এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • যাবার পথ, খাবার পথ

    প্রবুদ্ধ বাগচী লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৬৬ বার পঠিত
  • যাবার পথ, খাবার পথ (তৃতীয় পর্ব)

    পথের খাবারের সঙ্গে একেবারে নিত্যদিনের দুবেলার যোগাযোগ তৈরি হয় নব্বই দশকের দ্বিতীয় বছরের প্রথম দিন থেকে। জীবিকাসূত্রে মধ্য কলকাতার একেবারে প্রাণকেন্দ্রে চাকরিস্থল হওয়ায় সে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতার বিস্তার। একদিকে ওয়েলিংটন এলাকার ‘হিন্দ সিনেমা’ —-- তার পাশেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিধান রায়ের বাড়ি, আরেকটু এগিয়ে ক্যালকাটা গার্লস স্কুল, যদি তার একটা সীমানা হয় তবে গণেশচন্দ্র এভিনিউ হয়ে মিশন রো পেরিয়ে তার আরেক প্রান্ত বিবাদি বাগের ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের মোড়ে ডেড লেটার অফিসের প্রকান্ড লালবাড়ি। আরেকটু দক্ষিণে ইউ বি আই এর হেড অফিস, গ্রেট ইস্টার্ণ হোটেলের আশপাশ। অন্যদিক দিয়ে ধরলে ‘স্টেটসম্যান হাউসে’র সামনে ‘টিপু সুলতান মসজিদ’ সংলগ্ন এলাকা থেকে সটান চিত্তরঞ্জন এভিনিউ ধরে উত্তর প্রান্তের পুরোনো ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের সিটি অফিস এবং তার বিপরীত দিকের ‘যোগাযোগ ভবন’। এই মূল সীমানার মধ্যে আছে বেশ কিছু গলিপথ। যেমন, ক্যালকাটা গার্লস স্কুলের পাশ দিয়ে ঢুকে যাওয়া রাস্তায় ইলেক্ট্রিক পট্টি, পুরনো বি জি প্রেস (বেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্রেস), আনন্দবাজার অফিসের সামনের প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট যা বেন্টিংক স্ট্রিট আর চিত্তরঞ্জন এভিনিউয়ের যোজক, আছে সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের কফিহাউস ‘হাউস অফ লর্ডস’ এর পাশের গলি মেরিডিথ স্ট্রিট, আছে বৌবাজার থানার সামনে কাপালিটোলা এলাকা, বো ব্যারাক, আছে মলঙ্গা লেন। বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট আর গণেশচন্দ্র এভিনিউয়ের সংযোগস্থল থেকে ডান দিকে ঘুরে লালবাজারের সামনে বসা অসংখ্য খাবারের বিপণি।
    এই এলাকায় দিনের একটা বড় সময় উপস্থিত থাকার সুবাদে ও বাড়ি থেকে টিফিন কৌটো নিয়ে আসার বদভ্যাস না থাকায় এলাকার প্রতিটি খাদ্য বিপণির স্বাদ নেওয়ার বিরল সৌভাগ্য আমি অর্জন করেছিলাম প্রায় সাড়ে ছয় বছর ধরে। এঁদের অনেককে খুব কাছ থেকে চিনতাম, শুনতাম এঁদের জীবনের নানা টুকিটাকি কথা। ধূসর স্মৃতির ভিতর আজও তা গেঁথে আছে। এগুলো যে খুব পরিকল্পনা-ভিত্তিক এমন মোটেও নয়। অফিস নামক একটি খাঁচাকে চাকরি জীবনের গোড়ার দিনটা থেকেই ঠিক মেনে নিতে পারিনি তাই টিফিন টাইমের পঁয়তাল্লিশ মিনিট ক্ষুধা নিরসন ও পথ হাঁটা ছিল খানিকটা নেশার মতো। তারই সূত্রে এই বিস্তৃত আয়তক্ষেত্রের বিভিন্ন স্থানাঙ্কে মিলে মিশে গেছে যাবার ও খাবার পথ। আর সেইসব বিক্রেতাদের হরেক চরিত্রের মুখোমুখি হয়ে স্বাদ পাওয়া গেছে বিচিত্র সব জীবনের। জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন ‘যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের/ মানুষের সাথে তার হয় না কো দেখা’ —-- এসব জীবন হয়তো তেমন জরুরি জীবন ততটা নয় কিন্তু আমরা আজকাল যাদের মেনস্ট্রিম বলি এগুলো অবশ্যই তার বাইরে।

    যেমন ধরা যাক, বেন্টিংক স্ট্রিট আর গণেশ এভিনিউএর মোড়ে পুরোনো ‘বিনি কোম্পানি’র শো রুমের সামনে বসা ঘুগনি বিক্রেতাটির কথা। প্রসঙ্গত, এই বিনি কোম্পানির কাপড় এককালে খুব চলত, বিশেষ করে মহিলাদের ব্লাউজের কাপড় ছিল গুণেমানে অদ্বিতীয় —-- ভারতের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী দলের (১৯৮৩) নামী ক্রিকেটার রজার বিনি এই পরিবারেরই সদস্য ছিলেন। প্রকান্ড এক হাঁড়িতে তিনি নিয়ে আসতেন ঘুগনি ও আলুর দম। নিরামিষ। হাঁড়ির আধখানা ঘুগনি আর বাকি আধখানা আলুর দমে ঠাসা। অনেকে দেখতাম ঘুগনি আর আলুর দম মিশিয়ে এক জায়গায় করে চাইতেন। আলাদা থালায় থাকত পেঁয়াজ লঙ্কা ধনেপাতা জিরেগুঁড়ো ও লম্বা লম্বা নারকেলের ফালি। খদ্দেরদের পরিবেশনের জন্য শালপাতা আর আইসক্রিমের চামচ। প্রায়ই টিফিনে তার কাছে ঘুগনি বা আলুর দম খেতে যেতাম —-- অত্যন্ত যত্নে ঘুগনি দিতেন পাতায়, তার ওপর কুচো পেঁয়াজ, ধনে পাতা, গুঁড়ো মশলা, বিট নুন। শীতকালে আলুর সঙ্গে থাকত মেশানো থাকত লালচে রঙের বিট। মানুষটি আদপে ওড়িশার, থাকেন কলকাতার কোন এক মলিন মেসে বা ওড়িয়াপাড়ার কোনো বারোয়ারি ঘরে। হয়তো অনেকে জানেন, কাঁকুড়গাছি মোড় থেকে যে রাস্তাটি, মানিকতলা মেন রোড, বিখ্যাত বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানার দিকে চলে গেছে সেখানে এগোলে ডানদিকে একটা ওড়িয়াপাড়া আছে। কলকাতায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এমন ওড়িয়া পল্লি আরও আছে যেখানে উৎকলবাসীরা একত্রে বাসা বেঁধে থাকেন। এই মানুষটি আমায় বলেছিলেন, দুই প্রজন্ম ধরে তাঁরা অফিসপাড়ায় এই ঘুগনি আর আলুর দমের কারবার করছেন। বেলা এগারোটা নাগাদ এসে বসেন এখানে, তিনটের মধ্যে হাঁড়ি ফাঁকা। বলেছিলেন, দেশে টাকা পাঠিয়ে ছেলেকে পড়াচ্ছেন, ছেলেটি নাকি পড়াশোনায় ভাল। সম্প্রতি তারই এক দেশোয়ালি ভাইকে নিয়ে এসেছেন এই একই পথে। তিনি কোথায় বসেন ? জানতে চাইলে বলেন, এই তো একটু আগে। মিশন রো ট্রাম কোম্পানির (ট্রাম কোম্পানি মানে সি টি সি অর্থাৎ ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কর্পোরেশন) হেড অফিসের সামনে। সত্যি বেন্টিংক স্ট্রিটের মোড় থেকে ট্রাম কোম্পানির অফিস আর কতটুকু ? একদিন যাওয়া গেল সেই দেশোয়ালি ভাইয়ের কাছে। ট্রাম কোম্পানির অফিসের পাশে আছে একটি ইন্সিওরেন্স কোম্পানির অফিস আর রাস্তার ওপর একটি পানশালা, নামটা এখন মনে নেই। এখানে একটা গল্পের আভাস দিয়ে রাখা যাক। যে বাড়িটির কথা এখন বলছি তার ঠিক পাশেই আছে এক প্রকান্ড পুরোনো বাড়ি যার অন্দরমহলে কয়েকশো কোম্পানির অফিস আর জেরক্সের দোকান যা মনে করিয়ে দেয় সত্যজিতের ‘জন অরণ্য’ ছবির সেই সুবিখ্যাত দৃশ্য —-- যেখানে উৎপল দত্ত ফিল্মের চরিত্র সোমনাথ-কে আঙুল তুলে দেখায় বড়বাজারের সেই বাণিজ্যমহলের হদিশ, যার একেকটা ঘরে তিনটে চারটে কোম্পানির অফিস। এই বাড়িরই তিনতলায় এক জেরক্সের দোকানের মালিক কীভাবে সময়ের ম্যাজিকে প্রখ্যাত ফেং শুই বিশারদ হয়ে গেলেন সেই ঘটনা আমার নিজের চোখে দেখা। তবে সেই গল্প আজ এখানে নয়। ওই পানশালার সামনেই ঘুগনি আলুর দমের হাঁড়ি নিয়ে বসে ছিলেন সেই দেশোয়ালি ভাই। বললাম, আজ তোমার হদিশ পেয়ে এলাম, তোমার ওই দেশের লোকই তো আমায় এখানে পাঠাল। জিজ্ঞেস করে জানা গেল, কলকাতায় কোন এক পাড়ায় যেখানে তাদের দুজনের মাথা গোঁজার ঠাঁই সেখানে একই সঙ্গে সকালে তৈরি হয় দুই হাঁড়ি খাবার। অফিস পাড়ায় হু হু করে কেটে যায় সেসব।


    সেবার বেশ কিছুদিন পরে বিনির দোকানের সামনে ঘুগনি আলুর দমের লোভে লোভে পৌঁছে দেখি মানুষটি নেই। তার কিছুদিন পরে আরও একদিন দেখলাম ওই নির্দিষ্ট জায়গাটা ফাঁকা। কী হল ? কোথায় গেলেন মানুষটি ? কী মনে করে আরেকটু এগিয়ে চলে যাই তার ওই দেশোয়ালি ভাইয়ের কাছে। সুস্বাদু টিফিনে পেট ভরিয়ে জানতে চাই ওই অনুপস্থিত মানুষটির কথা। ও দেশে গেছে। ছেলের অসুখের খবর এসেছে তাই। আবারও মাস খানেক পরে ওই পথে যেতে যেতে চোখে আসে তার ফেলে রাখা ফাঁকা জায়গাটা। অফিসপাড়ায় জায়গা বেশিদিন ফাঁকা রাখা যায় না, ফাঁকা থাকেও না — কেউ না কেউ আবার বসে পড়ে সেখানে। তবে দীর্ঘদিন ওই পাড়ায় ঘোরার সূত্রে দেখেছি এই এক আশ্চর্য ভ্রাতৃত্ববোধ, আজ যাকে শহুরে ভাষায় বলা হয় প্রফেশনাল ফ্র্যাটারনিটি —-- কেউ অনুপস্থিত থাকলে, অসুস্থ থাকলে, দেশে গেলে নতুন কেউ সেই জায়গা দখল করে নেয় না। তাই হয়তো ওই জায়গাটাও এখনো শূন্য। আরও দিন পনেরো পরে শূন্যস্থান দেখে আবারও চলে যাই সেই অন্য মানুষটির কাছে। জানতে পারি, অনুপস্থিত ঘুগনি বিক্রেতার রোগাক্রান্ত কিশোর ছেলেটি চলে গেছে তাঁকে ছেড়ে, মাত্র কদিনের জ্বরে। অনেক চেষ্টা করে কটকের হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও শেষরক্ষা হয়নি। মনটা ছেয়ে যায় আশ্চর্য এক বেদনায়। সেদিনের আলুর দমে যেন আর স্বাদ পাই না, ঘুগনিও যেন নামতে চায় না গলা দিয়ে। ওই মানুষটি আমার কেউ ছিল না তবুও কোথাও একটা মন খারাপ ঘিরে ফেলে অফিস পাড়ার প্রখর মধ্যাহ্ন।
    আমার কেবলই মনে হয়, এই আমাদের চেনা জীবনের সমান্তরালে কোথাও চলছে একটা অবতল জীবনের স্রোত। সেখানেও ওঠা পড়া, ভাঙা গড়া শোক আর আনন্দের ক্যানভাস। তবে এই কাহিনির পরিসমাপ্তি একেবারেই অন্যরকম। এসব ঘটনার পর বেশ কয়েকমাস কেটে গেছে। ব্যস্ততায় নানা কাজে ভুলে যেতে থাকি সেই চকিত শোকের ছবি। বিংশ শতাব্দীতে শোকের আয়ু একটা সিগারেটের চেয়ে বেশি নয়। আর তখনই আরেকবার আমার সঙ্গে দেখা হয়ে যায় সেই পুত্রহারা মানুষটির। স্থান-কাল-পাত্র হুবহু অভিন্ন। বেন্টিংক স্ট্রিটের মোড়, বিনি কোম্পানির শো রুম। মাথার ওপর বেলা দেড়টার সূর্য।
    কী ব্যাপার ? আপনি আবার ফিরে এলেন কবে ?
    তিনি আমার দিকে তাকান। শুকনো মুখ, না-কাটা দাড়িতে এলোমেলো। সব মিলিয়ে যেন ক্লিন্ন আর ধূসর।
    আমি বলি, শুনেছি সব। কেমন আছেন ?
    তিনি বলেন, ঘুগনিতে কি ঝাল খাবেন ? একটু বিটনুন ছড়িয়ে দিই ?
    আমি চুপ করে থাকি। তিনি শালপাতায় ঘুগনি আর আলুর দমের মিশেল দিতে দিতে আপন মনেই বলতে থাকেন, দেশে ভাল লাগত না বাবু। ছেলেটা চলে গেল। বউটা আমার আছাড়ি পিছাড়ি। আমার কলকাতার জন্য মন টানত। এত বচ্ছরের কারবার। এই জায়গাটা ডাকত আমায়। আপনাদের মতো কতজন আমার খদ্দের ছিলেন, আপনারাই তো আমায় বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাই আবার ফিরে এলাম। হাতে শালপাতা ধরিয়ে কাঠের চামচে দিয়ে বললেন, দেখুন আজ কেমন বানিয়েছি! হাত বাড়িয়ে দিই। যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রীর যেমন যোগ থাকে তেমনই কি এক অলঙ্ঘ্য বাঁধন থাকে খাবারের সঙ্গে খাবার বিক্রেতার? এমন এক আবেগ যা জীবনের সব ভাঙাচোরাকেও মেরামত করে দিতে পারে !

    জানি না। তবে আমাদের অফিসের সামনে যে মানুষটি বারুইপুরের পেয়ারা আর জামরুল বিক্রি করতেন তিনি একদিন শুনিয়েছিলেন তাঁর কথা। আসলে ভরদুপুরেও সেই ভরন্ত পেয়ারাগুলি অমন শীতল থাকত কী করে, সেটাই জানতে চেয়েছি তার কাছে। ভোরবেলা পেয়ারা বাগানে পেয়ারা পাড়া হয় আর পাতার মোড়কে ভরে ভরে সাজানো হয় ঝুড়িতে। স্তরে স্তরে পাতার মোড়কে আচ্ছাদিত সেই সবুজ ফলগুলি ছেয়ে থাকে আশ্চর্য এক শীতলতায়। বেলা দুটোর রোদেও সতেজ পেয়ারাগুলি হাতে নিলে মনে হয় যেন সদ্যতোলা। অন্য পণ্যের ক্ষেত্রে যাকে বলে প্যাকেজিং এক্ষেত্রেও মূলত তেমনই একটা তাক দিয়ে রাখা হয় ফলগুলিকে। ভোরবেলা বাগানে গিয়ে তোলা ঝুড়িভরা ফল নিয়ে শহরে এসে পৌছায় বারুইপুর থেকে শিয়ালদাগামী ট্রেন। তারপর তা ছড়িয়ে যায় শহরের বাজারে ও ফুটপাথে। পুরসভার নিষেধাজ্ঞা থাকে কাটা ফল খাওয়ায়, সত্যিই কাটা ফলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু ঝুড়ি ভরা সবুজ পেয়ারা বা সোনালি রঙের জামরুল আস্ত বা চার টুকরো করে খাওয়ার যে আনন্দ তা জোগান দেন এইসব ফল বিক্রেতারা। বারুইপুর নিবাসী ওই মানুষটি ভুল বলেননি। কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের ঠিক উলটো দিকে আরেকজন ওই বইয়ের আড়তের মাঝেই রাস্তায় বসে পেয়ারা বিক্রি করেন, কখনো কখনো থাকে জামরুল লিচু কামরাঙ্গা। তার পাশেই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উতরে যাওয়ার মোটা মোটা গাইড বই আর আখের রস। মাঝে মধ্যে দুপুরের দিকে কলেজ স্ট্রিট এলাকায় গেলে তার কাছে ফল কিনে খাই। তিনিও একই গল্প বলেন আমায়। ভোরবেলার বাগান, ফলে ভরা গাছ, ঝুড়ি ভর্তি হয়ে কলকাতায় আসা। তিনিও তার শরিক। আমাদের যাবার পথ একটু আটকে থাকে তার ফলের পসরায়। তবে খুব বেশিক্ষণ নয়। এরও ঝুড়ি শেষ হয়ে যায় বেলা তিনটের মধ্যেই। এ দোকান ও দোকান ঘুরে একদিন চারটে নাগাদ গিয়ে দেখি খালি ঝুড়ি নিয়ে তিনি বসে আছেন পথে। পাশের চায়ের দোকান থেকে চা বিস্কুট খাচ্ছেন। আমার চেনা মুখ দেখে বললেন, বড় দেরি করে ফেললেন স্যার। সব মাল শেষ। মজা হল আরেকদিন। সেদিনও একটু বিকেল গড়িয়ে গেছি বইপাড়ায়, তার সাথে দেখা ওই একই জায়গায়।
    জিজ্ঞেস করি, বিক্রিবাটা শেষ করে ফেলেছেন ?
    মুচকি হেসে তিনি জবাব দেন, আজ তেমন জুতের মাল পাইনি তাই আনিনি।
    তাহলে ? এখানে ? খালি ঝুড়িতে ?
    এমনি চলে এলাম। এই বসে বসে লোক দেখছি। রোজই যে বেচাকেনা করতে হবে তার কি মানে আছে ! এই একটু এলাম, বসলাম, মানুষজন দেখলাম। কলেজ স্ট্রিটের মানুষজন বড় বিদ্বান, এঁদের দেখাও এক শান্তি !
    কী বলব এর উত্তরে ? ভেবে পাই না। পথের একটা টুকরো কখন যেন গেঁথে গেছে এঁদের অস্তিত্বের সঙ্গে যার ঠিক থিওরিতে ব্যাখা মেলে না।
    তাহলে? এবার তিনি হাঁটতে হাঁটতে শিয়ালদহ স্টেশনে যাবেন, সেখান থেকে ফিরতি ট্রেন। আবার পরের ভোরে পেয়ারাবাগান। ঝুড়িভর্তি তাজা ফল চলে আসবে রাজধানীতে। শহুরে ব্যস্ততার সমান্তরালে আরেক জীবন আরেক রকম জীবিকার চাকা গড়ায়। আমাদের যাওয়ার পথ আমাদের খাওয়ার পথ এইভাবেই আরও অনেকের খাওয়ার পথ তৈরি করে দেয়। জটিল অর্থনীতি, ফিচেল রাজনীতি, ঝকঝকে পণ্যসংহিতার বাইরে এ যেন এক নিবিড় বাস্তুতন্ত্র।
     
    পরের পর্ব প্রকাশিত হবে ২৩ আগস্ট রবিবার

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৬৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অরিন | ১৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:৩৫742265
  • দুর্ধর্ষ হচ্ছে সিরিজটা!
    কলকাতায় আরো একটি উড়িয়াপাড়া আছে অবশ‍্য, ভবানীপুর অঞ্চলে মোহিনীমোহন রোডের আশেপাশের গলি চত্বরে। সেখানে আবার তুখোড় সব উড়িয়া "ঠাকুর"দের আস্তানা (অন্তত বছর তিরিশের আগে আলবাত ছিল)।
  • kk | ১৬ আগস্ট ২০২৬ ২০:১১742269
  • খুবই ভালো লাগছে এই সিরিজটা। খাবারের পেছনে কত আবেগ থাকে, অনুভব থাকে, কত কোমল-কঠিন গল্প। বেশির ভাগ লোক সেসবের কোনো খোঁজই রাখে না। লেখক খুব সুন্দর করে সেই গল্পগুলো তুলে আনছেন। অথচ কোথাও কোনো বাড়াবাড়ি নেই। খাবার একটা দারুণ মিডিয়াম। সেটা চমৎকার ভাবে এখানে ধরা পড়ছে।
  • নীপা | ১৭ আগস্ট ২০২৬ ০৪:৫৭742276
  • টুপি খুললাম
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ প্রতিক্রিয়া দিন