এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • যাবার পথ খাবার পথ

    প্রবুদ্ধ বাগচী লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৩৫ বার পঠিত
  • আজ অন্তিম পর্ব
    যাবার পথ খাবার পথ (অষ্টম পর্ব)

    মধ্য কলকাতার খাবার পথের কথা বলতে বসলে ইতিহাস বিখ্যাত ডেকার্স লেনের উল্লেখ না করে উপায় নেই। কিন্তু সাধারণভাবে ডেকার্স লেনের খ্যাতি থাকলেও বাস্তবে ওই সংকীর্ণ রাস্তাটি ধরে উত্তরে এগিয়ে গেলে দেখা যায় আরও বেশ কিছু সংকীর্ণ গলিপথ। যার কিছু এসে পড়েছে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের পাশের রাস্তায়, কোনোটা আরও ঘুরে এসে পড়েছে বেন্টিংক স্ট্রিটে, কোনোটা আবার শেষ হয়েছে ওয়াটারলু স্ট্রিটে। পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখেছি এগুলিকে ঠিক যাবার পথের আভিজাত্য দেওয়া যায় না, বড় জোর পায়ে চলা পথ বলা যায় —-- কিন্তু ডেকার্স লেনকে কেন্দ্রে রাখলে এগুলি তার শাখা পথ, যাকে ষোলো আনা খাবার পথের মর্যাদা দিতে হবে। ডাঃ বারীন রায়ের চেম্বার-খ্যাত ওই ওয়াটারলু স্ট্রিট দিয়ে ঢুকলেই আরম্ভ হবে খাদ্যসম্ভার। পোস্টাল আকাউন্টস এর বড় বাড়িটির নিচে দাঁড়িয়ে আছেন একজন বেলের সরবত নিয়ে। আশেপাশে রকমারি আরও খাবার যা এই এলাকার অন্যান্য পাড়ার মতোই রোচক ও স্বাদু। ডেকার্স লেনে ঢোকার আগের অংশেই কিন্তু মিলবে বেশ কিছু খাদ্যসত্র। অফিস বেলার দুপুরে সেখানে ভাত, রুটি ছাড়াও লুচি বা পরোটা পাওয়া মোটেও দুষ্কর নয়। বেশ মনে পড়ে, নয়ের দশকের মাঝামাঝি এক গান-বন্ধু তখন রাজভবনের ভিতরে অবস্থিত পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের অফিসে বসেন, আরেকজন নাট্যকার তথা পরিচালক পিয়ারলেস ভবনে আর একজন লোকসংগীত গায়ক ও সংগ্রাহক রাইটার্সে। তাঁদের টিফিনবেলার পার্লামেন্ট ছিল এমনই একটি দোকান। বেশ কিছুকাল তাঁদের মধ্যাহ্ন অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি আর সামনের কলাপাতায় টপাটপ এসে পড়েছে গরম লুচি আর ছোলার ডাল অথবা আলুর দম। তাদেরই একজন চেনা দোকানিকে হেঁকে বলতেন, ওরে আরও দুটো নুচি দে দেখি ! টিপিক্যাল উত্তর কলকাতার সুবাস লেগে আছে সেই ডাকে। রাস্তার ধারে হাত ধোওয়া আর এঁটো বাসন মেজে নেওয়ার আপাত আনহাইজিনিক ব্যবস্থার মধ্যেও এমন পরিপাটি আয়োজনে একটা স্নিগ্ধতা আছে বইকি। ফ্রান্সের এক খাদ্যরসিক ‘বঁ ভিভিউ’ ছদ্মনামে ‘ওয়াইনিং অ্যান্ড ডাইনিং ইন ফ্রান্স’ শিরোনামে একটি বইয়ে লিখেছিলেন (১৯৫৮) ‘Some of France’s most primitive establishment provide some of France’s most memorable foods’ —--- কলকাতার পথেঘাটে অলিতে গলিতে যারা খাবার খেয়ে বেড়ান তাঁরা এর মর্ম ভালই বুঝবেন (সূত্র : কলকাতার ফিরিওয়ালার ডাক ও রাস্তার আওয়াজ — রাধাপ্রসাদ গুপ্ত)। সুরসিক রাধাপ্রসাদ ওরফে সাঁটুলবাবু লিখেছেন,খাবারদাবারে পরিমিত ভেজাল আর ময়লা না থাকলে তার স্বাদ খোলে না। স্বনামধন্য কমলকুমার মজুমদারকে নিয়ে একটা জনশ্রুতি আছে যে তিনি এক জনৈক ‘বাঙালের’ ঘাড় ধরে মারতে উদ্যত হয়েছিলেন, কারণ কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে সে দাবি করেছিল পদ্মার ইলিশ গঙ্গার ইলিশের থেকে মিষ্টি ! কমলকুমারের অকাট্য যুক্তি ছিল, ব্যাটা জানে না, গঙ্গার ইলিশ আজ দেড়শ বছর ধরে কোম্পানির তেল খাচ্ছে। পরিমিত পলিউশান খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে তোলার ক্ষেত্রে এক অমর উপাদান। আর আছে নিত্যদিন একই দোকানে আসার ফলে দোকানি ও তার সহকারীদের সঙ্গে মানবিক সম্পর্কের বুনন। পথের খাবারের ব্যাপ্ত ভুবনে এই বাড়তি পরিসরটা একেবারে উপেক্ষা করার নয়।


    তবে ডেকার্স লেনের সঙ্গে একাকার হয়ে আছে যে প্রবাদপুরুষের নাম তিনি চিত্তদা। আজকাল এন্টারপ্রেনারশিপ বা স্টার্ট আপ এসব গাল্ভারি বিষয় নিয়ে আলোচনার ছড়াছড়ি, কিন্তু একেবারে আক্ষরিক অর্থে কুড়ি বর্গফুটেরও কম একটা দোকান ঘরের পরিকাঠামো নিয়ে আর রাস্তায় বেঞ্চি পেতে পঁচাত্তর বছর আগে যে পুববাংলার মানুষটি চা-টোস্ট দিয়ে শুরু করেছিলেন আজ তার তৃতীয় প্রজন্ম একই জায়গায় স্থিত। আড়ে বহরে বেড়েছে তাঁদের ব্যবসা। চা টোস্ট থেকে ক্রমে তাঁদের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে নানারকম স্টু, ফিস ফ্রাই আর ডিমের ডেভিলে। রাস্তায় বেঞ্চি পেতে সারাদিনে কত মানুষ যে এখানে খেতে আসেন তার হিসেব নেই। অবশ্য একেবারে হিসেব নেই তা নয় কারণ, মধ্য কলকাতার ওইরকম দামী জায়গায় নয়ের দশকের শেষেই চিত্তদা একটা রেস্টুরেন্ট তৈরি করে ফেলেন। সেই ‘সুরুচি রেস্টুরেন্ট’এর আওতায় এইসব মেনুই পাওয়া যায় চেয়ার টেবিলে বসে খাওয়ার, সঙ্গে চিলি চিকেন, ফ্রায়েড রাইস, বিরিয়ানি। ‘সুরুচি’ ক্যাটারার সংস্থাও চালান — তাঁদের খাঁটি ভেটকির ফ্রাই শেষ পাতে পড়েছিল এক বিয়েবাড়িতে, বছর পনেরো আগে। কিন্তু এখনো চিত্তদার ওই চা আর টোস্ট এবং স্টু প্রায় কিম্বদন্তী। শুনেছি, আশেপাশের কোনো বাড়িতে মান্না দে আড্ডা দিতে এলে তার জন্য ফিস ফ্রাই যেত এই দোকান থেকেই। আর মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের খেলোয়াড়দের সকালবেলার ময়দানে অনুশীলনপর্বের পর স্টু আজো সরবরাহ করা হয় এখান থেকেই। স্বয়ং সৌরভও স্টু খেতে আসতেন সুরুচির টেবিলে। যদিও একথা বলা দরকার, চিত্তদার আশে পাশে এখন আরও নানান দোকান পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যারা প্রকান্ড কড়াইয়ে সিদ্ধ করে চলেছেন কেজি কেজি চাউমিন, লাল কাপড়ে মোড়া হাঁড়িতে বসেছে বিরিয়ানির পসরা, আছে চানা, পনির মশালা, কর্ন টোস্ট। একটু অস্বস্তি হলেও বলতে হচ্ছে এই দোকানগুলি ইদানিং যারা চালাচ্ছেন বলে দেখছি তাঁরা মূলত হিন্দিভাষী। খবরটা সঠিক কি না জানি না, শুনেছি চিত্তদার দোকানেরও সম্ভবত হাত বদল হয়েছে। যদিও সেই ঝটপট সার্ভিস, হাতে চারটে স্টুয়ের প্লেট নিয়ে গিজগিজে লোকের পাশ কাটিয়ে খদ্দেরদের হাতে খাবার পৌঁছে দেওয়া বা অর্ডার দেওয়া খাবারের মধ্যেও একটা ডিমের ডেভিল গুঁজে দিয়ে ‘একবার খেয়েই দেখুন না’ বলে মন জয় করা হাসি এগুলো এখনো অপ্রতিরোধ্য বাস্তব হয়েই জেগে আছে সেই খাবার পথে।
    খাবার পথের আখ্যান লিখতে গেলে শুধুই যে মধ্য কলকাতার মূল অফিসপাড়ার কথা লিখতে হবে তা নয়। গত কয়েক দশকে সরকারি বেসরকারি নানা অফিস ছড়িয়ে পড়েছে আরও নানা জায়গায়। ধর্মতলা বা বিবাদী বাগ থেকে খানিকদূরেই পার্ক স্ট্রিট থেকে এক্সাইড মোড় হয়ে অন্তত মিন্টো পার্ক পর্যন্ত একটা কাজের এলাকা যেখানে কাজে আসেন নানা রকমের মানুষ। যাবার পথ এখানেও সংগত করছে খাবার পথের। বিশেষ করে পার্ক স্ট্রিটে মেট্রো রেল ভবন থেকে জীবনদীপ বাড়িটা পর্যন্ত হরেক খাবারের জোগান আছে পথে পথে। আবার সেক্সপিয়ার সরণি হয়ে নিজাম প্যালেস সেখানেও একই রকম খাবারের আয়োজন। এসব এলাকায় যে ঘুরে বেড়াইনি তা নয়, তবে যদি বৈচিত্র্যের কথা বলতে হয় তার আলাদা কোনো বিচ্ছুরণ এখানে নেই যা আছে খোদ সাবেকি অফিস পাড়ায়। আরেকটা তথ্যও এখানে উল্লেখ জরুরি তা হল, এই এলাকায় বেসরকারি অফিসের প্রাধান্য বেশি। সেই সব অফিসের অনেকেরই হয়তো নিজস্ব ক্যান্টিন আছে অথবা না থাকলেও সেখানকার কর্মীরা টিফিনের পেছনে কিছু বেশি অর্থ ব্যয় করতে সমর্থ। বিদেশি ব্যাঙ্ক, বহুজাতিক সংস্থা, বেসরকারি ব্যাঙ্ক বা আর্থিক সংস্থা —- এঁদের উপযোগী খাবার জোগান দিতে হয় বলে এই এলাকায় পথের খাবারের দাম কিছু চড়া। রাইটার্সের পেছনে দশ টাকায় যতটা মশলা মুড়ি পাওয়া যাবে ওই একই পরিমাণ মুড়ির জন্য ক্যামাক স্ট্রিটের মোড়ে আপনার খরচ হবে কুড়ি টাকা। আরও একটা দিক আছে। এই এলাকায় বিভিন্ন সংস্থার যেসব অফিস সেখানে নিরামিষাশাসীর সংখ্যা তুলনায় বেশি —-- তাই ধোসা, বড়া, রুটি- সব্জি ইত্যাদি খাবারের বিপণি বেশি, তুলনায় বেশ কম আমিষ খাবারের স্টল। নিজাম প্যালেসের গেটের সামনে বেশ কিছু খাবার দোকান আছে সেগুলিতেও রোল, চাউমিন, চিলি চিকেনের সন্ধান মিলবে কম। একই কলকাতার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন কলকাতার এও এক রূপ। অবশ্য, এক্সাইড মোড় থেকে যদি বামে না গিয়ে ডাইনে যাই তাহলে আবার এক অন্য এলাকা। শিশির মঞ্চ থেকে শুরু হয়ে গগনেন্দ্র প্রদর্শনশালা, নন্দন, বাংলা আকাডেমি, রবীন্দ্র সদন হয়ে সেই আকাডেমি অফ ফাইন আর্টস। এখানে আসেন কালচারাল বাঙালি এবং তাঁদেরও খিদে পায়। নাটক বা সিনেমা দেখার আগে ক্ষুন্নিবৃত্তি না হলে কি উপভোগ করা যায় শিল্পের রস ? সেই আটের দশক থেকেই এই চত্বরে যাতায়াতের সূত্রে বলতেই পারি এখানেও সাংস্কৃতিক বাঙালির ক্ষুধারসকে সুধারসে ভরিয়ে তোলার আয়োজন ছিল পথের ধারের চায়ের দোকানে, ভেলপুরি বা ফুচকায়, রোল চাউমিনের স্টলে, চপ, ফিস্ফ্রাইয়ের আসঙ্গলিপ্সায়। নয়ের দশকেই নন্দন চত্বরে একটি সরকারি ক্যান্টিন লিজে দেওয়া হয় কোনো বেসরকারি সংস্থাকে, সেখানে দাম ছিল বেশি। কিন্তু আকাডেমির সামনের ওই সুখ্যাত চায়ের দোকান ‘হরি টি স্টল’ বা হরির দোকান নাট্যমোদী দর্শক শুধু নয় অভিনেতা পরিচালকদেরও অনিবার্য গন্তব্য হতে দেখেছি। নিজের দলের শো থাকলে রুদ্রপ্রসাদ বা বিভাস চক্রবর্তী কিংবা অশোক মুখোপাধ্যায়, অরুণ মুখোপাধ্যায়রা ওই দোকানে কিঞ্চিৎ কালাতিপাত না করে গ্রিন রুমে ঢুকতেন না। ইদানিং ওই দোকানটির পাশে আরও দুটো বড় স্টল যেখানে চা আর রকমারি খাবারের জোগান দিয়ে ওঠা যায় না। আর বেশ কয়েক বছর আগে তৈরি হওয়া ‘রাণুচ্ছায়া মঞ্চ’ চিনবার চিহ্ন ওই ‘হরির দোকান’। এভাবেই পথের খাবার থেকে তৈরি হয় পথের একরকম সংস্কৃতি, পথের সঞ্চয়।

    শ্যামবাজার- হাতিবাগান সেই অর্থে আপিসপাড়া নয়। তবে একসময় ওই হাতিবাগান পাড়ার নাটক ও সিনেমাপাড়ার দৌলতে পথের খাবারের এক রেওয়াজ গড়ে উঠেছিল। আশির দশকের মাঝামাঝি অবধি সেই পেশাদারি রঙ্গমঞ্চের রমরমা আমাদেরও দেখবার সুযোগ হয়েছে, সুযোগ হয়েছে ওইটুকু এলাকার মধ্যে অন্তত ছয় সাতটি সিনেমাহলের সাম্রাজ্যবিস্তার চাক্ষুষ করার। কিন্তু কালের গতিকে এখন সবই অলীক। এলাকার ছোটখাটো পথের খাবার আজ আর নেই, পরিবর্তে নামী ফুডচেনের প্রায় সবগুলিই এখানে খুলে ফেলেছে তাঁদের প্রকান্ড শাখা— সুশোভিত, সুশীতল, শোভন। শ্যামবাজারে হাতিবাগানে ‘আরসালান’, ‘আমিনিয়া’, ‘ভূতের রাজা দিল বর’, ‘ভজহরি মান্না’, ‘রাজবাড়ি’ সুবিখ্যাত এইসব খাদ্যসত্র এখন বিশ্বায়ন-উত্তর ক্রেতা মধ্যবিত্তের পেটপুজোর মন্নদির।কিন্তু ফড়েপুকুরের মোড়ে সুবিখ্যাত ‘সঞ্জীবনী’ চালু ছিল নয়ের দশকের শেষ অবধি। এখানেই বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিতেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, তখন তিনি শ্যামপুকুরের বাসিন্দা। সেসব আজ আর নেই। তবে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডের দিকে কিছুটা পথ এখনও খাবারের গন্ধে ভরপুর। বিখ্যাত গোলবাড়ির পাশ দিয়ে আরও দক্ষিণে এগোলে রাস্তায় এখনও পাওয়া যাবে ধোসা, দইবড়া, ইডলি চানা-মশলা —-- মিলবে রোল চাউমিন ফ্রায়েড রাইসের সঙ্গে ইদানিং চালু হওয়া নানা রং ও ঢং এর গরম মোমো। এই খাবার পথের দৈর্ঘ্য বেশি নয়, কলকাতা ইলেক্ট্রিক সাপ্লাইয়ের উত্তর আঞ্চলিক অফিসটা অবধি —-- কিন্তু এ পথেও মানুষ আছেন যারা নিয়মিত এখানে খেতে আসেন। তাঁরা ঠিক অফিস পাড়ার নন, হয়তো হাতিবাগানের মাঝারি মাপের ক্রেতা, অল্প কেনাকাটা করে সামান্য কিছু খেয়ে নেন। অথবা বাড়িতেও নিয়ে যেতে চান, যার পোশাকী নাম পার্সেল। একইভাবে কলেজ স্ট্রিট এলাকায় দুটো তিনটে দোকানের কথা বলি। কলেজ স্ট্রিট বইয়ের পাড়া, সেখানে বই পড়ুয়া ও পাঠকের জন্য তেমন কোনো নামী খাদ্যসত্র নেই। কিন্তু পাতিরামের বুক স্টলের পাশেই সন্তোষের মিষ্টির দোকানের বিপরীতে আছে কিছু দোকান। একটায় পাওয়া যাবে রোল চাউমিন, আর বিপরীতে কলেজ রো-র মুখের দোকানে তন্দুরি রুটির সঙ্গে তড়কা, পনির বা ছোলার ডাল। আর তার ঠিক পাশেই জিলিপি আর চপ। পথ চলতি মানুষ এখানে কম নয়। ক্রেতারা ছাড়াও এলাকার অগুনতি দোকানের মালিক কর্মচারীরা এসব দোকানে দুপুরের খাবার সারেন। যাবার পথের পাশে পাশে এখানেও খাবার পথ বিছিয়ে রেখেছে তার দুদন্ডের শান্তির পসরা।
    এই প্রসঙ্গে হাওড়া স্টেশনের কথা না বললে তা হবে ইতিহাসের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। সেটা অফিসপাড়া নয়, কিন্তু রাজধানী কলকাতা থেকে অবশিষ্ট ভারতের দিকে যাওয়ার প্রধান গেটওয়ে। পাশাপাশি দুটি রেলপথের শহরতলি ট্রেনের বিপুল যাত্রী নিরন্তর আনাগোনা করেন এই পথে। তাই এই পথ যে খাবারের পথ হয়ে উঠবে এ প্রায় সমাজ অর্থনীতির অনিবার্য উপপাদ্য। তার ওপর আছে হাওড়ার বাস স্ট্যান্ড —-- যা একদিকে ট্রেন পরিষেবা রহিত মেদিনীপুর বা বাকুড়ার নানা প্রান্তে যাত্রী বহন করে, অন্যদিকে কলকাতার প্রান্তে প্রান্তরে পৌঁছে দেয় আরেক ধরনের বাস পরিষেবা। খাবার আছে সব পথেই। গঙ্গার ধারে ভাতের হোটেলগুলিতো এককালে ছিল কিম্বদন্তী। চল্লিশের দশকে কলকাতায় চাকরি করতে আসা আমার মাতামহের থেকে শুনেছি ওই ভাতের হোটেলের রমরমার কথা। আর নিজের অভিজ্ঞতায় দেখেছি কলকাতার বাসরুটগুলির জন্য যে আলাদা আলাদা চ্যানেল করা আছে তারই মধ্যে মধ্যে ছড়িয়ে আছে খাবারের উৎস। ধরা যাক, সাবওয়ের যে মুখ দিয়ে উঠে আমরা ডানদিকে পেয়ে যাব গড়িয়াগামী সাবেক পাঁচ ও ছয় নম্বর রুটের বাস আর বাঁ দিকে মূলত উত্তরের দিকে যাওয়ার বাস —-- ঠিক এই মাঝখানে মাথার ওপর কলকাতা স্টেট ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন এর অফিস আর নিচের প্রশস্ত জায়গাটি দোকানে দোকানে ছয়লাপ। চা বিস্কুট কেক তো আছেই, আছে পাউরুটি ঘুগনি, ডিমভাজা। অবশ্যই খুব অপরিষ্কার ও অপ্রশস্ত, গায়ে গায়ে দোকান। তবু তাঁদের ক্রেতার কমতি নেই। একটা সময় সন্ধ্যের দিকে নিয়মিত ওখানের একটি চায়ের দোকানে আধঘণ্টার মতো বসে থাকতাম। মুখচেনা হয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যের মুখে মুখে চোখে পড়ত সেখানকার সান্ধ্যজীবনের উঁকিঝুঁকি। তখন ক্রেতার ভিড় কমে এসেছে, সকলেরই ঘরে ফেরার তাড়া। যাবার পথ ফাঁকা হচ্ছে, খাবার পথও গুটিয়ে ফেলছে তার যেটুকু সম্বল। আবার আগামী সকাল মানে একটা নতুন দিন, নতুন বেচাকেনা নতুন খদ্দের, নতুন লাভ লোকসান।
    থাকবে, থাকবে। যাবার পথ আর খাবার পথ মিলেমিশেই থাকবে আমাদের নাগরিক জীবনে, আমাদের বেঁচে থাকার পা তোলায় পা ফেলায়, আমাদের সামাজিক উৎসবে, আমাদের রোজকার পাকস্থলীর টানে। নিত্যদিন আমাদের সঙ্গে তাঁদের দেখা হবে, হবে বিনিময়। সে এক মস্ত আলেখ্য যার কোনো শেষ নেই।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৩৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন