এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  অপর বাংলা  শনিবারবেলা

  • শিউলির ঘ্রাণ আর দুব্বা ষষ্ঠীর ব্যবচ্ছেদ

    স্মৃতি ভদ্র
    ধারাবাহিক | অপর বাংলা | ০২ আগস্ট ২০২৬ | ৭৩ বার পঠিত
  • আজব বাকশো | রুশ টি সেট আর পেয়ারাতলায় মেম বৌমা | আমার বই আর মফস্বলের ভোর | শিউলির ঘ্রাণ আর দুব্বা ষষ্ঠীর ব্যবচ্ছেদ

    অলংকরণ: রমিত


    টুপটাপ। বাতাসের টোকা। এঁটেল মাটির লেপা উঠোনে একটা দুটো ফুল। উঠোনের কোণায় জ্বলতে থাকা টিমটিমে বাল্ব। আকাশের আলো অপ্রতুল। ভাদ্রকাল। পুব আকাশে লুব্ধক তারা লুকিয়ে থাকা। ভাদুরে মেঘের ভোর। আড়মোড়া ভাঙা শৈশবের ভোর।

    খিল আঁটা দরজায় তখনও কড়া নেড়ে ওঠেনি দিনের ব্যস্ততা। তবুও আমার ঘুমের সঙ্গে আড়ি। বিছানা ছেড়ে আধো আলোর লাল মেঝেয় পা। উঠোনে গোবর জলের ছরা। ফিসফিস কোলাহল। বাড়ির বৌদের গেরস্ত বেলা শুরু।

    এক পা। দু’পা। ছুট। একছুট। উঠোন পেরিয়ে বাইরবাড়ি।

    রেনু বালা। মাথা ভরা কদম ছাটের চুল। একপেঁচে সাদা থান। কিছুটা উবু কিন্তু গলার জোরে পুরো পাড়া তটস্থ,

    থাম থাম...সব তুলে কোছে রাখছিস ক্যান...আজ দূব্বাষষ্টী...সাত রকমের ফুল লাগবি...ওরে থাম...মোটে কথা শোনে না ছেলেপেলে...

    এক পা...দু'পা...এরপর ভো দৌঁড়...

    কোঁচড়ের ফুল লাল বারান্দায় ঢেলে ফটক খুলে সোজা তাঁতঘরের সামনে। গামছায় ভাত বেঁধে দু'একজন তাঁতি কেবল আসা শুরু করেছে। ওরা আসে বাদলবাড়ি থেকে। তাই ফজরের নামাজেই দিন শুরু হয়ে যায় ওদের।

    এক বিন্দু...দুই বিন্দু...ঝিরঝির...

    তাঁতঘরের সামনে ছোট্ট মন্দির। চারপাশে টিনের ঘের আর দোচালার নীচে সাদালাল সামিয়ানা। সাদামাটা আর আড়ম্বরহীন, কিন্তু বিশ্বাসের এক প্রশ্নাতীত আয়োজন।

    ঠাকুমার গলায় গুনগুন হরিনাম কীর্তন। দেবদারু গাছের কোঠরে ডেকে ওঠে অচেনা কোনো পাখি,

    টুঁই…টুঁই…টুঁই…

    এক পলকা বাতাসে ঝরে পড়া দেবদারু ফল মাড়িয়ে জামরঙা পায়ে এক ঠায় দাঁড়িয়েছিলাম আমি। এঁটেল মাটিতে নিকোনো মন্দির আঙিনা। হাতে তালি দিয়ে গৃহদেবতার জাগরণ। ভক্তিভরে হাত জোর।

    আস্থার নিগূঢ় চালচিত্র।

    আকাশের বুকে জমেছিলো আরও খানিক মেঘ। থমথমে সময় অথচ বাঙ্ময়। তবে আকাশ যতই মেঘাচ্ছন্ন হোক তাতে আয়োজনে বাঁধ পড়বে কেন?

    উটকো বাতাস। উড়ে আসা শিউলির ঘ্রাণ। তবে সেখান থেকে খুব মৃদূ বরই ফুলের ঘ্রাণটুকুও আলাদা করতে পারতাম আমি বেশ নিষ্ঠার সঙ্গেই,

    ও ঠাকুমা, বরইগাছে ফুল এসে গেছে এখনই...

    ততদিনে আমরা শহরে থিতু হয়েছি। তবে উৎসব আয়োজনে বাড়িতে আসা চাই-ই। অবশ্য শহরের সঙ্গে কিন্তু একটা সখ্যতাও গড়ে উঠেছে ততদিনে। নয়তো ছুটিতে বাড়ি আসার দিন যখন বাস ধরার জন্য রিকশায় উঠেছিলাম তখন বানিয়াপট্টির বাতাসে ভেসে থাকা শিউলির ঘ্রাণটুকু আজও নিজের ভেতর পুষে চলতাম না নিশ্চয়ই।

    এখনো?

    হ্যাঁ এখনো। এখনো শিউলির ঘ্রাণ আমাকে টেনে নিয়ে যায় মফস্বলি শহরের নীরব পথে। আমাকে টেনে নিয়ে যায় বাড়ির উঠোনে। আমাকে টেনে নিয়ে যায় আশ্বিনের ভোরে।

    সে সব ভোরে একলা আমি ইতিউতি খুঁজে বেড়াই আমাকে, নিখাদ আর অনি:শেষ আমাকে।

    মেঘে ঢাকা আলো। সাদা সকালের গা বেয়ে দিন নামে ধীরে।

    ঝিরঝির…ঝমঝম…টুপটাপ…

    আমাদের বাড়ির উঠোন ছিল নানা ব্রতের নানা থানের। তবে দূর্বাষষ্টি হতো বাইরবাড়িতে। বরইগাছে ফুল এলে আর শুক্লাদের উঠোন ঝরা শিউলিতে ঢেকে গেলে বাইরবাড়ি মন্দিরের সামনে পড়তো দূর্বাষষ্টির থান। ক’টা নিঁখুত গোটা ফল, সাতরকমের ফুল, এক গোছা দূর্বা আর সদ্য ফুল আসা বরইফুলের ডাল।

    সে সব থানে নীরবে পড়ে থাকা শিউলির লালিত্য আমাকে যতটা না টানতো তারচেয়েও বেশী টানতো উদাস করা ঘ্রাণটুকু।

    ঘটের আম্রপল্লবে সিঁদুর, পাশেই কঞ্চির মাথায় দুর্বার গোছা বাঁধা, ঘট উপচে মাটিতে পড়া ফুল আর হাতে কোঁচড়ের সেই শিউলি।

    ঘ্রাণ নিলে সে ফুল পূজায় লাগে না। মন উশখুশ। বন্ধ মুঠো। হাতের তাপে মিইয়ে আসা শিউলি। মিথ্যে অজুহাত। নি:শ্বাসের সঙ্গে শুষে নেওয়া সাদা ভোরের ঘ্রাণ,

    ষষ্ঠী দেবীর কৃপায়, মঙ্গল হয় সবার,
    সন্তান দীর্ঘায়ু হোক, মুছে যাক অন্ধকার।
    দূর্বা দিয়ে করি পূজা, ষষ্ঠীর চরণে,
    সুখে থাকুক সব পরিবার, ভক্তিভরে মনে…

    রেনু বালার চিকন সুরে উলু যোগার। ঘটের মাথায় পুষ্পাঞ্জলি।

    কিন্তু আমি…

    ছুট…ভো ছূট…মুঠোয় ভরা শিউলি…পুতুলের বাকশো…লুকিয়ে ফেলা শিউলির ঘ্রাণ…

    বোকা ছিলাম। ভাবতাম, পুতুলের মত শিউলিগুলোও থেকে যাবে সঙ্গে। জানাই ছিল না ফুল নয়, শুধু ঘ্রাণটুকু থেকে যায় সঙ্গে আজীবন তবে খুব নীরবে।

    দূর্গাপূজা ফুরালেই শহরের ফেরার দিন। কোজাগরী চাঁদের আলোয় যে ঝলমলে ভোর আসতো সে ভোরের বাতাসে আমার দু:খ মিশে থাকতো বিচ্ছেদী সুর হয়ে।

    কোনটা রেখে কোনটা সঙ্গে নেই। পুতুলের বাকশো, জড়ি সুতোর ববিন, পুঁতির মালা, কুড়িয়ে পাওয়া মার্বেল আর শিউলির সোঁদা ঘ্রাণ।

    টুংটাং…রিকশার প্যাডেলে পা…আঙুলের কড়ে আবার শুরু দিন গোনা…

    বাস…স্টিমার…রিকশা…

    জুবলী বাগান…কোর্টচত্বর…থানা রোড….

    আমরা এগোই শহরের দিকে। সময় এগোয় জীবনের দিকে।

    কি অদ্ভুত এক সাযুজ্য!

    ফেলে আসা সময় আর আগত সময়ের ভর বিন্দু হয়ে দাঁড়িয়ে রয় শিউলির ঘ্রাণ।

    উপড়ে ফেলা জীবনের সবটুকু ভাঙনের স্রোতে তলিয়ে গেলেও ভেসে আসা শিউলির নীরব ঘ্রাণ আমাকে নি:শব্দে আজও ডেকে নিয়ে যায় জীবনের কাছে।

    শহর তখনো মফস্বলি। বড় বড় দালানকোঠার দাপাদাপি তখনও শুরু হয়নি শহর জুড়ে। দোচালা ঘরের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষী গাছগুলো তখনো ইতিহাসের গল্প কয়। পুরোনো দালানের গা বেয়ে নেমে আসা পাকুরের শেকড় তখনো হারিয়ে যাওয়া নির্মল দিনের গল্প কয়। আর গল্প কয় পুরোনো মানুষেরা।

    সুকুমারের গলি…কালিবাড়ি রোড…বাজার…একডালা রোড…

    ঠিক এখানেই ছিল হরিপদ ঘোঘের বাড়ি। সে বাড়িতে টোকা দিলেই লম্বা গড়নের হরিপদ ঘোষ অভিব্যক্তিহীন মুখ নিয়ে বেরিয়ে আসতো। রোজগেরে দুধের বায়না বুঝে নিয়ে কলাপাতায় মোড়ানো খানিক ছানা হাতে গুঁজে দিতো,

    খুকি নে…বাড়িত গিয়া খা…

    বাড়ি? বাড়ি তো ফেলে আসলাম সেই কোন ভোরে। কীভাবে ফিরি সে বাড়িতে?

    উৎসব, আনন্দ আর নিজের মানুষগুলোকে ছেড়ে আসা মন খারাপের ক্লান্তি তখন কথার স্রোতে ভীষণ বাঁধ। তাই ‘ঘাড় নেড়ে’ আবার রাস্তায় নামা। অল্প একটু পথ। ঘন হয়ে আসা বাড়িগুলোর ফাঁকে সমবয়সী ছেলেপেলের হৈ চৈ, নিবিড় হয়ে থাকা কতগুলো সাদা টগরের গাছ আর সেই শিউলি।

    অন্য কারো বাড়ির সীমানা পেরিয়ে সেই গাছের ছায়া তখন পথে। ছায়া ভুলে বুকের খাঁজে বুভুক্ষু শ্বাস। সে শ্বাস দীর্ঘ, প্রলম্ব, প্রসারিত।

    বাতাসে মিশে থাকা শিউলির ঘ্রাণটুকু তখন শুধু উৎসবের নয়, বিচ্ছেদের স্মৃতিরও।


    চলবে...


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    আজব বাকশো | রুশ টি সেট আর পেয়ারাতলায় মেম বৌমা | আমার বই আর মফস্বলের ভোর | শিউলির ঘ্রাণ আর দুব্বা ষষ্ঠীর ব্যবচ্ছেদ
  • ধারাবাহিক | ০২ আগস্ট ২০২৬ | ৭৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন