

অলংকরণ: রমিত
‘শুনুন ধর্মাবতার’- ক্লাস এইটে আমার হাতে এই বই আসে, বইটা হাতে নিয়েই রোমাঞ্চিত হই। এই বইয়ের লেখকের প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে ফাঁসি হয়েছিল, বইটা নাকি তাঁর বিচারকালীন বয়ান, আত্মপক্ষ-সমর্থনে দেওয়া। চারদশক জুড়ে রাষ্ট্র বইটা নিষিদ্ধ করে রেখেছিল- সেই ইতিহাসই এই বই সম্পর্কে উৎসাহ জাগানোর জন্য যথেষ্ট। তারপর, দেখলাম ভারতের স্বাধীনতা ও দেশভাগ, যার বৃত্তান্ত তখন বিশদে কিছুই জানি না, তা নিয়ে লেখক বিস্তৃত আলোচনা করেছেন বিশ্লেষণী ঢঙে। লেখার শেষে তিনি নিজের আসন্ন মৃত্যুর কথা লিখে, সেই মৃত্যু ঊর্ধ্বে নিজের মতটির প্রতিষ্ঠা কামনা করেছেন। সেই বয়সে খুবই প্রাণিত হয়েছিলাম বইটি পড়ে।
তবে, সেই ক্লাস এইটের পর ভবিষ্যৎ ভিন্নভাবে উন্মোচিত হয়েছে। সৌভাগ্যবশতঃ দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস অধ্যয়ন করবার সুযোগ পেয়েছি আমি। আর, তার ফলেই নাথুরামের ভ্রান্তিগুলি এবং তাঁর যুক্তিক্রমের অসারতা বুঝতে পেরেছি। নাথুরাম গ্রন্থের মধ্যে নিজের পড়াশুনোর ব্যাপ্তি, নিজের বিচারবোধের দৃঢ়তার কথা বলছেন, কিন্তু বইটির ছত্রে ছত্রে দেখা যায় তিনি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে সঠিকভাবে অবহিত নন। গান্ধীজির সমস্ত লেখা ও বক্তৃতা তিনি পড়েছেন, এরকম দাবি করলেও, গান্ধীজির কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি অনেকক্ষেত্রেই ঠিকমতো জানতেন না। তাঁর ভ্রম কোথাও কোথাও যাকে ইংরিজিতে বলে রিডিকুলাস, সেই গোত্রের। যেমন দ্বিতীয় অধ্যায়ে গান্ধীজির রাজনীতির ‘অন্তর্ভেদী’ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নাথুরাম লিখছেন ‘সুরাবর্দ্দীর পৃষ্ঠপোষকতা’ অনুচ্ছেদে- ‘তিনি সুরাবর্দ্দী এবং মুসলিম লীগের হয়ে মধ্যস্থতা শুরু করলেন। ঐ তিন দিন ধরে যে হিন্দহত্যা চলল- জীবন ও সম্পত্তি রক্ষার জন্য কলকাতার পুলিশ একটুও চেষ্টা করল না। আইন শৃঙ্খলার রক্ষকদের চোখের ওপর এবং নাকের ডগায় সংখ্যাতীত হত্যা ও বলাৎকারের ঘটনা ঘটল- কিন্তু গান্ধীজীর তাতে কি এসে যায়! তাঁর কাছে যে সুরাবর্দ্দী প্রশংসার জিনিস। তার থেকে তিনি সরে আসবেন কি করে? প্রকাশ্যে তিনি সুরাবর্দ্দীএ ধর্মার্থ-প্রাণ (শহীদ) বলে বর্ণনা করলেন। ‘ – আমরা জানি শহীদ গান্ধীজির দেওয়া উপাধি বা বর্ণনা ছিল না। মুসলিম লিগের প্রধানমন্ত্রী সোহরাবর্দির পুরো নাম ছিল হোসেন শহিদ সোহরাবর্দি। নাথুরাম এর পরেও কয়েকবার লিখেছেন- এমন একজন দানবকে গান্ধীজি এক অযৌক্তিক উপাধি দিলেন- শহীদ, ইত্যাদি। অর্থাৎ তিনি সোহরাবর্দির পুরো নাম জানতেন না। সেই নামটির একাংশকেই গান্ধীজির দেওয়া উপাধি ভেবেছিলেন। এই ভ্রম সামান্য হয়তো, কিন্তু এর সঙ্গেই মিশে আছে এই ধারণা যে কলকাতা দাঙ্গায় তিনদিন শুধু হিন্দুরাই মারা গিয়েছিল। এমনকি, এই অংশ পড়ে এরকমও ভুল ধারণা হয় যে ৪৬-এর কলকাতা দাঙ্গার সময়ে গান্ধীজি স্বয়ং কলকাতায় ছিলেন, যা বস্তুত ঘটেছিল ৮৭ সালে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ৪৭-এ পূর্ব ভারতে দাঙ্গা থামানোইয় গান্ধিজির অমানুষিক ভূমিকার কথা নাথুরাম লেখেননি। তেমনিই নাথুরাম ভুল করেছেন নোয়াখালিতে গান্ধীজির ভূমিকার বিষয়ে। তিনি লিখছেন - ‘গান্ধীজী তখন নোয়াখালিতে এক পরিদর্শনে গেলেন। বলা হল তিনি একা গেলেন। একথা সকলেই জানে যে তিনি যেখানেই গেছেন, সেখানেই সুরাবর্দ্দী তাকে রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন। তা সত্ত্বেও তিনি নোয়াখালি জেলায় ঢুকতে সাহস পেলেন না।‘ – অর্থাৎ, নাথুরামের জানামতে গান্ধীজি নোয়াখালিতে ঢুকতেই পারেননি। তাই কয়েকমাস জুড়ে গান্ধীজি নোয়াখালিতে যেভাবে আক্রান্ত হিন্দুসমাজের পাশে দাঁড়িয়ে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও হিংসার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে গিয়েছিলেন, এমনকি তাঁর চলে যাওয়ার পরেও তাঁর অনুগামীরা যেভাবে নোয়াখালিতে গান্ধী আশ্রমের কাজ চালিয়ে গিয়েছিল, তা নিয়ে নাথুরাম আসলে কিছুই জানতেন না। অথচ হিন্দু মহাসভা, নাথুরাম যার সদস্য ছিলেন, তাঁরা কিন্তু গান্ধীজির নোয়াখালির কাজ নিয়ে প্রশংসা করেছেন। হিন্দু মহাসভার নেতারা নোয়াখালিতে গিয়ে গান্ধীজির সঙ্গে মিটিংও করতেন (নোয়াখালিতে মহাত্মা, সুকুমার রায়)। ফলে, নাথুরাম যখন সটান সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে গান্ধীজি হিন্দুদের জন্য কিছুই করছেন না, তিনি এক বৃহৎ ভ্রান্তির মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকেন।
নাথুরামের এই জবানি নিষিদ্ধ থাকা অন্যায্য ছিল। দেশের মানুষের জানা উচিত ছিল কোন অনুপ্রেরণার বশবর্তী হয়ে, কোন বিচারবোধ থেকে নাথুরাম এই ভয়ংকর কাজটি করেছিলেন। তিনি একজায়গায় এও লিখেছেন যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি সভাপতি হওয়ায় হিন্দুমহাসভা কংগ্রেসের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে। ‘নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাজকর্ম ও প্রতিবাদ করে হিন্দু সংগঠন চালাবার যে নীতি হিন্দু মহাসভা গ্রহণ করেছিল, তার কার্যকারিতার প্রতি সব আশা হারিয়েছিলাম এবং ভিতরে ভিতরে নিজেকে দৃঢ় করে তুলেছিলাম।‘- এই দৃঢ়তার ভিত্তিভূমি কী এবং তার বস্তুগত অসারতা কতটা তা আমাদের জাতির জানার দরকার অবশ্যই ছিল। নাথুরামের বইটি নিষিদ্ধ করা যেমন হঠকারী সিদ্ধান্ত ছিল, তেমনি এক ভুল পদক্ষেপ ছিল এই বইয়ের ক্রিটিকাল সমালোচনা না করা এবং নাথুরামের ভ্রান্তি ও যুক্তির গোলযোগগুলি মানুষের সামনে তুলে না ধরা।
সম্প্রতি সেই কাজটিই করেছেন লেখক সৌম্য বসু, তাঁর ‘গান্ধী হত্যা কেন? নাথুরাম গডসের জবানবন্দীর প্রত্যুত্তর’ বইটিতে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ পর্যায়টি এবং বাংলার সমাজে তার প্রতিচ্ছায়া ও দেশভাগের ঘটনাক্রম নিয়ে সৌম্যর পাণ্ডিত্য প্রশ্নাতীত। বিগত কয়েকবছর ধরে তিনি এর উপর বহু লেখালিখি, বহু গ্রন্ত্র প্রকাশ করেছেন। সৌম্য এই বইতে জাতীয় রাজনীতির বিকাশকালের গতিপথটির বর্ণনার পাশাপাশি নাথুরামের বক্তব্যের সুরতহাল করেছেন। সৌম্য প্রথমেই বলে নিচ্ছেন যে নাথুরামের মূল বইয়ে অনুবাদক নীরদবরণ হাজরা বহুক্ষেত্রে ফুটনোটে বক্তব্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বলতে চেয়েছেন, কিন্তু তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক বিশ্বাস এক্ষেত্রে তাঁকে নিরপেক্ষ থাকতে দেয়নি। এইটা খেয়াল করবার, নাথুরামের বইটি বাংলা অনুবাদের প্রকাশক যিনি, তিনি কিন্তু নিজেকে গান্ধী-অনুরাগী বলে প্রকাশকের বক্তব্য লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন সত্যনিষ্ঠাই এই বই প্রকাশের কারণ। কিন্তু সত্যনিষ্ঠার মানে তো যা প্রকাশিত হচ্ছে তা আদতেই সত্য কিনা সেই বিচারও। নাথুরামের বইয়ের ফুটনোটে সেই বিচার করা হয়নি। সত্যের বিচার আসলে পরিশ্রমসাধ্য। অন্য বর্ণনা, অন্য নথির পাশে আলোচ্য লেখাটিকে ফেলে সেই বিচার করতে হয়। তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা খতিয়ে দেখতে হয়। কখনো পারিপার্শ্বিক ঘটনাক্রমের সঙ্গে সাযুজ্যও প্রতিষ্ঠা করতে হয়। সৌম্য সেই কাজটি করতে পেরেছেন বলে, এই বই শুধু নাথুরামের জবানির প্রত্যুত্তর হয়নি বরং গান্ধীজির কর্মপ্রণালীর একটি অভিনব দলিলও হয়ে উঠেছে। কংগ্রেসের আন্দোলনগুলির গড়ে ওঠার পর্যায়ে, কিম্বা সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে, কিম্বা দেশভাগের সময়ে মুসলিম লিগের সঙ্গে টানাপোড়েনে গান্ধীজির চিন্তাভাবনা কীরকম ছিল, তাঁর সাফল্য ও ব্যর্থতার নজিরগুলি কীরকম, তা উঠে এসেছে এই বইতে।
নাথুরাম তাঁর বইয়ে গান্ধীজির রাজনৈতিক জীবনের তিনটি ভাগ করেছেন। ১৯১৫-১৯৪০ সাল অবধি, ১৯৪০ সাল থেকে স্বাধীনতা অবধি এবং স্বাধীনতার পরে গান্ধীজির দিল্লির অনশনপর্ব। তিনটি পর্বেই বিভিন্নভাবে মুসলিম তোষণ ও হিন্দুস্বার্থ বিরোধিতার অভিযোগ এনেছেন তিনি। সৌম্য এক এক করে সেই অভিযোগগুলির বিচার করেছেন। যদি শুরুতে অসহযোগ খিলাফত আন্দোলন দেখি, নাথুরামের বড়ো একটি অভিযোগ এই যে গান্ধীজি খিলাফতকে এই আন্দোলনে যুক্ত করে মুসলিম স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সৌম্য দেখাচ্ছেন সেই সময়ের প্রায় সমস্ত কংগ্রেস নেতা, এমনকি স্বামী শ্রদ্ধানন্দ, লালা লাজপৎ রায়, বিপিনচন্দ্র পালের মতন নেতারাও, যাঁরা হিন্দুজাতির স্বার্থ নিয়ে আলাদা করে সরব ছিলেন, তাঁরাও খিলফতের সমর্থক ছিলেন। সৌম্য তাঁদের বক্তৃতা, রচনা উদ্ধৃত করছেন। আমরা যদি দেশবন্ধুর বক্তৃতা পড়ি, দেখব তিনি প্যান ইসলামিক আন্দোলনের ধাঁচে প্যান এশিয়ান সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জোটের কথা বলেছিলেন এবং অসহযোগ-খিলাফত ছিল এই রাস্তার এক মাইলস্টোন। নাথুরামের লেখা পড়ে বোঝাই যায় তিনি সম্পূর্ণ অনবহিত ছিলেন এই রাজনৈতিক ফর্মুলেশনের এবং খিলাফতের সমর্থনে হিন্দুনেতাদের অবস্থানের বিষয়ে বিশেষ জানতেন না। ফলে পুরো দায় তিনি গান্ধীজির ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছেন। মোপলা বিদ্রোহীদের উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ নাথুরাম এনেছেন। সৌম্য দেখাচ্ছেন মোপলা বিদ্রোহ আসলে কীভাবে ব্রিটিশদের মদতেই হয়েছিল। সেই জাতিদাঙ্গা যেখানে হয়েছিল, সেইসব জায়গায় কংগ্রেস আগে কোনও সংগঠনই গড়ে তুলতে পারেনি। মোপলা বিদ্রোহের গতিধারা ও কারণ বুঝতে সৌম্যর এই বইটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হতে পারে। তেমনি শুদ্ধি আন্দোলন ও স্বামী শ্রদ্ধানন্দ হত্যার পর্যালোচনায় সৌম্য শুদ্ধি ও তবলিগের সমস্যার দিকটি তুলে ধরছেন। তিনি দেখাচ্ছেন শুদ্ধি আন্দোলনের মাধ্যমে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ধর্মান্তর করে হিন্দু করা কোন রাজ্যে কত সংখ্যায় হয়েছিল। আমরা অবাক হয়ে দেখতে পারি শুদ্ধি আন্দোলন যেখানে যত বেশি লোককে ধর্মান্তরিত করেছে, সেই এলাকাগুলি তত বেশি করে দাঙ্গা কবলিত হয়েছে। একই ভাবে সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ ও পরবর্তী পর্যায়ে মুসলিম লিগের সঙ্গে টানাপোড়েনের বিভিন্ন খতিয়ান তিনি দাখিল করে দেখাচ্ছেন, এইসব ক্ষেত্রেই উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি এবং দেশের অখণ্ডতার পক্ষে গান্ধীজি কতখানি সচেষ্ট ছিলেন। দেশবিভাজন আটকানোর প্রশ্নে গান্ধীজির সঙ্গে জিন্নার দীর্ঘ পত্রালাপ এবং জিন্নার অনমনীয়তা আর আলোচনা থেকে সরে আসার বিবরণটি বিশদে পেশ করেছেন সৌম্য। এইক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারণগুলি অবশ্যই অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। এবং এটাও জানা প্রয়োজন সেই ব্যর্থতার পরে গান্ধীজি কীভাবে পরের পদক্ষেপটি নিতেন, একই উদ্দেশ্য সাধন করতে। সৌম্যর বইয়ের আরেকটা উল্লেখযোগ্য অংশ হায়দারাবাদে নিজামের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের সত্যাগ্রহের ইতিহাসটি। এই ইতিহাস খুব কম আলোচিত হয়। নাথুরাম অভিযোগ এনেছিলেন কংগ্রেস মুসলিম করদরাজ্য বলে হায়দারাবাদের স্বাধীনতার কথা বলে না। আমরা সচরাচর এই বিষয়ে কিছুই জানিনা, কিন্তু এই অভিযোগও যে মিথ্যা সৌম্য তা দেখাচ্ছেন।
দেশভাগের পরে গান্ধীজি দিল্লিতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর অত্যাচারের বিহিত চেয়ে অনশন করেন। কিন্তু, তাঁর লক্ষ্য ছিল দু-দিকের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নোয়াখালির মাটি কামড়ে থেকে সংখ্যালঘু আক্রান্ত হিন্দুদের পক্ষেও তিনি সেই লড়াই করেছিলেন। নাথুরাম অভিযোগ করেছেন গান্ধীজি শুধু মুসলমানদের এবং পাকিস্তানের স্বার্থ দেখছেন। সৌম্য দৈনন্দিন খবর, বক্তৃতা ঘেঁটে দেখাচ্ছেন যে গান্ধীজি কীভাবে আসলে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের হয়েই লড়ছেন। গান্ধীজির ইচ্ছা ছিল দিল্লির পরে তিনি পাকিস্তানে গিয়ে সেখানকার সংখ্যালঘু হিন্দুর হয়ে কাজ করবেন। ইতিহাসে কী হলে কী হত এই পূর্বাভাস করা বাতুলতা, কিন্তু আমরা জানি নাথুরাম তাঁকে সেই সুযোগ দেননি। এই দেশ থেকে কোনও বড়োমাপের নেতা এর পরে আর চেষ্টা করেননি পাকিস্তানে গিয়ে সংখ্যালঘু হিন্দুর হয়ে লড়বার। এবং পাকিস্তানে সংখ্যালঘুর বিপন্নতা আরও বেড়ে গিয়েছে। হিন্দুস্বার্থের দাবিতে গান্ধীহত্যা করে নাথুরাম সীমান্তের ওপারের হিন্দুদের আরও বিপন্নই করে দিয়েছিলেন।
নাথুরাম কিন্তু নিজের জীবন পণ করে নিজের বিচারবোধ অনুযায়ী গান্ধীহত্যা করেছিলেন। সৌম্য দেখাচ্ছেন যে এর আগেও একাধিকবার নাথুরাম গান্ধীহত্যা করতে চেয়েছেন। অর্থাৎ গান্ধীজির প্রতি চূড়ান্ত বিরূপতা তাঁর অনেকদিনের। তাঁর মতে এই বিরূপতা হিন্দুদের জাতিস্বার্থে। কিন্তু গান্ধীহত্যা করে তিনি একজন সংখ্যালঘু হিন্দুকেও আলাদা করে বাঁচাতে পারেননি। কারণ, তাঁর উদ্দেশ্যটি নির্মিত হয়েছিল ভ্রান্তির উপরে, ভুল জানা ও ভুল বোঝার উপরে। আমরা ইন্টারনেটে ও বিভিন্ন লোকের বক্তৃতায় একটি তথ্য মাঝেমধ্যে পাই, অহিংসার অসারতা বোঝাতে। মহাভারতে অহিংসা নিয়ে শ্লোকটি নাকি আসলে – অহিংসা পরমো ধর্ম, ধর্মহিংসা তথৈব চ। গান্ধীজি নাকি এই শ্লোকটির খণ্ডার্থ করে অহিংসার প্রচার করতেন। কিন্তু, আসল ব্যাপার হল মহাভারতের কোথাও এই ধর্মহিংসা তথৈব চ শ্লোকাংশ নেই। অর্থাৎ, এক ভুল জানা বিভিন্ন লোকের মাধ্যমে বৃহত্তর ভ্রান্তি হয়ে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। আর জাতিদ্বেষ, হিংসাপরায়ণতা সেই ভুল জানার থেকে গড়ে ওঠে। নাথুরামের মধ্যেও তো তাই হয়েছিল। তাই ভ্রান্তিগুলিকে আড়াল না করে, সৌম্যর এই বইয়ের মতন সোজা ব্যাটে তাদের খেলা উচিত।
আমাদের সমস্ত সামাজিক সমস্যার মূল আসলে এইসব ভ্রান্তিই। আর সত্যের প্রতি আগ্রহ জানিয়ে, সত্যের শ্রমসাধ্য চর্চা করেই আমরা ভ্রান্তির অপনোদন করে গান্ধীহত্যার থেকে গান্ধীচেতনার পথে পৌঁছতে পারব। সমাজে আক্রান্ত সংখ্যালঘুর সাহারা যে ঐ গান্ধীচেতনাই- ইতিহাস তার সাক্ষী। সৌম্যকে ধন্যবাদ এই বইটি লেখার জন্যে।
বই: গান্ধী হত্যা কেন? নাথুরাম গডসের জবানবন্দীর প্রত্যুত্তর
লেখক: সৌম্য বসু
প্রকাশক: প্ল্যাটফর্ম প্রকাশনা
স্বাতী রায় | ০৫ আগস্ট ২০২৬ ১২:৪৯742118
বোকা বুড়ো | ০৬ আগস্ট ২০২৬ ১২:১৯742123