এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বৃটিশ বিরোধিতার কিস্যা

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
    ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৪৩ বার পঠিত
  • ভারত ছাড়ো এবং মহাসভা নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। অনেকে আরেসেসের শহীদও খুঁজে বার করে ফেলছেন। তাই একটু ইতিহাস পড়ে নেওয়া যাক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধে ১৯৩৯ সালে, সুভাষ ভারত ছাড়েন ১৯৪১ সালে, ভারত ছাড়ো শুরু হয় ১৯৪২ এ। আর হিন্দু মহাসভা ১৯৪০ সালেই প্রস্তাব নিয়ে ফেলেছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা ব্রিটিশ সামরিকীকরণের পক্ষে থাকবে। আমার কথা না। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন তাঁর ডায়রিতে। কী লিখেছেন পড়া যাকঃ

    "বীর সাভারকর প্রথম থেকেই একটি বিষয়ে ভীষণ জোর দিয়ে এসেছিলেন, যে, ভারতের প্রতিরক্ষার জন্য যে কোনও প্রস্তুতি—আক্রমণকারী যে-ই হোক না কেন—কোনওভাবেই হালকাভাবে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়। বিশেষ করে তিনি চেয়েছিলেন, হিন্দু যুবকেরা যেন সরকার কর্তৃক স্থল, বায়ু ও নৌবাহিনীতে যে সামরিক প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে। ইতিমধ্যেই সাম্প্রতিক প্রবণতাগুলি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল যে, সেনাবাহিনীতে মুসলমানদের শক্তি মুসলিম জনসংখ্যার আনুপাতিক হারের তুলনায় বেশি হয়ে উঠছে।" (১)

    এই নিয়ে ১৯৪০ সালে পাশ হয় মহাসভার মাদুরাই প্রস্তাব। সেখানে যা প্রস্তাব নেওয়া হয়, তার কিছু মূল পয়েন্ট এইরকমঃ
    ১। “যত বেশি সংখ্যক সম্ভব হিন্দু যুবককে” সামরিক বাহিনীতে প্রবেশ করানো।
    ২। যুদ্ধসামগ্রী উৎপাদন, সামরিক কারিগরি এবং আধুনিক যুদ্ধপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারতীয়দের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ গ্রহণ করানো।
    ৩। কলেজ ও উচ্চ বিদ্যালয়েও সামরিক প্রশিক্ষণ চালু করা হোক এবং সম্ভব হলে তা বাধ্যতামূলক করা। (২)

    এগুলো কেন করা হবে? বলতেই হবে, এইখানে একটু ব্রিটিশের পদলেহন না করার ভান অন্তত করা হয়েছিল। মোদ্দা কথা, বলা হয়েছিল, ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতা তো অনিবার্য বটেই। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারকে সাহায্য করা নিজেই লক্ষ্য নয়। ভারতের স্বার্থে যতটা সম্ভব লাভজনক করে তোলাই লক্ষ্য।

    পরবর্তীতে এইটুকু ভানও মহাসভা ঝেড়ে ফেলে। মাদুরাই প্রস্তাব বাতিল করা হয়। ৪১ সালে ভগলপুর অধিবেশনে স্পষ্ট বলা হয়ঃ "হিন্দু মহাসভার এই অধিবেশন হিন্দুদের দেশের সব ধরনের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে এবং ভারতজুড়ে হিন্দু মহাসভার সমস্ত শাখাকে নির্দেশ দিচ্ছে যাতে তারা সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং যুদ্ধাস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরির কারখানায় যথাসম্ভব বিপুল সংখ্যক হিন্দুকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সক্রিয় প্রচারকার্য চালাতে।" (৩)

    সেই সময় সুভাষ বসু আজাদ হিন্দ ফৌজ গড়ার দিকে এগোচ্ছেন। কংগ্রেস বৃহত্তর আন্দোলনের দিকে এগোচ্ছে। আর হিন্দু মহাসভা সোজাসুজি যুদ্ধ প্রক্রিয়ায় বৃটিশকে সহযোগিতা শুধু না, সোজা সামরিকবাহিনীতে ঢোকার আহ্বান জানাচ্ছে। কেন? খেয়াল করে দেখবেন, আবেদনটা শুধু হিন্দুদেরই করা হচ্ছে। কারণ তারা অস্ত্রবিদ্যা শিখে মুসলমানদের টেক্কা দেবে। আকারে ইঙ্গিতে প্রথম উদ্ধৃতিতেই শ্যামাপ্রসাদ যেটা বলেছেন। অর্থাৎ কংগ্রেস বলুন বা সুভাষ লড়ছেন বৃটিশের বিরুদ্ধে। আর এঁরা বৃটিশের পক্ষে। কারণ, ভাবটা এমনই, যেন, আসলে যুদ্ধটা হচ্ছে মুসলমানদের সঙ্গে, বৃটিশ যেখানে যুদ্ধের সহযোগী।

    এর ফল কী হয়েছিল? হিন্দুরা কি উজ্জীবিত হয়ে পড়েছিল? মোটেও না। সেটাও শ্যামাপ্রসাদের লেখায় স্পষ্ট। ডায়রি থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া যাকঃ
    "এদিকে আমি পাঞ্জাব সফর করছিলাম। সেখানে দেখলাম, হিন্দুদের মধ্যে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে এবং অনেকেই মহাসভার পতাকার তলায় সমবেত হতে প্রস্তুত, যদি একটি জোরালো ও সংগ্রামমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। মাদুরা প্রস্তাব প্রত্যাহার করা মহাসভার মর্যাদার ওপর এক গুরুতর আঘাত হেনেছিল এবং মানুষের মনে এই ধারণার জন্ম দিয়েছিল যে, আমরা কেবল বড় বড় কথা বলতেই পারি, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে নেমে পড়ার সময় পিছিয়ে যাই।" (৪)

    এই হল, ওঁদের বৃটিশ বিরোধিতার কিস্যা। ছোটো করে লিখলাম। আগ্রহীরা কেন মূল গ্রন্থ গুলো পড়েন না কে জানে। হিন্দুত্ববাদীরা বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে সব কিছু জমিয়ে রাখেন। সেগুলো না পড়লে কীকরে আর সত্যটা তুলে ধরবেন।

    সূত্রঃ
    ১। লিভস ফ্রম আ ডায়েরি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পৃষ্ঠা ৪২
    ২। সাভারকর সংকলন, ফার্স্ট ইমপ্রেশন, মাদুরাই প্রস্তাব প্রসঙ্গে একাধিক লেখা থেকে সংগৃহীত। এবং লিভস ফ্রম আ ডায়েরি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পৃষ্ঠা ৪২ -৪৪।
    ৩। সাভারকর সংকলন, ফার্স্ট ইমপ্রেশন, ভাগলপুর প্রস্তাব পৃষ্ঠা ৮-১০
    ৪। লিভস ফ্রম আ ডায়েরি, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পৃষ্ঠা ৪৪
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • হেঁয়ালি | ১৮ আগস্ট ২০২৬ ১৯:৩৯742305
  • যুদ্ধে সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেই হাতিয়ার পেয়ে যাওয়া, এটাকে তখন 'রংরুট' বলা হত। অবিভক্ত পাঞ্জাবে রাজনৈতিক নেতারা শিখ হিন্দু এবং মুসলিমদের বলেছিলেন এই রংরুট নিতে। অন্নদাশঙ্করের বইতে আছে। সেজন্য পাঞ্জাব ভাগের সময় ওরকম ভয়াবহ রক্তারক্তি হয়েছিল। বাংলাতেও এই সব চোরাবাজারের অস্ত্র নিয়ে কাটাকাটি হয়েছিল ক্যালকাটা কিলিংয়ের সময়। পাঞ্জাবের তুলনায় পুরো বাংলায় 'রংরুট' কম ছড়িয়েছিল।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন