এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • বিশ-একুশ

    ভবঘুরে
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১১ আগস্ট ২০২৬ | ১৮ বার পঠিত
  • ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক




    ধুতিটা আজড়ে পার্টি অফিসের বারান্দায় শুকোতে দিচ্ছিলেন পাঁচুগোপাল রায়। এই নিয়ে পরপর দুবার বিধানসভায় জিতলেন। হাতে গোনা কটি এম.এল.এ দলের। তার মধ্যে তিনি একজন।
    বলিয়ে কইয়ে তেমন নন। কিন্তু প্রখর ব্যক্তিত্ব। খালি গা। রোমশ বুক। ছেঁড়া গেঞ্জি বেয়ে বুকের রোমশ চুল উঁকি দিচ্ছে। বামুনের ছেলে। পৈতে পরেন না।
    কার্তিককে বললেন, ভাত বাড়। খাই।
    কার্তিক ভাতের হাঁড়ি নিয়ে এল। ভাত, আলুসেদ্ধ আর ডাল। শুধু নুন দিয়ে আলু মেখেছে।
    --একটু পেয়াঁজ দিয়ে মাখতে পারলি না।
    --পয়সা ছিল না বাবু।
    --কাঁচা লঙ্কা? দেখি?
    --নাই। ভগ্ন দূতের মতো দাঁড়াল কার্তিক।
    এমন সময় দরজা খুলে ঢুকল, মামুন।
    --খেতে বসে পড়েছেন?
    --এই মাত্র। বসে পড়ো। হয়ে যাবে।
    --দাঁড়ান, আমি খাবার এনেছি।
    --তাই? কইরে কার্তিক, আয়।
    --ও কী খাবে?
    --কী আছে?
    --চালের আটার রুটি, ফিরনি, পোলাও আর মাংস।
    --বড় খাসির তো?
    --হ্যাঁ।
    অ্যালুমিনিয়ামের সারি দেওয়া টিফিন কৌটো খোলে মামুন।
    কার্তিককেও ডাকে, তোমার ভাগ্যও ভালো কার্তিকদা।
    --মুরগির মাংসও আছে, খাবে তো?
    --তোমাদের পাল্লায় পড়ে জাত ধম্মো কি আর কিছু আছে মামুন ভাই।
    --ওরে আগে আর্যরাই গোরুর মাংস খেতো। রামায়ণ পড়, রামচন্দ্রও খেতো। বামুনদের কাছেই গোরু খাওয়া শিখেছে সবাই। বলেন পাঁচুবাবু। তারপর, কার্তিককে বললেন, সেই যে তোকে বললুম 'বিদ্যাসাগর' সিনেমাটা দেখে আয়। কী শিখলি? বামুনরা গোরু খেত সেখানে বলেনি?
    --আপনার যেমুন কতা, বামুনের ছেলে হয়ে কিছুই মানেন না। বলল কার্তিক।
    --আমি তো কমুনিস্ট। বিদ্যাসাগরের বন্ধুরা তো নয়? তবে, বিদ্যেসাগরকে কি বামুন বলে মানিবি না?
    নিজের রসিকতায় পাঁচুবাবু হো হো করে হাসলেন।
    --তারপর বললেন, তোকে আর মানুষ করা গেল না। বলেন কার্তিককে। মামুন আর পাঁচু রায় পাশাপাশি বসে খেলেন। খাওয়ার পর পাঁচু বাবু বললেন, আজ স্পেশাল কিছু? আজ তো কোন পরব নাই।
    --আমার ছেলে হয়েছে। তাই দাদি আর মা মিলে বানিয়েছে।
    মামুন ভাঙল না। সে না খেয়ে থাকায় সে যাতে খেতে বাধ্য হয়, তাই এম.এল.এ-র কাছে পাঠিয়েছে মা আর দাদি।
    --কার রান্না রে?
    --মা আর দাদি করেছে।
    --আমার সালাম জানাস। এমন চালের আটার পিঠে আমাদের ঘরের মেয়েরা পারে না।
    ‘আমাদের’ কথাটা কানে ঠেকল মামুনের। তার মানে কমিউনিস্টদেরও 'ওরা' 'আমরা' আছে?
    আচ্ছা উনি তো গোরুর গোস্ত খান আনন্দ করে, সব নেতাই কম বেশি খান, যে খায় না, তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা চলে পার্টিতে। হেঁদুয়ানি যায়নি এখনো?
    মামুন একটু দমে গেল। খেয়াল করলেন রায়বাবু।
    --কী রে মন খারাপ কর কেন?
    --না কিছু নয়।
    --কিছু নয় বললে হবে। মন খারাপ দেখছি।
    এ সব কথা বলা যায় না। ভুল বুঝবে। তার চেয়ে চুপ করে যাওয়া ভালো।
    --শোন, মামুন, এত অভিমানী হোস না। তোকে পার্টি মেম্বার করি নি বলে তোর দুঃখ আছে। আসলে কী জানিস, তোর মতো সেণ্টিমেন্টাল লোক মেম্বারশিপ রাখতেও পারবি না।
    তুই বাইরে থেকে যা দেখিস, সেটাই তো সব না। এই দেখ না, পার্টিটা দু টুকরো হয়ে গেল। চীন রাশিয়া এসব আসল কথা নয় – আসল কথা আমরা কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছিলাম না। নেতৃত্বের লড়াই ছিল। সঙ্গে নেহেরু নিয়ে মূল্যায়নে সমস্যা।
    --নেহেরু কেমন লোক?
    --দেখ, নিজেকে সমাজতন্ত্রী বলেন, কিন্তু খামতি আছে।
    খামতি তো সবার আছে। কিন্তু মামুনরা মনে করে নেহেরুকে বাদ দিয়ে দেশ সম্ভব না। কিন্তু সে কথা নেতাদের বলা যাবে না। যাদের বলা যাবে, তাদের আবার মামুনের পছন্দ না। বড্ড বড়লোক ঘেঁষা। মামুন মন খুলে কথা বলতে ভালোবাসে। কিন্তু আজকাল একটু সতর্ক হয়েছে। বিশেষ করে তার আদর্শ পাঁচুবাবুর মুখেও আমাদের তোদের শুনে।
    মামুন বের হয়ে এল। এবার সাইকেল নিয়ে ছুটবে শ্যামপুর। বাদশাকে নিয়ে যাবে বাড়িতে। সারারাত আড্ডা হবে।



    নবাব মুন্সি। ধনী ঘরের ছেলে। বাবা খুবই বড়লোক। এখন ১০০ বিঘের বেশি জমি। ধানকল আছে। বড় বড় কয়েকটা পুকুর। আক্ষেপ একটাই দুই ছেলের মধ্যে ছোট বাদশা লাল ঝাণ্ডায় নাম লিখিয়েছে।
    বড়র নাম সম্রাট। বাবার মতোই চাপা গায়ের রঙ। চাপা স্বভাবও বাপের মতো। বিষয় সম্পত্তির হিসেব ভালো বোঝে। দাপুটে। এবং কংগ্রেসের ছোটখাটো নেতা হয়ে উঠেছে। ছোটটা নবাব মায়ের গায়ের রঙ পেয়েছে। ফর্সা টুকটুকে। স্বভাবও মায়ের মতো। বড্ড দান খরচের ঝোঁক। আড্ডাবাজ। আড্ডাবাজ বাপ নিজেও। ছোট ছেলের দলের সঙ্গে তার ঘোর বিবাদ। কিন্তু নবাবের বন্ধুবান্ধবদেরকে খুব পছন্দ করেন। মদ মেয়েছেলের ঝোঁক নাই। বই পড়ে আর ঝাণ্ডাবাজি করে। তর্কবাজ। কিন্তু দিলদরিয়া সব। তাঁকে দেখলেই অবশ্য সেলাম ঠোকে। আজও ঠুকল। মামুন। সাইকেল থেকে নেমে।
    --কেমন আছেন চাচাজি?
    --আছি একরকম। তোমরা লাল ঝাণ্ডাওয়ালারা কি ভালো থাকতে দেবে?
    --আমরা আবার কী করলুম?
    --তোমার বন্ধু, কমরেড নবাব, আমাদের ছোট সাহেব, হুমকি দিয়েছে, আমার জমিতে লাল ঝাণ্ডা পুঁতবে। জমি খাস করবে।
    মামুন বুঝলেন চাচাজি রেগে আছেন।
    --আমি কথা বলবো চাচাজি।
    এই যে শোনো, এখুনি চলে যেও না, বড় পুকুরে মাছ ধরা হয়েছে। তোমার চাচির হাতের মাছের টক তো খাও নি। আজ খেও।
    --আমি খেয়ে এসেছি।
    --খেয়ে এসেছি মানে তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়। হলেই বা আমার বিরোধী পার্টি। মুন্সীসাহেবের ঘর থেকে না খেয়ে যাবে? লেঠেল লাগবে না, নিজেই তোমার ঠ্যাঙ খোঁড়া করে দেবো।
    তারপর গলা নামিয়ে বললেন, নবাবকে একটু বুঝিও? বড্ড মাথা গরম। বাপের সঙ্গে মেজাজ দেখিয়ে কথা বললে ভালো লাগে!
    মামুন জি আজ্ঞে, বলে সরে পড়ল।


    ক্রমশঃ
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ধারাবাহিক | ১১ আগস্ট ২০২৬ | ১৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন