১৬।
এরকম একটা দিন সহজেই পচে-গলে যায়,
কোনো কারণে, বা নিতান্তই কারণের অভাবে,
দু’দিনের বাচ্চার মতো, নামহীন, ঝরে যায় পঞ্জিকা থেকে;
আর আমি লাজুক অস্তিত্বে, ভাষার বিবরে শুয়ে শুয়ে,
দিবাস্বপ্ন দেখি না-হওয়ার, না-থাকার; চারিদিকে অগণিত অপসম্ভাবনা
খেলা করে বাতাসের সঙ্গে; ‘আমি জন্মদিন', ‘আমি মৃত্যুবার্ষিকী’ বলে
ধেয়ে আসে একেকটা তারিখ, আর আমি, হাজারো কর্তব্য সত্ত্বেও,
কিচ্ছু না করেই শুয়ে থাকি; খালি সন্দেহ হয়, সে আসবে,
তারিখহীন একটা দিনে, সকাতরে, গুরুদুয়ারার সাপ্তাহিক কীর্তনের মতো-
আর সেই একটিমাত্র ঘটনার দিকে তাকিয়ে, লক্ষ্মী ছেলের মতো,
ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখি ক্যালেন্ডার, যদিও প্রায় প্রত্যেকটা তারিখকেই
মনে মনে লাথি মেরে উড়িয়ে দিয়েছি আমি; কারণে হোক, অকারণে হোক,
এরকম একটা দিনে খড়ের চালের মতো ভেঙেচুরে যেতে ইচ্ছে করে
ন্যূনতম আলিঙ্গনে; সকাল হারিয়ে ফেলে তার অন্তর্গত সকালতা;
এরকম একটা দিন সহজেই ঝরে যেতে পারে।
১৭।
হয়তো এখন অনেক দূরে চমৎকার একটা স্বপ্ন
আমার ঘুমের মধ্যে ঢুকে পড়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে;
হয়তো স্বপ্নটা সুন্দর, কিংবা স্বপ্নটা হতে পারে অত্যন্ত বীভৎস,
হয়তো স্বপ্নটার পাখা আর ধারালো নখ আছে, রিরংসা আছে,
হয়তো স্বপ্নটা আমার চেয়ে, বা আমার ঘুমের চেয়ে শক্তিশালী,
কিন্তু আমি যতক্ষণ জেগে আছি, চাইবো না স্বপ্নটা কোনোমতেই আসতে পারুক;
বিষণ্ণ একটা ঘুম, রাতের আকাশের কালো মেঘের মতো সঘন আর ভীষণ একটা ঘুমের অভাবে
আমি কষ্ট পাচ্ছি, আর কোনো স্বপ্নই জানে না এই যন্ত্রণার কথা, এই অভাবের কথা;
কোনো স্বপ্নই জানে না যে, মানুষ মরতে চায় প্রতিদিন, কিছুক্ষণের জন্য, পারলে ঘুমাতে চায়
চোখ খোলা রেখে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে; জানে না যে, রাত আসে মৃত্যুর জন্য, বিস্মৃতির জন্য;
আর তাই যেসব স্বপ্ন স্কুলড্রেস পরে স্কুলভ্যানের জন্য এখন অপেক্ষা করছে,
আমি তাদেরকে বলে দিতে চাই, আজ স্কুল ছুটি, আজ স্কুল ক্লান্ত, দরজা-জানালা ক্লান্ত;
আজ স্কুল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুমোবে, কাঁথা মুড়ি দিয়ে মড়ার মতো
থাকবে শুয়ে, কেননা স্কুলেরও ঘুমের দরকার, পালিয়ে যাওয়া দরকার, সত্যি বড়ো দরকার!
১৮।
আজ অবধি কেউ কোনো নাম ধরে ডাকেনি,
কারণ আমি ঝরে পড়ি উচ্চারণের আগমুহূর্তে;
যখন উঠে দাঁড়াই, তখন স্মৃতি বলে কারো কিছু থাকে না,
কেউ কাউকে সম্বোধন করে না; অথচ সুযোগ পেলেই
অনেকক্ষণ আগে চলে যাওয়া রিকশার মতো খোঁচা মারে অবচেতনে,
‘হায় রে আহাম্মক! রাস্তায় নামা তোর কাজ না, তুই দাঁড়িয়েই থাক,’
আর আমি দাঁড়িয়েই থাকি, মোড়ে মোড়ে, অলিতে-গলিতে, বাসস্ট্যান্ডে,
যেনো নিখুঁতভাবে দাঁড়িয়ে থাকার জন্যই আমার জন্ম,
আর রিকশা আদতে কখনোই আসবে না, নাম ধরে ডাকবে না কেউ,
কারণ আমি ধূসরতম সম্ভাষণের সন্তান, উচ্চারণেই আগেই
যার পা পিছলে যায়, আর যে ঢলে পড়ে ভিড়ে, নর্দমায়, আপতনে;
পচাগলা নামের অ্যাকুয়ারিয়ামে, পরিণতিশীল, লঘু, ভেল্কিবাজ মাছের মতন।
১৯।
কোনো তুষারই ঝরতে চায় না, কক্ষনো পারে না তা চাইতে;
সকাল হয়ে গেলো, অথচ চোখে এক ফোঁটা ঘুমের দেখা নেই,
আমার ভেতরে-বাইরে ছারপোকাদের কিচিরমিচির, ডিগবাজি খেয়ে
ওরা লাফিয়ে পড়ছে আমার নাজেহাল মাংসে, আর আমি দিলদার হ’য়ে শুয়ে আছি,
যেনো এই মাংস অসীম, যেনো এই রক্ত অফুরান, যেনো প্রেম আসবেই পিলপিল পায়ে হেঁটে;
কোনো ছারপোকাই চায় না কামড়াতে, উল্টো মারণ কামড় খায়
নিজেরাও, খুনী মনে করে নিজেদের; দিনের বেলায় ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখে শত শত;
কাল রাতে এক মিলনোৎসব থেকে পেট পুরে খেয়ে ফিরেছি, আর ভেবেছি
আমিও বোধ হয় হতে পারলাম পালের গরু, ঝাঁকের কই, উচ্ছল, সম্পূরক, মামুলি;
অথচ ঠিকই ঘুম আসলো না, বেজায় নিষ্ঠুর হয়ে আমি ঠিকই জেগে রইলাম ভরপুর;
আর অন্তত অনন্তকাল ধরে এইভাবে না ঘুমোতে না ঘুমোতে শুয়ে শুয়ে ভেবেছি
কাল সারাটা দিন কীভাবে কাটবে, আমি বেঁচে থাকতে পারবো তো, নাকি কালকেও তুষার ঝরবে
অনিচ্ছা সত্ত্বেও, আর আমার দোলনা থেকে কবর অব্দি ঢেকে যাবে আন্তরিক তুষারে তুষারে?
নাকি আমি মাথা হেঁট করে, ছারপোকাদের কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ ডিগবাজি খেয়ে
ভুলে যাবো সবকিছু, আর হঠাৎ প্রেম আসবে ধেয়ে, আর আমি চাইলেও একা থাকতে পারবো না?
কোনো তুষারই কখনো ঝরতে চায় না, কস্মিনকালেও কোনো সূর্য চায় না
তাকে সূর্যাস্ত বলে ডাকা হোক; নেহাত ঘুমোতে পারছি না বলে এইসব আবোল-তাবোল,
পচা-গলা কিচিরমিচির আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখছে, আমি নেহাত জেগে থাকতে থাকতে হতাশ,
জেগে থাকাই আসল ছারপোকা; আর বাইরে সমস্ত চরাচর থরথর করে কাঁপলেও কিছু টের পাই না,
কারণ আমি নিজেও আরো বেশি করে কাঁপছি, আরো বেশি করে কান্না আমার চোখ-মুখ চেটে খাচ্ছে;
আমি চাইনি মানুষ হতে, কেউই তা চায়নি; অথচ ঘুম-না-পড়া ভূতের মতো
ঠিকই পায়চারি করছি, প্রায়শ্চিত্ত করছি অতীতের, এইভাবে ভয়ানক জেগে থেকে থেকে,
আর মাংসের ভেতর থেকে আঁশটে গন্ধ টেনে টেনে, কোনো রকমে মানুষ হয়ে বাঁচছি
ছারপোকাদের উৎসবে, আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি, ভাবছি আর হাসছি,
এ কী তেলেসমাতি তোমার! যার কিচ্ছু হওয়ার কথা নয়, সে মানুষ; আর যার মানুষ হওয়ার কথা, সে?
২০।
অসম্ভবের গন্ধ পাচ্ছি চারিদিকে।
আরো একটা সকাল হতে চললো:
আরো একটা দীর্ঘ সকাল;
মিনিটে মিনিটে এপাশ ওপাশ করতে করতে
আমি গুটিয়ে যাচ্ছি পচা কেন্নোর মতো বিশ্রীরকম।
যেনো কেউ কিছু রান্না করছে আশেপাশেই কোথাও।
অসম্ভবের গন্ধ ম ম করছে হাওয়ায়,
আর আমি আজকের পুরনো সকাল থেকে ফিরে যাচ্ছি
পুরনো দিনের কোনো নতুন সকালে, মাশরেফা।
এইবার শান্তি লাগবেই লাগবে। কাজ হবেই হবে ওষুধে।
অস্ত যাচ্ছি আমি। অস্ত যাচ্ছে ঘড়ি।
অস্ত যাচ্ছে দেশ-বিদেশ, অস্ত যাচ্ছে পাসপোর্ট।
আমি আর কোনো সম্ভাব্যতায় নেই, সুযোগে নেই;
আস্তরণ খসে পড়ে গেছে, কাছা খুলে গেছে আমার ভাগ্যের।
গভীর গন্ধে দু’চোখ আসছে জড়িয়ে
যদিও ঘুম অসম্ভব, যেমন তুমি অসম্ভব,
আর হাওয়ায় এই অসম্ভবের গন্ধ আসলে তোমারই গন্ধ, মাশরেফা;
সূর্য উঠছে, অথচ আমি ক্রমশ অস্ত যাচ্ছি,
নরকের মতো অন্তহীন এই সকালে, স্বপ্ন দেখছি মাপজোখহীন।
আমার যখন ঘুম আসবে, মাশরেফা,
তখন মধ্যগগন নক্ষত্রের উষ্ণ চুমোয় কাঁপতে কাঁপতে
ঢলে পড়বে দিগন্তহীন, ঝানু শহরের স্যাতসেতে তক্তপোশে;
যদিও আমার চারপাশ তখনো অসম্ভবের ভারি গন্ধে ভরপুর;
আর খাট-পালঙ্ক, ল্যাপটপ আর ধ্বংসের যাবতীয় উপকরণে
নেমে আসছে কালঘুম আর হাজার হাজার জোনাকির মতো ব্যাহত দিনের গরিমা।
২১।
তোমার মুখের দিকে তাকাবো যে সে উপায় নেই।
কী বিষাদ মেখে আছো, কী যে বর্ষা, কী যে হাহাকার;
ওই দু'টি চোখে যেনো অনেক দিনের সজলতা;
তাকালেই মনে হয় এই একটু আগেই কেঁদেছো।
এই ক'টা দিনে যেনো আরো বেশি রহস্যে উন্মনা-
হাজার হলুদ পাতা সারা মুখে, দুর্বোধ্য চিবুকে;
আমি প্রস্তুত; কিন্তু এতো ঝরা পাতার আড়ালে
কোনটা তোমার তুমি, কী করে যে জানবো, বুঝি না!
এতো আকুলতা নিয়ে বসে আছো দু’হাত সামনেই-
তবু তোমার মুখের দিকে তাকাবো যে সে বিশ্বাস নেই!