[তাক থেকে পুরনো বই নামাতে গিয়ে হাতে এল একটি চটি বই—দুষ্যন্ত কুমারের ৬৪টি গজল সংকলন। নাম ‘সায়ে মেঁ ধূপ’ বা ছায়ার মধ্যে রোদ্দুরের আনাগোনা। পাতা উল্টোতে গিয়ে দেখি ১৯৮৫তে প্রকাশিত হলদে হয়ে যাওয়া বইটি কেউ আমাকে দিয়েছিল।
তাতে সেই সময়ের খবরের কাগজের ছেঁড়া মলাটে খবরঃ ইরাক -ইরান যুদ্ধ বিরামের জন্যে ওয়াশিংটন মস্কোর দৌত্য। ভারতে আসন্ন বাজেট সেশনের আগে অনেক রাজনীতিবিদ চন্দ্রশেখরের ভবিষ্যত জানতে জ্যোতিষীর শরণাপন্ন হচ্ছেন। কী বলব? দেজাঁ ভু? কিছুই কি বদলায় নি?
জানি, কবিতার অনুবাদ অসম্ভব। সংস্কৃতি বাগধারার ভিন্নতা অনেক সময় যে শব্দপ্রতিমা নির্মাণ করে তাতে অনেক সময় মূল কবিতার আত্মা মরে যায়। তবু একটু চেষ্টা করছি দুটো কারণে।
এক, অকালপ্রয়াত ভোপালের এই কবি দুষ্যন্ত কুমার ত্যাগী চেষ্টা করেছিলেন হিন্দুস্থানীতে গজল লিখতে। অর্থাৎ উর্দু শব্দ থাকবে কিন্তু আমরা দৈনন্দিন যেভাবে ব্যবহার করি সেই ধরণে। যেমন আসমাঁ নয়, আসমান। আর টিপিক্যাল উর্দু শব্দবন্ধ, যেমন নিজাম উল মুলুক, মিরাজ উদ দীন—এসব থাকবে না।
দুই,
আমার চোখে গজল হল কোলাজের মত। দুটো দুটো করে লাইন যেন স্বতন্ত্র ছবি, স্বতন্ত্র বক্তব্য। কিন্তু সব মিল মিশে একটা বড় ক্যানভাস। তবে প্রত্যেক দ্বিপদীর শেষ শব্দটি একই হতে হবে—যেন ধ্রুবপদের মত।
উনি চাঁদ তারা প্রেম সাকী সুরা থেকে সরে এসে বেঁচে থাকার কঠিন ছবি গজলে ধরতে চাইছিলেন। ওনার কিছু লাইন এখন প্রবাদ হয়ে গেছে। বাম-ডান সবাই জায়গামত লাগিয়ে দেয়।
যেমন, কেইসে আকাশ মেঁ সুরাখ নহীঁ হো সকতা?
এক পত্থর তো তবিয়ত সে উছালো ইয়ারো।]
ছায়ার মধ্যে রোদ্দুরের আনাগোনা
মূল হিন্দিঃ দুষ্যন্ত কুমার
১
কোথাও শুনেছি তুমি ঘরে ঘরে আলো জ্বেলে দেবে কথা দিয়েছ,
কোথায় শহরে শুনি হাহাকার একটু আলোর জন্যে।
এখানে গাছের ছায়ায় বসেও বিঁধছে রোদের তির,
চলো ছেড়ে যাই এই জায়গাটা বাকি জীবনের জন্যে।
আদুল গা, তাই হাঁটু ভাঁজ করে ঢেকে নেব পেট—বুঝেছ?
এরাই যাত্রী? পাড়ি দেবে নাকি ? চেয়ে আছি তার জন্যে।
খোদা না থাকুন, মানুষ তো তবু আজও স্বপ্ন দেখে,
আমরা যে দেখি তাই তো প্রকৃতি সেজে ওঠে কারও জন্যে।
পাথর কখনও গলবে না জেনে শান্ত ছিলাম বন্ধু!
আজ অশান্ত, কে কে আহ্বানে সাড়া দেবে তার জন্যে।
আজ তোর দিন, সেলাই করে দে কবির জিভ ও ঠোঁট,
সাগরের ঢেউ আসছে-- একটু সাবধান তার জন্যে।
কাটিয়েছি দিন আমার বাগানে কৃষ্ণচূড়ার ছায়ায়,
মরে পড়ে আছি অচেনা গলিতে, কৃষ্ণচূড়ারই জন্যে।
২
ব্যথার পাহাড় জমে জমে আজ পর্বত হল,
গলতে থাকুক, হিমালয় থেকে গঙ্গা নামুক।
আজকে পাঁচিল দুলছে হাওয়ায় পর্দার মত,
এবার তাহলে প্রাসাদের ভিত নড়তে থাকুক।
গ্রামনগরের যত মাঠঘাট এঁদো গলি থেকে,
মুঠো হাত তুলে সারি সারি শব এগিয়ে আসুক।
খামোকা ঝামেলা পাকাতে আমার উৎসাহ নেই,
চারপাশে সব চেহারার থেকে মুখোশ ছিঁড়ুক।
আমার বুকের আগুন নিভেছে, তবে তোর বুকে?
নিয়ে এস খুঁজে যেখানেই পাও, জ্বলতে থাকুক।
৪৯
কড়িকাঠ এনে চোখের পাতায় বিছিয়ে দাও গো বন্ধু,
নইলে তেমন কায়দাটি খোঁজো- যাতে কাজ হয় বন্ধু।
ক্লিষ্ট হৃদয় সময়ের কাছে খবর পৌঁছে দেবে?
তাই কবুতর অনেক যতনে করে লালন কর গো বন্ধু।
দেখছি সবাই ব্যাধের খাঁচাটি রেখেছে নিজের হাতে
জলসাতে আজ শিকারীকে কর নেমন্তন্ন, বন্ধু।
সেলাই টেলাই টেনে খোল ভাই- একটু দেখতে দাও,
সিন্দুক থেকে সেই চিঠি আজ বের করে আনো বন্ধু।
আকাশের গায়ে ফুটো হয় না তো! এসব কে বলে বন্ধু?
চল, সবে মিলে একটা পাথর প্রাণপণে ছুঁড়ি, বন্ধু।
লোকে ডেকে বলে—এটা কী বললে? এটা বলা মানা, জানো?
বলেছ যখন, এইবার তার ঠ্যালা বুঝে দেখ, বন্ধু।।