এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  পথ ও রেখা

  • পায়ের তলায় সর্ষে ঃ কাশ্মীর

    Shuchismita Sarkar লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | পথ ও রেখা | ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ৫৫ বার পঠিত
  • ভেরিনাগ | আখুন্দ শাহ
    আখুন্দ শাহ

    আলতাফ ভাই অটোওয়ালাকে বলে রেখেছিলাম একদিন আমাদের শ্রীনগরের মসজিদগুলো ঘুরিয়ে দেখাতে হবে। ভদ্রলোক তো খুব রাজি। কিন্তু আমরা যা যা দেখতে চাই সেগুলোর সবকটা তাঁর সিলেবাসে পড়ছে না।
    "গর ফিরদৌস বর রুয়ে জমিন অস্ত
    হামিন অস্ত, হামিন অস্ত, হামিন অস্ত"
    (পৃথিবীতে স্বর্গ যদি কোথাও থাকে, তা এখানেই, এখানেই, এখানেই)
    মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর কাশ্মীরে এসে এই লাইন ক'টি উচ্চারণ করেছিলেন জানা যায়। নাতি দারা শিকোও কাশ্মীরের প্রেমে মজেছিলেন। একথা আমরা অনেকেই জানি দারা শিকোর সুফি ইসলামের প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল। কাশ্মীর বহুদিন ধরেই সুফি সাধনার পীঠস্থান। মিয়াঁ মীর নামে এক সুফি সাধক কাশ্মীরে থাকতেন। দারা শিকোর ইচ্ছে হল তাঁর সাথে দেখা করার। কিন্তু দারা কাশ্মীরে আসার আগেই মিয়াঁ মীরের দেহান্ত হল। মিয়াঁর এক শিষ্য তাঁর উত্তরসুরী হলেন। নাম মোল্লা শাহ বদকশী। আখুন্দ শাহ নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। দারা কাশ্মীরে এসে তাঁর কাছে নাড়া বাঁধলেন। ডাল লেকের পশ্চিম তীরে হরি পর্বতের পাদদেশে একটি মসজিদ তৈরী হল আখুন্দ শাহের নামে। এই মসজিদটি যে এখন পরিত্যক্ত তা আমাদের জানা ছিল। কিন্তু এটাও শুনেছিলাম আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া মসজিদের সংস্কার শুরু করেছে। আমাদের আশা ছিল একবার শ্রীনগরে গিয়ে পড়লে নিশ্চয়ই মসজিদটার খোঁজ পাওয়া যাবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল লাল চকের হোটেল ম্যানেজার বা অটোচালক আলতাফ ভাই এই মসজিদের নাম শোনে নি। আলতাফ ভাইই তখন বুদ্ধি দিলেন - আপনারা তো আরও মসজিদ ঘুরবেন। সেসব মসজিদের বুর্জুগরা নিশ্চয়ই এই মসজিদের খোঁজ দিতে পারবেন। কথাটা মনে ধরল। লিস্টের অন্য নামগুলো মেলে ধরলাম আলতাফ ভাইয়ের সামনে।

    পুরনো শ্রীনগরের মসজিদগুলোর অনেকগুলোই কাঠের তৈরী। পাহাড়ী জায়গায় এমন হওয়াই স্বাভাবিক। মসজিদগুলোর আকার প্যাগোডার মত। উত্তর-্পশ্চিম ভারতে বৌদ্ধপ্রভাবের জন্য এমনটা হতে পারে। আমার যদিও পড়াশোনা করা হয়নি এ নিয়ে। এমনই একটা মসজিদ খাজা বাজার নকশাবন্দ (বা নকশাবন্দ সাহিব)। প্রায় ছশো বছরের পুরোনো মসজিদ। নবী মহম্মদের চুল নাকি প্রথমে এখানেই আনা হয়। কিন্তু বাজারের মধ্যে ছোট মসজিদে দর্শনার্থীদের ভীড় সামাল দেওয়া যাচ্ছিল না। তখন ডাল লেকের ধারে ফাঁকা জায়্গায় হজরতবাল মসজিদ তৈরী করে নবীর দেহাংশ সেখানে স্থানান্তরিত করা হয়। হজরতবাল এখন শ্রীনগরের সবচেয়ে বিখ্যাত মসজিদ। ট্যুরিস্টদের ভীড় মূলত সেখানেই হয়। নকশাবন্দ মসজিদের ভিতরে অপূর্ব পেপার ম্যাশের কাজ আছে। আরেকজন সুফি সাধক শাহ হামদিন ১৩৯৫ সালে পারস্য থেকে কাশ্মীরে আসেন। পেপার ম্যাশে শিল্পটি তাঁর সাথেই ভারতে আসে বলে অনুমান করা হয়। শ্রীনগরে শাহ-এ-হামদিন মসজিদ পেপার ম্যাশের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। তবে নকশাবন্দ সাহিবও কম যায় না। আমার অবশ্য দেখার সৌভাগ্য হল না। মসজিদের ভেতর মেয়েরা ঢুকতে পারবে না। মিঠুনকে ওরা যত্ন করে দেখিয়ে দিলেন। তখনই আলাপ হল পীর সাহেবের সাথে। আখুন্দ শাহ বলতেই তিনি বুঝে গেলেন। অটোওয়ালা আলতাফ ভাইকে বলে দিলেন কিভাবে যেতে হবে। নিজের ফোন নাম্বারও দিয়ে দিলেন আমাদের দরকার হলে ব্যবহার করার জন্য।
    আলতাফ ভাই ভারী খুশি হয়ে বললেন - মাখদুম সাহিব যাবেন আগে বললেই হত! ওখানে আমারও একটা কাজ আছে। সেরে নেব। খানিক ভেবে বুঝতে পারলাম আখুন্দ সাহিবের মসজিদটা মাখদুম সাহিবের লাগোয়া। মাখদুম সাহিব শ্রীনগরের খুবই জাগ্রত মসজিদ। এটাও একজন সুফি সাধকের নামে। স্থানীয় লোকজন তাদের হাজারো সমস্যায় এই মসজিদে এসে প্রতিকার খোঁজে। আলতাফ ভাইয়ের দরকারটাও সেই গোত্রের মনে হয়। আমরা আর মাখদুম সাহিবে ঢুকলাম না। পাশ দিয়েই সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে যেখানে ASI একটা ভাঙা মসজিদ মেরামত করছে। ছেলেপিলেরা হাওয়া খেতে সেখানে যায় বটে। ভক্তরা ওঠে না।
    আমরা উঠে দেখলাম চিনার গাছের তলায় ফ্যাকাশে হলুদ পাথরের মসজিদ। খুব বেশি বড় না। মাঝারি একহারা বাড়ি। ভাঙা থামের কিছু টুকরো পড়ে আছে সামনের চত্ত্বরে। তবে পরিত্যক্ত হলেও বেশ পরিস্কার। দুটি ছোট ছেলে পাঁচিলে বসে নিচের শ্রীনগর শহর দেখছিল। আমাদের দেখে ঘুরে তাকালো। আমরা ওদের হাত নেড়ে মসজিদের সিঁড়িতে বসলাম কিছুক্ষণ। দরজা বন্ধ। ভেতরে যাওয়ার উপায় নেই। দরজার ফুটোয় চোখ রেখে ভিতরে কি আছে দেখে এলাম। ভারী শান্তির পরিবেশ। মিঠুন বলল, চল পিছনে কি আছে দেখে আসি। ভাঙা পাথরের টুকরো পেরিয়ে পিছনে যাওয়া হল। এদিকটা একেবারেই পরিচর্যাহীন। গোটা তিনেক ছেলে গুলতানি মারছিল। আমরা ছবি-টবি তুলে আবার সামনের দিকে ফিরে এলাম।
    ততক্ষণে আরও দুটো ছেলে হাজির হয়েছে চিনার গাছের নীচে। ওদের সাথে একটু গল্প করে ফিরে আসছি, এমন সময় এক মাঝবয়েসী ভদ্রলোককে দেখা গেল এদিকেই আসছেন। আমরা কোথা থেকে আসছি জানতে চাইলেন। বললাম এই মসজিদের কথা পড়েছি, খুব ভালো লেগেছে এখানে এসে।
    মিঠুন বলল - মসজিদের ভিতরে বোধহয় ঢোকা যায় না, তাই না?
    উনি বললেন - না, মসজিদ তো বন্ধ আছে।
    তারপর কি ভেবে জিগ্যেস করলেন - আপনারা ভিতরে যেতে চান?
    - যেতে পারলে তো খুবই ভালো হয়।
    - আচ্ছা, একটু দাঁড়ান, আমি চাবি নিয়ে আসছি।
    আমরা তো ভাবিইনি ভিতরে ঢুকতে পাবো। ছেলেদুটোও আমাদের সাথে চলল। খুবই সাদামাটা বাহুল্যবর্জিত মসজিদ। ভদ্রলোক বললেন, ভিতরের দেওয়ালে দামী পাথর বসানো ছিল। সে সত্যিও হতে পারে, মিথ্যেও হতে পারে। প্রশস্ত উঠোনটা থেকে আকাশ দেখতে ভারী ভালো লাগল। উঠোনের তিনদিকে কয়েকটি ঘর। অন্ধকার বটে, তবে ঝাঁটপাট দেওয়া। মূল দরজার মাথায় উর্দুতে কিছু লেখা। আমরা পড়তে পারি নি। আওরঙ্গজেব দারাকে হত্যা করলেও আখুন্দ শাহের গায়ে হাত দেন নি। তিনি শ্রীনগর থেকে লাহোর চলে যান এবং সেখানেই মারা যান।
    দারা শিকোকে কি ভারতের শেষ স্বপ্নালু যুবরাজ বলা যায়? শাসক হিসেবে দারা কতখানি দক্ষতা দেখাতে পারতেন জানি না, তবে তাঁর বিদ্যোৎসাহিতা, সৌন্দর্যবোধ, মুক্তচিন্তার যে বিবরণ পাই তাতে মুগ্ধ হতে হয়। এই পোস্টটি লেখার সময় খুঁজে পেলাম আখুন্দ শাহ দারা শিকোর সাথে প্রথম দেখা হওয়ার পর বলেছিলেন
    "নাই চিরাগিস্ত দারিন খানা-ই ভিরনা-ই মা
    রোশন আজ আতিশ-ই ইশক-ই তু-শুদাহ খানা-ই মা"
    (আমাদের এই বিজন ঘরে বাতি নেই
    তোমার প্রেমের আগুনে এই ঘর ভাস্বর)
    রাজপরিবারে এসব ভাবের কথা কি মানায়? চিনার পাতা চুঁইয়ে পড়া ঐশ্বরিক রোদের নিচে হলুদ পাথরের বেদীই তাঁর উপযুক্ত স্থান।
     

    আখুন্দ শাহ
     

    আখুন্দ শাহ
     

     

    নকশাবন্দ সাহিব
     

    শাহ-এ-হামদিন
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    ভেরিনাগ | আখুন্দ শাহ
  • ভ্রমণ | ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ৫৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে প্রতিক্রিয়া দিন