এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মর্নিং ওয়াক

    Minati Ghosh লেখকের গ্রাহক হোন
    ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯৬ বার পঠিত
  • প্রভাতী হন্টন … মর্নিং ওয়াক
    =====================
    ডাক্তারবাবু লিপিড প্রোফাইল আর সুগার টেস্টের রিপোর্ট দেখে, ঘসঘস্ করে প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে মুখ না তুলেই জিজ্ঞাসা করেন "ভোরবেলায় হাঁটছেন তো? মর্নিং ওয়াক ?" হ্যাঁ ….বলে মাথাটা যতদূর পারা যায় বাঁ দিকে হেলাই। "গু...ড্.. " ডাক্তারবাবুর প্রফুল্ল বদন।
    আম আদমির জীবনে এখন এই 'মর্নিং ওয়াক' একটি অবশ্যই পালনীয় কর্ম। শীত গ্ৰীষ্ম বারো মাস। বর্ষায় একটু ব্রেক চাপতে হয়। তবে প্রচণ্ড শীতে সে এক দেখনদারি চিজ! পেঁয়াজের খোলার মত একের পর এক পোশাকের পরত - উলিকটের গেঞ্জি, উলিকটের প্যান্ট, সার্ট, হাফ সোয়েটার, ফুল সোয়েটার, মাফলার, মাংকি ক্যাপ, উলের মোজা। মহিলারা ঐ গেঞ্জি বাদ দিয়ে শাড়ি কি সালোয়ার কামিজ, মোটামুটি আর সব এক। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় শুধু দুটি চোখ চেয়ে থাকে - প্রতিবেশী, আত্মীয় বন্ধু - কেউ কাউকে চিনতে পারে না।

    মর্নিং ওয়াক ছাড়া দিন শুরু হয়না আর। সেই অন্ধকার থাকতে থাকতে ওঠা। আওয়াজ না ক'রে, পাশের ঘুমন্ত মানুষটিকে এতটুকু বিরক্ত না করে, পা টিপে টিপে বাইরে আসা।
    আমার প্রভাতী হাঁটার পথ এন এইচ থার্টিফোরের এধার ওধার। হাঁটার সময় কিছু সামাজিক বৈশিষ্ট চোখে পড়ে এই জনপদ দুটিকে কেন্দ্র করে। আশ্চর্যভাবে দুটি শ্রেণীচরিত্র দেখতে পাই। পাওয়া এবং না-পাওয়ার শ্রেণীচিহ্ন মেখে দুটি কাছাকাছি জনপদ।
    বাঁ দিকের জনপদটি ব্রিটিশ আমলের সাহেব কলোনী সদৃশ - ঝকঝকে রাস্তা, সুরম্য, সুশৃঙ্খল বাড়ি-ঘরদোর, নিঃস্তব্ধ, নির্জন ...কেউ কথা ব'লো না, কেউ শব্দ ক'রো না, ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন - গোলযোগ সইতে পারেন না! ... মাঝেমাঝে সেই নিঃস্তব্ধতা খানখান করে দেয় ভিতর থেকে আ্যলসেসিয়ান কি গ্ৰে হাউন্ডের জলদ গম্ভীর হুংকার। বাংলো প্যাটার্নের প্রতিটি বাড়ির সামনে সাজানো বাগান - মৌসুমী ফুলের রঙীন সংসার, গাছে গাছে সবুজ পাতার ভীড় - অথচ রাস্তায় একটিও পাতা পড়ে নেই। রাজপথ নয়, গলি পথ - তবু ধুলোবালি পাতাহীন আ্যসফাল্টের ঝকঝকে রাস্তা। সবার বাড়ির সামনে গ্যারাজ। ছোট-বড় গাড়ির আবাস। পায়ে ধুলো লাগাতে নারাজ এখানকার বাসিন্দারা। ভারী অঙ্কের আয়কর দাতা তাঁরা! উন্নতির পরিকল্পনায় ভোরের সূর্য তাই এখানেই প্রথম আলো ফেলেছে।
    ডানদিকের জনপদটির চরিত্র এক্কেবারে আলাদা - এলোমেলো বাড়িঘর, স্থির হয়ে যাওয়া নোংরা জলে ভর্তি নর্দমা, শুরু হওয়া গলিপথ তৈরির কাজ থমকে দাঁড়িয়ে, বালি, খোয়া ইঁট, গোটা ইঁটের স্ট্যাগ ইতঃস্তত ছড়ানো। রাস্তায় পড়ে আছে প্রতিটি বাড়ির উঠোন ঝাড়ু দেওয়া ঝরে পড়া পাতার স্তুপ, তারি মধ্যে পাড়ার সারমেয়দলের বাচ্চাকাচ্চা লেন্ডিগেন্ডি নিয়ে সুখে গুলতানি। স্কুল থেকে পাওয়া দিদির দেওয়া বাচ্চার সাইকেলে চড়ে মা যাচ্ছে তার কর্মক্ষেত্রে - বাসনমাজা, কাপড়কাচা, ঘরমোছার সাত সতেরো কাজে। সাইকেল ভ্যান বা স্কুটার মোটরবাইকের পিছনে বিশাল বড় এলুমিনিয়ামের হাঁড়িতে জিয়ল মাছ নিয়ে বিক্রেতা চলেছে বাজারে, কেউ কেউ নিয়ে চলেছে শাকসবজি ...চলমান জীবনের ছবি। এখানে দু-একটি বাগান বাড়ি সদৃশ আবাস ছাড়া কোন বাড়িতে গ্যারাজ নেই। বেশির ভাগ বাড়িই টালি টিনের চালের নিচে একতলা - হেলানো, এলোমেলো - বাড়িতে ছাদ পড়েছে কোনক্রমে। মুর্তিমান রসভঙ্গের মত দু-একটি রঙহীন, ইঁটদাঁত বের করা দোতলা বাড়িও আছে! …সকালে হেঁটে যেতে যেতে চোখে পড়ে শীত-গ্ৰীষ্ম-বর্ষার সমস্ত রকম কামড় উপেক্ষা ক'রে, সারা বচ্ছর এই ভোরবেলায় বাসনকোসন, কাচাকুচির জন্য আনা কাপড়চোপড়ের স্তুপ নিয়ে রাস্তার পাশের মিউনিসিপ্যালিটির টাইমকলে বসে থাকা মহিলার দল, মাঠের পাশে শক্ত হাতে জোরে জোরে ব্রাশ করা পুরুষ, চাদর কি মায়ের শাড়ি দিয়ে আগাপাশতলা মুড়ে দেওয়া শিশু‌। এই ভোরবেলাতেও মাঝেমাঝে ভেসে আসে রান্নার ছ্যাঁকছোঁক শব্দ - জিরে শুকনো লংকার ডাল সম্বরা কি অল্প তেলে ভাজা মাছের আঁশটে গন্ধ …. চারিদিকেই শব্দ, গন্ধ, রঙের ছড়াছড়ি - মাঠে কখনও সোনালী ধান বা হলুদ সর্ষে… আর অনেক না-থাকার ছড়াছড়ি। সেগুলো চামড়ার চোখে নয়, মনের চোখে দেখতে হয়। ডাক্তারখানা, স্কুল পড়ুয়া, পরিচ্ছন্ন গোটাগুটি জামাকাপড় পরা মানুষজন, স্বাস্থশোভায় উজ্জ্বল পরিমণ্ডল চোখে পড়েনা।
    অসমাপ্ত পথটি তৈরি হচ্ছে এলাকার মানুষদের কথা ভেবে নয়, তৈরি হচ্ছে ব্যবসায়ীদের জন্য - এ পথ থেকে গাঁ গাঁ করে একদিন হয়তো ছুটে যাবে চারশো সাত, মিনি ট্রাক, মোটর গাড়ি - ভেড়ী থেকে মাছ, সবজি অল্পসময়ের মধ্যে পৌঁছে যাবে মূল শহরে - হ্যাভ নটসদের সীমানা ছুঁয়ে হাভসদের অন্দরমহলে মসৃণভাবে...
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • প্রতিভা | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯:২৮742749
  • কি ইমোজি দেব?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন