এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • পালকের নাম মাশরেফা (প্রথম পর্ব)

    Aritra Ahamed লেখকের গ্রাহক হোন
    ০১ অক্টোবর ২০২৬ | ১৭ বার পঠিত
  • ১।
    আজ কোনো শীত নেই, মাশরেফা, আজ এক তুখোড় দিনের শেষে
    অতীতের ভূতে-পাওয়া গল্পের মতন মৃদু সন্ধ্যা নেমে আসবে চরাচরে;
    আজ এতো বিপন্ন, তবুও মনে হচ্ছে ফিরে ফিরে, কিছু একটা বুঝি নেমে এলো
    গহন, অসহ, একঘেয়ে সমতায়- হয়তো একটা পাখি, হয়তোবা একটা পালকই মাত্র-
    অথচ তাতেও খুশি আমি; টেবিলে ছড়ানো আগাছার মতো শত শত শত বই,
    পাণ্ডুলিপি, তেলাপোকা, উঁই; বিকট শব্দে প্রিয়তম অস্তিত্বরা হাসছে হো হো করে,
    হাসছে শয়তান, হাসছে মাংস, আর মাংসের খুপরিতে আত্মাও খুন হচ্ছে হেসে,
    হাসছে গাড়ল আবহাওয়া, হাসছে কাগজে লুকিয়ে থাকা ম্লান, নপুংসক দার্শনিক-
    একটা পালক এসে ঘুমিয়ে গিয়েছে অগোচরে, পালকের নাম মাশরেফা, কিংবা,
    হতে পারে, নামহীন, অনিশ্চিত; কিন্তু এসেছে তো! আসবে তো! হাসো, আরো হাসো,
    হে অস্তিত্বমালা, হাসো; আজ বিপুল দিনের শেষে উড়ে আসবে সন্ধ্যা, আর সঙ্গে কিছু পাখি,
    কিছু পাখি রতিশেষে পালকের ওম থুয়ে যাবে; আর আমি আমার অন্তরালে, আবডালে,
    মাশরেফা, মাশরেফা বলে নিষ্পলক ডেকে যাবো; আজ কোনো কিচিরমিচির নেই,
    শীত নেই, অস্থিরতা নেই; আছে কেবলই সম্পন্ন এক চরাচর, স্বাভাবিক, মাশরেফাময়, মোলায়েম।
     
     
    ২।
    কোনো ব্যস্ততা নেই; পিস্তলের ট্রিগারে আঙুল রেখে
    চেয়ে আছি জানালায় হতভম্ব প্রেমিকের মতো:
    আগামসি লেনে আজ দল বেঁধে মেঘের ভিতরে
    উড়ে যাচ্ছে শত শত অর্বাচীন কাক; ভাবি, ওদের দুর্দান্ত চপলতা
    পেলে তো ভালোই হতো; হয়তোবা আমারই ভিতরে ঘন মেঘ আছে,
    জায়গা আছে ঢের লুকানোর, কিন্তু আমিই জানি না;
    সারাক্ষণ চোখ মেলে থাকি, দেখি রণে, বনে, জলে, জঙ্গলে
    আমিই ব্যাপৃত শুধু, আমারই পাপের ভারে ঈশ্বরের কাঁধ ভেঙে গেছে;
    আমারই সকাল শুধু সকালের মতন লাগে না;
    হয়তোবা কিছুতে কিছুই হয় না, দরজা খোলে না
    অস্তিত্বের; কেবল ধোঁয়ার মতো ভেন্টিলেটরের ছিদ্র দিয়ে
    যেটুকু পালানো যায়, যেতে হবে স্রেফ সেটুকুই।
    আজ এই সমাসন্ন শীতের সকালে বসে তাই নির্নিমেষ
    চেয়ে আছি আগামসি লেনে; স্মৃতি নেই, প্রতিবাদ নেই,
    বলবার কোনো দীক্ষা কিংবা অভিলাষও নেই, শুধু
    ট্রিগারে আঙুল রেখে ব্যর্থ কল্পনায় ডুবে যেতে যেতে ভাবি,
    যা হোক, শিকল ভালো, অন্তত নিঃসংকোচে বসে থাকা যায়;
    সাঁতারের চেয়ে ভালো ঘটনাপ্রবাহে ভেসে যাওয়া।
     
     
    ৩।
    আজ বিচক্ষণ মনে হচ্ছে শুধু পাখিদের, যারা নাকি
    রক্তের নির্দেশে আগুপিছু না ভেবেই উড়ে যায়
    অচেনা হাওড়ে; যেতে যেতে, শত শত ডানার শীৎকারে
    পাল্টে দেয় দৃশ্যপট; যেখানে কেবল নেতি ছিলো, নির্ভাবনা ছিলো,
    সেখানেই কিছুটা ঝলক আনে সন্তানের, কিছু সম্ভাবনা
    হুট করে জেগে ওঠে, মাশরেফা; আজ আমি কেবল তাদেরই মধ্যে
    অসংখ্য নাটক ঘটে যেতে দেখি; মনে হয়, এই নীরবতা,
    দুরূহ মূকাভিনয় তাদের অস্তিত্বে নেই, স্মৃতি নেই, বন্দোবস্ত নেই
    আপোসের; শুধু ডানা আছে, ডানায় পাতাল আছে লুকোনোর মতো;
    আমিও তো লুকোতেই চাই; সরে যেতে চাই খল রঙ্গমঞ্চ থেকে
    পরাভূত শয়তানের বেশে; বিভিন্ন মণ্ডল থেকে উৎসারিত প্রৌঢ় নক্ষত্রেরা
    আমার কন্দরে নেমে খেলা করে, আমি খেলি, খেলনা ফেলে
    উঠে আসি কখনো-সখনো; ভাবি, ওই তো হাওড়ে জেগে আছে
    শত শত পাখি; রঙচঙে খেলনার থেকেও আনন্দিত, প্রিয়, তৎপর;
    আমি কি ওদেরই মতো একরত্তি অস্তিত্বের নাগপাশ ঠেলে উড়ে যাবো
    অন্য কোনো অস্তিত্বের নিগূঢ় প্রান্তরে, ধরো, তোমার প্রাণেরই কোনো
    হাওড়ে-বাওড়ে, মাশরেফা? এই বিস্রস্ত গোল্লাছুট, এই আমরণ বালকতা
    কখনো কি মুছে ফেলা যাবে না? আজকে শুধু পাখিদেরই মনে হচ্ছে
    রাজ্যত্যাগী, জ্ঞানী, নিঃসংশয়; ইচ্ছে হয় তাদেরই ডানায় শুয়ে মিলেমিশে যেতে
    অকাতরে, বিচূর্ণ দৃশ্যের মতো, জায়মান, অপারগ, পরিসীমাবিহীন আকাশে।
     
    ৪।
    ওই তো সৌন্দর্য জেগে আছে, বিলকুল জেগে আছে, মাশরেফা,
    যাও, নিয়মে-নৈরাজ্যে, যাও, পরিত্রাণ করো, যাও, ডাকো;
    ওই তো ধুলোর মধ্যে জায়মান কোনো এক অতিকায় ধুলো, এক ঝাঁক
    বিলম্বিত পাখি, হীন, ঘড়িহীন, ঋতুহীন, সৃষ্টিকর্তাহীন; ডাকছে, জাগছে,
    ফিরছে অজ্ঞানে, জ্ঞানে; মারো, এক ঢিলে, মারো
    তাবৎ স্মৃতিকে; এই বারোমাসি, আত্মভুক অস্থিরতা থেকে
    ওরা যদি মুক্তি দিতে পারে, দিক; ধুলো ঝেড়ে দিক বাস্তবের;
    তারপর একে লাফে আবার ধুলোয় যাক চলে; ওই ম্লান পাখি, ওই ফুল,
    ওই তো সৌন্দর্য, ওরা জেগে আছে, ঝুলে আছে, যাও, কাছে গিয়ে
    চুপচাপ লুফে নাও রীতিহীন, ধৃতিহীন ফুল, ক্ষীণ ফুল, জমকালো
    এক ঝাঁক পাখি, যেনো অকৃত্রিম তুমি, যেনো বিলকুল তুমি, মাশরেফা!

    ৫।
    মাশরেফা, এই ভয়াল বিষাদ
    আমার আত্মা লুটপাট ক'রে নাগিনী রাতের
    শত পাঁকে পাঁকে ছড়ায় সীসার মুদ্রার মতো!

    মাশরেফা, এই বিষাদ তীব্র,
    পাগলাটে শিশু, ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে আমাকে;
    রঙিন মোড়কের মতো আমি কি? লুকাই ভেতরে কিছু?

    মাশরেফা, এই বিষাদ ছদ্মবেশী
    জল্লাদ, আমার তুচ্ছ জেল্লায় তার এতো লোভ?
    আমি পৃথিবীর কোন যুবরাজ? আমি শুধুই ভৃত্য, শুধু অমাত্য!

    তারপরও এই বিষাদ আমার
    মগজের মাটি খুঁড়ে কী রত্ন খোঁজে? আমি নই
    দরদালানের খাদক, ঘাতক কুড়ালের নিচে আমাকে ফেলো না!

    মাশরেফা, এই বিষাদই আমার
    পরিসমাপ্তি। আজ রাত্রির প্রান্তরে রাজসেনানীর মতো
    অশ্বমুখর পদপাতে শেষ মৌনটুকুও শতচ্ছিন্ন কোরো না!

    ৬।
    আমরাও, ধীরে-সুস্থে, ব্যক্তিগত বিবাদে-বিভ্রমে
    বাসি হয়ে যাবো, মাশরেফা; ওলট-পালট করে যাবো
    যা কিছু সাজানো ছিলো, নির্ধারিত, রপ্ত হয়ে ছিলো,
    আমাদের জন্যে, তবু আমাদেরই অজ্ঞাতে, বিনা আড়ম্বরে;
    কিন্তু তাতে লজ্জা নেই; কেননা হৃদয়, রক্ত বিস্মৃতি-প্রবণ;
    তুমি, আমি, মুমূর্ষু দাবার ঘুটি- ফলাফল একই মলিনতা:
    একটা খবর কিন্তু চিরকাল অবিকল্প খবর থাকে না,
    একটা গুজব ঠিকই জাতাঁকলে পিষ্ট হয়ে সত্যি হয়ে যায়;
    আমরাও, বিনা তর্কে, রক্তের অনেক প্ররোচনা
    মাপজোখ করি, মেনে নিই; সমূহ নক্ষত্র প্রিয় কক্ষপথ থেকে
    সরে যায়, ছিটকে যায়, গল্প বলতে বলতে ঝরে পড়ে;
    আমরা সেই গল্পের প্রস্তুতি, সেই ফুলের প্রস্তুতি, মাশরেফা,
    আছেন দানব এক জায়মান, দূরবর্তী, আত্মহত্যাহীন,
    নিঃসন্তান; আমরা দু’জনে তার আগ্রহে বিলীন হয়ে যাবো!
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন।