মিছিলের আড়ালে শ্মশানযাত্রালেখক : শংকর হালদার শৈলবালা
রচনাকাল : ১৫ অক্টোবর, ২০২৬
পৌষের মাঝামাঝি সময়। বিকেল চারটে বাজতেই দত্তপুলিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের পানিখালী পথগুলোতে শীতের ধূসর কুয়াশা আরও ঘন হয়ে জাঁকিয়ে বসছিল। বাতাস বইছিল হু-হু করে—যে বাতাসে ঠান্ডা যতটা না ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল এক অদ্ভুত নীরব নিস্তব্ধতা আর স্বজন হারানোর আতঙ্ক।
পানিখালী বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মোড়ে তখন শত শত কর্মীর ভিড়। মাইকে কানফাটা আওয়াজ ভেসে আসছে—
*"আজকের এই সর্বাত্মক ২৪ ঘণ্টার চাকা বন্ধ সফল করার জন্য সংগ্রামী লাল সেলাম! মেহনতি মানুষের রক্তে অর্জিত আন্দোলনকে কোনো বুর্জোয়া চক্রান্ত স্তব্ধ করতে পারবে না! এক ফোঁটা তেল জ্বলবে না, কোনো চাকা ঘুরবে না!"*
মাইকের এই উগ্র ও বিকট প্রতিধ্বনির ঠিক তিরিশ গজ দূরে, পথপাশের এক জং-ধরা জরাজীর্ণ শেডের নিচে কাঠের খাটিয়ায় শুয়েছিলেন পঞ্চাননবাবু। বয়স ষাটের ঘর ছুঁয়েছে। জীবনভর গ্রামের হাইস্কুলে শিক্ষকতা করে আসা এক সহজ-সরল নিঃস্ব মানুষ। কয়েক ঘণ্টা ধরে লিভারের তীব্র যন্ত্রণা আর অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণে ছটফট করছেন তিনি। তাঁর মুখ দিয়ে মাঝে মাঝেই সামান্য ফেনিল রক্ত বেরিয়ে আসছে।
পাশে হাঁটু মুড়ে বসে আছে তাঁর চব্বিশ বছরের তরুণী মেয়ে অণিমা। মেয়েটির চোখের জল শুকিয়ে এখন কান্নায় রূপ নেওয়ার ক্ষমতাও হারিয়েছে। পকেটে গচ্ছিত রাখা কয়েকটা মাত্র টাকা আর এক চিলতে আকুল প্রার্থনা—যদি একটা অ্যাম্বুলেন্স মেলে! যদি কোনো একটা চালক দয়া করে অন্তত হাসপাতালে পঞ্চাননবাবুকে নিয়ে যায়!
কিন্তু চারপাশের মোড়গুলোতে দলীয় ক্যাডারদের লাঠি হাতে পাহারা। কোনো রিকশা, সাইকেল বা তিন চাকার ভ্যান পর্যন্ত চলতে দেওয়া হচ্ছে না।
অণিমা কাঁপতে কাঁপতে হাত থেকে মোবাইলটা তুলে নিয়ে আবারও ফোন করল স্থানীয় যুব পার্টি অফিসের ল্যান্ডলাইন নম্বরে।
ওপাশ থেকে ভেসে এল এক যান্ত্রিক কণ্ঠ—
*"হ্যালো, পার্টি অফিস। বলুন।"*
অণিমা ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, *"দাদা, আমি রিটায়ার্ড মাস্টারমশাই পঞ্চানন সেনের মেয়ে অণিমা বলছি। বাবা আর বাঁচবে না দাদা! দুপুর থেকে রক্তবমি হচ্ছে, শরীর নীল হয়ে আসছে। আপনারা অন্তত একটা ট্যাক্সি বা অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দিন না! বন্ধের দিন রাস্তায় তো কোনো গাড়ি চলতে দিচ্ছে না আপনাদের ছেলেরা!"*
ওপার থেকে পার্টির অঞ্চল সম্পাদক সুজিতের অত্যন্ত উদাসীন, শীতল ও যান্ত্রিক গলা ভেসে এল—
*"দেখুন অণিমাদি, নীতি তো সবার জন্য এক। আজকের এই পথ অবরোধ আমাদের দলের অস্তিত্বের আর সম্মানের লড়াই। নেতৃত্ব ওপর থেকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে—আজ একটা সাইকেল বা ভ্যানও যেন রাস্তায় না চলে। আমরা নীতি ভঙ্গ করতে পারি না। আপনার বাবার শারীরিক অবস্থার কথা আমরা বুঝতে পারছি, কিন্তু আন্দোলনের বৃহত্তর স্বার্থে একটু ধৈর্য ধরুন। আর আপনার নিজের ভাই সৌরভই তো আজ আমাদের এই অঞ্চলের পিকেটিং দলের প্রধান হয়ে পাশের ব্লকে মিছিল পরিচালনা করছে। সে ফিরুক, তার সঙ্গে কথা বলুন।"*
ফোনটা কেটে গেল। অণিমার হাত থেকে মোবাইলটা যেন খসে পাথরের মেঝেতে পড়ে গেল।
পাশের রাস্তায় তখন মাইকের বিকট আওয়াজের সাথে উল্লাস চলছিল। সেখানে ব্যানার ধরে মিছিলের একেবারে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে হাঁটছিল অণিমার নিজের গর্ভজাত দাদা—সৌরভ সেন। মুখে তার উগ্র হুংকার—
*"আমাদের রক্তে কেনা দাবি মানতে হবে! জনজীবনের স্বার্থে আমাদের লড়াই চলছে, চলবে!"*
মাইকে সৌরভের গর্জন শুনে মনে হচ্ছিল, গোটা পৃথিবীর সমস্ত শোষিত মানুষের একমাত্র রক্ষাকর্তা বুঝি সে-ই! কিন্তু সেই মাইকের কৃত্রিম আওয়াজ ঢেকে দিচ্ছিল তার নিজের ঘরের ক্যানসারগ্রস্ত ও রক্তবমি করা জন্মদাতা পিতার অন্তিম জীবনের গোঙানির শব্দ।
দুপুর গড়িয়ে যখন সাড়ে পাঁচটা বাজল, কুয়াশার চাদর পুরো পানিখালী কে গিলে খেল। পঞ্চাননবাবুর ছটফটানিটা হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে এল। তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাসের দ্রুততা কমে গিয়ে এক দীর্ঘ বুকচেরা টান উঠল। তারপর চোখ দুটো স্থির হয়ে আটকে রইল আকাশের পানে।
পানীখালী থেকে পাশের দত্তপুলিয়া হাসপাতালের দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার ও সব্দালপুর হাসপাতাল ৪ কিলোমিটার; সাধারণ দিনে যা অতিক্রম করতে সময় লাগে মাত্র দশ মিনিট। কিন্তু আজকের এই রাজনৈতিক জেদ, ক্ষমতার দম্ভ আর অহংকারের জাঁতাকলে পড়ে সেই দশ মিনিটের পথটা অণিমার কাছে হাজার আলোকবর্ষ দূরের এক অচেনা গ্রহ বলে মনে হচ্ছিল।
অণিমা একা, জনমানবহীন সেই পথপাশে পিতার নিথর দেহের ওপর ভেঙে পড়ল। রক্তশূন্য, ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া বাপের হাত দুটো চেপে ধরে সে যখন ডুকরে কেঁদে উঠল, তখনো কিন্তু মোড়ের মাইকে নেতার জয়ধ্বনি ও স্লোগান থামেনি। সেখানে তখন একে অপরের সাফল্য নিয়ে হাততালি দিচ্ছিল।
সন্ধ্যা ছয়টায় বিজয়ের উল্লাসে লাল আবীর মেখে, ডজনখানেক মটর বাইকের হর্ন বাজিয়ে শোভাযাত্রা নিয়ে মোড়ে এসে থামল অণিমার দাদা সৌরভ। আজকের এই 'সফল বন্ধ' পালনের পুরস্কার হিসেবে দল তাকে আগামী পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রার্থী সহ পঞ্চায়েত প্রধান করার ঘোষণা দিয়েছে। তাই তার গলায় বিশাল এক রজনীগন্ধার মালা, মুখে এক অসীম জয়ের অহংকার।
তাকে ঘিরে সমর্থকেরা স্লোগান দিচ্ছিল—
*"সংগ্রামের জয় হলো! আমাদের তরুণ নেতা সৌরভ সেন এগিয়ে চলো!"*
বাইক থেকে নেমে অহংকারের সাথে যখন সৌরভ জং-ধরা শেডটার দিকে পা বাড়াল, তার চোখ গিয়ে পড়ল কাঠের খাটিয়ায় শ্বেতবস্ত্রে ঢাকা দেহটার ওপর। অণিমা ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে উঠল। তার চোখ থেকে তখন আর জল পড়ছে না, সেখানে জমে আছে কেবল ঘৃণা আর ধিক্কার।
সৌরভ থমকে দাঁড়িয়ে বলল, *"এ কী! বাবাকে এখানে খাটিয়ায় শুইয়ে রেখেছিস কেন? তোরা হাসপাতালে যাসনি?"*
অণিমা কোনো চিৎকার করল না, কোনো হট্টগোল করল না। অত্যন্ত শান্ত, গম্ভীর ও হিমশীতল গলায় বলল—
*"হাসপাতালে কীভাবে যাব দাদা? আজ যে তোদের নীতির জয় হয়েছে! তোদের ডাকা এই 'জনস্বার্থের' বন্ধ সফল করতে গিয়ে রাস্তার ওপর একটা অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে মানুষটা বমি করতে করতে মরে গেল। তুই জিতে গেছিস দাদা, তোর রাজনীতি আর দল আজ পরম জয়ী হয়েছে... শুধু হেরে গেল আমাদের রক্তমাংসের এই অবহেলিত পরিবারটা।"*
কথাটা শেষ করেই অণিমা দাদার গলা থেকে সেই ভারী রজনীগন্ধার বিজয়ী মালাটা এক হেঁচকায় টেনে ছিঁড়ে রক্তশূন্য, ফ্যাকাশে পিতার মৃতদেহের ওপর ছড়িয়ে দিল।
সৌরভ সেন এক মুহূর্তের জন্য যেন পাথর হয়ে গেল। তার হাত থেকে বাইকের চাবিটা খসে মাটিতে পড়ে গেল। মিছিলে আনা জয়ের লাল আবীরগুলো পৌষের বাতাসে উড়ে এসে ঢেকে দিতে লাগল এক মৃত পিতার শ্বেতবস্ত্র, আর তার পেছনে তখনও বাজছিল অন্ধ রাজনীতির এক নীতিহীন জয়ধ্বনি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।