ভোট এসে গেল যে! ভোটের ভটভটি চলতে শুরু করলে তরঙ্গ এসে লাগল খবরের কাগজেও। আমারও অ্যাসাইনমেন্ট পাল্টে গেল। কোলাপুরে যেতে হল ভোট কভার করতে।
খবরের কাগজের চাকরিটা আমি আরও দু-বছর ঘষ্টেছিলাম। তারপর চাকরি ছেড়ে সংক্ষিপ্ত একটা বিরতি নিয়ে বেশ কিছুদিন পর ঢুকেছিলাম বিজ্ঞাপনের জগতে। মাঝের সময়টাতে- আগেই বলেছি- সকালটা আমি কাটাতাম শিবসুন্দর লাইব্রেরিতে। রুহুগাঁও আমি ভুলিনি। ওখানে কিছু একটা গড়বড় আছে আমি বরাবর জানতাম। পুলিশের মুখ দেখে, হাবেভাবে কিছু একটা ঠিকরে পড়ছিল কি? কিন্তু চাকরিই যখন গেছে তখন আর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের প্রশ্ন ওঠে কোথা থেকে?
তারপর হঠাৎ একদিন সোনাতুয়া পাখিটা এসে, প্রাণটা দিয়ে পুরনো রোখটা আবার চাগিয়ে দিল। যেন বলতে চাইল, আমাদের গল্পটা কে বলবে?
সাধারণত সাংবাদিকরা চৈতন্য নাড়া দেওয়া খবরের খোঁজে জাল পেতে থাকে। মানুষ মরলে, যুদ্ধ হলে সংবাদপত্রের পোয়াবারো। কিন্তু সাংবাদিকের চাকরি ছেড়ে দেওয়ার জন্যই কিনা জানি না, রুহুগাঁয়ে ফিরে গিয়ে যা দেখেছিলাম তা যেন না দেখলেই ভালো হত।
শিবসুন্দর লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে উল্টোদিকের হোটেল থেকে জোয়ারের ভাকরি, মাংস আর লম্বা এক গ্লাস তাক খেয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল ঢলে এল। রুহুগাঁওয়ের নাভিতে বাইক রেখে পায়ে হেঁটে জঙ্গলে ঢুকতে ঢুকতে দুপুর যেন শান্ত হয়ে ক্লান্ত হয়ে বড়ো বড়ো গাছগুলোর পাতা থেকে মোমের মতো গলে পড়ছিল, থেমে থেমে নেমে আসছিল খয়েরি বাকল বেয়ে, আর শয়ে-শয়ে পাখি ঠোঁটে করে রোদ, আলো, রন্ধন-শক্তির কৌশল পৌঁছে দিচ্ছিলো গাছেদের পাতায় পাতায়। মনে হচ্ছিলো আমার মাথার ওপরে, চারিপাশে এক বিরাট আয়োজন, বিপুল দাওয়াতের বন্দোবস্ত। পাখিরা এখন পরিবেশনের ব্যবস্থা করছে, তাদের কিচিরমিচির ডাকে আপ্যায়নের ব্যস্ততা। সেই দাওয়াত, সেই মেলা দেখতে দেখতে আমার পা স্লথ হয়ে এল। আমি সেই বট গাছের ঝুড়ির গায়ে ঠেস দিয়ে বসে দেখতে লাগলাম অনুষ্ঠান শেষে অতিথিরা বাষ্পের মতো ফিরে যাচ্ছে অন্ধকার হয়ে। এভাবে অনেকক্ষণ কেটে গেল। আমি পড়ন্ত সূর্যের আলো একটুখানি টুপির মধ্যে নিয়ে এগিয়ে চললাম আদিবাসীদের গ্রামের দিকে।
কয়েকজন গোল হয়ে বসে ছিল ঘরের সামনে। মাঝবয়সী কয়েকটা লোক, বিড়ি খাচ্ছিল, এক একটা টান দিয়ে জ্বলন্ত বিড়িটা আঙুলের ফাঁকে আড়াআড়ি ধরে যেন হিসেব করছিল শেষ হতে আর কতক্ষণ- যেন বিড়ি খেতে তাদের আর ভালো লাগছে না। একজন বিড়িটা ছুঁড়ে ফেলে নিজের খাটো ধুতির আড়াল থেকে বেরিয়ে আসা খয়েরি পাদুটোয় হাত বোলাতে বোলাতে আমাকে দেখে থেমে গেল। আঙুলের ফাঁকে বিড়ি রেখে বাকিরাও থেমে গেল, এত সিনক্রোনাস যে মনে হয় নাটকের চেনা পাট, কতবার অভ্যেস করা হয়ে গেছে- এক ভাবে, এক সঙ্গে মেরুদণ্ড হঠাৎ টান করে তটস্থ হয়ে ওঠার রিহার্সাল!
তাদের চোখে, শরীর সজাগ করে তোলার কায়দায় যা ছিল তা তখন কিছুই পড়তে পারিনি। বোকা বোকা হাসি নিয়ে নমস্কার করব কিনা ভাবতে ভাবতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম ওদের দিকে, পোড়ো অপমানের দিকে। বেশ কয়েক দিন পরে যাবতীয় স্মৃতি তাসের গোছের মতো ফেটিয়ে ফেটিয়ে, তারপর আবার ক্রম মিলিয়ে সাজাতে গিয়ে দেখেছি কই, দৃষ্টির ভাষা পড়তে তো অসুবিধে হয় না! দেওয়াল লিখনের মতো স্পষ্ট, টানা টানা অক্ষর, গোটা গোটা কষ্ট, থোক-বাঁধা ভয়!
কথা বলতে ওরা রাজি হয়নি প্রথমে। ‘ন’। যাই বলি, যতই বোঝাই ওদের এক কথা- ‘ন’। শুধু এই একটা অক্ষরের মধ্যে যে কত দ্রবণ, আজ বুঝি, মৌমাছির চাকের মতো কত কান্না, অপমান এসে জড়ো হয়েছিল ন-এর বাঁকানো দেহের শেষে পাকিয়ে ওঠা গোল ক্ষতয়!
টাকার লোভও যে দেখাইনি তা নয়। তারপর হাজার বার বলেছি- দেখো, আমি সাংবাদিক নই, ওদের প্রধান উত্তর না দিয়ে তাকিয়েছে হয় দূরে, নয় পায়ের নখের সামনে মাটির কাছাকাছি- বুড়ো আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে একেকটা ঘাস উপড়ে ফেলতে ফেলতে। ভেবেছিলাম ওরা বিশ্বাস করছে না; তখনও বুঝিনি ওদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কক্ষপথ আমার অনুরোধের কুয়াশাঢাকা পরিখা অতিক্রম করে না, ছেদ করে না; বুঝিনি যে তাদের ক্ষীণ দড়ির মতো জীবন থেকে বাটখাড়ার মতো ঝুলছে স্মৃতি- বেশিদিন আগের না- আমার প্রতি অনুরোধে দোলা লাগছে দড়িতে, বাটখাড়ায়; প্রতি দুলুনিতে শিরা-ধমনীতে জানান দিচ্ছে দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
জৈন মন্দির রুহুগাঁয়ে হয়নি। হিন্দু জাগরণ মঞ্চের লোকেরা গোটা টেকরিটাই দিতে চেয়েছিল জৈন ধর্মস্থান করার জন্য। সরকারও রুহুগাঁও ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান অ্যাপ্রুভ করে দিয়েছিল। আদিবাসীরা হটে গিয়েছিল টেকরি থেকে নেমে নীচু জলাজমির ধার ধরে যতটা দেখতে পাওয়া যায়। এত সব সত্ত্বেও জৈন কেউকেটারা প্রজেক্টটা করলেন না। হিংসার গন্ধ নাকি তাঁরা ধরতে পেরেছিলেন সেদিনই।
মন খারাপ করে ফিরে এসেছিলাম। ডিনারের পর পাড়ার নির্জন ও আধো-অন্ধকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অনেক পুরনো কথা মনে পড়ছিল। মা মারা যাওয়ার আগে বলেছিল যাক তুই যে একটা ভালো চাকরি পেয়ে গেছিস, এটা দেখে যেতে পারলাম বলে শান্তি নিয়ে মরতে পারছি। আমি মুখ ফুলিয়ে বলেছিলাম, চুপ করো তো, ভালো চাকরি না ছাই! মা আমার হাতটা ধরে বলেছিল- সাংবাদিকতার চাকরিতে সবাই নীচ থেকেই শুরু করে। তুই দেখবি একদিন এডিটর হবি।
এডিটর হওটার আশা ছেড়ে আমি যেদিন রেজিগনেশন দিলাম তখনকার দোর্ডন্ডপ্রতাপ এডিটর ইন চিফ আমার মুখের দিকে একবারও না তাকিয়ে কাগজের ওপর সই করে দিলেন- অর্থাৎ বিনা বাধায় রেজিগনেশন গৃহীত হল। তারপর জীবনটাকে অন্য খাতে বইয়ে দেওয়ার জন্য যত মাটি কাটা দরকার, খননের সাহস ও পরিমিতিবোধ থাকা দরকার, তা পরীক্ষা করতেই হয়ত শিবসুন্দর লাইব্রেরিতে গিয়ে বসতাম সকাল সকাল, খননের আগে শাবল-কোদাল জোগাড় করার প্রস্তুতি বলেই বুঝিয়েছিলাম নিজেকে। প্রস্তুত কী হতে পারলাম শেষমেশ? সাংবাদিকের খোলস কী আরও আগেই ছেড়ে ফেলা দরকার ছিল? রুহুগাঁও থেকে ফিরে সেদিন রাতে ঘুম আসতে দেরি হল।
পরদিন ঘুম ভাঙল বেলা করে। মাথা ঝিমঝিম, গা ম্যাজম্যাজ- যেমন দিনে পরে পরে আলস্য করতে ইচ্ছে হয়। অনেকক্ষণ ধরে চান করলাম, দোকানে দিয়ে ব্রেকফাস্ট করলাম অনেক দিন পর। তারপর লাইব্রেরি যাওয়ার জন্য বেরিয়ে, মন্টুর দোকানের সামনে বাইকটা দাঁড় করিয়েছি একটা সিগারেট খাবো বলে; বাইকের মুখ কাত হয়ে আছে বাঁদিকে- রাস্তা থেকে বেরিয়ে খানিক ঘাসের ওপর, আমি সিগারেটটা ধরিয়ে আরও একবার আড়মোড়া দিয়ে শরীরের সুপ্ত ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করছি- এমন সময়, বাইকের হাতের ওপর এসে বসল একটা সোনাতুয়া পাখি। হলুদ পাখা, ছাই রঙের পেট, মাথার দিকে ছাই রঙ আরও ঘন; আর কপালের ওপর টিপের মতো লাল ফোঁটা! প্রথমে কয়েকবার ফুরুত ফুরুত করে বাইকের সর্বাঙ্গে ঘোরাঘুরি করে আমার দিকে তাকিয়ে ডাকল। এই প্রথম আমি সোনাতুয়া পাখির ডাক শুনলাম। ডাকে জোর বেশি নেই, তবে খুব মিষ্টি - যেন খুব কষ্ট অথচ আদর করে কেউ ডাকতে চাইছে। আমি মুখ দিয়ে চুক চুক শব্দ করতেই আবার ডাকল, সাড়া দিল যেন। সেই মোলায়েল, কাঁপা কাঁপা, সুরেলা ডাক শুনে অন্যমনস্ক হয়ে গেলাম। প্রথমেই মাথায় এল, পাখির ডাক আমার শহুরে জীবন-যাত্রায় শেষ কবে এমন খেয়াল করে শুনেছি? গাড়ি-বাসের হর্ন, আর আমাদের বর্ধমান ব্যস্ততায় পাখির ডাক রেজিস্টার করার কানটাই কি হারিয়ে ফেললাম? জীবন যত সহজ হচ্ছে প্রকৃতির সাথে আমাদের অ্যালিয়েনেশন কি বাড়ছে দিন দিন? দৈনন্দিন জীবনের কোলাজে গাছ হয়ত এখনও আছে, কিন্তু পাখি কবেই উড়ে গেছে আমরা জানতেই পারিনি। ভাবতে ভাবতে হাসি পেল, কত চেনা ডাকই হারিয়ে গেল! আমার দু-কামরা ঘরে বসে কত সন্ধ্যেয় মনে হয়েছে অন্য ঘর থেকে কেউ ডাকবে কী আমাকে, যেভাবে মা ডাকত? এভাবে চলতে চলতে ভালোবাসার ডাক, ভালোবাসার স্পর্শ রেজিস্টার করার অনুভূতিও হারিয়ে যাবে না তো? ভালোবাসার উপবাস কী অতি দীর্ঘায়ত হচ্ছে, হৃদয়ের আলসারই কী আসলে মিড-লাইফ-ক্রাইসিস? দক্ষিণারঞ্জনের মতো আমারও কী মৃত্যু হবে একা, বন্ধুহীন, উলঙ্গ, উন্মাদ হয়ে?
লাইব্রেরি যেতে আর ইচ্ছে করল না। বাইক যেন নিজেই নিজের গরজে চলেছে রুহুগাঁও-এর দিকে। ইন্টারভিউ যদি নাও নিতে পারি, প্রকৃতির ছবিই না হয় তুলব সারা দিন ধরে। একটা সোনাতুয়া পাখির ক্লোজ-আপ নিতে পারলেও মন্দ হয় না।
তাছাড়া ইন্টারভিউ-এর ব্যাপারটায় একটা ফন্দি মনের মধ্যে বুড়বুড়ি কাটছিল। ঘুরিয়ে নাক দেখানো গোছের ফন্দিটাই কাজ দিল শেষমেশ। যদিও একদিনে হয়নি। পরপর কয়েকদিন আমাকে যেতে হয়েছিল রুহুগাঁও।
দুটো জিনিস আমাকে সাহায্য করেছিল। ফটোগ্রাফি করার জন্য যে দামি নিকনের ক্যামেরাটা কিনেছিলাম কয়েক বছর আগে, আর ভিয়েনা থেকে অপূর্ব এনে দিয়েছিল একটা ইন্সট্যান্ট ক্যামেরা, সে’দুটো ব্যবহার হোক না হোক পড়েই থাকত আমার ব্যাগে। সময় পেলে কখনও কখনও বেতাল টেকড়ি বা লোনাভালার দিকে যেতাম ফটো তুলতে। ফটোগ্রাফির ব্যাপারটা খুব একটা রপ্ত করতে পারিনি যদিও। কিন্তু সেই ক্যামেরাই বাঁচিয়ে দিল রুহুগাঁওতে।
রুহুগাঁওয়ের ফটো তুলতে তুলতে ঘুরে বেরিয়েছি আদিবাসী বসতির আশেপাশে। আদিবাসীরা আমাকে দেখেছে, কথা বলেনি। মাঝে মাঝে জল চেয়েছি ওদের কাছে। প্রথম প্রথম শুধু গেলাস এগিয়ে দিচ্ছিল, কথা বলছিল না, এমনকি চোখাচোখিও না। তারপর ইন্সট্যান্ট ক্যামেরা দিয়ে কয়েকজনের ছবি প্রিন্ট করে দিলে ওদের কী আনন্দ! মেয়েরা বিশেষ করে। সাত-আট জনের পোলারয়েড ছবি প্রিন্ট করে দেওয়ার পর প্রধান বাইরে এসে ধমক দিলে সুরসুর করে ঢুকে গেল বাড়ির বাইরে। প্রধান রোদের মধ্যে বসে রইল বাড়ির দাওয়ায়, আমার থেকে দেওয়াল হয়ে।
আমি দূর থেকে জুম করে প্রধানের মুখের কয়েকটা শট নিয়েছিলাম। উনি খেয়াল করেননি বলেই আমার মনে হয়, বা খেয়াল করলেও শহরের মতো প্রাইভেসির সচেতনতা রুহুগাঁও-এর আদিবাসীদের মধ্যে ঢোকেনি। ফলে পরের দিন দুটো ছবি প্রিন্ট করে, বাঁধিয়ে যখন নিয়ে গিয়ে দিলাম প্রধানের হাতে, তার মুখে ক্ষীণ হাসি সূর্যোদয়ের আগের লাল আকাশের মতো স্নিগ্ধ হয়ে উঠল। সেই হাসির মধ্যে খানিক ছিল আনন্দ, আর পাঁউরুটির ওপর পাতলা চিজের মতন একটা দুঃখের কুয়াশা। হাসিটা মুখে রেখেই তিনি চোখ বন্ধ করে বসেছিলেন অনেকটা সময়।
আমি তাঁর মুখের কোঁচকানো চামড়ার দিকে দেখছিলাম, যেন চামড়া নয়, গাছের বাকল থরে থরে সাজিয়ে তৈরি হয়েছে এই মুখ, যেন ছুঁলেই খসে পড়বে মুখ থেকে একেকটি করে অংশ- নাক, চোখ, ঠোঁট, গালের খাঁজকাটা স্তর। রুহুগাঁওয়ের প্রাচীণ বটগাছটির মতো মনে হয় তিনিও এই গ্রামে পাঁচশ বছর ধরে আছেন। ক্লান্ত, বৃদ্ধ, অথচ মৃত্যুহীন, বিরামহীন।
কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে তাকালেন আমার দিকে। দেখলাম দুটো চোখ লাল, ছলছলে হয়ে আছে। এত অনায়াসে কি এ’দের খুশি করা যায়? শহরের লোকেদের এত সহজে বিশ্বাস করেন এরা, নাকি চালিত হচ্ছেন জেনেও শহুরে কায়দাবাজি ধরে ফেলেও নিজেদের দরজা খুলে দেওয়াই এদের অভ্যেস?
প্রধান আমায় খেয়ে যেতে বললেন। বুঝতে পারলাম ফন্দিটা কাজ দিয়েছে। রুহুগাঁওয়ের করুণ ইতিহাস শুনেছিলাম অনেকটা লাল লঙ্কার গুঁড়ো দেওয়া লাউয়ের তরকারি আর জোয়ারের রুটি খেতে খেতে। সাথে লঙ্কার আচার। কীভাবে কথা শুরু করেছিলাম এখন আর মনে নেই। তবে একেবারে শেষের দিকে কথোপকথনের কয়েকটা লাইন প্রায় হুবহু মনে আছে আমার। জিজ্ঞেস করেছিলাম- প্রধান, ডড্ডামারার কোনো মিথ, উপাখ্যান আছে?
প্রধান বলেছিলেন, তোমাদের ঠাকুরদের মতো আমাদের ঠাকুর উপাখ্যানে থাকে না, সাহেব। ডড্ডামারা আমাদের সাথেই থাকে, তাকে আমরা দেখতে পাই, তাকে খুঁজতে আমরা উপাখ্যানে যাই না।
শুনে আমি কিছুটা থমকে গেছিলাম। আদিবাসীদের উপাখ্যান কিছু নিশ্চয়ই থাকা উচিৎ, ধর্ম থাকলে পুরাণও থাকে। ডড্ডামারার কোনো উপাখ্যান নেই, মিথ নেই? প্রধান হেসে বলল, তাকে আমরা দেখি যে সাহেব, সবাইকে আশ্রয় দিতে, শুধু মানুষ না, সব পশুপাখিদের।
আমি বললাম, কিন্তু যেটুকু দেখা যায় তা দিয়ে মানুষকে বাঁধা যায় কী করে? এর মধ্যে কোনো অতিলৌকিক কিছু তো নেই, মানুষ তাকে কল্পনাই বা করবে কী করে?
প্রধান বললেন, ডড্ডামারা কাউকে বাঁধতে চায় না যে। তার কোনো বাঁধন নেই। শুধু করুণা আছে। সবাইকে বুকে টেনে নেয়।
খানিকটা উস্কে দেওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলাম- আর ডড্ডামারা যখন রেগে যান? মানুষের অত্যাচারে, অসভ্যতায়, লোভে যখন তিনি অসন্তুষ্ট হন?
না, তাও রাগে না, সাহেব। ডড্ডা মারা শাস্তি দিতে জানে না। শুধু ছায়া দিতে জানে।
এ কেমন ঠাকুর, প্রধান, দুষ্টু লোকেদের শাস্তি না দিলে? তাহলে বিচার হবে কী করে?
প্রধান হাসেন। যেন অবুঝ শিশু প্রশ্ন করে চলেছে। প্রশ্রয়ের স্বরেই বলেন- বিচারের ভার তার নয়। শাস্তি তো দেবে প্রকৃতি!
ডড্ডা মারা কী তবে প্রকৃতিরই প্রতীক নন? আমি প্রায় আক্রমণের স্বরেই বললাম।
এবার যেন বিরক্ত হলেন, যেন শিশুটি বেশি উত্যক্ত করে ফেলেছে, তবু গলাটা যথাসম্ভব মোলায়েম করে বললেন- তোমাদের ভাবনা বড়ো শহুরে, সাহেব। উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে দিয়ে তোমরা লম্বা গল্প ফাঁদতে পারো।
আমি সত্যিই শিশুর মতন আবার প্রশ্নটা করলাম- ডড্ডা মারা আর প্রকৃতি আলাদা হলে কার শক্তি বেশি?
দুনিয়াটা দড়ি টানাটানি খেলা নয়, ওটা তোমাদের শহরের গল্প।
শহর শুধু কেনো প্রধান? সব ধর্মেই কী প্রকৃতি মায়ের মতো না?
প্রধান দুদিকে মাথা নাড়ে- তোমাদের কাছে প্রকৃতি মায়ের মতো। আমাদের কাছে প্রকৃতি হল পিতা। ডড্ডামারাই আমাদের মা। প্রকৃতি হিংস্র হতে জানে, প্রকৃতি শাস্তি দিতে জানে…
আর ডড্ডামারা? প্রধানের কথার মাঝেই আমি প্রশ্নটা করে বসলাম।
ডড্ডামারা কিছুই পারে না সাহেব, শুধু আশ্রয় আর ভালোবাসা দেওয়া ছাড়া। তোমাদের অন্য লোকেরা সেদিন যখন আমাদের ঘর জ্বালিয়ে দিলে, আমাদের তিনটে মেয়েকে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ভোগ করে মেরে এলে, সেদিন ডড্ডা মারা সারাদিন কেঁদেছে। মায়ের কান্না আমরা শুনতে পাই। তোমরা আমাদের মাকে ধর্ষণ করতে পারো সাহেব, কিন্তু আমাদের অপমানিত মা, রক্তাক্ত মা কাউকে অভিশাপ দিতে পারে না। শুধু আমাদের জড়িয়ে থাকতে পারে অনন্তকাল।
এটুকু বলেই প্রধান উঠে গেছিলেন। বুঝেছিলাম আমার ইন্টারভিউ শেষ হয়েছে, এরপর চাইলেও প্রধান কিছু কথা বলবেন না।
ফেরার সময় দাঁড়িয়েছিলাম বটগাছটার তলায়। অবাক হয়ে ভাবছিলাম, বরাবর জেনে এসেছি মানুষের ইনসিকিওরিটি থেকেই ঠাকুরের জন্ম, ধর্মের জন্ম। এ কীরকম ধর্ম যেখানে মানুষের সাথে মানুষের আরাধ্যাও ভালনারেবল হয়ে, আক্রান্ত হয়ে, দুর্বল ও অসহায় হয়ে রয়ে যায় প্রতিরোধহীন?
এখন প্রায় সাত বছর বিজ্ঞাপনের চাকরিতে কাটানোর পরও আমার মাঝে মাঝে রুহুগাঁওয়ের প্রধানের কথাগুলো হুবহু মনে পড়ে। ভগবান জানে কবেই মরে ভূত হয়ে গেছে সেই প্রধান! হয়ত ভূত হয়ে গেছে গোটা গ্রামটাই।
আমি যাওয়ার পরও রুহুগাঁওয়ের জৈন মন্দিরের জমি পড়ে ছিল মাস ছয়েক। তারপরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত। একদিন আদিবাসীরা দেখল সেটার চারপাশে বড়ো একটা জায়গা কাঁটা-তারে ঘিরে ফেলা হচ্ছে। দিনের শেষে নোটিস পড়ল - “প্রাইভেট প্রপার্টি অফ ল্যান্স প্লাস্টিক কোম্পানি”। আরও সপ্তাহখানেক পর, বেশ কিছু লোক গাড়ি নিয়ে এল। জানা গেল, সেখানে প্লাস্টিক কারখানা হবে। কারখানার উদবোধনের দিন হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সভাপতি ছিলেন বিশেষ অতিথি। তিনি ঘোষণা করেছিলেন কারখানা কর্তৃপক্ষের ইচ্ছায় রুহুগাঁওয়ের আদিবাসীদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা হবে। একজন আদিবাসীকেও খুচরো চাষ করে ফল-সব্জি বিক্রি করে পেট চালাতে হবে না। শিল্পায়নের মাধ্যমে তাদের গরিবি, তাদের রোজগারের অনিশ্চয়তা কেটে যাবে।
তার কয়েক মাসের মধ্যেই প্লাস্টিক কারখানার কাজ শুরু হয়ে গেছে পুরো দমে। রুহুগাঁওয়ে সোনাতুয়া পাখিদের আর দেখা যায় না। চল্লিশ প্রজাতির প্রজাপতিও না। বড়ো বটগাছের পাতাগুলো আরও বিবর্ণ হয়ে গেছে। দেখলে মনে হয় গাছগুলো বড়ো যৌথ পরিবার থেকে হঠাত করে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে পৌঁছে গেছে। আদিবাসীদের গ্রাম হয়ে উঠেছে বস্তি। পাশে নীচু জলা-জমিতে কচুরিপানা ভরে থাকে না, তার বদলে দেখা যায় গাঢ় হলুদ জল। কারখানার নালা থেকে জল এসে শুনেছি ওখানেই পড়ে।
আদিবাসীরা অনেকেই রুহুগাঁও আর ডড্ডামারাকে ছেড়ে চলে গেছে। যারা অন্য বাসভূমি খুঁজে বাপ-ঠাকুরদার টিলা ছেড়ে চলে যেতে পারেনি অন্য কোথাও - সেই আদিবাসীরা এখন মাথায় গামছা দিয়ে দিন-মজুরের কাজ করে প্লাস্টিক কারখানায়। সরকারি খাতায় লেখা আছে- প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জনা পঞ্চাশ আদিবাসীর ঘর পুড়ে গেলে, ল্যান্স কোম্পানির প্রাইভেট জমির অংশ-বিশেষ তাদের দান করা হয়েছে। আরও বলা আছে - আদিবাসীদের উপাসনার জন্য আরাধ্য ডড্ডামারার একটি মন্দিরও ল্যান্স কোম্পানি তৈরি করে দিয়েছে গ্রামের পূর্বদিকে। এই কারণে কোম্পানির মালিক ও হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সম্মানীয় সদস্য বিদ্বান গাইতুন্ডুকে বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করেছে মহারাষ্ট্র সরকার।
সরকারি মহাফেজখানায় বসে এই হলুদ হওয়া কাগজ-পত্র সম্ভবত আমি ছাড়া কেউই ঘেঁটে দেখেনি। প্রিয় পাঠক, আপনি যদি সরকারি দলিল ঘেঁটে এর সত্যতা যাচাই করতে চান, তবে আপনাকে এখুনি জানিয়ে রাখা ভালো যে সামান্য ছাপার গোলোযোগে ডড্ডামারার মন্দির সরকারি দলিলে হয়ে গিয়েছে ডড্ডামায়ের মন্দির।
তবে, স্বাভাবিক ভাবেই, এত সবের পরেও যখন এই নিমকহারাম আদিবাসীদের পাঁচজন ষাটোর্ধ্ব মরদ দু-মাসের ব্যবধানে গলায় দড়ি দেয়, তখন সরকারি নথি তো দূরের কথা, কোনো সংবাদপত্রের ফুটনোটেও তা যে ছাপার যোগ্য হয়ে ওঠে না- সে তো বলাই বাহুল্য!
Ranjan | ০৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:৪৪743024