এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • স্মৃতি হতাশা ও আশঙ্কা

    Abin Chakraborty লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ৮২ বার পঠিত
  • বাঙালি হিসেবে বরাবর এক ধরণের গর্ব অনুভব করেছি। সেটা যে কলকাতা কেন্দ্রিক সংস্কৃতির সাথে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত সেটাও অনস্বীকার্য। কিন্ত এই জাত্যাভিমান এর ব্যাপারটা আজকাল কেমন যেন মেকী ও ঠুনকো লাগতে শুরু করেছে। এটার কারণ যে অনেকাংশেই রাজনৈতিক সেটা স্পষ্ট। সারা দেশের মত বাংলা জুড়েও অদ্ভূত বিদ্বেষ, বিভাজন ও বৈরিতার চাষ হয়েছে গত কয়েক বছর ধরে। ফলত রাজ্যের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের আবহাওয়া এমন ভাবে কলুষিত হয়েছে যে অনেক সময়েই লোকজনের সাথে কথা বলা দুরূহ হয়ে পড়ছে কারণ তাদের ঘৃণার ভাষার সাথে খাপ খাওয়ানো যাচ্ছেনা। নবজাগরণ, জাতীয়তাবাদ ও সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক স্ফূরণ যে প্রগতিশীল, উদার এবং সুদৃঢ় চেতনার সৃষ্টি করেছিল তার পরিপ্রেক্ষিতেই দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, দারিদ্র্য, উদ্বাস্তু সমস্যা ইত্যাদির প্রকোপ সামলেও বাঙালি এক নিজস্ব শান্তি, স্থিতি ও সাংস্কৃতিক বিকাশের পথ খুঁজে পেয়েছিল। সে পথে ঐশ্বর্য্য বা বৈভবের উজ্জ্বলতা ছিলনা। কিন্ত শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রার মৌলিক কিছু উপাদানের সজীব অস্তিত্ব ছিল। অর্থসর্বস্বতা মানুষকে গ্রাস করেনি, শিক্ষাগত যোগ্যতার মর্যাদা ছিল, দারিদ্র্য সত্ত্বেও জীবনে নিরাপত্তা ছিল, সামাজিক দুর্বৃত্তায়ন নির্লজ্জ ভাবে প্রকট হয়নি, তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের বাইরের শিক্ষিত মানুষ জনেরও স্বচ্ছল জীবনধারণের সম্ভাবনা ছিল, পারস্পরিক সৌজন্য ও সহানুভূতির সামাজিক স্বীকৃতি ছিল।

    কিন্তু বর্তমানে এই সব বৈশিষ্ট্য ক্রমশ ক্ষীয়মান। এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে বিত্তের আড়ম্বর অশ্লীল ভাবে মাথা চাড়া দিয়েছে। তারা আম্বানি দের বিয়ের আদেখেলেপনা দেখে প্রচুর উল্লসিত হয়ে একি কুৎসিত দেখনদারি নিজেরা করতে উঠে পড়ে লাগে। অন্যদিকে রয়েছে এদেরই কিছু স্বজাতি যারা বাংলাটা বলে হিন্দির মত করে, ধনতেরাস থেকে karva chauth সবই উদযাপন করে। এদের পূর্বসূরীরাই বলত আমার ছেলের/মেয়ের বাংলাটা ঠিক আসেনা। তার সাথে আছে সেইসব মানুষ যারা শিক্ষা দীক্ষার প্রতি বাঙালির যে সম্মানের বোধ টা ছিল সেটাই বিসর্জন দিয়ে শুধু টাকা বা ক্ষমতার পেছনে দৌড়াচ্ছে। এদের মধ্যে অনেকেই আবার বিভিন্ন স্তরের শিক্ষক। এরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে টাকাটাই সব। তাই এরা নিজেদের পারিপার্শ্বিক সকল অনাচার মুখ বুঝে সহ্য করে নিজের স্বার্থের বুদবুদে ডুবে থাকে। কোন সাংবাদিক অকারণে গ্রেপ্তার হল, বিচার ব্যবস্থা কেন রাষ্ট্রীয় অবিচারের সমর্থক হয়ে ওঠে, তেলের দাম কেন কমেনা, রাস্তাঘাট কেন সারানো হয়না, শিক্ষা বা স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে কেন যথেষ্ট নিয়োগ হয়না, ধনীদের কর বা ক্ষতিপূরণ মকুব করা হলেও দরিদ্র হকারের দোকান কেন ভাঙা হয়, কেন নাগরিকদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়, কেন ইভিএম পুড়ে যায়, কেন উন্নয়নের নামে নদী, অরণ্য ধ্বংস করে সর্বনাশ ডেকে আনা হয় ইত্যাদি কিছু নিয়েই তাদের কোন বক্তব্য থাকেনা। তবে সম্পূর্ণ অচেনা মানুষের বিরূদ্ধে সমাজমাধ্যমে বিষোদগার করতে এদের একটুও বাধেনা।

    তার মানে এই নয় যে এদের মনে অসন্তোষ থাকেনা। জীবনের নানা দুঃখ যন্ত্রণায় এই সব মানুষরাও ক্লিষ্ট হয়ে থাকে। এই অবস্থার সাথে সমঝোতার জন্য হয় তারা পারিবারিক সদস্যদের জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করে নয়তো দৈনন্দিন জীবনের আদান প্রদানে যাদের দুর্বল মনে হয় তাদের ওপর জমিদারি চোটপাট করে। এর ফলেই বেহালার সেই তরুণকে নিজেদের বাড়ির কন্যার সাথে প্রেম করার অপরাধে নগ্ন করে মারধর করা হয় এবং তার বাবার ওপরেও একই অত্যাচার করা হয়। প্রেম, ভালোবাসা ইত্যাদি অনেকের কাছেই অপরাধ সমান। তার সাথে মনের ঝাল মেটাবার সুযোগ একজোট হয়ে এই ধরণের অসভ্য অপরাধমূলক মাফিয়াবৃত্তির জন্ম দেয়। এদের সাথে সৌদি আরবের চুমুর বদলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া লোকদের বিশেষ ফারাক নেই। এমনই অবস্থা যে পুলিশও সেই ছক মেনে বিচারের আগেই খুন ও ধর্ষণে অভিযুক্ত দের এনকাউন্টার করে দেয়, আলাদা জায়গায় কিন্তু অবিকল এক পদ্ধতি মেনে। অনেকে তাতে আনন্দিত ও হয়। পুলিশকে খুনের অধিকার দিয়ে দেয়া টা কত বিপজ্জনক এরা কেউ ভাবেনা। এদেশের পুলিশের নিরপরাধীকে অভিযুক্ত বানাবার সুদীর্ঘ তালিকা মাথায় রেখেও এদের কারো মনে আতঙ্ক ও বিক্ষোভ জন্মায়না। এদের এক দল আবার সরকারের সব কাজেই সাধুবাদ দেয়। সরকার জনতার টাকায় মোচ্ছব করলেও তারা তৃপ্ত এবং সরকার প্রতিমা কে স্পর্শ করবে তার নিদান দিলেও তুষ্ট। তাই চোরবাগানের মৃত্যুমিছিল ভুলে তারা কাশ্মীরের পূজো কত ভাল হয়েছে তার বিজ্ঞাপন দেয়। কাশ্মীর নিয়ে তাদের আসল ব্যাপার টা হল এক ধরণের দখলদারির আনন্দ। কাশ্মীরের মানুষ, সে যে ধর্মেরই হোক না কেন, তাদের নিয়ে কোন প্রকৃত মানবিক দায় এদের নেই। সব টাই হল 'কেমন দিলাম' খেলার দান মাত্র। সরকারী সড়কের গর্তে উল্টে পড়ে পা ভাঙলেও এরা হয়তো গুজরাটের কোন সদ্য উদঘাটিত সরণির স্তুতি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বে (দেরী করলে ভেঙে যেতে পারে সেটা অন্য ব্যাপার)। শিক্ষিত বাঙালি যে কিভাবে নিজেদের বিবেক, বিচার বোধ, শিরদাঁড়া এমনকি সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব স্বহস্তে নষ্ট করল এর উত্তর আমার জানা নেই। তবে যেভাবে রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎচন্দ্র, নেতাজি সবার অপমান হয়ে চলেছে এবং একদল কৃমিকীট রা নির্বিঘ্নে এসব করছে বা তাতে উৎসাহ যোগাচ্ছে তাতে জাতি হিসেবে নিজেদের অবক্ষয় আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তাই যে বাংলায় শিক্ষার এত কদর ছিল সেখানে বইয়ের দোকানে ফ্যাসিস্ট আক্রমণ নামলেও তার বিরূদ্ধে সমবেত ধিক্কার একটা ছোট্ট অংশের বাইরে বাকিদের থেকে আসেনা।

    এটা হতে পারে যে নবজাগরণের আলোকদীপ্তি একটা ছোট অংশেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু তারাই সমাজের দিক নির্দেশকের অবস্থানে ছিলেন বলে তাদের মূল্যবোধের অনুকরণেই বাকি সমাজ একটা নির্দিষ্ট ধারায় চলত। হয়ত আমার সীমিত অভিজ্ঞতার জগতের বাইরে এখনো অনেক উজ্জ্বল মণি মাণিক্য ছড়িয়ে আছে। নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। কিন্তু দুর্দশার বোধ থেকে সহজে নিষ্কৃতি পাওয়া মুশকিল। আশঙ্কা হয় যা কিছু নিয়ে গর্ব ছিল সব যেন অতীত না হয়ে যায়। যেন আমার সন্তানও তার যৌবনে আমার শৈশবের গর্বের আকর গুলো খুঁজে পায়।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন।