আগের পর্বের শেষে হেবারের গল্প যেখানে শেষ করেছিলাম, সেই প্রেক্ষিতটা একবার মনে করিয়ে দিই। বছর তখন ১৯০৬-০৭, নার্ষ্টের একখানা চিঠি পেয়ে হেবারের রাতের ঘুম উড়ে গেছে! তিন বছর আগে অ্যামোনিয়া নিয়ে যে কাজটা তিনি করে ফেলে রেখেছিলেন, ভুলে-ভালে প্রায় বাক্সবন্দি করে দিয়েছিলেন, নার্ষ্টের খোঁচায় সেই বাক্স আবার খুলল। উদ্দেশ্য একটাই – ভদ্রলোককে ভুল প্রমাণ করা।
কিন্তু গল্পে ঢোকার আগে নার্ষ্ট মানুষটাকে নিয়ে দু’কথা মনে করিয়ে দেওয়া দরকার, নইলে হেবারের গায়ে-জ্বালাটা ঠিক বোঝা যাবে না। আগের পর্বে তাঁর পরিচয় খানিক দিয়েছি – তাপগতিবিদ্যার তৃতীয় সূত্রের জনক, বার্লিনের প্রতিষ্ঠিত অধ্যাপক। কিন্তু এখানে যেটা মাথায় রাখা দরকার তা হল, ১৯০৭ সালে নার্ষ্ট আর হেবারের খ্যাতি মোটেই সমান ছিল না। নার্ষ্ট তখন শুধু বিখ্যাত নন, রীতিমতো রাঘব-বোয়াল – ধনী (গটিনজেন শহরের প্রথম মোটরগাড়িটি ছিল তাঁরই), প্রভাবশালী, বুনসেন সোসাইটির প্রেসিডেন্ট, স্বভাবে খানিক দেমাকিও। এমন একজন মানুষ যখন সবার সামনে আপনার গবেষণাকে ‘ভুলে ভরা’ বলে দেগে দিতে চান, তখন আপনার-আমার কেমন লাগবে ভেবে দেখুন।
আগের পর্বের শেষে এও বলেছিলাম, নার্ষ্ট চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন যে তাঁর হিট থিওরেমের হিসেবের সঙ্গে হেবারের মাপা অ্যামোনিয়ার সংখ্যা মিলছে না, এবং তিনি এক ছাত্রকে দিয়ে উচ্চ চাপে পরীক্ষা করিয়ে হেবারের ফলকে ভুল প্রমাণ করবেন পরের বছরের বড় সম্মেলনে। সেই সম্মেলনটাই বসল ১৯০৭ সালে হামবুর্গে জার্মান বুনসেন সোসাইটির (Deutsche Bunsen Gesellschaft) বার্ষিক সম্মেলন। নার্ষ্ট তখন সেই সোসাইটিরই প্রেসিডেন্ট, বার্লিনের সম্মানিত ‘গেহাইমরাট’ (Geheimrat, মানে প্রায় ‘রাজদরবারের উপদেষ্টা’ গোছের সরকারি খেতাব)। আর হেবার? কার্লসরুহে-র এক আধা-চেনা অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। এই অসম লড়াইয়ে ভরা সভায় নার্ষ্ট যা বললেন, তার বাংলা মোটামুটি এই রকম দাঁড়ায়: “দুঃখজনক যে সাম্যাবস্থা আসলে অনেক কম উৎপাদনের দিকেই হেলে আছে – হেবারের ওই ভীষণ ভুল সংখ্যাগুলো দেখে এতদিন যা ভাবা হচ্ছিল তার উল্টো। ওই ভুল সংখ্যা দেখে তো লোকে ভেবেই ফেলেছিল যে সত্যিই বুঝি নাইট্রোজেন-হাইড্রোজেন থেকে অ্যামোনিয়া বানানো যাবে। কিন্তু আসল অবস্থা আরও অনেক প্রতিকূল।”
কথাটার ভেতরের খোঁচাটা ধরতে পারছেন? নার্ষ্ট শুধু হেবারকে ভুল বলছেন না, কার্যত বলছেন – হেবারের ভুলের জন্যই লোকে মিছিমিছি আশায় বুক বাঁধছে, গোটা অ্যামোনিয়া-স্বপ্নটাই অবাস্তব। ভরা সভায় নিজের চেয়ে ঢের ক্ষমতাবান একজনের মুখে এমন কথা শুনে হেবারের অবস্থা কী হয়েছিল অনুমান করা কঠিন নয়। শোনা যায়, অপমানে তাঁর হাত-পা কাঁপছিল, মুখ ফ্যাকাশে। বন্ধুরা পরে বলেছিলেন, ওই ঘটনা হেবারকে কিছুদিন শারীরিক ভাবে অসুস্থ করে দিয়েছিল। যে মানুষটা সারা জীবন ছিলেন প্রায় বদ্ধপরিকর ভাবে সম্মানের কাঙাল, তাঁর কাছে প্রকাশ্য এই অপমান হজম করা সহজ ছিল না।
এখানে একটা কথা মনে করিয়ে দেওয়া দরকার। বিজ্ঞানের ইতিহাসে অনেক বড় আবিষ্কারের পেছনে যতটা না থাকে নিখাদ কৌতূহল, ততটাই থাকে জেদ, রাগ, আর ‘দেখিয়ে দেব’ মনোভাব। আমরা স্কুল-কলেজে যে ভাবভঙ্গিতে বিজ্ঞানীদের গল্প পড়ি – ধীরস্থির, নিরাসক্ত সাধকের মতো, আসল ছবিটা প্রায় ক্ষেত্রেই তার উল্টো। হেবারের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা প্রায় নির্লজ্জ ভাবে সত্যি। বিখ্যাত রসায়নবিদ গেরহার্ড আর্টল, যিনি নিজেও এই ‘হেবার-বশ্’ বিক্রিয়ার অনুঘটক নিয়ে কাজ করে ২০০৭ সালে নোবেল পাবেন, তিনি সরাসরি লিখে গেছেন যে হেবার এই সাফল্যের জন্য আসলে নার্ষ্টের সঙ্গে ওই ঝগড়ার কাছেই ঋণী। ঝগড়া না বাধলে হেবার হয়তো অ্যামোনিয়াকে বাক্সবন্দিই রেখে দিতেন, আর পৃথিবীকে হয়তো অন্য কারও জন্য আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে হত।
যাই হোক, রাগে গজগজ করা এক জিনিস, আর গবেষণা করে জিতে আসা আরেক জিনিস। হেবার বুঝেছিলেন যে খালি হাতে নার্ষ্টের সঙ্গে পারা যাবে না, তার জন্য দরকার একজন দক্ষ কারিগরের, যিনি অসম্ভব সব যন্ত্রপাতি বানাতে পারেন। এই জায়গায় গল্পে ঢোকেন এক ইংরেজ তরুণ – রবার্ট লে রসিনল (Robert Le Rossignol)। ইনি প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন লন্ডনে উইলিয়াম র্যামজি-র কাছে (সেই র্যামজি, যিনি বাতাসের নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলো আবিষ্কার করে নোবেল পেয়েছিলেন)। লে রসিনলের হাতে ছিল যন্ত্র বানানোর জাদু, আর মাথায় ঠান্ডা প্রকৌশলী-বুদ্ধি। হেবারের আগুন আর লে রসিনলের বরফ – এই জুটিই ইতিহাস বদলে দেবে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন জুটির গল্প বারবার ফিরে আসে, অথচ পুরস্কার-খ্যাতির আলোটা বেশির ভাগ সময় একজনের ওপরেই পড়ে; লে রসিনলের নামটা আজ ক’জন মনে রেখেছেন? পরে ইনি ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে বৈদ্যুতিন ভালভ, অর্থাৎ পুরনো দিনের রেডিও-টেলিভিশনের যন্ত্রাংশ নিয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন, হেবার-বশ্ পদ্ধতির পেটেন্ট থেকে কিছু রয়্যালটিও পেতেন। কিন্তু ইতিহাসের বইতে জ্বলজ্বল করে কেবল হেবারের নাম। এ যেন এক অমোঘ নিয়ম, আবিষ্কারের কৃতিত্ব একজনের নামে বাঁধা পড়ে যায়, আর পেছনের নিঃশব্দ কারিগরেরা মিলিয়ে যান পাদটীকায়।
সমস্যাটা ঠিক কোথায়, সেটা বুঝলে এঁদের কৃতিত্বটা ধরা পড়ে। নার্ষ্টও কিন্তু বুঝেছিলেন যে চাপ বাড়ালে অ্যামোনিয়া বেশি হবে – এ আর নতুন কী! আসল প্যাঁচ হল, চাপ বাড়ানো মানেই যন্ত্রের গায়ে প্রচণ্ড ধকল, ফেটে যাওয়ার ভয়। মনে আছে তো, আগের পর্বে বলেছিলাম বিখ্যাত ফরাসি রসায়নবিদ শ্যাতেলিয়ার প্রায় প্রাণ হারাতে বসেছিলেন যন্ত্র ফেটে গিয়ে, আর ভয়ে অ্যামোনিয়ার সন্ধান ছেড়ে দিয়েছিলেন? সেই ভয় এখানে খুবই বাস্তব। তার ওপর আরেক জ্বালা যে অল্প তাপে বিক্রিয়া ধীর হয়, বেশি তাপে অ্যামোনিয়া তৈরি হয়েও আবার ভেঙে যায়। মানে, একদিকে খাদ, অন্যদিকে খানা। হেবারের অঙ্কটা দাঁড়াল যে চাই খুব বেশি চাপ, কিন্তু মাঝারি তাপ, আর সেই মাঝারি তাপেও যাতে বিক্রিয়া তরতর করে চলে তার জন্য চাই এক ভালো অনুঘটক (ক্যাটালিষ্ট)।
এর পেছনে প্রকৃতির একটা মজার নিয়ম কাজ করে – লে শ্যাতেলিয়ারের নীতি – যা মোটামুটি বলে, চাপ বাড়ালে বিক্রিয়া সেই দিকেই এগোতে চায় যেখানে গ্যাসের আয়তন কমে। নাইট্রোজেন আর হাইড্রোজেন মিলে অ্যামোনিয়া হলে আয়তন কমে, কাজেই বেশী চাপ অ্যামোনিয়ার পক্ষে – এই কারণেই হেবারকে অতখানি উঁচু চাপে যেতে হয়েছিল। ব্যাপারটা অনেকটা সেই লোকের গল্পের মতো, যে জোরে দৌড়তে চায় অথচ পা বাঁধা: বন্ধন ভাঙতে যত তাপ লাগায়, সেই তাপই আবার তৈরি-হওয়া ফসল (অ্যামোনিয়া) ভেঙে দেয়। তাই গোটা গবেষণা এসে দাঁড়াল এক প্রশ্নে – কম তাপে, বেশি চাপে কাজ করবে এমন এক অনুঘটক কি পাওয়া যাবে?
আরও একটা চালাকি ছিল হেবারের মাথায়, যেটা কার্যত পুরো পদ্ধতির প্রাণভোমরা। একবার চাপ দিয়ে গ্যাস চালালে যেটুকু অ্যামোনিয়া হয় তা তো সামান্যই – প্রতিবার হয়তো ৫-৮ শতাংশ, বাকি নাইট্রোজেন-হাইড্রোজেন অবিক্রিয়াই থেকে যায়। বেশির ভাগ মানুষ এখানে হাল ছেড়ে দিতেন। হেবার ঠিক করলেন, ওই অবিক্রিয়া গ্যাসকে ফেলে না দিয়ে আবার ঘুরিয়ে যন্ত্রে ঢোকানো হবে, বারবার, চক্রাকারে। তৈরি হওয়া অ্যামোনিয়াটুকু ঠান্ডা করে তরল করে ছেঁকে নেওয়া হবে, আর বাকি গ্যাস আবার পাক খেয়ে ফিরবে বিক্রিয়ায়। শুধু তাই নয়, যে গরম গ্যাস বেরিয়ে আসছে তার তাপ দিয়েই ঢুকতে থাকা ঠান্ডা গ্যাসকে গরম করে নেওয়া হবে, যাতে জ্বালানির অপচয় না হয়। এই চক্রাকার পদ্ধতিই ছিল আসল বুদ্ধি – অল্প অল্প করে ফোঁটা জমিয়ে সিন্ধু করার কৌশল। আজকের রাসায়নিক প্রকৌশলের যত ‘রিসাইকেল লুপ’ আর ‘হিট এক্সচেঞ্জার’, তার আঁতুড়ঘর এই ছোট্ট যন্ত্রটাই।
এবার অনুঘটকের পালা। হেবার আর লে রসিনল একের পর এক ধাতু পরখ করতে লাগলেন। শেষে হাতে এল ‘ওসমিয়াম’ (osmium) – পৃথিবীর অন্যতম দুর্লভ আর ভারী ধাতু। অসাধারণ কাজ দিল এই ওসমিয়াম, ২০০ অ্যাটমোস্ফিয়ার চাপে আর ৬০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপে প্রায় ৮% অ্যামোনিয়া মিলল – আগের সেই দশমিক শূন্য-শূন্য কিছু শতাংশের তুলনায় যা রীতিমতো রাজকীয়। কিন্তু ওসমিয়ামের এক মহা দোষ – জিনিসটা এত দুর্লভ যে গোটা পৃথিবীতে তখন সাকুল্যে কয়েক কিলোগ্রাম মিলবে কিনা সন্দেহ। মজার কথা, BASF কোম্পানি এই ওসমিয়ামের গুরুত্ব বুঝে দুনিয়ার প্রায় গোটা মজুতটাই কিনে নিয়েছিল – যাতে প্রতিযোগীরা হাত না দিতে পারে। পরে হেবার এমন এক ধাতুও খুঁজে পেলেন যা প্রায় ওসমিয়ামের মতোই কাজ করে অথচ তুলনায় সহজলভ্য – ইউরেনিয়াম।
এদিকে সেই পুরনো তর্কের ফয়সালাটাও হয়ে গেল। শেষমেশ দেখা গেল, হেবার আর নার্ষ্ট – দু’জনেই খানিকটা করে ঠিক, খানিকটা ভুল। গোলমালের গোড়ায় ছিল একটা আপাত-নিরীহ সংখ্যা: চড়া তাপমাত্রায় অ্যামোনিয়ার আপেক্ষিক তাপ (specific heat)। এই মানটা তখন অবধি কেউ ঠিকঠাক মাপেনি, আর নার্ষ্ট তাঁর হিসেবে ভুল মানটা বসিয়েছিলেন। ফলে তাঁর গণনায় খানিক ফাঁক থেকে গিয়েছিল। উঁচু চাপে হেবার আর লে রসিনলের নিখুঁত মাপ শেষ পর্যন্ত নার্ষ্টের সংখ্যার কাছাকাছিই এল, কিন্তু হেবারের মূল দাবিটাও – যে বাণিজ্যিক ভাবে অ্যামোনিয়া বানানো সম্ভব – প্রমাণিত হল সত্যি বলেই। জেদের লড়াইয়ে হেবার হারলেন না। বিজ্ঞানের এই একটা দিক বড় সুন্দর – এখানে ‘কে জিতল’ তার চেয়ে বড় কথা ‘সত্যিটা কী দাঁড়াল’, আর দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর ঠোকাঠুকিতে সত্যিটাই শেষমেশ পরিষ্কার হয়ে বেরিয়ে এল।
এই জেদ আর নিষ্ঠার একটা মানসিক মূল্যও ছিল। যে হেবার তিন বছর আগে অ্যামোনিয়াকে ‘অসম্ভব’ ধরে নিয়ে ছেড়ে দিয়েছিলেন, নার্ষ্টের খোঁচা খেয়ে সেই একই মানুষ এবার প্রায় নেশাগ্রস্তের মতো লেগে পড়লেন। দিনরাত ল্যাবে, উঁচু চাপের বিপজ্জনক যন্ত্র নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি, একের পর এক ব্যর্থতা – কিন্তু এবার তিনি আর পিছু হটলেন না। লে রসিনলের সঙ্গে মিলে তিনি যে যন্ত্রটা বানালেন, তা আসলে এক প্রকৌশল-বিস্ময়: আকারে ছোট্ট, একটা টেবিলের ওপর এঁটে যায়, অথচ তার ভেতরে একসঙ্গে চলছে প্রচণ্ড চাপ, চড়া তাপ, গ্যাসের চক্রাকার পাক আর তরল অ্যামোনিয়া ছেঁকে নেওয়ার সূক্ষ্ম কারিগরি – প্রায় ঘড়ির কারিগরের মতো নিখুঁত। ব্যক্তিগত এক অপমান কীভাবে রূপ নিতে পারে এমন এক একনিষ্ঠ সাধনায় যা শেষে গোটা পৃথিবীর ভাগ্য বদলে দেয় – হেবারের এই অধ্যায় তার এক অসাধারণ নমুনা।
এখন কথা হল, ল্যাবের টেবিলে ফোঁটা ফোঁটা অ্যামোনিয়া বানানো আর কারখানায় টন টন বানানো, এই দুয়ের মধ্যে যোজন ফারাক। হেবার নিজে সেটা ভালোই জানতেন, তাই তিনি পেটেন্ট নিয়ে গেলেন BASF কোম্পানির কাছে। আগের পর্বে যে কার্ল বশ্-এর কথা বলেছিলাম – সেই তরুণ ইঞ্জিনিয়ার যিনি একদা অসোয়াল্ডের ভুল ধরে দিয়ে মুরুব্বিদের চমকে দিয়েছিলেন – তাঁর ওপরেই পড়ল দায়িত্ব, বিচার করার যে হেবারের এই ‘টেবিল-যন্ত্র’ আদৌ কারখানায় নামানো যাবে কিনা।
BASF-এর অন্দরমহলে একটা জমকালো তর্ক হয়েছিল বলে শোনা যায়। হেবার যখন বললেন বিক্রিয়ার জন্য ‘অন্তত ১০০ অ্যাটমোস্ফিয়ার’ চাপ লাগবে (আসলে যা তখনও কম করে বলা), কোম্পানির এক পোড় খাওয়া রসায়নবিদ বার্নথসেন আঁতকে উঠে বললেন – “সে কী কথা! এই সেদিন মাত্র সাত অ্যাটমোস্ফিয়ারে আমাদের একটা যন্ত্র ফেটে উড়ে গেছে!” সবাই যখন দোনামনা করছেন, তখন তরুণ বশ্ ঠান্ডা গলায় বললেন – “আমার মনে হয় এটা করা সম্ভব। স্টিল-শিল্প ঠিক কতটা পারে, সে আমি জানি। ঝুঁকিটা নেওয়ার মতো।” এই একটিমাত্র আত্মবিশ্বাসী বাক্যই বশ-কে একদিন জার্মানির সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাসায়নিক সাম্রাজ্য ‘ই. গ. ফারবেন’-এর মাথায় বসিয়ে দেবে। ভাগ্যিস কোম্পানির কর্তা ব্রুংক সেদিন এই তরুণের কথায় ভরসা রেখেছিলেন।
সব প্রস্তুতি সেরে হেবার ঠিক করলেন চূড়ান্ত পরীক্ষার দিন, ১৯০৯ সালের ১ থেকে ২ জুলাই। লে রসিনল বানিয়ে ফেলেছেন আরও দক্ষ এক যন্ত্র, হাতে এসেছে সহজলভ্য ইউরেনিয়াম অনুঘটক। বশ্ নিজে কার্লসরুহে এলেন, সঙ্গে আনলেন এক সঙ্গীকে – আলভিন মিটাশ (Alwin Mittasch)। সবাই মুখিয়ে আছেন, নিজের চোখে দেখবেন হেবার এতদিন ধরে যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন তা সত্যি হয় কিনা।
আর ঠিক তখনই বিধাতার রসিকতা। বাংলায় একটা কথা আছে না – ‘যত্ন করে বসানো হাঁড়ি টগবগ করে না’ – অনেকটা সেই দশা। শেষ মুহূর্তে যন্ত্রের একটা জায়গা দিয়ে গ্যাস লিক করতে শুরু করল। মেরামত হতে সময় লাগবে। অধৈর্য বশ্ আর অপেক্ষা করলেন না, পরের ট্রেন ধরে লুডভিগসহাফেন ফিরে গেলেন। ফলে যখন কয়েক ঘণ্টা বাদে মেরামত সেরে সত্যি সত্যি অ্যামোনিয়া বইতে শুরু করল, তখন কোম্পানির তরফে সাক্ষী রইলেন কেবল মিটাশ আর এক টেকনিশিয়ান। টানা পাঁচ ঘণ্টা ধরে লে রসিনলের যন্ত্র থেকে প্রতি মিনিটে প্রায় দু’ঘন সেন্টিমিটার করে মহার্ঘ তরল অ্যামোনিয়া ঝরে পড়ল। মিটাশ, তাঁর নিজের কথায়, “গভীর ভাবে অভিভূত এবং সম্পূর্ণ বিশ্বাসী।” তাঁর সেই রিপোর্টই বশ্-কে ঠেলে দিল কারখানা-স্তরের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে। ভাবুন একবার – ইতিহাসের অন্যতম বড় মুহূর্তটা বশ্ মিস করলেন নিছক অধৈর্য হয়ে ট্রেন ধরার তাড়ায়!
হেবারের কাজ ব্যাবহারিক অর্থে এখানেই শেষ – তাঁর সন্তানকে দত্তক নিয়ে নিল BASF। সাফল্যের কয়েকদিন পর হেবার এক হোটেলে বন্ধুবান্ধব ডেকে ভোজের আয়োজন করলেন। “উনি বললেন, যাকে খুশি ডাকো,” পরে স্মৃতিচারণ করেছিলেন হেবারের এক ইংরেজ সহকর্মী জে. ই. কোটস। সে রাতে দেদার মদ আর কথার ফোয়ারা ছুটল। বাড়ি ফেরার পথে, কোটসের ভাষায়, “সোজা হয়ে হাঁটতে হলে আমাদের ট্রামের লাইন ধরে ধরে যেতে হচ্ছিল।” বিজ্ঞানীরাও শেষ পর্যন্ত মানুষ – আবিষ্কারের আনন্দে গলা ভেজানোর অধিকার তাঁদেরও আছে।
হেবার আর লে রসিনলের বানানো সেই ছোট্ট টেবিলে আঁটা যন্ত্রটা আজও রাখা আছে মিউনিখের ডয়েচেস মিউজিয়ামে। এক কোণে চুপ করে বসে থাকা নেহাত সাদামাটা একখানা জিনিস, অথচ এই বীজ থেকেই জন্ম নেবে ঘরের চেয়ে উঁচু সব যন্ত্র, শত শত একর জুড়ে কারখানা, দুই-দুইটো বিশ্বযুদ্ধ, আর গোটা পৃথিবীজোড়া শস্যের বন্যা। জাদুঘরের কাচের ওপারে বসানো ওই যন্ত্রটার দিকে তাকিয়ে কেউ কি আন্দাজ করতে পারে, কত জীবন আর কত মৃত্যু ওই নিরীহ চেহারার ভেতর লুকিয়ে ছিল?
বাকিটা বশ্-এর কীর্তি, আর সে কীর্তি কম নয়। ল্যাবের ইউরেনিয়াম-ওসমিয়াম কারখানায় চলবে না কারণ সেগুলো দুর্লভ, দুর্মূল্য। তাই দরকার সস্তা, টেকসই অনুঘটক। এই দায়িত্ব পড়ল সেই বিজ্ঞানী আলউইন মিটাশের ঘাড়ে। মিটাশ আর তাঁর দল যে কীর্তি করলেন তা ধৈর্যের এক মহাকাব্য। কথিত আছে, প্রায় কুড়ি হাজারেরও বেশি পরীক্ষা চালিয়ে, হাজার হাজার আলাদা আলাদা পদার্থ যাচাই করে শেষে তাঁরা থিতু হলেন সাধারণ লোহার ওপর, তবে তাতে সামান্য অ্যালুমিনা আর পটাশ মিশিয়ে (যাকে বলে ‘প্রোমোটার’)। এখানে আমাদের দেশের গবেষণা-সংস্কৃতির সঙ্গে একটা তফাত চোখে পড়ে। আমরা প্রায়ই খুঁজি এক ঝলকের চমকপ্রদ আবিষ্কার – এক পেপার, এক পেটেন্ট, ব্যস। কিন্তু মিটাশের গল্প বলে দেয়, বড় প্রযুক্তির পেছনে থাকে নিরলস, ক্লান্তিকর, প্রায় বিরক্তিকর হাজার হাজার ব্যর্থ পরীক্ষা। এই সস্তা লোহার অনুঘটকই আজও, একশো বছর পরেও, দুনিয়ার অ্যামোনিয়া কারখানার প্রাণ। এর পেছনে একটা মজার সৌভাগ্যের গল্পও আছে। মিটাশ দেখলেন, সুইডেনের একটা বিশেষ খনির লোহা (ম্যাগনেটাইট) অন্য সব লোহার চেয়ে ঢের ভালো কাজ করছে – অথচ সেটা তো নিছক লোহাই! রহস্য ফাঁস হতে দেখা গেল, ওই আকরিকের ভেতরে প্রকৃতিগত ভাবেই মিশে আছে সামান্য অ্যালুমিনা আর পটাশ, আর সেই আপাত-অপ্রয়োজনীয় ভেজালগুলোই আসলে অনুঘটকের আসল জাদুকর। বিশুদ্ধ লোহা খুঁজতে গিয়ে দেখা গেল, খানিক ‘নোংরা’ লোহাই সেরা। বিজ্ঞানে এমন দৈবাৎ আবিষ্কার বিরল নয়, তবে কিনা সেই দৈবকে কাজে লাগানোর জন্যও চাই মিটাশের মতো তীক্ষ্ণ চোখ।
এবার ব্যাপার হল, একশো বছর ধরে বহু গবেষক চেষ্টা করেও এই লোহার অনুঘটক ঠিক কেন-কীভাবে কাজ করে তা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি – সেই রহস্যের অনেকটা উন্মোচন করতেই তো গেরহার্ড আর্টল পরে নোবেল পান। অর্থাৎ, হেবার-বশ্ পদ্ধতি চালু হয়ে গোটা পৃথিবীর পেট ভরিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে জিনিসটা কীভাবে ঘটছে তা বিজ্ঞান বুঝেছে আরও অনেক পরে। কাজ আগে, ব্যাখ্যা পরে – প্রযুক্তির ইতিহাসে এমনটা প্রায়ই ঘটে।
তারপর ছিল চাপ সামলানোর যুদ্ধ। প্রচণ্ড চাপে গরম হাইড্রোজেন ইস্পাতের ভেতর সেঁধিয়ে গিয়ে তাকে ভেতর থেকে ঝুরঝুরে করে দিত, যাকে বলে ‘হাইড্রোজেন এমব্রিটলমেন্ট’। প্রথম দিকে বশ্-এর যন্ত্র মাত্র কয়েক ঘণ্টা চলার পরেই ফেটে যেত। বশ্ এর সমাধান বার করলেন দ্বি-স্তরের নল বানিয়ে – ভেতরের স্তর নরম লোহার, বাইরের স্তর মজবুত ইস্পাতের, আর মাঝে হাইড্রোজেন বেরিয়ে যাওয়ার সূক্ষ্ম ফুটো। শুধু নল নয়, আরও এক অদৃশ্য শত্রু ছিল ভেজাল। বিক্রিয়ায় ঢোকা নাইট্রোজেন-হাইড্রোজেন গ্যাসে সামান্যতম ইমপিউরিটি থাকলেই অনুঘটক ‘বিষিয়ে’ (poison) গিয়ে অকেজো হয়ে পড়ত। ফলে কারখানার খরচের সিংহভাগ, কথিত আছে প্রায় তিন-চতুর্থাংশ চলে যেত নিছক গ্যাস পরিশোধনেই। প্রকৌশলের দিক থেকে দেখলে হেবার-বশ্ পদ্ধতি ছিল একসঙ্গে বহু অসম্ভবকে বশ করার এক দুঃসাহসিক কাজ – উচ্চ চাপ, উচ্চ তাপ, অনুঘটক, বিশুদ্ধ গ্যাস, চক্রাকার প্রবাহ – প্রতিটা ধাপে একটা করে পাহাড় ডিঙোতে হয়েছিল। ১৯১৩ সালের সেপ্টেম্বরে অপাউ (Oppau) শহরে চালু হল প্রথম বড় কারখানা, বছরে হাজার সাতেক টন স্থিরীকৃত নাইট্রোজেন উৎপাদন দিয়ে শুরু। যুদ্ধের চাহিদায় সেই উৎপাদন লাফিয়ে বাড়ল – ১৯১৮ সাল নাগাদ হেবার-বশ্ পদ্ধতি জার্মানিকে বছরে দু’লক্ষ টনেরও বেশি স্থিরীকৃত নাইট্রোজেন জোগাচ্ছে। এই বিপুল প্রকৌশল-কীর্তির স্বীকৃতিতেই কার্ল বশ্ পরে নোবেল পাবেন – যে কথা আগের পর্বেই বলেছি।
যুদ্ধ যত গড়াল, চাহিদা তত বাড়ল, আর অপাউ একা আর কুলিয়ে উঠল না। তখন জার্মানরা মধ্য জার্মানির লয়না (Leuna) শহরে গড়ে তুলল আরও বিশাল এক কারখানা – দেশের ভেতরের দিকে, যাতে শত্রুর বিমান সহজে হানা দিতে না পারে। এই দুই কারখানা মিলে জার্মানির যুদ্ধ-যন্ত্রকে সচল রেখেছিল, একই সঙ্গে জোগান দিয়েছিল খেতের সার আর গোলার বারুদ। ভাবলে অদ্ভুত লাগে, একটা মাত্র রাসায়নিক বিক্রিয়া, যা কিনা কেবল বাতাস আর জলের উপাদান থেকে অ্যামোনিয়া বানায়, তা একই সঙ্গে হয়ে উঠল মানবজাতির খাদ্যভাণ্ডার আর যুদ্ধভাণ্ডার দুইয়েরই ভিত্তি। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এত বড় ‘দ্বৈত-ব্যবহারের’ উদাহরণ আর নেই বললেই চলে।
আরেকটা কথা এই ফাঁকে বলে রাখি, কারণ আজকের প্রেক্ষিতে তা তাৎপর্যপূর্ণ। হেবার-বশ্ পদ্ধতি আসলে ছিল ‘বিগ সায়েন্স’-এর এক আদি নমুনা – যেখানে একা এক প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর বদলে দরকার হয় বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প-কারখানা আর প্রকৌশলীদের এক সম্মিলিত প্রয়াস। ল্যাবের হেবার, কারখানার বশ্, অনুঘটকের মিটাশ, যন্ত্রের লে রসিনল – এঁদের কেউ একা এই কীর্তি গড়তে পারতেন না। বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান যেভাবে দল বেঁধে, শিল্পের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এগোবে, তার নকশাটা যেন এইখানেই আঁকা হয়ে গিয়েছিল।
এই কাজের আরেকটা উত্তরাধিকার প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়। অ্যামোনিয়া বানাতে গিয়ে হেবার আর বশ্ যে প্রচণ্ড-চাপে-প্রচণ্ড-তাপে রসায়ন-বিক্রিয়া ঘটানোর কায়দা রপ্ত করলেন, তা কার্যত জন্ম দিল ‘উচ্চ-চাপ রাসায়নিক প্রকৌশল’ নামের এক আস্ত নতুন শাখার। এই কায়দাই পরে কাজে লেগেছে মিথানল থেকে শুরু করে সিন্থেটিক জ্বালানি, প্লাস্টিক – আধুনিক রাসায়নিক শিল্পের এক বিরাট অংশ তৈরি করতে। অর্থাৎ, নার্ষ্টকে ভুল প্রমাণ করার জেদ থেকে হেবার যা শুরু করেছিলেন, তার ফল কেবল সার বা বারুদেই আটকে থাকেনি; বদলে দিয়েছিল রসায়ন-শিল্পের গোটা চেহারাটাই। একটা জেদি লড়াইয়ের কত দূর পর্যন্ত ঢেউ পৌঁছতে পারে, ভাবলে অবাক লাগে।
গল্পের এই জায়গায় এসে একটু থামা যাক। নার্ষ্ট, যিনি একদিন ভরা সভায় হেবারকে ‘ভুল সংখ্যার’ কারিগর বলে দেগে দিয়েছিলেন, তিনি ১৯১৬ সালে BASF-কে লেখা এক চিঠিতে কবুল করলেন – “দুর্ভাগ্যবশত সে সময় আমি ধরেই নিয়েছিলাম যে জিনিসটা কারিগরিভাবে বানানো কঠিন।” ভুল স্বীকারের এই সততাটুকুও কম নয়। আর এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর গল্পের শেষটা আরও অদ্ভুত – জীবনের একেবারে শেষ দিকে, ১৯৩৩ সালের কাছাকাছি সময়ে, হেবার আর নার্ষ্ট একরকম সন্ধিতে পৌঁছেছিলেন। দু’জনেই তখন এক ভাঙাচোরা জার্মানির সাক্ষী। বিজ্ঞানের প্রতিযোগিতা যাঁদের একদিন শত্রু বানিয়েছিল, ইতিহাসের ধাক্কা তাঁদের শেষমেশ পাশাপাশি এনে দাঁড় করাল। প্রসঙ্গত, নার্ষ্ট নিজেও এই যুদ্ধের কম মূল্য চোকাননি – প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাঁর দুই ছেলেই প্রাণ হারিয়েছিলেন। যে দেশপ্রেমের জোয়ারে সেকালের জার্মান বিজ্ঞানীরা গা ভাসিয়েছিলেন, তার দাম শুধু হেবার একা দেননি; দিয়েছিলেন আরও অনেকে, নানা ভাবে।
বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় মজাটা বোধহয় এখানেই। যে তাচ্ছিল্য একদিন এক তরুণ গবেষককে অপমানে অসুস্থ করে দিয়েছিল, সেই তাচ্ছিল্যই তাকে ঠেলে দিয়েছিল এমন এক আবিষ্কারের দিকে যা মানবসভ্যতাকে অনাহারের কিনারা থেকে টেনে তুলবে। ‘বাতাস থেকে রুটি’ (Brot aus Luft) – উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠেছিল সেকালের জার্মানরা। আজ পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষ যে দুবেলা খেতে পায়, তার পেছনে রয়েছে এই এক আবিষ্কার।
মনে আছে, প্রথম পর্বে সেই খ্যাপাটে বিজ্ঞানী উইলিয়াম ক্রুকসের কথা বলেছিলাম, যিনি ১৮৯৮ সালে ভরা সভায় সতর্ক করেছিলেন যে কৃত্রিম নাইট্রোজেন সার বানানোর পথ না বেরোলে মানবসভ্যতা অনাহারের মুখে পড়বে? ক্রুকস বলেছিলেন, বাতাসের নাইট্রোজেন স্থিরীকরণই ‘রসায়নবিদদের প্রতিভার সামনে অপেক্ষারত সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর একটি’। মাত্র এক দশকের মধ্যে সেই চ্যালেঞ্জের জবাব দিলেন হেবার। ক্রুকসের ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণিত হল ঠিকই, তবে ভুল ছিল বলে নয় – বরং হেবারের মতো কেউ সময়মতো এগিয়ে এসেছিলেন বলে। ইতিহাসের এই মুহূর্তগুলো ভারী কৌতূহলকর – একজন সতর্ক করেন, আরেকজন সমাধান দেন, আর তার ফাঁকে বদলে যায় গোটা সভ্যতার গতিপথ। এমন কথাও বলা হয়, বিগত একশো বছরে জন্ম নেওয়া প্রতি দুটো শিশুর একটি বেঁচে আছে কেবল হেবার-বশ্ পদ্ধতির কল্যাণেই।
তবে এই আশীর্বাদেরও একটা ছায়া-ঢাকা আছে, যা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে না বললে অন্যায় হবে। এই কৃত্রিম সার বানাতে আজও পৃথিবীর মোট শক্তির প্রায় এক থেকে দুই শতাংশ খরচ হয় – একটা গোটা আবিষ্কার যেন পৃথিবীর জ্বালানির একটা স্থায়ী ভাগ চেয়ে বসে আছে। তার ওপর, আমরা জমিতে যত সার ঢালি তার বেশির ভাগটাই ফসল শুষে নিতে পারে না; বাকিটা ধুয়ে গিয়ে নদী-হ্রদ-সমুদ্রে মেশে, শ্যাওলা জন্মিয়ে জলাশয়ের অক্সিজেন শুষে নেয়, তৈরি করে বিরাট বিরাট ‘মৃত অঞ্চল’ (dead zone) যেখানে মাছ-প্রাণী বাঁচে না। হেবার নিজে কল্পনাও করতে পারেননি, তাঁর জীবনদায়ী নাইট্রোজেন একদিন পরিবেশ-দূষণের এক নীরব উৎসও হয়ে দাঁড়াবে। জীবন আর মৃত্যুর এই টানাপোড়েনটা যেন হেবারের নিজের জীবনেরই এক ছোট সংস্করণ – আশীর্বাদ আর অভিশাপ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
আর যে বারুদের কথা বললাম, তারও এক ভয়ংকর ঝলক হেবারকে দেখে যেতে হয়েছিল, একেবারে ঘরের কাছেই। ১৯২১ সালের সেপ্টেম্বরে সেই অপাউ কারখানাতেই এক বিরাট বিস্ফোরণ ঘটে – স্তূপীকৃত অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট-জাতীয় সার হঠাৎ ফেটে ওঠে, প্রাণ হারান প্রায় পাঁচশো মানুষ, গোটা জনপদ কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়। যে সার ফসল ফলিয়ে প্রাণ বাঁচায়, সেই একই সার স্তূপ হয়ে জমলে যে বিস্ফোরকে পরিণত হতে পারে – এ যেন প্রকৃতির আরেক নিষ্ঠুর কৌতুক, আর হেবারের গল্পের সঙ্গে ভারী মানানসই।
কিন্তু বাতাস থেকে যে কেবল রুটিই এল তা তো নয়। একই নাইট্রোজেন থেকে এল বারুদও – কারণ ওই কৃত্রিম অ্যামোনিয়া থেকেই বানানো যায় বিস্ফোরকের মূল উপাদান। জীবনদায়ী সার আর মারণাস্ত্র, দুইয়েরই উৎস এক। যে মানুষটি এতক্ষণ ধরে দুনিয়াকে অন্ন জোগানোর নায়ক হয়ে উঠছিলেন, পরের অধ্যায়ে সেই একই মানুষকে দেখব এক ভিন্ন ভূমিকায়। সেই দ্বৈত গল্প বলতে গেলে আমাদের ঢুকতে হবে এক সবুজ-হলদে মেঘের ভেতর, বেলজিয়ামের ইপ্রিস নামের এক জনপদে।
সে কথা পরের পর্বে।
[ক্রমশঃ]
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।