

অলংকরণ: রমিত
২
কাউকে চোখ-কান খুলে রাখতে বলাটা খুব সহজ, বুঝলেন? কিন্তু যখন আপনি জেনে গেছেন যে পৃথিবীর আয়ু আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ কিম্বা আরো কম, আর যখন তাকে বাঁচাবার দায়টা কেউ আপনার কাঁধের ওপর ঝপ করে ফেলে দিয়েছে, বিশ্বাস করুন, তখন 'চোখ-কান খোলা রাখা' জাতীয় কাজ গুলো সব অবিশ্বাস্য রকম কঠিন মনে হয়! আপনাকে যদি কেউ কোনো 'দৈব ক্ষমতার অধিকারী' কিম্বা 'জগতভাগ্যবিধাতা' এইসব গালভারী নাম দিয়ে দেয়, শুনতে অসম্ভব ভালো লাগে। কিন্তু সত্যি সত্যি সেই চরিত্রটার পার্ট করতে নামলে, দুনিয়াকে তার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করা গালাগালি দিতেই ইচ্ছে করে! হলফ করে বলছি!
আমার ঐসব তথাকথিত বাড়তি অনুভব ক্ষমতা না কী যেন, এখানে এক কানাকড়িও কাজে আসছিলোনা। যেদিকে তাকাই, সেই পুরোনো একঘেয়ে দিনরাত। সেই পুরোনো একঘেয়ে লোকজন। চেনা ছকে বাঁধা জীবন। সম্ভাব্য দুষ্টুলোকেদের খোঁজে আমি সারাদিন ঘুরে ঘুরে বেড়াই। বাজারের ভিড়ে, ইঁটের জঙ্গলে, রাস্তার মোড়ে। মিসিসিপি নদীর ঘোলা জলে, কাদামাখা পাড়িতে আমি কান পেতে রাখি, যদি কোথাওকার কোনো অঘটনের শব্দ শোনা যায়। আমি আমার প্রত্যেকটা ইন্দ্রিয়কে শান দিয়ে দিয়ে ঘাসের ফলার মত ধারালো করে তুলি যদি সামান্যতম উথালপাথালও ধরা পড়ে। কিন্তু কিচ্ছু নেই! কোত্থাও, কিচ্ছু নেই!
শেষ অব্দি এমন দাঁড়ালো যে আমার মনে হলো আমার মাথাটাই টগবগ করে ফুটছে। এই বুঝি বিকট শব্দ করে ফেটে চুরমার হয়ে যাবে। আমি মরিয়া হয়ে মন থেকে ঐ চিলেকোঠার ঘটনাটা মুছে ফেলতে চেষ্টা করি! চারপাশের আর পাঁচটা লোকের মত আমি দুনিয়ার পরিণতি সম্পর্কে পুরোপুরি উদাসীন হয়ে যেতে চাই! আমি পাগলের মত চাই যে কেউ আমাকে আশ্বাস দিক যে কোনো ভয় নেই, স-অ-ব কিছু ঠিক হয়ে যাবে .... সে কাজটা মনে হয় মাত্র একজনই করতে পারতো এই দুনিয়ায়... সে হলো মিশেল।
জঙ্গলের মধ্যে লাল টালির ছাদ অলা ছোট্ট বাড়ি, গোলাপফুলের কুঁড়ি আঁকা পর্দা, ফায়ারপ্লেসের সামনের নরম পাপোষে শোয়া একটা ফুঁয়োফুঁয়ো মোটা ল্যাজ সাদা বিল্লি, ঘরময় ওর দিদিমা’র হাতে বানানো ব্ল্যাকবেরী প্রিজার্ভের মিষ্টি গন্ধ... মিশেলদের বাড়িটাকে আমার সব সময়েই মনে হতো দুনিয়ার সবথেকে ভালো বাসা।
অনেকক্ষণ ধরে একটা মিষ্টি নরম-গরমের মধ্যে ডুবে থেকে, আরো অন্য গোলাপকুঁড়িদের ছুঁয়েছুঁয়ে, অনেকখানি হল্কা আর আঁচ উড়ে যেতে দিয়ে পর আমার মনে হলো যে শেষ অব্দি আমি হয়তো সত্যি পাগল হয়ে যাইনি! শান্ত, লম্বা নিঃশ্বাস ফেললাম একটা।
--"আজ দিদুন খুব খুশি হবে! তুমি এসেছো! আমি চট করে এই স্কোন আর কুকিগুলো রোয়েনাদের বাড়িতে দিয়ে আসি। তুমি দিদুনের সাথে বসে ততক্ষণ গল্প করবে? তোমাকে ওর খুব পছন্দ, জানোই তো!"
মিশেলের দিদিমা অ্যাগনেস। সাদা ধপধপে তুলোর গুছির মত চুল, ঝকঝকে নীল চোখ, পাকা আমের মত গালভরা হাসি। আর সারাক্ষণ দু'হাত বাড়িয়েই আছেন। সব্বাইকে খালি "এসো এসো। এখানে বসো। এটা খাও, ওটা খাও"। এমন মিষ্টি দিদিমা যে কী বলবো! হ্যাঁ, আমি দিদুনের সাথে বসে গল্প করবো। আমারও তাঁকে খুব পছন্দ।
আমি জানতাম দিদুনকে কোথায় পাওয়া যাবে। জানলার ধারে ওঁর সেই গোলাপী রঙের গদিঅলা চেয়ারটায়। ওখানেই ওঁকে বসতে দেখি সব সময়। আর কোলের ওপর থাকতেই হবে দুটো বোনার কাঁটা, পায়ের কাছে বেতের ঝুড়িতে নানা রঙের উলের গোলা। বুনতে কী ভালোটাই না বাসেন!
--"আরে আমার দাদুভাই যে! কোথায় ছিলে গো ভাই? সেই গত সপ্তাহের পর আর দেখাই পাইনি!" -- ওঁর দু চোখে গভীর স্নেহ ঝিকমিক করে উঠলো। আমি ওঁর সামনের চেয়ারটায় বসে পড়লাম।
কী আরাম এখানে...বসে বসে দিদুনের চেরী পাই আর অ্যাজেলিয়া চারাগাছদের কথা শুনতে শুনতে, ওঁর হাতের কাঁটাদুটোর একটানা টিকির-্টিকির-্টিকির দেখতে দেখতে আমার চোখ্দুটো জড়িয়ে আসতে লাগলো। কী শান্তি এখানে ... কোনো দুশ্চিন্তা নেই, উদ্বেগ নেই... দুনিয়াতে যেন শুধু দুটো জিনিষ ছাড়া আর কিচ্ছু নেই -- একটা লক্ষ্মীমতো শান্ত সন্ধ্যেবেলা আর একটা লাল-হলুদ-কালো উলের চাদর ... অ্যাগনেস দিদুনের কোলের ওপর ধীরে ধীরে অবয়ব পাচ্ছে।
--"কী তাড়াতাড়ি আঙুল চলে আপনার দিদুন! এইটুকু সময়েই কতটা বুনে ফেললেন! একটু ধীরেসুস্থ্যে করলে হয়না? চোখে ব্যথা করবে না?"
--"না গো ভাই। দেরী করলে একেবারেই চলবেনা। যতই আমার চোখ ব্যথা করুক, যতই ক্লান্তি লাগুক। এটা আমাকে খুব তাড়াতাড়ি বুনে শেষ করতে হবে। তার আগে আমার ছুটি নেই। আমার সাথীরা আমার ওপর ভরসা করে আছে। সময় খুব কম!"
ইলেক্ট্রিকের খোলা তারে শক খাওয়ার মত চমকে আমি সোজা হয়ে বসলাম! ঠিক এই রকমই কথা আমি কোথায় শুনেছি না? মাত্র কয়েকদিনই আগে? এতক্ষণে ভালো করে নজর করলাম আমি ... সোনালী চশমার পেছনে ওঁর নীল চোখ দুটো... একবারও পলক পড়ছেনা ওদের। উনি হাই তুললেন এই সময় একটা। ওঁর জিভটা! মনে পড়লে আজও আতঙ্কে আমার হাতপা হিম হয়ে আসে... মাংসল বেগুনি রঙের একটা কিলবিলে জিভ আর তার সারা গায়ে কালোকালো তীক্ষ্ণ কাঁটা! আমার মাথার মধ্যে কুয়াশা কেটে যাচ্ছে -- "সেই কাঁটালো জিভ অপলকরা"।
ওঁর কোলের ওপরে দ্রুত তৈরী হচ্ছে একটা লাল উলের চাদর। তার ঠিক মাঝখানে হলুদ একখানা গোল সূর্য্য। আর দুটো কালো রঙের মস্ত সাপ তাকে বেড় দিয়ে ঘিরে ফেলছে। দুটো সাপ আর সূর্য্য-- মহাপ্রলয়ের শেষ সংকেত! টিকির-টিকির-টিকির ... ঝড়ের বেগে কাঁটাদুটো বুনে চলেছে। আর কয়েক ইঞ্চি মাত্র বাকি। সাপ দুটো যেদিন সূর্য্যটাকে গিলে ফেলবে সেই মূহুর্তে মহাধ্বংস শুরু হয়ে যাবে… কিছু করেই, কোনো ভাবেই তখন আর তাকে থামানো যাবেনা!
আমার সারা শরীরে ভয়ের হিমঠাণ্ডা একটা স্রোত বয়ে গেলো। প্রায় অসাড় হাত-পা নিয়ে আমি কোনোমতে চেয়ার ছেড়ে উঠে ওঁর হাত থেকে বোনাটা কেড়ে নিতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কী জোর ঐ বুড়ো মানুষটার কোঁচকানো দুই হাতে! অ্যাগনেস আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। পলকহীণ চোখ, ঠাণ্ডা, নিষ্ঠুর। হিসহিসে গলায় বললেন -- "বোকা ছেলে! তুমি কি ভেবেছো আমাকে তুমি শক্তিতে হারাতে পারবে? 'আমাকে'?"
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। শরীর, মন, সব অবশ, অসাড়। চেতনা অন্ধকারে হারিয়ে যাবার ঠিক আগের মূহুর্তে হঠাৎ একটা জিনিষ আমার মাথায় ঝনঝন করে বেজে উঠলো -- স্কারলেটের গভীর গলা -- "আমাকে ডেকো, আমি আসবো।"
নিজের অস্তিত্বের সবটুকু জড়ো করে আমি ডানহাতের তালুতে আঁকা আয়নাটার ওপর আঙুল রাখলাম। একটা উত্তাপ ছড়িয়ে যাচ্ছে ... আমার হাতের পাতায়... কনুই, কাঁধ ... পুরো হাতটায়। অ্যাগনেস ডুকরে উঠলেন -- "ও কী করছো? ওটা কী তোমার হাতে? না না, থামো। থামো-ও-ও-ও!"
ঝাপসা দুই চোখে আমি আবছা দেখতে পেলাম মিশেলের স্নেহময়ী মিষ্টি দিদিমা হাতের কাঁটাটাকে ছোরার মত ধরে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। চারপাশে ভয়ানক শব্দ করে এক তুমূল ঘুর্ণিঝড় আমাদের ঘিরে ফেলছে। তীব্র ঝাঁকুনি তুলে একটা অসম্ভব ঠাণ্ডা ব্যথা আমার বুকের মধ্যেটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিলো। জ্ঞান হারানোর আগের মূহুর্তে .... উজ্জ্বল লাল রঙের একটা দমক... তারপর সব কালোয় মুছে ....
৩
আমার কোনো ধারণাই নেই কতদিন পেরিয়ে গেছে! যখন চোখ খুললাম, দেখি হাসপাতালের কোনো ঘরে শুয়ে আছি আর একটা উদ্বিগ্ন মুখ ঝুঁকে আমায় দেখছে!
--"মিশেল!"
--"ওঃ ভগবান! বাঁচলাম! কী যে চিন্তায় ফেলেছিলে তুমি! আমি তো ভেবেছিলাম..."
-- "তোমার ...তোমার দিদুন...?"
--"দিদুন ভালো নেই!" -- মিশেলের বড়বড় চোখ দুটো জলে ভরে উঠলো -- "কাউকে চিনতেও পারছে না, কোনো কথাও বলতে পারছেনা। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে! ডাক্তার বলছেন সেরিব্রাল স্ট্রোক। কিন্তু ঠিক কী হয়েছিলো বলো তো সেদিন? আমি বাড়ি এসে দেখি তোমরা দুজনেই অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে পড়ে রয়েছো!"
ঠিক কী হয়েছিলো? সেইটা তো লাখ টাকার প্রশ্ন! তোমায় আমি কী উত্তর দেবো মিশেল? আমার নিজেরই যদি জানা থাকতো ...
উত্তর এসেছিলো। একমাত্র যে জানতো, তার কাছ থেকে। রাত অনেক গভীর হলে পর, চারদিক যখন ঘুমে নিশ্চুপ হয়ে আছে, আমার ডান হাতের তালুটা আস্তে আস্তে গরম হয়ে উঠতে লাগলো। চোখ না খুলেই আমি বুঝতে পারলাম, আমার খাটের পাশে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। স্কারলেট!
--"তাহলে শেষ পর্যন্ত তুমি ঠিকই জিতলে! দেখলে তো? আমি বলেছিলাম না তোমার মধ্যে কোনো বিশেষ ক্ষমতা আছে?"
--"স্কারলেট, আপনি ঠিক সময়ে এসে পড়েছিলেন! আপনি আমাদের পৃথিবীটাকে বাঁচিয়েছেন!"
--"হ্যাঁ, আমার মিশন ব্যর্থ হয়নি, সেটা বলতে পারো। তোমাকে অনেক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি কার্লি।" উনি নিজের বাঁ হাতটা তুলে আমায় দেখালেন। লিলি ফুলের পাঁচটা পাপড়ি লাল টুকটুক করছে!
ওঁর দেওয়া নতুন নামটাও আমার ভারী পছন্দ হলো। কিন্তু সে কথা বলবো কী! তখন আমার মাথার মধ্যে এত প্রশ্ন টগবগ করছে যে ছটফটানিতে মারা যাই আর কী!
--"আপনি কেমন করে এসব করলেন? আর অ্যাগনেস? তারই বা কী হলো?"
--"অ্যাগনেস এবারটায় আমাদের প্রায় পেড়েই ফেলেছিলো! তুমি যদি আর কয়েক মিনিটও দেরী করতে, তাহলে আমার আর কিচ্ছুই করার থাকতো না। ও শেষ সময়েও জোর লড়াই করেছে অবশ্য!"
দেখতে পেলাম স্কারলেটের গলায় তিনটে গভীর কাটা দাগ দগদগে লাল হয়ে আছে! সেদিকে আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে উনি হাসলেন -- "ও এর থেকেও অনেক বেশি ক্ষতি করতে পারতো। ভাগ্য ভালো যে পুরোপুরি তৈরী ছিলোনা। আমি যে কোনোভাবেই ওখানে পৌঁছে যেতে পারি তা ও ভাবতে পারেনি।"
--"আপনি কেমন করে হারালেন ওকে? ঐটুকুনি বয়স্ক একটা মানুষের শরীরে কী ভয়ানক জোর!!"
--" হ্যাঁ, কিন্তু শরীরের জোর দিয়ে সব যুদ্ধ হয়না। আমাদের, রক্ষকদের সব কাজ মনের ওপরে। আমি ওর মনটাকে একজন নবজাতকের অবস্থায় ফিরিয়ে দিয়েছি। ওর কোনো স্মৃতি নেই। ও নিজে কে, ওর কত শক্তি সেসব অ্যাগনেস আর কোনোদিনও মনে করতে পারবেনা। আমাদের যুদ্ধে জেতার জন্য কাউকে প্রাণে মারার দরকার হয়না। আমরা শুধু শত্রুর মধ্যে থেকে সবটুকু 'খারাপ' মুছে ফেলি।"
--"থ্যাংকিউ স্কারলেট। আপনি আমার পৃথিবীকে বাঁচিয়েছেন... আমাকেও!"
--" তুমি এবার বিশ্রাম নাও। অ্যাগনেস খুব অন্ধকার একটা শক্তি দিয়ে তোমার হৃৎপিণ্ডটাই ফুঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলো। কপাল ভালো যে সেটা একেবারে ভেতর অব্দি পৌঁছোয়নি! যেটুকু ক্ষতি হয়েছে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেরে উঠবে।"
-- "আপনার সাথে আর দেখা হবে কখনো?"
-- "সম্ভবত না। যে কাজের জন্য তোমার সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছিলো তা তো মিটেই গেছে, তাই না?"
--"আপনার কথা আমার খুব মনে হবে স্কারলেট। খুবই।"
--"আমারও তোমার কথা মনে হবে কার্লি। কিন্তু কিছুকিছু জিনিষ অল্প সময়ের জন্যই থাকে। সেটাই তার পক্ষে ভালো। তোমার হাতে আমার আয়নাটা রইলো। আমাদের এই বন্ধুত্বের চিহ্ন।"
উনি আবার হাসলেন আমার দিকে তাকিয়ে। আমার মনে হলো এই হাসিটার মধ্যে অনেকখানি প্রশান্তির রং মিশে আছে।
আমার চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে …বুকের মধ্যে আর ব্যথা নেই… ভারী শান্তির, আরামের এক গভীর ঘুম আমাকে আস্তে আস্তে জড়িয়ে নিচ্ছে…
হ্যাঁ, আয়নাটা... আয়নাটা তো আমারই রইলো। কেউ তো আর ওটাকে আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবেনা?