এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • কালবেলার  রৌদ্রছায়া - ১১

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৬ মার্চ ২০২৬ | ১২৭ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮ | ১৯ | ২০
    ( ১১ )

    প্রশান্ত দাসের সময়টা ভাল যাচ্ছে না। পার্টিতে এখন প্রচুর কম্পিটিশান। ব্লকে এখন বিমল মাইতি রাজ চলছে, যদিও তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট। তের চোদ্দজন মেম্বারকে হাত করে দলের মধ্যেই একটা গ্রুপকে টেনে নিয়ে ব্লক প্রেসিডেন্ট কানাইলাল পাত্রকে একেবারে কোনঠাসা করে ফেলেছে। তার যে কোন প্রস্তাব, তা সে ভালই হোক আর খারাপই হোক এরা ঠিক কোন একটা গন্ডগোল পাকিয়ে ভেস্তে দিচ্ছে।

    প্রশান্ত দাস হল কানাইলালের গ্রুপের লোক। কানাইবাবুর ওপর তার সত্যিই একটা টান ছিল। তার অনেক উপকার করেছে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে হাওয়া অন্যরকম। দিক বদল না করলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। তাকে তো এই করেই খেতে হবে। তার তো আর কোন লাইন জানা নেই। আর এ লাইনে এ অঞ্চলে বিমল মাইতি এখন সর্বেসর্বা। বখরার ভাগ ঠিকমতো না পেলে আর এ লাইনে থেকে লাভ কী ?

    প্রশান্ত দাসের সঙ্গে রাস্তায় প্রিয়াঙ্কা আর নিরুপম বারিকের দেখা হয়ে গেল।
    নিরুপমের বুক ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। পার্টি অফিসে ডেকেছিল। গেল না সে বউয়ের কথা শুনে। ঘুমিয়ে পড়েছিল তাতে কী, ডেকে দিতে পারত তো। কোন আক্কেল নেই প্রিয়াঙ্কার।
    প্রিয়াঙ্কাকে দেখে একগাল হেসে দাঁড়িয়ে গেল প্রশান্ত দাশ। প্রিয়াঙ্কাও দাঁড়িয়ে গেল হাসিমুখে।
    টেনে টেনে বলল, ' কী খ...বর ? '
    --- ' এ...ই আর কী... ভাল মন্দ মিলিয়ে... বৌদি আপনি কেমন আছেন ? '
    --- ' আছি একরকম... কিন্তু পার্টি অফিস থেকে আজকাল যাকে তাকে ডাক পাঠানো হচ্ছে... কী ব্যাপার ? '
    প্রশান্ত দাশের মুখ গম্ভীর হয়ে যায়। বলে, ' কীরকম কীরকম ? কে কে ? '
    --- ' ওই তো, কালো মতো বেঁটে মতো... শ্যামল পাল বোধহয় ওর নাম... '
    --- ' ও... বুঝেছি। কী বলছিল ? '
    --- ' আমার কর্ত্তাকে নাকি পার্টি অফিসে দেখা করতে হবে। এসব কী... '
    --- ' আমি তো শুনিনি কিছু। কী যে সব হচ্ছে না... আচ্ছা আমি বিমলদার সঙ্গে কথা বলছি... ওসব কিছু না... দেখে নিচ্ছি... '
    --- ' আসুন না একদিন বাড়িতে। আগে তো আসতেন বাবা... '
    প্রশান্তবাবু বিগলিত ভঙ্গীতে বললেন, ' যাব যাব...
    আসলে সময় পাইনা একদম। এত কাজ থাকে... '
    প্রিয়াঙ্কা মনে মনে ভাবল, ' কাজ তো তোলা তোলা। তার আবার কত ভড়ং। গোরুর গাড়ির আবার হেডলাইট ... '
    মুখে বলল, ' তাই তো... আপনারা দিনরাত আমাদের জন্য কত খাটেন... সত্যি... '
    --- ' কী আর বলব... দায়িত্ব তো ঝেড়ে ফেলতে পারি না... '
    প্রিয়াঙ্কা আবার স্বগতোক্তি করল, ' শুয়ো..র ...চ্চা '
    মুখে বলল, ' আচ্ছা এখন চলি... আমাদেরও তো
    কিছু কাজ থাকে। আপনাদের মতো বড় বড় কাজ না। আমরা ছোটখাটো মানুষ। আমাদের ছোটখাটো কাজ... '
    প্রশান্ত দাশ আবার বিগলিত ভঙ্গীতে বললেন, ' কী যে বলেন বৌদি... '
    --- ' আচ্ছা যাই এখন... '
    প্রিয়াঙ্কা হতচকিত নিরুপমকে ' চল চল ... ' বলে
    টান মেরে এগিয়ে নিয়ে গেল।
    যেতে যেতে বলল, ' আলুবাজ মেড়াগুলো সব নেতা হয়েছে... হুঁঃ, আবার বলে, এত ব্যস্ত যে সময় পায় না ... '
    নিরুপম কী বলবে ঠিক ভেবে পেল না।

    দ্রৌপদি দূর থেকে দেখতে পেল বিজয় ভ্যান রিক্শা থেকে নামল। তার সঙ্গে আর একজনও নামল। বেশ গাট্টাগোট্টা চেহারা। দেখেনি কোনদিন। সে দাঁড়িয়ে ছিল খড়গপুর লাইনের বাসস্ট্যান্ডের সামনে। কাছে আসতে বলল, ' কিগো... জঙ্গলে গিয়েছিলে ? '
    --- ' হুঁ। তুই এখানে দাঁড়িয়ে ? '
    --- ' বাজারে গিয়েছিলাম, এই যে... ঘরে কিছু নেই... ', হাতের থলেটা ফাঁক করে দেখাল। দেবাশিস দেখতে পেল থলেতে আলু, কুমড়ো আর ঝিঙে রয়েছে। একটা বেগুনও রয়েছে মনে হল।
    বিজয় বলল, ' বাড়ি যাবি তো ? '
    --- ' হ্যাঁ ... '
    --- ' চল আমার সঙ্গে... এ হল দেবাশিস। আমাদের নতুন বন্ধু... '
    দ্রৌপদি বুদ্ধিমতী মেয়ে। এর বেশি কিছু জানতে চাইল না। মুখে হাসি ফুটিয়ে দুহাত জড়ো করে নমস্কার করল যা আজ পর্যন্ত কেউ করেনি দেবাশিসকে। সে যে কারও কাছ থেকে এহেন সৌজন্য পাবার যোগ্য সেটা তার জানা ছিল না।
    সে কী বলবে ভেবে না পেয়ে প্রতি নমস্কার করল একবার মাথা ঝুঁকিয়ে।

    সুভাষ গিরি বাইরের দাওয়ায় বসেছিলেন। দ্রৌপদি 'আমি যাচ্ছি... পরে আসব... রান্না আছে... ', বলে চলে গেল।
    বিজয় বলল, ' বাবা... এ হল দেবাশিস, চৌত্রিশ নম্বরে থাকে... '
    --- ' বস বাবা... নারকেল মুড়ি খাবে ? '
    --- ' না না ... স্যার... কিছু খাব না এখন... '
    সুভাষবাবু দেবাশিসের সঙ্গে অনেক কথা বললেন। চাষবাসের কথা থেকে আরম্ভ করে হলদিয়ার মেলা, কাঁথিতে কয়েক মাস আগে হয়ে যাওয়া যাত্রা উৎসব, ভেড়িতে 'চিংড়া' চাষের নানাবিধ প্রথা প্রকরণ, নন্দীগ্রামে বসনা মাঠে জমজমাট ফুটবল টুর্নামেন্ট, রামনগরে দেশি কাজুর ফলনের ভবিষ্যৎ এরকম নানা কথা বলতে লাগলেন। দেবাশিসের মতামতও মন দিয়ে শুনলেন। কিন্তু পার্টি পলিটিক্সের কথা একটাও বললেন না। রাজনৈতিক কথার ধার কাছ দিয়ে গেলেন না।
    প্রায় মিনিট চল্লিশ ধরে বকবকানি শোনার পর দেবাশিস একটু উসখুস করতে লাগল। বিজয় সেটা আন্দাজ করে বলল, ' ঠিক আছে... এখন চল তা'লে... ওদিকে ভাতের হোটেল আছে। চল আমিও খাব তোমার সঙ্গে... '
    দেবাশিস দাঁড়িয়ে উঠল। বলল, ' আজ আসি স্যার... পরে আসব আবার একদিন... '
    --- ' নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই ... যেদিন খুশি, যখন খুশি। এমনকি মাঝরাতেও... আই অ্যাম অলওয়েজ অ্যাভেলবল। আর একটা কথা, আমাকে স্যার ট্যার বোল না। ওতে আমি অভ্যস্ত নই। বয়সে বাবার বয়সী হলেও আমাকে দাদা বলতে পার। সবাই তাই বলে... '
    দেবাশিস একটু চুপ করে রইল। কিছু একটা বলতে গিয়েও দোনামোনা করতে লাগল। তার মনে একটা পাথরের করকরানি তো আছেই অষ্টপ্রহর। অন্তত বাচ্চার দুধের ব্যবস্থাটা তো করা দরকার। তাদের স্বামী স্ত্রীর খাওয়া জুটুক না জুটুক।
    বলে ফেলল, ' খুব কষ্টে আছি, বুঝলেন দাদা ... '
    কথা শেষ হবার আগেই সুভাষ গিরি বললেন, ' জানি। কষ্টে থাকা লোক আমি দেখলেই বুঝতে পারি। মানুষের কষ্ট চোখেই লেখা থাকে। একটা কথাই বলব... নিজেকে কখনও বিক্রি কোর না, কোন অবস্থাতেই না... '
    --- ' হুঁ... বুঝেছি... কিন্তু দাদা একটা রোজগার না হলে তো... খুব খারাপ অবস্থা... কী বলব... '
    সুভাষবাবু আবার বললেন, ' হুঁ... বুঝেছি। কিছু বলতে হবে না। যতদিন না কিছু হচ্ছে... '
    এরপর বিজয়কে দেখিয়ে বললেন, '... ততদিন এরা দেখবে... '

    দেবাশিসকে নিয়ে দ্রৌপদির বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল পঞ্চানন পাড়ুইয়ের ভাতের হোটেলের দিকে। দ্রৌপদি বোধহয় দেখতে পেল ওদের। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল।
    দেবাশিসের দিকে তাকিয়ে বর্ষার পবিত্র জুঁই ফুলের মতো একরাশ হাসি ঝরিয়ে বলল, ' দাদা, আসবেন একদিন আমাদের বাড়িতে ... '
    দেবাশিস ভাবল, এরপর আর নিজেকে বিক্রি করার কোন রাস্তা খোলা রইল না তার কাছে।
    সে দাঁড়িয়ে গেল। নীরবে দ্রৌপদির দিকে ঘুরে দুহাত জড়ো করে নমস্কার করল অকৃত্রিম নিষ্ঠায়।

    ( ক্রমশ )

    *************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮ | ১৯ | ২০
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে প্রতিক্রিয়া দিন