*
যখন খুশি জানালা খুলে ঈশ্বরের দিকে চেয়ে থাকা;
যখন খুশি মেঘ আর মেঘে ঢাকা চাঁদ দেখার জন্য
আনন্দময় উৎসব থেকে নীরবে পালানো;
যখন খুশি ভালোবাসা, যখন খুশি ভালো না বাসা;
নিজের মধ্যে নিজের প্রেম, নিঃসঙ্গতা, অবাধ শান্তি,
পাগল হয়ে, পাগল না হয়ে ফুলের দিকে, মেঘের দিকে তাকানো!
যখন খুশি, তখন; যেমন খুশি; নিজের ভেতরে অগাধ উৎসব,
রক্তপাত, আর গান, আর নাচ, আর মেঘ, আর অন্তহীন মুখরতা!
যখন খুশি জানালা খোলা, যখন খুশি বন্ধ করে দেওয়া!
*
আমার কফিন হবে হালকা,
একটা বাক্সে দু’টো সুতো থাকলে যেমন হয়;
আমাকে ধরে রাখতে কষ্ট হবে না মাটির,
যেমন একটা পাতা কাউকে কোনো কষ্ট দেয় না;
আমার বাবার কোনো কষ্ট হবে না আমাকে বয়ে নিয়ে যেতে,
টুপটাপ করে ঝরে ফুল, মা’র চোখ থেকে তেমনি অশ্রু পড়বে
আমার মরা মুখে, মরা চোখে, মরা বুকে;
একবার মাটির গহীনে ঢুকলে কোনো চিন্তা থাকবে না;
একবার পোকার খাবার হলে কোনো কষ্ট থাকবে না;
হিংস্র হতাশা আমাকে খুন করেছে, আমি মৃত্যুর চেয়ে ভালো কোনো রাস্তা দেখিনি,
আমার ভেতরে ছিলো কুয়াশা, আমার ভেতরে ছিলো ঘুণ;
কেবল মরার পরই মুক্ত হলাম ওই কুয়াশা, ওই ঘুণ থেকে;
তাই বাবা হয়তো কখনো জানবে না তার পুত্রের লাশ এতো হালকা কেনো!
মা কখনো জানবে না কেনো নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে নিজেকে মুক্তি দিলাম;
আমার মৃত্যুর পরও মা কবরের কাছে আসবে,
বাবা আসবে আমাকে দেখতে, যে আমি তখন আর নেই;
আমার কবর ঘিরে বেড়া উঠবে, বাবা বসে থাকবে প্রহরায়;
হতাশাকে আমি চিনি; সে শেয়ালের মতো অপেক্ষা করবে
আমার প্রাণের মতো আমার লাশটাও চুরি করে নিয়ে যেতে;
কিন্তু তখন আমি নিরাপদ, বাবাকে তো চিনি;
আমার কবরের একটা ঘাসও যাতে চুরি না হয়, সে ব্যবস্থা বাবা করবে;
আর এদিকে পোকারা তখন আরাম করে আমাকে খাচ্ছে,
আমার চুল, চোখ, উরু;
আমি মরা শিকড়ের মতো খালি ফুরিয়ে যাচ্ছি,
মরা ঝিনুকের মতো পড়ে থাকছি খোলস-সুদ্ধু;
তখন আমি আরো হালকা; একটা বাক্সে দু’টো সুতোর মতো,
বা একটা বাগানে দু’টো ঘাসের শীষের মতো,
আমার কফিন হবে হালকা!
বাতাসে ঘুড়ির মতো হালকা!
*
এখন, এই অনেক দূর থেকে,
আমি টের পাচ্ছি তোমার নিঃসঙ্গতা, তুমি কাঁদছো!
তোমার ভেতরে প্রচণ্ড বাতাস,
বিদ্যুৎ,
অনেক, অনেক মরা পাখি;
তুমি সাবধান হতে চাইছো,
সরে যেতে চাইছো রঙ্গমঞ্চ থেকে,
কিন্তু পারছো না; কারণ তুমি নিজেও একটা রঙ্গমঞ্চ;
যেখানেই যাও, ঝড় উঠবে;
যেখানেই পালাও, তোমার নিজের তামাশা তোমার পিছু ছাড়বে না!
অনেক পাখি মরে গেছে, তুমি কিছুতেই ভুলতে পারবে না তাদের কথা;
এখন, এই অনেক দূর থেকে,
আমি শুনতে পাচ্ছি তোমার চিৎকার,
বিশাল একটা ঢেউয়ের সামনে তুমি একা;
বুঝতে পারছো না কোন লবণ, কোন নীল,
কোন নিঃসঙ্গতার লোভে
সমুদ্রের পারে তুমি এসেছো;
বুঝতে পারছো না তুমি নিজেই একটা সমুদ্র,
আর এমন অজস্র ঢেউ বারবার খুন করে গেছে তোমাকে;
তোমার স্মৃতি এখন খুব ক্ষীণ!
এখন, এই অনেক দূর থেকে,
তোমার জীবনের কথা ভেবে আমি কাঁদছি;
কারণ আমার সামনেও দৈত্যের মতো ঢেউ,
প্রচণ্ড বাতাসের মতো নিঃসঙ্গতা আমাকেও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে,
যেনো আমি বালির পুতুল৷
আমিও জানি না আমি কেনো সমুদ্রের কাছে এসেছি।
এখন, এই অনেক দূরে থেকেও,
আমি তোমার খুব কাছে, তোমার মধ্যেই,
তুমিও আমার মধ্যে;
একবার রঙ্গমঞ্চ,
একবার বাতাস,
একবার সমুদ্র হ’য়ে একে অন্যকে চিনছি
আর ফিরে আসছে একটার পর একটা স্মৃতি,
আবারও মানুষ হচ্ছি আমরা,
আর ভুলে যাচ্ছি যে আমাদের ভেতরে ছিলো অনেক মরা মানুষ, অনেক মরা পাখি,
আর একদিন আমাদের তাড়া করেছিলো নিঃসঙ্গতা, একদিন আমরা হয়তো বেঁচেই ছিলাম না…
*
পেছনে ফেলে এসেছি ঝরা ফুলের মতো কাটা মুণ্ডু,
প্রাণ, প্রতিদান, উচ্ছ্বাস;
নাকে আংটা বেঁধে মগডালে ঝুলিয়ে রেখেছি যাবতীয় শিকার;
আমাকে আর কেউ মারবে না;
আমি আর কাউকে মারবো না;
পেছনে ফেলে এসেছি হত্যা, আত্মহত্যা, চলে যাওয়া, চলে যেতে চাওয়া;
ঝরা ফুল আর শুকনো পাতার মতো রক্ত-মায়া-মাটি-মাখা অজস্র মানুষ;
আর পেছনে ফিরবো না, আর গড়বো না বিপরীত সাঁকো,
আমি জল্লাদ নাকি নিহত? ফুলগাছ নাকি ফাঁসিকাঠ? ফিরে আসা নাকি যাত্রা?
আমার চোখ সমুদ্রের নুনে কুরে খাক, পাঁজর এ পাশ ও পাশ হোক মাটির অত্যাচারে;
আমার প্রাণ ছিঁড়ে যাক, যেমন ছিঁড়ে যায় বাচ্চার শাদা জামা; যেমন ফেলে দেয় বাচ্চার মা সেই জামা,
আমাকে ফেলে দাও; জীবনে, মরণে, উচ্ছ্বাসে আটকা পড়েছি, তাই শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে আমার,
হে মৃত্যু, হে তীর, হে ঘুম, এসো; এবার গ্রহণ করো ঘাতকের প্রাণ;
হে আলো, হে উত্তর, হে দক্ষিণ, এবার আমাকে ফাল ফাল করে ছিঁড়ে ফেলো অদৃশ্য পাথরে!
পেছনে ফেলে এসেছি পঁচা পান্তার মতো আমার জীর্ণ প্রাণ,
এই মরা জিহ্বায় ধরতে চেয়েছি ফলমূল, গাছে ঝুলছে, কিন্তু পারিনি!
এবার সমুদ্রের কাছে যাবো, এবার ডাইনীর কাছে যাবো, এবার নিজেই নিজের চোখ তুলে খাবো,
হে চোখ, হে নীড়, হে আলো, আমার খাদ্য হও, জল হও, হজমশক্তি হও!
আমাকে আর কেউ মারবে না;
আমি আর কাউকে মারবো না;
আমার ভেতরে হামাগুড়ি দিচ্ছে অজস্র হাঙ্গর,
আমাকে চিবিয়ে খাচ্ছে নিঃসঙ্গতা, পিঁপড়ের মতো টিপে মারছে শূন্যতা;
হে সমুদ্র, হে ঘুম, হে হাত, এবার আঘাত করো,
শেষ আঘাত, কঠিন আঘাত,
হে জল, হে অপ্সরা!
*
ঝলকে ঝলকে বেঁচে উঠছে বোবা প্রাণ!
পুড়ে যাচ্ছে ভিতর-মজ্জা, চুরমার পাঁক খাচ্ছে
নিঃসঙ্গ আনন্দে; সে ফুল এখন, শহর এখন, সে মানুষ, সে পৃথিবী;
জানালা খুলছে, টেবিলের বইয়ে বাতাস, পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় দুঃখ হলো আনন্দ,
মৃত্যু হলো জীবন; এক ফুঁয়ে নিভে গেলো বানানো সম্প্রীতি!
ঝলকে ঝলকে জ্বলে উঠছে প্রকৃতি, প্রকৃতি হচ্ছে প্রাণ,
কড়া হাতুড়ির ঘায়ে চিরে যাচ্ছে হতাশা, নিঃসঙ্গতা- ঝরে পড়ছে
প্রবালের মতো পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ, শীতল; টুকরো টুকরো সান্ত্বনা;
সংকেত আর সংকেত হয়ে নেই, সে মানুষ; চিহ্ন আর চিহ্ন হয়ে নেই, সে অর্থ;
কতোবার পাথরে ঠুকেছি বোবা মাথা, কিছুই হয়নি!
আজ প্রাণ পাগল, পাগল চারপাশ, আপনা থেকে খুলে গেলো জানালা!
দুর্গম সমুদ্র ঠেলে অভ্রভেদী শিখরের মতো নিঃস্ব দানব উঠে এলো আলোয়,
আর ঝলকে ঝলকে বেঁচে উঠলো, অন্ধ, অসহ্য, বেপরোয়া;
লাখো বছরের পীড়নে পীড়নে ক্লান্ত;
ভেঙে গেলো নির্বাসন, ভেঙে গেলো আয়না, নিজের ভেতরে ফুঁসে উঠলো পৃথিবী;
ফুলের পর ফুলে, বইয়ের পর বইয়ে, জানালার পর জানালায়
সে এখন দৃশ্যের পরও দৃশ্য, গল্পের পরও গল্প, ডালে ডালে পাখি, হাজার হাজার পাখি!
*
যাচ্ছে যাক। চমৎকার! সুন্দর হতে হবে,
এমন কথা নেই। জেগেই থাকি
আর ঘুমাই, এক কথাই। ঘুমের মধ্যে হাঁটা
সারা জীবন! মানুষ দেখে লুকিয়ে পড়ি
নিজের শীর্ষে, নিজের কিনারায়! মন্দ নয়!
আয়না ভাঙছে, আয়না গড়ছে, হেঁটে যাচ্ছি,
পিছিয়ে পড়ছি; গোলাপ-বনে খুঁজছি কাঁটা;
কাঁটার মাখন, মিষ্টি মাখন; নামের দেশে
নামই হবো, জন্মে জন্ম দেবো, এমন কথা নেই;
চমৎকার! একটু খানি অন্য কিছু থাকুক!
এক ফোঁটা বিষ লুকিয়ে থাকুক পিঁপড়ে হয়ে;
বাঁচা-মরা এক কথাই, জেগে কিংবা ঘুমিয়ে থেকে
একলা কিংবা পরস্পরে ছুটতে থাকা,
চমৎকার! যাচ্ছে যাক! এমন কথা নেই থামতে হবে!
*
কেউ কি মরার জন্য বাড়ি যায়? কেউ কি যত্রতত্র
খোঁজে কুটুম্বিতা? সাত পুরুষের ঘরে যতো আগাছাই থাক,
কেউ কি সেখানে আদতেই মরে? জীবাণু, কীটাণু,
দুঃখ, দুঃস্বপ্ন, স্বপ্নের প্রচণ্ড অভাব, ক্লান্ত করে প্রতিদিন,
লাশ হতে ইচ্ছে হয় জনকের কাঁধে, সবার গোপনে
চলে যাবো, ভেবে শান্তি লাগে- যে বীর, সে হাহাকারে
বাঁচে? বাঁচতে পারে? সত্যিকার বাঁচা কি আগন্তুকের মতো বাঁচা?
কেউ কি স্বপ্নের মতো বাঁচে, যদি নিজের বাড়িতে
না আসে, না কাঁদে, না উগরে দেয় বুকের প্রকৃত কাপুরুষ?
*
(9th Symphony- Gustav Mahler)
চোখ তোলো, প্রান্তর, হে জ্যামিতি, আমাকে ডাকো;
কুয়াশাকে বলো, ‘সরে যাও', অনন্তকাল কিছু দেখিনি
নিজেকে ছাড়া; ভেঙে যাও, আয়না! দৃশ্যের হাতাহাতি
ভেতরে, বুঝছি না, কে কার, কিভাবে, কেনো, কখন;
চোখে যা দেখছি, তা ধাঁধা; ফিরে পাচ্ছি যা, তা মৃত;
হত্যাক্লান্ত স্বপ্ন; এসো, ঘুম, এসো আত্মায়; আছে তক্ষক,
আছে ডাকিনী, আছে মেঘলা আকাশ ভেতরে; আছে সমুদ্র,
তার যেখানে আমার জলসীমা শেষ, কুয়াশার শুরু-
দেখিনি, কে কার ঘাতক, চিরদিন কে মৃত, কে আলেয়া;
হাড় একেলা, মজ্জা একেলা; সূর্য-সন্ধ্যা-রাত্রি-সকাল একেলা;
ঝড়ে ভেঙে পড়া গাছের মতো অবলা দৃশ্য; পারবো না
দেখতে, তাকাবো না জলে, নক্ষত্রকে দেবো না হৃদয়;
হে প্রান্তর, ঢেউ আর ঢেউ, শিকলে বাঁধো আমার ভ্রুকুটি;
খুন করো স্মৃতিকে, স্বপ্নকে; নাচো কুয়াশার তালে তালে;
আমি অনন্তকাল জাগিনি, হে জ্যামিতি, এই মরা আত্মায়,
জোনাকির ঝড়ে, বাঁধো বাসা, যন্ত্রণাকে বলো, ‘সরে যাও',
জেঁকে বসো, সমূলে, ঘুমের মতো, হে প্রান্তর, হে ফসল, হে আঙিনা!
*
হায় রে বিপন্ন দিন,
হায় রে উৎসুক, লাজুক স্বপ্নদৃশ্য,
রঙিন ছাতার নিচে লুকোনো নিভৃতি,
আমি আর পেছনে ফিরবো না;
নোনা জল ঠেলে আর হাতলা দিয়ে ধরবো না সাপ,
পাগলের মতো মিথ্যে কথার গন্ধে যাবো না খেপে।
বঁড়শিগাথা রয়েছি বহুদিন!
ভীষণ ক্ষমার অজস্র পোকা সাঁতার কাটছে আমার রক্তে,
আমি সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছি;
লবণাক্ত এই রাত, এই নবজাতকের মতো বৃষ্টি,
আর সবার গোপনে বসে নিরবধি কান্না,
আগামী কাল কিছুই থাকবে না!
কেউ মরবে না আগামীকাল, কেউ না!
কাউকে দেবে না বিষ, শিকল, ফুল বা ক্ষত!
কেউ নিঃসঙ্গ হবে না, পারবে না নিঃস্ব হতে, শূন্য হতে, শূন্য করতে!
আয়না হবে বিশ্বস্ত, দাঁড়াবে সবাই, দেখবে সার বেঁধে;
কেউ গালে তুলবে না রুটি, করবে না চুম্বন!
কেউ মাতাল হবে না, কেননা সবাই পৃথিবীর সন্তান!
পিতা রইবে চেয়ে অজানায়, কাঁধে নেবে কাঁটায় ছিন্ন পুত্রশরীর;
কেউ রইবে না উন্মন! মরবে না, মারবে না। ঈশ্বর চাইলেও দাঁড়াবে না কাঠগড়ায়।
হায় রে বিধ্বস্ত দিন,
হায় রে নরম, কোমল, শাদা পাখি,
জীবনের নামে গড়িমসি, সমুদ্রখেকো ভয়;
ভীষণ লজ্জার উলঙ্গ কৃমিরা চিবিয়ে খেয়েছে আমাকে!
আর কাতর আঙুল তুলে দেবো না ক্ষুধার্ত সাপের গালে;
লুকোনো খোপে বাস করবো না মিথ্যে খোলসে উদ্বাস্তুর মতো,
আমি আর পেছনে ফিরবো না!
*
*
(উট-মানুষ)
কুঁজোর জল ফুরিয়ে গেছে। দীর্ঘ দিন, তপ্ত রোদ,
অন্ধ রোদ, দেখে না ক্লান্তকে; মৃত্যু মুখরিত চারপাশেই;
চায় অব্যাহতি, চায় জন্মজল, চায় নতুন কুঁজো;
বিস্মৃত সে, বিলম্বিত জগতে; তার আপন সবাই
হাসতে হাসতে সরে গেছে, আর্তনাদ করেছে কেউ;
কেউ খেলেছে লাটিম, সুতো বেঁধে, খেলা শেষে উধাও;
পৃথিবী তাই সূর্য, গাছ সূর্য, পাতা সূর্য, মানুষ সূর্য;
প্রকট উষ্ণতা, কুঁজোয় ছিদ্র হ’য়ে গড়িয়ে গেছে জল;
ভণ্ড রোদ, বোঝে না অবসাদ; মরা চামড়ার মতো শুষ্ক প্রাণ
সাাগর পাড় খোঁজে, কৃমির মতো মাটির আড়ম্বরে ডুবতে চায়,
চায় জন্মজল, চায় যোনি, অন্ধ রোদের মৃত্যু চায় কুঁজো!
*
হাত ধরে টানে রক্তমাখানো ঝুলি,
হাত ধরে টানে আমরণ সান্ত্বনা;
সন্ন্যাসী হাওয়া পিছু নেয় উদভ্রান্ত-
থমকে রয়েছে দু'পা!
বিদ্রোহ করে অনন্ত যন্ত্রণা;
তাড়াবে সে ফুল, তাড়াবে সে আল্পনা;
হৃদয় ডাকিনী হতে চায়, তবু পারে না-
জড়িয়ে গিয়েছে দু'পা!
বিপন্ন ঋতু, আকাশে প্রসূতি মেঘ;
সারা মণ্ডলে শিকড় গজায় হাওয়া;
হাত ধরে টানে বৃষ্টি, তবু সে বোবা-
রক্তে ভেসেছে দু’পা!
নিঃস্ব রক্তে অনুশোচনার ধুলো;
বাতাসের তোড়ে ছিঁড়েখুঁড়ে যায় সুতো;
হাত ধরে টানে বিস্মরণ, তবুও
সামনে যাবে না দু’পা!
*
চোখে চোখে রক্ত, কানে কানে গান!
জীবন ছিলোই, কিন্তু জীবন পেলো না-
ঘরে ঘরে, দেশে দেশে, আশায়, সর্বনাশে
যেটুকু আপন, তা-ও মিথ্যে মনে হলো।
চোখে যা পেতেই পারে, হৃদয়ে তা নয়।
নিজের জীবনে আর নিজের মরণে
একটু ভরসা- তা-ও পেলো না কখনো!
চোখে চোখে রক্ত, কানে কানে গান;
হৃদয়ে সাধনা ছিলো, হৃদয় পেলো না; তার
চোখেই আশ্রয় ছিলো, হৃদয়ে ছিলো না!
*
(নিষ্কৃতি)
( Wolfgang Amadeus Mozart, Horn Concertos- 1, 2, 3, 4 )
চোখের গভীরে সুর, জলের মতোই সুর,
যতো কাঁদবে, মনে হবে সমুদ্রের দিকে যাচ্ছো,
যতো কাঁদাবে, মনে হবে ফিরে আসছো রুক্ষ ডাঙায় নাবিকের মতো,
তোমার চোখের ঘরদোর ভেঙে পড়ছে, ফাটল ধরছে মাটির দেয়ালে,
ধরে রাখতে পারছো না কোনো কিছুই, ভালোবাসতে পারছো না,
এখনো এতো কান্না চেপে আছো অথচ, এখনো এতো সুর, জলের মতো সুর,
এখন তুমি নিঃসঙ্গ, এখন তুমি কিচ্ছু পাবে না। কথায় না। নীরবতায়ও না।
গভীর বাঁশি বাজছে, চোখের বাঁশি বাজছে,
ঘরে সুর, বাইরে সুর, কেবল তোমার চোখে লোনা জল,
তোমার চোখে তোমার বুকের, তোমার মনের মতোই শূন্যতা,
আর কিছুক্ষণ দাঁড়ালে শূন্যতা ভেঙে ফেলবে বাঁশি,
শূন্যতা জাঁকিয়ে বসবে ঘরে, শূন্যতা টহল দেবে বাইরে,
চোরা ছারপোকার মতো শূন্যতা ছড়িয়ে পড়বে তোমার বিছানায়,
আর কিছুক্ষণ দাঁড়ালে তোমার কানে শিক ঢুকিয়ে দেবে শূন্যতা,
তুমি তোমার ঈশ্বর থেকে আলোকবর্ষ দূরে, দূরে ভালোবাসা থেকে,
নিঃসঙ্গ, নিরাসক্ত মেধার মতো, আকাঙ্খার মতো!
তোমার বিষাদ, তোমার শহর, তোমার বিশ্ববিদ্যালয় সমস্ত তোমাকে একলা করে ফেলে রেখেছে,
তুমি সমুদ্রের দিকে যাচ্ছো, যাওয়ার মতো যাচ্ছো, শেষ নেই সেই যাওয়ার, শেষ নেই লোনা জলের,
একটি সমুদ্র তোমার বাইরে, হাজারটি তোমার ভেতরে, তোমার মনে, মুখে, চোখে মজ্জায় নুন আর নুন!
কারো থেকে দূরে সরছো না, কারো কাছেও আসছো না, যতো কাঁদছো, ততোই থমকে দাঁড়াচ্ছো,
ততোই গেড়ে যাচ্ছো মাটি আর মাংসের আরো গভীরে!
চোখের পলকে সুর, জলের মতোই সুর,
বোকা কান্নায় কিচ্ছু হবে না, জলে কুমির, ডাঙ্গায় ফাটল,
যতো কাঁদবে, মনে হবে মানুষের দিকে যাচ্ছো, মানুষের ভেতরের সমুদ্রের দিকে,
যতো কাঁদাবে, মনে হবে জলে মজ্জমান, রুক্ষ মাটিতে ব্যর্থ শিকড় গেড়ে অবশেষে নিরবলম্ব,
যতো অপেক্ষা করবে, ততো খামচে ধরবে শূন্যতা, যতো শূন্য হবে, ততো শূন্য করবে, মরবে ততোটুকুই,
নিঃসঙ্গ, নিরাসক্ত মেধার মতো, মাটির দু’মাইল নিচের কৃমির মতো, পাতালের মাতাল মাছের মতো,
যদি নিজের চোখে নিজে ভাষা দাও, বা নিজের চোখকেই করে তোলো ভাষা, যদি অন্যকে ভাষা দিতে দাও-
যদি চোখের গভীরে যাও, চোখে চোখ রাখো, যদি ভালোবাসো সঙ্গোপনে-
তোমার চোখের বাঁশি কেউ ভেঙে ফেলবে না আর, না শূন্যতা, না মৃত্যু, না মেধা;
তোমার ভেতরের ফাটল তুমি, তোমার যেকোনো মেরামতও তুমি, তোমার ঘরদোর তুমি,
কারণ একা নও আর, কারণ অচেনা নও, কারণ গোপন ঘণ্টা ঝুলছে তোমার আত্মায়, তোমার গলায়,
যতো কাঁদবে, ততো সেই ঘণ্টা বাজবে, যতো কাঁদাবে, ততো সেই ঘণ্টার আর্তনাদে কেঁপে উঠবে তোমার আত্মা,
আর নিঃসঙ্গ নও, নিরাসক্ত নও, আর যাবে না জলে, ফিরবে না ডাঙ্গায়। কথায় না, নীরবতায়ও না!
*
ভাঙা পুতুলের হৃদয় তো ভাঙলো না!
সূর্যহীন, স্মৃতিহীন পড়ে রইলো ময়লার ঝুড়িতে,
মানুষ থুথু ফেলে, পায়ে মাড়িয়ে যায়, ধুলো থেকে ধুলোয়
ঘুরে ঘুরে ভাঙা পুতুল আরো ভাঙে, মুখ থুবড়ে থাকে শুয়ে
কাচের বোতলে, মৌমাছি, ডানাকাটা, নিরুপায়;
দেহ নেই, আত্মা নেই, খিলখিল হাসে তা-ও,
হৃদয় থাকে, থেকে যায়, আপন মুলুক, আদ্যোপান্ত,
ভাঙা পুতুল পাগল, ছন্নছাড়া, ভাঙতে ভাঙতে পরিশ্রান্ত,
শুধু হৃদয়ে ময়লা মেশে না; আগুনে আগুন পোড়ে না, জ্বলে না!
রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, গঙ্গা, যমুনা বয় ভাঙা অন্দরে,
বেদনা চাইলে আসে মৃত্যু, জল চাইলে উল্লাস, আলো চাইলে সূর্য,
আর কাদায় জড়িয়ে ভেসে যায় দিগদিগন্তে, পুতুলের গন্তব্য সীমাহীন!
শুধু হৃদয়ে অনন্ত পলিমাটি, শিলাবৃষ্টিতে অশ্রুহীন, অটল,
ভাঙা পুতুলের হৃদয় সহজে ভাঙে না!
*
কী আছে জেগে থাকায়? বিবাদ? বিশ্বাস?
ফুল? পাথরের কাছে গেছো, পাখিদের কাছে
শিখেছিলে অদ্ভুত গণিত; তবু জীবন দুঃসাধ্য কেনো?
আজও ভরপুর স্মৃতি তোমার বুকের আলগোছে
লুকোনো রয়েছে! নাকি বিষাদ, বিষাদ শুধু? সম্ভ্রম? যন্ত্রণা?
কী আছে তন্দ্রায়? ফুল? পাহাড়? ফসল? পাখি?
নাকি ঝরা পাতা আর বুকের অম্লানে চেয়ে থাকা
একটি নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস, থরোথরো অলীক প্রার্থনা?
পরমার্থহীন কৃত্রিমতা; শুধুই গণিত? জানি,
ছবির খাদ্য নও। কাঠ-চাপা দ্বন্দ্বের পাহাড়ে
কী রইলো আকাঙ্খিত? বিশ্বাস না বিশ্বাসের স্মৃতি?
*
সবার প্রথমে, কিংবা অন্তত অনেকের আগে
চলে যাবো, সবুজ ঘাসের মতো, সোনালি দিনের মতো!
আমার টেবিলে আজ আমিই বসি না, ভয় লাগে
কখন পোকার মধ্যে, কখন কাঠের মধ্যে অত্যন্ত সঙ্কটে
নিজেকে দেখতে পাই! নিজের আসল হাসি
শুনতে পাই পোকার প্রলাপে! পোকা? নাকি দেবদূত?
সবার সামনে আছি, চুপ আছি, কিন্তু চলে যাবো
বিদ্যুতের আগুনের মতো; আকাশে নিজেকে দেখে
ইচ্ছে হবে চূর্ণ করে ফেলি চাঁদ, সূর্য, তারা; ধ্বংস করি
ঘড়ির যথার্থ কাঁটা, মানবিক প্রাচুর্য, সংযম,
সবকিছু! এর চেয়ে চলে যাওয়া ভালো, যেতে যেতে
টেবিলের কাঠে আর পতঙ্গের নিঃশব্দ কান্নায়
নিজের নির্যাসটুকু রেখে যাওয়া। অত্যন্ত দুর্যোগে
আমূল বিনষ্ট আমি, আমার চরমতম বিশ্বাসের দামে
সবুজ ঘাসের মতো কাদাজলে বুক পেতে দেবো!
সবার প্রথমে, কিংবা অন্তত অনেকের আগে চলে যাবো!
*
মাফ করো। জীবনের অনেক নিকটে
গিয়েও ছুঁইনি তাকে, বিশ্বাস করিনি!
আজ চোখে মুখে মৃত্যু, অসম্ভব লক্ষ ঝরা পাতা,
তুমি শেষবার এ পাতা কুড়াও,
এ মৃত্যু কুড়াও! মাফ করো। ঈশ্বরের প্রিয়
হয়েও পাইনি তাকে; স্মরণে, মননে
যন্ত্রণা, দাবানল, ধাঁধা, নিজেকে হত্যার ইচ্ছা;
আজ হৃদয়ে নিষ্কৃতি হও, ঈশ্বরের সাজে সাজো!
মাফ করো। ভালোবাসতে গিয়েও বাসিনি,
নিজেকে চরম জেনে নিজেকে নিঃশেষে
হারিয়েছি তোমাকে হারিয়ে, তুমি যে কেমন ধাঁধা!
এই শেষবার ভালোবাসো, দয়া করো, নয়তো ফুরিয়ে যাবো!
*
(Ludwig Van Beethoven- Symphony No. 5- ll. Andante con moto)
তোমার হাত ধরছি; অন্ধ হবো; মাথায় হাত রেখে বলছি,
অন্ধ হবো; তুমি এখন যন্ত্রণা হও, যন্ত্রণা হও! আমাকে রূদ্ধ করো
জোর শিকলে; হাওয়া বইছে, পাতা বইছে, কড়া নাড়ছে অনন্ত বর্ষা;
তোমার মুখের কালো দাগ আমাকে দাও, আমাকে অন্ধ করো, যন্ত্রণা দাও!
জানালায় দুর্ধর্ষ হাওয়া, শুয়ে আছি, চোরা শীতে জবুথবু,
আমি আমার অনেক দিনের বিষ উগরে দিচ্ছি, আমি আমাকে শাস্তি দিচ্ছি,
এই বর্ষা, এই হাওয়া আমাকে লুণ্ঠন করে নিয়ে যাচ্ছে,
আমার পাপের বহর দেখে আমি নিজেই স্তম্ভিত!
অনেক দিনের হাওয়া এই, অনেক দিনের ভালোবাসা এই, অনেক পাপের শাস্তি;
আজ নিজেকে শুদ্ধ করে নিচ্ছি; তুমি অমৃত হও, অমৃত হও!
কালো মেঘ মিলিয়ে যাচ্ছে আরো কালো অন্ধকারে,
মা ঘুমোচ্ছে; অনিদ্রার দোষ সত্ত্বেও বাবার চোখ বন্ধ, সম্ভবত হতাশায়;
আমি নিজে একটি কালো দাগ, অন্ধকারে মিশে যাচ্ছি; বুদ হয়ে যাচ্ছি অনুতাপে;
আমার মা-বাবা এখনো জীবিত, অথচ তাদের থেকে অন্তত কয়েক লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে
সরে গেছি; এই অচিরেই দ্বিধা-বিভক্ত আলো আর অন্ধকার, ফুল আর শিকড়ের মাঝখানে!
আলো হবো, অন্ধকার হবো; শুদ্ধ হবো; স্থির হবো; তুমি এক জীবনে নিশ্চিতি হও, নিশ্চিতি হও!
কাঁচের দেয়াল ফুঁড়ে সুতোটঙ্ক সাপের মতো আসছে বিষাদ,
অসম্ভব বিষাদ আমার সামনে-পেছনে; হাওয়া বইছে, পাতা বইছে, অনন্ত বর্ষা আমাকে চিরে ফেলছে,
আমার অনেক দিনের স্বপ্ন টুকরো টুকরো, আমার বাবা-মা বৃদ্ধ, তাদের স্বপ্ন টুকরো টুকরো;
এই অজস্র পাপের বোঝা নিয়ে বৃষ্টি মাথায় বেরিয়ে পড়ার শক্তি আমার নেই, আমাকে আগলে রাখো,
তোমার মুখের কালো দাগ আমাকে দাও, তোমার ভয়, শোক, দ্বিধা আমাকে দাও,
হাত ধরছি, পা ধরছি, অন্ধ হবো, শুদ্ধ হবো; তুমি আমার যন্ত্রণা হও, সম্প্রীতি হও, অমৃত হও!
*
(বিশ্বাসের দিন)
আজ তোর মুখে মুখে কথা;
চোরা-কাঁটা নেই ত্রিভুবনে;
দুর্যোগ যা গেছে, সে তো গেছে-
আজও কেনো ভালোবাসলি না?
তোর বুক শস্যে একাকার;
বাগান ভরেছে কচি ফুলে;
তুই শুধু দু'মুঠো চাইতি-
তা-ও চোখে-মুখে অবিশ্বাস?
আজ সারাদিন শীত ছিলো,
তা-ও তোর পিঠে পোড়া দাগ?
কাল রাত ভরে বৃষ্টি হলে,
তোর প্রিয় পিপাসা মিটবে তো?
সারা মুখে ভয়, শোক, দ্বিধা-
সারা বছরের এই রীতি!
আজ তো বিশ্বাসের দিন,
পোড়ামুখো, ভালোবাসলি না?
*
মনে হয় আমার বিগত বছরগুলো শেষ পর্যন্ত
নিছক একটা বসন্তের হাঁড়ি, যেখানে যন্ত্রণাগুলো মধু,
দুঃখরা মৌমাছি, আক্ষেপ আর অনুতাপেরা ফুলখেকো পোঁকা,
যেখানে বিক্ষোভ, বিস্মৃতি, চায়ের দোকান, স্টেশনের বাস,
আর আত্মার প্রার্থনায় লালিত বিশ্ববিদ্যালয়, ঝোড়ো প্রতিজ্ঞা -
সব একসাথে মিশে লীন হয়ে গেছে একে অপরের মধ্যে,
আর এইসবই ভাবতে ভাবতে মনে হতে থাকে
আমি ওই হাঁড়িটা ছুঁতেও পারবো না আর কখনো, আর কোনো যন্ত্রণা,
কোনো লোককথিত স্বপ্ন আমাকে আর কাঁদাবে না,
দম বন্ধ হ’য়ে আসবে না সেদিনকার ভবিষ্যৎ, অর্থাৎ আজকের কথা ভেবে,
কারণ যা কিছু আজ, যা কিছু বিদ্যমান, যা কিছু ভ্রমণরত,
সব গিলে ফেলা হয়ে গেছে আমার; কেবল ভবিষ্যতে,
এরকমই কোনো মুহুর্তে, এরকমই কোনো সোমবারে, মনে হবে
আগামীকে মুছে ফেলি, আর জাবর কাটি পুরাতন ‘আজ' আর ‘বিদ্যমান’গুলো,
আগামী আমাকে গিলে খেয়ে ফেলার আগেই
অতি সত্বর গিলে, জাবর কেটে আর হজম করে নিতে হবে অতীতকে,
খালি করে দিতে হবে বসন্তের হাঁড়িটা, নইলে ভেঙেই ফেলতে হবে,
কারণ আমার ভেতরের কুমোর বানিয়ে চলেছে নতুন নতুন সব হাঁড়ি,
আমার ভেতরের খেজুর গাছগুলো রসে রসে টইটম্বুর,
আর অস্তিত্ব মানেই তো নতুন হাঁড়িতে নতুন রসের একঘেয়ে স্বপ্ন,
যে স্বপ্নই আমার জন্যে বাস্তবের ভোগ-মন্দির,
আমি সেই মন্দিরে আমি অর্ঘ্য দিতে পারি বা না পারি, একই কথা!
*
যেদিকে লাবণ্য আছে, সেদিকেই অগাধ যন্ত্রণা!
তোমার সঙ্গে আর যোগাযোগ নেই, তুমিও তো
বহু দিন ভালো না বেসেই আছো, বেশ আছো, থাকো!
ভয়ে-শোকে একাকার রে পৃথিবী! নির্বাসন ফাঁকি;
তোমার সম্মানে তবু তোমাকে দু'চোখে ধরে রাখি!
তুমি কি সম্প্রীতি ছিলে? তুমি কি লাবণ্য? মায়া? মোহ?
ধূসর অতল ছিঁড়ে ফিরে গেছো অত্যন্ত গহ্বরে,
তোমাকে পাই না আজ, তুমিও তো আমাকে চাও না!
যেদিকে লাবণ্য আছে, সেদিকেই অসহ্য যন্ত্রণা!
হে ঘুম, হে ঘুম, ভাঙো, ভাঙো, আমি নির্বাসনে যাবো!
*
আমার কন্যা মেলে দিয়েছে বাসনার পাখা,
জুনের রোদে সে আছে শুয়ে,
তার দেহ বেয়ে মদিরার মতো ঘাম চুয়ে পড়ছে ঘাসের জিহ্বায়-
যাকে চুপিচুপি লুফে নিচ্ছে মৃত্তিকার স্বপ্নীল পিঁপড়ের সারি!
আমার কন্যা জলফোয়ারার মতো
লক্ষ বছর ধরে আমারই ভেতরে বইছিলো,
পেন্ডুলামের মতো ঝুলে ছিলো অস্তিত্বের মরা দেয়ালে।
আজ সে বেদনার্ত নদীর গান, আজ সে স্বপ্ন,
আজ সে জুনের হাওয়ায় রেখে যাওয়া ভ্রমরের বিষণ্ন আঁখর!
কিন্তু সে মিশে আছে ছায়ালোকে,
জাদুকর মৃত্যু তাকে ছড়িয়ে গেছে সৈকতে সৈকতে, বালুকণায়।
শুধু যেদিন বিবর্ণ নারীর মতো নামে গোধূলিমা,
সে ফিরে আসে, কবিরা তাকে কুড়িয়ে আনে
ফুল-পাতা-তোলা পাৎলুনের ভাজে, হৃদয়ের গানে, হৃদয়ে হৃদয়ে!
*
চুরি করে ভালোবেসেছিলো রাঙা রেণু-ভরা
পৃথিবীটা। মন্দিরে, মাটির সাথে, হাঁটতে হাঁটতে
গোপনে দু’ফোঁটা জল ফেলা ফুলো চোখ বুজে;
এরপর খুনী স্ট্রোক, এক বিন্দু ফাঁকা হলো
কি হলো না। রাঙা রেণু চোখেমুখে ঝরে, কবরের
মাটির উল্লাসে আধফোটা ফুলের কান্না, নিরর্থক।
চুরি করে ভালোবেসেছিলো যাকে, সে-ই কেড়ে নিলো তাকে!
*
দীর্ঘ রাতের চক্কর, তুমি
ঠাঁই খোঁজো ভাঙা হৃদয়ের কানাগলিতে,
ছাইঠাসা ফুলদানিতে!
অনেক তো হলো চক্কর, তুমি
নিজেকে খেলনা বানিয়ে
আর কতোই বা খেলবে?
কোন ডাইনীর বুকের মমতা ছিনিয়ে
সাজাবে তোমার ছাইঠাসা ফুলদানিতে?
হৃদয়ের কানাগলিতে?
দীর্ঘ রাতের দিশাহারা ঘুম ভাঙিয়ে
আর কতো ঢেঁকি ঠেলবে?
[ রচনাকাল: ২০২১-২২-২৩]
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।