সভ্যতার ইতিহাসে এ এক জটীল গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই বর্তমানে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে সবচেয়ে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা হিসেবে মেনে নিয়েছে; কারণ, অন্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার তুলনায় এ ব্যবস্থা নীতিগতভাবে জনগণের হাতে শাসনভারের ক্ষমতা ন্যস্ত করে। বিগত ৫০ বছরে গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়, জনগণ, গণতান্ত্রিক আধুনিক রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অধিকারী করেছে। এখন এই বিপুল সম্পদ দেশের নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যবহার করা যেতে পারে, বা তা মুষ্টিমেয় লোভী, ধনী ও ক্ষমতাবান মানুষের কুক্ষিগত হতে পারে। আর এটাই আমাদের সময়ের প্রকৃত সংঘর্ষ, যা বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতবর্ষে আমরা দেখছি।
সাধারণ মানুষের ভোটের মাধ্যমে নাগরিকরা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে, যারা তাদের স্বার্থে দেশ পরিচালনা করবে; খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও শোষণমুক্ত জীবন নিশ্চিত করবে। কিন্তু অল্প সংখ্যক লোভী, ধনী কর্পোরেট, রাষ্ট্র ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের সম্পদকে দখল করতে, ক্রমাগত নির্বাচিত প্রতিনিধি থেকে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দখল করে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের স্বার্থে ব্যাবহার করার চেষ্টা করে চলেছে। এর জন্য তারা কখনও অর্থ বিনিয়োগ করছে তাদের নিজেদের পোষা, রাজনৈতিক নেতা বা দলের জন্য। তাদের মনোনীত প্রার্থীকে জেতানোর জন্য বিভিন্ন বয়ান বা আখ্যান (narrative) নিয়ন্ত্রণ; আর ইদানীং প্রযুক্তি-চালিত গণমাধ্যম ও সামাজ মাধ্যমের ব্যবহার করছে। আবার কখনও তাদের লাভের আইন প্রণয়নের জন্য অন্য দলের নির্বাচিত প্রতিনিধি কিনছে।এই সময়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো বড় গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আমরা অতিলোভী, ধনীদের এই ক্ষমতা দখলের নানা চেহারা দেখছি।
ধর্ম, বর্ণ, জাতিসত্তা, অঞ্চল, ভাষা, শ্রেণি ও মতাদর্শের পার্থক্য যে কোন সমাজের স্বাভাবিক। এই পার্থক্যগুলো বৈধ এবং গণতান্ত্রিক জীবনেরই অংশ। কিন্তু যখন এই বিভাজনগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দেওয়া হয়, তখন সেই সামাজিক বিভাজনই জন সাধারনকে শাসন করার রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠে। মানুষে মানুষে ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ে, এবং এক ফলে, গণতন্ত্রের গভীরতর প্রশ্নরা—যেমন রাষ্ট্রের সম্পদের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে? প্রতিষ্ঠানগুলো কারা নিয়ন্ত্রণ করছে? সম্পদের সুফল কারা ভোগ করছে?—সেসবের উত্তর অধরাই থেকে যায়। বিপদটি আরও ঘনীভূত হয় যখন শক্তিশালী কর্পোরেট গোষ্ঠীগুলো কেবল নির্বাচিত সরকারকেই নয়, বরং অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকেও দখল করতে শুরু করে, এবং গণতন্ত্র হয়তো বাহ্যিকভাবে টিকে থাকে, কিন্তু এর মূল সত্তা বা প্রাণশক্তি ক্রমশ ভেঙ্গে পড়ে। এই সময়ের প্রযুক্তি এই লড়াইকে আরও জটিল করে তুলেছে। সামাজ মাধ্যম এবং অ্যালগরিদম-চালিত তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের ধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করছে, অপপ্রচার করে সামাজিক বিভাজনকে গভীর করছে এবং সত্য ও কৃত্রিমভাবে তৈরি বয়ানের মধ্যকার পার্থক্য মুছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এরই মধ্যে আশার আলো এই যে বিশ্বজুড়ে মানুষ ধীরে ধীরে এই উদ্বেগজনক বাস্তবতাটি উপলব্ধি করতে শুরু করেছে: সাধারণ মানুষ যখন তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন, তখন সম্পদ ও ক্ষমতা ক্রমশ মুষ্টিমেয় কিছু ধনীর হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে। মাত্র কয়েক বছর অন্তর ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার দ্বারা এই গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না। একে বজায় রাখা সম্ভব হবে যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত জনগণের জন্য ব্যবহার হবে এবং দেশের সম্পদের ব্যবহার জনগণের জবাবদিহির আওতায় থাকবে। তাই আমাদের সামনে প্রশ্ন কেবল এটা নয় যে, পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী হবে কে? বরং প্রশ্ন হলো, এই ব্যাবস্থা কি আদৌ ‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা পরিচালিত ও জনগণের জন্য নিবেদিত’—এই স্বরূপ বজায় রাখতে পারবে? সময়মতো যদি অল্প সংখ্যক লোভী, ধনীর হাতে দেশের সম্পদ ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধ করা না যায়, তবে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে, আমরা দেখবো যে, গণতন্ত্রের খোলস পড়ে ধনীর দালাল দেশ চালাচ্ছে।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।