এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  প্রবন্ধ

  • ক্ষয়ের কড়চাঃ নিঃশব্দ ঘাতক (পর্ব ২)  

    সুকান্ত ঘোষ লেখকের গ্রাহক হোন
    প্রবন্ধ | ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ৩০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • পর্ব ১ | পর্ব ২
    প্রথম পর্বে আমরা দেখেছিলাম, মরচে আসলে ধাতুর ঘরে ফেরার এক নিঃশব্দ চেষ্টা - প্রকৃতির এক অলঙ্ঘনীয় নিয়মের রোজকার প্রকাশ। কথাটা শুনতে বেশ কাব্যিক, প্রায় নিরীহ। কিন্তু এই নিরীহ, ধীর, নিঃশব্দ প্রক্রিয়াটাই যখন ভুল জায়গায়, ভুল সময়ে ঘটে, তখন সে হয়ে ওঠে এক নিখুঁত ঘাতক। বন্দুকের গুলি বা আগুনের মতো তার কোনো হুংকার নেই, কোনো আগাম সতর্কবার্তা নেই - সে বছরের পর বছর ধরে ধাতুর ভেতরে চুপচাপ জমতে থাকে, আর তারপর এক মুহূর্তে গোটা কাঠামো ভেঙে পড়ে। এই পর্বটা ক্ষয়ের সেই রক্তমাখা মুখটার গল্প।

    সমস্যাটা হল, মরচে খুন করে অদৃশ্য থেকে। ভূমিকম্প বা বন্যা এলে আমরা টের পাই, কিন্তু একটা সেতুর ভেতরে জমে ওঠা ক্ষয় কেউ দেখতে পায় না - যতক্ষণ না দেরি হয়ে যায়। এই অদৃশ্যতাই তাকে এত ভয়ংকর করে তোলে। নিচের গল্পগুলো পড়তে পড়তে খেয়াল রাখবেন একটা সাধারণ সুর, প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই বিপর্যয়টা আকস্মিক মনে হলেও আসলে ছিল দীর্ঘদিনের অবহেলার ফল, আর প্রায় প্রতিটাই ছিল ঠেকানো সম্ভব।

    এই বিপদ যে কেবল দূরের সেতু বা বিমানে, তা কিন্তু নয়। সে আমাদের ঘরের ভেতরেও - রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারের নলটা পুরনো হয়ে ক্ষয়ে গেলে গ্যাস চুঁইয়ে বেরোতে পারে; জলের ট্যাংকের ভেতর মরচে ধরলে জল দূষিত হয়; পুরনো প্রেশার কুকারের ধাতু ক্ষয়ে পাতলা হয়ে গেলে তা ফেটে যেতে পারে; বাড়ির দেয়ালের ভেতর দিয়ে যাওয়া ক্ষয়ে-যাওয়া বৈদ্যুতিক তার আগুনের কারণ হতে পারে; গাড়ির তলার ক্ষয় বড় দুর্ঘটনা ডেকে আনতে পারে। যে জিনিসগুলোকে আমরা নিরাপদ ধরে নিয়ে রোজ ব্যবহার করি, তাদের অনেকের ভেতরেই এই নিঃশব্দ ঘাতক ধীরে ধীরে জমছে। তফাত শুধু এটুকু যে বড় বিপর্যয় খবর হয়, ছোট বিপর্যয়গুলো হয় না।

    আরেকটা কথা মাথায় রাখা ভালো। যে ক্ষয় সবচেয়ে বেশি প্রাণ কাড়ে, সে সাধারণত সেই গোটা-পৃষ্ঠ-জোড়া নিরীহ মরচে নয়, যা চোখে পড়ে। বরং সে লুকিয়ে থাকা ধূর্ত জাতভাই - ছিদ্রের ভেতরের গর্ত-ক্ষয়, ফাটলের মুখের ক্রেভিস-ক্ষয়, চাপের নিচে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা চিড়। এরা বাইরে কোনো দাগ রাখে না, চেহারা প্রায় নিখুঁত রাখে, আর তারপর হঠাৎ একদিন গোটা কাঠামোকে ভেঙে ফেলে। প্রকৌশলের ভাষায় এদের বলা যায় বিশ্বাসঘাতক ক্ষয় যে হাসিমুখে পাশে দাঁড়িয়ে থেকে পেছন থেকে ছুরি মারে।


    সবুজ মূর্তির ভেতরের ক্ষত

    শুরু করা যাক এক বিখ্যাত মূর্তিকে দিয়ে, যাকে আমরা প্রায় সবাই চিনি - নিউ ইয়র্কের স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, স্বাধীনতার সেই সবুজ দেবীমূর্তি। কখনো ভেবে দেখেছেন, তামা দিয়ে তৈরি এই মূর্তিটা সবুজ কেন? কারণ সেই সবুজ রংটাই আসলে ক্ষয়ের ফসল - তামার গায়ে বাতাস, জল আর দূষণের বিক্রিয়ায় জমা হওয়া এক সবুজ আস্তরণ, যাকে বলে প্যাটিনা। মজার ব্যাপার, এই প্যাটিনা কিন্তু ক্ষতিকর নয়, বরং ভেতরের তামাকে সে রক্ষা করে - এ গল্প শেষ পর্বে ফিরে আসবে। কিন্তু মূর্তির আসল বিপদটা ছিল বাইরে নয়, ভেতরে।

    মূর্তির বাইরের চামড়াটা তামার, কিন্তু ভেতরের কাঠামো, যার ওপর সেই চামড়া বসানো, তা ছিল লোহার। মনে আছে গ্যালভানিক ক্ষয়ের কথা? দুই আলাদা ধাতু একসঙ্গে ছুঁয়ে থাকলে একটা অন্যটাকে দ্রুত ক্ষয়াতে শুরু করে। মূর্তি বানানোর সময় প্রকৌশলীরা এটা জানতেন, তাই তামা আর লোহার মাঝে একটা অন্তরক স্তর দিয়েছিলেন যাতে তারা সরাসরি না ছোঁয়। কিন্তু শতাব্দী পার হতে হতে সেই অন্তরক স্তর নষ্ট হয়ে গেল, তামা আর লোহা সরাসরি ছুঁতে শুরু করল, আর শুরু হল গ্যালভানিক ক্ষয়। ভেতরের লোহার কাঠামো ক্ষয়ে ফুলে উঠতে লাগল, আর সেই ফোলা ক্ষয়-জাত পদার্থ চাপ দিয়ে তামার চামড়ায় ফুটো করে দিতে লাগল। বাইরে থেকে সবুজ দেবী দিব্যি দাঁড়িয়ে, অথচ ভেতরে ভেতরে তাঁর কঙ্কাল কুরে খাওয়া হচ্ছিল। শেষে ১৯৮০-র দশকে বিশাল সংস্কারে মূর্তির ভেতরের ক্ষয়ে-যাওয়া লোহার কাঠামো বদলে স্টেইনলেস স্টিল বসাতে হয়। স্বাধীনতার প্রতীকও শেষমেশ ক্ষয়ের কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়েছিল।

    এই গল্পটায় একটা গভীর ইঙ্গিত আছে। মূর্তির নির্মাতারা কিন্তু বোকা ছিলেন না - তাঁরা গ্যালভানিক ক্ষয়ের কথা জানতেন, তাই সাবধানতাও নিয়েছিলেন। তবু বিপদ এল, কারণ তাঁদের সেই সাবধানতা ছিল সময়ের সঙ্গে ক্ষয়ে-যাওয়া এক অন্তরক স্তরের ওপর নির্ভরশীল। এটাই ক্ষয়ের আসল চালাকি - সে শুধু ধাতুকেই খায় না, ধাতুকে বাঁচানোর ব্যবস্থাটাকেও ধীরে ধীরে খেয়ে ফেলে। তাই একবার সুরক্ষা বসিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়ার উপায় নেই; সেই সুরক্ষা ঠিক আছে কিনা, তা-ও বারবার দেখতে হয়। ক্ষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একবারের কাজ নয়, সে এক আজীবনের সতর্কতা।
     

    একটা ফাটল, ছেচল্লিশটা মৃত্যু

    স্ট্যাচু অফ লিবার্টিতে মানুষ মরেনি। কিন্তু সব গল্প এত সহজ সরল নয়। ১৯৬৭ সালের ১৫ই ডিসেম্বর, বড়দিনের ঠিক আগে, আমেরিকার ওহাইও নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা 'সিলভার ব্রিজ' নামের এক ঝুলন্ত সেতু হঠাৎ ভেঙে পড়ল। সন্ধের ভিড়ের সময়, সেতুর ওপর তখন বড়দিনের কেনাকাটা সেরে ফেরা মানুষজন আর মালবোঝাই লরির লম্বা সারি। এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছিলেন, শব্দটা ছিল যেন বন্দুকের গুলির মতো, আর তারপর গোটা সেতুটা তাসের ঘরের মতো এক পাশ থেকে ভাঁজ হয়ে ধসে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে বত্রিশটা গাড়িসহ চৌষট্টি জন মানুষ বরফঠান্ডা নদীতে গিয়ে পড়ল। মারা গেলেন ছেচল্লিশ জন।

    তদন্তে যা বেরোল, তা রীতিমতো শিহরন জাগানো। গোটা এই বিশাল সেতুটা ভেঙেছিল একটামাত্র যন্ত্রাংশের জন্য - একটা 'আইবার', মানে চেন-এর মতো লিঙ্কের একটা কড়ি। সেই আইবারটার ভেতরে লুকিয়ে ছিল মাত্র মিলিমিটার তিনেকের একটা সূক্ষ্ম ফাটল। এই ফাটল কোনো একদিনে তৈরি হয়নি, চল্লিশ বছর ধরে ধীরে ধীরে বেড়েছিল, স্ট্রেস কোরোশন ক্র্যাকিং আর কোরোশন ফ্যাটিগ-এর যৌথ কারসাজিতে। খেয়াল করুন, দুটোই ক্ষয়েরই রূপ। ফাটলটা শুরু হয়েছিল একটা ছোট্ট মরচে-গর্ত থেকে, যেখানে জল আর নুন জমে থাকত, তারপর চাপ আর ক্ষয় মিলে সেটাকে বাড়িয়ে তুলেছিল। আর যেহেতু ফাটলটা ছিল একদম ভেতরে, ছিদ্রের গায়ে, তাই সে-যুগের চোখে-দেখা পরিদর্শনে সেটা ধরা পড়ার কোনো উপায়ই ছিল না।

    ভাবলে শিউরে উঠতে হয় যে এই গোটা বিপর্যয়টা শুরু হয়েছিল এমন এক জায়গা থেকে, যেখানে কারো চোখ পৌঁছনোর উপায়ই ছিল না। ফাটলটা ছিল ধাতুর ভেতরে, একটা ছিদ্রের গায়ে লুকিয়ে। বাইরে থেকে সেতুটা দেখতে ছিল মজবুত, নির্ভরযোগ্য; প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ নিশ্চিন্তে তার ওপর দিয়ে পার হত, কেউ ভাবেনি যে তাদের পায়ের নিচে একটা অদৃশ্য ঘড়ি টিকটিক করছে। চল্লিশ বছর ধরে সেই ফাটল একটু একটু করে বেড়েছে, ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছে, আর তারপর বেছে নিয়েছে বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সন্ধেগুলোর একটাকে। নিঃশব্দ ঘাতকের ধৈর্যই তার সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্র।

    সেতুটার নকশাতেও একটা মারাত্মক দুর্বলতা ছিল, কোনো বিকল্প বা 'রিডানডেন্সি' ছিল না। মানে, একটা কড়ি ভাঙলে তার ভার অন্য কোথাও ভাগ হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না; একটা গেলেই গোটাটা যাবে। ঠিক তাই হল। সেই একটামাত্র আইবার ভাঙার এক মিনিটের মধ্যে গোটা সেতু নদীতে। এই দুর্ঘটনার পরেই আমেরিকায় প্রথম সেতু-পরিদর্শনের জাতীয় নিয়মকানুন চালু হয়। ছেচল্লিশটা প্রাণের বিনিময়ে মানুষ শিখল, চোখে যা দেখা যায় না, তার দিকেও নজর রাখতে হয়। মিলিমিটার তিনেকের একটা মরচে-ফাটল কীভাবে একটা গোটা জনপদকে দুই টুকরো করে দিতে পারে, সিলভার ব্রিজ তার নির্মম সাক্ষী।
     

    আকাশে খুলে যাওয়া ছাদ

    এবার আসুন আকাশে। ১৯৮৮ সালের এপ্রিল, হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের ওপর দিয়ে উড়ছিল আলোহা এয়ারলাইন্সের ২৪৩ নম্বর ফ্লাইট, একটা বোয়িং ৭৩৭ বিমান। প্রায় চব্বিশ হাজার ফুট উচ্চতায় হঠাৎ এক বিস্ফোরক শব্দ, আর মুহূর্তের মধ্যে বিমানের সামনের দিকের ছাদের একটা বিরাট অংশ, প্রায় আঠারো ফুট লম্বা টুকরো কাগজের মতো ছিঁড়ে উড়ে গেল। যাত্রীরা হঠাৎ নিজেদের আবিষ্কার করলেন খোলা আকাশের নিচে, গর্জন করা বাতাসের মধ্যে, বাইশ হাজার ফুট ওপরে। এক বিমানসেবিকা, যিনি তখন যাত্রীদের সেবায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, নিমেষে বাইরে ছিটকে গিয়ে হারিয়ে গেলেন - তাঁর দেহ আর পাওয়া যায়নি। বাকিরা প্রাণে বাঁচলেন অবিশ্বাস্যভাবে, কারণ পাইলট প্রায় অসম্ভব দক্ষতায় সেই আধ-খোলা বিমানটাকে নামিয়ে আনতে পেরেছিলেন।

    এর পেছনেও সেই নিঃশব্দ ঘাতক। বিমানের ধাতব চামড়ার পাতগুলো জোড়া দেওয়া হয় হাজার হাজার রিভেট দিয়ে, আর জোড়ার মুখগুলো আঠা দিয়ে সিল করা থাকে। এই বিমানটা ছিল পুরনো, বহুবার সমুদ্রের নোনা-আর্দ্র বাতাসে উড়েছে। সেই নোনা আর্দ্রতা আঠার ফাঁক গলে রিভেটের জোড়ার ভেতরে ঢুকে ক্রেভিস-ক্ষয় শুরু করে দিয়েছিল। জোড়ার ভেতরে জমে ওঠা ক্ষয় থেকে তৈরি হয়েছিল সূক্ষ্ম ফাটল, আর প্রতিটা উড়ানে বিমানের ভেতরের চাপ বাড়া-কমার ধকলে সেই ফাটলগুলো ফ্যাটিগ বা ক্লান্তির টানে বাড়তে বাড়তে একদিন এক বিরাট ফাটলে জুড়ে গেল। ব্যস, ছাদ খুলে গেল আকাশে। এই দুর্ঘটনা গোটা বিমান শিল্পকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, বদলে দিয়েছিল বুড়ো হয়ে যাওয়া বিমানের রক্ষণাবেক্ষণের নিয়ম। কারণ আকাশে ওড়া প্রতিটা ধাতব খোলসের ভেতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে সেই একই নিঃশব্দ ক্ষয়।

    সিলভার ব্রিজ আর আলোহা, দুটো ঘটনার ভেতরে একটা গভীর মিল আছে, যা খেয়াল করা জরুরি। দুই ক্ষেত্রেই একা ক্ষয় সর্বনাশ করেনি; সর্বনাশ করেছে ক্ষয় আর চাপের যুগলবন্দি। ক্ষয় প্রথমে একটা ছোট্ট দুর্বল বিন্দু তৈরি করে - একটা গর্ত, একটা খসখসে দাগ। তারপর যন্ত্রের ওপর বারবার পড়া চাপ বা টানের ধকল সেই দুর্বল বিন্দু থেকে ফাটল টেনে লম্বা করে। এই জোড়া আক্রমণ, একে বলে কোরোশন ফ্যাটিগ বা স্ট্রেস কোরোশন, সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ শুধু ক্ষয় বা শুধু চাপ যা করতে পারত না, দুইয়ে মিলে তা অনেক তাড়াতাড়ি করে ফেলে। ধাতু যেখানে নড়ে, বাঁকে, কাঁপে, বারবার ভার বইতে হয়, সেখানেই এই যুগলবন্দি সবচেয়ে মারাত্মক। সেতু, বিমান, রেললাইন, পাইপলাইন - এরা সবাই তো সারাক্ষণ চাপ আর ক্ষয়ের এই দ্বিমুখী আক্রমণের নিচে বেঁচে আছে।
     

    যখন গোটা শহর জ্বলে ওঠে

    এবার সবচেয়ে ভয়ংকর গল্পটা যেখানে ক্ষয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছিল সেই দুই আলাদা ধাতুর গ্যালভানিক ঝগড়া। ১৯৯২ সালের ২২শে এপ্রিল, মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা শহরের মাটির নিচে পরপর দশটা বিস্ফোরণ ঘটল। প্রায় আট কিলোমিটার লম্বা রাস্তা ফালা ফালা হয়ে গেল, ম্যানহোলের ঢাকনা রকেটের মতো আকাশে উড়ল, বাস-গাড়ি ছিটকে উঠল বাতাসে, কোথাও কোথাও মাটিতে বিশাল গহ্বর তৈরি হয়ে গোটা বাড়ি-রাস্তা গিলে নিল। মারা গেলেন অন্তত দুইশো-র বেশি মানুষ, আহত হলেন প্রায় দেড় হাজার, ক্ষতিগ্রস্ত হল প্রায় ষোলোশো বাড়ি।

    কেন? তদন্তে বেরোল, মাটির নিচে জিঙ্ক-মোড়া লোহার একটা জলের পাইপ বসানো হয়েছিল ইস্পাতের একটা পুরনো পেট্রোল-পাইপলাইনের একদম গা ঘেঁষে। মাটির ভেজা ভাবে এই দুই ধাতুর মধ্যে তৈরি হল ঠিক সেই গ্যালভানিক ব্যাটারির মতো অবস্থা ঠিক যেন মাটির নিচে একটা আস্ত ব্যাটারি চলছে। ধীরে ধীরে ইস্পাতের পেট্রোল-পাইপটা ক্ষয়ে গিয়ে ফুটো হয়ে গেল, আর সেই ফুটো দিয়ে পেট্রোল চুঁইয়ে ঢুকতে লাগল শহরের নর্দমার ভেতর। বিস্ফোরণের কয়েকদিন আগে থেকেই এলাকার মানুষ নর্দমা থেকে পেট্রোলের কটু গন্ধ পাচ্ছিলেন, কারো কারো বাড়ির জলের কল দিয়েও নাকি পেট্রোল বেরোচ্ছিল, চোখ-গলা জ্বালা করছিল। শয়ে শয়ে অভিযোগ জমা পড়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা করেও সিদ্ধান্ত নিল, এলাকা খালি করার দরকার নেই। তারপর এল সেই সকাল, আর গোটা এলাকা যেন বোমা-বর্ষণের শিকার হল।

    গুয়াদালাহারার গল্পটা শুধু ক্ষয়ের নয়, অবহেলারও। মরচে ফুটো করেছিল পাইপ, কিন্তু মানুষ উপেক্ষা করেছিল সতর্কবার্তা। এই দুইয়ের মিলনেই তৈরি হয় আসল বিপর্যয় যা শুধু ধাতুর দোষে নয়, মানুষের চোখ বুজে থাকার দোষেও।

    খেয়াল করে দেখুন, এই 'সতর্কবার্তা উপেক্ষা' ব্যাপারটা কেমন বারবার ফিরে আসছে। গুয়াদালাহারায় মানুষ পেট্রোলের গন্ধ পেয়েছিল, অভিযোগ করেছিল কিন্তু শোনা হয়নি। পরের গল্পে দেখবেন, প্রিন্সেস আশিকা ফেরিতে ওঠার আগেই এক প্রকৌশলী ছবি দেখিয়ে সাবধান করেছিলেন, সেখানেও শোনা হয়নি। ক্ষয় কখনোই একদম নিঃশব্দে আঘাত করে না; সে আগে থেকে ইশারা দেয় - একটা দাগ, একটা গন্ধ, একটা চুঁইয়ে পড়া। বিপর্যয় ঘটে তখনই, যখন সেই ইশারা পড়েও মানুষ পড়ে না।

    আর সমুদ্রের কথা তো আলাদা করে বলতেই হয়। নোনা জল, নোনা বাতাস, অবিরাম ঢেউয়ের ধকল - জাহাজের জন্য সমুদ্র যেন ক্ষয়ের এক নিখুঁত রণক্ষেত্র। এই জন্যই জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণে এত খরচ, এত যত্ন। একটা জাহাজের খোল যদি ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে পাতলা হয়ে যায়, আর তা যদি কেউ সময়মতো ধরতে না পারে, তাহলে ভরা সমুদ্রে একটা বড় ঢেউই যথেষ্ট। মাছধরা নৌকো থেকে দৈত্যাকার তেলের ট্যাংকার, সমুদ্রে ভাসা প্রতিটা ধাতব শরীরই ক্ষয়ের সঙ্গে এক নিরন্তর, নিঃশব্দ যুদ্ধে লিপ্ত। প্রিন্সেস আশিকার সেই ক্ষয়ে-যাওয়া দরজা তারই এক করুণ সাক্ষী যেখানে নোনা জল ধীরে ধীরে যে জাহাজকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলেছিল, তাকে বাঁচানোর শেষ সুযোগটুকুও মানুষ হেলায় হারিয়েছিল।
     

    কংক্রিটের ভেতরের গোপন যুদ্ধ

    এবার এমন এক শত্রুর কথা, যা আমাদের সবচেয়ে কাছের, অথচ সবচেয়ে অদেখা। আমরা যে বহুতলে থাকি, যে সেতু পেরিয়ে অফিস যাই, যে ফ্লাইওভারের নিচে দিয়ে গাড়ি চালাই, এদের প্রায় সবই তৈরি রিইনফোর্সড কংক্রিট দিয়ে, অর্থাৎ কংক্রিটের ভেতরে বসানো লোহার রড দিয়ে। কংক্রিট চাপ সইতে ওস্তাদ, কিন্তু টান সইতে দুর্বল; আর লোহার রড টান সইতে ওস্তাদ। দুইয়ে মিলে অপূর্ব জুটি। আরও ভালো ব্যাপার, তাজা কংক্রিট ভীষণ ক্ষারীয়, আর এই ক্ষারীয়তা লোহার রডের গায়ে এক অদৃশ্য রক্ষাকবচ তৈরি করে রাখে, যা রডকে মরচে থেকে বাঁচায়। তাত্ত্বিকভাবে এই জুটির শত বছর টিকে থাকার কথা।

    কিন্তু গোল বাধে যখন বাইরের নুন বা দূষণ কংক্রিটের ফাটল গলে ভেতরে ঢুকে সেই রক্ষাকবচ ভেঙে দেয়। বিশেষ করে সমুদ্রের ধারে, বা যেখানে বাতাসে নুন-দূষণ বেশি। তখন ভেতরের রডে মরচে ধরতে শুরু করে। আর মরচের একটা খুব বাজে স্বভাব আছে, সে মূল লোহার চেয়ে অনেক বেশি জায়গা নেয়, ফুলে ওঠে। এই ফুলে ওঠা রড ভেতর থেকে কংক্রিটে চাপ দিয়ে ফাটিয়ে দেয়, চাঙড় খসে পড়ে, রড আরও বেশি খোলা বাতাসে চলে আসে, আরও দ্রুত ক্ষয় হয় - এক দুষ্টচক্র। বাইরে থেকে দেখলে বাড়িটা দিব্যি দাঁড়িয়ে, ভেতরে তার কঙ্কাল কুরে খাওয়া। বার্লিনের সেই বিখ্যাত কংগ্রেস হলের ছাদ ঠিক এভাবেই ধসেছিল ১৯৮০ সালে, কংক্রিটের ভেতরে টান-টান করে রাখা ইস্পাতের রড ঠিকমতো মোড়া না থাকায় ক্ষয় আর ভঙ্গুরতায় ভেঙে পড়ে, প্রাণ যায় একজনের।

    এই গল্পটা ভারতের মতো দেশের জন্য বিশেষভাবে জরুরি। আমাদের আর্দ্র, গরম, নোনা আবহাওয়া রডে-মরচের আদর্শ প্রজননক্ষেত্র। প্রতি বর্ষায় খবরের কাগজে যে বহুতল বা ফ্লাইওভার বা পুরনো সেতু হঠাৎ ভেঙে পড়ার খবর আসে, তার পেছনে নিম্নমানের নির্মাণ বা অতিরিক্ত ভারের সঙ্গে সঙ্গে প্রায়ই লুকিয়ে থাকে এই নিঃশব্দ রড-ক্ষয়। চোখে দেখা যায় না বলেই সে বিপজ্জনক, যতদিনে চাঙড় খসে পড়া শুরু হয়, ততদিনে ভেতরের ক্ষতি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে।
     

    শুধু মানুষ নয়

    ক্ষয়ের শিকার কিন্তু কেবল মানুষ নয়। মানুষের মৃত্যুর খবর কাগজে ওঠে, কিন্তু নীরবে মরে যাওয়া পশুদের খবর কেউ রাখে না। হ্যানসন একটা উদাহরণ দিয়েছেন যেখানে কানাডার অন্টারিওতে একটা শূকর-খামারের কংক্রিটের ঠেকনা-স্তম্ভ ক্ষয়ে ভেঙে পড়ে গোটা খামার ধসে যায়, মারা যায় প্রায় আড়াইশো শূকর। পশুর মলমূত্রে থাকা অ্যামোনিয়া, সালফেট আর নানা রাসায়নিক খামারের কংক্রিট আর ধাতুকে ভেতর থেকে ক্ষইয়ে দেয়, যা এমন দুর্ঘটনার জন্ম দেয়।

    আরও একটা অদ্ভুত অথচ মারাত্মক ব্যাপার আছে যেখানে ক্ষয়ে-যাওয়া বৈদ্যুতিক তারও আগুনের কারণ হতে পারে। তারের ধাতু ক্ষয়ে সরু হয়ে গেলে সেখানে বিদ্যুৎ চলাচলে বাধা বাড়ে, বাধা বাড়লে তাপ বাড়ে, আর সেই তাপই আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। বহু খামার-অগ্নিকাণ্ডের পেছনে এই ক্ষয়ে-যাওয়া তারই দায়ী। ভাবুন, একটা মরচে-পড়া তারের টুকরো থেকে গোটা একটা কাঠামো পুড়ে ছাই। মরচে যে কত রূপে, কত অপ্রত্যাশিত পথে আঘাত হানতে পারে, ভাবলে অবাক হতে হয়।
     

    ভোপাল - বিপর্যয়ের ভেতরের এক ছোট্ট অংশীদার

    ভারতের সবচেয়ে বড় শিল্প-বিপর্যয়, ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, কেবল ক্ষয়ের গল্প নয়, এটা নকশার ত্রুটি, ব্যবস্থাপনার গাফিলতি আর নিরাপত্তার চূড়ান্ত অবহেলার এক ভয়াবহ সমষ্টি। তবু এর ভেতরে ক্ষয়ও একটা ভূমিকা নিয়েছিল, আর সেটুকু জানা জরুরি। হ্যানসনের বিবরণ অনুযায়ী, কারখানার ইস্পাতের পাইপ ক্ষয়ে গিয়ে যখন সেই ফুটো দিয়ে জল চুঁইয়ে মিথাইল আইসোসায়ানেট ভরা ট্যাংকে ঢুকল, তখন লোহার ক্ষয়-জাত পদার্থ এক ভয়ংকর বিক্রিয়ার অনুঘটক হিসেবে কাজ করল। সেই বিক্রিয়াই ট্যাংক ফাটিয়ে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে দেয়। সেই রাতে মারা যান হাজার হাজার মানুষ, পরের বছরগুলোতে মৃত্যু আরও বাড়ে, আর লক্ষ লক্ষ মানুষ গ্যাসজনিত নানা রোগে ভুগতে থাকেন যে যন্ত্রণা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে।

    ভোপালের দায় নিশ্চয়ই মরচের ঘাড়ে চাপানো যায় না, সে দায় অনেক বড়, অনেক গভীর। কিন্তু এই ঘটনা একটা কথা মনে করিয়ে দেয় যে বড় বিপর্যয়ে ক্ষয় প্রায়ই থাকে নেপথ্যের এক ছোট্ট অংশীদার হয়ে, যাকে কেউ আলাদা করে খেয়াল করে না, অথচ সে দুর্ঘটনার শৃঙ্খলে একটা গুরুত্বপূর্ণ আংটা জুড়ে দেয়। বড় দুর্ঘটনা কখনো একটামাত্র কারণে ঘটে না; ঘটে অনেকগুলো ছোট ছোট ভুল, অবহেলা আর দুর্বলতা একসঙ্গে সার বেঁধে দাঁড়ালে। ক্ষয় সেই সারিতে প্রায়ই থাকে - চুপচাপ, পিছনের দিকে, কিন্তু হাজির।


    আরও কিছু নিঃশব্দ পতন

    তালিকা করলে শেষ হবে না, তবু আরও দু-একটা উল্লেখ করা যাক। বার্লিনের কংগ্রেস হল ১৯৫৭ সালে তৈরি এক অসাধারণ স্থাপত্যকীর্তি, যার বাঁকানো ছাদ ছিল দেখার মতো। মাত্র তেইশ বছর পরে, ১৯৮০ সালে, তার সেই ছাদ হঠাৎ ধসে পড়ে, প্রাণ যায় একজনের। কারণ? ছাদের কংক্রিটের ভেতরে টান-টান করে রাখা ইস্পাতের রড ঠিকমতো কংক্রিট-গ্রাউটে মোড়া হয়নি; ফলে সেই ইস্পাত রক্ষা পায়নি, ক্ষয় আর হাইড্রোজেন-জনিত ভঙ্গুরতায় ভেঙে পড়েছে। কংক্রিটের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইস্পাতের ক্ষয় যা চোখে দেখাই যায় না, আজও সারা পৃথিবীর সেতু আর বহুতলের এক বড় নিঃশব্দ শত্রু।

    ২০০৯ সালে টোঙ্গার 'প্রিন্সেস আশিকা' নামের এক ফেরি ডুবে যায়, প্রাণ যায় সব যাত্রী ও নাবিক মিলিয়ে চুয়াত্তর জনের। পরে তদন্তে জানা যায়, জাহাজে ওঠার আগেই এক প্রকৌশলী ছবি দেখিয়ে সাবধান করেছিলেন যে জাহাজের দরজা-জানলা ক্ষয়ে গিয়ে এমন হয়ে গেছে যে ঠিকমতো বন্ধই হচ্ছে না, এই জাহাজ চালানো উচিত নয়। সেই সাবধানবাণী উপেক্ষা করা হয়েছিল। আবার সেই একই সুর - মরচে আর মানুষের অবহেলার যুগলবন্দি।
     

    অদৃশ্যকে খোঁজার লড়াই

    এতগুলো বিপর্যয়ের একটা সুফলও হয়েছে যে মানুষ শিখেছে কীভাবে অদৃশ্য ক্ষয়কে খুঁজে বার করতে হয়, যন্ত্র না ভেঙেই। আজ প্রকৌশলীরা ধাতুর ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফাটল বা গর্ত খুঁজতে ব্যবহার করেন নানা কৌশল - শব্দতরঙ্গ পাঠিয়ে ভেতরের ফাটল শনাক্ত করা (আলট্রাসনিক পরীক্ষা), এক্স-রে দিয়ে ধাতুর ভেতর দেখা, চুম্বকক্ষেত্র বা রঞ্জক দিয়ে পৃষ্ঠের সূক্ষ্ম চিড় ফুটিয়ে তোলা। এদের বলা হয় 'অবিনাশী পরীক্ষা', অর্থাৎ জিনিসটা না ভেঙেই তার ভেতরের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, অনেকটা মানুষের এক্স-রে বা আলট্রাসাউন্ডের মতো। সিলভার ব্রিজের যুগে এই প্রযুক্তি এত সহজলভ্য ছিল না, তাই সেই মিলিমিটার তিনেকের ফাটল কেউ দেখতে পায়নি। আজ পেত। এইটুকুই অগ্রগতি যে মানুষ ধীরে ধীরে অন্ধকারে আলো ফেলতে শিখছে।

    কিন্তু যন্ত্র যতই উন্নত হোক, সে তখনই কাজে লাগে যখন কেউ সেটা ব্যবহার করে। আর এইখানেই আসল গল্পের মোড়। কারণ ক্ষয় শনাক্ত করার চেয়েও বড় প্রশ্ন — শনাক্ত করার পর মানুষ কী করে?


    আসল অপরাধী কে?

    এতগুলো গল্পের পর একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে যে দোষটা তাহলে কার? ধাতুর, নাকি মানুষের? গ্রয়সম্যান একটা চমকে দেওয়া হিসেব দিয়েছেন। ক্ষয়জনিত বিপর্যয়ের প্রায় পঁয়ষট্টি থেকে পঁচাশি শতাংশ ক্ষেত্রেই মূল দায় থাকে মানুষের - ভুল ধাতু বাছাই, দুই বেমানান ধাতুকে একসঙ্গে জুড়ে দেওয়া, রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতি, সময়মতো পরিদর্শন না করা, বা সবচেয়ে খারাপ - স্পষ্ট সতর্কবার্তা পেয়েও তা উপেক্ষা করা। মরচে নিজে থেকে কাউকে খুন করে না; মানুষ তাকে সুযোগ করে দেয়।

    কেন মানুষ বারবার এই ভুল করে? একটা বড় কারণ হল, ক্ষয় ধীর। যা ধীরে ঘটে, মানুষ তাকে গুরুত্ব দিতে ভুলে যায়। আজ একটু মরচে, কাল একটু, আজ ঠিক আছে তো, কাল নিশ্চয়ই আরও ঠিক থাকবে, এই ভেবে আমরা কাজ ফেলে রাখি। প্রকৌশলীদের মধ্যে একটা তেতো রসিকতা চালু আছে যে কোনো যন্ত্রের ক্ষয়ের হার নাকি সেই ক্ষয়-প্রকৌশলীর চাকরিতে বাকি থাকা মেয়াদের সঙ্গে উল্টো অনুপাতে চলে! অর্থাৎ যতদিন সমস্যাটা 'আমার আমলে' ফাটবে না, ততদিন সেটা 'পরে দেখা যাবে'। এই 'পরে দেখা যাবে' মনোভাবই বহু বিপর্যয়ের আসল বীজ।

    এই কথাটাই বোধহয় গোটা পর্বের সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা। ভূমিকম্প বা ঘূর্ণিঝড়ের ওপর আমাদের হাত নেই, কিন্তু ক্ষয় আলাদা। সে ধীর, সে অনুমেয়, সে ঠেকানো সম্ভব। শুধু দরকার একটু নজর, একটু যত্ন, আর অদৃশ্যকে দেখার একটু ইচ্ছে। সিলভার ব্রিজের সেই মিলিমিটার তিনেকের ফাটল, আলোহার সেই রিভেটের ভেতরের ক্ষয়, গুয়াদালাহারার সেই মাটির নিচের ব্যাটারি - এদের প্রত্যেকটাই আগেভাগে ধরা যেত, ঠেকানো যেত। ধরা যায়নি, কারণ মরচে কাজ করে অন্ধকারে, আর আমরা প্রায়ই আলো ফেলতে ভুলে যাই।

    এই পর্বের গল্পগুলো ভারী, রক্তমাখা, বিষণ্ণ – সেটা মানছি। কিন্তু এদের পিছনে একটা আশার আলোও আছে। যেহেতু দোষটা মূলত মানুষের, সমাধানটাও মানুষের হাতেই। প্রকৃতির রোষ আমরা থামাতে পারি না, কিন্তু নিজেদের অবহেলা তো থামাতে পারি। প্রতিটা বিপর্যয়ের গল্প আসলে একেকটা শিক্ষা - সিলভার ব্রিজ শিখিয়েছে নিয়মিত পরিদর্শন, আলোহা শিখিয়েছে বুড়ো যন্ত্রের যত্ন, গুয়াদালাহারা শিখিয়েছে সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া। এই শিক্ষাগুলোর দাম মিটেছে বহু প্রাণের বিনিময়ে; অন্তত সেগুলো যেন বৃথা না যায়।

    কিন্তু এই নিঃশব্দ ঘাতকেরই আরেকটা মুখ আছে, যা এতক্ষণ চেপে রেখেছি। যে ক্ষয় সেতু ভাঙে, বিমান ফাটায়, শহর জ্বালায়, সেই একই ক্ষয় আবার আমাদের ব্যাটারি চালায়, ধাতুকে বাঁচায়, শিল্পীর হাতে রূপ পায়, এমনকি আমাদের শরীরে অক্সিজেন বইয়ে নিয়ে যায়। শত্রু আর বন্ধুর এই আশ্চর্য দ্বৈততাই শেষ পর্বের বিষয়। সেইসঙ্গে দেখব ক্ষয়ের আসল দামটা, টাকায়, পরিবেশে, আর মানুষের জীবনে - ঠিক কত।
     
    [ক্রমশঃ]

     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    পর্ব ১ | পর্ব ২
  • প্রবন্ধ | ০৬ নভেম্বর ২০২৬ | ৩০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • হীরেন সিংহরায় | ০৬ নভেম্বর ২০২৬ ১৮:৩৭743808
  • অজস্র ধন্যবাদ।
    কেন যে বলে এ চেন ইজ অ্যাজ স্ট্রঙ্গ অ্যাজ ইটস উইকেসট লিংক সেটা আজ বুঝলাম। সিলভার ব্রিজ তার উদাহরণ। ভাস্করদা একবার বলেছিলেন, গাড়িতে উঠে লম্বা সফরে বেরিয়ে পড়লে বটে দুশ মাইল যাবার পরে গাড়ি খারাপ তুমি তাকে গাল মন্দ করলে তুমি তো জানো না তাঁর কল কব্জা বিগড়োতে আরম্ভ করেছে অনেক দিন আগেই, এটা হঠাৎ ঘটে না। আপনার লেখা পড়ে সেই কথাটা আবার মনে পড়ল - নিত্যি দিন কতো ব্রিজ পেরিয়ে যায় কত গাড়ি মানুষ, আকাশে ওড়ে হাওয়াই জাহাজ। তাদের দেখভাল কতোটা হয়? শুনেছিলাম ইটারনাল ভিজিলেন্স ইজ দি প্রাইস অফ লিবার্টি। আপনার লেখা পড়ে জানলাম কল কব্জাও তাই। অসাধারণ লেখা, ফাইল করে রাখলাম।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন।