১.
( নিক্কোলো প্যাগানিনি)
ক.
একেকটা রাত
হতে পারতো
একেকটা মহাসমুদ্র!
ওডেসীয়ুসেরও অসাধ্য!
যদি তুমি না থাকতে, হে প্যাগানিনি!
খ.
মেয়েরা তোমাকে চায়, হয়তো চায় না।
মেয়েরা ভালোও বাসে, আবার বাসে না।
কিন্তু যতদিন রোগা আঙুলে নীলিমা
রয়েছে উৎকীর্ণ, ফিরে আসবে মেয়েরা
বারবার তোমার পায়ের কাছে, শুধু
নিশিদিন বেহালায় ঝড় তুলে যেও!
২.
(এরিক স্যাটি)
বিস্মৃতি? সত্যি সে আছে?
আমাদেরই প্রাণে?
নাকি বিস্মৃতিই আমাদের প্রাণ?
৩.
(গুস্তাভ মালার)
ক.
দু'বার, তিনবার নয়, মাঝেমধ্যে নয়,
আমৃত্যু অচেনা থাকে মানুষ, অজানা থাকে
ইহুদির মতো, হে মালার, আগন্তুকের মতো,
সর্বত্রই অনুপ্রবেশ তার, কখনো সে কোথাও ‘যায় না',
কারো কাছেও না।
খ.
যখন নামবে বিস্বাদ! মহাধমনী
মরা নীলিমার রঙিন কলুষে ভরবে,
হাভাতে হৃদয়, যেনো সে গর্ভধারিণী,
গাঢ় চুমোকেও নিরাশায় লীন করবে,
যখন পৃথিবী, যেনো অতিকায় বেহালা,
অনায়াসে হবে ভয়াল সুরের ধাত্রী,
দেবতার ভোজসভায় স্বর্ণপেয়ালা
চৌচির করে, বাতাসার মতো রাত্রি
নামবে, তখন লক্ষ তারার শিবিরে
ঘন হবে ক্ষয়, তোমার আমার আকাশে
মায়াভরা কোনো বেলুনের মতো পিপাসা
আবেশে উড়বে, আমরা প্রাণের তিমিরে
সাঁতরাবো, গান গাইবো মৃত্যুবিলাসে!
তোমার আমার দু'চোখে কম্প্র কুয়াশা!
৪.
(দিমিত্রি শস্তাকোভিচ)
ক.
অর্ফিয়ুসও ভেঙে দিতো নীরবতা,
চুরমার করে দিতো শাদা, কালো আর ধূসরের লড়াই,
ঘুম পাড়িয়ে দিতো চিরশ্রমশীল সিসিফাসকে,
অথচ শেষ নিঃশ্বাস ফেলবার আগেই কেবল সে জেনেছিলো
তার পুরাতন দশ লক্ষ দশটা নিঃশ্বাসের মূল্য,
যার একটাও তার নিজের ছিলো না, ছিলো ইউরিদিসি-র।
খ.
কখনো কি কাঁদো? দুই গাল ভেঙে প্রবল কান্না
কখনো কি নামে? কখনো পিয়ানো লাগে নিষ্ঠুর?
কখনো পারো না দু'গাল ফোলাতে? সুরের বন্যা
কখনো দেখায় স্মৃতি ভেদ করে দূরান্ত দূর?
কখনো কি পারো অট্টহাসিটা না হেসে থাকতে?
কখনো ইচ্ছে হয় না আঁচলে দু'চোখ ঢাকতে?
৫.
(সেজার ফ্রাঙ্ক)
ক.
অযুতপ্রসবা নই,
সাহস ছিলো না অমর হওয়ার,
তবু যে অমরই হলাম, আর গেঁথে রইলাম
মহাকালের উচ্ছিন্ন দেয়ালে,
এর চেয়ে মন্দ আর কী হতে পারে?
খ.
আমরাও তবে মিতালির আশা হারিয়ে
কুয়াশাকাতর, চোরাই প্রাণের চাতালে,
রাক্ষসী তীঁর সোনালি ধনুকে জড়িয়ে,
অন্ধের মতো পিছলাই ঢালু পাতালে!
হয়তো পাবো না ঈশ্বর, দেশ, দেবতা,গ
এক নগরীর পিছনে আরেক নগরী
সাজিয়ে খুঁজবো ভাঙা পিয়ানোর মমতা,
নিঃস্ব; যে যার মূঢ় সন্ন্যাসে জাগরী!
কিন্তু কখনো সত্তার বোবা পাথরে
গান করে নবজাতকের মায়া-মদিরা-
অন্ধকারের নিঃঝুম মরা ধাঁধাকে
তাই বয়ে চলি বগলে, রাঙাই আতরে!
তাই হৃদয়ের ক্লান্ত, ক্লিষ্ট পাখিরা
ভোলে না রক্ত-মাংসের চেনা মিতাকে!
৬.
(ফ্রেডেরিক হ্যান্ডেল)
ক.
এ পথে, সে পথে ঘুরে
একটা চাকা বুঝলো আপন পথ বলতে কিছুই নেই,
বরং পথ মাত্রই মঞ্চ, পথ মাত্রই গোলকধাঁধা,
আর ভ্রমণের হয়রানিই বিনোদন,
মোটের ওপর, পৃথিবীতে সংখ্যায় তো দর্শকেরাই বড়ো!
খ.
মানুষ কেবল চাকার সেবক,
ঝড়ের, ঘূর্ণিজলের সেবক, ফুলের সেবক,
ফলের সেবক, আয়না আর ছায়ার সেবক,
মানুষ কেবল চাকার মতো ঘোরে, ফোঁটে
ফুলের মতো, ফলের মতো হাওয়ায় দোলে,
মানুষ কেবল আয়না চেনে, দুঃখ চেনে, মৃত্যু চেনে,
সর্বনাশা পাঁক খেয়ে ফের শান্তি জানে, শান্তি আনে,
মানুষ কেবল চাকার সেবক, আয়না হাতে
ফুলের সেবক, ফলের সেবক, পাতার, প্রজাপতির সেবক!
৭.
(ফ্রানৎস শুবেয়াঁ)
ক.
বাগানের নাম দুঃখ।
তীর্থের মতো বিমল সে,
অলিম্পুসের মতো প্রাচীন,
সেখানে সারাক্ষণ পুষ্প, রক্ত আর ইশ্বরের প্রার্থনা।
আর তারই মধ্যে বাগানের মালী, শুবেয়াঁ,
অশ্রুর মতো ঝাপসা, চেনাই যায় না,
মাথা নিচু করে স্বপ্ন দেখছে
মুখে বসন্তের দাগ-পড়া একটা মেয়েকে পাওয়ার!
খ.
চালচুলো ভুলে ঠিকই দুঃখের কাছে ফিরে আসি;
আমার এ ভীত ভালোবাসা
চেনা-শোনা মানুষের মতো
কখনো পাবে না ঠাঁই লোকালয়ে, পাবে না সুখের
অমল ধবল শান্তি, একাকার হাতে
কেবলই দুঃখের বীজ বুনে যাবো, কালক্রমে হবে মহীরুহ
আমার দুঃখ, আর সেইদিন তাবৎ পৃথিবী
দুর্গত বুড়োর মতো তাকিয়ে রইবে নিষ্পলক, ভাববে,
ভালোবাসা কেমনে উজানে টেনে নিয়েছিলো তাকে ও আমাকে!
৮
(লুডউইগ ফন বিঠোফেন)
ক.
নিঃশব্দে তুমি ছিলে বেঁচে,
নিঃশব্দেই তোমার মরণঃ
দুঃখের ঊর্ধ্বে এ মহিমা!
তাই বন্ধ হোক অশ্রুপাত,
সত্তার স্বর্গীয় ঘরে-ফেরায়!
জীবনে মরণে নিঃশব্দতা।
[ বিঠোফেন-১১৮ ]
খ.
তিনি সারা জীবন দুঃখ পেয়েছেন। দুঃখ পেতে পেতেই সারা জীবন স্বপ্ন দেখেছেন একটা Ode to Joy লেখার। প্যারাডক্স নয়? দুঃখের মাঝ দিয়েই আনন্দ!
গ.
ভিটগেনস্টাইন বলেছিলেন, 'বিঠোফেন ও মোজার্ট হলেন ঈশ্বরের সন্তান!' সত্যিই? ঈশ্বর? সন্তান? প্রথাগত ধর্মে অবিশ্বাসী ভিটগেনস্টাইন সম্ভবত বিস্ময় চেপে রাখতে পারেননি বিঠোফেন ও মোজার্টের মুখোমুখি হ'য়ে। সম্ভবত এই দুই ব্যক্তিত্বের মধ্যেই মানবিক আধ্যাত্মিকতার সবচেয়ে সুষ্ঠু বিকাশ ও প্রকাশ ঘটেছিলো- সংগীতের মাধ্যমে- কিন্তু বিঠোফেন বোধ হয় উৎকর্ষে সবাইকেই ছাপিয়ে যান। কী আশ্চর্য এই মানুষটি, যাঁর সান্নিধ্যে আমরা বোধ হয় একেক সময় মুগ্ধ হওয়ার ক্ষমতাও নিছক হারিয়ে ফেলি! যেমন এই এখনই, রাতের নির্জনে, স্ট্রিং ট্রায়ো শুনতে শুনতে মনে পড়ছিলো কল্কিপুরাণের অনন্ত মুনির কথা। সেই যে পুরীতে গিয়ে সমুদ্রে এক ডুব দিয়েই কোন এক মায়ার জগতে বহুকাল কাটিয়ে আবার পুরীতেই ফিরে আসা! বিস্ময়কর নয়? বিঠোফেন যেনো সেই সমুদ্রের জল। আর বিঠোফেনই বিষ্ণু! যিনি বারবার আমাকে বলছেন, 'জীবন নিঃসন্দেহে মায়া, কিন্তু তোমাকে আরো বাঁচতে হবে!'
ঘ.
বিঠোফেন জীবনে সুখশান্তির মুখ দেখেননি। নারীরা তাঁকে ভালোবাসেনি। আর্থিক দুর্ভাবনা ও অনিশ্চয়তা কখনো তাঁর পিছু ছাড়েনি। শারীরিক অসুস্থতা তো ছিলোই। কিন্তু এইসবের মধ্যেই তিনি সৃষ্টি করে গেছেন একের পর এক রত্ন। রোমাঁ রোলাঁ-র লেখা বিঠোফেনের ছোট্ট জীবনীটি পড়লে মনে হয় কোনো অচিন দেবতার কথা বলা হচ্ছে হয়তোবা, যে দেবতার কাছে দুঃখ-যন্ত্রণা-অশান্তি কোদাল বা মইয়ের মতোই অনায়াসে ব্যবহার্য একেকটা যন্ত্র বা উপকরণ, যা ওই দেবতা নিজেই হয়তো আহ্বান করে নিতেন যদি এমনিতেই না আসতো। প্রশ্ন ওঠে, ওই সমস্ত ব্যর্থতা, বিষাদ আর দুঃখভোগ ছাড়া কি বিঠোফেন বিঠোফেন হতে পারতেন? সম্ভবত, না। সুখের স্বর্গে শিল্পকলার কোনো প্রয়োজন নেই; অন্তর্গত বেদনা যেখানে নেই, সেখানে মহামানব বা মহামনীষারও কোনো প্রয়োজন পড়ে না। সব মানুষই কি বিঠোফেন হবে? কিন্তু সবার অন্তত এটুকু দুঃখ নিয়ে মরা উচিত যে, জীবদ্দশায় যথেষ্ট দুঃখ তারা ভোগ করে যেতে পারে নি।
ঙ.
বিঠোফেন গণিতে কাঁচা ছিলেন। স্কুলে থাকা কালে যোগ-বিয়োগ শিখেছিলেন। তবে গুণ-ভাগ শেখার আগেই, ১১ বছর বয়সে, সেখান থেকে বিদায় হন। পরবর্তী জীবনে এমনকি সাধারণ টাকা-পয়সা'র হিসাব রাখতেও ঝামেলা হতো তাঁর। হ্যাঁ, সেই মানুষ, যাঁর রচনার গাণিতিক সৌকর্য ও জটিলতা বিশ্ব জয় করেছে, তিনিই নিজের সম্পর্কে একবার বলেছিলেন, ' আমি এমন এক আনাড়ি ব্যবসায়ী, যে পাটিগণিতেই কাঁচা!'
চ.
যতটা বিনয়ী ও অনুগত না হলে একজন শিল্পীর পক্ষে একটা সামাজিক জীবন যাপন করা অসম্ভব, বিঠোফেন ততটা ছিলেন না। তিনি সম্ভবত বিনয়ীই ছিলেন না। এমনও বলেছিলেন যে, 'যা আমি মলত্যাগ করে বাইরে বার করে দিই, তা-ও আমার সমসাময়িকদের সমস্ত রচনার চেয়ে বেশি মূল্যবান।' সমসাময়িকরা কি বিঠোফেনকে পছন্দ করতেন? খুব একটা না মনে হয়। দস্তয়েভস্কি'র অহংকারও মনে হয় তাঁর মধ্যে ছিলো। 'আমি প্রতিভাবান, সুতরাং আমাকে ঋণ দেওয়া, সাহায্য করা, ও আমাকে ভালোবাসা মানুষের অবশ্যকর্তব্য।' এমনই হয়তো ভাবতেন। কিন্তু এই উদ্ধত অথচ দরিদ্র শিল্পীরাই সভ্যাতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন সবসময়। দুঃখ ও ভোগান্তি যখন অনিবার্য, তখন মাথা উঁচু রেখেই দুঃখভোগ করে যাবো। মন্দ কী? বিঠোফেন দুঃখভোগের চেয়ে বেশি কিছু চাননি কখনো।
৯.
(পিওতর চাইকোভস্কি)
ক.
ঈশ্বর লুকিয়েছিলেন বেহালায়,
যখন মঞ্চে বাজলো ভালজ্ সেন্তিমেন্তালে,
জনতার গুঞ্জন আর করতালির মধ্যেই
বাজনা থামলে ঈশ্বর ব্যপিত হলেন জনে জনে,
বনভোজনের আনন্দ কিংবা মধ্যরাত্রির ভুতুড়ে ভয়ের মতো!
খ.
যাও, পিয়ানোয় গিয়ে বসে পড়ো,
উগরে দাও নিজেকে, স্থির হও,
বিনীত শক্তিতে, সুরে সুরে,
টুকরো টুকরো ছিঁড়ে ফেলো বিচ্ছেদের ব্যাথা!
যাও, পিয়ানোর কাছে যাও, ক্ষমা চাও,
মনে করো কেবলই দুঃস্বপ্ন সব,
সমস্ত মানুষ; তুমি নিজে ছাড়া। শান্ত হও।
মুছে ফেলো চৌকাঠে পায়ের দাগ,
তোমার পথে তুমিই একেলা।
কেউ কখনো কি হতে পারে ব্যবহৃত?
যাও, ছিঁড়ে ফেলো স্মৃতির তসবীহ, মালা ছেঁড়ো,
ফুল দলে ফেলো শুকনো পায়ে,
শূন্য হাতে পুনরায় নিজেকে কুঁড়োও, যাও,
পিয়ানো'কে বলো সঙ্গী হতে, শক্তি হতে,
যাও, মেরে ফেলো অতীতকে, গলা টিপে ধরো স্মৃতির,
ভেঙে পড়ো অমলিন, যাও,
রক্ষা করো নিজেকে, শান্ত হও, স্বার্থপর হও!
গ.
'ভালজ্ সেন্তিমেন্তালে' শুনলে মনে হয় পৃথিবী কঠিন নয়, ঈশ্বরহীন, জলচিহ্নহীন মরুভূ নয়; বরং মায়ায় জড়ানো এক মায়াপুরী, যেখানে অনন্তকাল থাকতে না পারার দুঃখ রক্তে বিষের মতো মিশে যাচ্ছে আমাদের। এই সুরের সুরকার হওয়ার কথা ছিলো ঈশ্বরের; এই সুর দিয়েই তিনি মানুষকে বুঝিয়ে দিতে পারতেন জীবনের তাৎপর্য, জীবনের স্বাদবিস্বাদ। তা না ক'রে তিনি এবং তার পয়গম্বরেরা হাতুড়ে ডাক্তারের মতো একের পর এক ভুল চিকিৎসা দিয়ে গেছেন মানবজাতিকে; পৃথিবীকে তারা ক'রে তুলেছেন তাজ্যপুত্র, জীবনকে করেছেন 'পরীক্ষা'...হায় চাইকোভস্কি! আমাদের মৃত্যুর পরও গোলাপ ফুঁটবে মৌসুমে; আমাদের মৃত্যুর পরও ষোড়শীরা জন্ম নেবে; পৃথিবী এগিয়ে যাবে অনেক দুঃখ আর সামান্য সুখের মিতালিতে; কিন্তু আমরাই শুধু তা দেখতে পাবো না! এমনকি মৃত্যুর পর কে আমাদের জন্যে কেঁদেছে এবং কে কাঁদেনি; তাও জানতে পারবো না আমরা! কেমন হতো এই জীবন হাজারো অঙ্কের একটা নাটক হ'লে? আমাদের যবনিকাপাত হতো, কিন্তু আমরা মরতাম না; আমরা চুপ থাকতাম, কিন্তু সে শুধু আরো একবার গান গেয়ে ওঠার জন্যে! 'ভালজ সেন্তিমেন্তালে' এমন এক বিষ,যা আমাদের বেঁচে থাকার কামনা জাগিয়ে দেয়; কিন্তু আবার বিষই যেহেতু, সুতরাং ধীরে ধীরে নিঃশেষও ক'রে ফেলে আমাদেরকে!
[রচনা কাল: ২০২০-২১]
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।