"নেড়িবাদীদের আজকাল সবেতে লাফানো চাই!" ; "এইসব মাল লাইফে জুটলে কপালে প্রচুর দুঃখ আছে ", "নেড়িদের স্বাধীনতা" ইত্যাদি একেবারে যাকে বলা হয় শিশু-প্রজাতির মন্তব্য। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া নামক বস্তুটির পাব্লিক কমেন্ট সেকশনকে যদি 'পাব্লিক টয়লেট'-এর সঙ্গে তুলনা করি, তবে খুব ভুল হবে না। উভয়েই সম্পূর্ণ বীভৎসতায় পরিপূর্ণ, দূষিত ও মানুষ সেখানে আসে মানসিক বর্জ্যপদার্থ ত্যাগ করতে। কিছুদিন আগেই মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব সংক্রান্ত একটি আলোচনায় পড়লাম, কেবল রুচির মহামারী নয় বরং সামাজিক নেটমাধ্যমে বিকৃত কুৎসা, কদর্য ভাষার প্রয়োগ ইত্যাদি একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ধরুন, সকালের কলকাতার হাড়ভাঙা যানজট পেরিয়ে আপনি অফিসে পৌঁছতেই এক সহকর্মী কাঁচুমাচু মুখে বললো, "পাঁচুদা, তোমাকে বস ডেকেছেন একবার।" দাঁত খিঁচিয়ে বললেন, "রাখো তো! হাড় জ্বালিয়ে খেলো! এতো আবার বস নয়, নারী দ্যি বস ! স্লিভলেস পরে আর ফরাসি পারফিউম ঢেলে এসি ঘরে বসে ওরকম বাকতাল্লা মারা যায়! মেয়েমানুষের আর কতো বুদ্ধি হবে? " সহকর্মীর এদিক-ওদিক তাকিয়ে 'অ্যাই! চুপ চুপ' ইঙ্গিতে পাত্তা না দিয়ে দুরন্ত আবেগে উড়ন্ত বেলুন হয়ে আপনি বসের পার্সোনাল কেবিনে পৌঁছলেন। অতি-আধুনিকা যে মেয়েমানুষটিকে মনে মনে ঝেড়ে গালাগাল করতে করতে আসছিলেন, গন্তব্যে পৌঁছে সেসব মন্তব্যের হাওয়া গমনায় চঃ ! তিনি চশমার কোণ দিয়ে তাকিয়ে কাজ শেষ না হওয়া ফাইলটা এগিয়ে দিতে না দিতেই পকেটে অরিজিৎ সিং গেয়ে উঠলেন "রং দে তু মোহে গেরুয়া...."(অন্য রিংটোনও হতে পারে, তবে চৌঠা মে'র পর থেকে ঐটেই চলছে কিনা) বসের চশমার কোণ কাটিয়ে দেখলেন আপনার পঁচিশবছরের পুরোনো কনে ফোন করেছেন! --- "এই আজকে গুবলুর বেষ্টফ্রেন্ড সোহাদের বাড়ি ওর ভাইয়ের বার্থডে পার্টি ! আসার সময়ে গিফ্ট প্যাক করে আনতে বলেছিলাম মনে আছে তো? আর স্লাইস পাঁউরুটিটাও এনে রাখবে, কাল তোমাদেরই বেরোতে হবে।"
-- "যখন তখন ফোন করবে না তো **** " বলে কটাস করে ফোনটা কেটে দিলেন। পাব্লিক ট্রান্সপোর্টের অবস্থা যারা জানেন, তারা জানেন এরপর কোনো পাব্লিক পোষ্টে 'নেড়িবাদী' লিখে গালাগাল দিলে বুকটা কেমন হালকা হালকা লাগে।
তো এটা গেলো মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। আসন্ন গেরুয়া ঝড়ে অতি পরিচিত যে শব্দ-বন্ধ ঢেউ তুলেছে তা হলো 'হিন্দুত্ববাদী নারীবাদ'। অর্থাৎ, পাশ্চাত্য -কেন্দ্রিক প্রবণতাকে অনুসরণ করতে গিয়ে আমরা নাকি আদপেই ভুলে বসে আছি আমাদের শিকড়ের নারীবাদের কথা। এই শিকড়ের নারীফাদ কী? যদি উদ্গাতাগণ বলতেন, চন্দ্রাবতী রামায়ণের কথা, হটী বিদ্যালঙ্কার বা দ্রবময়ীর প্রসঙ্গ, তাহলে তবু একটা আন্দাজ পাওয়া যেতো যে এনারা ঠিক কী বলতে চাইছেন। এখন রূপকার্থ যা দাঁড়িয়েছে, তার বাংলাভাষায় অনুবাদ করলে হয়, "অ্যাতো সাহেব-মেমদের মতো স্বাধীনতা কিয়ের র্যা? আমাদের কালে মেয়েরা ঘরের কাজও করতো আবার কেউ মানে আঘাত করতে এলে খ্যাংরা নিয়ে ভাগাতো না?"
অন্তত প্রসঙ্গ সেটাই। নাহলে তথাকথিত 'হিন্দুত্ববাদী নারীবাদের প্রবক্তা' দের বক্তব্যে পাওয়া যায় না হটী বিদ্যালঙ্কারের কাশীতে পাঠশালা খুলে ছাত্র পড়ানোর সংগ্রামের কথা। তৎকালীন ইংরেজ সংযোগ ও কাশী অধিপতির মিলিত চক্রান্ত এই মহীয়সী নারীকে কীভাবে অসম্মান করেছিলো তার হদিশ এনারা রাখেন কিনা আমি তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয়বাদী। চন্দ্রাবতী রামায়ণ যদি সীতাদেবীর দৃষ্টিভঙ্গী থেকে মহাকাব্যিক বিচার হয় তাহলে তা আলোচনায় আসে না কেন? মহাকাব্যের নারীদের কেবল পাতিব্রাত্যের মূর্ত রূপ না সাজিয়ে নবনীতা দেবসেনের যুগোপযোগী সমালোচনাগুলি 'সেকু-মাকু'র দলে পড়ে গেলে কী করে হবে? প্রথাগত অর্থে, যেকোনো মতবাদ বা 'ism' নির্ভর করে একগুচ্ছ সময়োপযোগী ধারণার উপর যা তাত্ত্বিকদের সময়কাল অনুযায়ী পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত (revised) হয়। আর যেকোনো তত্ত্বের দুটি দিক থাকে যা একদিকে কোনো সত্য উপস্থাপন করে ( proposition ) এবং অন্যদিকে কোনো প্রথাগত ধারণাকে নাকচ করে (opposition). নারীবাদের ক্ষেত্রে এই পজিটিভ উপাত্ত খুব কম কথায় দুটো -
1. সামাজিক, জৈবিক ও আর্থ-সামাজিক তথা রাজনীতিগত কারণে নারীরা পুরুষের তুলনায় অসুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে ও তারা শোষিত
2. উভয় লিঙ্গের সমানাধিকার স্থাপন করার মাধ্যমে এই বৈষম্যকে সম্পূর্ণ দূরীভূত করতে হবে।
যে বিষয়টির আলোচনা নারীবাদে মুখ্য বা কেন্দ্রীয় প্রতিবন্ধকরূপে চিহ্নিত হয়, তা হলো পুরুষতন্ত্র। এখানে আগেই বুঝে নেওয়া দরকার পুরুষতন্ত্রকে কেবল পুরুষেই টিকিয়ে রাখে না বরং এটি একটি সোশ্যাল কনষ্ট্রাক্ট যা ধরে রাখতে নারী-পুরুষ উভয়েই সমানভাবে দায়ী (*আগ্রহী পাঠকমাত্রেই কমলা ভাসিনের 'patriarchy' পড়ে দেখতে পারেন)। এবার সর্বজনের সুবিধার্থে নারীবাদের প্রথম সফল সম্মেলন হিসাবে 1848 খ্রিষ্টাব্দের সেনেকা ফলস্ পরিগণিত হয়। কারণ ভোটাধিকার আন্দোলন বা ইউনিভার্সাল অ্যাডাল্ট সাফ্রেজের ধারণা যে কোনো লিঙ্গগত কারণে মানুষকে বাদ দিয়ে হতে পারে না, তা ইউরোপীয় লিবেরালিজমের প্রথম যুগের প্রবক্তারা যেমন বুঝেছিলেন, তেমন সেখানকার নারীরাও বুঝেছিলেন ভোটাধিকার না পেলে রাষ্ট্র তার কথা শুনবে না। তাই ছয় সন্তানের মা সুসান বি অ্যান্থনি স্বহস্তে ও স্ব-খরচে নারীদের মধ্যে বিলি করেছিলেন এলিজাবেথ ক্যাডি ষ্ট্যান্টনের লিখে দেওয়া নারীবাদী প্যামফ্লেট। ষ্ট্যান্টনের কথায়, "আমি বজ্র তৈরী করেছি, বজ্র নিক্ষেপের দায়িত্ব সুসম্পন্ন করেছিলেন সুসান বি অ্যান্থনি।" এক্ষণে লিবেরালিজমের প্রাথমিক তরঙ্গ বা ভিয়েতনাম যুদ্ধ ও এশিয়া - আফ্রিকার দেশগুলির নব-স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় তরঙ্গকে কি তাহলে 'খ্রিষ্টান নারীবাদ' বলে অস্বীকার করতে হবে? প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মই যে নারী বা পুরুষ উভয়ের মুক্তির অন্তরায়, তা নিয়ে আর বাক্য খরচ করলাম না। ডেভিডের উপাখ্যান, ক্লাইমোনেস্ত্রা বা ধর্ষণে ধর্ষণে উন্মাদ হয়ে যাওয়া কাসান্দ্রা, দেবরাজ জিউসের হাতে ধর্ষিতা লিট্টো আবার হেরা দেবীর অভিশাপ পাবেন যে সন্তান জন্ম দেবার জন্য একটুকরো ভূমি পাবে না, আত্রেউসপুত্র আগামেমনন অ্যাপোলোর পুরোহিতকে বলবেন, "ক্রাইসেইসকে ফিরে পাবার আশা রেখো না। তাকে দিনে সুঁচের কাজ করে ও রাতে আমার শয্যাসঙ্গিনী হিসাবেই জীবন কাটাতে হবে।" চটেমটে গিয়ে আকিলিসের বন্দিনী ব্রিসেইসকে নিজের কাছে টেনে আনবেন এই আখেনিয়ান বীর, স্বামীহীনা পেনিলোপকে ঘিরে লুব্ধ শ্বাপদরা ঘুরে ফিরে বেড়াবে -- এসব তো আছেই। আর সবিশেষভাবে যদি ইউরোপীয় রেঁনেসার দিক থেকেও ধরি, তবে জন ষ্টুয়ার্ট মিলের আগে মুক্তচিন্তকরা নারী স্বাধীনতা নিয়ে মাথা ঘামাননি। অন্তত 'On the Subjugation of Women' রচনা বা পার্লামেন্টে তর্কে অবতীর্ণ হওয়ার ঝুঁকি কেউ নেননি। এ হতে পারে জুনিয়র মিলের মতাদর্শের সঙ্গে ইভানজেলিকালদের মূলগত ফারাক বা ওনার ব্যক্তিজীবনের সগভীর চিন্তায় হ্যারিয়ট টেলরের প্রভাব। যাক, ফিরে আসি হিন্দুত্বের কথায়। বলিউডি ছবি 'পদুমাবৎ' এর উদাহরণ দিয়ে বলে থাকেন অনেকে, "রাজপুত কঙ্গনেও ততোটাই শক্তি থাকে যা আছে রাজপুত তরবারিতে।" এখান থেকে সূক্ষ্মতরভাবে যে ধর্মীয় ঘৃণার বিষটা নারীশক্তির মোড়কে চালিয় দেওয়া হলো, তা নেহাৎ সদ্ভক্ত ছাড়া সকলেই বোধগম্য হবে। আমি বলছি না, রাজপুত বা অন্য নারীদের সম্ভ্রম লুন্ঠন হয়নি। মধ্যযুগের নিয়ম ছিলো যুদ্ধে যে পক্ষ হারবে, তাদের ধন-প্রাণ-সম্ভ্রম সবই যাবে। কিন্তু সেটা যে কোনো যুদ্ধের ক্ষেত্রে, যে কোনো প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য। কেন স্পেসিফিক্যালি মোগল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধেই লাম্পট্যের তির? যদি তাই হবে, তাহলে পাঠান সুলতান ইব্রাহিম লোদী তো ছিলেন বাবরের স্বধর্মেরই লোক? পানিপথের প্রথম যুদ্ধে হারের পর লোকশ্রুতি আছে, বাবরের সামনে ইব্রাহিমের বৃদ্ধা মাতা কেঁদে এসে বলেছিলেন, "আমি হতভাগ্য ইব্রাহিম লোদীর অভাগিনী মা! এই হীরেটি নিয়ে তুমি হারেমের নারীদের দয়া করে ছেড়ে দাও।" সেই হীরকটিই যে বহু বিতর্কিত কোহিনূর তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেখানে তাহলে দুয়ে দুয়ে চারের ফর্মূলা সুপ্রযুক্ত হলো না কেন? যেমন হিসেব মেলে না শোভা সিংহ ও বর্ধমান রাজকন্যা সত্যবতীর ক্ষেত্রে। একদা হিন্দুজন-বিক্ষোভের রাজনেতৃত্ব শোভা সিংহ শ্বাপদের লোলুপতা নিয়ে এগিয়েছিলেন হিন্দু বর্ধমানরাজেরই কন্যার দিকে। বাকি ইতিহাসটা আমাদের সবার জানা। যেখানে পুরুষ ও নারী উভয়ের মনের গভীরেই আজও অতল অন্ধকারের বাস্তুভিটে, সেখানে আলোর শিখা না জ্বেলে আরো কালি ঢালা কেন? ইউরোপীয় সেগমেন্টেশনের ধারণা আর বিদ্বেষের বীজ বপনে এই হাঁসজারু ধারণা সহায়ক হতে পারে ; নারীমুক্তিতে আদৌ নয়।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।