বাজার উঠে যাওয়ার পরেও,
বাজারের গন্ধ লেগে থাকে গোটা ফুটপাথ জুড়ে
মরা ইঁদুর, থেঁতলানো টমেটো,
কপির পাতা, রসালো ফলের খোসা
মানুষের পায়ে মথিত হয়ে তৈরী করে এক অলৌকিক ভর্তা,
দাঁত ভাঙা পিচের রাস্তা হাঁ করে একথালা ভাত বেশি খেয়ে নেয় তাই দিয়ে সোনামুখ করে, রোদে পিঠ দিয়ে।
মুর্গীমাছের দোকানে, কাক কুকুর শরিকি ঝামেলা সামলায়,
ভ্যানে করে আঁশ পালক ছাঁট চিংড়ি মাথা, পাড়ি দেয় পাঙাস-মাগুরের স্কুলে মিড ডে মিল হতে।
ক্রমে না পাওয়া চাকরির মতন, বেলা বাড়ে,
যুবতীর ন্যায় লঘূ পায়ে ঘুরে ঘুরে
পায়রার ঝাঁক খুঁটে খায় অবাঞ্ছিত খাদ্যকণা,
ফাঁকা টোটো বাঁক নেয় সহসা ভুল গলিতে,
আঁকার স্কুলের সামনে তখন, চটি জুতোর আনন্দবাজার।
অনেক অনেক রোল চাউমিন চপের দোকান সাজতে বসে, সন্ধ্যায় তার অনায়াস অনুষ্ঠান, পাড়ার মোড়ে।
সহসা বিরল প্রজাতির শিল-কাটাও কিংবা তালপাতার বাঁশির ফেরিওয়ালারা শহরের পেশা বৈচিত্র্য বাড়ায় হাঁক পেড়ে। রাধাপ্রসাদ আড়মোড়া ভাঙেন, মৃত্যুর এতকাল পরেও।
বাজারের পাশে রেললাইন, রেললাইনের ওপারে
আবার কুঁচো বাজার, বাড়ন্ত দারিদ্র্য,
উঠতি বয়সের রেল ঝুপড়ি,
তার পাশে বাদাবনের কুমির হয়ে ঘুমোয় জেসিবি মেশিন,
ওপর মহলের অপেক্ষায়।
রেললাইনের ওপর দিয়ে
একফালি ফুটব্রিজ চলে গেছে চুপচাপ, এদিক থেকে ওদিক
যেমন এসির জল বেরোনোর পাইপ করিডোর পেরিয়ে নালার মুখ চুমুতে ভরিয়ে দেয় নিঃশব্দে,
সাবওয়ে তৈরী হওয়ার পর,
ফুটব্রিজের ভালোবাসার মানুষেরা কমে গেছে,
ঘর ভোলা মানুষ, কুকুর আর পাখিরা শুধু তার সাথে মেশে,
কেউ কেউ ঘুমায়, কেউ স্বেচ্ছা সঙ্গম করে,
কেউ ইঁটের কুঁচি দিয়ে
তার লোহার শরীরে ফুলের উল্কি আঁকে,
গুটখার পিক ফেলে বানায় মেহেন্দী গ্রাফিতী,
আলতামিরা, ভীমবেটকা, অজন্তা মিলে মিশে যায়।
বাজার করে ফেরার পথে, তুঁতে দিয়ে খুন করে ফেলা একটা বটগাছের লাশের নীচে,
একটা প্রাচীন সাইকেল স্ট্যান্ড পরে,
সকল পুঁজিবাদী - ভোগবাদী অর্থনীতির মুখে
দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করে সাইকেলেরা টিকে থাকে,
চেন পড়ে যাওয়া, টিউব পাংচার হয়ে যাওয়া ছাড়া তার আর কোনো দুরারোগ্য ব্যাধি নেই,
তাই সাইকেলেরা ঘাড় বেঁকিয়ে
দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে
নাগোয়া থেকে নাগরাকাটা হয়ে নাইরোবি অবধি,
বিমল মুখার্জি আনন্দে বেল বাজিয়ে দেন কিড়িং ক্রিং।
এসব হাভাতে ক্লান্ত রাস্তা, চা-কচুরি-মিষ্টির কুটির শিল্প,
সব পেয়েছির আসরের মত দশকর্মা ভান্ডার
এবং জানলায় হরলিক্স সাজিয়ে রাখা ওষুধের মুদি দোকান পেরিয়ে আসার একটু পরেই,
একটা সরু গলি পড়ে, যার একমাত্র ল্যাম্পপোস্টের মাথায় প্রতিবছর কালো ঘুড়ি আটকায় যীশুর মতন,
যদিও তাকে নামিয়ে আনে না কেউ,
তিনবার অস্বীকার করে না কেউ,
তাই তার অলৌকিক পুনরুত্থান,
শেষ অবধি ভালো করে দেখা যায় না,
এহেন গলির শেষ মাথায় আমি থাকি,
সেখানে পাঁচিল আলো করে বেড়ালেরা সৎবৎসর
রোদ পোহায়-ঝগড়া করে,
গা চেটে সাফ করে, থাবা থেকে গোপনাঙ্গ।
ডেলিভারির দেবদূতেরা
দেওয়ালের দণ্ডায়মান ছায়ায় বিশ্রাম নেয়-জল খায়, ঘাম মোছে, কাকে যেন ফোন করে আশ্বাস দেয়,
মাল আসছে, অপেক্ষার মাত্র কয়েকটা মিনিট
শীতের শুরুতে এখানে পটপটিরা বেগুনি ফুল নিয়ে জাঁকিয়ে বসে নালার মুখের ভেজা মাটিতে,
বর্ষায় হলদে রেন লিলি তার বাসা কেড়ে নেয়,
গরমে কিন্তু কেউই থাকেনা।
নর্দমার কালো গাপ্পি মাছেরাও পরিযান করে,
অনাগতবিধাতার মতো, অন্য কোথাও
শুধু একটা পাকুড়ের চারা দুরন্ত গতিতে
অশ্লীল ভাবে বেড়ে উঠতে থাকে,
গরমকে ফুৎকার দিয়ে, পল্লবিত মধ্যমা দেখিয়ে।
এভাবেই বছর গড়িয়ে যায়,
মার্বেলের মেঝেতে মার্বেলগুলির মতো অনায়াসে, অবলীলায়।
এই হয়, এই হয়ে থাকে সাধারনত,
বলতে হয় তাই বলা,
এসব সহজ কথা, কপট কঠিন করে বলা,
কারন কঠিন কথা বলতে গেলে, গলায় আঙুল দিতে হয়
তীব্র বমনের বেগে বেড়িয়ে আসে অপ্রিয় সত্য।
অথচ,
সকল অনিয়ম, চুরি, ডাকাতি, দুর্ঘটনা এবং দুর্নিতীর পরেও,
মানুষ শান্তি ও ভালোবাসা একসাথে খেতে চায়,
তাই বারবার বিষম খায়।
ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার ভয়ে আমরা কেন্নো হয়ে যাই,
আমরা বলতে পারিনা,
ক্ষমা করবেন,
আমরা ভুল করেছি,
আমরা ভুল করছি,
আমরা ভুল করেই চলবো, সমাজ-পরিবার-পরিবেশের প্রতি,
আমরা অজান্তে ভুল করেছি,
আমরা সজ্ঞানে ভুল করেছি,
আমরা বাঘের গুহার সামনে পশুদের পদচিহ্নের অভিমুখ চিনতে বারবার ভুল করেছি,
আমরা নিছকই ভুল করেছি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।