সুনীল সাগরের মুক্তো-ঝিনুক
প্রবুদ্ধ বাগচী
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কলেজ পড়ুয়া ছাত্রদের ভাষা শিক্ষার স্বার্থে বাংলা নাটকের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়। কারণ, সাহিত্য শিক্ষার্থীর কাছে অন্যতম মাধ্যম হিসেবে নাটকের গুরুত্ব অসীম। আর, বাংলাতেও নাট্যসাহিত্যের সম্ভার এতদূর পর্যন্ত সমৃদ্ধ যে তাকে এড়িয়ে গিয়ে সাহিত্যের পাঠ অসম্পূর্ণ থাকতে বাধ্য। কিন্তু সাধারণভাবে, গল্প উপন্যাস কবিতা এমনকি নিবন্ধ যেভাবে আমরা পড়ি, নাটক পড়ার তেমন অভ্যাস আমাদের নেই। তার একটা বড় কারণ, নাটক মাধ্যমটাই এমন যে তা একটা দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যম দাবি করে, নতুবা পাঠক ঠিক বুঝতে পারেন না। ধরা যাক, নাট্যমুহূর্ত বলে যে ধারনা তা কিন্তু একটি মঞ্চের আধার ছাড়া অনুভব করা খুব মুস্কিল। ফিল্মের চিত্রনাট্যের ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথা বলা যায়, চিত্রনাট্য যত উঁচু দরেরই হোক ছাপানো বই পড়ে ফিল্মটাকে বোঝা যাবে না। প্রায়োগিক ঘরানার এই অন্তর্গত সমস্যাটুকু নিয়েই নাটকের বই পড়তে বসা।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের দশটি ছোট গল্পকে নাট্যরূপ দিয়েছেন সায়ন্তন গঙ্গোপাধ্যায় দুই মলাটের মধ্যে। এর আগেও এই ধরনের কাজ তিনি ছড়িয়ে ছিটিয়ে করেছেন, তবে একটি বইয়ের পরিধিতে এতগুলি গল্পকে নিয়ে আসা এই প্রথম। যতদূর জানি, লেখক এই ধরণের প্রকল্পে অত্যন্ত আগ্রহী ও এই বিষয়ে তার কিছু সাফল্য বিন্দুও আছে। সেদিক দিয়ে তার এই আন্তরিক প্রয়াস বেশ অভিনব। অভিনব এই কারণে যে অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় সাহিত্যিকের বেশ কিছু চেনা গল্পকে নিয়ে যখন তিনি কাজ করছেন তখন পাঠকের কাছে গল্পের একটা অন্যমাত্রা উন্মোচিত হচ্ছে। আমরা যখন আখ্যান পড়ি তখন তার ভিতরের সংলাপের বাইরে যে দৃশ্য বর্ণনা তা আমাদের যে যার ভিতরে একরকম ভাবে গড়ে ওঠে, এটা একরকম পাওয়া। ‘মনীষার প্রেমিকেরা’ গল্পে কলেজ স্ট্রিটে মনীষা প্রিয়ব্রতের দিকে তাকাল — এই খবরটুকু আমরা কাহিনিতে পাই। এবার কেমনভাবে তাকাল, কীভাবে দুজনে ট্যাক্সিতে ওঠার সময় তাদের শরীরের স্পর্শ ঘটল এগুলো টেক্সটে বলা থাকলেও সেটা ঠিক কেমন তা একেক পাঠক একেকভাবে ভেবে নিতে পারেন —-- ওটা তার নিজস্ব পরিসর। কিন্তু এই নাট্যরূপে ওইভাবে পরিসর ছেড়ে রাখলে চলে না। সেখানে প্রতিটি চলাচলকে আদল দিতে হয় সুনির্দিষ্ট অ্যাকশনে, না হলে নাটক বাঁচে না। অর্থাৎ একটা বিমূর্ত বিষয়কে মূর্ত করে তোলার একরকম অভিপ্রায় আছে এই পুরো প্রক্রিয়াটায়। আরও বলার কথা, আখ্যানের চরিত্র মেনে সব সময় শুধু সংলাপে ভর দিয়ে কাহিনি এগোয় না তার মধ্যে থাকে গ্রন্থনার বিস্তার —- নাটকের শর্তে ওই ফাঁক ভরাট করে নিতে হয় সঙ্গীতে ও বাড়তি সংলাপে —- এটা একটা চ্যালেঞ্জ। দশটি গল্প নিয়ে এই বইয়ের আয়োজন, গল্পগুলি হল —-- তিনজন মানুষ, কঠিন প্রশ্ন, মনীষার দুই প্রেমিক, খরা, শাহজাহান ও তার নিজস্ব বাহিনী, তাজমহলে এক কাপ চা, টেলিগ্রাম, একটি পুরনো বই, পুরনো স্পর্শ, নিয়তি পুরুষ। সেদিক দিয়ে বিচার করতে গেলে যিনি নাট্যরূপ দেওয়ার কথা ভেবেছেন তিনি বেশ ঝুঁকি নিয়েই কাজে হাত দিয়েছেন কারণ খুব পরিচিত লেখা নিয়ে বিকল্প মাধ্যমে কাজ করতে গেলে বারেবারেই তুলনা চলে আসে মূল আখ্যানের লিখিত চেহারার সঙ্গে। সন্দেহ নেই, এই কাজে তিনি সফল। মনীষার দুই প্রেমিক, শাহজাহান ও তার নিজস্ব বাহিনী, তাজমহলে এক কাপ চা —- এইসব খ্যাত গল্পগুলিকে নাটকের চেহারায় পেয়ে যে খুব একটা অসুবিধে হয়েছে তা নয়। বিশেষ করে এগুলির মধ্যে এমন কিছু অন্তর্নিহিত উপাদান আছে যাকে পরিভাষায় সাবভার্সিভ বলা চলে —- সেগুলিকে খুব নিপুণ হাতে নিয়ন্ত্রণ করার ছাপ আছে নাট্যরূপে। সরাসরি তুলনা করছি না, কিন্তু নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখা থেকে নাট্যরূপ ও চলচ্চিত্ররূপ দিতে গিয়েও প্রচুর ভাবনা চিন্তা করতে হয়েছিল দেবেশ চট্টোপাধ্যায় ও সুমন মুখোপাধ্যায়কে —- সেসব কথা তাঁরা নানা মাধ্যমে বলেছেন। তফাত এইখানে, এঁরা দুজন নিজেরা নাটক ও চলচ্চিত্র মাধ্যমে সংযুক্ত তাই একটা প্রযোজনার বৃহত্তর চিন্তা তাদের থেকেই যায়। সেদিক দিয়ে সায়ন্তন মুক্ত কারণ, এই নাট্যরূপগুলি নিয়ে কোনো নাট্য প্রযোজনার ভাবনা তার নেই আর তিনি ঠিক এই জগতের ফুলটাইমার মানুষও নন। একটা নিরীক্ষার জায়গা থেকেই তার এই প্রয়াস যা প্রশংসার দাবি রাখে।
এই পর্যন্ত ঠিকই আছে। কিন্তু পাশাপাশি ভাবনা হল, যে উদ্দেশ্য থেকেই এগুলি নাট্যে রূপান্তরিত হোক না কেন সেই মূর্ততা সফল হতে পারে যদি এগুলি প্রত্যক্ষভাবে মঞ্চে উপস্থাপিত হতে পারে। এর আগে সুনীলের উপন্যাস নিয়ে বাংলা মঞ্চে সফল প্রযোজনার উদাহরণ আছে কাজেই সেই সম্ভাব্যতা যে একেবারে শূন্য তা নয়। কিন্তু এখানে নাট্যরূপান্তর যিনি করলেন তার কোনো ভূমিকা নেই, এটা তার সীমাবদ্ধতাও নয়, নাট্য মাধ্যমে যারা কাজ করেন তাদের সিদ্ধান্ত ও অভিরুচির ওপর নির্ভর করা ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। আবার এটাও ঠিক, রূপান্তরিত আখ্যানগুলি শেষ অবধি দর্শকের কাছে কীভাবে কতটা পৌঁছল তার অ্যাসিড-পরীক্ষার জন্য এগুলোর মঞ্চ রূপায়ণ প্রয়োজন। এই গ্রন্থের কারিগরের ভিতর-মনে তেমন বাসনা থাকা খুব স্বাভাবিক কিন্তু এক্ষেত্রে জাদুদন্ডটা ঠিক তার হাতে নেই। এটা একটা দ্বন্দ্বক্ষুব্ধ সংকট।
বিপরীত পক্ষে যদি নাট্যদলের দিক দিয়ে ভাবি, তাঁরা সমবেতভাবে কোনো প্রযোজনার কথা ভাবেন তার মঞ্চ পরিবেশনার সমস্ত শর্ত মাথায় রেখে। সমস্যা হল, এই রূপান্তরিত গল্পগুলির যে নাট্যরূপ আমরা ছাপার অক্ষরে পাচ্ছি মঞ্চে এগুলি অভিনীত হতে দশ/পনের মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। কথাটা হল, এত সীমিত সময়ের উপস্থাপনা নিয়ে নাট্যদলের প্রযোজনা হওয়া কার্যত অসম্ভব। উৎসাহী নাট্যমোদী পূর্ণ সময়ের নাটক উপভোগ করতে চান, এমনকি একজন লেখকের আট /দশটি লেখার বিচ্ছিন্ন নাট্যরূপ তাদের রসগ্রহণে বাধা হওয়ার সম্ভাবনাই ষোলোআনা। ফলে একটি নিরীক্ষা হিসেবে বইটি যত গুরুত্বের নাটকগুলির মঞ্চ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তার একটা স্পষ্ট সমস্যা আছে। তার একটা বিকল্প যে নেই তা নয়। নাট্যরূপগুলিকে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের বাইরে অঙ্গনমঞ্চের আঙ্গিকে আরেকবার নির্মাণ করে দেখা এবং কিছুটা নাট্যকারের স্বাধীনতা নিয়ে কাহিনির প্রসার ঘটানো। এটা সায়ন্তন ভেবে দেখতে পারেন।
সে যোগ্যতা তার আছে বলেই আমার অনুমান। এই গ্রন্থের নাট্যকার হিসেবে তার পরিচয়ের বাইরে তার আরও একটা অভিজ্ঞান আছে —-- তিনি গঙ্গোপাধ্যায় পরিবারেরই এক সদস্য। কাজে কাজেই নিজের জেঠুর লেখাকে এক ভিন্নভাবে প্রণতি জানানোর দায় থেকে এই বইয়ের কাজ শুরু, আর, পরিবারের অনুমতি সাপেক্ষে এগুলি নিয়ে আরেকটু বিছিয়ে ভাবার ক্ষেত্রে তার কোনো বাস্তব অসুবিধে আছে বলে মনে হয় না। তাকে এই বিষয়ে ভেবে দেখতে অনুরোধ করি। তবে তার এই প্রয়াসটিও স্মরণীয় শ্রমের ফসল।
না বলে পারছি না, সায়ন্তন নিজের সীমাবদ্ধ উদ্যোগে তার প্রয়াত স্বজন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের যাবতীয় প্রকাশিত অপ্রকাশিত লেখা, সাক্ষাতকার, চিঠি, ফিল্ম, নাটক ইত্যাদি নিয়ে এক তথ্যভান্ডার তৈরিতে আগুয়ান হয়েছেন। কিন্তু এই কাজ একার নয়। অনেকটা এগোলেও এখনো বহু সূত্র ও তথ্য বাইরে আছে। এই প্রসঙ্গে কেউ যদি তার কোনো সূত্র থেকে সুনীল বিষয়ে কোনো তথ্য বা ছাপানো নথি দেন তাহলে সংগ্রাহক তা সানন্দে গ্রহণ করবেন। আর এই বইটিও সংগ্রহে রাখতে পারেন সুনীল-ভক্তরা।
নাট্য দর্পণে সুনীলের গল্প।। সায়ন্তন গঙ্গোপাধ্যায়
দি কাফে টেবিল।। দুশো টাকা
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।