এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ত্রিকাল হিল্লোল ও শিবনাথ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ৩৭ বার পঠিত
  • মহাদেব দীনবন্ধুকে বললেন, ‘আচ্ছা দীনবন্ধু, তোমার মনে আছে, আমাদের এই তেঁতুল গাছটার বয়েস কত ? ‘
    দীনবন্ধু একটু ভেবে বললেন, ‘ প্রায় পনের বছর।’
    মহাদেব মাথা নাড়েন, ‘ হ্যাঁ ঠিক ঠিক। পনের বছরই হবে। আর ত্রিকালের বয়েসও ওই প্রায় পনের।’
    মহাদেববাবুর বাড়িতে মূলত তিনটি মানুষ। মহাদেব, দীনবন্ধু আর অনুপমা। আর আছে চিরজাগ্রত ত্রিকাল। অঘোর দাস, গোপাল সাঁতরাদের মতো অনেকে মাসে অন্তত পনের দিন এ বাড়িতে আসা যাওয়া, থাকা খাওয়া করে।
    আর আছে বাড়ির আঙিনায় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই তেঁতুল গাছটা। অনেক বর্ষার ধারা, বসন্তের বাতাস, গ্রীষ্মের দহন, শীতের কাঁপন এ গাছের শরীরে, পাতায় পাতায় অবারিত বয়ে চলেছে বছরের পর বছর। এর ডাল পাতার ফাঁকে ফাঁকে আলোয় ছায়ায় হাওয়ায় হাওয়ায় এক অদৃশ্য বন্ধনের সাঁকো তৈরি হয়েছে ত্রিকাল আর তেঁতুল গাছে এই পনের বছর ধরে।সারা বছর ধরে গাছটার ডালপালাগুলো হাওয়ার দোলে আপনমনে দোল খায় বলে মহাদেব ওর নাম রেখেছেন হিল্লোল।
    মহাদেবের এই সংসারে দুনিয়ার বিচিত্র সব পাগল চরিত্রের আনাগোনা।তারা আসে, দুচারদিন থাকে, তারপর উধাও হয়ে যায়। আবার হঠাৎ কখনও আবির্ভূত হয় ধূমকেতুর মতো। যেমন, গতকাল থেকে এখানে অধিষ্ঠান করছেন মোহন্ত বিরসানন্দ। তিনি সারা বছর হিমালয় পাহাড়ে অনেক উঁচুতে কোন আশ্রমে যেন বাস করেন। সেখানেই ব্যস্ত থাকেন তার পূজা পাঠ, জপ ধ্যান নিয়ে। প্রতি বছর বর্ষাকাল নাগাদ এই মহাদেব নিবাসে এসে উপস্থিত হন গমগমে গলায় ‘হরহর মহাদেব’ ধ্বনি তুলে। বিরসার উপস্থিতি এ বাড়ির সকলেই বেশ উপভোগ করে বলেই মনে হয়। মহাদেববাবু মহা উৎসাহে গঙ্গোত্রী যমুনেত্রী উত্তর কাশীর গল্পে মেতে ওঠেন। বিরসানন্দ কিন্তু পাক্কা সাধু একেবারে। রীতিমতো জটাজুটধারি শ্মশ্রুগুম্ফ আবৃতমুখ গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী। সাধু হলে কি হয় বিরসা কিন্তু দুনিয়ার হাল হকিকৎ সব কিছু জানে।সব খবর রাখে।
    সে পাহাড় পর্বতের অনেক কথা বলে।বিশেষ করে হিমেল শীতে পাহাড়ের রূপ বদল, পাহাড়ি মানুষের জীবনযাত্রার রঙ, ধরণ এইসব কথা অনর্গল বলে চলে বিরসা। মহাদেব এবং দীনবন্ধু দুজনই মনোযোগী শ্রোতা। ত্রিকালও স্থির হয়ে বসে থাকে। বিরসানন্দের কথা উপভোগ করে কিনা তা ঠিক ধরা যায়নি এখনও।
    বিরসা অবশ্য এক সপ্তাহের বেশি এখানে থাকে না।দিন চার পাঁচের পরই সে তল্পি গোটায়। তক্ষুণি অবশ্য পাহাড়ে ফেরে না সে। আবার অন্য কোন চরে গিয়ে তার নৌকো ভেড়ায়। দিন কয়েকের জন্য তরী ভেড়াবার ডাঙা তার জানা আছে বিস্তর। তা সে কোন সাধু সন্তের আশ্রম হোক বা আন্তরিক গৃহস্থের সংসার হোক। এইভাবে মাস দুই কাটিয়ে আবার রওয়ানা দেয় হিমালয়ের দিকে। কেমন মুক্ত বিহঙ্গের মতো জীবন।বিরসার পঞ্চাশ বাহান্ন বছর বয়েস হবে। রোগ ভোগ কাকে বলে জানে না। সামান্য কিছু হলেও তার নিজস্ব আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাতেই সেরে যায়। বিরসার সদানন্দময় মন, অনাবিল স্বচ্ছপ্লব শরীর।তাকে দেখে মনেই হয়না মানুষের জীবন এত কন্টকাকীর্ণ, বেদনাক্লিষ্ট।স্বচ্ছতোয়া নদীর মত আপন বেগে বহমান জীবন। অর্থের ভাবনা তার নেই।বিশ্বপ্রকৃতির হাতে নিজেকে সমর্পণ করে বসে আছে পরমানন্দে। ‘যে খায় চিনি, যোগায় চিন্তামনি’-র সারবত্তা তার মতো আর কটা মানুষ বুঝেছে।
    ত্রিকাল দাঁড়িয়ে ছিল বারান্দার সামনে। হিল্লোলের থেকে সাত আট ফুট দূরে। সিরসির করে পুবে হাওয়া বইছে। মাঝে মাঝে দমকা ঝাপটা মারছে তেঁতুল গাছের ডালে। হিল্লোল থেকে থেকে ওই উঁচুতে তার ছটফটে ডালগুলোকে মাঝে মাঝে নুইয়ে দিচ্ছে সামনের দিকে। দেখে মনে হচ্ছে যেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ত্রিকালকে হাতছানি দিয়ে কাছে আসতে বলছে। ত্রিকাল রোবট হলে কি হয়, তার সেনসরি চিপস একেবারে অন্য ধাঁচের। ত্রিকাল মহাদেববাবুর এক অনুপম সৃষ্টি।একথা সারা তল্লাটের লোক জানে। মানুষের সেনসরি নিউরনের থেকে বহুগুন বেশি শক্তিশালী। গাছের ভাষা মানুষ বোঝে না ( কেউ কেউ বোঝে অবশ্য, যেমন বিরসা মোহন্ত ) কিন্তু ত্রিকাল বোঝে। সে তার নিজস্ব দুলকি চালে এগিয়ে যেতে লাগল হিল্লোলের দিকে। এইসময়ে পাঁচিলের গেট খুলে দীনবন্ধু ঢুকছিলেন।তিনি দেখলেন ত্রিকাল পাঁচিলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা তেঁতুলগাছটার একদম গায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপর ডান হাতটা তুলে হিল্লোলের কান্ডে হাত বোলাতে লাগল। কাকতালিয় ব্যাপার কিনা কে জানে, গাছটার ডালপালা বাতাসে লুটোপুটি খেতে লাগল।ত্রিকালের ব্যাপারে অনেক অভিনব ঘটনার সাক্ষী থাকলেও দীনবন্ধু এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখেননি এ বাড়িতে। দুই অমানবের সংস্পর্শজনিত প্রতিক্রিয়া দৃশ্য দেখে দীনবন্ধুর মনে বিদ্যুচ্চমকের মতো ঝলসে উঠল একটা চিন্তা। এটা সত্যিই যদি কোন গ্রাহ্য পারস্পরিক বিক্রিয়া হয় একটা রোবট আর একটা বৃক্ষের মধ্যে, সেটা তা’লে কি ধরণের বিক্রিয়া— রাসায়নিক, বৈদ্যুতিক, না পারমানবিক !
    যতক্ষণ না তিনি মহাদেবের সঙ্গে কথা বলতে পারছেন ব্যাপারটা নিয়ে ততক্ষণ তার শান্তি নেই।
    খানিকক্ষণ পরে তেঁতুলের ডালে হাওয়ার লুটোপুটি থেমে গেল। হিল্লোল আবার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল এবং নীচের দিকে দুটো সরু ডাল ধীরে ধীরে বেঁকে গিয়ে ত্রিকালকে বেড় দিয়ে ধরল। প্রায় পঁচিশ সেকেন্ড ওইভাবে রইল ডাল দুটো। তারপর আবার আস্তে আস্তে সোজা হয়ে গেল। ত্রিকাল তার হাত সরিয়ে নিল গাছের গা থেকে, তারপর আবার ডাঁয়ে বাঁয়ে হেলেদুলে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। চমকপ্রদ এই দৃশ্য দেখে দীনবন্ধুবাবু বিষ্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

    এ বাড়ির পাঁচিলের ধারে রাস্তা। রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি দুটো কৃষ্ণচূড়া আর একটা রাধাচূড়া গাছ।রাস্তা আলো হয়ে থাকে লাল আর হলুদ রঙা আগুনে, শীত ফুরিয়ে বসন্ত ঢুকলেই। এই বর্ষা দিনেও গাছের তলাটা লাল আর হলুদে মাখামাখি।
    বিরসানন্দ মোহন্তর পূর্বাশ্রমের নাম ছিল শিবনাথ। বিরসানন্দ নামটা কে দিল কে জানে। মানে কি নামটার ? যার রস নেই সেই তো বিরস। কিন্তু ও কি সত্যিই তাই ! যাই হোক, নাম যা হোক একটা হয়েছে।
    বসিরহাটের দিকে দন্ডিরহাট বলে একটা গ্রাম আছে। আজ সে গাঁ আর গাঁয়ের মতো নেই। শহর বনে গেছে।একসময়ে ছিল ছবির মতো একখানা গ্রাম। গাছগাছড়ার বুনো গন্ধে ভরা মাটির গাঁ। ফুরসৎ পেলেই শিবনাথ ঢুকে পড়ত মামারবাড়ির পিছন দিকের যে জঙ্গলটা ছিল সেখানে। দিনের বেলাতেও আবছা আলো ওখানে। কি না গাছ আছে ওখানে।আম জাম আতা জামরুল ছাড়াও আশ শ্যাওড়ায় ভর্তি। ভেতরে অনেকটা জায়গা। কেমন বুনো গাছপালার গন্ধ। বাইরে থেকে সড়সড় করে হাওয়া বয়ে আসছে মাঝে মাঝে। আবার একটু পরেই হাওয়া টাওয়া কিচ্ছু নেই।থম ধরে আছে নিস্তব্ধতা।শিবনাথ আপনমনে ঘুরে বেড়ায় ওই ছমছমে বুনো গন্ধ মাখা আবছা আলো ভরা জঙ্গলের মধ্যে। শিবনাথের মনে হয় গাছগুলো যেন তার সঙ্গে কথা কইছে। প্রতিটি গাছের সঙ্গে তার যেন জন্ম জন্মান্তরের দোস্তি। ওদের পাতা পত্তরের মধ্যে দিয়ে যখন ওই পুবের বিলের দিক থেকে আসা খোলা হাওয়া বয়, শিবনাথের মনে হয় গাছগুলো যেন ডাল নেড়ে নেড়ে তাকে কাছে ডাকছে। শিবনাথের মাঝে মাঝে মনে হত সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে। কোন কোন গাছের গায়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে সে আপনমনে কথা বলত। তার মনে হত গাছগুলো তার কথা সব বুঝতে পারছে।

    একদিন বড়মামা মারা গেল। ছেটমামা বাড়িটা নগেন্দ্র চক্রবর্তীর হাতে তুলে দিয়ে দিদিমাকে নিয়ে বসিরহাটে চলে গেল। নগেন্দ্রবাবু বাড়িতে তালা মেরে দিল। কিন্তু পিছনের জঙ্গলটা তো থেকেই গেল। শিবনাথ স্কুল ছুটির দিনে ওর ভিতরে গিয়ে একা একা ঘুরে বেড়াত। শিবনাথ কাউকে কখনও বলেনি এসব কথা। তার কোন বন্ধুকেও কোনদিন নিয়ে যায়নি জঙ্গলের ভেতরে।শিবনাথ জানে, সঙ্গে কেউ থাকলে সে বকবক করবে। নীরব মৌন জঙ্গলের মধ্যে তার একাত্মতা চুরমার হয়ে যাবে।সে কাউকে নিয়ে যায় না। তবে গাঁয়ের লোক অনেকেই যায় মাঝে সাঝে। আম জাম জামরুল পাড়তে। সাপখোপের ভয়ে তেমন কেউ অবশ্য পা বাড়াতে চায় না ওর মধ্যে। শুধু দিনরাত বুনো গন্ধ মেখে বসে থাকে রহস্যময় নীরবতা। আর থাকে শিবনাথ।
    শিবনাথের বাবা কলকাতায় রেল অফিসে চাকরি করত। বহু বছর ধরে মেস বাড়িতে জীবন কাটিয়েছে।প্রতি শনিবারে দন্ডিরহাটে ফিরত।আবার সোমবারে রওয়ানা দিত। পরে আর পেরে উঠছিল না।গ্রামে বসবাসের পাঠ চুকিয়ে দিয়ে পাকাপাকি কলকাতায় আস্তানা গাড়ল মানিকতলার দিকে।
    গাঁ ছাড়ার আগের দিন শিবনাথ ওই জঙ্গলে গিয়ে ঢুকল শেষবারের মতো। তার পরম বন্ধু গাছগুলোর গন্ধমাখা হাওয়া সারা শরীরে মেখে নিতে লাগল, ওদের জড়িয়ে ধরে ফুসফুস বোঝাই করে ভরে নিতে লাগল সে মধুর ঘ্রাণ।
    তারপর কত দিন গেল, মাস গেল, বছর গেল ..... শিবনাথ একসময়ে ঘরসংসার ছেড়ে বিবাগী সন্ন্যাসী হল।বিরসানন্দ হল। কিন্তু সেই আশশ্যাওড়া ভরা জঙ্গলের গন্ধ স্নায়ুর সুতোয় জড়িয়ে রইল সারা জন্মের মতো।

    দীনবন্ধুর কথা শুনে মহাদেব বললেন, ‘ এতো দারুন কথা শোনালে দীনু ! এ গ্রেট রেভেলেশান ..... আমাদের আগেই বোঝা উচিৎ ছিল যে ত্রিকালের সেনসরি চিপসে নন মেকানিক্যাল ইমোশান ডেভেলাপ করতে পারে। প্ল্যানট অ্যান্ড ট্রি আর দি ইনএক্সট্রিকেবল পার্ট অফ আওয়ার লাইফ। প্রপার কমিউনিকেশান যে হচ্ছে এটা দারুন আশাব্যঞ্জক ব্যাপার।’
    দীনবন্ধু বললেন, ‘ ত্রিকালের দিককার ব্যাপার নয় বুঝলাম, কিন্তু হিল্লোলের রিঅ্যাকশানটা কিন্তু এক্সট্রীমলি এসোটেরিক.... রহস্যময়। অবশ্য আমার অবসার্ভেশানে ভুল থাকতে পারে। আমি কিন্তু বেশ নাড়া খেয়ে গেলাম ব্যাপারটা দেখে।’
    — ‘ আচ্ছা, আমি একটু দেখি ব্যাপারটা। তারপর বিশ্লেষণে বসব। তবে তোমাকে যখন নাড়া দিয়েছে সামথিং মাস্ট বি দেয়ার অ্যাট দি বটম।’

    দুপুর দুটো। ত্রিকাল তার নিজের আর্মচেয়ারে বসে আছে। তার ঘরের জানলা দিয়ে রাস্তার ওদিকে কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া গাছগুলো দেখা যাচ্ছে। আজ মেঘলা আকাশ। ত্রিকাল স্থির দৃষ্টিতে জানলা দিয়ে গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। তিনটে লোক গাছগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে কি সব আলোচনা করছে।একজন একটা মাপ নেওয়ার ফিতে বার করে রাধাচূড়া গাছটায় বেড় দিয়ে মাপ নিতে লাগল। তারপর কৃষ্ণচূড়া গাছ দুটোরও মাপ নিল।তারপর আবার নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে লাগল।
    শিবনাথ, মানে বিরসা সামনের বারান্দায় বসে ঘুমে ঢুলছিল। পাহাড় থেকে নীচে নেমে এলে দুপুরবেলা ভাত পেটে পড়লেই কেমন ঢুলুনি আসে। কিন্তু দিনের বেলায় ঘুমনো তার স্বভাববিরুদ্ধ কাজ। সে জোর করে জেগে বসে থাকে। তার চোখে পড়ল তিনটে লোক রাস্তার ওদিকে গাছগুলোর নীচে দাঁড়িয়ে কি সব বলাবলি করছে। বিরসানন্দের বুকটা ছাঁত করে উঠল। তার স্নায়ুতন্ত্রের কোষে কোষে সেই বাল্যকালের আশশ্যাওড়া জঙ্গলের বুনো গন্ধ খেলে বেড়ায়। সে বুঝতে পারল এরা কোন কাঠ ব্যবসায়ীর লোক। সে উঠে গিয়ে রাস্তার এদিকে গাছগুলোর সামনাসামনি দাঁড়াল। বিরসা জানে গাছেরা সব বোঝে। সে অনুভব করতে লাগল গাছগুলোর শরীর থেকে এক বিদ্যুৎ শিহরণ উৎসারিত হচ্ছে। ওটা ভয়ের শিহরণ। বিরসা গাছের সংসারে ঘর করা লোক। সে জানে, তারা বিপদ আগাম আন্দাজ করতে পারে। তাদের ভিতরকার সে কম্পন ইথারে প্রবাহিত হয়ে বিরসার স্নায়ুতে এসে মিশতে লাগল।
    বিরসা রাস্তা পেরিয়ে ওপারে গেল। উৎকন্ঠা চেপে রাখতে না পেরে লোকগুলোকে জিজ্ঞেস করল, ‘ কি জন্যে মাপছেন ভাই ? কিছু হবে নাকি ..... এমনি ?’
    লোকগুলো সৌম্যদর্শন জটাজুটধারি সাধু দেখে ভয়ে হোক ভক্তিতে হোক একটা জবাব দিল, ‘ ওই সুজিতবাবুর লোক আমরা। মাপতে বলেছে। আর কিছু জানি না। আমরা পবিত্র কন্ট্রাকটারের আন্ডারে আছি চেয়ারম্যানের পারমিট আছে।’
    বিরসা আন্দাজ করল চেয়ারম্যান মানে মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান।
    ‘ ঠিক আছে ঘোষ চল.... মোটামুটি তো হয়ে গেল। পরশুদিন নয় কাজ শুরু করা যাবে।’ লোকগুলো ফিতে টিতে গুটিয়ে নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে চলে গেল।
    বিরসা অনুভব করতে লাগল গাছগুলোর আগা থেকে গোড়া তীব্র বিদ্যুৎ শিহরণ ওঠানামা করছে। বিরসা এক একটা গাছকে ছুঁয়ে ওগুলোর কান্ডে হাত বোলাতে লাগল। তাতে ওদের শরীরে শিহরণের বেগ ক্রমশ কমে আসতে লাগল। শিবনাথের মাথায় রাধাচূড়া এবং কৃষ্ণচূড়ার ফুল ঝুরঝুর করে পড়তে লাগল।
    পরদিন সকাল। মহাদেব আর দীনবন্ধু তেঁতুলগাছের তলায় বসে চা খাচ্ছেন। ত্রিকাল গাছটার আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছে। অনুপমা তৈরি হচ্ছে স্কুলে যাবার জন্য।এক্ষুণি বেরিয়ে যাবে।
    বিরসা ওঠে ভোরবেলায়। উঠে জপ ধ্যান ও নানারকম যোগাসন করে। সে সব প্রক্রিয়া সেরে এখনও বাইরে আসেনি। তেঁতুলের ডাল মেঘলা হাওয়ায় দোল খাচ্ছে।
    দীনবন্ধু এবং মহাদেব দুজনেই লক্ষ্য করলেন ত্রিকাল মহীরুহসম হিল্লোলের কাছে গিয়ে ওপরের ডালগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে মুখ তুলে। তেঁতুল গাছের সঙ্গে ওর যেন কোন বার্তা বিনিময় হচ্ছে। দেখা গেল এই সাতসকালে ওপারের লাল হলুদ ফুলের গাছগুলোর নীচে সেই তিনটে লোক এসে দাঁড়িয়ে আছে। আর উল্টোদিকে মহাদেবদের বাড়ির পাঁচিলের ধারে দাঁড়িয়ে আছে একটা ম্যাটাডোর ভ্যান। তাতে রকমারি গাছ কাটার যন্ত্রপাতি। গাছগুলোর কান্ডে এবং শাখা প্রশাখায় তীব্র শিহরণ শুরু হল। সে শিহরণের অভিঘাতে হিল্লোলের মাইটোকনড্রিয়ায় উথাল পাথাল তরঙ্গ প্রবাহিত হতে লাগল তার বহুদিনের বন্ধুদের সম্ভাব্য বিপদ আন্দাজ করে। এ ঘটনাক্রম এবং বৈদ্যুতিক অনুরণন আর কেউ বুঝতে না পারুক ত্রিকাল কিন্তু আঁচ পেয়ে গেল। তার মাইক্রো সেনসরি সার্কিটে ভীষণ কম্পন তৈরি হচ্ছে। ত্রিকাল বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
    ইতিমধ্যে শিবনাথের আশৈশবলালিত উদ্ভিদ সম্পৃক্ততা তাকে ধাক্কা মারল। সে তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল তার আসন ছেড়ে। তড়িঘড়ি বাইরে বেরোতে গিয়ে ত্রিকালের সঙ্গে বিরসার মুখামুখি দেখা হয়ে গেল। ত্রিকাল তাকেই ডাকতে আসছিল। কি আশ্চর্যের ব্যাপার। যেভাবে বালকরা অভিবাবককে ডাকতে আসে নিজে বিপন্ন বোধ করলে। ভাবল, মহাদেববাবুর ত্রিকাল এত বোঝে !
    দুজনে যখন বাইরে এল অনুপমা তখন গেট খুলে রাস্তায় বেরোতে যাচ্ছে। সে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। মহাদেব এবং দীনবন্ধুবাবুও চায়ের টেবিল ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠেছে।
    ত্রিকাল যেন বিরসা ছাড়া আর কাউকেই চেনে না এই মুহুর্তে। কি অদ্ভুত ব্যাপার !
    বিরসানন্দ সোজা তেঁতুলগাছ হিল্লোলের কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে নাক ঠেকিয়ে গভীর শ্বাস নিতে লাগল।
    তিরিশ চল্লিশ সেকেন্ডের মধ্যে বিশাল দেহের মহীরুহ হিল্লোলের প্রকাণ্ড ভারি মাঝামাঝি জায়গা থেকে কান্ডের একটা শক্তিশালী অংশ ভয়ংকর শব্দে ভেঙে পড়ল একদম ম্যাটাডোরটার ওপর। গাড়িটা দুমড়ে গেল একেবারে। ওধারে কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়ার নীচে দাঁড়িয়ে থাকা লোক তিনটে ছুটে পালিয়ে যাচ্ছে নিরাপদ দূরত্বে। চারপাশ থেকে লোকজন ছুটে আসছে। শোনা গেল কোন অনিবার্য কারণবশত: মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান গাছ সাফাই কর্মসূচি বাতিল করে দিয়েছেন। ভয়ে না ভক্তিতে ঠিক জানা নেই। তাতে অবশ্য গাছ তিনটের পিছন দিককার বাড়িগুলোর বাসিন্দাদের ভীষণ মুখ ভার হয়েছে। তাদের নাকি আলো হাওয়ার খুব অভাব হচ্ছে গাছ তিনটে আড়াল করে থাকায়।

    সেদিন সন্ধেবেলায় মহাদেব এবং দীনবন্ধুকে খুব সিরিয়াস আলোচনায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল ত্রিকালকে নিয়ে। বিরসা বোধহয় আগামীকালই বিদায় নেবে এ বাড়ি থেকে। কোনরকম মায়ার বাঁধনে সে থাকতে চায় না। তা সে, গাছই হোক, মানুষই হোক আর রোবটই হোক।

    ************************************************

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন।