*
ওই যে মেয়েটা হেঁটে গেলো, আমি ওরই মতো
যুবতী ছিলাম, ভালোবেসেছিলাম পুরুষের লাল চামড়া,
ঘামের গন্ধ, নীল অট্টালিকা, শীতের সকালে ঘুঘুর ওড়াউড়ি;
ওরই মতো স্তন ছিলো আমার, সন্তান ছিলো, বিপুল দুধভাত ছিলো,
ভেবেছিলাম মৃত্যুর পরও ওই স্তন, ওই সন্তান, ওই ফুল, ওই দুধভাত,
ফিরে পাবো একদিন; কারণ চেষ্টার কমতি করিনি, আর তারপরও
আজ যখন আমার নিতম্বে কালো কর্কশ পোকার মোচ্ছব বসেছে,
ঝুরি ঝুরি জঙ্ঘা, নাভি, স্তন; আমি লক্কড়-ঝক্কড়, ডালপালা হয়ে পড়ে আছি,
আর স্বর্গ-নরক হয়ে গেছে অবান্তর, টিকিট কিনেও কোথাও যেতে পারছি না,
তখন, ওই যে মেয়েটা হেঁটে গেলো, আমি ওরই মতো
আরেকবার মাংস হতে চাই, যোনি হতে চাই, স্বল্প আর মিথ্যে হতে চাই,
আর ছাদে উলঙ্গ দাঁড়িয়ে থেকে দেখতে চাই শীতের সকালে পাখির খুঁদ খুঁটে খাওয়া,
আর পুরুষ, আর হিংস্রতা, আর উজ্জ্বল, বলবান, লাল চামড়া, আর শৃঙ্গার, আর সঙ্গম!
*
আমরা মরে গেলে
সম্ভবত পাগল হ’য়ে যাই;
যাকে নিয়ে একটা কফিন পর্যন্ত হাসাহাসি করে;
আর ঠাট্টা করে তারই পার্থিব, অপার্থিব স্মৃতি;
এমনকি পোকারাও টিটকারি করে, ‘দেখো, পাগলের ধুম,
জানোয়ার, দেখো, জলকাদা আয়নায় ভালো করে মরা মুখ দেখো..’
অথচ সে কাউকে কিছু বলে বলতে পারে না,
আমরা কাউকে কিছু বলতে পারি না,
কারণ সে অধিকার আজ আমাদের নেই;
আমরা, যারা মরে গেছি,
অট্টহাসির শব্দে কান ফেঁটে যাচ্ছে আমাদের,
যে অট্টহাসি আমাদেরকে নিয়েই- অথচ আমরা বুঝতে পারছি না,
কেনো, কী করেছি আমরা, কী ব্যর্থতা আমাদের, কী এমন অপরাধ?
আমরা কখনো রাতে ঘুমাতে পারিনি,
বেঁচে থাকার এক ফোঁটা শান্তিও অনুভব করিনি কখনো,
কখনো ভালোবাসতে পারিনি,
অতএব মনে করেছিলাম কিছুটা করুণার আমরা যোগ্য,
অথচ মরে যাওয়ার পর
আমরা দৃশ্যতঃ পাগল হয়ে গেলাম,
ছটফট করতে লাগলাম, বিড়বিড় করে বকতে লাগলাম আপন মনে,
‘কবরের চেয়ে ভালো কোনো জায়গা আছে?
নাকি আগুনে পুড়ে ভস্ম হওয়া উচিত ছিলো আমাদের?
নাকি শ্রেয় হতো লবণের খাদ্য হয়ে নির্মম সমুদ্রে ভেসে গেলে?
স্বর্গে গেলাম না, আবার নরকেও নিয়ে যাওয়া হলো না আমাদের,
যে কবর, সেই কবর, যে মাটি, সেই মাটি, যে জগৎ, সেই জগত, সেই অতীত,
আহা, শুয়ে শুয়ে পিঠে ফোঁসকা পড়ে গেলো আমাদের;
আর অট্টহাসির শিকার হতে হলো,
কারণ আমরা স্বর্গে যেতে চেয়েছি,
নরকে যেতে চেয়েছি,
পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথাও যেতে চেয়েছি,
জানতাম না মাটির নিচে এসব উচ্চমানের পাগলামি বলেই বিবেচিত হয়,
জানতাম না পরলোক এতো হীন, এতো একঘেয়ে, এতো শূন্য, এতো বিকৃত;
অতএব নাকে খত দিয়ে হাজার হাজার বছর শুয়ে থাকতে হলো আমাদের
বাসি হাড়গোড় আর পার্থিব, অপার্থিব সাড়ে তিন হাত স্মৃতি হয়ে,
আহা, আমরা, এক দল মৃত, ধিক্কার আর শূন্যতায় জর্জর হতে লাগলাম,
মরার পরও ব্যর্থ মনে হতে লাগলো নিজেদের,
এখানে আসার আগে হয়তো জেনে আসা উচিত ছিলো:মরে গেলে
আমরা একদমই পাগল হয়ে যাই।
*
লাল চামড়া লালই আছে, শুধু সে-ই নেই;
আমার আদেহ-মন উর্বর চুম্বনে ভরে দিয়ে
জানি না সে পাশের কবরে শুয়ে শুয়ে আজ কতো কিছু ভাবে;
একদা পাথর ছিলো আমার হৃদয়, মনে পড়ে,
কোনো কোনো দিন তার চুম্বনের উত্তর করিনি;
বীজের উদ্যম নিয়ে কোনো কোনো ঋতু চলে গেছে;
আজ আমি অজস্র আজান শুনি, কলতান শুনি, মেঘ ডাকে,
মহাশব্দ শুনি; আমি নেই আজ, সে-ও নেই, উত্তর পুরুষ
শুধু আছে; মন চায়, আবার কখনো ফুল, সন্তান, প্রাণ,
মেলা, মধুমেলা নিয়ে তার কাছে যাই, তার বুকে,
অমৃত নিতম্বে, স্তনে চুমো খাই; মাংসে মাংস ফেলি;
অতঃপর, নবজাতকের কান্না, বৈশাখের নগদ বৃষ্টিতে
বিবিক্ত আজান: মালিকের কাছে দুই হাত তুলে বলা:
তাকে মুক্তি দাও; মাটি, প্রার্থনা করি, হায় পোকা, তাকে দেখে রেখো।
*
ঘুমিয়ে রয়েছো, পৃথিবী?
ভূতের মতো আমি চরে বেড়াচ্ছি তোমার ঘুমন্ত মুখ,
লালার জোৎস্না আর গালের দুর্গন্ধের মধ্যে-
আজ রাতে এই ছাদ হয়ে উঠেছে বিশাল, সবুজ প্রান্তর,
ঈশ্বরের দুর্গম আত্মার মতো, পৃথিবী;
অবশ্য আমার ঘুমানো উচিত, আর
ঘুমের ঊর্ধ্বে যা কিছু, ঘুমানো উচিত তাদেরও;
এই ভূতের মতো উত্তাল, সংক্রামক পায়চারির চেয়ে
যে কোনো পাপ শ্রেয়; যে কোনো বিধান আমি মেনে নিতে রাজি
তোমার মতো স্থির, সুনসান হয়ে যাওয়ার জন্য;
ঘুমিয়ে রয়েছো, পৃথিবী?
এতো রাতে, ছাদের নিস্তারহীন নির্জনতায়,
ভাবলেশহীন, ঘুমিয়ে পড়েছো, পৃথিবী? এতো সহজেই?
*
এই চিলেকোঠায় যে থাকে,
হিংসা করি, হিংসা করি তাকে;
হয়তো সে প্রভূত উদ্ধার
পেয়ে গেছে শান্ত জানালায়;
হয়তো সে যাবতীয় ভুল
শুধরে নিয়েছে অবজ্ঞায়;
আমি তাকে কখনো দেখিনি,
সে-ও হয়তো আমাকে চেনে না,
কেউ হয়তো তার সুখে সুখী,
আমি নই, আমার সাজে না;
বদ্ধ যে প্রাণ, বশংবদ,
পড়ে গেছি তারই পচা পাকে;
হিংসা করি, হিংসা করি তাকে,
এই চিলেকোঠায় যে থাকে।
*
কানের মধ্যে যেনো শত শত পোকা-
আগে সন্দেহ হতো, আজ প্রকৃতই;
সবচেয়ে হীন আমি, মরেও বিকট এক শয়তানের মতো
যাযাবর, বড়ো তাড়াতাড়ি চলে এসেছি বলেই হয়তোবা;
কিছু নেই, ভয় নেই, আবার আহ্লাদও নেই;
আমার শূন্যতা তবে পরিশেষে সত্যিকার হলো;
আমি যে কে, সে-ই; সেই ঘুঘু, শীতের সকালে সেই
উলঙ্গ মেয়েকে দেখে খুঁদ খেতে খেতে স্বপ্নচর্চা করা ঘুঘু;
ঘোর অসময়ে চলে এসেছি বলেই এখনো তো
ভুলিনি কী জাত আমি, শরীরের পরিপাটি হাড়ে
সতেজ মাংস লেগে আছে থোকা থোকা,
এখনো অমর, তবু আজীবন রক্তে ছিলো শত শত ধোঁকা!
*
কোনো না কোনো হাতে সবাই ধরাশায়ী।
হোক সে ব্যাথা হোক ফুল কী চিৎকার
হোক সে রূপসীর ভোরের গয়না,
আজকে যার গায়ে ভীষণ জোর আছে,
সে-ই ফিরে পাবে দখলিস্বত্ব;
সে-ও তো চায় তার আঙুলে ক্ষয় হোক,
গোলাপ কাঁটা হয়ে অগাধ ব্যাথা দিক,
সে-ও তো স্বপ্নের ফিল্মি-কৌতুকে
কিছুটা স্বাদ পায় মাতৃগর্ভের;
কিছুটা গর্ভে কীইবা আসে যায়?
হোক সে নাগরিক বাতিল ভ্রম তার,
হোক সে স্রেফ রতিদৃশ্যে ব্যস্ত;
কোনো না কোনো রাতে সে-ও তো নিদ্রার
অলীক বাহুপাশে সমূলে ন্যস্ত!
*
আমি সহজেই ঝরে গেছি, ওরা কেউ
ভাবেনি আমার কথা, একদলা গোবর যেমন
পায়ে পায়ে ঘোরে, ওইভাবে হারিয়ে গেলাম স্রেফ,
কেউ কোনো খোঁজও নিলো না। শুধু একদিন,
হাত-বদলের পরে, মনে পড়ে, ওরা কেউ
রক্তাভ আদর নিয়ে আমাকেও স্পর্শ করেছিলো;
আমি রাস্তার ফুল, সম্ভ্রমের স্বপ্ন দেখি না,
তবে সেই দিন, সেই কিছুক্ষণ, মনে হয়েছিলো, আছি,
সারবত্তাময়, জ্ঞাত, সবার মতন বেঁচে আছি!
তারপর, যেমন হয়, হলো। চিরকাল
ধরে রাখবে না, জানতাম; গেলো, ফেলে চলে গেলো;
দিনে দিনে, সঙ্গমে সঙ্গমে, ফুলে ফুলে,
নিজেদের কাছে ওরা নিজেরাই তুচ্ছ হয়ে গেলো;
তবু, সেই কিছুক্ষণ, আমি জানি, এখনো আমাকে ওরা ভুলতে পারেনি!
*
হে চিৎকার, প্রসন্নতা, হে প্রসঙ্গ,
আক্রমণ কোরো না আমাকে,
আমি তো ছবির মতো পড়ে আছি, শুয়ে আছি,
নিঃসাড়, নিঃসঙ্গ, অনেক দিনের বিবিধ স্বপ্নের কাছে পরাভূত,
উঠে দাঁড়াতে পারছি না, কারণ আমার পা, আমার হাঁটু,
এমনকি আমার উঠে দাঁড়ানোর ইচ্ছা পর্যন্ত উধাও হয়ে গেছে,
হে উলঙ্গ, হে প্রচ্ছন্ন, হে উন্মাদ হতে চাওয়া অসীমতা,
আমার জীবনে আবির্ভূত হয়ো না তোমরা কেউ!
এক অতিকায়, হীন দোটানায় পড়ে গেছি আমি,
এই শামুকের মতো ধীর অস্তিত্ব হঠাৎ ভেঙেচুরে টুকরো টুকরো
আর ধারালো, আর সুচোলো হয়ে ঢুকে পড়ছে মানুষের সীমানায়,
আমি নিজেকে উৎপাটন করে নিতে চাই,
নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাই,
যেমন ব্যর্থ মালো জাল গুটিয়ে নেয় ঘোলা জল থেকে;
আমাকে বিরক্ত কোরো না,
হে সন্তান, হে নিষাদ, হে রুগ্ন প্রাণের ব্যাপক আহ্লাদ, হে উল্লাস!
আমি অনেকের চেয়ে উন্মাদ,
অনেকের চেয়ে শান্ত;
অনেকের চেয়ে পুরুষ,
অনেকের চেয়ে নারী;
কোনো একক, নিঃস্ব, পরম, রুদ্ধ, শূন্য হতে চাই না আর,
এতো কেঁদেছি যে কান্নারও আমার ওপর ঘেন্না ধরে গেছে;
এতো হেসেছি যে জানোয়ার হয়ে যেতে মন চায়, যারা হাসতে পারে না;
এতো একা থেকেছি যে নিঃসঙ্গতা আমাকে বমি করে ফেলে দিতে চায়;
হে শূন্য, হে চরম, হে অলাতচক্র, হে ধ্বনি,
অজস্র আধো-ইচ্ছা, তারও অজস্র অতি-ইচ্ছার মধ্যে
আমি নিজেকে খুইয়ে ফেলেছি;
আমি প্রায় আমাকে না নিয়েই চলাফেরা করি ইদানীং,
বিশেষ হতে চাই না, সম্পন্ন হতে চাই না, বিশুদ্ধ হতে চাই না,
হে নিজ, হে অপর, হে ইহজীবন, হে জাতিস্মর আত্মভ্রম,
মরে যাও, মরে যাও, মিলে যাও একে অন্যের মাঝখানে!
হে সমুদ্র থেকে দেখা মাটি,
হে মাটির উপর দাঁড়িয়ে দেখা সমুদ্র,
মিলে যাও, মিলে যাও, জীবনের গর্ভে নুন ঢালো,
ফুলকে ফুল হতে দাও, কচ্ছপকে কচ্ছপ;
হে তিমি, হে বিশ্ব, হে ভালুক, হে অবিশ্ব,
কেউ কাউকে করুণা কোরো না,
কেননা হত্যার চেয়ে করুণা নৃশংস,
হে কল্পনা, হে জল্পনা, হে টুকরো, হে টুকরো, হে জল, হে জ্যান্ত,
হে প্রগাঢ় আমি, হে হত্যা, হে নীল নির্মম তপোবন,
হও লালসা, হও জানোয়ার, হও ঘন, হও শীতল, হও উষ্ণ!
আমি একটা ছবির মতো ধুঁকে ধুঁকে মরছি,
আর অস্বস্তি বোধ করছি চারিদিকের উজ্জ্বল, বাঁচাল চলচ্চিত্রের মধ্যে;
আমি বিবিধ স্বপ্নের ঘন জরায়ুতে খুঁজে পেয়েছি অজানা, অচেনা সন্তানের স্পৃহা;
যেকোনো ব্যর্থ মানুষের মতো বাসি রুটি আর পানপাত্র হাতে
আমি কাটিয়ে দিতে চাই এই অলৌকিক জীবন, এই মৃত যৌবন,
আর কিছু ছিঁড়তে চাই না,
আর কিছু খুঁড়ে দেখতে চাই না,
হে চিৎকার, প্রসন্নতা, হে চিহ্ন, হে ফানুস, ফোয়ারা,
আক্রমণ কোরো না, নিকট হয়ো না,
শুয়ে থাকতে দাও আমাকে এই জীর্ণ, শূন্য অস্তিত্বের বীভৎস কুঠুরিতে,
হে আত্মা, হে হত্যা, হে জীবনচরিত,
মুছে দাও আমাকে, ভুলে যাও, ভুলিয়ে দাও, ভুলিয়ে যাও,
সম্পূর্ণ কোরো না, সুস্থ কোরো না, বিশুদ্ধ কোরো না,
আমি সুচের উপরে দাঁড়িয়ে আছি, শুয়ে আছি করাতের পালঙ্কে পা তুলে,
টুকরো টুকরো, কালো কালো, দীর্ঘ, বিবশ, বিনত; অস্তিত্বের দুরূহ গর্ভে বিতাড়িত।
*
মুহুর্মুহু নারীচিত্র। ঘুমাবো কী করে শীতরাতে?
যেসব আধোয়া মুখ বাতিল হওয়ার পরও আজো
ঘুমের আগের স্বপ্নে ওহী হয়ে নামে- কী উপায়ে
তাদের দখল থেকে ত্রাণ পাবো- সে কিছু জানি না।
ওরা বেশরমভাবে আমার ঘাড়ের রুক্ষ ঘাসে
চুমো খায়, ঢলে পড়ে, চাখে, কাঁদে শীৎকারে শীৎকারে:
আমি কান পেতে শুনি; আমার কানেও দু’টো চোখ ফোঁটে,
ফক্কিকার দেখে; আমার ঘাড়েও কিছু জিহ্বা জন্ম নেয়,
খায় তীব্র, সকাতর রস; ভাসে আমার শরীর
তাদের শরীরে; আমি তাদের শরীর হয়ে নিজের ভেতরে ঢুকি,
লুব্ধ হই, ভালোবাসি, ঘুম আসে, ঘুম চলে যায়;
উঠে বসি; নিচে যাই; লক্ষণ ঘোষের ছানা খোলা কিনা,
দেখি, টিএসসির গাড়ল বাগানে দু’টো সাপের খুনসুটি;
আহা, নারীচিত্র, আহা, তোমাদের বিজন কোমরে
মাদুলির মতো ঝুলে যেতে যদি পারতাম, আহা!
প্রভূত খটকা ঠিকই লেগে আছে আখোলা ব্লাউজে!
আহা, নারীচিত্র, আহা, নিঃসঙ্গ সাপের মতোই আমি
হা-হুতাশ রোধ করে তোমাদেরই সবিশেষ, অলজ্জ আনন্দে কেঁপে উঠি।
*
মিথ্যের বাহাদুরি, শুনি, দীর্ঘ হয় না;
আয়না, আমি মিথ্যে দেখার কমতি করিনি;
উলঙ্গ দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি উলঙ্গ মিথ্যেকে;
সুন্দর দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি সুন্দর মিথ্যেকে;
ক্লান্ত দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি ক্লান্ত মিথ্যেকে;
আজ আমি মরে গেছি, আয়না, মৃত্যু আসছে
একের পর এক উড়ে, ডালে ডালে, আমার ভেতরে
পাতায় পাতায় নামছে, মিথ্যের মতো উলঙ্গ,
মিথ্যের মতো সুন্দর, মিথ্যের মতো ক্লান্ত;
আয়না, আমি এমন এক চিড়িয়াখানায় ঢুকেছি,
যেখানে খাঁচায় বন্দী মিথ্যে, খাঁচায় বন্দী আয়না,
আর আমি দর্শক, শুধু হাসছি, আর হাসছি, আর হাসছি।
*
অন্ধকারহীনভাবে বাঁচা অসম্ভব। এর চেয়ে
দীর্ঘ প্রবাসে থাকা ভালো, আত্মপর ভুলে গিয়ে,
স্বপ্ন খেয়ে, স্বপ্নত্যাগ করে; ভোরবেলা চোখে ঠুলি
পরা, খাওয়া, গালগল্প, অব্যর্থ মাদুলি
গোপনে গলায় বেঁধে স্রোতের নিশ্চিতে ভেসে যাওয়া-
সে-ও ভালো। অন্ধকারহীনভাবে বেঁচে থাকতে চাওয়া
প্রচণ্ড অন্যায়, আমি চরম কুয়াশা ভালোবেসে
কোনোমতে টিকে আছি। লালসার বেশে
কখনো কখনো আসে পরিত্রাণ, কখনো ঈশ্বর
ঘরের কোণায় এক ইঁদুরের মতো, বড়ো জোর,
পোষা বেড়ালের মতো ধরা দেন, আমি তারই লোভে
অসংখ্য বাদুড় হয়ে ঝুলে থাকি। যেহেতু স্বভাবে
অফুরন্ত অন্ধকার, অশনাক্ত, পরিত্যক্ত, কালো-
এইভাবে নিম্নলোকে, এইভাবে দীর্ঘ প্রবাসে থাকা ভালো।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।