

বিজ্ঞানকে শুধু বইয়ের পাতায় আটকে রাখলে বিজ্ঞান শিক্ষা পূর্ণতা পায় না। বিজ্ঞানকে দেখতে হয়। ছুঁতে হয়। পরীক্ষা করতে হয়। প্রশ্ন করতে হয়। ভুল করতে হয়। আবার সেই ভুল থেকে শিখতে হয়। একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন এই অভিজ্ঞতাকে শিক্ষার কেন্দ্রে নিয়ে আসে, তখন বিজ্ঞান আর শুধু একটা বিষয় থাকে না। তা হয়ে ওঠে চিন্তার পদ্ধতি - যুক্তির অভ্যাস, অনুসন্ধানের আনন্দ। আসলে এসব তো বক্তৃতার কথা। গত চব্বিশে আগষ্ট এর অনবদ্য রূপায়ণ দেখলাম রাণীসাই বাণীপীঠ-এ গিয়ে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার রামনগর থানার অন্তর্গত মীরগোদার কাছে, ওড়িশা সীমান্তসংলগ্ন গ্রাম রাণীসাই। সেদিন এক অনাবিল মুগ্ধতা তৈরি হল ঐ স্কুলে গিয়ে। এ অভিজ্ঞতা শুধু আমার নয়, একই মুগ্ধতা ছিল রামনগর কলেজের রসায়নের কৃতী ছাত্রদরদী অধ্যাপক ড. সদানন্দ রঞ্জিত মশায়েরও। সেদিন আয়োজনের উপলক্ষ ছিল আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। কিন্তু এই অনুষ্ঠান নিছক একটা স্মরণসভা ছিল না। বিজ্ঞান সেমিনার, বিজ্ঞান প্রদর্শনী, এক্সপেরিমেন্টাল কুইজ, দীর্ঘ পর্যায় সারণি লেখার প্রতিযোগিতা—বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ওরা যেন দেখিয়ে দিল, বিজ্ঞানকে শেখানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ হল বিজ্ঞানকে করে শেখা।
বেশ কয়েক বছর পর গিয়েছিলাম সেখানে। তাই প্রত্যাশার সঙ্গে কিছু পুরোনো অভিজ্ঞতাও মনে ছিল। আমাদের চারপাশে এমন বহু স্কুল আছে, যেখানে বিজ্ঞান পরীক্ষাগার কার্যত অচল। কোথাও ল্যাবরেটরির দরজা দীর্ঘদিন বন্ধ। কোথাও যন্ত্রপাতি থাকলেও নিয়মিত ব্যবহার হয় না। ব্যবহারিক বিজ্ঞান শিক্ষা অনেক সময় পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সেই বাস্তবতার পটভূমিতে রাণীসাই বাণীপীঠ হাই স্কুলে পৌঁছে সম্পূর্ণ অন্য একটা ছবি দেখা সত্যিই বিস্ময়কর। সুযোগ্য প্রধান শিক্ষক জনাব সেক সফিউল রহমানের দক্ষ নেতৃত্বে পদার্থবিদ্যা বিভাগের ভুবন চন্দ্র মাইতি, প্রসেনজিৎ দাস, রসায়ন এর শক্তিনাথ পানি, রঞ্জন সাউ, হাবিবা খাতুন, গণিত এর আনন্দময় রানা, সুভাষচন্দ্র দে, সুমিত দাস এবং জীববিদ্যা বিভাগের বিদিশা প্রধান, এজাজুল মহম্মদ এর মতো একদল ছাত্রদরদী ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষক যে নিষ্ঠা, সৃজনশীলতা ও সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়ে বিজ্ঞানচর্চাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন, তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
এ বছরের অনুষ্ঠানের মূল আলোচ্য ছিল ‘আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়: একজন সম্পূর্ণ মানুষ’। বিষয়টা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে কেবল একজন রসায়নবিদ হিসেবে দেখলে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটা ছোট অংশই ধরা পড়ে। তিনি ছিলেন গবেষক, শিক্ষক, শিল্পোদ্যোগী, সমাজচিন্তক এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত এক অসাধারণ মানুষ। প্রফুল্লচন্দ্রের গবেষণা জীবনের বড় কাজ ছিল বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য উপর পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তার গুণাগুণ এবং তাতে মেশানো ভেজাল নির্দেশ করা। তাঁর জীবন দেখায়, বিজ্ঞানচর্চা কখনও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। জ্ঞান যদি মানুষের কাজে না আসে, তবে তার পূর্ণতা কোথায়?

এই ভাবনাই বিজ্ঞান প্রদর্শনীর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রফুল্লচন্দ্র রায় তাঁর গবেষণার প্রথম দিকের কাজের মধ্যে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের উপর পরীক্ষানিরীক্ষা করে তার গুণমান ও ভেজাল বের করার পদ্ধতি নির্দেশ করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক প্রসঙ্গকে সামনে রেখে শিক্ষকেরা বিজ্ঞান প্রদর্শনীকে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ছাত্রছাত্রীরা দেখিয়েছে, বিজ্ঞানের সহজ ধারণা ব্যবহার করে কীভাবে আমাদের চারপাশের নানা সমস্যাকে বোঝা যায় এবং সচেতন হওয়া যায়। খাদ্যে ভেজাল সনাক্তকরণ ছিল তারই এক গুরুত্বপূর্ণ দিক। দুধে ভেজাল, খাদ্যলবণে ভেজাল, পানীয়তে ভেজাল, মসলা ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যে ভেজালের সম্ভাবনা—এসব বিষয়কে ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষার মাধ্যমে তুলে ধরেছে। বাজারের রংবেরঙের পানীয়তে ব্যবহৃত কৃত্রিম রং ও রাসায়নিক উপাদান নিয়েও সচেতনতামূলক উপস্থাপনা ছিল। কোথাও শুধু চার্ট নয়। ছিল পরীক্ষা। ছিল পর্যবেক্ষণ ও ব্যাখ্যা। ফলে দর্শক শুধু তথ্য শোনেননি। বিষয়টা চোখের সামনে ঘটতে দেখেছেন। PET বোতলের পুনর্ব্যবহার, ধূমপান ও ক্যান্সারের সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন জীবনে রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহারের নানা দিক ছাত্রছাত্রীরা তুলে ধরেছে। বিজ্ঞানের পাঠ যে আমাদের খাদ্যাভ্যাস, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও দৈনন্দিন সিদ্ধান্তের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত—এই উপলব্ধি তৈরি করাই এই ধরনের কর্মকাণ্ডের বড় সাফল্য। মূলত সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীরা এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে। জীববিদ্যা ও রসায়নের আন্তঃসম্পর্ককে সামনে রেখে বেশ কিছু মডেলও ছিল। পদার্থবিদ্যার বিভিন্ন বিষয়ের মডেলও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে মডেলের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় ছিল ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের বক্তব্য। তারা কীভাবে বিষয়টা বুঝেছে, কীভাবে অন্যকে বোঝাচ্ছে এবং প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে কীভাবে উত্তর দিচ্ছে—সেখানেই এই উদ্যোগের প্রকৃত সাফল্য। বিশেষভাবে চোখে পড়েছে তাদের আত্মবিশ্বাস। মুখস্থ করা বক্তব্য আর নিজের হাতে করে শেখা জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য খুব স্পষ্ট। নিজের হাতে পরীক্ষা করার পরে একজন ছাত্র যখন তার ফলাফল ব্যাখ্যা করে, তখন তার কথায় স্বাভাবিক দৃঢ়তা আসে। প্রশ্ন করা হলে সে শুধু নির্দিষ্ট উত্তর খোঁজে না। নিজের পর্যবেক্ষণ থেকে যুক্তি তৈরি করার চেষ্টা করে। বিজ্ঞানমনস্কতার বীজ আসলে এখানেই।
এরপর অলোচনা হয় আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জীবন ও কাজ নিয়ে। তাঁর বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব, বিজ্ঞানচর্চা, সমাজভাবনা এবং ছাত্র তৈরির অসামান্য ক্ষমতা নিয়ে। তিনি যে বিপুল ছাত্রসম্পদ তৈরি করেছিলেন এবং সেই ছাত্ররা পরবর্তীকালে কীভাবে ভারতীয় বিজ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছিলেন, সেই প্রসঙ্গও উঠে আসে। অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল হাতে লেখা কয়েক পৃষ্ঠার একটা সংকলন। সেখানে প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ও স্মৃতিচারণ তুলে ধরা হয়েছিল। এই বয়সী ছাত্রছাত্রীদের হাতে এমন এক সংকলন তুলে দেওয়া নিছক স্মরণ নয় - ইতিহাসের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটানোর সুন্দর পদ্ধতি।

দুপুরে একটু বিরতির পর অনুষ্ঠান আবার অন্য মাত্রা পায়। অনুষ্ঠিত হয় এক অভিনব এক্সপেরিমেন্টাল কুইজ। এখানে কেবল প্রশ্ন করা হয়নি। প্রশ্নের ভিত্তি ছিল পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের বিভিন্ন পরীক্ষা। শিক্ষকরা কিছু পরীক্ষা করে দেখিয়েছেন। ছাত্রছাত্রীরাও নিজেদের পরীক্ষানির্ভর কাজ উপস্থাপন করেছে। তারপর সেই পরীক্ষার পর্যবেক্ষণ, কারণ ও ফলাফল নিয়ে বিভিন্ন দলকে প্রশ্ন করা হয়েছে। অর্থাৎ এখানে উত্তর দেওয়ার জন্য শুধু বইয়ের তথ্য জানা যথেষ্ট নয়। দেখতে জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং তারপর যুক্তি দিয়ে উত্তর দিতে হবে।
এই ধরনের উদ্যোগ গত প্রায় সাত বছর ধরে ওঁরা বিভিন্ন স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে করে আসছে। কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দু’বছর অবশ্য এই আয়োজন বন্ধ ছিল। তারপর আবার সেই ধারাবাহিকতা ফিরে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন এই ধরনের বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়, তখন সেটা আর বিচ্ছিন্ন কোনও অনুষ্ঠান থাকে না - ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
এই অনুষ্ঠানে রাণীসাই বাণীপীঠ হাই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী ছয়টা স্কুলের ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকারাও অংশগ্রহণ করেন। ফলে স্কুলের সীমানা পেরিয়ে একটা বৃহত্তর বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হয়। ছাত্রছাত্রীরা অন্য বিদ্যালয়ের সহপাঠীদের সঙ্গে নিজেদের কাজ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পায়। প্রতিযোগিতা থাকে। কিন্তু তার সঙ্গে থাকে শেখার সুযোগও। পরীক্ষামূলক কুইজের ফলাফলও ছিল আকর্ষণীয়। দীঘা বিদ্যাভবন প্রথম স্থান অধিকার করে। রাণীসাই বাণীপীঠ দ্বিতীয় এবং সাদী আর. এন. হাই স্কুল তৃতীয় স্থান অর্জন করে। কিন্তু এই ফলাফলের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল প্রতিযোগিতার ধরন। কারণ এখানে জয়-পরাজয়ের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীরা শিখেছে কীভাবে বৈজ্ঞানিক প্রশ্নকে পর্যবেক্ষণ করতে হয়, কীভাবে পরীক্ষার ফল থেকে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হয় এবং কীভাবে যুক্তি দিয়ে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
রাণীসাই বাণীপীঠ এর এই উদ্যোগ আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে করিয়ে দেয়। বিজ্ঞান শিক্ষা মানে শুধু পাঠ্যবই শেষ করা নয়। বিজ্ঞান শিক্ষা মানে প্রশ্ন করার অধিকার তৈরি করা। সন্দেহ করার সাহস তৈরি করা। নিজের চোখে দেখা এবং নিজের হাতে পরীক্ষা করার অভ্যাস তৈরি করা। আর এই কারণেই বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান প্রদর্শনী, পরীক্ষানির্ভর কুইজ বা সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডকে শুধুমাত্র ‘অনুষ্ঠান’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সুযোগ্য বিজ্ঞানশিক্ষকদের উদ্যম, বলিষ্ঠ ইচ্ছাশক্তি ও প্রয়াসে ‘অনুষ্ঠান’ হয়ে উঠেছিল বিজ্ঞানশিক্ষার এক বিকল্প শ্রেণীকক্ষ। এখানে ল্যাবরেটরি শুধু একটা ঘর নয়। বিদ্যালয়ের চারপাশের পৃথিবীটাই হয়ে ওঠে ল্যাবরেটরি। দুধ, নুন, মসলা, পানীয়, প্লাস্টিকের বোতল, স্বাস্থ্য, পরিবেশ—সবকিছুই হয়ে ওঠে বিজ্ঞানের বিষয়।

আজ যখন অনেক জায়গায় ব্যবহারিক বিজ্ঞান শিক্ষা নানা কারণে সংকুচিত হয়ে পড়ছে, তখন রাণীসাই বাণীপীঠ হাই স্কুলের এই উদ্যোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সীমিত সম্পদের মধ্যেও যদি শিক্ষকরা সৃজনশীল হন, ছাত্রছাত্রীদের হাতে কাজ তুলে দেন এবং বিজ্ঞানকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেন, তবে বিজ্ঞান শিক্ষা প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে। বড় ল্যাবরেটরি সবসময় দরকার হয় না। দরকার বৈজ্ঞানিক মনোভাব, শিক্ষকতার নিষ্ঠা এবং ছাত্রছাত্রীদের কৌতূহলকে সম্মান করার মানসিকতা। রাণীসাই বাণীপীঠ সেই কাজটা করে চলেছে। তাদের বিজ্ঞানচর্চার মূল শক্তি যন্ত্রপাতির জৌলুসে নয়। তার শক্তি মানুষে। শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীর যৌথ উদ্যোগে। প্রশ্ন ও পরীক্ষার সম্পর্কের মধ্যে। বইয়ের জ্ঞানের সঙ্গে বাস্তব জীবনের সংযোগে।
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জন্মবার্ষিকী পালনের এর চেয়ে সুন্দর উপায় আর কী হতে পারে? তাঁর স্মৃতিকে শুধু ফুল ও বক্তৃতায় স্মরণ না করে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অনুসন্ধান, যুক্তি ও মানুষের কল্যাণের সঙ্গে বিজ্ঞানকে যুক্ত করে দেখা—এটাই তাঁর বিজ্ঞানভাবনার প্রকৃত উত্তরাধিকার।
রাণীসাই বাণীপীঠ হাই স্কুলের এই পথচলা তাই শুধু ওদের সাফল্যের গল্প নয়। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাইলে একটা প্রজন্মের বিজ্ঞানভাবনাকে সঠিক রূপ দিতে পারে।
