
আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মাঝে মাঝে এমন কিছু কথা বলেন যে আমাদের মুখে আর বাক্যি সরে না।কয়েকদিন চুপ করে ভাবতে হয়।যেমন কয়েকদিন আগে কম্যুনিস্টদের কেন পুজোয় বইয়ের স্টল করতে দেওয়া উচিত নয় সেই প্রসঙ্গে বললেন, ওরা নাস্তিক। ওরা অঞ্জলি দেয় না,হাতে ডোর বাঁধে না,কপালে টিকা দেয় না ইত্যাদি।
উনি জানেন না হয়তো বহু হিন্দু এই সমস্ত বাহ্যিক আচরণগুলো পালন না করেই হিন্দু থাকেন,এমনকি ঈশ্বরবিশ্বাসী অর্থে আস্তিকও থাকেন।
আবার অনেকেই আছেন যাঁরা সত্যিই নাস্তিক। ঈশ্বরের অস্তিত্বে এবং বেদের অভ্রান্ততায় বিশ্বাস করেন না। তার মানেই কি তাঁরা হিন্দু বা সনাতন ধর্মকে অশ্রদ্ধা করেন?
একজন অজ্ঞেয়বাদী,সংশয়ী বা নাস্তিকও জানেন যে ধর্ম একটা সংস্কৃতি। ধর্মের ইতিহাস একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস জানতে অপরিহার্য।
প্রথমে যে বইটির কথা বললাম সেটি সম্ভবত আদি শংকরাচার্যের কোনো শিষ্যর লেখা।এই ইংরেজি অনুবাদটি এত ভালো যে তা উদবোধন প্রকাশিত বাংলা অনুবাদের তুলনায় সহজবোধ্য। এখানে বেদান্তদর্শনের গূঢ় তত্ত্ব, তাঁর আত্মোপলব্ধির কথা চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। শংকরের ব্রহ্মভাষ্য, নাগার্জুনের মাধ্যমিক কারিকা বা মহর্ষি কপিলের সাংখ্যকারিকার সম্বন্ধে সামান্য ধারণা থাকলেও বোঝা যায় যে ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মতত্ত্ব ( theology) এবং তৎসম্পর্কিত দর্শন যে উচ্চতায় পৌঁছেছিল, সম্ভবত পৃথিবীর আর কোথাও তা সম্ভব হয় নি। পরে তিব্বত এবং সিংহলে বৌদ্ধদর্শনের যে বিস্তার তার উৎসমুখ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ।ধর্মতত্ত্ব বহির্ভূত দর্শনচর্চায়, বস্তু,পদার্থ, ইন্দ্রিয়জ বাস্তবতা প্রভৃতির অনুধাবনে ভারতীয় দর্শনের সঙ্গে একমাত্র বোধহয় গ্রীক দর্শনের তুলনা হতে পারত।
মনে রাখতে হবে ভারতীয় ষড়দর্শনের মধ্যে বেদান্ত, যোগ ও ন্যায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে নি:সংশয়। কিন্তু সাংখ্য,পূর্ব মীমাংসা আর বৈশেষিক দর্শনে ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রতিষ্ঠা কোনো কেন্দ্রীয় বিষয় নয় ( আমি আধুনিক নাস্তিকতার অর্থে তাদের ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী বলছি না)।” ঈশ্বরাসিদ্ধে “ বলে সাংখ্যদর্শনের যে শ্লোকটি বেশি উদ্ধৃত হয় ঈশ্বরের অস্বীকৃতি হিসেবে সেটি সাংখ্যকারিকার নয়,সম্ভবত সাংখ্যসূত্রের। বৈশেষিক দর্শনের ক্ষেত্রেও কণাদ নয়,পরবর্তী বৈশেষিক দার্শনিক প্রশস্তপাদ বলেন যে অদৃষ্ট যেহেতু নিজে অচেতন তাই তাকে চালনা করার জন্য ঈশ্বরের মতো নিয়ন্ত্রক বুদ্ধিমান সত্তার প্রয়োজন হয়। এমনকি গৌতমের প্রাচীন ন্যায়শাস্ত্রেও ঈশ্বরের আলোচনা সীমিত। কিন্তু ষষ্ঠ শতকের নৈয়ায়িক উদ্যোতকর এবং দশম শতাব্দীর ন্যায় কুসুমাঞ্জলির প্রণেতা উদয়নাচার্য ঈশ্বরের অপরিহার্যতাকে প্রতিষ্ঠা করেন।
যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম এই পোস্ট– থমাস বাইরমের অনুবাদে অষ্টাবক্রগীতার অনুবাদ পড়ে মুগ্ধ হতে হয়। তা শুধু এই কারণে নয় যে এই অনুবাদের স্বচ্ছতা, সাবলীলতা বাংলা অনুবাদের চেয়েও ভালো। সেটা এই কারণেও যে বেদান্ত দর্শনের চিন্তার উচ্চতা অনুধাবনের জন্য এই গ্রন্থের বিকল্প নেই। তবে এটাও সত্য নির্গুণ ব্রহ্মের উপাসক এই বইয়ের সাধনার ধারা কেবল সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু এই বইতে ঈশ্বর উপাসনার সমস্ত বাহ্যিক উপকরণ বর্জনের কথা বলা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যে যে বাহ্যিক লক্ষ্মণগুলোর কথা বলেছেন সেগুলো পালন না করেও আমি আমার বাড়িতেই আমার বাবাকে দেখেছি সম্ভবত ঈশ্বরবিশ্বাসী হিসেবেই জীবন কাটাতে। ‘সম্ভবত' শব্দটা ব্যবহার করছি কারণ ভক্তির বাহ্যিক প্রদর্শন তখনও রীতিসিদ্ধ হয়ে যায় নি, ফলে বাইরে থেকে কাউকে আস্তিক বা নাস্তিক বলে চিনে নেওয়া সবসময় সম্ভব হত না। আবার ব্যক্তিগত ঈশ্বর, যিনি গাছের পাতা পড়াও নিয়ন্ত্রণ করেন তাকে অস্বীকার করলেও ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মীয় দর্শনের উচ্চতাকে শ্রদ্ধা করব না এমন মূর্খ আমি নই।
ধর্ম নিয়ে সমালোচনা করার বহু জিনিস আছে। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম যেভাবে বিবর্তিত হয়েছে সেখানে জাতিভেদ,মেয়েদের সামাজিক অধিকার নিয়ে সমালোচনার বহু জায়গা আছে। তবে বিশেষত পূর্ব ভারতে বিভিন্ন নারীদেবতার পুজোয়,তন্ত্রসাধনায়,শক্তিপূজায় নারীদের সশক্তিকরণের একটা মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান গড়ে উঠেছে এই যুক্তিও কেউ কেউ দেন। যদিও সেটা সামাজিক বঞ্চনার ক্ষতিপূরণ কিনা, দেবীত্ব আসলে নারীদের মানবিক সত্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া বোঝা কিনা সেটাও পালটা আলোচনায় উঠে এসেছে। আবার শুধু দার্শনিকতা কেন, হিন্দুধর্মের নেতিবাচক রিচ্যুয়ালগুলোর পাশাপাশি আধুনিক মূর্তিপুজার মধ্যে নান্দনিক এবং সৃষ্টিশীল অনেক ভাব যে ঘনীভূত হয়ে আছে তা যদি কেউ সদ্যসমাপ্ত দুর্গাপূজার প্যাণ্ডেলে সন্ধ্যারতির সময় কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকেন, তিনিই অনুভব করতে পারবেন।
ধার্মিকতা বলতে এই দেশে আমরা যা বুঝতাম, আধ্যাত্মিকতা তার একটা দার্শনিক স্তর। পাশাপাশি সাধারণ লোকের জন্য বেশকিছু নৈতিকতা ভিত্তিক অনুশাসনকেই ধর্ম বলা হয়েছে।বৌদ্ধ ধর্মেও তাই। নৈতিক হওয়ার জন্য,নান্দনিক ও সৃষ্টিশীল হওয়ার জন্য এমনকি আধ্যাত্মিক হওয়ার জন্য শুধু মানুষ হলেই চলে। তাতে কোনো নব্য সনাতনীর ফরমান মেনে চলার দরকার পড়ে না।
গর্ব করে বলুন আমি হিন্দু।হ্যাঁ, গর্ব করার মত অনেক কিছুই আছে হিন্দুধর্মের মধ্যে। আবার হিন্দুধর্মের নামে এরকম অনেক কিছুই হয়েছে যেটা লজ্জা পাওয়ার মত।কিন্তু অনেক অনাচার অন্য বড় ধর্মগুলোকে সামনে রেখেও হয়েছে,অনেক ক্ষেত্রে হয়ে চলেছে— আরও বেশি তো কম না।কিন্তু সামগ্রিকভাবে হিন্দুধর্মের সংস্কৃতি ও সভ্যতার অর্জন গর্ব করার মত।
স্কুল লাইফে আমাদের ইতিহাস পরীক্ষায় একটা ছোটো প্রশ্ন প্রায়ই কমন পড়ত। শিবাজীর চরিত্রের কোন দিকটি তোমার সবচেয়ে ভালো লাগে। দুই নম্বরের প্রশ্ন।উত্তর হল সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা আর নারীর প্রতি মর্যাদাবোধ। হিন্দুধর্মের ক্ষেত্রেও যদি এরকম প্রশ্ন আসে তাহলে বলতে চাইব বহুত্ববাদ এবং দার্শনিক চিন্তার উচ্চতা। এটা নিয়ে ব্যক্তিজীবনে নাস্তিক হওয়া সত্ত্বেও আমার গর্ববোধ আছে।
সমালোচনার অধিকারকে বজায় রেখেই এই শ্রদ্ধাবোধ নিয়ে বাঁচতে চাই।