এটা তো আমাদের সবার সাথেই হয়েছে বা নিয়মিত হয়। ধরুণ হাতে কাপে কফি বা চা নিয়ে হাঁটছেন – তা সে বাড়ি, অফিস, পার্টি, শপিং মল, যেখানেই হোক না কেন। একসময় সে কফি বা চা চলকাতে চাইবেই, তা সে আপনি যতই আস্তে হাঁটতে শুরু করুন না কেন! এই যে আমারা থমকে দাঁড়াই, কাপের জিনিস একটু থিতু হলে আবার চলা শুরু করি – কিন্তু চলকানো পুরোপুরি থামে না। আমাদের কি মনে হয় না, ভাই, এ কেমন অবিচার! আমি তো দৌড়চ্ছি না, লাফাচ্ছি না, রীতিমতো ভদ্রলোকের মতো হেঁটে যাচ্ছি। তবু ভরা কাপ থেকে কফি উপচে পড়ে কেন? আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার — যতবারই সাবধান হই, ততবারই যেন উপচে পড়ার ইচ্ছেটা বেড়ে যায়। কারণটা কি?
সেদিন জানতাম না, ঠিক এই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজতে গিয়ে একাধিক মানুষ রীতিমতো গবেষণাপত্র লিখে ফেলেছেন, নামজাদা জার্নালে ছাপিয়েছেন, এমনকি পুরস্কারও বাগিয়েছেন। শুধু এমন আপাত তুচ্ছ কফি সংক্রান্ত প্রশ্নই নয়, মানুষের জিজ্ঞাসার তো আর শেষ নেই, তাই এর সাথে যোগ করুন - বিড়াল আসলে কঠিন না তরল, রোলার কোস্টারে চড়লে কিডনির পাথর সত্যিই খসে পড়ে কিনা, ঘুমন্ত মানুষকে জাগাতে ওয়াসাবির (মানে সুসির সাথে সবুজ রঙের যেটা খান আর কি!) ঝাঁঝ কতটা লাগে, মুরগি কি সুন্দর মানুষ চিনতে পারে, টস করলে কয়েন সত্যিই সৎ থাকে কিনা – এগুলোও। এই সমস্ত আপাত-হাস্যকর প্রশ্ন নিয়ে সত্যিকারের বিজ্ঞানীরা সত্যিকারের গবেষণা করেছেন। আর সেই গবেষণার জন্য তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে এমন একটা পুরস্কার, যার নাম শুনলে প্রথমে একটু হাসি পেতেই পারে আপনার - ইগ নোবেল।
নামটা শুনে অনেকেই ভাবেন, এ বুঝি নোবেল পুরস্কারের সস্তা নকল, কিংবা বিজ্ঞানীদের পিছনে লাগার একটা কৌতুক-আয়োজন। ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। ইগ নোবেলের নিজস্ব একটা দর্শন আছে, একটা মন্ত্র আছে - 'প্রথমে হাসাও, তারপর ভাবাও'। এই দুটো শব্দের মাঝখানে যে কমা-টুকু, সেখানেই লুকিয়ে আছে গোটা ব্যাপারটার আসল মজা। কারণ হাসিটা সহজ, ভাবনাটা কঠিন – আর যে জিনিস একই সঙ্গে দুটোই করতে পারে, সে জিনিস সহজে ভোলা যায় না।
আজকের এই লেখায় আমরা সেই অলিগলিতেই একটু ঘুরে দেখার চেষ্টা করব। শুরুতে দেখব জিনিসটা কীভাবে চালু হল, কে চালু করলেন, আর কেন এই অদ্ভুত অনুষ্ঠান আজ সারা দুনিয়ার বিজ্ঞানীদের কাছে রীতিমতো সম্মানের বস্তু হয়ে উঠেছে। তারপর একেকটা বিভাগে ঢুকে খুঁজে বার করব সবচেয়ে মজার গল্পটা। তবে ‘সবচেয়ে বেশী’ মজার এই ভাবে তো আর তেমন কিছু নির্দিষ্ট করে দাগিয়ে দেওয়া যায় না। তাই এখানে লিখবো আমার কাছে যেটা বেশীর মজার লেগেছে সেই গল্পগুলি। প্রতিটার ক্ষেত্রেই ছোট্ট করে লেখার চেষ্টা করব গবেষণাটা কোথা থেকে শুরু হল, কে করলেন, কীভাবে করলেন, কোন কাগজে ছাপা হল, এবং শেষ পর্যন্ত তার কী হল।
একটা অনুরোধ, আমি চাই আপনি হাসুন, সেই জন্যই মূলত লেখা - কিন্তু প্লীজ হেসে উঠে 'ধুর, এ তো বানানো গল্প' বলে রায় দিয়ে দেবেন না। এখানে উল্লেখ করা প্রতিটা গল্পই সত্যি, প্রতিটার পিছনেই একটা আসল গবেষণাপত্র আছে।
গোড়ার কথা: এক গণিতবিদের ছেলেবেলার শখ
আমাদের শুরুর গল্পের নায়ক মার্ক আব্রাহামস যার ছোটবেলা কেটেছে ম্যাসাচুসেটসের সোয়ামস্কট শহরে। ক্লাস ফোরে পড়তে পড়তেই সংখ্যার প্রতি একটা টান তৈরি হয়ে গিয়েছিল যা তৈরি করে দিয়েছিলেন মিসেস বন্ডেলেভিচ নামের এক খামখেয়ালি, কৌতুকপ্রিয় অঙ্কের দিদিমণি। কিন্তু আব্রাহামসের আসল নেশাটা ছিল অন্য জায়গায়, তিনি সব অদ্ভুত জিনিস জমাতেন। খবরের কাগজ থেকে কেটে রাখতেন উদ্ভট সব শিরোনাম। দশ বছর বয়সে তিনি যে শিরোনামটা কেটে রেখেছিলেন, সেটা অনুবাদ করলে মোটামুটি এই দাঁড়ায় - 'লোকটি টয়লেট ফ্লাশ করল, বাড়ি উড়ে গেল'। ভাবুন একবার, এই একটা লাইনেই কী নিখুঁতভাবে ধরা আছে গোটা ইগ নোবেলের চরিত্র — প্রথমে হাসি, তারপরেই মাথায় প্রশ্ন, 'আচ্ছা, সত্যিই কি এমন হতে পারে? হলে কীভাবে?'
হার্ভার্ড থেকে ফলিত গণিতে ১৯৭৮ সালে স্নাতক হয়ে আব্রাহামস কিছুকাল কম্পিউটার নিয়ে কাজ করেছেন। কার্জওয়েল কম্পিউটার প্রোডাক্টসে অপটিক্যাল ক্যারেক্টার রিকগনিশন নিয়ে, এমনকি অন্ধদের জন্য ছাপা বই পড়ে শোনানোর যন্ত্র বানানোর কাজেও ছিলেন। পরে নিজে একটা কোম্পানি খুলেছিলেন, নাম 'উইজডম সিমুলেটরস' - কম্পিউটারের সাহায্যে মানুষকে অসহ্য রকমের কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিজ্ঞতা দেওয়াই ছিল যার কাজ। এই লোকটির জীবনবৃত্তান্ত পড়লেই বোঝা যায়, ইগ নোবেল আকাশ থেকে পড়েনি।
বেশ কিছু দিন পরে এক আড্ডায় ঘুরল ঘটনার মোড়। কিংবদন্তি বিজ্ঞান-লেখক মার্টিন গার্ডনার একদিন আব্রাহামসকে বলেছিলেন পঞ্চাশের দশকের এক পুরনো রঙ্গ-বিজ্ঞান পত্রিকার কথা, 'জার্নাল অফ ইরিপ্রোডিউসিবল রেজাল্টস', অর্থাৎ 'অপুনরাবৃত্তিযোগ্য ফলাফলের পত্রিকা'। নামটাই তো রসিকতা কারণ বিজ্ঞানের প্রথম শর্তই হল পরীক্ষা বারবার করলে একই ফল আসবে, আর এই পত্রিকা ছাপে ঠিক তার উল্টোটা। আব্রাহামসের জিনিসটা এত পছন্দ হল যে তিনি পত্রিকাটাকে নতুন করে বাঁচিয়ে তুললেন, ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত সম্পাদনা করলেন। মেজাজটা ছিল অনেকটা 'ম্যাড' পত্রিকার মতো, ফাজলামি, কিন্তু বুদ্ধিদীপ্ত ফাজলামি।
১৯৯৪ সালে প্রকাশক হঠাৎ ঠিক করলেন, পত্রিকা আর চালাবেন না। এরপর ঘটল বেশ মজার ঘটনা। প্রকাশক পত্রিকাটাকে পরিত্যাগ করলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতারা এবং ১৯৫৫ সাল থেকে চলে আসা গোটা সম্পাদকমণ্ডলী প্রকাশককেই পরিত্যাগ করলেন! তাঁরা বেরিয়ে এসে চালু করলেন নতুন এক পত্রিকা, 'অ্যানালস অফ ইম্প্রোবেবল রিসার্চ', সংক্ষেপে এআইআর, অর্থাৎ 'অসম্ভাব্য গবেষণার ইতিবৃত্ত'। এই পত্রিকারই উত্তরাধিকার বয়ে চলেছে এই ইগ নোবেল। পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীতে আজ পঞ্চাশেরও বেশি খ্যাতনামা বিজ্ঞানী আছেন, যাঁদের মধ্যে আছেন একাধিক নোবেলজয়ী, বেশ কয়েকজন ইগ নোবেলজয়ী, আইকিউ-এর বিশ্বরেকর্ডধারী মেরিলিন ভস স্যাভান্ট, এবং পত্রিকা নিজেই সগর্বে জানায়, একজন সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী।
প্রথম ইগ নোবেল অনুষ্ঠান বসেছিল ১৯৯১ সালের অক্টোবরে, এমআইটি-র একটা মিউজিয়ামে, রাতের বেলা। তিনশো পঞ্চাশজন মানুষ গাদাগাদি করে ঢুকে পড়েছিলেন। চারজন সত্যিকারের নোবেলজয়ীকে ডাকা হয়েছিল পুরস্কার তুলে দেওয়ার জন্য, চারজনই এসেছিলেন, গ্রুচো মার্ক্সের নকল চশমা, উত্তরীয়, ফেজ টুপি ইত্যাদি পরে। টিকিট প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আব্রাহামস পরে লিখেছেন, সেই সন্ধেবেলা সবার মনে একটা চোরা উত্তেজনা কাজ করছিল, যেন লুকিয়ে-চুরিয়ে একটা অভাবনীয় কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলা হচ্ছে, আর যে কোনও মুহূর্তে কোনও কর্তৃপক্ষ ঢুকে পড়ে ধমক দিয়ে বলবে, 'এই সব বাজে কাজ বন্ধ করে বাড়ি যাও।'
কেউ ধমক দিতে আসেনি। উল্টে পরের বছরগুলোয় অনুষ্ঠান আরও বড় হয়েছে, হার্ভার্ডের ঐতিহাসিক স্যান্ডার্স থিয়েটারে উঠে গেছে, আর ১৯৯৫ সালের অনুষ্ঠানটি হয়ে উঠেছে পৃথিবীর একেবারে গোড়ার দিকের ওয়েবকাস্ট অনুষ্ঠানগুলোর একটা। প্রতি বছর দশটা করে নতুন পুরস্কার দেওয়া হয়। ফরাসি কাগজ 'ল্য মঁদ' আব্রাহামসকে ডেকেছে 'অসম্ভাব্য বিজ্ঞানের পোপ' বলে, ওয়াশিংটন পোস্ট বলেছে 'জাতির শিক্ষায়তনিক আবর্জনার গুরু'!
অনুষ্ঠানটার নিজস্ব কিছু আচার-অনুষ্ঠান আছে, যেগুলো না বললে ব্যাপারটা হয়ত পুরোপুরি বুঝতে পারবেন না, যদি না আপনার আগে থেকে জানা থাকে। প্রথমত, নগদ পুরস্কারের ব্যাপারটা। বিজয়ীদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় জিম্বাবোয়ের দশ ট্রিলিয়ন ডলারের একটা নোট। আরে শুনে চমকে উঠবেন না — দুই হাজারের দশকের মাঝামাঝি জিম্বাবোয়ে যে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল (মাসে প্রায় আশি বিলিয়ন শতাংশ!), তাতে সরকার সত্যিই দশ ট্রিলিয়ন ডলারের নোট ছাপতে বাধ্য হয়েছিল। সেই নোটের বাজারদর আজ আমেরিকান মুদ্রায় বড়জোর কয়েক সেন্ট। অর্থাৎ পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হচ্ছে এমন একটা কাগজ, যা দেখতে বিপুল, কিন্তু মূল্যে প্রায় শূন্য, অথচ যার পিছনে একটা গোটা দেশের অর্থনৈতিক ট্র্যাজেডি লেখা আছে। রসিকতার বেশ সূক্ষ্ম মোচড় ধরা যেতেই পারে ব্যাপারটিকে!
দ্বিতীয়ত, ভাষণের সময়সীমা। বিজয়ীর জন্য বরাদ্দ মাত্র ষাট সেকেন্ড। কেউ বেশি বকবক করলে মঞ্চের পাশ থেকে উঠে আসে 'মিস সুইটি পু' — আট বছরের একটি বাচ্চা মেয়ে, যে অত্যন্ত বিরক্ত মুখে বারবার আওড়াতে থাকে, 'প্লিজ থামুন, আমার বোরিং লাগছে; প্লিজ থামুন, আমার বোরিং লাগছে।' বিশ্বের তাবড় গবেষকেরা এই বালিকার একঘেয়ে বকুনির সামনে ঘাবড়ে গিয়ে মাইক ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। আমি ভাবি, আমাদের দেশের কিছু কিছু সভা-সমিতিতে এই ব্যবস্থাটা চালু করলে জাতির কত সময় বাঁচত।
তৃতীয়ত, কাগজের প্লেন। দর্শকরা সমানে কাগজের প্লেন বানিয়ে মঞ্চের দিকে ছুঁড়তে থাকেন। মঞ্চে সেই প্লেনের স্তূপ জমে যায়। এবং সেই স্তূপ ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করার দায়িত্ব বহু বছর ধরে সামলেছেন একজন প্রকৃত নোবেলজয়ী পদার্থবিদ, যাঁর পদটির নামই হয়ে গিয়েছিল 'ঝাঁটার রক্ষক'। নোবেল পেয়ে কেউ ঝাড়ু হাতে মঞ্চে দাঁড়াবেন, এ দৃশ্য দুনিয়ায় আর কোথাও পাবেন!
চতুর্থত, আমার সবচেয়ে প্রিয় পর্ব - '২৪/৭ লেকচার'। আমন্ত্রিত বিশেষজ্ঞকে প্রথমে ঠিক চব্বিশ সেকেন্ডে তাঁর বিষয়ের পুরো টেকনিক্যাল ব্যাখ্যা দিতে হয়। তারপর সেই একই জিনিস বোঝাতে হয় মাত্র সাতটি শব্দে, এমনভাবে যাতে যে কোনও সাধারণ মানুষ বুঝে ফেলেন। ভেবে দেখুন, সারা জীবন যে বিষয়টা নিয়ে কাটিয়ে দিলেন, তার সারমর্ম সাত শব্দে! এই একটা খেলাই বুঝিয়ে দেয়, ইগ নোবেল বিজ্ঞানকে ঠাট্টা করে না, বরং বিজ্ঞানীকে বাধ্য করে নিজের কাজটাকে আমজনতার ভাষায় বলতে। আমাদের অনেক লেখকের এই পরীক্ষায় বসা উচিত বলে আমার বিশ্বাস, এবং আমি নিজেও তার ব্যতিক্রম নই। একটা জিনিস বোঝাতে গিয়ে হেজিয়ে হেজিয়ে পাতা ভরিয়ে ফেলি একতা কাপুরের সিরিয়ালের মত!
তবে ভুললে চলবে না, এর কেন্দ্রে আছে আসল বিজ্ঞান। প্রতি বছর প্রায় নয় হাজার মনোনয়ন জমা পড়ে। কমিটির শর্ত একটাই - কাজটা সত্যি হতে হবে, নথিভুক্ত হতে হবে, মোটামুটি ভদ্রস্থ কোনও জার্নালে ছাপা হতে হবে। একটা মজার অলিখিত নিয়মও আছে, যাঁরা মুখিয়ে থেকে নিজেই নিজেকে মনোনীত করেন, তাঁরা প্রায় কখনওই পান না। পুরস্কারটা যে সবসময় আদরের, তা-ও নয়। যে কাউকে তাঁর অজান্তে, এমনকি ইচ্ছের বিরুদ্ধেও মনোনীত করা যায়, ফলে মাঝেমধ্যে এটা হয়ে ওঠে কোনও প্রতিষ্ঠানের হাস্যকর কাণ্ডের দিকে আঙুল তোলার হাতিয়ার। প্রথম বছরের তালিকায় যেমন ছিলেন আমেরিকার প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট ড্যান কোয়েল, যিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন 'পোট্যাটো' বানানের শেষে একটা বাড়তি 'ই' জুড়ে দিয়ে।
আর একটা কথা না বললেই নয়, কারণ এটাই আমার কাছে গোটা ব্যাপারটার সেরা আকর্ষণ। আন্দ্রে গাইম নামের এক পদার্থবিদ ২০০০ সালে মাইকেল বেরির সঙ্গে ইগ নোবেল পেয়েছিলেন চুম্বকক্ষেত্র দিয়ে একটা জ্যান্ত ব্যাঙকে শূন্যে ভাসিয়ে। ডায়াম্যাগনেটিজম নামের এক ধর্মের কেরামতি, যাতে জল-ভরা যে কোনও বস্তু (এবং ব্যাঙ তো প্রায় পুরোটাই জল) প্রবল চুম্বকক্ষেত্রে ভেসে থাকতে পারে। ঠিক দশ বছর পরে, ২০১০ সালে, সেই একই মানুষ গ্রাফিন আবিষ্কারের জন্য পেলেন আসল নোবেল পুরস্কার। অর্থাৎ আজ পর্যন্ত তিনিই একমাত্র মানুষ, যিনি ইগ নোবেল আর নোবেল দুটোই জিতেছেন। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলেন, দুটো নোবেল জেতার চেয়ে এই জোড়াটা ঢের কঠিন।
বিড়াল-তরল খ্যাত গবেষক মার্ক-আঁতোয়ান ফারদাঁ এই প্রসঙ্গে একবার চমৎকার একটা কথা বলেছিলেন, নোবেল প্রত্যাখ্যান করাটা হয়তো স্টাইলিশ, কিন্তু ইগ নোবেল প্রত্যাখ্যান করাটা নেহাতই ক্ষ্যাঁচড়া কাজ। কথাটার মধ্যে একটা গভীর সত্যি আছে। নোবেল ফিরিয়ে দিলে আপনি বিদ্রোহী; ইগ নোবেল ফিরিয়ে দিলে আপনি কেবলই রসকষহীন। রসকসহীন জীবন কি আর জীবন হল!
পদার্থবিদ্যা: বিড়াল কি তরল, আর কফি উপচে পড়ে কেন?
শুরু করি সেই কফি দিয়েই, যা দিয়ে এই লেখার সূত্রপাত। ব্যাপারটা এতটাই সর্বজনীন যে এই একই সমস্যা নিয়ে ইগ নোবেল দেওয়া হয়েছে দু-দুবার, দুটো আলাদা দলকে।
প্রথমবার সেই ২০১২ সালে যখন রুসলান ক্রেচেৎনিকভ আর হ্যান্স মেয়ার তরল-ছলকানোর গতিবিদ্যা নিয়ে কাজ করে দেখালেন, ঠিক কী কী শর্তে কফি উপচে পড়ে। তাঁদের গবেষণাপত্রের নামটাই দুর্দান্ত - 'কফি নিয়ে হাঁটা: এটা ছলকে পড়ে কেন?', ছাপা হয়েছিল ফিজিক্যাল রিভিউ ই-তে, ২০১২ সালে। তাঁরা দেখালেন, মানুষের হাঁটার ছন্দ আর সাধারণ মাপের কফির মগে তরলের যে সবচেয়ে কম-কম্পাঙ্কের দুলুনি - এই দুটো এমন বেয়াড়াভাবে মিলে যায় যে একটা অনুনাদ বা রেজোন্যান্স তৈরি হয়। সহজ কথায়, আপনার পায়ের তাল আর কাপের ভিতরের ঢেউয়ের তাল এক হয়ে যায়, আর তখনই মাল চলকায়।
এর কয়েক বছর পরে দৃশ্যপটে এলেন এক কোরিয়ান কিশোর। জিওয়ন হান (ইংরেজিতে জেসি হান নামেও পরিচিত) তখন কোরিয়ান মিনজক লিডারশিপ অ্যাকাডেমির ছাত্র, অর্থাৎ নেহাতই স্কুলপড়ুয়া। ২০১৫ সালে তিনি এই সমস্যাটা নিয়ে নিজে নিজে কাজ শুরু করেন, আর ২০১৬ সালে তাঁর গবেষণাপত্র বেরোয়, 'নিম্ন-ভরবেগ অঞ্চলে কফি ছলকে পড়ার ঘটনা প্রসঙ্গে'। ২০১৭ সালে তিনি ইগ নোবেল পান তরল-গতিবিদ্যা বিভাগে। স্কুলের ছেলে, নিজের হাতে যন্ত্র বানিয়ে, নামী জার্নালে গবেষণাপত্র ছেপে ইগ নোবেল, শুনলেই বেশ উত্তেজনা জাগে!
হানের কাজটার সবচেয়ে সুন্দর দিক হল তাঁর ভাবনার সরলীকরণ। তিনি বললেন, কফি ছলকানোকে দু-ভাগে ভাগ করা যাক। একটা 'নিম্ন-ভরবেগ' অঞ্চল, যেখানে আপনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটছেন, ছন্দোবদ্ধভাবে আর একটা 'উচ্চ-ভরবেগ' অঞ্চল যেখানে আপনি পাথরে হোঁচট খেয়েছেন। প্রথমটা নিয়েই তাঁর কারবার। তিনি যুক্তি দিলেন, আমাদের হাত কফির ধাক্কায় বিশেষ প্রভাবিত হয় না। ফলে গোটা ব্যাপারটাকে একমুখী ভাবা যায়, আর কফি-কাপের যুগলকে ভাবা যায় একটা 'চালিত দোলক' হিসেবে, যাকে হাত পর্যায়ক্রমে ধাক্কা দিয়ে চলেছে।
হানের করা পরীক্ষাগুলোও দিব্যি ঘরোয়া। একটা যন্ত্র বানালেন যা নির্দিষ্ট কম্পাঙ্কে কাপ দোলাতে পারে। তুলনা করলেন একটা সাধারণ চোঙাকৃতি মগ আর একটা ওয়াইন গ্লাসের - একই পরিমাণ কফি দুটোতে ঢেলে। ফলাফল স্পষ্ট: পাত্রের জ্যামিতিই অনেকটা ঠিক করে দেয় কে কতটা ছলকাবে। ওয়াইন গ্লাসের চওড়া মুখ আর সরু গোড়া ছলকানোকে ঠেকিয়ে রাখে অনেকটাই।
আর সমাধান? দুটো। এক, কাপটা উপর থেকে থাবার মতো করে চেপে ধরুন, আঙুলগুলো কাপের মুখের চারপাশে। এতে হাতের দুলুনির ছন্দ বদলে যায়। দুই, আর এইটাই আসল মজার পরামর্শ - উল্টো দিকে হেঁটে যান। পিছন ফিরে হাঁটলে হাঁটার ছন্দটা এলোমেলো হয়ে যায়, নিয়মিত পর্যায়ক্রমিকতা নষ্ট হয়, ফলে সেই ভয়ানক রেজোন্যান্স আর তৈরি হয় না। তবে আপনি আমি কি আর অফিসের করিডোরে উল্টো হেঁটে কফি বইবার সাহস করে উঠতে পারবো!
কিন্তু সেই বছরের আসল তারকা ছিল বিড়াল। ২০১৭ সালের পদার্থবিদ্যার ইগ নোবেল পেলেন ফরাসি পদার্থবিদ মার্ক-আঁতোয়ান ফারদাঁ, এক অমর প্রশ্নের মীমাংসা করে - বিড়াল কি একই সঙ্গে কঠিন এবং তরল হতে পারে?
গল্পটার শুরু ইন্টারনেটে। আপনি কি দেখেছেন সেই সব ছবি যেখানে বিড়াল বয়ামের ভেতর ঢুকে বয়ামের আকার নিয়েছে, সিঙ্কের মধ্যে গলে গিয়ে সিঙ্কের আকার নিয়েছে, ওয়াইন গ্লাসে বসে গ্লাসের আকার নিয়েছে? এই ছবিগুলো নিয়ে ইন্টারনেটে রসিকতা চলছিল, 'বিড়াল আসলে তরল' আর সেই রসিকতা চোখে পড়েই ফারদাঁ প্রথমে হেসেছিলেন। তারপর, পদার্থবিদ হিসেবে, ভেবেছিলেন, আচ্ছা, প্রশ্নটাকে যদি সত্যিই গুরুত্ব দিয়ে দেখি?
তিনি কাজ করতেন লিয়ঁর একোল নরমাল সুপেরিয়রে, রিওলজি নিয়ে। রিওলজি হল সেই বিদ্যা যা দেখে পদার্থ কীভাবে বিকৃত হয় আর কীভাবে বয়ে যায়। শব্দটার জন্ম গ্রিক ধাতু থেকে, যার অর্থ 'বওয়া' - হেরাক্লিটাসের সেই বিখ্যাত উক্তি 'পান্তা রেই', অর্থাৎ 'সবই বয়ে চলে'। বিংশ শতকের গোড়ায় ইউজিন বিংহ্যাম শব্দটা চালু করেন।
ফারদাঁর যুক্তিটা এইরকম। তরলের সংজ্ঞা কী? যে পদার্থ পাত্রের আকার নিতে পারে। কিন্তু 'নিতে পারে' কথাটার মধ্যে একটা ক্রিয়া লুকিয়ে আছে, আর প্রতিটা ক্রিয়ারই একটা সময় লাগে। এই সময়টাকে বলে 'রিল্যাক্সেশন টাইম'। এবার আসে একটা চমৎকার সংখ্যা - 'ডেবোরা সংখ্যা', যা হল রিল্যাক্সেশন টাইমকে পর্যবেক্ষণের সময় দিয়ে ভাগ করলে যা পাওয়া যায়। এই সংখ্যা এক-এর চেয়ে বড় হলে বস্তুটি কঠিন, ছোট হলে তরল।
নামটার পিছনের গল্পটা আরও সুন্দর, তাই সেটাও একটু বলে নেওয়া যাক। ১৯৬৪ সালে মার্কুস রাইনার এই নামটা প্রস্তাব করেন, বাইবেলের বিচারকর্ত্রী ডেবোরার একটা পঙ্ক্তি থেকে, যেখানে বলা হয়েছে প্রভুর সামনে পাহাড়ও গলে যায়। রাইনার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে ডেবোরা দুটো জিনিস জানতেন। এক, পাহাড়ও বয়ে যায়, কারণ সবই বয়ে যায়। দুই, পাহাড় বয়ে যায় ঈশ্বরের সামনে, মানুষের সামনে নয়; কারণ মানুষের স্বল্পায়ু জীবনে পাহাড়কে বইতে দেখা সম্ভব নয়, কিন্তু ঈশ্বরের পর্যবেক্ষণের সময় অসীম। অর্থাৎ কঠিন আর তরলের সীমারেখাটা বস্তুর মধ্যে নেই, আছে দর্শকের ধৈর্যের মধ্যে।
এবার বিড়ালে ফেরা যাক। আপনি যদি একটা বিড়ালকে মাত্র এক সেকেন্ড দেখেন - সে তখন লাফাচ্ছে, ঘুরছে, টেবিলে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে যাচ্ছে - সে তখন নিরেট কঠিন পদার্থ, অনেকটা স্থিতিস্থাপক। ডেবোরা সংখ্যা এক-এর চেয়ে অনেক বড়। কিন্তু যদি আপনি ধৈর্য ধরে মিনিটখানেক অপেক্ষা করেন, ততক্ষণে সে সিঙ্কের ভেতরে গলে গিয়ে সিঙ্কের আকার নিয়ে ফেলেছে। ডেবোরা সংখ্যা এখন এক-এর চেয়ে ছোট। ফারদাঁর উপসংহার - বিড়াল তরল, যদি আমরা তাকে তরল হওয়ার মতো সময়টুকু দিই।
কাগজটা কিন্তু নিছক ঠাট্টা নয়, রীতিমতো সিরিয়াস। তিনি রিওলজির আরও নানা ধারণা বিড়ালে প্রয়োগ করেছেন – সারফেস টেনশন, টেনসাইল ভিক্সোসিটি, ইল্ড স্ট্রেস ইত্যাদি। 'সুপারফেলিডাফোবিক' বলে একটা গালভরা শব্দ বানিয়েছেন, জল-বিকর্ষী 'সুপারহাইড্রোফোবিক'-এর অনুকরণে, অর্থাৎ যে পৃষ্ঠকে বিড়াল ছুঁতে চায় না। এমনকি একটা 'রেনল্ডস-ভাইসেনবার্গ সংখ্যা' এনে বলেছেন, এই রাশি কম হলে বিড়ালের প্রবাহ শান্ত ও স্তরায়িত; এক-এর কাছাকাছি হলে ছোটখাটো বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় যেমন লেজের ঝাপটা, আর অনেক বেশি হলে রীতিমতো 'স্থিতিস্থাপক অশান্তি' শুরু হয়ে যায়। বিড়ালের মেজাজ খারাপ হওয়ার এত সুন্দর পদার্থবৈজ্ঞানিক বর্ণনা আপনি আগে পড়েছেন?
তবে একটা জায়গায় তিনি হাল ছেড়ে দিয়েছেন, আর সেখানেই পেপারটার সেরা রসিকতা ধরা আছে যেন। রিওলজিতে প্রবাহের হার হিসেব করা যায়, কারণ সাধারণ তরল নিজে থেকে কিছু করে না। কিন্তু বিড়াল একটা 'সক্রিয় রিওলজিকাল পদার্থ' যে নিজেই ঠিক করে কখন বইবে, কখন বইবে না, কখন আদৌ পাত্রে ঢুকবে। বিড়ালের ইচ্ছেটাকে সমীকরণে বসানোর কোনও উপায় ফারদাঁ খুঁজে পাননি। যাঁদের বাড়িতে বিড়াল আছে, তাঁরা এই অসহায়তাটা হাড়ে হাড়ে বুঝবেন হয়ত।
ফারদাঁ নিজে পরে লিখেছেন, বিড়াল তরল কিনা এই প্রশ্নটা তুলে তিনি আসলে রিওলজির মাত্রাহীন সংখ্যাগুলোর ব্যবহার বোঝাতে চেয়েছিলেন, আর আশা করেছিলেন যে এতে মানুষ প্রথমে হাসবে, তারপর ভাববে। এর চেয়ে নিখুঁতভাবে ইগ নোবেলের উদ্দেশ্য আর কেউ বলতে পারেননি। আজ রাতে বাড়ির বিড়ালটাকে একবার ঘড়ি ধরে দেখুন, আপনি পদার্থবিদ্যার পরীক্ষা করছেন, এই ভেবে বাড়ির লোককে কনভিন্স করার চেষ্টা করুন।
শান্তি: কারাওকে - পরস্পরকে সহ্য করার নতুন কৌশল
শান্তি পুরস্কার শুনলে আমাদের চোখে সাধারণত ভাসে যুদ্ধবিরতি, সন্ধিচুক্তি, গম্ভীর কূটনীতি। কিন্তু ইগ নোবেলের শান্তি পুরস্কারের সবচেয়ে মন-ভালো-করা গল্পটা এসেছে একটা মাইক্রোফোন আর কিছু ব্যাকিং-ট্র্যাক থেকে। ২০০৪ সালে জাপানের দাইসুকে ইনোউয়ে শান্তি পুরস্কার পেলেন কারাওকে আবিষ্কারের জন্য। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক মার্ক আব্রাহামসের ভাষায়, 'মানুষকে পরস্পরকে সহ্য করতে শেখানোর এক সম্পূর্ণ নতুন উপায় উপহার দেওয়ার জন্য'।
কথাটা যতটা রসিকতা, ততটাই সত্যি বাস্তবে একটু যদি তলিয়ে দেখেন। কারাওকে আসলে একটা সামাজিক চুক্তি যেখানে আমি তোমার বেসুরো গান হাসিমুখে সহ্য করব, বিনিময়ে তুমি আমারটা সহ্য করবে। মদের গ্লাস হাতে অফিসের বস যখন মাইক ধরে অসম্ভব বেসুরো গলায় গান ধরেন এবং গোটা টিম হাততালি দেয়, তখন যে জিনিসটা ঘটে, কূটনীতির ভাষায় তাকে বলে পারস্পরিক সহনশীলতা।
কিন্তু আসল মজা হল মানুষটার গল্পে। দাইসুকে ইনোউয়ে ছিলেন কোবে শহরের এক ড্রামার যিনি পাড়াতেই বাজাতেন ছোট্ট গন্ডির মধ্যে। ওসাকায় স্কুলে পড়ার সময় তিনি ড্রাম বেছে নিয়েছিলেন কেন? টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর নিজের ভাষায় দেওয়া উত্তর হল - কারণ ড্রামে তো শুধু বাড়ি মারলেই হয়! এমন সৎ স্বীকারোক্তি সচরাচর মেলে না। তিনি কোনওদিন স্বরলিপি পড়তে শেখেননি, শুনে শুনে, বারবার অভ্যেস করে গান তুলতেন। সত্তরের দশকের গোড়ায় তিনি একটা ব্যান্ডের সঙ্গে কোবের বার আর ক্লাবগুলোয় বাজাতেন। কাজটা ছিল সহজ, মানে খদ্দের গান গাইতে চাইলে ব্যান্ড সঙ্গত করে দেবে।
গোটা আবিষ্কারটার জন্ম একটা ছোট্ট অস্বীকৃতি থেকে। একদিন এক ব্যবসায়ী খদ্দের ইনোউয়েকে অনুরোধ করলেন, তাঁর সঙ্গে একটা সফরে গিয়ে বাজিয়ে দিতে। ইনোউয়ে কাজের চাপে যেতে পারবেন না। তাহলে উপায়? তিনি লোকটির হাতে ধরিয়ে দিলেন গানের যন্ত্রসঙ্গীত রেকর্ড করা একটা টেপ যাতে ভদ্রলোক একা একাই গাইতে পারেন। ব্যস, কারাওকের বীজটা পোঁতা হয়ে গেল সেখান থেকেই। ইনোউয়ে ভাবলেন, এই জিনিসের তো আরও চাহিদা থাকতে পারে!
১৯৭১ সালে তিনি বানালেন 'জুক-এইট' যার উপকরণ একটা অ্যামপ্লিফায়ার, একটা মাইক্রোফোন, একটা কয়েন-বাক্স আর গাড়িতে ব্যবহারের একটা আট-ট্র্যাক স্টিরিয়ো। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে এমন এগারোটা যন্ত্র বানাতে সময় লেগেছিল প্রায় দু-মাস, প্রতিটার খরচ পড়েছিল সাড়ে চারশো ডলারের মতো। যন্ত্রগুলো তিনি আশপাশের ব্যবসায়িক জায়গায় ভাড়া দিলেন, গান পিছু একশো ইয়েন, যা সেই আমলে গোটা দুয়েক পানীয়ের দাম।
তাঁর গান রেকর্ডিংয়ের গল্পটাও চমৎকার। প্রথমে তাঁর নিজের ব্যান্ডই যন্ত্রসঙ্গীত রেকর্ড করত। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ব্যান্ড তাঁকে বাজানো থেকে ছাঁটাই করে দেয়! ফলে তিনি বাজানোর বদলে প্রযোজনা আর মিক্সিং করতে লাগলেন - প্রথম বছরেই তিনশোটা গান, তারপর মাসে আটটা করে নতুন গান। চার বছরের মাথায় যখন সত্যিই টাকা আসতে শুরু করল, তিনি কুড়িজন পেশাদার বাজিয়ে নিয়োগ করলেন, ভাড়া নিলেন পেশাদার স্টুডিয়ো। যিনি নিজের ব্যান্ড থেকে বাদ পড়েছিলেন, তিনিই শেষমেশ কুড়িজন বাজিয়ের নিয়োগকর্তা - জীবনের এই অদ্ভূত মোচড়গুলো গল্প-উপন্যাসেও সহজে মেলে না।
কিন্তু ওই যে – সুখ কি আর সবার চিরকাল সয়! এবার এল আসল ট্র্যাজেডি, কারণ ইনোউয়ে যন্ত্রটার পেটেন্ট নেননি। কেন নেননি, সেই ব্যাখ্যাটা বেশ দার্শনিক। তাঁর বক্তব্য ছিল - তখন ভাবতাম, পেটেন্ট বুঝি কেবল সেই সব অবিশ্বাস্য আবিষ্কারের জন্য, যা শূন্য থেকে কিছু একটা তৈরি করে। প্রথম কারাওকে যন্ত্রটা তো শুধু কতগুলো আগে থেকেই থাকা যন্ত্রাংশ জুড়ে দেওয়া, তাই ওটাকে কোনওদিন 'আবিষ্কার' বলেই মনে হয়নি। অন্য এক সাক্ষাৎকারে আরও সরল ভাষায় বলেছেন, পেটেন্ট নিতে পারতাম, কিন্তু মাথাতেই আসেনি, আমি শুধু স্থানীয় কয়েকজন শিল্পীকে একটু কাজের ব্যবস্থা করে দিতে চেয়েছিলাম।
ফলে যা হওয়ার তাই হল। কারাওকে গোটা পৃথিবী জয় করল, শত শত কোটি ডলারের শিল্প হয়ে উঠল, আর যিনি এর জনক, তিনি কার্যত এক পয়সাও রয়্যালটি পেলেন না। ২০১৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, পেটেন্ট থাকলে গত বছর কত পেতেন? তাঁর হিসেব বছরে আট কোটি ডলারের মতো, মানে ভারতীয় মুদ্রায় প্রাত ৭৭২ কোটি টাকার মত বছরে! এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গে যোগ করেছিলেন, 'আর গত বছরটা তো খারাপ বছর ছিল।'
ইতিহাসের ন্যায়বিচার আরও জটিল। ইনোউয়ের আগেও শিগেইচি নেগিশি নামের একজন ১৯৬৭ সালে 'স্পার্কো বক্স' নামে একটা সঙ্গত-যন্ত্র বানিয়েছিলেন, তিনিও পেটেন্ট নেননি। আর ফিলিপিন্সের রোবের্তো দেল রোসারিও ১৯৭৫ সালে একটা 'সিং অ্যালং সিস্টেম' তৈরি করে যথারীতি পেটেন্ট করিয়ে নেন, আশির দশকে যার স্বীকৃতিও পান। ফিলিপিন্সে আজও কারাওকের আবিষ্কর্তা বলতে তাঁকেই বোঝায়। অর্থাৎ যিনি প্রথম ভেবেছিলেন আর যিনি প্রথম কাগজে সই করিয়েছিলেন, এঁরা আলাদা মানুষ। আমার আগের একটা লেখায় সেফটিপিনের উদ্ভাবক ওয়াল্টার হান্টের কথা লিখেছিলাম, যিনি নিজের আবিষ্কার চারশো ডলারে বেচে দিয়ে ধার শোধ করেছিলেন। ইতিহাস বারবার একই কথা বলে, পৃথিবী প্রায়ই ভাবুকের বদলে দরদস্তুরে ওস্তাদ মানুষটিকেই টাকা দেয়।
ইনোউয়ে অবশ্য এই নিয়ে আপশোস করেন না, আর তাঁর যুক্তিটাও ভাবার মতো। তিনি বলেন, পেটেন্ট থাকলে হয়তো কারাওকে কোনওদিন এতটা ছড়াতই না, আর পেটেন্ট নিলে গোটা ব্যাপারটার মূল সুরটাই নষ্ট হয়ে যেত। তাঁর কথায়, গান গাওয়ার ইচ্ছেটা প্রায় সব মানুষের মধ্যেই আছে, কারাওকে তাদের এক মুহূর্তের জন্য তারকা হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
গল্পের সবচেয়ে করুণ রসের মোচড়টা এবার। ইনোউয়ে যে কারাওকের আবিষ্কর্তা, দুনিয়া সেটা জানতেই পারল প্রায় পঁচিশ বছর পরে ১৯৯৬ সালে, সিঙ্গাপুরের একটা তথ্যচিত্রের দল তাঁকে খুঁজে বার করার পর। তখন তিনি কী করছিলেন? একটা ছোট ব্যবসা চালাচ্ছিলেন কীটনাশক স্প্রে বিক্রি করার, যা কারাওকে যন্ত্রের ভেতরের তার আরশোলা আর ইঁদুরের কামড় থেকে বাঁচায়। ভাবুন একবার যে যন্ত্রের পেটেন্ট তিনি নেননি, জীবনের মাঝপথে তিনি সেই যন্ত্রেরই তার বাঁচানোর ওষুধ বেচে সংসার চালাচ্ছেন! বানিয়ে লিখলে আপনারা হয়ত অনুযোগ করতেন, “বস, একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?”
১৯৯৯ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে 'শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী এশীয়দের' একজন বলে ঘোষণা করল, গান্ধী-কুরোসাওয়াদের পাশে জায়গা দিল। সম্মান এল, কিন্তু রয়্যালটি এল না। তারপর ২০০৪ সালে এল ইগ নোবেল। হার্ভার্ডের স্যান্ডার্স থিয়েটারে সেদিন যা হয়েছিল, তা টাকায় মাপা যায় না। ইনোউয়ে মঞ্চে উঠে একটা পুরনো কোকা-কোলার বিজ্ঞাপনী গান ধরলেন। গোটা প্রেক্ষাগৃহ উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে থাকল - মার্ক আব্রাহামসের হিসেবে সেটাই ইগ নোবেলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ দাঁড়িয়ে জানানো অভিবাদন। নোবেলজয়ীরা পাল্টা গান ধরলেন। পেটেন্ট থেকে যিনি এক কড়িও পাননি, সেই মানুষটাকে সেদিন হলভর্তি বিজ্ঞানী গান গেয়ে সম্মান জানালেন। তাঁর নিজের কথা অনুযায়ী, একদিন তাঁর স্বপ্ন ছিল মানুষকে গান গাইতে শেখানো, তাই তিনি কারাওকে বানিয়েছিলেন। স্বপ্নটা যে সফল হয়েছে, তার প্রমাণ পৃথিবীর যে কোনও শহরের যে কোনও উইকএন্ডের রাত।
চিকিৎসা: রোলার কোস্টারে চড়ে কিডনির পাথর ঝরানো
এবার এমন একটা গল্প, যেটা শুনলে প্রথমে বিশ্বাসই হতে চায় না, কিন্তু ঘটনা সত্যি। ২০১৮ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে ইগ নোবেল পেলেন মার্ক মিচেল আর ডেভিড ওয়ার্টিংগার — রোলার কোস্টারে চড়ে কিডনির পাথর খসিয়ে ফেলার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণার জন্য।
যাঁদের কখনও কিডনিতে পাথর হয়েছে, তাঁরা জানেন যন্ত্রণাটা কী জিনিস। ছোট ছোট খনিজের দলা কিডনির ভেতরে জমে, আর যখন সেগুলো সরু মূত্রনালী দিয়ে নামতে চায়, তখন যে কষ্ট হয়, অনেকে তার তুলনা করেন প্রসববেদনার সঙ্গে। চিকিৎসা বলতে হয় শব্দতরঙ্গ দিয়ে পাথর ভাঙা, নয়তো অস্ত্রোপচার — দুটোই খরচসাপেক্ষ, দুটোতেই ঝুঁকি।
গল্পের শুরু মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির অস্টিওপ্যাথিক মেডিসিন কলেজের ইউরোলজির অধ্যাপক ডেভিড ওয়ার্টিংগারের চেম্বারে। তাঁর কয়েকজন রোগী ছুটি কাটিয়ে ফিরে এমন কথা বললেন, যা প্রায় অবিশ্বাস্য — ফ্লোরিডার ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ডে 'বিগ থান্ডার মাউন্টেন রেলরোড' রাইডে চড়ার পরেই তাঁদের কিডনির পাথর কোনও যন্ত্রণা ছাড়াই বেরিয়ে গেছে। এক-আধজন হলে কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু একজন রোগীর গল্পটা ছিল অন্যরকম: তিনি পরপর তিনবার সেই একই রাইডে চড়েছিলেন, আর প্রতিবারই একটা করে পাথর খসে পড়েছিল। তিনবারে তিনটে! কৌতূহলী মানুষ হলেই এমতবস্থায় ‘কেস কি’ বলে ঝাঁপাতে হয়। তাই ওয়ার্টিংগার সিদ্ধান্ত নিলেন, ব্যাপারটা তলিয়ে দেখতে হবে। কাজটা তিনি শুরু করেছিলেন ২০০৮ সালে। সঙ্গী নিলেন ওয়াশিংটনের পুলসবোর 'দ্য ডক্টরস ক্লিনিক'-এর চিকিৎসক মার্ক মিচেলকে।
পদ্ধতিটা হালকা করে বলে নেওয়া যাক, কারণ এইখানেই লুকিয়ে আছে গবেষণাটার আসল কেরামতি! সেই রোগীর কিডনি আর ঊর্ধ্ব-মূত্রনালীর ভেতরটা ইউরেটেরোস্কোপি করে মেপে নেওয়া হল। সেই তথ্য থেকে থ্রিডি প্রিন্টারে বানানো হল হুবহু একই মাপের একটা স্বচ্ছ সিলিকনের কিডনি-মডেল — স্বচ্ছ, যাতে ভেতরের পাথর কোথায় যাচ্ছে তা চোখে দেখা যায়। এবার সেই মডেলে ভরা হল সত্যিকারের মূত্র, আর তিনটি সত্যিকারের কিডনি-পাথর, তিনরকম মাপের: সাড়ে চার, সাড়ে তেরো আর প্রায় পঁয়ষট্টি ঘন মিলিমিটার। পাথরগুলো বসানো হল কিডনির উপরের, মাঝের আর নিচের প্রকোষ্ঠে।
তারপর? তারপর সেই কিডনি-মডেল ভরা হল একটা ব্যাকপ্যাকে, ব্যাকপ্যাকটা বাঁধা হল গবেষকের শরীরে — ঠিক নিজের কিডনি যেখানে থাকে, সেই উচ্চতায়। এবং তাঁরা চড়ে বসলেন বিগ থান্ডার মাউন্টেনে। একবার নয়, দুবার নয় — কুড়ি বার। প্রতিটি রাইডের পরে তিনটে পাথরের অবস্থান নথিভুক্ত করা হত, ফলে মোট ষাটটি ফলাফল বিশ্লেষণ করা গেল। এবং হ্যাঁ, তাঁরা ডিজনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই এই কাণ্ড করেছিলেন — নইলে ব্যাগে মূত্রভর্তি সিলিকনের কিডনি নিয়ে ঘুরলে ব্যাপারটা অন্যরকম দাঁড়াতে পারত।
ফলাফল রীতিমতো চমকপ্রদ। রাইডের একেবারে পিছনের সিটে বসলে পাথর খসার হার প্রায় চৌষট্টি শতাংশ। আর সামনের সিটে? মেরেকেটে সতেরো শতাংশ। অর্থাৎ শুধু রোলার কোস্টারে চড়লেই হবে না, বসতে হবে ঠিক জায়গায়! গবেষণাপত্রটি ছাপা হয় জার্নাল অফ দ্য আমেরিকান অস্টিওপ্যাথিক অ্যাসোসিয়েশনে, ২০১৬ সালে।
আরও একটা কৌতূহলোদ্দীপক পর্যবেক্ষণ ছিল। খুব দ্রুতগতির, প্রবল ঝাঁকুনির রাইড, যেমন স্পেস মাউন্টেন — এই কাজে তেমন সুবিধের নয়। বিগ থান্ডার মাউন্টেন কাজ করে কারণ এটি মাঝারি তীব্রতার: ঘণ্টায় প্রায় পঁয়ত্রিশ মাইল বেগে ছুটতে ছুটতে এদিক-ওদিক দোলে, ঝাঁকায়, মোচড় দেয়। এই ছোট ছোট এলোমেলো ঝাঁকুনিই পাথরকে নাড়িয়ে দিয়ে নালীর মুখে এনে ফেলে।
এবার প্রশ্ন উঠতেই পারে — এ কি নেহাতই ছেলেমানুষি? মোটেই না, আর এই ব্যাপারে ওয়ার্টিংগারের নিজের যুক্তিটাই সবচেয়ে জোরালো। তিনি বলেছেন, কম খরচের, অস্ত্রোপচার-বিহীন একটা পদ্ধতি যদি লক্ষ লক্ষ রোগীর কষ্ট বাঁচাতে পারে, তার চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে। ঘটনাক্রম ভেবে নিন একটু - কিডনিতে ছোট পাথর ধরা পড়েছে, ডাক্তার প্রেসক্রিপশনে লিখে দিলেন, 'সপ্তাহান্তে একবার অ্যামিউজমেন্ট পার্কে যান, পিছনের সিটে বসবেন।' চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাসে এর চেয়ে আনন্দদায়ক প্রেসক্রিপশন কমই লেখা হয়েছে। ওয়ার্টিংগার পরে আরও নানা ধরনের কিডনি-মডেল বানানোর কাজে হাত দিয়েছিলেন — বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে থ্রিডি প্রিন্টে যার একেকটার খরচ পড়ে মাত্র আট ডলার।
গল্পের একটা মিষ্টি লেজুড়ও আছে। কয়েক বছর পরে অলিম্পিক জিমন্যাস্ট সিমোন বাইলস কিডনি-স্টোনের যন্ত্রণা নিয়ে দোহায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে নেমেছিলেন। নিজের পাথরটার নাম দিয়েছিলেন 'দোহা পার্ল', অর্থাৎ 'দোহার মুক্তো'। সাংবাদিকরা যখন জিজ্ঞেস করলেন তিনি কী করবেন, তিনি বলেছিলেন, শুনেছি রোলার কোস্টারে চড়লে নাকি কিডনির পাথর সরে যায়; মাঠে নেমে আমি তো নিজেই একটা ছোটখাটো রোলার কোস্টার হয়ে যাই। ইগ নোবেল-জয়ী একটা গবেষণা যে অলিম্পিক পদকজয়ীর মুখে রসিকতা হয়ে ফিরে আসতে পারে, এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে!
[ক্রমশঃ]
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।