

অলংকরণ: রমিত
রবিবারের সকাল। মেঘলা আকাশ হলেও বৃষ্টি হওয়ার সম্ভবনা কম। বসন্ত এসে গেছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে পার্কের পলাশ ফুল দেখে আর অশত্থ গাছের আড়ালে কোকিলের ডাক শুনে। বাজার করে চায়ের আড্ডায় হাসাহাসি, ফাজলামি করে মনটা হালকা হয়ে যায়। বাড়িতে এসে খবরের কাগজ নিয়ে বসলাম। ভোট আর যুদ্ধের খবর পড়তে পড়তে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। হুঁশ এলো আমার স্ত্রীর চেঁচামেচিতে।
—‘আর কতক্ষণ লাগবে তোমার খবরের কাগজ থেকে চোখ ওঠাতে। বাড়ির তো কোন খবর রাখো না। এদিকে তোমার আদরের মেয়ে তো খাবার খেতে চাইছে না।’
আমি সঙ্গে সঙ্গে খবরের কাগজ সরিয়ে রেখে মেয়ের কাছে এলাম। মেয়ের মুখ চোখ দেখে মনে হল সে খুব ভয় পেয়ে গেছে। চোখ দিয়ে জল বেরিয়েই যাচ্ছে। সামনে রয়েছে এক বাটি দই মাখা ভাত। আমার মা ও স্ত্রী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে দই ভাত খেলে মাথা ঠাণ্ডা থাকে আর বুদ্ধি বাড়ে। মেয়ের এই অবস্থা দেখে আমার চোখে জল এল। কোনরকমে দই ভাতের বাটিটা তুলে নিয়ে মেয়েকে বললাম, ‘চন্দ্রা, সবটা না খেলেও কিছুটা খাও মা, অন্তত তোমার বাবার জন্য।’
মেয়ে একটু নরম হল। তার চোখের জল মুছে বলল, ‘ঠিক আছে বাবা, আমি সব দইভাত খেয়ে নেব, কিন্তু আমি যা চাইবো, তুমি কি তাই দেবে?’
—‘নিশ্চয়ই দেবো মা’ — এই কথা বলে মেয়ের ডান হাতটা আমার ডান হাতের উপর রেখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
—‘প্রমিস।’
—‘হ্যাঁ, প্রমিস।’
—‘কিন্তু মা আর ঠাকুমা কি প্রমিস করবে?’
আমার স্ত্রী প্রমিতা আর মা প্রমিস করলো। তখনই আমার সন্দেহ হল। বললাম, ‘মা, খুব দামী জিনিষ, যেমন কম্পিউটার, আই-ফোন যেন চেয়ো না। তুমি তো জানো, তোমার বাবার এত টাকা নেই।’
—‘না বাবা, আমি কোন দামী জিনিষ চাইবো না, প্রমিস।’
ধীরে ধীরে, যদিও কষ্ট করে, চন্দ্রা দই ভাত খেয়ে নিল।
আমি মনে মনে আমার স্ত্রী আর মায়ের উপর রেগে গেলাম, কেন যে তাঁরা মেয়েকে জোর করে তার অপছন্দের খাবার খেতে বলে বুঝলাম না।
দুপুর বেলা। অসহ্য গরম। আকাশে চিলের ডাকে যেন এক অশুভ সংকেত! সামনে দেখলাম আমার মেয়ে আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার মুখে কোন সংশয় নেই, আছে শুধু আশা আর হাসি। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তি পেলাম।
—‘বাবা, সামনের রবিবার আমি ন্যাড়া হতে চাই – এটাই তোমার কাছে আমার একমাত্র চাওয়া।’
আমার মাথা বন্বন্ করে ঘুরতে লাগল।
আমার স্ত্রী চিৎকার করে বলল, ‘নৃশংস, বর্বর।’
আমার মা বলল, ‘আমাদের পরিবারে এটা কোনদিন হয়নি, আর আমি বেঁচে থাকতে হতেও দেবো না। যতসব বদমায়িসি বুদ্ধি! অসম্ভব। সব সময় মোবাইল খুলে দেখলে এই সব শিক্ষাই হয়। আমাদের পরিবারের সুনামকে নষ্ট করতে আমি কিছুতেই দেবো না।’
—‘চন্দ্রা, তুমি অন্যকিছু চাও মা, তোমার ন্যাড়া মাথা দেখে আমরা সবাই খুব ব্যথিত হব। তাছাড়া, তোমাকেও তো দেখতে খারাপ লাগবে। সমাজের মানুষের কাছে, আত্মীয় স্বজনদের কাছে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না। মা, তুমি অন্যকিছু চাও মা প্লিজ।’
—‘না বাবা, আমি আর কিছুই চাই না – এটাই আমার শেষ কথা।’
—‘মা, তুমি কেন আমাদের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করছো না। আমরা তো তোমার আপনজন।’
আমি অনেক চেষ্টা করলাম চন্দ্রাকে বোঝাতে, কিন্তু সে কিছুতেই তার মত পরিবর্তন করতে চাইলো না। চন্দ্রা বলল, ‘আমি কি কষ্ট করে দই ভাত খাই, সেটা তো তুমি বোঝো। তোমরা প্রতিজ্ঞাও করলে যে আমি যা চাইবো, সেটা তোমরা দেবে। এখন কেন কথার খেলাপ করছো? তুমিই তো আমাকে রাজা হরিশ্চন্দ্রের চরিত্র এবং তার আদর্শ সম্বন্ধে গল্প শুনিয়েছিলে। তুমিই শিখিয়েছিলে, পৃথিবী উল্টে গেলেও আমাদের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা জীবনের ধর্ম। তাই না বাবা?’
এই সব কথা শোনার পর আমি চন্দ্রাকে অনুমতি দিলাম, ‘ঠিক আছে মা, তোমার ইচ্ছামত তুমি তোমার মাথার সব চুল কেটে ন্যাড়া হয়ে নাও।’
আমার অনুমতি দেওয়া শুনে আমার মা ও স্ত্রী একসাথে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘তোমার মাথার ব্যারাম হয়েছে।’