

অলংকরণ: রমিত
ওই যে যাচ্ছে - একটু টালমাটাল বর্ষার জলে ভিজছে ছই, এলোমেলো জোলো হাওয়ায় উচ্ছ্বসিত শৈশব। ধুয়ে যাচ্ছে কাগজে লেখা নামতা বা জীবনবিজ্ঞান প্রশ্নের উত্তর-ফুলের কটা অংশও কি কি? ওই তো নৌকো - ওই তো একটু একটু কল্পনা - সদ্য ভাসার আনন্দে মশগুল। ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে যেতে চাইছে অন্য চৌকাঠে, পেরোতে চাইছে সাতসমুদ্দুর তেরো নদী। ঘোর বর্ষায় গৃহবন্দী শিশু আর আর বাড়ি বা স্কুলের আঙিনা ছুঁয়ে থাকা ঘেরাটোপ হীন নাবাল জমি দুটোই সমান অবাধ্য। বড়োদের ভাবনা- এইবুঝি জল ঢুকে জলাঞ্জলি হল ঘর। বাচ্চাদের মধ্যে যদিও তখন তীব্র প্রতিযোগিতা কে কত শক্ত বাহারি কাগজে তার নৌকা তৈরি করবে এবং এসব অবশ্যই সেই জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া সময়ের কথা যখন বাড়ির রেডিয়াল আর্টারিতে দপদপ করছে একান্নবর্তী শব্দটি। গল্প তৈরি হত শুক্লপক্ষের লোডশেডিং রাতে ও দাদু,দিদিমা বা ঠাকুমার গা ঘেঁষে। এসব হল সেইসব হল অব ফেম-এ নাম লেখানো সময়ের গল্প যখন একটা ডিম সুতো দিয়ে কেটে ভাগ করে দুভাই-বোনে খেত আর দুষ্টুমি করলে পাড়ার কাকু জ্যাঠারাও দু’ঘা দিয়ে দিত- এসব সেই বিরল সময়ের গল্প যখন পাঁচ পয়সার হজমিগুলি, পঞ্চাশ পয়সার এক প্লেট আলুকাবলির মতো অলীক ব্যাপারস্যাপার ঘটত - বিকেলে দরজার কাছে আসত খেলতে যাওয়ার ডাক আর সেই এলাটিং বেলাটিং সইয়ের হাত ছাড়িয়ে সন্ধের শাখের ফুঁ বাজতেই একছুটে ঘরে ফেরা ছিল বাধ্যতামূলক; যেসময় সাদাকালো টিভি আর ছবি দুইয়েরই হাতছনি ছিল অমোঘ আর নীলচে সবুজ ইনল্যান্ড বা হলুদ পোস্টকার্ড নিয়ে কৌতূহল উসকে ডাকপিওনের আবির্ভাব ছিল প্রায় প্রত্যেক দুপুরেরই বাঁধাধরা রোজনামচা। পুজোয় দশমীর পর পাড়ায় পাড়ায় নারকোল নাড়ু আর তক্তিতে বিজয়া লাগু থাকত বাড়তি আরো এক সপ্তাহ। এরকম একটা অভিযোজনহীন সময়ের বাসিন্দা যারা তারা জানত কাগজের নৌকো, তালপাতার পাখা, লক্ষ্মীর ঝাঁপি- এসব অশরীরী শব্দগুচ্ছ।
নৌকো এগোচ্ছে, বৃষ্টিতে ভিজছে, সোঁদা হাওয়ায় কাঁপছে, ছোটো ছোটো স্রোতে বেসামাল-তবুও এগোচ্ছে এঁকে বেঁকে, ঠেকে শিখে, কিন্তু ডুবতে দেওয়া যাবে না। ওটুকুই তো আশা, ভেসে থাকা, বেসে থাকা - ভালো অথবা মন্দ। কম তো লাট খায়নি জীবন, সাত ঘাটের জল খেয়ে, দুটো বিশ্বযুদ্ধ পেরিয়ে, কাঁটা তার পেরিয়ে, শরণার্থী শিবিরের লপসি খেয়ে, একটু ফ্যান দ্যাও-এর দীর্ঘশ্বাস শুনে, শহরের বুকে আস্থা আর অনাস্থার বারুদ গন্ধের সত্তর নিয়ে, প্রেম ও প্রত্যাখানের কাটাকুটি খেলে - জীবন চলছে - ঐ ভেসে চলাটুকু আদায় করাই তো জীবন। তাও-বা কতক্ষণ? পলক ফেলতে না ফেলতেই তো বুকে গীতা সাজানোর পালা। তাই গীতবিতানে যতটুকু ছেয়ে থাকে, ভাটিয়ালির মনকেমন যতটুকু জুড়ে থাকে, মাটির সোঁদা গন্ধ-এ যতটা বৃষ্টি শুষে থাকে ততটুকুই প্রাপ্তির বীজতলা।
জীবনের সঙ্গে তরীকে প্রথম কে জড়েছিলেন জানিনা - তবে দূরদর্শী যে ছিলেন তা তো নিঃসন্দেহে - নাহলে এত দোলাচলতা, শর্তসাপেক্ষতা, সিদ্ধান্তমুখীনতা, দ্বিধা-দ্বন্ধের এই যুগপৎ সমাসবদ্ধ ও সমাজবদ্ধ পদটি যে আমৃত্যু উথাল পাতাল করবে তা তার জন্মলগ্নে মালুম হয়না। ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে হবে নাহলে কোথাও কলকে পাবে না, ভালো র্যাঙ্কিং থাকতে হবে নাহলে ভালো কলেজ আসবে না, একটা ভালো চাকরি পেতে হবে নাহলে প্রেমিকা যাবে ফসকে, গাড়ি, বিএইচ কে আর ইন্স্যুরেন্সের সংখ্যাতত্ত্বে ভিড়তে হবে নাহলে হারিয়ে যেতে হবে অগণনে। চাকরির ক্ষেত্রে কখনো কখনো হয়তোবা মোটামুটিতে সামঝোতার দায় থাকে - বাবার রিটায়ার্মেন্ট, ভাই বা বোনের পড়াশোনা, দিদির বিয়ে ইত্যাদি। তবু মোটের ওপর “নাহলে” শব্দের আরোপেই জীবন নৌকা লাট খাবে সময়ের গর্তে প্রতিযোগিতার আবর্তে।
এ যেন নোয়ার নৌকা- যতটা সম্ভব গুছিয়ে নেওয়া। রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা সারা। তবে এই বহর নেওয়ার জন্য গানগেয়ে তরী বেয়ে কেউ কি আসে? ওদিকে জোয়ার ভাটার খেলা চলছে অবিরত। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এর ভাব সম্প্রসারণে চারিদিকে বাঁকা জলের খেলা অর্থ পৃষ্ঠা জুড়ে সম্প্রসারিত হলেও রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মনে মনে এই চাওয়াটুকু উৎকণ্ঠ থাকে যেন পরের দিন সোজা জলেই নৌকা ভাসাতে পারি। মুঠোয় শক্ত করে কারোর হাতটা ধরা থাকুক অনুক্ষণ। জীবনের এ্যাঙ্গেলগুলো যেন বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলে এসে মিলিত না হয়।
প্রথম কাগজের নৌকা বানানো যে শিখিয়েছিল - দেখিয়েছিল কিভাবে সঠিক ভাঁজ করলে নৌকা ডোবে না। কিন্তু যথারীতি কি করে যেন ভাঁজ খুলে নৌকা একসময় জল খেয়ে ডুবে যেত ভুস্ করে। কতবার এমন মনে হয়েছে - হারিয়ে যাচ্ছে ভরসার ভারসাম্য। কত সময় এসেছে মাথার ওপর ইস্পাত কঠিন আকাশ যেন গুম হয়ে বসে আছে। ছোট্ট একটি কাগজের নৌকা- তার ওপরই ঝরিয়ে দিচ্ছে তার যাবতীয় অভিযোগ। মন প্রাণপণ জপে চলেছে ইষ্টনাম। এই বুঝি তলিয়ে গেল সাধ আর সাধ্যের বোঝাপড়ায় গড়া বড়ো দুর্বল ভঙ্গুর নৌকাখানি। কোন অলীক রহস্যে যদি মাথা উজিয়ে রাখতে পারে তবেই না জীবন জীবনানন্দ। তবুও জীবনানন্দ নাম নিয়ে যে কবি-জন্ম তিনি বনের পাতার মতো হলুদ কুয়াশা মেখে “ হেমন্ত আসার আগে হিম হয়ে “ কেন যে ঝরে যান ট্রামের মতো সহিষ্ণু উচ্চকিত যানের সামনে? তাহলে -এই পলক ফেলার পরিসরে লিখে চলা জীবনের আনন্দটুকু কি শুধুই এক আরামপ্রদ বিভ্রম যা হাজার নক্ষত্রের মেলবন্ধনেও সত্যি হয়না। বেহুলার নৌকাটি ভিড়ে গেলেও জীবনের নৌকাটির সঠিক নেতা ধোপানির ঘাট খুঁজে পায়না কখনো।
“আমি ঝরে যাব,তবু জীবন অগাধ / তোমারে রাখিবে ধরে সেইদিন পৃথিবীর পরে” - অগাধ না হলেও কিছু জল চাই, চাই জীবনের মতো কিছু স্রোত যাতে ভাসবে দুর্বল ভীরু সে কাগজের নৌকো। যে নৌকো হৃদয়েরটানে হৃদয়ের পানে ছোটে – বুঝে বা অবুঝ হয়ে; যে ছোটার মানে খুঁজে বের করার মতো কোনো অভিধান এখনো সংসদ প্রকাশ করে উঠতে পারেনি। কোথাও শুনেছিলাম পাশাপাশি দুই যুযুধান প্রতিবেশির বাড়ির মধ্যে চিল চিৎকার থামাতে পাঁচিল উঠেছিল। কিন্তু তাতে কি? এ বাড়ির বাসিন্দা এক সদ্য নওল কিশোর আর ও বাড়ির বাসিন্দা দুই বেণীর এক নবমশ্রেণীর অফুরান হৃদয়ের আদানপ্রদান থেমে থাকে নি। সে পাঁচিলের কোনো এক কোণে একচিলতে ফাঁক গলে বর্ষার জমা জলে পেরিয়ে ডট পেনে লেখা চিরকুটে নৌকা বানিয়েই চলত তাদের হৃদয়ের আদানপ্রদান - তখনো অর্কুট মুখবইয়ের জানালা খোলে নি।
তবে এত জটিল কুটিল না হয়ে বলাই যায়-কাগজের নৌকা আসলে নির্ভার ছিমছাম এক ছোটোবেলার গল্প যেটা সবার জীবনেই থাকে - রাজপ্রাসাদ থেকে ফুটপাত। শুধু কোনো এক বর্ষার দুপুর বা বিকেলে সেটা জলে ভিজতে ভিজতে ছোটো ঢেউ কেটে এগিয়ে যায়। তারপর আজীবন মনফকিরার বুকে আখর কাটে আরেক ফকির- সুদর্শন ফাকির সঙ্গে জগজিৎ-“ মাগর মুঝকো লওটা দো ওহ বচপন কি সাবন/ ওহ কাগজ কি কস্তি ওহ বারিশ কা পানি”। এক স্মৃতি যা জীবনের বুকে আঁকিবুকি কাটতে কাটতে একসময় দিগন্তে মিলিয়ে যায় …
kk | ১২ অক্টোবর ২০২৬ ১৯:৫৪743210