

চল্লিশ বছর আগে ফ্রাঙ্কফুর্টের একটি প্রতিবাদী বইয়ের দোকানে ড্যানিয়েল কন বেনডিটকে চোখে দেখি। ড্যানি দি রেডের চুল ততদিনে ক্ষীণ হয়ে এসেছে; বলেছিলাম আটষট্টি সালে আমার কলেজের শেষ বছরে প্যারিসের সেই পথ বিপ্লব আমাদেরও অভিভূত করেছিল, তিনি সে কথায় গেলেন না, মৃদু হাসলেন মাত্র। মনে আছে যদিও জার্মান বলার চেষ্টা করেছিলাম, হয়তো আমার চেহারা দেখেই হয়তো স্বচ্ছন্দ ইংরেজিতে জবাব দিলেন। উনিশশো আটষট্টি সালে কলকাতায় টেলিভিশন নেই, খবর কাগজে ছাপা হতো সাদা কালো ছবি। তাঁর চুলের রঙ কতোটা লাল সেটা বোঝার উপায় ছিল না কিন্তু জেনেছিলাম মে মাসের তিন সপ্তাহে ফ্রান্সের ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে এক কোটি ফরাসি শ্রমিক তাঁদের দাবি নিয়ে কারখানা ছেড়ে পথে নামেন, শার্ল দ্য গলের সরকারের ভিত কেঁপে যায়। কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখল করতে পারে এই আশঙ্কায় প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল বাদেনে গিয়ে ফরাসি সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে এক সম্ভাব্য রাষ্ট্র বিপ্লব এড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করেন। শেষ অবধি ছাত্র আন্দোলন সফল হয়নি – সকল কর্মীর ন্যূনতম বেতন ৩৫% বাড়িয়ে দিয়ে এবং নতুন নির্বাচনে জয়ী হয়ে আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে কোনো এক চুক্তি করে শান্তি পুনরুদ্ধার করেন।

ড্যানি লে রুজ মে ১৯৬৮
তারপরেও অন্তত তিনবার ফরাসি ছাত্ররা তাঁদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে পথে নেমেছে কখনো জিতেছে কখনো ম্যাচ ড্র। তবু কয়েকদিন ধরে বারবার ড্যানিয়েল কন বেনডিটকে মনে পড়েছে।
এবারের ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছে ফ্রান্সের উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল বা লিসেতে।
প্রাক কথন
ফ্রান্সের স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অবৈতনিক
ক্রেশ: ছ’মাস থেকে তিন বছর
মাতারনেল: তিন থেকে ছ’বছর (আমাদের হিসেবে কিনডারগারটেন)
একোল এলিমেন্তার: ছয় থেকে এগারো (প্রাইমারি স্কুল)
কলেজ (!): এগারো থেকে পনেরো (মাধ্যমিক) এটি ব্রিটেনের ও লেভেল বা জি সি এস ই তুল্য, পাস করলে মেলে ডিপ্লম নাশিওনাল দু ব্রেভ
লিসে: পনেরো থেকে আঠারো (উচ্চ মাধ্যমিক) – ব্রিটেনের এ লেভেলের তুল্য -স্কুলের শেষ পরীক্ষা বাকালরিয়াত পাস করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দরোজায় কড়া নাড়া
লিসেতে ছাত্র ছাত্রীদের তিনটি ভাগ হয়ে যায় – টেকনিকাল, জেনারেল এবং ভোকেশনাল, যে যেটি নিতে চায়।
যদিও আঠারো বছর বয়েস অবধি শিক্ষালাভ ফরাসিদের জন্মগত অধিকার, দেশে কিছু, মাত্র সাত শতাংশ, লিসে প্রাইভেট। তারা কোন সরকারি সহায়তা পায় না, সেখানে পড়তে গেলে বছরে অন্তত বারো হাজার ইউরো দক্ষিণা লাগে। তুলনামূলক ভাবে ব্রিটেনের অন্তত বিশ শতাংশ ছাত্র ছাত্রী পাবলিক স্কুলে পড়ে, যা একেবারেই বাজে কথা, সেগুলো আসলে প্রাইভেট। সেখানে দক্ষিণা ফ্রান্সের লিসের ডবলের বেশি। ছেলে মেয়েদের কারণে আমি তার ভুক্তভোগী।
স্ফুলিঙ্গ
১৭ই সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার প্যারিসের প্লাস দে লা কনকর্ড থেকে সিধে দক্ষিণের উপকণ্ঠ ক্রেতেইয়ের একটি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল, সাঁ এক্সুপেরির (বিখ্যাত নাম, লিটল প্রিন্সের প্রণেতা) শিক্ষক শিক্ষিকারা স্ট্রাইক করলেন, তাঁদের পক্ষ থেকে রা বেসিয়ে ওপর মহলকে জানালেন এই স্কুল চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে, ইতিহাস, ফরাসি ভাষা ও সাহিত্য, অঙ্ক সহ বিভিন্ন বিষয় পড়ানোর শিক্ষকের অভাব, স্কুলের একমাত্র নার্স দীর্ঘদিন সিক লিভে আছেন। আমরা অভিযোগ করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি, সুরাহা করুন নইলে স্কুল আর খোলা রাখা যাবে না। সেদিন বিকেলবেলা নাগাদ ছাত্র ছাত্রীরা সমবেত হয়ে এই স্ট্রাইকে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নিলো; পরের দিন সকালবেলা তারা সমস্ত ডাস্টবিন স্কুলের সামনে জড়ো করে ব্যারিকেড গড়ে তোলে, প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে সমস্বরে তারা শিক্ষক শিক্ষিকাদের সমর্থন জানায়।
‘আমরা চাঁদ চাইছি না, আমাদের দাবি সামান্য’
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রায় তৎক্ষণাৎ এই দাবিগুলি মেটালেন এবং সাঁ এক্সুপেরি হাই স্কুল (লিসে) খুলল দু দিন বাদে। কিন্তু এই ঘটনাটি একটি দেশলাইয়ের কাঠির মতন আগুন লাগিয়ে দিল সারা দেশে। ফ্রান্সের সাড়ে তিন হাজার উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র ছাত্রীরা জানালো – স্কুল ঠিক করো! তাদের দাবির তালিকা –
• সব বিষয় পড়ানোর শিক্ষক চাই- ২০০৮ সালে লিসেতে মোট শিক্ষকের সংখ্যা যা ছিল আজ তার চেয়েও কম, ইতিমধ্যে ছাত্র সংখ্যা বেড়েছে দু লক্ষ
• স্কুল বাড়ির সংস্কার - বহু স্কুল ১৯৭০ সাল নাগাদ বানানো; কোথাও, এমনকি প্যারিসের স দেনিতে ছাদের ফুটো দিয়ে জল পড়তে দেখা গেছে
• পরিচ্ছন্ন এবং প্রয়োজন মাফিক টয়লেটের ব্যবস্থা
• বছরের পর বছর গরম বাড়ে, এবারের গ্রীষ্মে তিন মাস প্রায় ৪০ ডিগ্রি; এয়ার কন্ডিশন না হোক, ভালো ভেনটিলেশান এবং শীতের মোকাবিলা করতে সম্যক হিটারের ব্যবস্থা হোক
• ক্লাসে পড়ুয়ার সংখ্যা কমানো হোক – সত্তর শতাংশ ক্লাসে পড়ুয়ার সংখ্যা ৩৫ এর বেশি
• স্বাস্থ্য সেবা, নার্সের ব্যবস্থা
স্কুল বাড়ির সংস্কার এবং লোক বলের অভাব যে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা সেটি সরকার এবং ট্রেড ইউনিয়ন সকলেই মেনে নিয়েছেন কিন্তু সমাধান করতে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন সেটি মাকরোঁ সরকারের হাতে নেই। তাদের দিন আনি দিন খাই অবস্থা; হিসেব করে দেখা গেছে খরচা হবে দশ বিলিয়ন ইউরো; আজকে দেশের জাতীয় আয়ের তুলনায় ধারের পরিমাণ একশো কুড়ি শতাংশ – গ্রিস এবং ইতালির পরেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের তিন নম্বরে।*
কেবলমাত্র অর্থ দিয়ে হয়তো তার সমাধান হয় না এমন দুটি সমস্যা আছে -
বাকালরিয়াত বা হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা পাস করার পর ইউনিভার্সিটিতে যেতে গেলে ফরাসি ছাত্র ছাত্রী যে বিভীষিকার সম্মুখীন হয় সেটি আমাদের নীট পরীক্ষার মতো – এর নাম Parcoursup এই অনলাইন অটোমেটেড সিস্টেমে তারা তাদের রেজাল্ট এবং স্কুল রেকর্ড সহ ইউনিভার্সিটিতে দাখিল হবার জন্য দরখাস্ত করে। তারপর যে কি ঘটে খোদায় মালুম – ভালো ফলাফল সত্ত্বেও ঠিক কোন কারণে যে কেউ তার ইচ্ছেমত বিষয়ে তার পছন্দের ইউনিভার্সিটিতে স্থান পেলো না তা কোন মতেই জানা যায় না। এই অস্বচ্ছ সিস্টেমের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ অর্থহীন। স্বভাবতই অভিযোগ উঠেছে প্রাইভেট লিসে এবং বিশেষ সচ্ছল পরিবারের ছাত্র ছাত্রীরা এখানে অন্যায় সুবিধে পায় (ব্রিটেনে যেমন প্রাইভেট স্কুলের ছেলে মেয়েদের জন্য অক্সফোর্ড কেমব্রিজের দরোজা হাট করে খোলা, অবৈতনিক স্টেট স্কুলের ছেলে মেয়েদের কপালে ঢু ঢু, রেজাল্ট যত ভালো হোক না কেন) অতএব অবিলম্বে এই Parcousup পদ্ধতির সংস্কার প্রয়োজন। টাকার ব্যাপার নয়, এটি সদিচ্ছার বিষয়।
আমাদের উচ্চ মাধ্যমিকের ক্লাস বসতো এগারোটায়, বিকেল পাঁচটায় আমাদের দরোয়ান আশনারায়ণ ছুটির ঘণ্টা বাজাতো। ফরাসি লিসেতে হাজিরা দেওয়ার সময় সকাল আটটা, ছুটি হতে বিকেল ছটা, শীতের দিনে ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছে। ইংল্যান্ডে সেই এ লেভেলে আমার বড়ো মেয়ের স্কুল নটা থেকে সোয়া তিনটে, ইন্দ্রনীলের স্কুল নটা থেকে চারটে! এই দশ ঘণ্টা যে পাঠ পঠনে কাটে তা নয় ছাত্র ছাত্রীদের বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকরা সময় সুবিধে অনুযায়ী ক্লাস নিয়ে থাকেন, লাঞ্চ ব্রেক প্রায় দু ঘণ্টার রুটিনকে যদি কর্তৃপক্ষ ঠিকমতো সাজাতে পারেন তাহলে হয়তো ছেলেমেয়েদের দিনে দশ ঘণ্টা স্কুলে কাটাতে হতো না।
সামার এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের কারণে আমার ছেলে মেয়েরা জেনেছে ফ্রান্সের উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের অনুমোদিত ছুটি অনেক বেশি; ইংল্যান্ডে ও জার্মানিতে অন্তত ১৮০ দিন স্কুল খোলা রাখা আবশ্যিক,ম্যানডেটরি। ফ্রান্সের লিসে খোলা থাকে বছরে গড়ে দেড়শো দিন।
কিন্তু তাদের দিনগুলি দীর্ঘ।
প্রতিবাদ প্রতিরোধ
প্রতিবাদ জানাতে ছাত্র ছাত্রীরা পথে নেমেছে, সারা দেশে। শুরুতে তাদের মিছিল ছিল যন্তর মন্তরের মতোই বর্ণময়, নাচে গানে জীবন্ত। তাদের প্ল্যাকার্ডে নানান বাণী, ব্যঙ্গ, অট্টহাসি -সারা দেশ জুড়ে, লিওঁ থেকে মার্সেই, বোরদো, তুলুজ, সর্বত্র; পুলিস থেকেছে সম্মানজনক দূরত্বে, ধর পাকড় লাঠি চার্জ হয়নি বা কাঁদানে গ্যাস দূরের কথা তবু ছাত্র ছাত্রীদের রক্ষার জন্য এগিয়ে এসেছেন শুধু স্কুলের শিক্ষক নন, অনেক অভিভাবক গড়েছেন হিউম্যান চেন। গত মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর দেখা গেল স দেনির বামপন্থী মেয়র বাগায়কো একা দাঁড়ালেন অগ্রসরমান রায়ট পুলিস এবং ছাত্র ছাত্রীদের মাঝখানে, গড়লেন ওয়ান ম্যান হিউম্যান শিল্ড বললেন, এরা আমার ছেলে মেয়ে। পুলিস পেছিয়ে গেলো। কিন্তু গত ছ’তারিখে দেশ জোড়া আন্দোলনে চেহারাটা বদলাতে দেখা যাচ্ছে। গণতন্ত্রে বিরোধিতার সাংবিধানিক মান্যতা আছে, কিন্তু দেখা গেলো প্যারিস, লিল থেকে মারসেই অবধি ছাত্ররা স্কুলের প্রবেশ পথ অবরোধ করছে ডাস্টবিন দিয়ে, তাতে আগুন লাগিয়ে। অন্তত একশোটির বেশী স্কুল কোনো না কোনো ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সন্দেহ করা যেতেই পারে কিছু সমাজ বিরোধী মানুষ এই ভিড়ে নেমে ভাঙচুর করছেন। সরকার বিরোধী মত প্রকাশ করাটা বেআইনি নয় কিন্তু সরকারি সম্পত্তিকে নষ্ট করাটা মেনে নেওয়া যায় না। অতএব স্টান গান, কাঁদানে গ্যাসের ক্যানিস্টার হাতে সশস্ত্র পুলিস বাহিনীর আবির্ভাব এবং ছ’হাজার গ্রেপ্তার, তাদের মধ্যে পাঁচ হাজার নাবালক নাবালিকা। অন্তত একশো জনের ওপরে ক্রিমিনাল চার্জ আনা হয়েছে। অচিরেই দেখা গেলো যদিও প্রেসিডেন্ট মাকরোঁ জনতার সামনে আসছেন না, প্রায় অদৃশ্য; তিনি জানেন এ গোয়ালে ধুনো দেবার কোন প্রয়োজন নেই। তাঁর ক্ষমতাকাল ফুরবে ছ’মাস বাদে, তখন নতুন নির্বাচন। কিন্তু এই আন্দোলনের সুবিধে নেবার জন্য অতি দক্ষিণ এবং অতি বাম দু’পক্ষই মাঠে নেমে পড়েছে। মাকরোঁর কাছে পর পর দু’বার নির্বাচনে হেরেছিলেন দক্ষিণ পন্থী মারি ল্য পেন তিনি সামনের ইলেকশনে জেতার আশা রাখেন, গ্যালপ পোল অনুযায়ী এগিয়ে আছেন। মারি ল্য পেন এই ছাত্র অরাজকতার বিরুদ্ধে কিন্তু তাঁর প্রবল প্রতিপক্ষ বামপন্থী মেলানশঁ ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের দরকার হোক বা নাই হোক।

absolute বিপ্লব

একটা চোখ দাঁত হাত। আর কি?


তোমাদের অসুবিধা করার জন্য দু:খিত
আমরা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য লড়ছি


জার্মান স্কুলের সমর্থন

পিতা মাতা আমদের সঙ্গে আছেন

পুলিশি পাহারায়

আবর্জনা রিসাইকেল করো মন্ত্রী নয়


বিপ্লব শুরু হয় আমাদের সাহসে - জুলাই ১৮৩০ কলাম প্যারিস

নিস - শিক্ষা আমাদের অধিকার লড়াই নয়

“উল্টো করে যদি ধরো, তোমাদের দেব মে ১৯৬৮''

মাকরঁ ইউ আর ডান ব্রো
(ক্রমশ)
* ফরাসি বন্ড মার্কেট নিয়ে আলাদাভাবে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা আছে পরে।