এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • অন্ধজনে দেহ আলোঃ পর্ব ৩ 

    Ranjan Roy লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ২৩ বার পঠিত
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩
    ৩ চন্দনা

    দিনটা ছিল শনিবার। আমার অন্য ক্লাস অফ। রঙ্গনা স্যার পরীক্ষার জন্যে এক্সট্রা ক্লাস নেবেন, সকাল সাড়ে সাতটায়। তাই আজ আমাকে একাই কলেজ যেতে হচ্ছে।
    অন্য চারজন রায়পুর শহরের। জয়স্তম্ভ মোড়ে নেমে হাঁটছি। দুর্গা মহাবিদ্যালয় মাত্র দশ মিনিটের পথ।
    উনি এলিয়টের ‘মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল’ পড়াবেন। আমার প্রিয় নাটক।
    রঙ্গনা স্যার চান আমরা যেন নোটস মুখস্থ না করি, নিজের মত করে ভাবতে শিখি, প্রশ্ন করি।
    ‘ও ম্যাডাম, ম্যাডামজী! জলদি আইয়ে। ইধার দেখিয়ে, ইধার’!
     

    আমাকে কেউ ডাকছে? সতর্ক হওয়ার চেয়ে অবাক হই বেশি। বাঁদিকে সারি সারি দোকান ঘর, সাত সকালে একটাও খোলেনি।
    ডানদিকে রাস্তার পাশে একটা খালি প্লট, সেখানে উবু হয়ে কিছু লোক কিছু করছে--যেন রোদ পোহাচ্ছে।
    কিন্তু সেখান থেকেই একটা ময়লা পাজামা পরা একটা লোক আমার দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছে। একটু ভয় ভয় করছে কি?
    নাঃ, শীতের সকাল সাতটায় রোদে ঝলমল রাজধানীর রাস্তাঘাট। একটা অচেনা লোক ডাকছে তো কী হয়েছে?

    আমি থমকে দাঁড়াতে লোকটা এসে কাকুতি মিনতি করতে থাকে—চলুন না ম্যাডামজি। ওরা ক’জন মিলে আমার ভাইকে লুটে নিচ্ছে।
    সেরেফ হাতের সাফাই! আপনি পড়িলিখি মহিলা। আপনি ব্যাপারটা বুঝে ওদের আটকাতে পারবেন। প্লীজ, চলুন।
    কৌতুহল অ্যালার্ম বেলের সংকেতকে চাপা দিল।
     
    কিছু না ভেবে পায়ে পায়ে পৌঁছে গেছি ওই মাঠের কোনায় লোকগুলোর কাছে। মাটির ওপর ময়লা গামছা বিছিয়ে একটা লোক তিনটে তাস বিছিয়েছে।
    তারপর কীসব বলে চটপট ওই তিনটেকে ডানদিক থেকে বাঁদিক আর বাঁদিক থেকে ডানদিকের মধ্যে তিনবার শাফল করে উলটে রাখল।
    একজন একটা তাসে হাত রাখল, লোকটা গম্ভীর মুখে সেই তাসটা উলটে দিতেই অন্য লোকটা আনন্দের চোটে একেবারে তো-তো-তো-তো করে উঠল।
    আর তাসওলা ওকে ব্যাজার মুখে দশটা টাকা দিল।
     

    আবার একজন তাসের প্যাকেট তুলে নিয়ে গামছাওলার থেকে আড়াল করে একটা তাসের কোণা একটু মুড়ে আবার ওকে ফেরত দিল। আমরা দেখলাম ইস্কাপনের গোলাম।
    এবার গামছাওলা ফের শাফল করে তিনটে তাস উলটো করে রাখল। তারপর প্রথম লোকটার দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকাল। ও ভাবছে কোনটাতে হাত রাখবে।

    আরে কী বোকা! ও কী দেখতে পাচ্ছে না যে মাঝখানের তাসটারই কোণাটা সামান্য মোড়া, ওটাই তো ওর তাস।
    আমি উত্তেজনা চেপে রাখতে পারিনা।
    মুখ ফসকে অস্ফুট আওয়াজ আর ইশারা করে ফেলি।
    সংগে সংগে এতক্ষণ একটাও কথা না বলা গামছাওলা আমার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে—এইসা নহী ম্যাডামজি! পহলে পয়সা লাগাইয়ে, ফির বোলিয়ে।
    আমি ঘাবড়ে গিয়ে বলি—আমি এসব খেলব না। আর আমার কাছে কোন পয়সা নেই।
     

    তিনজন কলকলিয়ে ওঠে। ইস্কাপনের গোলাম ব্যাটাও বলে-আপ বরবাদ কর দিয়ে। ইশারা কর দিয়ে। অব ম্যায় জিৎ ভী যাউঙ্গা তো একোপয়সা নেহি মিলেগা।
    কারণ আপনি না খেলে বাইরে থেকে ইশারা করে আমাকে হেল্প করেছেন। এটা ফাউল।

    আমাকে এখানে টেনে আনা ময়লা পাজামার গলায় অনুনয়ের সুর। বহেনজি, এই আমার ভাইয়া। এরা একে বেশ কয়েকবার হাতসাফাই দেখিয়ে ঠকিয়েছে
    ।তাই আপনাকে বলেছিলাম সাহায্য করতে। এবার ভাইয়া ওদের চালাকি ধরে ফেলে জিতে যেত। কিন্তু আপনি খামোখা খেল কাচ্চি করে দিলেন।
    অন্ততঃ দশটা টাকা লাগান, ভাইয়া জিতলে টাকা ফেরত পাবেন।
    হ্যাঁ, আমার পার্সে কলেজের ফীস ষাট টাকা ছিল। ফীস না হয় কালকে দেব, এখন দশটা টাকা দিয়ে এদের হাত থেকে ছাড়ান পাই আগে!
     

    পার্স খুলে রবার ব্যান্ডে আটকানো দশটাকার ছ’টা নোট থেকে একটা বের করতে যাচ্ছি কি ওই ছোটভাই আমার হাত থেকে ছোঁ মেরে গোটা বান্ডিলটা নিয়ে একটা দশটাকার নোট নিয়ে তাসগুলোর পাশে রাখে। গামছাওলা আরেকবার তাসগুলোর উপর ম্যাজিশিয়ানের কায়দায় হাত চালায়। বড়ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করে- কোনটা?
    আমি ফুল কনফিডেন্সে আঙুল দেখাই কোনামোড়া তাসটার দিকে—ওটা এখন জায়গা বদলে ডানদিকে। আমি ড্যাম সিওর, তিনটের মধ্যে কোণার দিকে একটু মুড়ে যাওয়া তাস একটাই।
    গামছাওলা তাসটা উলটে দেয়।

    একী! আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা। এটা তো হরতনের বিবি। কী করে হল?
    লোকটা ভাবলেশহীন মুখে টাকাটা ট্যাঁকে পোরে।আবার তাস সাফল করে। বড়ভাই আবার একটা তাসের কোণা দাঁত দিয়ে কামড়ে মিলিয়ে দেয়। রুইতনের নওলা।
    আমি কিছু বলার আগে ছোট ভাই আরও দশটাকা ম্যাডামজিকে তরফ সে বলে তাতে লাগায়। আমি বাধা দেয়ার সুযোগ পাইনে। মনের মধ্যে একটু লোভও ছিল কি?
    যদি চান্স লেগে যায়? যদি কপালজোরে জিতে আগের টাকাগুলো ফেরত পাই।
     
    ঝড়ের বেগে খেলা এগিয়ে চলে। প্রত্যেকবার কেউ না কেউ দাঁও লাগায় এবং সবাই হারে। গামছাওলা টাকা পয়সা গুছিয়ে মুখের ঘাম মুছে উঠে পড়ে।
    জটলা ভাঙে।
    আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি। ছোটভাইকে বলি আমার বাকি টাকা ফেরত দাও। সে বলে-কিসের টাকা? সব তো আপনি হেরে বসে আছেন।
    আমার মাথায় বাজ। কলেজের ফীস!
    আমি চেঁচাই—একবার খেলেছিলেম, আচ্ছা বেশি হলে দু’বার। কিন্তু বাকি চল্লিশ টাকা।
    বাকিরা দলবেঁধে আমাকে ঘিরে ধরে –জুয়োয় হেরে গলাবাজি? লজ্জা করে না?
     

    --জুয়ো খেলেছি? আমি? একদম ফালতু কথা বলবে না। থানায় যাবো।
    --হ্যাঁ, হ্যাঁ, যান যান। গিয়ে বলুন, আমি কলেজে পড়া ভদ্রঘরের মেয়ে, রাস্তার ধারে আওয়ারা ছোকরাদের সঙ্গে জুয়ো খেলে হেরেছি, দেখুন কী হয়!

    আতংকে আমার গলা দিয়ে শব্দ বের হয় না। কিন্তু হঠাৎ প্রাণপণে ফাটা বাঁশের আওয়াজে চিৎকার করে উঠি।
    --হেল্প! প্লীজ হেল্প! মুঝে ইনলোগোঁ নে লুঠ লিয়া হ্যায়। কোই হ্যায় ? মুঝে বাঁচাইয়ে।

    চারদিকে লোকজন নেই দু’একটা সাইকেল ও মোটরবাইক নিজের খেয়ালে চলে যাচ্ছে। পান-সিগ্রেটের ঠেলাগুলোও বন্ধ।
    আমি কেঁদে ফেলি। ওরা হাসে, কিন্তু একটু দূরে সরে যায়। এবার আমার গলা থেকে একটা জান্তব চিৎকার বেরিয়ে আসে।
    ওরা হকচকিয়ে যায়, তারপর আমাকে ভেঙায়।

    কিন্তু একটা মোটরবাইক ইউ-টার্ন নিচ্ছে। ওদের ভুরু কুঁচকে ওঠে।
    বাইকটা রাস্তা ছেড়ে সোজা মাঠের মাঝখানে চলে আসে। ছেলেটি হেলমেট খুলে আমাকে জিজ্ঞেস করে- কী হয়েছে?
    আমি ফোঁপাতে থাকি। বলি-এরা জোট বেঁধে আমার সব পয়সাকড়ি ঠকিয়ে নিয়েছে, ফেরত দিচ্ছে না।
    ওরা প্রতিবাদ করে—মেয়েটি নিজের ইচ্ছেয় এসে জুয়ো খেলছিল।
    আমি বলি-আমার কলেজের ফীস!
     
     

    ছেলেটা বড়ভাইয়ের দিকে এগিয়ে যায়।
    --তুই ইয়াসিন না? মোদহাপাড়া থানায় এর আগেও তোর নামে শিকায়ত হয়েছে কয়েকবার। একবার তো আমার বন্ধুর আব্বাজান গিয়ে তোকে ছাড়িয়ে আনে।
    টাকা ফেরত দিয়ে দে!

    এই কথায় যেন সাপের মাথায় জল পড়ল। ওরা নীচুগলায় বলে -আপ মৌলবী সাহাবকে বেটে আফতাব ভাইয়ার দোস্ত?
    --হাঁ, ম্যায় সুপ্রতীক হুঁ। কলেজ ইউনিয়ন কা লীডার। অব তো রূপিয়া লৌটা দো! নইলে আমিই থানায় গিয়ে ডায়েরি লেখাব।
    আফতাব আর তোকে ছাড়াতে আসবে না।

    ওরা বিড়বিড় করে, মাফি চায়। তারপর ছ’টা নোট ফিরিয়ে দেয়।
    ও বলে-দুর্গা কলেজে পড়েন? কোন ইয়ার? আমার পেছনে বসুন, কলেজের গেটে ছেড়ে দেব।
    আচ্ছা, এই শিভ্যালরাস নাইটের নাম সুপ্রতীক?
    আগে খেয়াল করিনি।
     

    আসলে মর্নিং শিফটে ক্লাস। শহরের বাইরে গ্রাম থেকে আসি। তাই কলেজ এবং লাইব্রেরি, ব্যস্‌।
    কালচারাল ফাংশন, স্পোর্টস আর ইউনিয়নবাজি, দলাদলি—এসব এড়িয়ে চলি। দুপুরের মধ্যে বাড়িতে ফিরে যাই।
    মা অপেক্ষায় থাকে, দেখা মাত্র একগাল হেসে ফেলে।
    জিজ্ঞেস করে—ক্লাস কেমন হল, কোন প্রফেসর কেমন পড়ান, আমার ব্যাপারে কোন স্যার ভালো কিছু বলেছেন কিনা।
    বুঝতে পারি, ওরা আশায় আশায় আছে। মেয়েটা দাঁড়িয়ে যাবে, চাকরি পাবে। সংসারের হাল ধরবে।
     
    হ্যাঁ, আমি কথা দিয়েছিলাম।
    আর বাবার চেম্বারে রোগীদের ভিড় বেশ কমে গেছে।
    শুধু কাছের গ্রাম থেকে আসা কিছু পুরনো পেশেন্ট এখনও বাবাকে ধন্বন্তরি মনে করে।

    কিন্তু আমি কথা রেখেছিলাম।
    সকাল বিকেল মিলিয়ে চারটে টিউশন চালিয়ে যাচ্ছি। একটা রায়পুর শহরেই, কলেজ থেকে ফেরার পথে। বড়লোকের বাড়িতে ভাইবোনকে পড়ানো, সপ্তাহে তিনদিন।
    আর আমরা যেখানে থাকি সেই গ্রামেই দুটো বাড়িতে সন্ধ্যেবেলা হোমটাস্ক করিয়ে দেয়া।

    শহরের টিউশনে টাকা বেশি এবং ভালো জলখাবার। আর গাঁয়ের দুটোতে টাকা কম, রুটি ও লাল চা। কিন্তু খুব আন্তরিক।
    চার নম্বর টিউশনে আমি জলখাবার না করে দিয়েছি। কারণ, তার পর বাড়ি ফিরে দু’ঘন্টা পরে রাতের খাওয়া সারতে হয়। কিন্তু এই বাড়িটাতে পড়াতে সবচেয়ে ভাল লাগে।
     
    ছাত্র একটি বাচ্চা ছেলে, মহা বিচ্ছু! নিত্যনতুন ঝামেলা পাকায়। পড়তে না বসার অজুহাত খোঁজে।
    ওকে নানান কায়দা করে বুঝিয়ে লোভ দেখিয়ে পড়তে বসানো আমার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। আর আমার চ্যালেঞ্জ স্বীকার করতে ভাল লাগে।
    কী করে জানব আমার এই ঝোঁকটাই একদিন আমায় সুপ্রতীকের সংগে জড়িয়ে ফেলবে!

    কলেজে গিয়ে একদিন নোটিস বোর্ডে দেখলাম— সুপ্রতীক রায়চৌধুরী (এম এ অন্তিম বর্ষ) কে একসপ্তাহের জন্যে সাসপেন্ড করা হইয়াছে। অভিযোগ--- বিদ্যার্থীটি দর্শন বিভাগাধ্যক্ষ ডঃ ঘনশ্যাম চতুর্বেদীকে ক্লাস চলাকালীন অপমান করিয়াছে।

    কিছুই বুঝতে পারলাম না। সুপ্রতীক স্যারদের ইনসাল্ট করবে? ঠিক বিশ্বাস হয় না। তারপর ফাইনাল ইয়ার। একবছর পর চাকরি। এটাই বাঁধা রাস্তা।
    ফার্স্ট ইয়ারের বাছুরকে নাচন কোঁদন মানিয়ে যায়। কিন্তু ফাইনাল ইয়ার? ও কি কালিদাস নাকি যে নিজের বসে থাকা ডালে কুড়ুল চালাবে?
    এত বোকা? একটু খোঁজ নেওয়া দরকার

    কিন্তু ও জানে কী করেছে। কাঠ খেলে আঙরা হাগবে। আমার কী?
    সেইটা আমার ব্যাচমেট শৈলজাকে জিজ্ঞেস করায় ও বলল—তোর কীসের ইল্লি হচ্ছে? ও হিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট, ফালতু সাবজেক্ট। খালি সন তারিখ মুখস্থ করতে হয়।
    আর আমরা হলাম কলেজের সবচেয়ে এলিট ডিপার্টমেন্ট—ইংলিশ লিটারেচার। শেক্সপীয়র, শেলি, বায়রন, কীটস, পড়ি। চার্লস ল্যাম্ব পড়ি, হ্যাজলিট, ইলিয়ট, হেমিংওয়ে পড়ি।
    আমরা পাশ করলে যা চাই তাই পাব। ভাল বর—ইয়েস। ভাল চাকরি—ইয়েস।

    আমি হেসে ফেলি। শৈলজা মনসুখানি বিজনেস ফ্যামিলির মেয়ে। নিজের স্কুটারে করে আসে। কোন কোন দিন বাড়ির ড্রাইভার গাড়ি করে কলেজে ছেড়ে যায়।
    ওর বয়ে গেছে চাকরি করতে। ওর বিয়ের কথাও চলছে। গ্র্যাজুয়েট হলেই--।

    ওদের ফান্ডা সিম্পল। লড়কী হল পরায়া ধন। পরের আমানত। খাইয়ে দাইয়ে লেখাপড়া চালচলন আদবকায়দা এবং আচ্ছে সংস্কার শিখিয়ে বড় করব।
    ততদিন সামলে রাখব। যাতে কোন শয়তানের কালী নজর না পড়ে। তারপর শুভ লগনে যার জিনিস তাকে সঁপে দেব।
    কার জিনিস? কে মালিক? ভগবান যাকে আগে থেকে ঠিক করেছেন। চিত্রগুপ্তের খাতায় নাম তোলা আছে।
    সবচেয়ে বড় কথা –আমার বন্ধুটিও তাই চায় যে!
     

    কিন্তু আমার মন মানে না। শৈলজা আমাকে চোখ কুঁচকে দেখে। কী হোল? কুছ গড়বড়? প্রেমে পড়েছিস নাকি? ছি রে!
    আমি হেসে ফেলি।–হট্‌ রে শালী! তোর মুখে কিছুই আটকায় না?

    --দেখ, ছেলেটা হ্যান্ডসাম কিন্তু উড়নচণ্ডে টাইপ! ওর সংগে বেশি ইলু ইলু না করাই ভাল।
    --আরে ওসব কিছু নয়। এমনই জানতে চাইছি। মানে, আমাদের কলেজে স্যারদের অপমান করার কালচার নেই তো। কী হয়েছিল?
    আর হিস্ট্রি পড়ে তো ফিলজফির ক্লাসে কী করতে গেছল—এই আর কি!
    --ঠিক আছে। তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তুই বলছিস যখন খবর এনে দেব। তিনটে ছেলে আছে। আমি কোন কাজ করতে বলে জনম সার্থক মনে করে।
    তোর জন্য জান হাজির! তবে চেয়ে বসিস না, তাহলে মরে যাব।
    --উফ্‌ এত বাজে বকর করতে পারিস না!

    ***************************************************
    দুর্গা মহাবিদ্যালয়। ছত্তিশগড়ের সবচেয়ে নামজাদা প্রাইভেট কলেজ। এটি একটি পুরনো এডুকেশনাল ট্রাস্ট দ্বারা পরিচালিত। শুরু যাঁরা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে বাঙালী সমাজের প্রতিষ্ঠিত জনা কয়েক নাগরিক। বিশেষ করে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার, উকিল এবং দাঁতের ডাক্তার। প্রিন্সিপাল অত্যন্ত কড়া। পুরনো জেলখাটা স্বাধীনতা সংগ্রামী। নিজের ছেলের নামে অনিচ্ছুক মেয়েকে লাভ লেটার লেখার কমপ্লেন এলে ছেড়ে কথা বলেন নি, সাসপেন্ড করেছিলেন।

    সেদিন দর্শন বিভাগের ডীন ডক্টর ঘনশ্যাম চতুর্বেদী ক্লাসে পড়াচ্ছিলেন—বেদান্ত দর্শন। স্যার বয়স্ক এবং ভক্ত মানুষ। গলায় রুদ্রাক্ষের মালা।
    উনি পেছনের বেঞ্চে ফিসফিস করে পাশে বসা মেয়েটির সংগে কথা বলতে থাকা ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন—কী বলছ ওকে?
    -- বলেছি আপনি শিখিয়েছেন তোরা হচ্ছিস মায়া। তোদের টনটনাটনের চোটে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হয়েছে।
    গোটা ক্লাস হেসে উঠল।

    --আমি তোমাদের ওরকম আবোলতাবোল কিছু শেখাই নি। টনটনাটন আবার কি?
    --সেকী স্যার ! আপনি পড়ান নি যে ঈশ্বর মায়িক শক্তি দ্বারা জগত সৃষ্টি করিয়াছেন। আর বেদান্ত দর্শন অনুসারে ব্রহ্ম হলেন অবাঙ্মনসোগোচর। তাঁকে শব্দ দিয়ে ধরা যায় না। দ্রষ্টাগণ অব্যক্ত ব্রহ্মকে ওঁ নামক নাদের দ্বারা প্রতীকী রূপে ব্যক্ত করেন, আপনি পড়ান নি?
    --তা পড়িয়েছি। কিন্তু টনটনাটন?

    --বলছি স্যার। ব্রহ্মকে যদি প্রণব মন্ত্র ওঁ দিয়ে প্রতীকী রূপে বলা যায় তাহলে মায়ার শক্তি বোঝাতে আমি টনটনাটন নাম দিলে ক্ষতি কী?
    স্যার গম্ভীর হলেন।
    --ব্যাখ্যা কর।
    --স্যার, মায়া হচ্ছে ত্রিগুণাত্মিকা শক্তি—তাই টনটনাটন মানে সত্ত্বঃ, রজঃ, তমঃ।
    গোটাক্লাস হেসে গড়াচ্ছে।

    --তুমি কি আমার সংগে মস্করা করছ?
    --না স্যার, আমি সিরিয়াস।
    --বেশ, বল ঈশ্বর বলতে কী বুঝেছ?
    --স্যার, আপনি কি বোঝেন?

    এবার গোটা ক্লাসে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। চাপা উত্তেজনা। যেন গুরু শিষ্য ডুয়েল লড়ছে।
    স্যার টেবিলে রাখা জলের গেলাস থেকে এক ঢোঁক জল খেলেন। তারপর গোটা ক্লাসের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন।

    --ঈশ্বর হলেন আমাদের সৃষ্টিকর্তা। উনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, পরম করুণাময়। উনি জ্ঞান ও শক্তির আধার। আমাদের সবকিছু নৈতিক নিয়মের তিনিই উৎস। কোনটা ভাল, কোনটা মন্দ তিনিই ঠিক করে দেন। তিনি দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করেন।
    এবার তুমি বল।

    -- স্যার, আপনার ঈশ্বর সব পারেন?
    স্যার বললেন ঈশ্বর খালি আমার নন, উনি সবার, আর ঈশ্বরের অসাধ্য কিছুই নেই।
    তখন ছেলেটা মিচকি হেসে বলল—আপনার ঈশ্বর কি এমন একটা পাথর সৃষ্টি করতে পারেন যেটা উনি নিজে তুলতে পারেন না?
    -- ক্লাস থেকে বেরিয়ে যাও।
    উনি পড়াতে শুরু করলেন।
     

    ঘন্টা পড়ার মিনিট পাঁচেক বাকি। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটি চশমা পড়া ছেলে।
    --স্যার, ভেতরে আসতে পারি?
    স্যার ওকে ভাল করে দেখলেন, চোখে প্রশ্নঃ তুমি কে?
    --সরি স্যার, আমি সুপ্রতীক। ইতিহাসের ফাইনাল ইয়ার।
    --কী চাও?
    --স্যার, একটু আগে আপনি একটি ছেলেকে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ক্লাস থেকে বের করে দিয়েছেন। এটা আপনার মত জ্ঞানী দর্শনের অধ্যাপককে মানায় না।
    --কী বলতে চাও?
    --ওর প্রশ্নটি লজিক্যাল। তবে একটা ফ্যালাসি রয়েছে। সেটা নিয়ে ইন্টারেস্টিং আলোচনা হতে পারত। সক্রেটিস এমন কূট প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা উঠলে খুশি হতেন। কিন্তু আপনি—
    --বাজে কথা। কোন লজিক ছিল না। ও ঈশ্বরের ধারণা নিয়ে ইয়ার্কি মারছিল। এখন তোমাকে উকিল ধরেছে?
     
     

    পেছনের বেঞ্চ থেকে একটা কথা উড়ে এল। সুপ্রতীক ইউনিয়নের সেক্রেটারি স্যার।
    --বুঝলাম, ইউনিয়নবাজি। মানে আমি ক্লাসে কী ভাবে পড়াবো সেটা ইউনিয়ন ঠিক করে দেবে? আস্পর্ধা কম নয়!
    --না স্যার, আমি এসেছি দর্শনের অ্যামেচার ছাত্র হিসেবে। আমার মনে হয়েছে আপনার ঈশ্বরের বর্ণনা বা সংজ্ঞায় ফ্যালাসি বা হেত্বাভাস আছে।
    --ইয়ে বাত? বাতাইয়ে জী। ক্যা ফ্যালাসি ইয়ানে হেত্বাভাস?

    সুপ্রতীকের চোখের পলক বেশ খানিকক্ষণ ফরফর করে।
    --স্যার, আপনার বর্ণনায় দুটো ভাগ। যদি শুধু দ্বিতীয় ভাগটা দেখি তাহলে মনে হয় ঈশ্বর একজন রাজা।
    ঠিক-বেঠিক বলে দেন, দুষ্টুলোককে শাস্তি ও ভাললোককে ইনাম দেন। অথবা আজকালকার সরকার। একই কাজ। খালি স্কেলটা আলাদা।

    আর যদি ঈশ্বর কী বোঝাতে শুধু প্রথম ভাগের কথা ধরেন –সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান, অসীম করুণাময়; তাহলে একটা কথা আছে।
    বহু আগে একজন গ্রীক দার্শনিক এই কথাগুলো নিয়ে প্রশ্ন করেছন।

    --কী নাম? কবেকার লোক?
    --এপিকিউরাস, যীশুর জন্মেরও কয়েক শতাব্দী আগে?
    --তা কী বলেছেন তোমার এপিকিউরাস?

    খোঁচাটা বৃথাই গেল। ওকে তাতিয়ে তোলা গেল না।

    সুপ্রতীক শান্ত ভাবে বলত লাগলঃ
    ঈশ্বর যদি সবকিছুর স্রষ্টা, তাহলে যা কিছু খারাপ, যত শয়তানি –সেটাও ওনার সৃষ্টি।
    সেসব যদি উনি ইচ্ছে করে মজা দেখার জন্যে করে থাকেন, তাহলে উনি দুষ্টু লোক, করুণাময় নন।

    যদি ওনার ইচ্ছে আছে, শক্তিও আছে, কিন্তু কোথায় কী শয়তানি হচ্ছে সেসব উনি ঠিকমত জানেন না—নইলে কবে টাইট করে দিতেন—
    তাহলে উনি সর্বজ্ঞ নন।
    আর যদি উনি করুণাময়, চাইছেন জগত থেকে যত অন্ধকার যত খারাপ সব বিলুপ্ত হোক, অথচ পারছেন না। মানে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণ ওনার সাধ্যের অতীত।
    তাহলে উনি সর্বশক্তিমান নন।
     

    ঘন্টা বেজে উঠল। ডঃ ঘনশ্যাম রেজিস্টার ও ডাস্টার তুলে বেরিয়ে সোজা প্রিন্সিপালের রুমে গেলেন।
    প্রিন্সিপাল সুপ্রতীককে ডেকে পাঠালেন।
    সুপ্রতীক কিছুই অস্বীকার করে নি।
    এই হোল বেত্তান্ত।

    (চলবে)
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩
  • ধারাবাহিক | ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ২৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন।