৩অ’য়ে AGI আসছে তেড়ে
যন্ত্রের ভিতর যে কৃত্রিম ভাবে বুদ্ধিমত্তার সঞ্চার করা সম্ভব এই ধারণার বীজ প্রথম অঙ্কুরিত হয়েছিল 1943 সালে প্রকাশিত হওয়া স্নায়ুতন্ত্রের কর্মপদ্ধতি নিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্রে। এই “A Logical Calculus of the Ideas Immanent in Nervous Activity” শীর্ষক গবেষণাপত্রে লেখক নিউরো সায়েন্টিস্ট ওয়ারেন ম্যাককূলক ও লজিশিয়ান ওয়ালটার পিটস্ প্রশ্ন রাখেন যে "মস্তিস্কের ভিতরের স্নায়বিক কার্যকলাপকে কি যুক্তি-শৃঙ্খলার মূর্ত রূপ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়?”
তাঁরা এই গবেষণাপত্রে প্রস্তাব করেছিলেন যে, আমাদের মস্তিস্কের একটি একক নিউরন (Neuron) মূলত একটি বাইনারি on-off সুইচ হিসেবে কাজ করে। সে তার আশেপাশের অন্যান্য নিউরন থেকে ইনপুট হিসেবে বৈদ্যুতিক সিগন্যাল গ্রহণ করে, এবং এই বিভিন্ন সিগন্যালের যোগফল যদি একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা অতিক্রম করে যায় তাহলে সে নিজে ফায়ার করে একটি বৈদ্যুতিক সিগন্যাল আউটপুট দেয় (on) আর এই যোগফল যদি সীমারেখা অতিক্রম না করে তাহলে সে শান্ত হয়ে বসে থাকে (off)।
তাঁরা আরও লক্ষ্য করেন যে এই স্নায়বিক প্রক্রিয়া দিয়ে, “এবং (and)”, “অথবা (or)”, “না (not)”, এই ধরনের বিভিন্ন যুক্তি পথ তৈরি হয় যা দিয়ে একটি গোটা যুক্তি শৃঙ্খলা তৈরি করা সম্ভব।
ধরুন আপনি ও আপনার দুই বন্ধু হলেন তিনটি নিউরন। এবার ভোরবেলা যদি আপনার বন্ধু ক’বাবু আপনাকে ফোন করেন আপনার গাঢ় ঘুম ভাঙবে না কিংবা শুধু গ’বাবু ফোন করলেও আপনি গভীর ঘুমে অচেতন। কিন্তু যদি ক’ “এবং (and)” গ’ বাবু দুজনে একসঙ্গে ফোন করেন তাহলেই আপনি তড়াক করে উঠে বসেন ও আপনার কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে দিলো সেই আক্রোশে আপনি আপনার শত্রু ঘ’বাবু কে ফোন করেন তাঁর ঘুমটা ভাঙিয়ে দেওয়ার আশায়। এক্ষেত্রে আপনার (neuron-এর) আচরণ যেন “এবং” শব্দটার মূর্ত রূপ।
আবার আপনার ঘুম যদি খুব পাতলা হয় তাহলে ক’বাবু “অথবা (or)” গ’বাবু যেকোনো একজন ফোন করলেই আপনার ঘুম ভেঙে যায়, ও আপনি একই ভাবে ঘ’বাবু কে ফোন করে বিরক্ত করার চেষ্টা করেন। যদিও আপনার সাফল্য নির্ভর করবে ঘ’বাবুর ঘুম পাতলা না গাঢ় তার ওপর। এক্ষেত্রে আপনার (neuron-এর) আচরণ যেন “অথবা” শব্দটির মূর্ত রূপ।
এই ভাবে আমাদের “চিন্তা করা” কে অনেকগুলি নিউরনের নেটওয়ার্কের মধ্যে ঘটে চলা একটি যুক্তি প্রক্রিয়া বা লজিক্যাল অপারেশন হিসাবে আমরা দেখতে পারি। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়া বা ধাপে ধাপে যুক্তি দিয়ে বিচার করার (reasoning) প্রক্রিয়াকে এক একটি যুক্তি শৃঙ্খলা বা লজিক চেইন হিসেবে দেখা যেতে পারে।
অর্থাৎ, আমাদের মস্তিস্ক শুধুমাত্র অনেকগুলো on-off সুইচ দিয়ে তৈরি লজিক সার্কিট দিয়ে পৃথিবীর যাবতীয় তথ্য বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যুক্তি নির্ভর চিন্তা সম্পন্ন করতে পারে।
সত্যি বলতে এই গবেষণাপত্রটি যে বিজ্ঞানের জগতে বিরাট সারা ফেলে দিয়েছিল তা নয়। বিশেষ করে পরবর্তীকালে যখন একটি ব্যাঙ এর অপটিক নার্ভের স্টাডির মাধ্যমে দেখা যায় নিউরন সরল on-off সুইচ নয় এর ব্যাপার স্যাপার অনেক জটিল।
অতএব এই গবেষণাপত্রের লেখকদ্বয় গুণক্ষরেও অনুমান করতে পারেননি তাঁদের এই উপলব্ধির কতখানি যুগান্তকারী, সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকতে পারে। তাঁদের অজান্তেই তাঁরা সম্পুর্ন নতুন একটি গবেষণা ক্ষেত্রের পথ খুলে দিয়েছিলেন।
1956 সালে আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ও বেল ল্যাবস এবং আইবিএম এর মতো নামকরা গবেষণাগারগুলি থেকে অত্যন্ত উজ্জ্বল ও মেধাবী একদল গবেষক, দার্টমাউথ কলেজের কাছাকাছি একটি নিরিবিলি কাঠের কেবিনে এসে জড়ো হন একটি অত্যন্ত দুঃসাহসিক ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী অভিপ্রায় নিয়ে। তাঁরা প্রস্তাব রাখেন যে মানুষের শেখার ক্ষমতা আর বুদ্ধিমত্তার প্রতিটি ধাপকে এতটাই পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে গাণিতিক ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব যে, একটি কম্পিউটার দিয়ে তাকে হুবহু অনুকরণ করা যাবে। এই বিপ্লবাত্মক ধারনার ডার্টমাউথ কলেজের প্রোফেসর জন ম্যাকার্থি নাম দেন “আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স”।
এই গবেষকরা বিশ্বাস করতেন, যদি এই ধারণাকে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এমন কম্পিউটার তৈরি করা সম্ভব হবে যা শুধু গণনা নয়, বরং যুক্তি তৈরি করা, সমস্যা সমাধান করা, এমনকি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার ক্ষমতাও অর্জন করতে পারবে—এক কথায়, মানুষের বুদ্ধিমত্তার একটি কৃত্রিম প্রতিরূপ।
তাঁরা মনে করতেন কম্পিউটার কে দিয়ে যদি গাণিতিক ভাবে if/then reasoning ( যদি বৃষ্টি হয় / তাহলে ছাতা নিতে হবে) এবং formal logic ( মানুষ মরণশীল — রবীন্দ্রনাথ মানুষ — রবীন্দ্রনাথ মরণশীল) অনুসরণ করাতে পারেন তাহলে একটা সময়ে সে মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে পারবে।
এঁরা হলেন Symbolic AI বা Rule based AI শিবির। এদের AI কে বলা হতো Good Old Fashion Artificial Intelligence. ফালতু জিবে গিট্টু না পাকিয়ে আসুন আমরা এর নাম দিই “পুরাতন ভৃত্য”। আপনার একটু বোকা-সোকা পুরাতন ভৃত্যের মতোই এই AI কে আপনি যদি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কোনো কাজের পরম্পর্য সঠিক ভাবে শিখিয়ে দেন তাহলে সেই কাজগুলো সে খুবই দক্ষ ভাবে সম্পন্ন করবে।
আপনি আপনার ভৃত্যকে ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছিলেন আপনি ৮ টায় ঘুম থেকে উঠলেই যেন সে আপনার হাতে এককাপ গরম চা ধরিয়ে দেয় তারপর আপনার বাথরুমে কাচা তোয়ালে, গরম জল সব রেডি করে রাখে। আপনার সকালে বাথরুমে আধঘণ্টা টাইম লাগে সে জানে, আপনি বাথরুম থেকে বেরিয়েই যেন গরম জলখাবার পান তার ব্যাবস্থাও সে তার ট্রেনিং অনুযায়ী খুব দক্ষতার সঙ্গে করে রাখে। কোনো দিন আপনি ৮ টার জায়গায় ১০ টায় উঠলেও কোনো সমস্যা নেই এটুকু সে নিজে থেকেই এডজাস্ট করে নিতে পারে। কিন্তু যদি কোনো অনুষ্ঠানের কারণে আপনার বাড়ি অনেক লোকসমাগম হয়ে থাকে তাহলে সকালবেলা তাদের সবাইকার চা জলখাবারের ব্যবস্থা করা তাদের স্নানের গরম জলের ব্যবস্থা করার জন্য যখন আপনার ভৃত্যটিকে আপনি খুঁজবেন দেখবেন সে সক্কাল সক্কাল হওয়া হয়ে গিয়ে দেশওয়ালি ভাইদের সঙ্গে গাঁজা টানছে, “উফফ! অনুষ্ঠানবাড়ির ভিরভাট্টা থেকে মানুষের একটু শান্তি চাই তো নাকি”।
আসলে শুধু আপনার সেবা করার জন্য যে নিয়মগুলো তাকে শেখানো হয়েছে, সেই একই নীতিকে কাজে লাগিয়ে এক বাড়ি লোকেরও সঠিকভাবে সেবা করা যায়—এই উপলব্ধি করার ক্ষমতা তার নেই।
বাস্তব জগতে সমস্যাগুলো কখনোই কোনো সরল, নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে বন্দি থাকে না। মানুষের আচরণ, পরিস্থিতির পরিবর্তন, অপ্রত্যাশিত ঘটনা—সব মিলিয়ে বাস্তবতা অনেক বেশি বিশৃঙ্খল, অনেক বেশি অনিশ্চিত। তাই কিছু গবেষক সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পথের কথা ভাবতে শুরু করেন।
মানুষ নিজে তার পাঁচটা ইন্দ্রিয় দিয়ে raw data (আপাত অর্থহীন বিশৃঙ্খল তথ্য) ইনপুট গ্রহণ করে এবং তার দেখে শেখা ও ঠেকে শেখা অভিজ্ঞতা দিয়ে সেই তথ্য থেকে প্রয়োজনীয় প্যাটার্ন চিনে নিয়ে একটি অর্থপূর্ণ আউটপুট দেয়। একটি যন্ত্রকে যদি এই প্রক্রিয়া শেখানো যায় তাহলে সে সব পরিস্থিতি নিজে থেকেই বিচার করে সঠিক বা অন্তত অর্থপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এই পথে যাঁরা আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স তৈরী করতে চেয়েছিলেন তাঁদের শিবিরকে বলা হতো Network AI বা Connectionist AI শিবির।
মস্তিষ্কের ভেতর যেমন অসংখ্য নিউরোনের নেটওয়ার্কের মধ্যে ঘটে চলা সিগন্যাল আদান প্রদানের মাধ্যমে আমাদের ‘চিন্তন’ ফুটে ওঠে, বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক দিয়ে এই প্রক্রিয়ায় যন্ত্রের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলেন।
বোঝার সুবিধার জন্য একদম প্রাথমিক পর্যায় থেকে আমরা হাতে-কলমে এমন একটা কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করে দেখতে পারি।
আপনি যদি একটি কৃত্রিম নিউরোনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখেন, তার একমাত্র কাজ হলো আশেপাশের অন্যান্য নিউরনগুলি থেকে প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া—সে সক্রিয় হবে কি হবে না।
তবে সে আশেপাশের সব নিউরন থেকে সমান ভাবে প্রভাবিত হয় না। অনেকটা যেন তার চারপাশের নিউরনগুলো ভোট দেয়—তার “ফায়ার” করা উচিত কি না। কিন্তু সব ভোটের দাম সমান নয়—কোনো নিউরনের ভোট দুই বা তিনটি ভোটের সমান, আবার কারও ভোটের গুরুত্ব কম। এই সব ভোট যোগ করে যদি একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা অতিক্রম করে যায় তাহলে সেই নিউরন নিজে একটি সিগন্যাল আউটপুট দেয়। এই সীমারেখা কতটা হবে সেটা এই নিউরোনের bias এবং এই ভোটের গুরুত্বের তারতম্যকে বলা হয় নিউরনের “weight” এখানে weight এবং bias—এই দুটোই হচ্ছে প্যারামিটার। অর্থাৎ একটা নিউরন অন্য নিউরোনের ভোটকে কতটা গুরুত্ব দেবে ও কটা ভোট পেলে সে নিজে fire করবে এটা ঠিক করে প্যারামিটার। এই প্যারামিটার প্রয়োজন মতো পরিবর্তন করে যন্ত্র ‘শেখে’, অনেকটা যেন যন্ত্রের ভেতর অসংখ্য পরিবর্তন যোগ্য নব বা ডায়াল এর মতো যেগুলো প্রয়োজনমতো ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে যন্ত্র নিজের আউটপুট এডজাস্ট করে। যত বেশি প্যারামিটার তত সূক্ষ্ম আউটপুট।
ধরুন এই ধরনের কয়েক কোটি পরস্পর সংযুক্ত নিউরন দিয়ে আপনি এমন একটি নিউরাল নেটওয়ার্ক বানাতে চান যে অনেকগুলো পাখি এবং অ-পাখির ছবি দেখে চিনে নিতে পারবে কোনটা পাখি ও কোনটা অ-পাখি। এবার পাখির ছবি অনেক রকম হয়। উড়ন্ত পাখি, ডালে বসে থাকা পাখি, মাটিতে হাঁটা পেঙ্গুইন, উটপাখির মুখের ক্লোজআপ এই সব ধরনের ছবি থেকে যদি এই নিউরাল নেটওয়ার্ক কে সঠিক ভাবে পাখি চিনে নিতে হয় তাহলে ছবিগুলিতে পাখির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যগুলি স্তরে স্তরে চিনে নিয়ে পাখিত্বের একটা ধারণা তাকে তৈরি করে নিতে হবে, যে ধারণা দিয়ে চড়াই ও উটপাখি দুটোকেই পাখি বলে চেনা যায়।
নেটওয়ার্কের প্রথম স্তরের ইনপুট আসে raw data থেকে। ছবির ক্ষেত্রে এই ডেটা হলো পিক্সেল। প্রতিটি নিউরন ধরুন পাশাপাশি ছ’টা করে পিক্সেলের ওপর নজরদারি করে, এবার তার একমাত্র কাজ হলো যদি একদিকের তিনটে পিক্সেলের উজ্জ্বলতা অন্যদিকের তিনটে পিক্সেলের চেয়ে বেশি হয় তাহলে পিং করা। এইভাবেই সমগ্র প্রথম স্তর জুড়ে বিভিন্ন নিউরন ছবির ভেতরের যাবতীয় পাখি,আকাশ, ডালপালা ইত্যাদির পার্শ্বরেখা বা edge গুলি চিনে নেয়। এবং এই তথ্য চলে যায় পরবর্তী স্তরে।
এই স্তরের নিউরণগুলি ছবির মধ্যে আগের স্তরের পার্শ্বরেখা গুলির কম্বিনেশনে কিছু সরল আকার খোঁজে। যেমন দুটি পার্শ্ব রেখা যদি সূঁচালো হয়ে পাখির ঠোঁটের মতো দেখতে হয় তাহলে একদল নিউরন উত্তেজিত হয়ে ওঠে, তবে এরা তীরের ফলা বা টেনিদার নাক দেখলেও উত্তেজিত হয়। আবার একদল নিউরন সারা ছবি জুড়ে বৃত্তাকার জিনিস খোঁজে যেটা পাখির চোখ হতে পারে আবার ডোর নব বা বাপি বাড়ি যা-র চাপড় খেয়ে উড়ে যাওয়া ক্রিকেট বলও হতে পারে। তাই আপনার আরও একটি স্তর প্রয়োজন যে এই আগের স্তরে খুঁজে পাওয়া আকারগুলিকে একটা কনটেক্সট এ বসাতে পারবে, যেমন ঠোঁটের মতো আকার আর চোখের মতো আকার যদি কাছাকছি থাকে তাহলে সেটা পাখির মাথা হতে পারে।
এইভাবে যদি পাখির মাথা, ঠ্যাং, ল্যাজের ডগা যদি একটা ছবিতে খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে অন্তিম স্তর ছবি থেকে পাখিত্ব চিনে নিয়ে একটা আউটপুট দেয় যে ছবিটা পাখির হওয়া 80 বা 90 পার্সেন্ট সম্ভাবনা। নেটওয়ার্কের মধ্যে তথ্যগুলি এইভাবে স্তরে স্তরে পরিস্রুত হয়ে জ্ঞানে পরিণত হয়।
এবার আপনার ইচ্ছা হলে এই নেটওয়ার্ক এর কয়েক কোটি নিউরনকে বার বার আপনি ধরে ধরে প্রোগ্রাম করতে পারেন কখন পিং করতে হবে, কিন্তু আপনাকে নিশ্বাস নিতে হয়, হিসি করতে যেতে হয়। তাই যন্ত্র নিজে থেকেই যাতে উদাহরণ দেখে দেখে তার প্যারামিটারগুলি এডজাস্ট করে নিতে পারে আপনি সেই ব্যবস্থা করবেন।
প্রথমে নেটওয়ার্কের মধ্যে প্যারামিটারগুলি যখন এলোমেলো হয়ে থাকে তখন এই নেটওয়ার্ক কে যদি একটা পাখির ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেন এটা পাখি কিনা, সে বলবে এইটা 50 পার্সেন্ট পাখি 50 পার্সেন্ট অ-পাখি যার বাংলা অনুবাদ দাঁড়ায় “ঈশ্বর জানেন”। এবার আপনি তাকে বলে দিলেন “না এটা 100 পারসেন্ট পাখি”, এখন প্রশ্ন হলো যন্ত্র তার ভুলটা শুধরোবে কি করে?
নেটওয়ার্ক তার দেওয়া উত্তর আর আসল উত্তরের মধ্যে পার্থক্যটা মাপে—এই পার্থক্যটাকেই বলা হয় error. এখন এই error-টা কোথা থেকে এলো? কোন নিউরন ভুল করল?
শেষ স্তরের নিউরন বলছে—“আমি তো আগের স্তর থেকে যা পেয়েছি তাই বলেছি।”
তার আগের স্তরের নিউরন বলছে—“আমরা কি জানি, আমাদের তো আগের স্তর যা বলল আমরা তাই করলাম।”
এইভাবে দোষটা ধাপে ধাপে পিছনের দিকে যেতে থাকে। অবশেষে নেটওয়ার্ক ঠিক করে—কোন কোন নিউরোনের ভোটের গুরুত্বের কতটা করে পরিবর্তন আনতে হবে যাতে পরের বার একই ভুল না হয়। এই প্রক্রিয়া কে বলে back propagation.
এবার যেসব নিউরন গুলো ভুল সিদ্ধান্তে বেশি ভূমিকা নিয়েছে তাদের weight একটু কমিয়ে দেওয়া হয়, আর যেগুলো সঠিক সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল তাদের weight বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় ভুল শুধরে শুধরে নেটওয়ার্কটি আপনি যে উত্তর চাইছেন তার দিকে গড়িয়ে নেমে আসে বলে একে বলে gradient descent.
এই ভাবে নেটওয়ার্কটিকে আপনি যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে পাখি ও অ-পাখির ছবি দেখান সে বার বার এই backpropagation এবং gradient descent ব্যবহার করে নিজের ভুল শুধরে নিয়ে স্বয়ংক্রিয় ভাবে আপনার কাম্য উত্তরের দিকে এগিয়ে যাবে।
এখানে মনে রাখতে হবে কোনো স্তরের নিউরন কে কিন্তু আপনি বলে দেননি প্রথমে, যে তাদের মধ্যে কে edge detector কে shape detector কে context detector. নেটওয়ার্কটি নিজে থেকে আপনার ফিডব্যাক অনুযায়ী ভুল শুধরে শুধরে এগুলো বানিয়েছে। প্রথম স্তর আর শেষ স্তরের মাঝখনের স্তরগুলি, যেখানে এই detector গুলি তৈরি হয় তাকে hidden layer বলা হয় — কারণ আমাদের হস্তক্ষেপ ছাড়া, আমাদের অজান্তেই সেগুলির কাজকর্ম চলে।
এই সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় নিউরাল নেটওয়ার্ক আবিষ্কার হয় গেছিল সেই 1985-86 সালে। কিন্তু সেই সময়ে এই যন্ত্র বড়জোর হাতে লেখা সংখ্যা আলাদা করে চিনতে পারত ব্যাস, ওই পর্যন্তই। গবেষকরা বুঝতে পারছিলেন নেটওয়ার্কের বার বার খুব দ্রুত নিজেকে শুধরে নিতে গেলে যে পরিমাণ কম্পিউটিং পাওয়ার লাগে তার কনামাত্রও বর্তমানে তাঁদের কাছে উপলব্ধ নেই। এবং সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ডেটা, 1985 সালে পৃথিবীর অধিকাংশ ডেটা ছিল হয় ব্যক্তিগত অথবা অত্যন্ত খরচা সাপেক্ষ। অতএব এই নেটওয়ার্কগুলিকে ট্রেনিং দিতে হতো খুবই অল্প পরিমাণ ডেটা সেট দিয়ে তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা আবোল তাবোল আউটপুট দিত।
এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে নিউরাল নেটওয়ার্ক যেন ছিল একটা প্রতিশ্রুতি—একটা অসম্পূর্ণ স্বপ্ন, যার তাত্ত্বিক ভিত্তি শক্ত, কিন্তু বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি তখনো অধরা। অতএব Geoffrey Hinton, Yoshua Bengio, Yann LeCun এর মতো অল্প কয়েকজন যুব ইঞ্জিনিয়ার লেগে থাকলেও নিউরাল নেটওয়ার্ক এর ফান্ডিং প্রায় একেবারেই শুকিয়ে গেছিল।
এর পরের পঁচিশ বছর কোনো প্রিয় ছাত্র আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে গবেষণা করতে চায় শুনলে অধ্যাপকরা চশমার তলা দিয়ে তার দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকাতেন। কিন্তু ২০১২ সালের এক ঘটনায় তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যায়।
নতুন সহস্রাব্দের শুরু থেকেই আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স-এরও যে নবযুগের সূচনা হয় গেছে সেটা মুষ্টিমেয় কিছু গবেষক ছাড়া প্রায় সকলেরই দৃষ্টি এড়িয়ে গেছিল। ১৯৯৯ সালে Nvidia কোম্পানি বাজারে এনেছিল GPU Chip যা দিয়ে কম্পিউটার সমান্তরাল ভাবে একাধিক গণনা চালাতে সক্ষম হয়। ফলে ১৯৮৫ থেকে এই পনেরো বছরে কমপিউটিং ক্ষমতা কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ গুণ বৃদ্ধি পায়। এই একই সময়ে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে একের পর এক সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি ফলে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মানুষ নিজেদের জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মুহূর্তগুলো ডিজিটাল মাধ্যমে ধরে রাখতে শুরু করল।
Facebook, YouTube, Twitter—এই প্ল্যাটফর্মগুলির কল্যাণে প্রতিদিন তৈরি হতে লাগল অজস্র ছবি, লেখা এবং ভিডিও। যে পৃথিবীতে একসময় ডেটা ছিল দুষ্প্রাপ্য, সেই পৃথিবীই অচিরেই ডেটার প্রাচুর্যে ভরে উঠছিল।
এই সময় Princeton University-র কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর Fei-Fei Li তৈরি করলেন প্রায় দেড় কোটি ছবি নিয়ে গড়ে তোলা এক বিশাল ডেটাবেস।
এখানে ছিল প্রায় কুড়ি হাজার ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরির ছবি—বিভিন্ন প্রজাতির কুকুর, বেড়াল, পাখি থেকে শুরু করে চেয়ার, টেবিলের মতো নিত্যদিনের জিনিসও।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ছবিগুলোর প্রতিটিই মানুষের হাতে লেবেল করা—অর্থাৎ প্রতিটি ছবির সাথে লেখা আছে সেটি ঠিক কী। উদ্দেশ্য AI কে চার পাশের পৃথিবী সম্বন্ধে একটা গঠনগত ধারনা দেওয়া, যা সে তার ট্রেনিং ডেটা হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
ইতিমধ্যে Yann LeCun, Yoshua Bengio-র মত গবেষকরা কিন্তু চুপচাপ বসে ছিলেন না। গত বিশ পঁচিশ বছর ধরে তারা ডেভেলপ করছিলেন নতুন নিউরাল নেটওয়ার্ক আর্কিটেকচার এবং বহুস্তরীয় গভীর নিউরাল নেটওয়ার্ক কে ট্রেনিং দেওয়ার জন্য deep learning algorithm.
কম্পিউটিং, ডেটা প্রাচুর্য ও উন্নত ট্রেনিং এলগরিদম এই ত্র্যহস্পর্শ যোগে 2012 সালে টরেন্টো ইউনিভার্সিটির একটা স্টুডেন্ট হোস্টেলের ঘরে জন্ম নিলো AlexNet.
টরেন্টো ইউনিভার্সিটির দু’জন PhD র ছাত্র Alex Krizhevsky, Ilya Sutskever ও তাদের অধ্যাপক Geoffrey Hinton এর তৈরি এই AlexNet ছিল আট স্তরের একটি গভীর নিউরাল নেটওয়ার্ক, যার প্রায় ছয় কোটি প্যারামিটার ছিল—অর্থাৎ ছয় কোটি পরিবর্তনযোগ্য মানের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল তার শেখার ক্ষমতা। AI কে ট্রেনিং দিতে কম্পিউটিং এর জন্য GPU ব্যবহারের কথা তাঁরাই প্রথমে চিন্তা করেন যা পরে AI ইন্ডাস্ট্রির মূল হার্ডওয়ার হয়ে দাঁড়াবে।
পঁচিশ বছর ধরে যারা নিউরাল নেটওয়ার্কের ক্ষমতার ওপর বিশ্বাস হারাননি, এতদিনে হাতে নাতে প্রমাণ দেওয়ার জন্য তারা তৈরি হলেন।
গত দু বছর ধরে অধ্যাপক Fei Fei Li আয়োজন করছিলেন ImageNet Large Scale Visual Recognition Challenge এর। এই Imagenet প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের বারো লক্ষটা মানুষের হাতে লেবেল করা ছবির একটা ডেটা সেট দিয়ে দেওয়া হতো তাদের AI কে ট্রেনিং দেওয়ানোর জন্য (Training set)।
ট্রেনিং শেষ হওয়ার পর, যন্ত্রকে এমন কিছু নতুন ছবি দেওয়া হতো যা সে আগে কখনও দেখেনি (Test Set)। যন্ত্রকে প্রতিটি ছবির জন্য ৫টি সম্ভাব্য উত্তর দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো।
যদি যন্ত্রের দেওয়া ৫টি উত্তরের মধ্যে একটিও সঠিক উত্তরের সাথে মিলে যেত, তবে তাকে 'সফল' ধরা হতো। আর যদি ৫টিই ভুল হতো, তবে তাকে 'এরর' বা ভুল হিসেবে গণ্য করা হতো। এই ভুলের শতাংশ যত কম হবে, সেই মডেল তত বেশি বুদ্ধিমান।
প্রথম দু বছর এই প্রতিযোগিতায় যারা অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা প্রায় সবাই ট্র্যাডিশনাল computer vision পদ্ধতি ব্যবহার করছিলেন, মানে তাদের যন্ত্রের ভিতরের edge detector, shape detector গুলো মানুষের হাতে প্রোগ্রাম করা। এই পদ্ধতি তে প্রথম বছরের চ্যাম্পিয়নের error rate ছিল ২৮%, পরের বছর ২০১১ সালের চ্যাম্পিয়নের error rate ছিল ২৬%, অলিম্পিকের রেকর্ডের মতো মিলিসেকেন্ডের ব্যবধানে রেকর্ড ভাঙছিলো প্রত্যাশা মতো।
২০১২ সালে AlexNet এর error rate কমে দাঁড়ালো ১৫.৩% যেখানে দ্বিতীয় স্থানের প্রতিযোগীর error rate ছিল ২৬.২%, এক ধাপে ১১% উন্নতি, এ যেন অন্য প্রতিযোগী দু’পা ফেলার আগেই রেসে জিতে যাওয়া। এই ফলাফল ওয়াকিবহাল মহলে ভূমিকম্পের মতো প্রভাব সৃষ্টি করে। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স গবেষনা জগতের বিবর্তন রাতারাতি বিপ্লবে পরিণত হলো।
বড় বড় কর্পোরেট গুলো উপলব্ধি করতে শুরু করলো নিউরাল নেটওয়ার্কের এই বিশৃঙ্খল তথ্যের মধ্যে থেকে প্যাটার্ন চিনে নেওয়ার ক্ষমতা হলো ভবিষ্যতের চাবিকাঠি। তাঁরা একঝুড়ি ফান্ডিং নিয়ে সেলাম ঠুকলেন এই নেটওয়ার্কের কারিগরদের। প্রথমেই সাড়ে চার কোটি ডলার অফার করে Geoffrey Hinton এর পুরো টিমটাকে তুলে নিলো গুগল। Yann LeCun লক্ষ লক্ষ ডলার research grant নিয়ে facebook AI research এর মাথা হয়ে বসলেন। শুধু Yoshua Bengio অসংখ্য অফার পেয়েও big tech এর চক্করে না ঢুকে স্বাধীনভাবে গবেষণা সংস্থা Montreal Institute for Learning Algorithms খোলেন। এঁদের তিনজনকে পরবর্তীকালে Godfathers of AI বলে ভূষিত করা হয়।
যন্ত্রের বিবর্তন একধাপ এগিয়ে গেলো। এতদিন মানুষ যন্ত্রকে বলে দিতো—কি খুঁজতে হবে। 2012 সালে প্রথমবার যন্ত্র নিজেই ঠিক করতে শুরু করল—কি গুরুত্বপূর্ণ। AlexNet দেখালো পর্যাপ্ত পরিমাণের ডেটা ও কম্পিউট যদি একটা নিউরাল নেটওয়ার্ক কে দেওয়া যায় তাহলে খুব সংকীর্ণ কার্যক্ষেত্রে হলেও সে নিজে থেকেই এক পরিস্থিতি থেকে প্যাটার্ন চিনে শিক্ষা নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতিতে সেই শিক্ষা কাজে লাগাতে পারবে।
2016 সালে AlphaGo দেখালো—এই শেখার প্রক্রিয়াটিকে আরও বড় স্কেলে নিয়ে গেলে, যন্ত্র এমন জায়গাতেও দক্ষতা অর্জন করতে পারে যেখানে আগে মানুষের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল।
2017 তে Alphago-র পরবর্তী প্রজন্মের Alphago Zero কে শুধুমাত্র Go খেলার নিয়ম গুলো শিখিয়ে তাকে নিজের সঙ্গে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ গেম খেলিয়ে সেই ডেটা দিয়ে ট্রেনিং দেওয়া হল মানুষের কোনরকম হস্তক্ষেপ ছাড়া। বিজ্ঞানীরা দেখলেন সে নিজে থেকেই একসময় মানুষের তৈরি ধ্রুপদী ওপেনিং থিওরী (Fuseki), মিডলগেম থিওরী(Joseki)-গুলি আবিষ্কার করে ফেললো এবং কিছু পরে আরও উন্নততর কৌশল আবিষ্কার করে মানুষের 4000 বছর ধরে ভেবে বার করা কৌশলগুলি কে সম্পুর্ণ পরিত্যাগ করে দিলো।
এই Alphago Zero মডেলটি, আমাদের লি সেডল-কে যে হারিয়েছিল সেই Alphago কে ১০০-০ ম্যাচে আচ্ছা করে ধুনে দেয়। বর্তমানে Go খেলায় তার রেটিং মানুষের চেয়ে ১০০০ পয়েন্ট বেশি। মানুষের প্রথম ও দ্বিতীয় খেলোয়াড়ের মধ্যে ব্যবধান ১০০ পয়েন্টের।
বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছিলেন—যন্ত্রের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা ফুটিয়ে তুলতে গেলে কম্পিউট ও ডেটা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই ডেটা থেকে কিভাবে অর্থ নিষ্কাশন করতে হয় সে বিষয়ে মানুষের সঞ্চিত জ্ঞান, তার কাছে ততোটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই যখন গুগল কোম্পানী সমগ্র ইন্টারনেটের আনাচে কানাচে যত্ত টেক্সট আছে তা দিয়ে একটা ডেটাবেস বানিয়ে দিল তাকে ট্রেনিং দেওয়ার জন্য, সে নিজে থেকেই শব্দের মধ্যে থেকে এক ধরনের অর্থ বার করে নিতে পারল।
শুধু মাত্র কোন শব্দ কতবার অন্য শব্দের কাছাকাছি বসেছে সেই পরিসংখ্যান থেকে সে দেখতে পেলো, ফ্রান্স (এটা কি বস্তু কে জানে!) ও প্যারিস (এটাই বা কী জন্তু!) -এর যা সম্পর্ক, চীন ও বেজিংয়ের সেই একই সম্পর্ক। সে দেখলো, রাজা – পুরুষ + নারী = রানি, দেখলো Cu – copper + gold = Au, দেখলো Windows – Microsoft + Google = Android, দেখতে পেলো ফুটবল – শ্রম + লাঞ্চ = ক্রিকেট (আচ্ছা আচ্ছা শেষেরটা নাহয় বানিয়েই বললুম)।
এটাকে উপলব্ধি বলে কিনা সেসব নিয়ে দার্শনিকরা সেমিনার করুক কিন্তু যন্ত্রটি যা “পড়ছে” তার থেকে যে সে তার নিজের মতো করে সে এক ধরনের অর্থ নিষ্কাশিত করে নিচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই।
পিক্সেল দিয়ে কোনো বস্তুর আকার ছবির মধ্যে বর্ণনা করা যায় কিন্তু ভাষা দিয়ে আপনি গোটা ব্রহ্মান্ডের আকার ও প্রকার সম্বন্ধে ধারণা করতে পারেন। যন্ত্র যখন ভাষা থেকে অর্থ বুঝে নিতে শিখল আনুষাঙ্গিক ভাবে ভাষা দিয়ে বাস্তবের যত রকম মডেল বানানো সম্ভব যেমন ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথমেটিক্স, ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার কোডিং, এমন কি কবিতা সবই সে শিখে ফেললো। যন্ত্রের মধ্যে “সাধারণ বুদ্ধিমত্তা” যা দিয়ে একাধিক বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করা যায় তার আভাস দেখা যেতে লাগলো।
বিজ্ঞানীরা আরও দেখলেন, এই বুদ্ধিমত্তার বিকাশ কোনো দৈব ঘটনা নয়, বরং এটি একটি গাণিতিক নিয়ম মেনে চলে। তাঁরা লক্ষ্য করলেন, মডেলের আয়তন (Parameters), তথ্যের পরিমাণ (Data) এবং তাকে প্রসেস করার ক্ষমতা (Compute)—এই তিনটি স্তম্ভকে যখন একটি নির্দিষ্ট অনুপাতে বাড়ানো হয়, তখন মডেলটির ভুল করার প্রবণতা একটি অবিশ্বাস্য নিখুঁত রেখা মেনে কমতে থাকে। যেন পাহাড়ে চড়ার মতো — আপনি যত ওপরে উঠছেন আপনার প্রতিটি পদক্ষেপে আপনার দৃষ্টি একটু একটু করে প্রসারিত হচ্ছে, এবং এই প্রসারণের হারটা আগে থেকে অনুমান করা যাচ্ছে। এই নিয়মকে বলা হয় Scaling Law.
ChatGPT 3 আপনার প্রশ্নের, সঠিক যুক্তি সাজিয়ে একটা সুসংবদ্ধ উত্তর দিতে পারত, মাধ্যমিকের অঙ্কে খুব বেশি ভুল করত না, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে হ্যালুসিনেট করে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল উত্তর দিতো, কলেজের অঙ্কে তো নির্ঘাৎ ধ্যাড়াতো।
ChatGPT 4 আমেরিকার ডাক্তারি ও আইনী পরীক্ষার প্রশ্ন সামলাতে পারতো। বর্তমানের ChatGPT 5 Maths Olympiad এ সোনা জেতার ক্ষমতা ধরে, তার হ্যালুসিনেশন কমে গেছে 45%। তার জন্য ChatGPT কে মাস্টার রেখে প্রাইভেট টিউশন দিতে হয়নি বা বিজ্ঞানীদের কোনো “অলৌকিক এলগরিদম” আবিষ্কার করতে হয়নি। তার আর্কিটেকচর প্রায় একই রেখে দিয়ে শুধু প্যারামিটার এর সংখ্যা, ট্রেনিং ডেটা আর কমপিউট প্রায় হাজার গুণ করে বাড়িয়ে দিতে হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা অনুধাবন করলেন, যে বুদ্ধিমত্তা কোনো রহস্যময় গুণ নয় যা শুধু মানুষের মস্তিষ্কেই সীমাবদ্ধ; বরং পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্য আর শক্তির সংযোগ ঘটলে যেকোনো বৃহৎ সিস্টেমের মধ্যে যুক্তি ও বোধের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ প্রায় অবধারিত। বুদ্ধিমত্তার বিকাশ তাত্ত্বিক সমস্যা থেকে কারিগরি (engineering) সমস্যায় রূপান্তরিত হলো। যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখন আমাদের পোষা কুকুরছানাটির মতো। আমাদের কাজ হলো তাকে পর্যাপ্ত পুষ্টি জোগানো, সে যাতে জুতো কামড়ে নষ্ট না করে তাকে সেই শিক্ষা দেওয়া। কিন্তু সে ব্যাটা বড় হয়ে চোরের হাত চেটে দেবে কি না কিংবা সে চালাক হবে না বোকা হবে, মিশুকে হবে না খেঁকুড়ে হবে—সে বিষয়ে আমাদের নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত। আমরা যন্ত্রের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা প্রোগ্রাম করার বদলে যন্ত্রের মধ্যে বুদ্ধিমত্তার উন্মেষ ঘটাতে শুরু করলাম।
এখন প্রশ্ন হলো এই ধারা আমরা যদি অব্যাহত রাখি তাহলে এর শেষ কোথায়— যন্ত্রের পিছনে শুধু কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢাললেই আর কাঁড়ি কাঁড়ি বিদ্যুৎ যোগালেই যদি সে একই সঙ্গে বিজ্ঞান, শিল্প ও অর্থনীতিতে দিগ্গজ হয়ে ওঠে তাহলে কি এমন দিন আসবে যখন যন্ত্র সবরকমের বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়ে মানুষকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেবে?
এমনই একটি যন্ত্র নির্মাণের সাফল্যের ওপর বর্তমান বিনিয়োগ বাজারে সর্বমোট আড়াই লক্ষ কোটি ডলারের কাছাকাছি বাজী রাখা হয়েছে, গবেষণা সংস্থাগুলির অনুমান, ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পাওয়ার গ্রিড উন্নয়নের খরচ মিলিয়ে এই খাতে মোট বিনিয়োগ ৭ থেকে ১০ লক্ষ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন mass migration of capital. অর্থাৎ সমগ্র মানবজাতির মোট বিনিয়োগের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ এখন এমন একটি পরিকাঠামো তৈরীর পিছনে খরচা করা হচ্ছে যা মানবিক শ্রমের অর্থনৈতিক গুরুত্বকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেবে। এটা আমি বলছি না, OpenAI কোম্পানীর মূল ব্রত হিসেবে তাদের চার্টারেরই লেখা আছে। বাকিরা না লিখলেও তাদের গতিপ্রকৃতি সেই দিকেই। তাঁদের দাবী তাঁরা একাজ মানবজাতির সামগ্রিক কল্যাণের উদ্দেশ্যেই করছেন। মাসান্তে তাঁরা তাঁদের সমস্ত রোজগার সাধারণ মানুষের মধ্যে ভাগ করে আপনার হাতে একটা থোক টাকা ধরিয়ে দেবেন আর আপনি প্রজাপতি ধরবেন, সাবানের বুদবুদ ওড়াবেন আর ললিপপ চুষবেন মনের আনন্দে।
আপনি যখন চিন্তা করবেন যে সমগ্র মানবসভ্যতার ইতিহাসে কেউ কোনোদিন তাদের কেন্দ্রীকৃত ক্ষমতা ও সম্পদ স্বেচ্ছায় মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেয়নি তখন এই কোম্পানীগুলির উদারতায় তাঁদের মহত্বে অবাক হয়ে আপনার ‘হাঁ’ বুঝতেই চাইবে না। তারপর যদি আপনি এঁদের নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান যে বাজার থেকে এই লক্ষ লক্ষ কোটি ডলার তাঁরা তুলবেন কী করে! কি এমন যন্ত্র তাঁরা বানাতে চলেছেন যার মন্তরে অপুত্রের পুত্র হয় আর নির্ধনের ধণ?
OpenAI এর চার্টারে একে বলা হয়েছে Artificial General Intelligence, এটি সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত এমন একটি যন্ত্র যে সবরকম অর্থনৈতিক ভাবে গুরুত্বপুর্ণ কাজে মানুষের ক্ষমতা কে বহুগুণে ছাড়িয়ে যাবে। আনথ্রপিক কোম্পানির CEO, দারিও আমোদেই এর দেওয়া সংজ্ঞাটি এই যন্ত্র সম্পর্কে সবচেয়ে পরিষ্কার একটা ধারণা দেয়, তিনি একে বলেছেন "a country full of geniuses in a data center”.
অর্থাৎ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন ফিজিসিস্ট এর চেয়েও স্পষ্ট করে এই যন্ত্রের কাছে ব্রহ্মান্ডের অন্তঃসলিলা নিগূঢ় অর্থগুলো ধরা পড়বে। তার এক মিনিটে বানিয়ে দেওয়া পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবিটি অস্কারের মঞ্চে জিতে নেবে সেরা গল্প, সেরা সঙ্গীত, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনয়। জনতার নাড়ী টিপে তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতায় এ যন্ত্র ধুরন্ধরতম রাজনীতিবিদকেও অতিক্রম করে যাবে। যুদ্ধনীতি তে অতিক্রম করে যাবে আমাদের অভিজ্ঞতম সেনাপতিকে।
সুদূর সাইন্স ফিকশন বলে উড়িয়ে দেবেন না। আপনার বয়স যদি আশি বা তার কম হয় এবং আপনার স্বাস্থ্য যদি খুব খারাপ না হয় তাহলে খুব সম্ভবতঃ আপনার জীবদ্দশার মধ্যেই এই ঘটনা ঘটতে চলেছে। আমার কথা নয় সবকটি AI কোম্পানির CEO আগামী দুই থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে AGI এর আগমনের ভবিষ্যৎবাণী করে রেখেছেন ও সেইমতো বিনিয়োগ বাজারে বাজী ধরেছেন। সুতরাং ওসব শুধু মার্কেটিং গিমিক বলে চট করে উড়িয়ে দেওয়া মুস্কিল।
২০২৫ সালে OpenAI, SoftBank, Oracle আর আবুধাবির MGX— মিলে শুরু করলো 'Stargate Project'। এটি মূলত আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অনেকগুলো ডেটাসেন্টারের সমন্বয়ে গঠিত, ১.৫ কোটি GPU নিয়ে তৈরী একটি বিশালাকার কম্পিউটিং সুপারক্লাস্টার। ২০১২ সালে ছয় কোটি প্যারামিটারের AlexNet কে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল দু'টি মাত্র সাধারণ জিপিইউ দিয়ে। সুতরাং AI এর ব্যবহারের জন্য বিশেষ ভাবে তৈরী ১.৫ কোটি GPU দিয়ে কোন দৈত্যকে ট্রেনিং দেওয়া হবে নিজেই বুঝে দেখুন।
এই প্রজেক্টের জন্য প্রয়োজনীয় দশ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ জোগাতে ডেটাসেন্টার সংলগ্ন এলাকায় তৈরি হচ্ছে বিশাল সব সোলার ফার্ম এবং নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর। এই দশ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ দিয়ে অনায়াসেই প্রায় পঁচাত্তর লক্ষ বাড়িতে একযোগে বিদ্যুৎ জোগানো সম্ভব। পুরো প্রজেক্টের সম্ভাব্য খরচ? প্রায় পঞ্চাশ হাজার কোটি ডলার। টাকায় হিসেব করতে চাইলে দুটো শূন্য বাড়িয়ে নিন।
ইলন মাস্ক তাঁর রকেট কোম্পানি (SpaceX) ও এআই কোম্পানিকে (xAI) এখন এক সুতোয় গেঁথে ফেললেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে SpaceX আমেরিকার FCC-এর কাছে আবেদন করেছে খেপে খেপে প্রায় ১০ লক্ষ স্যাটেলাইট লঞ্চ করার অনুমতির জন্য — যা পৃথিবীর কক্ষপথে সৌরশক্তি-চালিত AI ডেটা সেন্টার হিসেবে কাজ করবে। মহাজাগতিক বিকিরনেও নষ্ট হবে না—এমন বিশেষ 'এআই চিপ' তৈরির উদ্দেশ্যে ২০২৬ এর এপ্রিলে তিনি শুরু করেছেন Terafab কারখানা। এটি এমন এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা যেখানে একদিক দিয়ে কাঁচামাল ঢুকবে আর অন্যদিক দিয়ে বেরোবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত এআই চিপ; নিকট ভবিষ্যতে এই কারখানা বছরে ১ টেরাওয়াট কমপিউট পাওয়ার উৎপন্ন করার মতো প্রয়োজনীয় চিপ উৎপাদন করবে যা বর্তমানে সমগ্র বিশ্বের সম্মিলিত কম্পিউট ক্ষমতার দশ গুণ।
তাঁর Starship রকেটটি কক্ষপথে ১০০ মেট্রিক টন পর্যন্ত মাল পৌঁছে দিয়ে অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে ফিরে আসতে সক্ষম। বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথে তাঁর দশ হাজারের ওপর স্যাটেলাইট ঘুরছে—সুতরাং এই পুরো বিষয়টিকে ‘স্রেফ অতিরঞ্জন’ বলে অবজ্ঞা করলে আপনি ঠকতে পারেন।
মোটকথা আপনি চান বা না চান সাইন্স ফিকশন আপনার ঘাড়ে এসে পড়েছে। পাঁচ বছরটা দশ বছর হতে পারে কিন্তু পাঁড় স্কেপটিকও সম্ভবতঃ আর AGI কে পঞ্চাশ বছর দূরে ঠেলবে না। ইতিমধ্যে তাঁর আবির্ভাবের আগেই তাঁর পূর্বসূরীরা আগামী দিনে যথেষ্ট পরিমাণ গণ্ডগোল বাঁধাতে চলেছেন।
(যদি ভালো বেসে কেউ কমেন্ট করে চায় তাহলে পরের পর্ব "আ’য়ে আমটি খাবে কেড়ে"। নইলে বিদায়)
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।