এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক

  • যাবার পথ, খাবার পথ  

    প্রবুদ্ধ বাগচী লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৪০ বার পঠিত
  • প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব
    যাবার পথ, খাবার পথ (দ্বিতীয় পর্ব )

    এটা আজকে ভাবতে গেলে বেশ অবাকই লাগে যে আমাদের ছেলেবেলার সেই মফস্বলের জীবনে ‘দোসা’ নামক কোনো খাবারের নাম আমরা সত্যিই শুনিনি। আর তা পাওয়া যাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এই পদটি আমরা প্রথম খাই আমাদের এক নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে। পার্কসার্কাসের সেই বাড়িতে গেলে আমাদের জন্য প্রায়ই আনানো হত এই খাবার যা মিলত গলির মুখের এক মাদ্রাজি দোকান থেকে। একটা সময়ের পর, কলকাতা ছাড়িয়ে প্রায় সর্বত্রই দক্ষিনী খাবারের চল বাড়তে থাকে, বাড়ে দোকান এমনকি ফুটপাথের স্টলেও দিব্যি মিলতে থাকে ইডলি, দোসা ও সম্বরে ডোবানো বড়া। ধর্মতলার মোড়ে ওই ‘মেট্রো’ সিনেমার পাশেই দোতলার ওপর ছিল ‘কমলা ভিলাস’ —- খাঁটি দক্ষিণ ভারতীয় খাবারের দোকান। বাবার হাত ধরে সেখানে দুয়েকবার পা রাখার সৌভাগ্য হয়েছে। পুরোনো দিনের দোকান, সোফা ও নিচু টেবিলে বসার ব্যবস্থা। মশলা দোসা মানে যে মূল বৃত্তাকার দোসার গর্ভে আলু-মটরের পুরু প্রলেপ এটা গোড়াতে আমি বুঝতেই পারিনি —--- কারণ বাঙালি হেঁসেলে মশলা শব্দের ব্যঞ্জনা আলাদা। মশলা দোসার সঙ্গে একই সঙ্গে পরিবেশিত দুটি আচারের একটি যে নারকেল বাটা ও পোস্তর এক চমৎকার মিশেল সেটি জেনেও বড় আহ্লাদ হয়েছিল। শ্যামবাজারের মোড়ে ‘ডিম্পি’ তে একেকটি দোসার চেহারা ছিল প্রকান্ড —-- কবি সুকান্ত জীবিত থাকলে আজকে তাকেই পূর্ণিমার চাঁদ বলে অনায়াসে কল্পনা করতে পারতেন। তুলনায় ফুটপাথের দোসারা ছিল ব্যাসার্ধে কিছুটা ছোট আর তার সঙ্গে পরিবেশিত আচারের পরিমাণও ছিল কম —-- ফুটপাথের নিয়ম মেনে দোকানির কাছে দ্বিতীয় বার ওইদুটি চেয়ে নিলে তা অনায়াসেই পাওয়া যেত। পথের দোসা আর বিপণির দোসার এই যে আকার-পার্থক্য এর অবশ্য একটা যৌক্তিক কারণ আছে। একে তো ফুটের দোকানে তার দাম কিছু কম, আর, দাম বেশি থাকলে ক্রেতার সংখ্যার হেরফের হতে বাধ্য। একেবারে টাটকা একটা হিসেব দিই —--- ভাল দোকানে এখন মশালা দোসার দাম কমপক্ষে দেড়শো টাকা আর পথের দোকানে সত্তর টাকার বেশি নয়। তার থেকেও বড় কথা অমন প্রকান্ড চেহারার দোসা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে বা সংকীর্ণ বেঞ্চিতে ঠেলাঠেলি করে বসে খাওয়া রীতিমতো বিড়ম্বনার। পথের খাবার মূলত পথিকের ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য, তার মধ্যে বিলাসের শতকরা ভাগ কম। তবু এই বাড়তি বিলাসের তোয়াক্কা না করেই দেখেছি বেলা তিনটের মধ্যেই দোসার দোকানি বাসন-কোসন ধুতে বসে গেছেন। চাঁদনী চকে হিন্দুস্থান বিল্ডিং আর স্টেটসম্যান হাউসের মাঝের যে ছোট রাস্তাটি চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ থেকে ম্যাডান স্ট্রিটের যোজক হয়ে আছে ওই রাস্তার ওপর আছে একটি চিনাদের স্কুল। ওই স্কুলের সামনে থাকেন এক দক্ষিনী দোসাওয়ালা। বেলা তিনটের পরে তার কাছে পৌঁছে দেখবেন তিনি তার সহকারীর সঙ্গে দেশোয়ালি ভাষায় গপ্পো করছেন, তার দোসা- ইডলি- বড়ার ঝাঁপি শূন্য। প্রায় একই অবস্থা এর থেকে মাত্র দুশো মিটার দূরে অবস্থিত ‘মাদ্রাজ কাফে’র —--- ‘সাবির হোটেল’ এর মোটামুটি বিপরীতের এই বহু পুরোন দোকানটিও দক্ষিণী খাবার প্রেমিকদের ইডেন গার্ডেন। বেশি বেলা করে গেলে হাতে থাকবে খালি থালা।

    নিতান্ত কোনো বড়মাপের জৌলুষ না থাকলেও ছোট দোকানেও যে কী অসম্ভব সুন্দর খাবার মেলে কলকাতায় তার একটা উদাহরণ মিশন রো এলাকার একটি দোকান। ওই চত্বরে পুরোনো ‘কোল ইন্ডিয়া’ অফিসের ঠিক বিপরীতে ছিল ‘কলকাতা ট্রাম কোম্পানি’র সদর দফতর। ট্রামের অফিস থেকে পুবে একটু এগোলেই বাঁ হাতে একটি ছোট্ট ছিমছাম রেস্তোরাঁ, কিংবা তাকে খাবার দোকান বলাই ভাল। এই ঠেকটাও চিনিয়ে দিয়েছিল বাবা, কারণ বাড়ি থেকে মা টিফিন করে দিলেও এক আধদিন তার ব্যাতিক্রম হত, তখন বাবা এই দোকানে টিফিনের জন্য আসত —- বাবার সেই সময়ের কর্মস্থল ছিল ওই ‘কোল ইন্ডিয়া’র পাশের বাড়িটি —- ৫, মিশন রো, কেন্দ্রীয় সরকারের অ্যাকাউন্টস বিভাগের প্রধান দফতর। পরিচ্ছন্ন এই দোকানে হাতে গরম রুটির সঙ্গে পাওয়া যেত ডিমের ডালনা, আলুর দম, শীতকালে ফুলকপির তরকারি, দামে বেশ কম। এই বিপণিটির আরেক ভূমিকা ছিল যা কিছুটা অন্ধকারে ঢাকা, যা শুনেছি বাবার থেকেই। বাবাদের ওই কেন্দ্রীয় আকাউন্টস অফিসে বড় বড় কোম্পানির বিপুল অর্থের বিল পাশ হত, যাদের মধ্যে ছিল হিন্দুস্থান মোটর, টাটা, গোদরেজ ইত্যাদি বিগ হাউস। অফিসের একশ্রেণির কর্মী-আধিকারিক ওইসব কোম্পানির বিল পাশের বিনিময়ে কিছু কিছু নজরানা দাবি করতেন —-- আর অফিসের বাইরে এই দোকানে বসেই সেইসব অন্ধকার ‘ডিল’গুলি রফা নিষ্পত্তি হত। একইভাবে স্টিফেন হাউসের পেছনের দিকে চার্চের সামনে (যে চার্চে মধুসূদন দত্ত কৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হন) ছিল কিছু ছিমছাম দোকান, নামে সেগুলি ফুটপাথের দোকান হলেও খাবারের গুণমান সেখানে বেশ ভাল।

    বেশ কয়েকদশক হল, কলকাতার ফুটপাথের ব্যাপারীদের বিষয়ে সুশীল সমাজের আপত্তি ও গোঁসা খুব প্রবল। প্রশাসন কেন এঁদের তোল্লাই দেয়, কেন এঁদের মেরে তুলে দেয় না এগুলি সোচ্চারে বলার জন্য অনেকেরই মুখ নিশপিশ করে। কেউ কেউ বলেও ফেলেন। ‘জনমত’-কে সামনে রেখে নয়ের দশকের মাঝামাঝি রাজ্যের তৎকালীন বাম সরকার রাতের অন্ধকারে ‘সূর্যোদয়ে’র চেষ্টাও করেছিলেন কিন্তু সেই সূর্য বেশিদিন আলো দেয়নি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত রাজপথের বিপণিগুলির জন্য আইনি প্রতিকারের কথা বলেছেন বারবার। তার সবটা করেও ওঠা যায়নি। তবু বছর পাঁচেক আগে আবার একবার আচমকা চেষ্টা করা হয়েছিল ফুটপাথের সওদাগরদের ঠাঁইনাড়া করার —- সেবারেও বর্ষণ আর গর্জনের মধ্যে আনুপাতিক ভারসাম্য ছিল বেখাপ্পা। কিন্তু যেহেতু আমরা ফুটপাথের খাবার নিয়েই কথা বলছি তাই এর মধ্যে একটা দরকারি কথা বলে নেওয়া দরকার। কলকাতায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় গবেষণা সংস্থা ‘অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ পাবলিক হেলথ অ্যান্ড হাইজিনে’র উদ্যোগে নব্বইয়ের দশকে একটি সমীক্ষা হয়, যার বিষয় ছিল কলকাতার ফুটপাথের খাবারের গুণমান। বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য গবেষক ডঃ ইন্দিরা চক্রবর্তীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত এই গবেষণায় প্রতিভাত হয়েছিল কলকাতার পথের খাবারের স্বাস্থ্যগত গুণমান যথেষ্ট ভাল আর অন্যান্য শহরের চাইতে দামেও তা সুলভ। এই সমীক্ষার রিপোর্টের ছায়া পড়েছে সরকারি নীতিতেও। কলকাতা কর্পোরেশনে জনস্বাস্থ্য ও পথের খাবারের মান দেখার জন্য সুনির্দিষ্ট কমিটি আছে —-ডঃ ইন্দিরা চক্রবর্তী এখনও তার সদস্য। জীবিকাসূত্রে দুয়েকবার সেই কমিটির সভায় হাজির থেকে দেখেছি ডঃ ইন্দিরা চক্রবর্তীকে সরকারি কর্তারা এখনও কীরকম সম্মান করেন এবং তার তৈরি করা রিপোর্ট এখনো কত প্রামাণ্য বলে ধরা হয়। কেন্দ্রীয় নগরোন্নয়ন দফতর কয়েকবছর আগে কলকাতার একেকটা এলাকা নিয়ে ফুডহাব তৈরির প্রকল্পনা করেছেন সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে কিছু অংশ পথের ফুডস্টলগুলিকে বরাদ্দ করার কথা বলা হয়েছে। শহরের নামী খাদ্যসত্রগুলিতে যারা নিয়মিত খেতে ঢুকছেন তাঁরা পথের খাবারের দিকে মোটেও ট্যারা চোখে তাকাবেন না। এই শহরটা তাঁদেরও।


    সুদূর দক্ষিণে যাদবপুরে পড়তে গিয়ে মুখোমুখি হয়েছি এক আশ্চর্য জগতের। এটা ঠিক পথের খাবার নয় ঠিকই তবু যাদবপুরের ছাত্রদের জন্য গান্ধীভবনের ক্যান্টিন ছিল এক বিস্ময়। সেখানে পনেরো পয়সার কুপন কিনে বেশ বড় এক কাপ চা খাওয়া যেত। সত্তর পয়সায় মিলত মোগলাই পরোটা। আর হাতে আরেকটু পুঁজি থাকলে দুটাকায় মাটন কোর্মা কারি। এখন এই মূল্যগুলি শুনলে কেউ কেউ প্রতিবেদককে গেঁজেল বলে গাল পাড়তেই পারে কিন্তু যাহা বলিব সত্য বলিব, এর মধ্যে কোনো কল্পনার মিশেল নেই। খেয়াল রাখতে হবে, গত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝি হাওড়া স্টেশন থেকে সাধারণ সরকারি বা বেসরকারি বাসে যাদবপুর যেতে ভাড়া লাগত পঞ্চান্ন পয়সা। দুবেলা বাসভাড়া আর দুপুরের টিফিনের জন্য বাড়ি থেকে বরাদ্দ ছিল পাঁচটাকা আর কী আশ্চর্য তাতে বেশ কুলিয়েও যেত, বরং হাতে দুয়েক টাকা বেঁচেও যেত। যাদবপুরে এইট বি বাসস্টপে যে কফিহাউস ছিল সেখানে কিন্তু খাবারের দাম এতটা কম ছিল না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরেও কিছু ব্যক্তিগত স্টল ছিল সেগুলোও এত সস্তা ছিল না। এঁদের মধ্যে অবিস্মরণীয় মিলনদার দোকান যেখানে টিফিনের আকর্ষণ ছিল বড় বড় আলুর চপ, যাকে যাদবপুরীয় ছাত্রসমাজ ‘ঢপ’ বলেই উল্লেখ করত। আর ছিল, বেঙ্গল ল্যাম্পের গেটের বিপরীত দিকে ঝুপড়ি চায়ের দোকান যেখানে চা, কেক, অমলেট, টোস্ট দেদার মিলত। আরেকটু সন্ধ্যে উতরে গেলে যাদবপুর থানার সামনে মেন বয়েজ হোস্টেলের গেটের সামনে পাওয়া যেত গরম রুটি আর আলুর চোখলা। হোস্টেলে কোনোকালেই আবাসিকদের পেট পুরে খেতে দেওয়া হয় না ফলে সন্ধ্যের মুখোমুখি রাস্তার ওপর বসে বা দাঁড়িয়ে আমরা গোগ্রাসে পেটে পুরতাম রুটি-চোখলা যুগলবন্দি। শহর জুড়ে তখন ছড়িয়ে পড়ছে গ্রীষ্ম সন্ধ্যার মিঠে হাওয়া।

    এখানে আরেকটা কথা না বললেই নয়। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের জন্য সস্তার ক্যান্টিন বা বইখাতার দোকান রাখা একটা সময় পর্যন্ত সেই প্রতিষ্ঠানের অবশ্যকর্তব্য বলেই ধরা হত। একই ব্যবস্থা থাকত বিভিন্ন কারখানায়। সুতরাং যাদবপুর যে এখানে বিশিষ্ট তা হয়তো নয়। যেহেতু সেই সময়ের ছাত্র ক্যান্টিনগুলির খাবারের দামের কোনো তুলনামূলক তথ্য হাতে নেই তাই এবিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। তবে এর বাইরেও কলেজের বাইরে যেসব ব্যক্তিমালিকানার ছোটখাটো দোকান তৈরি হত সেখানেও খাবারের গুণ ও মূল্য দুটোই ছিল ইতিবাচক। এর একটা সামাজিক অর্থনৈতিক কারণ নিশ্চয়ই আছে। শিক্ষাসত্রের লাগোয়া খাবার দোকানে সম্ভাব্য ক্রেতা পড়ুয়ারাই, তাই তাঁদের গড় ক্রয়ক্ষমতার বাইরে খাবারের দাম রাখলে তা বেচা মুস্কিল। এইখানে এসে এবার একটা অন্য কথা বলতেই হচ্ছে। নব্বই দশকের বিশ্বায়ন-উত্তর বাস্তবতায় প্রতিটি জিনিশের মতো খাবারেরও ব্র্যান্ডায়ন ও কর্পোরেটাইজেশন ঘটেছে তুমুল বেগে। ভেলপুরি থেকে বিরিয়ানি সব কিছুরই আজকাল সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ড আছে শুধু নয়, চেইন রেস্তোরায় আমাদের পদচিহ্ন পড়ে থাকে উঁচু কম্পাঙ্কে যার মধ্যে একটা উচ্চকিত কোলাহল থাকে ওই সুনির্দিষ্ট বিপণির। আগে রেস্টুরেন্টে গিয়ে হাত ধুয়ে অপেক্ষা করা হত খাবার টেবিলে আসার এবং আসামাত্র তার সদ্ব্যবহার করার অভিপ্রায় থাকত। এখন অবশ্য একটু কাজ বেড়েছে আমাদের। গৃহীত খাদ্য পাকস্থলীতে পৌঁছানোর আগেই টেবিল-চেয়ার-থালা-বাটিসহ সেলফি পেস্টিয়ে দেওয়া হয় সমাজমাধ্যমে। কী খাচ্ছি-র থেকে কোথায় খাচ্ছি-র বিপণন মূল্য বেজায় চড়া। এই আবহে গত আড়াই তিন দশকে যারা পড়ুয়া হিসেবে নানা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছেন তাঁদের হাতখরচ বেড়েছে প্রচুর আর তারই তালে তাল মিলিয়ে শিক্ষাঙ্গনে সস্তা ক্যান্টিন ক্রমশ উপহাস বা উপেক্ষার বিষয় হয়ে গেছে। নিতান্ত গেঁয়ো ও মলিন পড়ুয়ারা সেখানে গেলেও যেতে পারে, সাধারণ্যে তাঁদের তেমন কদর আর নেই। যদি খুব ভুল না বলি, ইদানিং প্রায় প্রতি কলেজে কোনো না কোনো ফাস্টফুডের নামী কাউন্টার আছে যাদের বিক্রিবাটা খারাপ নয়। সাব-অল্টার্ন ওই ঝুপড়িগুলিরও দিন গিয়েছে। শুধু তাই নয়, একজন সাধারণ পড়ুয়া যে শিক্ষার ন্যুনতম মূল্য আশা করে এবং প্রত্যাশা করে তার শিক্ষাসত্রে উপযুক্ত ক্লাসরুম শৌচাগার ল্যাবরেটরির মতো সস্তায় খাবার পাওয়ারও পরিকাঠামো থাকবে এই অধিকারের জায়গাটিও যেন কিছুটা আবছায়া হয়ে গিয়েছে। এই রাজ্যের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের এখন আর আলাদা করে দাবি-দাওয়া জানানোর ব্যবস্থা নেই। ছাত্র সংসদ ঠুঁটো জগন্নাথ। দাদারা নিজেদের মতো ক্ষমতার বিলি ব্যবস্থা করে নিয়েছেন। তাঁরা মূলত পরিত্রাতা ও নিয়ন্ত্রক। এখানে অধিকারের কথা তোলা অবান্তর — কখনো বা ক্ষমাহীন স্পর্ধার দ্যোতক যার জন্য খুব বেশি মূল্য পর্যন্ত দিতে হতে পারে। কারণ ছাত্র সংসদের ঘরের লাগোয়া ‘অতিথিশালা’ এখন প্রায় রীতি —-- সেখানের নিভৃতিতে বেয়াড়া ছাত্র ছাত্রীদের রগড়ানি বা নষ্টামি সবই নিপাতনে সিদ্ধ। তাই ‘ভর্তুকি’ শব্দটিকে যবে থেকে আমরা ঘোর সন্দেহের কুটিল চোখে দেখতে আরম্ভ করেছি তবে থেকেই কলেজে সস্তার খাবারসহ বাকি সবকিছুই মাইল মাইল শান্তিকল্যাণ হয়ে আছে।

    তবে এসব চিত্তাকর্ষক ভাবনার দাপট যাই হোক তার সার্বজনীন হয়ে ওঠার এখনও ঢের দেরি। মার্কিন ধনকুবের বিল গেটস বলেছিলেন, ইনফরমেশন হাইওয়েতে যেতে গেলে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোটি কোটি গরিব মানুষ পথে পড়ে মরবেন, অন্যান্য দেশের কথা তো তাঁরা ভেবে উঠতেই পারছেন না। কিন্তু সবাই বেঘোরে মরেননি। রাস্তায় লোহার বড় বড় পেরেক গেঁথে দেওয়ার পরেও যেমন আন্দোলনরত কৃষকরা দাঁতে দাঁত চেপে অবস্থান চালিয়ে গিয়েছেন, যেভাবে খালি পায়ে পথ হেঁটে নাসিকের তুলো চাষিরা লং মার্চ করেছেন শহরের ফুটপাথের খাবার বিক্রেতারাও সেইভাবেই আছেন। খুব বড় জায়গা নিয়েই আছেন। যতদূর জানি কিছু মাস আগেও আর্থিক টানাটানির এই প্রদেশে সমস্ত সরকারি মিটিঙের খাবার প্যাকেটের বরাত দেওয়া হয় নির্দিষ্ট কিছু নামী ফাস্ট ফুড কোম্পানিকে। এমনকি যেসব স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীগুলি রাজ্যে কাজ করে তাঁদেরও বলে দেওয়া হত বিশেষ কিছু ফাস্ট ফুড কোম্পানির থেকে খাবার কিনতে। যারা পথের খাবার বিক্রি করেন বড় সরকারি দফতরে তাঁদের প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ হয়েছে অনেকদিন, গত দেড় দশক রাজ্যের প্রশাসনিক সদর নবান্নে খুব সস্তা খাবারের দোকান নেই, যা ছিল রাইটার্স বিল্ডিঙে। কিন্তু তাতে কী ? সুবৃহৎ এই মেট্রোপলিসে নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধানের মতোই নানান আর্থিক কিসিমের নানান মানুষের নিয়ত পথচলা। তাঁদের সকলেই তিনশো টাকা দিয়ে এক কাপ চা খেতে পারবেন না কেননা হয়তো তাঁদের দৈনিক রোজগার ওই অর্থের আশেপাশে বা তারও কিছু কম। তাঁদের জন্য খোলা থাকে অবিরত রাজপথ। মেডিক্যাল কলেজে রোগী ভর্তি করে উল্টোদিকের ফুটপাথে তার স্বজন কোয়ার্টার পাউন্ড পাউরুটি এক গ্লাস চায়ে ভিজিয়ে খেয়ে পেট ভরান —- দিনের যে কোনো দিন মেডিক্যালের উলটো ফুটপাথে এই দৃশ্য দেখা যাবে, দেখা যাবে আর জি কর, এন আর এস বা পিজিতেও। কাছাকাছি ফুটপাথের ভাতের হোটেলগুলোতে খাবার দিয়ে কুলিয়ে ওঠা যায় না। এখন যেখানে রাজকীয় কলকাতা অর্থাৎ কিনা রাজারহাট, সেখানে বিপুল জায়গা জুড়ে প্রচুর নির্মাণ কাজ আর তারই সূত্রে নির্মাণ শ্রমিকদের অস্থায়ী আস্তানা —- সেখানেও এই দিনমজুরদের দুবেলা পেট ভরাবার জন্য গড়ে উঠেছে ঝুপড়ির ভাতের হোটেল।

    যাবার পথ যদি খাবার পথ না হত তাহলে কি এটা সম্ভব হত?
    পরের পর্ব প্রকাশিত হবে ১৬ আগস্ট রবিবার

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    প্রথম পর্ব | দ্বিতীয় পর্ব
  • ধারাবাহিক | ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৪০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অরিন | ০৯ আগস্ট ২০২৬ ০১:৫৪742151
  • সিরিজটা ভাল হচ্ছে।
    দোসা কে বাল‍্যকালে "ধোসা" বলে জানতাম।
    তার সঙ্গে যে দুটো চাটনি দেওয়া হত, দেখতে পোস্তবাটার মত হত বটে কিন্তু বেসিকালি নারকেলবাটা যতদূর মনে আছে, সেদিক থেকে আপনি মশাই ভাগ্যবান।
    আহা, পোস্তবাটা মশলা দোসা খাবার আনুষঙ্গিক হলে ফাটাফাটি হবে। মশলা দোসা আর রাস্তার খাবারের কথায় মনে হল লিখি যে একদা কোনারকের পাশে ফুটের দোকানে ওডিয়া মশলা দোসার অর্ডার দিয়েছিলাম। সে জিনিস নেহাতই সরুচাকলি মার্কা একখান খাদ‍্যবস্তু আর তাতে মশলার নামে মিষ্টি মোচার। তরকারী দিয়েছিল, এবং সম্বর ডালও ঐরকম মিষ্টি ঘন ডাল।
    আপনি ভাববেন এক জিনিস খাচ্ছেন আর মুখে এক রক স্বাদ সে এক অদ্ভুত ব‍্যাপার।
  • Ranjan | ০৯ আগস্ট ২০২৬ ০৭:১৯742155
  • দক্ষিণের বন্ধুরা জানান সঠিক নাম "dhosa", कदापि Dosa নয় l
    ওরা বড্ড h লাগায়-- বানান এবং উচ্চারণ দুটো ক্ষেত্রেই l
    সহকর্মী जनार्दन राव রেগে যান-- ওনার নাম জনারধন্ ! Janardhan.
    ওরা Thomas ke বলেন थॉमस!
  • অরিন | ০৯ আগস্ট ২০২৬ ০৮:৫৯742158
  • বাঁচালেন মশাই রঞ্জনবাবু ধোসা ই তবে রইল।
  • সত্যেন্দু সান্যাল | ০৯ আগস্ট ২০২৬ ১৩:১৭742161
  • প্রবুদ্ধ বাগচী মহাশয়ের এই শৃঙ্খলা প্রশংসনীয় প্রয়াস।
    রঞ্জন বাবুর "ধ" সংক্রান্ত সংশোধনীর জের ধরে বলি দক্ষিনী উচ্চারনে "সম্বর" এর প্রকৃত রূপ "সাম-বার"।
    প্রত্যেকটি অক্ষর আলাদা ভাবে উচ্চারিত হয়, যুক্তাক্ষরের "ম্ব" নয়।
    তবে বাংলা প্রতিবেদনে পাঠক "সম্বর" শব্দটিই সহজে identify করবেন।
    পরবর্ত্তী অংশের জন্য আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষায় রইলাম
  • | ০৯ আগস্ট ২০২৬ ১৫:৪৩742164
  • এই না ওটা দোসাই ধোসা নয়। দক্ষিণের সহকর্মীরা নিত্যদিন আমার নাম Dh দিয়ে লিখত পদবি Th দিয়ে লিখত। তাই বলে কি আমার নাম ধ দিয়ে হয়ে গেল নাকি! এমনকি ওই Dh আর Th এর চক্করে আমাকে কোম্পানি ল্যানে খুঁজে পায় নি এও দেখেছি।
     
    সিরিজটা দিব্বি খাসা।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন