

অলংকরণ: রমিত
শহরের উপকণ্ঠের একটা আবাসন। বেশ খোলামেলা আবাসনটা। যাঁরা আছেন, তাঁদেরকে মনে হয় উচ্চমধ্যবিত্তই বলা যায়। কিছু অবসরপ্রাপ্ত প্রৌঢ়, যাঁরা মোটামুটি ভালো চাকরি করতেন, মানে পেনশন গ্র্যাচুইটি এল-আই-সি ইত্যাদি মিলিয়ে এখানে ফ্ল্যাট কেনার পরেও হাতে ভালোমতনই আছে। আর থাকে কিছু তরুণ-তরুণী, তারা বেশিরভাগই এম-এন-সি-তে চাকরি করে, লোনের টাকায় ফ্ল্যাট কিনেছে। শহর থেকে একটু দূরে হলেও তারা নিজের গাড়িতে কর্মস্থলে যায়, ছেলেমেয়েকে ইস্কুলে ছেড়ে দিয়ে আসে। জায়গাটা বেশ হাত-পা ছড়িয়ে থাকার মতন, রোদ হাওয়া আসে- একটু দূরেই গ্রামের পথ, মোটের ওপর পলিউশন ফ্রি। বুড়োরা, যাদের মর্নিং বা ইভিনিং ওয়াক ছাড়া বাইরে বেরোনোর দরকার হয় ন, শীতের দুপুরে কি গরমের সন্ধেয় আবাসনের পার্কের বেঞ্চে বসেন আড্ডা মারতে। আড্ডার কিছু চরিত্র নির্দিষ্ট, প্রায় রোজই এসে বসেন, আর দু-একজন অনিয়মিত। পুজোর মুখে এরকমই একদিন তাঁরা আড্ডায় বসেছেন।
ডঃ গাঙ্গুলি মাঝখানে পড়ে গেছিলেন খাট থেকে গড়িয়ে, পায়ে প্লেট বসেছে, তিনি এখন হুইল চেয়ারে বেরোচ্ছেন। তিনি বিপত্নীক, ছেলেরা বিদেশে থাকে। এখানে দু-বেলার আয়া আসে তাঁর দেখাশুনো করতে। সিকিওরিটির একজন নামিয়ে দিয়ে গেছে তাকে, সাড়ে আটটায় শিফট শেষ হলে সেই তাকে আবার ঘরে পৌঁছে দেবেন। এছাড়া যাঁদের দেখতে পাচ্ছি, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রিটায়ার্ড আই এ এস অফিসার মিঃ সিনহা আর সচদেবা কলেজ অফ কমার্সের অবসরপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল প্রফেসর বসু। এই দুজন আলাদা করে আকর্ষণীয় কারণ এরা সমাজে বেশ সম্মানিত হলেও এই আড্ডায় প্রকাশ পায় যে এঁদের রুচি বেশ মোটা দাগের। ইনুএন্ডু মেশানো রসিকতা চালান তারা, বাকিরা আমোদ পায় অবশ্য। এতদ্ব্যতীত আছেন নন্দীবাবু, সেন্ট্রাল গভার্নমেন্টের অফিসার ছিলেন আর বিজ্ঞান আন্দোলন করতেন। সুমন পাল ছিলেন ব্যাঙ্কে, তিনি আবার ইউনিয়নের বড়ো মাথা ছিলেন, প্রোমোশন নেননি সেজন্য। তাঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজনই কট্টর বামপন্থী, সারাজীবন ব্যাংকের ইউনিয়ন করেছেন- এখন থিতিয়ে পড়েছেন যদিও। নন্দী আর পালের সঙ্গে মিঃ সিনহার প্রায়ই লাগছে। মিঃ সিনহা এককালে সরকারে থাকা বামপন্থীদের ঘনিষ্ঠ হলেও আজকাল হোয়াটস-অ্যাপে বেশি ভরসা করেন। সেইসব পড়ে পড়ে যখন শোনান, এঁরা উলটে চ্যালেঞ্জ করেন। মাঝেমাঝে একজন মুসলিম ভদ্রলোকও আড্ডায় আসেন, এই আবাসনের কিছুটা তাঁর জমির ওপর হয়েছে বলে তিনি এখানে ফ্ল্যাট পেয়েছেন। ইনি এলে মিঃ সিনহা আরও উত্তেজিত হয়ে যান আর পাল্লা দিয়ে চলেন সুমন পাল। ওহ, আরেকজন আসেন প্রায়ই, ব্রতীন রায়। ইনি পাবলিক রিলেশনস দেখেছেন বিভিন্ন কোম্পানির। এখন রিটায়ার করেও কনসালটেন্সি করেন অনেক। পেশাগত ট্রেনিং-এর ফলেই বোধহয়, ইনি সবসময়ে ব্যালেন্স করে কথা বলেন। মানে, চ্যাপেলও ভালো, সৌরভও ভালো, অথবা প্রোমোটারও থাকবে, পুকুরপাড়ও থাকবে- এরকম অভিমত বেশ যুক্তিসহই রাখতে পারেন।
সম্প্রতি বাগীরাম বাবা কলকাতায় এসেছিলেন। সল্টলেকে বড়ো আসর বসেছিল কথা-র। হিন্দিভাষাভাষী স্থানীয় লোকের ভীড় উপচে পড়েছিল। সেখানে বাগীরাম বক্তব্য রেখেছেন যে অত্যধিক আমিষ ভোজনের ফলেই বাঙালি হিন্দুদের স্বধর্মনিষ্ঠা কমে যাচ্ছে। বাবা বলেছেন সারাভারতের হিন্দু একতার স্বার্থে বাঙালির উচিত একটি সাধারণ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। তাই, তাঁকে নিয়ে এখন মিডিয়া তোলপাড় হচ্ছে। বাগীরাম এককালে বাগী বা ডাকাত ছিলেন, পরে রামভক্ত হয়েছেন। দেশের একাংশ মানুষ তাঁকে বাল্মীকির অবতার মনে করে। তাঁর স্পেশালাইজেশন রামনামে ভূত তাড়ানোয়। উত্তর ও মধ্যভারতের থেকে হাজার হাজার লোক তাঁর দরবারে যায় ভূত তাড়াতে। মিঃ সিনহা একটা ভিডিও দেখাচ্ছেন, অবশ্যই হোয়াটস অ্যাপ ফরোয়ার্ড- বিভিন্ন লোক অদ্ভুত সব ব্যবহার করছে আর তাদের বাগীরাম বাবা ছুঁয়ে রামনাম জপ করলেই তারা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। যেমন একটা অল্পবয়সি ছেলে দাঁতে ভারী ফুলদানি চেপে ঘুরছে। সঙ্গের লোকজন তাকে টানতে টানতে বাবার কাছে নিয়ে গেল। বাবা মাথায় হাত দিতে ফুলদানি হাতে ধরে মাটিতে নামিয়ে রেখে শান্ত। এক মহিলা নিজের মাথার চুল ছিঁড়ছে, ছিঁড়েই যাচ্ছে। বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন জয় শ্রীরাম। ব্যাস, মহিলার দু চোখ বেয়ে জল- সেও শান্তি পেল। একের পর এক সব আসছে এবং শান্ত হয়ে যাচ্ছে, বেশিরভাগই এদের মহিলা।
নন্দীবাবু বললেন - ‘দূর মশাই। হিস্টিরিয়া জানেন না, এই তো ফ্রয়েডের প্রথম কাজ ছিল। একশো বছর আগে বিজ্ঞান এসব বুঝে নিয়েছে। কোথায় পড়ে আছেন?’
মিঃ সিনহা ছাড়বেন কেন? বললেন - ‘নিজের চোখে দেখছেন ঐ বাচ্চা ছেলে শুধু দাঁতে করে ফুলদানি তুলছে! আরে, চোখে যা দেখছেন শুধু বিজ্ঞান বলে তাকে অবিশ্বাস করবেন? এই আপনাদের আরেক মৌলবাদ-‘
নন্দীবাবু উড়িয়ে দিলেন তাকে -
‘ধ্যার ধ্যার! ওইসব হোয়াটস অ্যাপ রিল না দেখে একটু উইকিপিডিয়াও তো করতে পারেন! অথবা জাস্ট একটা সিম্পেল সার্চ দিলেন হিস্টিরিয়া নিয়ে- মাসেল পাওয়ার কী করে শর্ট স্প্যানে বাড়িয়ে নেওয়া যায়, মোটর নিউরন আর অ্যাড্রিনালিন রাশ কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে পড়ে নেবেন। আজকাল তো জেমিনিকে বললে ছবি টবি এঁকে বুঝিয়ে দেয়। কোথায় পড়ে আছেন আপনারা? জানেন ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ারে তুর্কি সেনারা একা হাতে কামান তুলে ফেলত হিস্টিরিক শকে? এসব একটা নিউরোসাইকোটিক ডিফেন্স মেকানিজম, হেরে যাওয়া মানুষ রুখে দাঁড়াতে পারে যাতে তাই ইভলিউশন এই পাওয়ার তৈরি করেছে!’
বামপন্থী সুমন পাল বললেন - ‘হ্যাঁ, ঐ তো ফ্রয়েড- অপ্রেসড মহিলারা হিস্টিরিক হত। এখানেও যাদের দেখছেন বেশিরভাগই মেয়ে। তাও ওইসব সোসাইটির। ওখানে মেয়েদের কীভাবে দেখা হয় জানেন না?’
মিঃ সিনহা আবার চেষ্টা করছেন -
‘এই তো আপনাদের স্নবারি বেরিয়ে পড়ল। হিন্দিভাষী মানেই পুংতান্ত্রিক। আপনারা নিজেরা সব কী? আর, এই ছেলেটা? এই বাচ্চা ছেলেটা?’
সুমন পাল - ‘বাচ্চা কোথায়? অ্যাডোলেসেন্ট। দেখুন কারো প্রেমে পড়েছিল, তার বাড়িতে বলেছে অনার কিলিং করে দেবে! অপ্রেশন কি শুধু জেন্ডারে? কাস্টে নেই?’
মিঃ সিনহা - ‘কাস্ট আর মাইনরিটি, এরা হচ্ছে রাজা। দেখেছি তো সব! শুনুন, ওই সব স্টেটে নীচু জাত থেকেই নেতা মন্ত্রী পঞ্চায়েত চলে। কলকাতার বাইরে তো বেরোননি। সবই বইয়ে পড়ে-’
ব্রতীন রায় আজকে আড্ডায় এসেছেন। তিনি বিশ্বশান্তির লোক। ফলে, তাঁকে মুখ খুলতে হল। তিনি যেটা বুঝলেন আনোয়ারুদ্দিন আসার আগে টপিক ঘোরানো ভালো হবে। নাহলে এই আমলা সে-বেচারাকে আবার অপমান করবে! ব্রতীন বললেন -
‘নন্দীবাবু, এগুলো না হয় হিস্টিরিয়া। এ হল যাকে বলে ভূতে ধরা। এরা অদ্ভুত কিছু করছে সেটা সবাই দেখছে। এবার এরা মানসিক রুগিও হতে পারে, আবার অভিনয়ও করতে পারে। এর তো বললেন ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু ভূত দেখা নিয়ে কী বলবেন? লোকে তো ভূত দেখে- তারা সবাই মানসিক রুগিটুগি নয়। আমার আপনার মতন লোকই পাবেন, বলছে যে ভূতের অভিজ্ঞতা তাদের হয়েছে। সেটা কিন্তু সেন্সারি। দর্শনেন্দ্রিয়, শ্রবণেন্দ্রিয় ধরেছে সেটাকে।‘
প্রফেসর বসু বললেন - ‘স্পর্শেন্দ্রিয় বাদ দিলেন? ভূতের সঙ্গে সেক্স- ইংরিজি সিনেমায় হয়। ইন্দ্রিয়সুখের চূড়ান্ত’
ডঃ গাঙ্গুলি বললেন - ‘স্পর্শ বলতে ঘাড় মটকানোও হতে পারে। তখন আবার আরেকটা ভূত তৈরি হয়ে যাবে।‘
ব্রতীন সবাইকে সুযোগ দিতে চান -
‘মিঃ সিনহা আপনার কী মনে হয়? ভিডিও-টিডিও আছে নাকি ভূতের?’
‘ওসব প্র্যাংক ভিডিও’ বললেন সুমন পাল। ‘প্রফেসরসাহেব যেরকম অ্যাডাল্ট সিনেমা দেখতেন ভূতের, ওরকমই, তবে শিশুদের জন্য বানানো রিল। অবশ্য আমরা তো এখন শিশুই!’
প্রফেসর বসু বললেন - ‘জানেন না, ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। আমিও হোয়াটস অ্যাপে ভিডিও পাঠাতে পারি। আপনাদেরর ভেতরের শিশুগুলি জেগে উঠবে খন’।
মিঃ সিনহা বললেন - ‘আমাকেও পাঠিও-খন প্রফেসর। দেখব তোমার অ্যাসোসিয়েটরা কীসবের চর্চা করে!’
প্রফেসর বসু - ‘পাগল! তোমার শিশু তখন দাঁতে ফুলদানি তুলতে চাইলে তার ভূত তাড়াবে কোন বাবা? তুমি বরং হোয়াটসঅ্যাপে ইউনিভার্সিটিই পড়ো। ঐসব অশিক্ষা-কুশিক্ষাই সইবে তোমার।‘
ব্রতীন বললেন - ‘আরে আমি তো ওঁর মতটা শুনতে চাইছিলাম ভূত নিয়ে, আপনি বলুন মিঃ সিনহা সত্যি ভূতের ব্যাপারে কিছু জেনেছেন?’
মিঃ সিনহা বলে উঠলেন -
‘দেখুন স্যার - এই ভূত দেখা বা ভূতের গলা শোনা, এইসবের অনেক অভিজ্ঞতা আছে। আর যাঁরা এক্সপিরিয়েন্স করেছেন নট দ্যাট অল আর সাইকো-স। তাহলে তাঁরা কিছু একটা দেখছেন বা শুনতে পাচ্ছেন। হোয়াট ডাস ইট মিন? যে কোনও একটা অবজেক্ট লাইট রে রিফ্লেক্ট করাচ্ছে, তাই তাকে দেখা যাচ্ছে। মানে কিছু ছিল না, হঠাৎ একটা রিফ্লেক্টিং সারফেস তৈরি হচ্ছে। বা কেউ সাউন্ড ওয়েভ তৈরি করছে- সাউন্ড তৈরি করতে তো একটা এনার্জি লাগে। সেটা আসছে কোথার থেকে? তার মানে ফিজিক্সের যে সূত্রগুলো আমরা জানি বা অ্যাটলিস্ট আমরা সেগুলোকে যেভাবে দেখছি, কোথাও একটা তো সেটা টিকছে না।‘
সুমন পাল তেড়িয়া হয়ে উঠলেন -
‘এ কোন যুগের লোক মাইরি আপনি? এই নিয়ে আপনি লেফট-এর আমলে সেক্রেটারিগিরি করেছেন? বিজ্ঞান ভুল? রাধাকান্ত দেবের আমলের লোক নাকি? আপনার মতন লোকরাই গ্যালিলিও-ব্রুনোকে মেরেছিল!’
মিঃ সিনহা বললেন - ‘দেখুন মিঃ রয়, আপনি আমার মত জানতে চাইলেন আর অসহিষ্ণুতার পোকা নড়ে উঠল কোথায়? কমিউনিস্টদের এমনি এই অবস্থা হয়েছে!’
নন্দীবাবু মুখ খুললেন - ‘মিঃ সিনহা, আপনাদের সমস্যা হচ্ছে আপনারা শুধু সেন্সারি ফিলিংটাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, কিন্তু সেইটা যে আসলে নিউরন-বাহিত হয়ে ব্রেনে যাচ্ছে, এই পদ্ধতিটাকে দেখছেন না। রজ্জুতে তো সর্পভ্রম হয় - ঐ হিন্দুদর্শনের বইয়েই পাবেন। আপনি একটা দেখে আরেকটা অনুমান করে নিচ্ছেন। গাছ দেখে মানুষের ছায়া ভাবছেন- এগুলো সাইকোলজিকালি স্টেবল লোকেরও হতে পারে?’
ব্রতীন বললেন - ‘আচ্ছা নন্দীবাবু, তাহলে আপনারা র্যাশনালিস্টরা ভূতকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?’
নন্দী- ‘এই তো যেটা বললাম। আমি দেখছি মানে ব্রেন সেন্স করছে যে দেখেছি। এবার আপনি দেখছেন না কিন্তু ব্রেন সেন্স করছে, এইটা হতে পারে, তাই না? হ্যালুসিনেশনই ভাবুন’
-মিঃ সিনহা হাততালি দিলেন -
‘ব্র্যাভো! এই এরাই বলে না, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করবে না। আর চোখে দেখলে বলে পাগল! হ্যালুসিনেট করছে!’
ডঃ গাঙ্গুলি মুখ খুললেন -
‘মিঃ সিনহা, এইটা আপনি ভুল করলেন, হ্যালুসিনেট করা মানেই পাগল না। বিভিন্ন ফিজিওলজিকাল কন্ডিশন, মানসিক স্ট্রেস, এইসব থেকে এমনিতে সুস্থ লোকও হ্যালুসিনেট করে।‘
নন্দীবাবু সমর্থন পেয়ে উৎসাহে বলে উঠলেন -
‘এই তো উনি নিজে, উনি তো পাগল নন। চলুন একটা পুকুরে নিয়ে গিয়ে ওনার মাথা জলের মধ্যে চেপে ধরি। বেশি না, মিনিট পাঁচেক- দেখব হ্যালুসিনেট করেন কি না!’
ব্রতীন দেখলেন, আবার কিছু অপ্রীতিকর ব্যাপার হতে পারে, বললেন -
‘ওসব করলে আবার আপনাকে অ্যাটেম্পট টু মার্ডার খেতে হবে। আমার বরং আরেকটা প্রস্তাবনা আছে। তাতে ভূতও টেকে, হ্যালুসিনেশনও লাগে না আবার একটু হায়ার লেভেলে ফিজিক্সও আসে।‘
নন্দীবাবু বললেন - ‘আচ্ছা, কীরকম সেইটা?’
ব্রতীন বললেন্ - ‘ধরুন রিলেটিভিটি, আপেক্ষিকতাবাদ কী বলে? স্থান কাল পাত্রের নির্ভরশীলতা। এইবার এইটা যদি আমরা যেরকম এক্সপেক্ট করছি, তার থেকে আলাদা কিছু হয়, আমরা বলি ভূত দেখছি। মানে ভূত এল মানে স্থান কাল পাত্রের যে পরম্পরা আমরা এক্সপেক্ট করছি, তার থেকে কিছু একটা আলাদা হয়ে গেল’
সুমন পাল বললেন - ‘ওহ সেই বিরিঞ্চিবাবার গল্প। পরশুরাম পড়ছিলেন নাকি রিসেন্টলি?’
ব্রতীন - ‘ও তো মাঝে মাঝেই পড়ি। ঝালিয়ে নেওয়া যাকে বলে। তবে আমি একটু টুইস্ট আনব পরশুরামের থিওরিতে।‘
ব্রতীন রায় একবার মুখ তুলে তাকিয়ে শ্রোতাদের দিকে দেখে নিলেন -
‘আরে বাঃ, আনোয়ারুদ্দিন এসে গেছেন। খুব ভালো। তো এই জমি জায়গা তো আপনাদেরই। মানে আমরা যেখানে বসে আছি বছর দশ আগেও আপনাদের ভিটেজমি এখানেই ছিল তাই তো?’
আনোয়ারুদ্দিন বললেন – ‘হ্যাঁ, সেই জমিতেই তো এই হাউসিং। আমাদের একার না। আরও ক-ঘর ছিল তো।‘
ব্রতীন - ‘তা বেশ। ধরুন আপনার দাদু মানে দাদা। নাঃ নিজের লোককে টানতে হবে না। আপনার চাচার বন্ধুর বাবা- আজ থেকে সত্তর বছর আগে, আপনার চাচা বেশ ছোটো, তার বন্ধু বাড়িতে এসে ফিরছে না, বন্ধুর বাবা ডাকতে এল দরকারে। এরকম তো হতেই পারে তাই না?’
আনোয়ারুদ্দিন সম্মতি দিলেন ঘাড় নেড়ে।
ব্রতীন - ‘মানে আমরা এখন যেখানে বসে আছি, পৃথিবীর বুকে এই স্থানে, এই অক্ষাংশ দ্রাঘিমায়, শেখ আনোয়ারুদ্দনের চাচার বন্ধুর বাবা যদি সত্তর বছর আগের এই আটটা নাগাদ অবস্থান করতেন, সেইটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক ঘটনা। এই সত্তর বছরে তার স্বাভাবিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠত না। খুবই মানডেন নরমাল ব্যাপার। কিন্তু, উনি যদি সত্তর বছর পরে, এখন আমাদের সামনে এইখানে উপস্থিত হন। আমরা কী বলব?’
দু-তিনজন একত্রে বলল - ‘ভূত!’
নন্দীবাবু বললেন - ‘না মিলল না। কারণ সত্তর বছরে পৃথিবী তার কক্ষপথ, সূর্যের চলন মিলিয়ে এক জায়গায় নেই!’
সুমন পাল - ‘আরে বাবা, ফ্রেম অফ রেফারেন্স বোঝেন। বিজ্ঞান আন্দোলন করতে তো একটু বিজ্ঞান পড়ে নিলেও তো হত। আপনি ট্রেনে যেতে যেতে জল খাচ্চো যখন, তখন কি ভাববেন যে বোতলটা টিকিয়াপাড়ায় কাত করেছিলাম আর জল গলায় পড়ল রামরাজাতলায় এসে?’
নন্দীবাবু গায়ে মাখলেন না। বরং রিলেটিভিটির পবিত্রতা রক্ষাই তাঁর আশু কর্তব্য। তিনি আবারও প্রশ্ন করলেন -
‘তাহলে বলছেন ভূত যে তাকে আগের সময় থেকেই আসতে হবে। কারণ সে ভূত? ভবিষ্যতের কোনও পাত্র এখানে এলে তাকে তাহলে কী বলবেন? এরকম ধরুন হল, আনোয়ারুদ্দিনের চাচাতো ভাইয়ের বন্ধুর নাতির নাতির নাতি, এখন এখানে ঘুড়ি লাটাই হাতে চলে এল। এরকম কেন হবে না বলুন তো?’
আনোয়ারুদ্দিন উত্তরটা বুঝতে পেরেছেন। বললেন -
‘আরে এতগুলো নাতি যে বিয়ে করবে, তাদের যে ছেলেই হবে এ কীকরে এখন থেকে জানলেন আপনারা। যে হয়ে গেছে, সে তো একশোভাগ নিশ্চিত যে হয়ে গেছে। চাচার চাচা জন্মেছেন, মরেছেন, এইসব তো সত্য। কিন্তু ঐ নাতির ব্যাপারটা তো সত্যি নাও হতে পারে ফিউচারে-‘
প্রফেসর বসু প্রোবাবিলিটি বোঝালেন -
‘হ্যাঁ, ঐ নাতির কিউবের প্রোবাবিলিটি আর তাদের টাইম ট্র্যাভেলের প্রোবাবিলিটি গুণ করে, বেইজ থিওরেমে বসালে ফাইনাল সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।‘
ব্রতীন বললেন - ‘আরেকটাও হতে পারে। আমার শ্বশুর, তিরানব্বই চলছে। মোটের ওপর বিছানাতেই এখন। হঠাৎ এক একদিন চাঙ্গা হয়ে ওঠেন, ড্রইং রুমে নিজে হেঁটে আসেন, টিভি চালালে দেখেন, কমেন্ট করেন। তো বড়োশালার বেহালার ফ্ল্যাটে তিনি আছেন। আমি যদি বাড়ি ফিরে দেখি, আমার ফ্ল্যাটের সোফায় বসে তিনি টিভি দেখছেন এখন। আমি কী ভাবব? মরে ভূত হয়ে এসেছেন -‘
মিঃ সিনহা বললেন- ‘শেষে নিজের শ্বশুরকে টানছেন? এটা ভালো হল? গুরুজনের মৃত্যুকামনা- বৌদি শুনলে কী বলবেন?’
ব্রতীন - ‘আপনি গিয়ে না লাগালে সে শুনবে কী করে? যাক, তাহলে কাল ও পাত্র ঠিক রেখে স্থান ঘেঁটে গেলেও ভূত হতে পারে!’
ডঃ গাঙ্গুলি উস্খুস করছেন -
‘আহ। তার মানে, তার মানে কি’
নন্দীবাবু বললেন - ‘আইনস্টাইনের ভূতকে কবরের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়ানোর থেকে সহজ ব্যাখ্যা আছে। সেটাই আসল ব্যাখ্যা এখানে- আপনি, মানে আপনি যদি এরকম দেখেন, আপনি সিওর হবেন যে আপনি গাঁজা খেয়েছেন। স্থান কাল পাত্র সব গুলিয়ে যাচ্ছে তাই’
প্রফেসর বসু বললেন - ‘গাঁজা? আপনাদের মনে হয় গাঁজা খাওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। ওতে এরকম কিছু হয় না।‘
নন্দীবাবু - ‘আপনি খেতেন নাকি কলেজে পড়তে?’
প্রফেসর বসু - ‘কলেজ মাই ফুট। এই তো এ-মাসেই খেয়েছি?’
সকলে অবাক হয়ে তাকাল
প্রফেসর বলছেন - ‘বউ একদিন কী এক প্যানপ্যানে সিনেমা দেখাতে হলে নিয়ে গেছে। ছেলে বাড়িতে, ওয়ার্ক ফ্রম হোম বলে মা-কে কাটিয়েছে। তা হলে ঢোকার মুখে বউয়ের এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা। আমার টিকিট তাকে গছিয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। এদিকে বেল বাজাচ্ছি, দেখি শ্রীমান দরজা খুলছেনই না। আমি ভাবলাম প্রেমিকা-টেমিকা ঢুকিয়েছে নাকি। তারপর এলেন, চোখ লাল তার। ঘরে ঢুকে সেই নস্টালজিক ঘ্রাণ। এ তো ছেলেরও বাবা, বাবারও বাবা। তা পরেরদিন বস পায়খানায় গেছে সকালে, আমি স্যাট করে ঘরে ঢুকে একবার খুঁজি। ড্রয়ারেও নেই, আলমারির লকারেও নেই। শেষে দেখি টেবিলের ওপর মানিব্যাগটা বেশ মোটা লাগছে- ঠিক তার মধ্যে পুরিয়াটা রাখা। আরে গাধা! ব্যাগের মধ্যে চাপে পাতা ভেঙে যাবে তো! যাই হোক, কিছুটা হাতিয়ে নিলাম, বিকেলে কাপড় তুলব বলে ছাদে গিয়ে সিগারেটের তামাক বের করে বাবাকে কপালে ঠেকিয়ে দে টান- আহ, কালসর্পের মাথায় পা দেওয়া বোঝেন? কালসর্প? সময়টা স্লো হয়ে যায়, ডিস্ক্রিট- একটা একটা সময়ের ধাপের ওপর দিয়ে যেন হেঁটে ফিরি। স্থান পাত্র এইসব নিয়ে কোনও সমস্যা হয় না।‘
মিঃ সিনহা বলছেন - ‘কী ডেঞ্জারাস লোক তুমি। ছেলের মানিব্যাগ থেকে নেশার জিনিস চুরি করছ। এরপর তো ছেলের থেকে কন্ডোম চুরি করবে।‘
প্রফেসর বসু - ’লাগে না হে, লাগে না। উপসর্গের সমস্যা আছে। ছেলের এখনও লাগে না মনে হয়। বাবার এখন আর লাগে না- মনে হয়’
উচ্চহাস্য করে উঠল সকলে।
ডঃ গাঙ্গুলি বললেন - ‘আমি ভাবছিলাম বিজনের কথা। তাহলে বিজনও কি ভূত হয়ে গেছে?’
মিঃ সিনহা বললেন - ‘এই বিজনটা কে?’
ডঃ গাঙ্গুলি - ‘বিজন আমাদের সঙ্গে মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিল। নরমাল, আর পাঁচজনের মতন। তবে গরিব ঘরের। সে গরিব ঘরের মেধাবী ছেলে আরও কজনা তো ছিল। কিন্তু ফোর্থ ইয়ারে পড়তে বিজন পড়া ছেড়ে দিল। পুজোর পর হোস্টেলে আর ফিরল না। তখন তো আর আজকের মতন ইন্টারনেট নেই, তাই কেউ কোনও খোঁজও রাখল না তার।‘
সুমন পাল জানতে চাইলেন -
‘মরে গেছিল নাকি? তারপর হঠাৎ হোস্টেলে দেখলেন মাঝরাতে?’
ডঃ গাঙ্গুলি বলছেন - ‘না আমি দেখিনি তাকে। সে মরে গেছে এরকমও কোনও খবর নেই। হোস্টেলে ফিরে এসেছে এরকমও না। কিন্তু অনেকেই তাকে দেখেছে। খুব অদ্ভুত অদ্ভুত ভাবে দেখেছে। আমাদের ব্যাচের একটি মেয়ে, প্রায় কুড়ি বছর পরে, গাইনি হয়েছে। বাচ্চা দিতে গিয়ে মায়ের অবস্থা খারাপ। পেশেন্ট পার্টি রক্ত দেওয়ার জন্য লোক নিয়ে এল। সে দেখে- বিজন! আবার, ক-বছর পরে একজন দিল্লিতে গেছে, কনফারেন্সে। বিজন নাকি কোন ফার্মা কোম্পানিতে কাজ করে, কনফারেন্সেই তার সঙ্গে দেখা হল। সে তো ছবি তুলে রেখেছিল, আমিও দেখেছি পরে সেই ছবি। আরেকজন বলল, তার বাবা মারা গেছেন, শ্মশানে একটা ভ্যাগাবন্ড ঘুরছে। দেখে অবিকল বিজনের মুখ- বিজনই, তাকে চিনতেও পারল। বলল অনেকরকম সমস্যায় আছে। টাকা ধার চাইল, সে কিছু দিলও। বাবার শ্রাদ্ধের পর আসতে বলেছিল, আসেনি।
ব্রতীন রায় বললেন - ‘এই বিজন কি নেশাভাঙ করত বা রেস খেলত? এদের অনেক ওঠানামা আছে জীবনে।‘
ডঃ গাঙ্গুলি - ‘জানি না। কিন্তু এমন অদ্ভুত অদ্ভুত জায়গায় এত লোক বিজনকে দেখেছে যে দেখতে পেলে কেউ আর আলাদা করে অবাক হয় না। অনেকে ছবিটবিও তুলেছে। আমার কাছে আসে আপনারা দেখবেন, শ্যামল কুন্ডু, অর্থোপেডিক। আমার অপারেশন তো শ্যামলই করল। বলল হিথরো থেকে ফেরার ফ্লাইটে তার দু তিনটে রো আগে বিজন ছিল। নেমে একসঙ্গে ছবি তুলে গ্রুপে দিয়েওছে। আর তার কিছুদিন আগেই আরেকজন তাকে দেখেছে পাঁচটাকার ডিমভাতের লাইনে। সে গাড়ি থেকে ডাকল- বিজন তাকিয়ে হাত নাড়ল। এই সবগুলোই কিন্তু হতে পারে একটা লোকের পরিণতি। মানে, ধরো- কলেজে পড়ার থেকে প্রায় পঞ্চাশবছরের ব্যাপার তো, কতকিছু ঘটে যেতে পারে জীবনে! কিন্তু- সবগুলো একসঙ্গে একজনেরই বা কী করে হয়? আমাদের কলেজসার্কেলে এই কথাটা চলে- বিজনের সাথে দেখা হল? আমি তখন ঠাট্টা করে বললাম- যমদূতও যখন আসবে দেখব সে বিজন!’
আরেকজন আগন্তুক এসে দাঁড়িয়েছে, আনোয়ারুদ্দিনের পাশে। ফিসফিস করে বলল, ‘বুড়ো বলছে কী দেখুন! আমিই বিজন।‘
ডঃ গাঙ্গুলি মুখ তুলে তাকালেন - ‘বিজন?!’
বিজন বলল - ‘শ্যামলকে ফোন করেছিলাম, বলল, তোর ঠ্যাং ভেঙেছে। আমি এদিকেই ছিলাম। ভাবলাম দেখে যাই।‘
প্রফেসর বসু বললেন -‘ডাক্তারবাবু আপনার নামে কী সব ঢপ দিচ্ছিলেন, এ তো দেখছি রক্তমাংসের বিজন।‘
বিজন বললেন - ‘ওকে এবার বিজনের রক্তমাংস দেখাই তাহলে। আচ্ছা, এ মক্কেলকে আমি হুইল চেয়ার-সুদ্ধ বাড়ি নিয়ে গেলাম। আপনাদের আড্ডায় আর থাকল না। চল রে-‘
সিকিউরিটির ছেলেটা নিতে আসছিল, তাকে হাত দেখিয়ে বিজন হুইল চেয়ার ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে এগোল ডঃ গাঙ্গুলিকে। ওদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ব্রতীনের মনে হল ডঃ গাঙ্গুলির ব্লকটা ছাড়িয়ে আরও এগিয়ে যাচ্ছে বিজন তার বন্ধুকে নিয়ে। অন্ধকারে অত দূর থেকে ভালো বোঝা যায় না, তিনি আর মাথাও ঘামালেন না।
ডঃ গাঙ্গুলি আর আসেননি আড্ডায়। নন্দীবাবু পরে বলছিলেন একবার খোঁজ নেওয়া দরকার। পুজোটুজো মিটে গেলে একদিন সুমন পাল গেছিলেন ওই ব্লকে। গাঙ্গুলিজ লেখা ফ্ল্যাটটার কোলাপসিবেল গেট বাইরে থেকে তালা বন্ধই ছিল।