

অলংকরণ: রমিত
টুংটাং…টুংটাং…টূংটাং…
দুপুর ঘুমে ফাঁকি। আলগোছে শব্দ বাঁচিয়ে বারান্দায় পা রাখা। এরপর একটু দম নেওয়া। তারপর একছুট। ফটক খুলে সোজা রাস্তায়। পেছন ফিরে তাকানো মানেই মায়ের শাসানি চোখ। সে চোখ ফাঁকি দিতেই কোলাহলে মিশে যাওয়া।
সেসব দিনে রোজা পড়তো চৈত্রের কড়কড়ে দিনে। দিনের নিয়মেও যথারীতি ব্যত্যয়। তবে আমার দিন শুরুর আহবান আসতো কিন্তু সেই ভোরের আজানের পরপরই। কারণ স্কুল খোলা থাকুক কিংবা বন্ধ বিছানা ছাড়তে হবে সেই একই সময়ে। এরপর লবণ জলের গার্গল। হারমনিয়ামে সুরে বেসুরে টান। তারপর ফুলের সাজি হাতে সোজা যমুনার পাড়।
কিন্তু তারপর?
তারপর লম্বা সকাল। তাড়াহুড়োহীন প্রলম্বিত সকাল। রুলটানা খাতা, আমার বই, প্রাথমিক গণিত সব শেষ হলেও সকাল ফুরায় কই? তবে চিরকালের অনুসন্ধিৎসু আমি ঠিক খুঁজেপেতে কিছু বের করেই নিতাম।
তখন সন্ধ্যা হলেই উঠোনের তুলসী গাছতলায় প্রদীপ পড়তেই নিভে যেতো একশো পাওয়ারের ফিলিপস বাতিগুলো। লোডশেডিং নাম তখনও অজানা। মফস্বলি উচ্চারণ,
যাহ্…কারেন্ট চলে গেলো…
তবে সে আঁধারে অভ্যস্ত ঘরগুলো বিকেলেই হারিকেনের চিমনি মুছে, সাদা পলতে ছেঁটে, কেরোসিন তেল ভরে প্রস্তুত রাখা হতো। আর সেই কেরাসিন তেল কিনে আনতে হতো আশেপাশের মুদি দোকান থেকে।
ভাড়া বাড়ির পাশেই বেশ বড়সড় একটা মুদি দোকান। সে দোকানের অগ্রভাগে সাজানো যত জিনিস ঠিক ততটাই গোছানো থাকতো পেছনের গুদাম ঘরে।গুদামের সামনে ছোট্ট পিছ আঙিনা। মাঝারি কতগুলো আমগাছ। কাঁচামিঠে আম। গাছের নীচে সারি সারি কেরোসিনের ড্রাম। সঙ্গে ঝুলানো টিনের চৌঙা।
আমি পড়া শেষ করেই গিয়ে দাঁড়াতাম সেই ছোট্ট পিছ আঙিনায়। এ আসে সে আসে দড়িতে বাঁধা কাঁচের বোতল হাতে ঝুলিয়ে। চৌঙায় ঢেলে কেরোসিন ভরে। আর আমি অপলক তাকিয়ে দেখি।
কি দেখতাম আমি সেই পিছ আঙিনায়? কাঁচামিঠে আমগাছের সবুজ পাতার তলায় উচ্ছ্বাসহীন মফস্বলি জীবনের লেনদেন নাকি নেহাতই ধাবমান জীবনের এক টুকরো বাস্তবতা?
জানি না, সত্যিই জানি না। শুধু জানি চৈত্রের কড়কড়ে দিনের তপ্ততায় চিরকালই লুকিয়ে থাকে অনুচ্চারিত আগামীর নীরব প্রস্তুতি।
এরপর এক পা দু’পা মল্লিক দাদুর বাড়ি। সাদা ধবধবে দাঁড়িতে যতটা ভারিক্কি চেহারা ঠিক ততটাই উচ্ছল তাঁর ব্যবহার,
পড়াশোনা করেছিস তো সকালে…নাকি ফাঁকি দিয়ে পাড়া বেড়ানোর তাল…ফেলি রে ফেলি বুঝবি দিন গেলি…পড়াশোনার কি দাম…
না সেসব বুঝে আমার কাজ নেই। ফেলি হয়েই থাকি। ফেলি বলেই না আশেপাশের সবাই আমার বন্ধু। ফারহানা, রূপা, রনি আরও কত সবাই। তবে মল্লিক দাদুর সবচেয়ে ছোট আর দুরন্ত মেয়ে ফারহানার সঙ্গে অবশ্য বোঝাপড়াটা সবচেয়ে ভিন্ন।
ফারহানা দুরন্ত আমি ভীতু। পুরোই উল্টো চরিত্র। ফারহানা চোখের পলকে এ গাছ থেকে ও গাছ, গাছ পেরিয়ে ঘরের চাল, চাল ডিঙিয়ে বাড়ির ছাদ করে বেড়ায়। আর আমি উঠোনে দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচিয়ে ওকে দেখি,
ওই আমটা…ফারহানা দেখ…ওদিকের ডালে…হ্যাঁ ওটাই…ওই দেখ পাখির বাসা…ফারহানা ওদিকে দেখ…নাগাল পেলি…কি পাখিরে…চড়ুই…
গাছের এ ডাল থেকে ও ডালে ফারহানা পাখির মতো উড়ে বেড়ায় আর আমি তলায় দাঁড়িয়ে ওর পাখায় চোখ রাখি।
ফারহানার কোঁচড়ে ভরা কোন গাছের টক বরই, কোন গাছের পানিফল, কোন গাছের কাঁচা তেতুল। সবকিছুতেই আমার সমান ভাগ। আর সেই একই ভাগ ওদের বাড়ির সকল পরব আনন্দেও।
চৈত্রের রোজা। দুপুর তেতে উঠতেই ধুনুরির দোকানে বেজে উঠতো কুরানের কোনো সূরা। একটানা। সুরেলা। নির্মল। মফস্বলি দুপুর তখন আধ্যাত্মিক অনবদ্য ব্যঞ্জন।
সেই সুরের সঙ্গে মিলেমিশেই বারবেলায় গেরস্থালি বেলায় জমতো খানিক অবসর। বারোব্যান্ডের রেডিওতে নব ঘোরালেই অনুরোধের আসর,
আমার মন বলে তুমি আসবে
হৃদয়ের বসন্ত বাহারে
প্রেমের অভিসারে আসবে…
নীচু ভলিউমের সেই সুর শরীরে জড়ো করতো রাজ্যের ক্লান্তি। ভাতঘুম। মেঝের পাটিতে জমে থাকা একপ্রস্ত শীতলতায় গা জুড়ানো আরাম। পাশে তন্দ্রাঘোর মায়ের চুল থেকে ভেসে আসা তিব্বত নারিকেল তেলের ভুরভুরে ঘ্রাণ।
মধ্যবিত্ত দুপুরের এক পশলা নিরুদ্বিগ্ন সময়,
কতো ঝড় আসে পৃথিবীতে
তবুও তো ফুল ঝরে না
কতো দুঃখ আসে ব্যথা দিতে
তবুও তো আশা হারায় না
অচেনার আড়াল হতে সরে
আপন করে নিতে আসবে…
আপনারা শুনছেন অনুরোধের আসর…এবারের গানটির অনুরোধ করেছেন…ভেজা চোখ চলচ্চিত্র…শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের কন্ঠে…জীবনের গল্প আছে বাকী অল্প…
ছেঁড়া ছেঁড়া শুনতে শুনতে চোখের পাতা ভারী।
টুংটাং…টুংটাং…টুংটাং…
আকুল হাতছানি। তন্দ্রা উবে যাওয়া ডাক। এসব হাতছানি উপেক্ষা করার শক্তি আমার কোনোকালেই ছিল না। একছুট। ফটক পেরিয়ে রাস্তায়।
বরফকলের গাড়ি। তিন রাস্তার মোড়। সুকুমারের মুদি দোকান ছাড়িয়ে ছানা মিষ্টির দোকান। সে দোকান পাড় হলেই রিকশা স্ট্যান্ড। ঠিক সেখানেই এপাড় বাজারের একহারা রাস্তা।
ততক্ষণে বরফকলের গাড়ি ঘিরে জমে উঠতো ভীড়। সে ভীড়ে একমাত্র পরিচিত মুখ ফারহানা,
আয়…এদিকে আয়…ছুঁয়ে দেখ…দেখ কত ঠান্ডা…
বরফ চাইয়ের গা থেকে তখন খুলে পড়তে শুরু করেছে খন্ড। সুঁচালো লোহার আঘাতে তখন টুকরো হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ছে বরফচাই। ছড়িয়ে পড়ছে বরফকুচি। ফারাহানার হাত বদলে তা আমার হাতে। সোজা চালান মুখে। জিহবার তলায় লুকিয়ে ফেলা বেয়ারা শৈশব।
খিলখিল। ছলছল। হিলহিল।
মুঠোর ধরা বরফকুচি। আমাদের আনন্দ সময়। ফারহানার আস্কারায় আমার দুরন্ত সময়। তপ্ত দুপুরের এক টুকরো হিম জুড়ানো আনন্দ।
ভীড় কমতেই বরফকলের রওনা করতো অন্য পাড়ায়। গন্তব্য লম্বা দিনের রোজাক্লান্ত মানুষ। আর আমি পিছু নিতাম ফারহানার। পা এগোতো মল্লিক বাড়ির দিকে।
পুঁই মাচানের বেগুনি ফল। হাতরঙ। খেলনাবাটি সময়।
উঠোনের কোনের আখায় সে বাড়িতে তখন চলতো ইফতারি আয়োজন। বেশি কিছু নয়, ভাত, গোশত আর পুঁইমেটুলির চচ্চড়ি।
সঙ্গে লেবু জলে বরফ।
তারপর আকাশের আলো নিভু নিভু। দিন ফুরানোর প্রস্তুতি। গেরস্থালির শেষ প্রস্ত আয়োজন। হারিকেনের চিমনিতে বাস্প ভাসিয়ে খবরের কাগজ দিয়ে মুছে নিতে নিতে হঠাৎ ফারহানার আলটপকা গল্প,
কাল যাবি কড়ইতলা বরফকল দেখতে?