এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • বিশ-একুশ

    ভবঘুরে
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৮ জুলাই ২০২৬ | ১৫ বার পঠিত
  • জুলাই ২৭- ২০২৬
    ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক



    কনকনে ঠাণ্ডা। সঙ্গে বৃষ্টি তেড়ে। দুগো আজ সকালে দোকান খুলতেই চাইছিল না। এত বৃষ্টি রাত থেকে পড়ছে তো পড়ছেই, থামার নাম নাই। ইচ্ছে ছিল, মাঠে কাল কাটা ধানের কী অবস্থা দেখে আসবে। একটু খেয়াল করে আলে তুলে না দিলে জমা জলে ধানে কল গজিয়ে যবে। খড় পচবে।
    ঘরের লাগোয়া দোকান। ঘরের দাওয়ায় দাঁড়াতেই দেখে দাঁড়িয়ে আছে মামুন ভাইয়ের বড় মেয়ে সালেহা। শান্ত, মেয়ে। একটু বেশি ঢ্যাঙা। কথা বলে চটপট। স্কুলে পড়ে। গাঁয়ের দুটো মেয়ে এবার ক্লাস এইটে উঠবে। একজন ও। মামুন ভাই এককালে বেশ বড়লোক ছিল। এখন পার্টি ক্লাব দান দ্যান করে মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত হলেও খানদানি পরিবার। মামুন ভাইয়ের ঘর থেকে কেউ মাল নিতে আসে না। মাসকাবারি বাজার করে সাঁইদের দোকান থেকে। পাশের গ্রাম বাজার আছে। গঞ্জ। সেখানে। দুগো একটু অবাক হল। কী ব্যাপার ?
    দেখল, সালেহার ফ্রকের মধ্যে চাল।
    --চাল, কী ব্যাপার ?
    --পরে বলব, তুমি এটা আলাদা করে রেখে আমাকে ১০০ বিস্কুট দাও। ব্রিটানিয়া।
    --আচ্ছা।
    --আচ্ছা নয়। মনে রেখো এটা মেশাবে না। আলাদা করে রাখবে।
    --সালেহা যেতে না যেতেই হাজির স্বপন। সালেহার পরের ভাই। মামুন ভাইয়ের বড় ছেলে। বড় সুন্দর দেখতে। গম্ভীর ভারিক্কি চাল, খুব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ছেলে। মামুন ভাইয়ের সব কটি ছেলে মেয়ে পড়াশোনায় ভালো। ক্লাসে সবাই ফার্স্ট হয়। দুই ছেলে দুই মেয়ে। কাল রাতে নাকি আরও একটি ছেলে হয়েছে।
    --কী ব্যাপার রে স্বপন ?
    --কিছু না।
    --কিছু না তো---
    দুগো জানে, মামুন ভাই ভারি ভালো মানুষ। লোকের আপদে বিপদে ছুটে যায়। লোকে বলে সাক্ষা‌ৎ শিব।
    রাগও শিবের মতো। একবার রাগলে আর রক্ষে নেই। দুগো ভাবল, নিজেই যায়। গিয়ে বলে, মামুন ভাই কী হচ্ছে ?
    কিন্তু সাহসে কুলোল না। রাগী মানুষ চড় টড় মেরে দেবে। ১০টার সময় দোকানে এলেন, বিনয়বাবু। পাশের গ্রামের স্কুলের অংকের মাস্টার। পড়াশোনা জানা মানুষ। বিএসসি পাশ। জাতে বামুন। বড্ড শান্ত মানুষ।
    গ্রামে কোন কথা গোপন থাকে না। দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নবীনবাবুও ঘটনাটা শুনেছেন। সকাল থেকে মামুনের চার ছেলে মেয়ে বৃষ্টির মধ্যে পায়ে কাদা মেখে দোকানে আসছে তো আসছেই।
    বিনয়বাবু ইশারায় সালেহাকে ডাকলেন।
    --কীরে স্কুল যাবি না ?
    --যাবে। কিন্তু কী করবে, বাবার হুকুম। রাগ কমেনি বাবার। সকাল থেকে কিছু খায়ওনি।
    মামুন ভাইয়ের বিশ্বাস খেলে রাগ পড়ে যাবে। তাই খায় না।
    বিন্যবাবু জানেন ব্যাপারটা।
    দুগোকে বললেন, চালগুলো সব দিয়ে দে সালেকে।
    দুগো ইতস্তত করছিল, বিনয়বাবু গলা ভারি করে বললেন, আমি বলছি দে। বাকিটা আমি বুঝে নেবো।

    সালেহাকে লোকে সংক্ষেপে বলে সালে।

    ******



    সালেহাকে নিয়ে বিনয়বাবু যখন মামুনের ঘরে পৌঁছালেন, দেখলেন থমথমে অবস্থা। মামুনের বউয়ের বাচ্চা হয়েছে। আঁতুড় ঘরে।
    প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। ছেলে কাঁপছে। নুরপুরের দাই ঘরে উনুন জ্বালিয়েছে। নুরপুরের দাই এ তল্লাটে বিখ্যাত। প্রায় সব ঘরের ছেলেমেয়ে হয়েছে তার হাতে। জমিলা বিবি। হিন্দু মুসলিম প্রায় সব ঘরে ক্রিটিক্যাল রোগী হলেই জমিলা বিবি মুশকিল আসান। কালো গাঁট্টাগোট্টা চেহারা।
    বিনয়বাবুকে দেখেই এগিয়ে এল মামুনের মা। মামুনের নিজের মা নেই সৎ মা। সৎ মা জহুরা ছেলে অন্ত প্রাণ। কী ভালই না বাসেন। বিনয়বাবুর গল্প উপন্যাস পড়ার খুব নেশা। রামের সুমতি বিন্দুর ছেলে নিষ্কৃতি বোধহয় এই সব মায়েদের দেখেই লিখেছিলেন শরৎবাবু। ভাবেন বিনয়।
    --চা খাবে ?
    --না ভাত খেয়ে বেরিয়েছি।
    --একটু মিষ্টি খান। নাতি হয়েছে।
    --পরে এসে খাবো।
    --মামুন কই ?
    বিনয়বাবুর গলা শুনে বেরিয়ে এল মামুন।
    --খবর কি মাস্টার মশাই ?
    --খবর ভালো। বোস।
    বলে মামুনের মাকে ডাক দিলেন, দিন মিষ্টি দিন। মামুনের মায়ের সঙ্গে এলেন মামুনের দাদি। নবিসন। রাশভারি মহিলা। স্বামীর মৃত্যুর পর চিকের আড়ালে বসে বিচার করেছেন গাঁয়ের। একা হাতে রক্ষা করেছেন ২৫০ বিঘা জমি। দানধ্যানে সুনাম আছে। বহু ছেলেকে পড়াশনা করায় গোপনে সাহায্য করেছেন। আর গরিব দুঃখির ত কথাই নেই। এই মহিলার বিচারবুদ্ধির ওপর বিনয়ের বাবার ভরসা ছিল। আসতেন পরামর্শ করতে। বিনয়কে মিষ্টি এগিয়ে দিয়ে বললেন, খাও। বিনয় হাতে মিষ্টি নিয়ে মামুনের দিকে এগিয়ে বললেন,
    --খা।
    --মামুন চুপ।
    --খা বলছি।
    --আমার ছেলে হয়েছে। আমি মিষ্টি খাব ?
    --কেন খাবি – সে ও তুইও জানিস আমিও জানি।
    বিনয়বাবু, মামুন আর কাজীপাড়ার মাস্টার মিলে ফুটবল খেলা চালু করেছিলেন।
    এক স্কুলে পড়তেন। মামুনকে ভালোই চেনেন। এমনিতে ভালো ছেলে। মাথা গরম হলে মুশকিল। খাইয়ে দিলেই শান্ত। দু' জনে দুটো আলাদা বোর্ডিংয়ে থাকতেন। মামুন মুসলিম বোর্ডিংয়ে। বিনয় হিন্দু বোর্ডিংয়ে। রায়নায়। স্বাধীনতা দিবসের দিন একসঙ্গে সারারাত জেগেছিলেন। আনন্দে। দুই মেস মিলে ফিস্ট হয়েছিল। জীবনে প্রথম বামুনের ছেলে হয়ে মুরগির মাংস খান। স্বাধীনতার অন্য স্বাদ ১৫ আগস্ট রাতে। বিনয়ের কথা মামুন শোনে। বিনয় কম কথা বলেন। মামুন কথা বলতে ভালোবাসে।

    মামুন চুপচাপ মিষ্টি খেল। তারপর বলল, তুইও একটা খা।

    মামুন বলল, ছেলে দেখে যাবি না।
    --নারে। মা জানতে পারলে ঝামেলা করবে শৌচ মৌচ নানা ঝামেলা।
    --যাক, ছেলের নামটা তুই দিবি। আর হাতে খড়ি।
    --সে তোর তো পূজারী বামুন ছাড়া পছন্দ নয়।
    না, এর হাতে খড়ি তুই দিবি।
    এই গাঁ-টা একটু অদ্ভুত। মুসলমান ছেলের হাতে খড়ি বামুন দেয়। আর বামুনের ছেলের হাতের লেখা হয়তো শেখাল কোনো মুসলমান শিক্ষিত ছেলে।
    বিনয়বাবু বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোর ভক্ত। একটু আধটু জ্যোতিষের চর্চা করেন।
    বললেন, কাল কখন ছেলে হল ? সময়টা বল।
    --১১টা ৫২।
    একটু সময় নিলেন। কাগজ কলম চাইলেন। কীসব আঁকিবুঁকি করলেন, তারপর বললেন, "শোন, তোর এ ছেলে বংশের মুখ উজ্জ্বল করবে। লেখক হবে। গাঁয়ের মুখ রাখবে। মিলিয়ে নিস। আর বাকিটা দেখে বলব। তবে যেটুকু বললুম বামুনের কথা।"


    ক্রমশঃ
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    জুলাই ২৭- ২০২৬
  • ধারাবাহিক | ২৮ জুলাই ২০২৬ | ১৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় প্রতিক্রিয়া দিন