এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • জোছনায় তোমার সঙ্গে ভিজবো বলে

    ছুটি রায়চৌধুরী
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ৪৮ বার পঠিত
  • জুলাই ২৭- ২০২৬ | অগাস্ট ৪, ২০২৬
    ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক


    *৪*

    সম্বিতি গেয়ে যাচ্ছিল একের পর এক গান। সঙ্গে অসামান্য নাচছিল এক বৃদ্ধ বাউল। জিজ্ঞেস করে নাম জানল বিবেক খ্যাপা। অপেক্ষা করল নাচ শেষ হওয়ার। তারপর এগিয়ে গেল। আলাপ করতে।

    “সেবা হয়েছে আপনাদের, — জিজ্ঞেস করলেন বিবেক খ্যাপা।
    বুঝতে না পেরে বাকিরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।

    ইমু সায় দিল, ওসব নিয়ে ভাববেন না।
    — ভাবতে হবেই বাবা, আপনারা আমাদের অতিথি।
    এমনি এমনিই সাঁইবাবা গান বাঁধেননি —

    পড়শি আছে কয়জনা।

    গান তো শুধু গাওয়ার জিনিস নয় বাবা। তা হল সাধনা—জীবন সাধনা। জীবকে বাদ দিয়ে কি জীবন সাধনা হয় বাবা। চলেন সেবা করবেন চলেন।

    না গেলে দুঃখ দেওয়া হয় বলে ইমু দলবল নিয়ে গেল বিবেক বাবার সঙ্গে। একটা বড় অশ্বত্থ গাছের তলায় ধুনি জ্বলছে। গোল হয়ে বসে আছেন একদল বাউল।

    মধ্যমণিকে চেনা চেনা ঠেকল—ইমুর, ষষ্ঠীলাল খ্যাপা। তাকে দিয়ে গান গাইয়েছে সে। রবীন্দ্রসদন চত্বরের আসরে। আমেরিকায় জন্মালে মাইকেল জ্যাকসন হতো ষষ্ঠীলাল। এদেশের বাউল বলে ২০-৫০ টাকায় গান গাইয়ে নেয়। আর দেয় গাঁজার জোগান। তাতেই মনে করে ফোক কালচার করা হয়ে গেল।

    — কতক্ষণ আসা হল? জানতে চাইল ষষ্ঠীলাল—
    — এই ভবে আসার আশা, আসা মাত্র হল—ফোড়ন কাটল চূর্ণী।

    চূর্ণী এমনিতে চুপচাপ মেয়ে। কিন্তু গভীর পাণ্ডিত্য। প্রেসিডেন্সি থেকে ইংরেজিতে প্রথম। জওহরলাল নেহরুতেও প্রথম। আইন শাস্ত্রে র‍্যাঙ্ক করেছে। কিন্তু অধ্যাপক না প্রশাসক—ধন্দে পড়েছে। বাবা-মা, মেয়ের ইচ্ছে অধ্যাপনা। বাবার পছন্দ প্রশাসন।

    জানতে চেয়েছিল ইমুর কাছে। সে সরাসরি জবাব দেয়নি। উল্টে বলেছিল, কাল কী করছো?
    — কেন ইমুদা।
    স্যার না বলে তাকে নাম ধরে দাদা ডাকতে শিখিয়েছিল ছাত্র-ছাত্রীদের। তাই ইমুদা।
    — কাল যাব, আসাননগরে বাউল মেলায়। পায়ের তলার সর্ষে দিল্লির গরমে নিশ্চিত শুকিয়ে যায়নি।
    — কী যে বলেন স্যার।

    সেই চেষ্টা চলে এসেছে। কলেজ না গিয়ে। আই.এ.এস হবে না অধ্যাপকের চাকরি করবে—সে প্রশ্নের কোনও জবাব দেয়নি ইমু। দেবেও হয়তো না। নিজের পথ নিজেকে খুঁজতে শিখতে হয়।
    অন্যের হাঁটা পথে আনন্দ কই, আরাম হয়তো আছে।

    *৫*

    বেলা বাড়ছিল। খিদেও। একটু আলুকাবলি, একটু ঝাল মুড়ি, একটু ঘুগনি খাওয়া হয়েছে, গ্রামের দিকে রান্নায় এক ধরনের স্বাদ আছে—যা শহরের জীবনে অমিল। এ স্বাদ মুখ মেরে দেয় না। মুখকে আরও চালিয়ে যাওয়ার প্রণোদনা দেয়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল হাঁটার ক্রিয়া। ফলে খিদের কোনও দোষ নেই। আর গরিব-বড়লোক সবার খিদে সমান। তফাৎ এই বড়লোকেরা খিদের ব্যাপারটা খুব একটা টের পায় না। আর পেলে সহ্য করতে পারে না। বাকি দলে ইমুরা।

    এই সময় ইমু গুনতে বসল। দল বেঁধে বেড়াতে গেলে মাঝে মাঝেই মাথা গোনে ইমু। এটা তার অভ্যাস। দরকারও। কারণ এই রকম জায়গায় ছেলে-মেয়েরা হারাতে চায়। হারানো ভালোও কিন্তু দলপতির পক্ষে বিপদের। না হারালে ছেলেরা যে ছেলে, মেয়েরা যে মেয়ে—তা প্রমাণ হবে কেমন করে। বাউল মেলায় গিয়ে দেখা গেল ঈক্ষণ্যা আর নাসিম নামে দুজন উধাও। এদের তেমন চেনে না—ইমু।

    পার্থদের সঙ্গে এসেছে। খোঁজ-খোঁজ। পাওয়া গেল। গাঁজা খাওয়ার প্রাথমিক পাঠ নিতে গিয়েছিল এক আসরে। নাসিমের মুখে কলকে উঠলেও ঈক্ষণ্যার সে সুযোগ আসার আগেই তলব। তাই বেচারির মন বেশ খারাপ। সেবা বা খাওয়ার ওখানে খিচুড়ি আর টম্যাটোর চাটনি। কিন্তু বেশ লম্বা লাইন। পিছনে দাঁড়ানোর জন্য সবাইকে নির্দেশ দিয়ে দিল ইমু। সবাইকে দাঁড় করিয়ে নিজে শেষে দাঁড়াবে ইমু—এমন সময় দেখে হন্তদন্ত হয়ে আসছে মঞ্জু।

    — স্যার কোথায় ছিলেন আপনি, আমি আর বীণা সারা মেলা খুঁজে খুঁজে হয়রান।
    — বীণা কে?
    — বীণা আমার বন্ধু। পরে বলব ওর কথা। আপনার খুব ফ্যান।
    — কী করে? সে তো আমায় চেনেই না।
    — আমাদের মুখে শুনে শুনে।
    — তো ব্যাপারটা কী?
    — স্যার বাড়িতে মা রান্না করে বসে আছেন। আর আপনাদের দেখা নেই!

    — দেখা হওয়ার কথা কি দিয়েছিলাম?
    — না তা দেননি। তবে আমি ভেবেছিলাম আপনি আমার কথা রাখবেন।
    আপনি যে…
    কথা শেষ করতে পারে না মঞ্জু।
    জল এসে যায় চোখের কোণে।
    ইমু অগত্যা সবাইকে হাঁক দেয়—
    — ব্যাটালিয়ন চলো কদম কদম বাড়ায়ে…

    প্রায় দু-কিমি রাস্তা। কিন্তু জমিয়ে দিল চূর্ণী। চুপচাপ মেয়েটি গাইতে লাগল গান—
    আমার দোসর কে জানে…
    তারপর চলল একের পর এক গান। কোরাসের ঢঙে।
    কী নেই সেখানে—হৃদমাঝারে রাখবো থেকে
    কদম কদম বাড়ায়ে যা—

    শেষ হল… জীবন ছাইড়্যা যেও না মোরে…

    অবশেষে মঞ্জু বলল, এবার জীবনের প্রবেশ পথে আসুন।

    *৬*

    কাঁসার কোণা উঁচু করা থালায় চূড়ো করে সাজানো মোটা লাল চালের ভাত। আলু মাখা, পোস্তর বড়া, কলমি শাক বেগুন ভাজা, লেবু আর কাঁচা লঙ্কা।
    দেখেই খিদেটা চাঙাড় দিয়ে উঠল। ইমুর ইচ্ছে হচ্ছিল হাত না ধুয়েই বসে পড়ে।
    মাটি থেকে তিন/চার ফুট উঁচু ইটের দেওয়াল। তার ওপর বাঁশের চটি। মাথায় টিনের ছাদ। অন্যরকম এক বাড়ি। ছেলে-মেয়েরা খুব খুশি।
    ইমু বিব্রত বোধ করছিল ১৩ জনের খাবার। মুখের কথা নয়।

    মঞ্জুর মায়ের বয়স বেশি নয় ৩৬-৩৭। বোঝা যায় ১৫-১৬ বছর বয়সেই মা হয়েছে। মঞ্জু বোধহয় এখন ২৩ হবে। মঞ্জুর বাবার বয়সও প্রায় তাই। রোগা শক্ত-সমর্থ সরল চেহারা। মঞ্জু মায়ের চোখ পেয়েছে। টানা টানা মায়াবী। মঞ্জুর সঙ্গে পরিবেশন করছিলেন। বিউলির ডাল আর মাছের চারাপোনা ভাজা আরও মৃগেল মাছের কালো জিরে দিয়ে ঝোল। অমৃত মনে হচ্ছিল। শেষে ঢুকলেন মঞ্জুর বাবা। সঙ্গে মঞ্জুর বোন বীণা কাঁসার বাটিতে উঁচু করা মাংসের সম্ভার।

    সবাই হাঁ হাঁ করে উঠল। কিন্তু কে কথা শোনে। মঞ্জু, মঞ্জুর বোন আর বীণা—তিন জনে সবার পাতে উপুড় করে দিয়েছে হাঁসের মাংসের বাটি। যাতে কেউ না বলতে পারে।
    শহরের লোকের মতো ‘দেবো দেবো’ করা নয়।


    ক্রমশঃ
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    জুলাই ২৭- ২০২৬ | অগাস্ট ৪, ২০২৬
  • ধারাবাহিক | ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ৪৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন