কোরাল ব্লিচিং
কোরাল বা প্রবাল হলো একধরনের অমেরুদণ্ডী সামুদ্রিক প্রাণি যারা যূথবদ্ধ জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত। একই প্রজাতির ছোট্ট প্রবাল পলিপসরা লাখো লাখো সংখ্যায় একত্রিত হয়ে উষ্ণ ক্রান্তীয় মণ্ডলের সমুদ্রের অগভীর অংশে গড়ে তোলে তাদের জন্য এক আশ্চর্য আবাসিক এলাকা বা কলোনি যা সাধারণভাবে রীফ নামে পরিচিত। শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রবাল কীটদের দেহ থেকে ক্যালসিয়াম কার্বনেট নিঃসৃত হয় যা পরবর্তীতে শুকনো হয়ে শক্ত চুনট খোলসে পরিণত হয়।
পৃথিবীর উষ্ণ মণ্ডলের বিস্তির্ণ অংশ জুড়ে প্রবালরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে কলোনি বানিয়ে বাস করে। দুনিয়ার কমবেশি ১০০ টি দেশের সীমান্ত প্রান্তিক সমুদ্রের অগভীর অংশে আবাসিক কলোনি বানিয়ে বাস করে প্রবালেরা। তবে পৃথিবীর ছটি দেশে – অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন্স, পাপুয়া নিউগিনি, ফিজি এবং মালদ্বীপে – সারা দুনিয়ার অর্ধেকের বেশি প্রবালদের দেখা মিলবে।
বিজ্ঞানীদের মতে প্রবালদের কলোনি এক অনন্য বাস্তুতন্ত্রের উদাহরণ। সমুদ্রের খুব নগণ্য এলাকা (০.১%) জুড়ে থাকা এই বসতি বহু বিচিত্র সামুদ্রিক প্রাণির আশ্রয়স্থল। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে প্রায় ২৫% সামুদ্রিক প্রাণি এই প্রবাল কলোনিতে নিজেদের আবাস গড়ে তুলেছে। এ এক আশ্চর্য সহবাসী জীবনের উদাহরণ। এদের মধ্যে রয়েছে বহু বিচিত্র প্রজাতির মাছ, মোলাস্কস, সামুদ্রিক কীট, ক্রাস্টাসিয়ান্স, একিনোডার্মস, নানান রকম স্পঞ্জ,টুনিকেটস্ এবং অন্যান্য স্নিডারনিয়ানস্ রা। স্থলভাগের ওপরে থাকা আমাজনের বৃষ্টিবন যেমন বিপুল সংখ্যক প্রজাতির প্রাণির আশ্রয়স্থল, ঠিক তেমনি এই প্রবাল প্রাচীরকে জড়িয়ে ধরে বেঁচেবর্তে আছে বিপুল পরিমাণ সামুদ্রিক প্রাণির দল। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে বিজ্ঞানীরা আদর করে প্রবাল কলোনিকে সমুদ্রের বৃষ্টি বন বা ‘রেইন ফরেস্ট অফ দ্যা সী ‘ বলে থাকেন।
সাধারণ লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই অতুলনীয় বাস্তুতন্ত্রটি আজ গভীর সমস্যার সম্মুখীন। অগভীর সমুদ্রজলে থাকা অতি ক্ষুদ্র আকারের পলিপসরা বদলে যাওয়া জলীয় বাতাবরণের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না। নতুন নতুন পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে রীতিমতো বিপন্নতার শিকার হতে বাধ্য হচ্ছে এই অতি সংবেদনশীল প্রাণিরা। চলতি সমস্যাগুলোর সাথে ইদানিং যুক্ত হয়েছে কোরাল ব্লিচিং বা প্রবাল বিবর্ণতার সমস্যা। এই বিষয়েই আমাদের আজকের আলোচনার পরবর্তী অংশ।
২.
খুব সম্প্রতি পৃথিবীর প্রবালদের নিয়ে গবেষণারত সংস্থা “গ্লোবাল কোরাল রীফ মনিটরিং নেটওয়ার্ক” এর তরফে প্রকাশিত “স্ট্যাটাস অফ কোরাল রীফস্ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড” শীর্ষক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে পৃথিবীর প্রবাল কলোনিগুলো ঘনায়মান এক গভীর সংকটের সামনে পড়েছে। সমুদ্র জলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় প্রবালেরা আজ ক্রমশই ব্লিচিং বা বিবর্ণতার শিকার। রিপোর্টে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি এতো দ্রুত এবং স্বল্পকালের মধ্যে ঘটছে যে সমস্যার আবর্ত থেকে প্রবালদের রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। আগে কমবেশি এক দশক সময়ের মধ্যে এই সমস্যা দেখা গেলেও এখন তার অর্ধেকেরও কম সময়ে এই ঘটনা ঘটে চলেছে। এরফলে ক্রমশই কমছে প্রবালদের বসতি এলাকার পরিসর, বিপন্নতার শিকার হতে বাধ্য হচ্ছে তারা।
৩..
পৃথিবীর প্রধান প্রধান প্রবাল বসতিগুলোতে বিস্তারিত অনুসন্ধানের পর তাঁরা জানিয়েছেন যে ১৯৮০ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সারা পৃথিবীর প্রবাল কলোনিগুলোর ক্ষেত্রীয় পরিসর গড়পড়তা প্রায় ৯.৫ % কমে গেছে। ২০১০ সালের পরবর্তী সময়ে এই কমে যাওয়ার ঘটনা ঘটে চলেছে ধাপে ধাপে। মানুষের ক্রিয়াকলাপ জনিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্র জলের তাপমাত্রা ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে যা পলিপসদের সহন মাত্রাকে ছাপিয়ে গেছে। এভাবে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৯৮ সালের পর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত কম করে চারবার কোরাল ব্লিচিংএর ঘটনা ঘটেছে বিশ্বজুড়ে।
৪.
আলোচ্য রিপোর্টে সতর্কবার্তা জারি করে বলা হয়েছে যে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের দাপট কমাতে না পারলে অদূর ভবিষ্যতে এই অতুলনীয় বাস্তুতন্ত্রটি হয়তো সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই অবস্থার জন্য মানুষের কার্যকলাপকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা। তাঁদের মতে বায়ুমন্ডলে গ্রীনহাউস গ্যাসের সংযোজন মাত্রা ক্রমশই বাড়ছে। এই কারণে বিশ্ব উষ্ণায়নের সীমা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর সংকটমানকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। এরফলে সমুদ্র জলের উষ্ণতা এতোটাই বাড়ছে যে অদূর ভবিষ্যতে ব্লিচিং’এর দরুণ প্রবালরা হয়তো সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। সামুদ্রিক তাপদাহের পৌনঃপুনিকতা বেড়ে যাবার কারণে প্রবাল কীটদের পক্ষে বিপর্যয়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার কাজে যথেষ্ট সময় মিলছে না। রিপোর্টে খুব দ্রুত এই বিষয়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
৫.
প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক - উভয় কারণেই বৈশ্বিকভাবে বায়ুমণ্ডল আরও তপ্ত হয়ে উঠেছে। সদ্য পেরিয়ে আসা ২০২৩ এবং ২০২৪ সাল সাম্প্রতিক সময়ের সবথেকে উষ্ণ বছরের তকমা পেয়েছে। পরিস্থিতির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি পরবর্তী সময়ে। গবেষকরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর যে সব অঞ্চলের সমুদ্রের অগভীর অংশে কোরালরা দলবেঁধে থাকে সেই সব এলাকায় সামুদ্রিক তাপমাত্রা প্রাক শিল্প বিপ্লব কালীন তাপমাত্রা থেকে প্রায় ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে। এমন অবস্থা প্রবালদের পক্ষে সহনীয় নয়। এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে কমেছে প্রবালদের আবাসিক এলাকা। বিশ্বের ক্রমবর্ধমান উষ্ণতার কারণে এক অনন্য বাস্তুতন্ত্র নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে চিরকালের মতো।
৬.
পৃথিবী জুড়েই কমছে প্রবালদের আবাসিক এলাকার পরিসর। IUCN এর পক্ষ থেকে করা পর্যবেক্ষণ থেকে জানা গেছে যে অগভীর সমুদ্রজলে বসবাসকারী প্রবালেরা আগামী ২০৭৫ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। প্রবালদের বাসভূমির পরিবেশের ভারসাম্য হারিয়ে গেলে তাদের অস্তিত্বের সংকট আরও ঘনীভূত হবে। রিপোর্টে বলা হয়েছে যে পৃথিবীর প্রবালদের ৯৬% এলাকাই অত্যন্ত বিপদাপন্ন। পৃথিবীর প্রায় ১২৭ টি ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় প্রবাল বসতির সবকটিতেই এই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে যা রীতিমতো আশাহত করেছে
গবেষকদের। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বেরিয়ার রীফ, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের কোরাল ট্রায়াঙ্গল ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার প্রবাল কলোনিগুলো, মেসোআমেরিকান প্রবাল প্রাচীর ও লোহিত সাগরীয় প্রবালেরা সবই আজ সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার আশঙ্কায় রয়েছে। এমন খবরে মন ভারী হয়ে ওঠে। প্রশ্ন জাগে মনে – তাহলে কি আমরা সবাই হাল ছেড়ে দিয়ে হার মেনে নেব? এমন আশ্চর্য সুন্দর একটা বাস্তুতন্ত্র কি এভাবে লোপাট হয়ে যাবে চিরকালের মতো?
৭.
সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে প্রবালদের ভূমিকা অনন্য। অথচ নানা কারণেই এই জীবনধারা আজ বিপন্ন শুধু নয় নিশ্চিহ্ন হবার মুখে। সমুদ্রের স্বল্প গভীর অংশের আবাসিক হবার কারণে এই ঝুঁকি আরও বেড়েছে – উপকূলীয় এলাকায় উন্নয়ন কর্মসূচি, অনিয়ন্ত্রিতভাবে কংক্রিটের বোঝা বাড়িয়ে চলা, দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি, পর্যটন শিল্পের ব্যাপক প্রসার, শিল্প গড়ে তোলা, আধুনিক বাণিজ্যিক অ্যাকোয়া কালচার ব্যবস্থার প্রসার - এসবই প্রবালদের টিকে থাকার লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
অথচ এরা বিপন্ন হলে সামুদ্রিক জীবনচক্রের বর্ণিল প্রাণময় একটি ধারা চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে। প্রবাল কলোনিগুলোর ওপর একান্ত ভাবে নির্ভরশীল বিপুল সংখ্যক সামুদ্রিক জীবন আজ এই কারণেই গভীর সংকটের সামনে।
৮.
এতো বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েও আশায় আশায় নতুন করে বুক বাঁধার কথা শুনিয়েছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ। তাঁরা নতুন করে সব কিছু খতিয়ে দেখার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁদের যুক্তি হলো এই যে,প্রবালেরা চাপের মধ্যে থাকলেও এখনও সম্পূর্ণভাবে লোপাট হয়ে যায়নি। যারা এখনো টিকে রয়েছে তাদের নিয়েই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে হবে।সমুদ্র জলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। আমাদের সকলের উচিত এই দিকে ধ্যান দেবার। সমস্যা কেবলমাত্র প্রবালদের নয়, সমস্যা সমগ্র সামুদ্রিক জীবনের। মনে রাখতে হবে এই পরম সত্যটাকে যে একদিন এই সমুদ্র থেকেই জীবনের জয়যাত্রার সূচনা হয়েছিল কোটি কোটি বছর আগে। আজ বিশ্ব প্রাণের সেই আদিম আঁতুরঘর বিলীন হবার মহা আশঙ্কায় শঙ্কিত। আমাদের এগিয়ে আসতে হবে, সাড়া দিতে হবে এমন আন্তরিক আহ্বানে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।