একশীতের দিন,খুব তাড়াতাড়ি চলে যায়।
মানুষের জীবনগুলোও বোধহয় তেমনই, হুট করে যাওয়ার দিন এসে পড়ে।তখন হিসেব মেলানোর খাতাটা যদি খুলে বসি,বুঝতে পারি অনেক ভুল করেছি এতদিন।সেইসময় যদি কেউ বলে,"তোমাকে তিনটে বর দিলাম,যা ইচ্ছা চাও।
তাহলে সবাই বোধহয় একটা জিনিসই চাইবে,আবার শৈশবে ফিরে যেতে।সব ভুলগুলো শুধরে নিতে।
কিন্তু তাতে সেই ছোটবেলার ধোয়ামোছা মস্তিষ্কটাই নিয়ে যাবে।সেই এক ভুল বারবার করবে।
কেউ যদি একটু ভাবে,তারপর বলে,যে আমি এখনকার সমস্ত স্মৃতি,সমস্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে যেতে চাই,তবুও সে ভুল করবে।কারণ সে যে কাজটা করেছিল,তার ফল জানে,কিন্তু একই পরিস্থিতিতে আরো অগুনতি সিদ্ধান্ত থাকতে পারে,তার মধ্যে অগুনতি ভুল সিদ্ধান্ত থাকতে পারে।আবার সেই সিদ্ধান্তগুলো ঠিক বা ভুল,সেটা ব্যক্তির উপর নির্ভর করে।
তাই সে যাই করুক না কেন,আবার আফসোস নিয়েই ফিরে আসবে।
তাই সবকিছু ঠিক করার দরকার নেই,যতটা পারা যায়,ভুলে যাওয়া ভালো,কিছু মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়া ভালো।
এতকিছু বলছি,কারণ আমি মৃত্যুর দোরগোড়ায়।বেশিদিন নেই আমার হাতে,ডাক্তার বলে দিয়েছে,একে বাড়ি নিয়ে যান,যতদিন বাঁচে,নিজের লোকেদের মধ্যেই বাঁচুক।এমনিতেও আর কিছু করার নেই।
ওরা আমার ছেলেদের বলেছে,কিন্তু আমি শুনতে পেয়েছি সব,কিচ্ছু বলিনি।কী হবে বলে!
কিংবা মনে করুন,আমি আত্মহত্যা করতে চলেছি,আমার বয়স এখন আঠাশ,অথবা বত্রিশ।তাতে কী এসে যায়!
এটা আমার মৃত্যুপূর্ববর্তী অনুধাবন।আমার কৃতকর্মের জন্য,অতীতের জন্য আফসোস হচ্ছে।সেজন্য এত কথার অবতারণা।তেমন কিছুই যে করে ফেলেছি তা নয়,কিছু যে করতে পারতাম তাও নয়,আবার হতেও পারতাম।কিন্তু আমি প্রচণ্ড কুঁড়ে।আসলে এমন নয় যে আমি পরিশ্রম করি না,দিনে দশ কিলোমিটার সাইকেল চালাই,ঘণ্টা দুয়েক ব্যয়াম করি,ঘরের ছোট -বড় অনেক কাজ করি।কিন্তু নিজের চেনা চৌহদ্দির বাইরে একটুও যেতে ইচ্ছে করে না,দুদিন একটু বেশি কষ্ট করে নিয়ে বাকি জীবনটা নিশ্চিত,একটু সুরক্ষিত করে নেব;চাইলেও পারি না।
আমি যে এখন মরতে চলেছি,না মরলেও কিছু এসে যায় না,আবার মরলেও তেমন কিছু সমস্যা নেই।কিন্তু কেন জানি না,মরতে খুব ইচ্ছে করছে।
আমি চাইলেই এখন গলা থেকে দড়ির ফাঁসটা খুলে হাসিমুখে বাজার করতে যেতে পারি,আমি চাইলেই এখন বসার ঘরে গিয়ে বসে চেঁচিয়ে বলতে পারি,"রুবিনা,এক কাপ চা দাও তো?"
তারপর চা এলে চরম পরিতৃপ্তিতে চুমুক দিতে দিতে,শুভেন্দু ভালো নাকি মমতা ভালো সেই নিয়ে তুমুল তর্ক করতে পারি।
আবার রাস্তার ধারে যে মোক্ষম গাড়ি আর মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছি,সেটা ছেড়ে দিয়ে গিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারি।
আমি পুরোপুরি নিঃস্পৃহ,একটুও কোনো হঠকারিতা নেই,উত্তেজনা নেই একটুও।আমি নির্বিকার।
কিন্তু তবু ফিরে যাব না।
এটা এক অদ্ভুত অবস্থা।আমি চাইলেও বোঝাতে পারব না,তোমরা বুঝতে পারবে না।বলবে,"কী পাগলের মতো কথা!"
এই যে এটি গাড়ি যাচ্ছে,এদের মধ্যে যেকোনো একটা আমার মৃত্যুর কারণ হতে পারে।তাই কি?
এরা জানেও না,আমার একটা সিদ্ধান্ত এদের মধ্যে যেকোনো একজন,বা কয়েকজনের জীবনের পরবর্তী কয়েকটা ঘণ্টা,দিন,মাস,বছর বা সারা জীবনটাই পাল্টে দিতে পারে এক মুহূর্তে?
নিজেকে ঈশ্বর মনে হচ্ছিল,ভাগ্যবিধাতা।
কিন্তু এখন ওসবের কিছু মানে হয় না,এগুলোর কোনোটাই আমাকে জীবনের প্রলোভন দেখাতে পারে না।
প্রলোভনই বা কেন বলছি?আমি নির্লিপ্ত,পুরো পাথরের মতো,পাহাড়ের মতো বা পর্বত।
আমি যদি টুল থেকে ঝপ করে ঝাঁপ দিই,আমার গলায় দড়ির ফাঁসটা চরম আলিঙ্গন করবে।মাথায় রক্তচলাচল বন্ধ হয়ে যাবে,শ্বাসনালী রুদ্ধ হবে।আমার শরীর একফোঁটা অক্সিজেনের জন্য ছটফট করবে।
আমি একটা রিলে শুনেছিলাম,অক্সিজেন আসলে আমাদেরকে ভেতর থেকে ধীরে ধীরে রান্না করছে।যেদিন রান্না সম্পূর্ণ হবে,সেদিন ঝুপ করে মরে যাব।
অপঘাত মৃত্যু সেই রান্নার মাঝখানে হাঁড়িটা নামিয়ে নেয়।
দুই
আমার আব্বু যেদিন এরকম রান্না হতো,আম্মাকে খুব মারত।মেরে মেরে অজ্ঞান করে ফেলত।তারপরেও মারতে থাকত।আব্বুর খুব রাগ।কোনো কোনো দিন এত মারার পরেও রাগ না কমলে আমাকে মারত।মাঝে মাঝে তাতেও রাগ কমত না,তখন ভাইকে মেরে রাগ কমাতে হতো।
কিন্তু আমার তাতে কোনোদিন রাগ হয়নি।তাই আমিও রাগ করিনি।আব্বুকে ভয় করতাম,ভালোবাসতাম।মারুক,পিটুক যাই করুক,আব্বু তো! -আম্মা বলত।
আম্মা খুব মানত আব্বুকে।বাইরে থেকে এলেই পানি দিত, পাখা করত।কিন্তু আব্বু বাইরে কী কাজ করত জানি না।মামারা টাকা দিত,চাল দিত, তেল-মশলা দিত।আম্মার মাঝে মাঝে মার খেয়ে শরীর খারাপ হলে মামারা নিয়ে যেত,চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হলে আবার মার খাওয়ার জন্য ফিরিয়ে দিয়ে যেত।
তারপর একদিন আব্বু খুব বেশি রেগে গেল,সেদিন একটা লোহার রড দিয়ে আম্মাকে মারল।আম্মা প্রথম কয়েক ঘা খেয়ে "মাগো মাগো " বলে চিৎকার করে উঠলে,আব্বু রাগে মাথায় আর এক ঘা দিল।
আব্বু আম্মাকে চিনত,কীভাবে শাসনে রাখতে হয় জানত।আম্মা মার খেয়ে আর একটা কথাও বলল না।অনেকক্ষণ হয়ে গেল,তবুও না।আব্বু মাথায় হাত দিয়ে বসেছিল।তারপর কাঁদতে আরম্ভ করল।আম্মাকে খুব ভালোবাসত আব্বু।
সেই কান্না শুনে সবাই এল।বলল,আম্মা নাকি মরে গেছে।আমি মরা মানে কী জানতাম না।
কিন্তু যদি এরকম ভাতের মতো ব্যাপার হয়,তারমানে যত মানুষ অপঘাতে মরে,সব শালা কাঁচা।
আমার আম্মা কাঁচাই মরে গিয়েছিল।
তিন
আমার মরাটা কি খুব প্রয়োজন!
এটা বেশ আশ্চর্য প্রশ্ন লাগতে পারে,মনে হতে পারে আমি এই তো ঠিক এর উল্টোটাই বলছিলাম।
আমি না মরলেও কিছু এসে যায় না,কারণ এরকমভাবে যে বেঁচে আছি,এটাকে কি বাঁচা বলে?
আমরা তৃতীয় বিশ্বের দেশ,সমস্ত দিক দিয়েই থার্ড ক্লাস।আমরা মানুষ হিসেবে থার্ড ক্লাস,আমাদের নীতি-নৈতিকতা থার্ড ক্লাস,আমাদের রোজগার,জীবনযাত্রা,পোশাক পরিচ্ছদ,কথাবার্তা,আচার আচরণ,শিল্প সংস্কৃতি সব থার্ড ক্লাস।
আমাদের রাজনৈতিক চেতনা নেই,জীবনের দাম নেই,শিক্ষা নেই,স্বাস্থ্যব্যবস্থা জঘন্য,একজন নিরীহ মানুষকে মারলে বাকি সবাই দাঁড়িয়ে উল্লাস করি,আর সে যদি সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করে,বা সত্য কথা বলে,বা শাসকদলের বিরোধিতা করে,তাহলে তো কথাই নেই।
কয়েকজন তেড়ে আসবে,আমাদের অতীতে এই ছিল,সেই ছিল।কিন্তু ওসব যে কিচ্ছু কাজে আসে না, তা নিয়ে সবাই ওয়াকিবহাল।কেউ কেউ আছে যারা জানে, মানে,কিন্তু বলতে ভয় পায়।আর একদল আছে,যারা জানে,কিন্তু মানতে চায় না।
এই রে,জ্ঞান দিতে আরম্ভ করলাম।
যাই হোক,আমি ভাবলাম আজকে আত্মহত্যা করার দরকার নেই,গরম লাগছে খুব।আসলে আমার একটু বদ অভ্যাস হয়েছে কিছুদিন।বড়লোক কিছু খদ্দের আছে আমার,তাদের বাড়িতেই সারাদিন কাটে তো,তাই বাইরের এই গরম আর সহ্য হয় না।
বরং একদিন একটু বাদলা হোক,সেদিন নাহয় মরা যাবে।এমনিতেও খুব দেরি হবে তা তো নয়!
চার
রুচিরা কথা বলছে না কয়েকদিন।ফোন করে করে সারা,একবারও ধরেনি।হোয়াটসঅ্যাপে আর এসএমএসে কম করে হাজার খানেক মেসেজ করেছি, তা দেখেওনি।ভিখিরির মতো ভালোবাসা ভিক্ষা করেছি,কিন্তু না,কিচ্ছু নেই।ভালোবাসা চটে গেছে।হয়,হয়, এরকম হয়,চোখের মায়াকাজল মুছে গেলে বাস্তব চোখের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে,ঠিক কয়েকরাত জাগা অবস্থায় যদি অনেকক্ষণ অন্ধকারে থাকা হয়,তার পর হঠাৎ আলোতে এলে যেমন চোখ জ্বালা করে,ঠিক তেমনই জ্বালা করে উঠে চোখ।নিজের কৃতকর্মের জন্য নিজের উপর ঘৃণা হয়।
ব্লক কেন করেনি সেটাই আশ্চর্য।
অবশ্য আমিও যে খুব ভালো আচরণ করেছি তা তো নয়!
আসলে আমি ভালো করে কথা বলতে পারি না।তার মানে এটা মোটেই নয়,যে আমি কথা বলতে পারি না!সাজিয়ে গুছিয়ে চিত্তাকর্ষক উপায়ে বলতে পারিনি। তারানাথ কীভাবে হওয়া যায়?তার জন্য কি কোনো ট্রেনিং হয়।চরম মজার কথাকেও জঘন্যতম উপায়ে বলি।তাছাড়া আমি খুব একটা ভালো শ্রোতা নই।তাছাড়া খুব দুর্বিনীত, ইনসিকিওর একখানা মাল। ধৈর্য্যের সাথে আমার কস্মিনকালেও কোনো সম্পর্ক ছিল না।
বেশি ভালোবেসে ফেলেছিলাম,তাই একটু উপেক্ষাও সহ্য হত না,বেশি প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলতাম।আর ও ছিল চরম সংবেদনশীল।ফলে যা হয় আর কি!
তবুও আমার সাথে কথা বলছিল,সুযোগ দিয়েছিল,কিন্তু আমি পাল্টাতে পারিনি।
অবশ্য কিছু বলে ফেলার বা প্রতিক্রিয়া দেখানোর পর খুব খারাপ লাগত,নিজেকে জানোয়ার মনে হত,ক্ষমা চাইতাম।কিন্তু তখন যা হওয়ার হয় গেছে।একটু একটু করে ক্ষয়ে শেষে কখন শুধু সম্পর্কের কঙ্কালখানা পড়েছিল,জানতেও পারিনি।তার উপরেও প্রহার করে গেছি।তারপর একদিন সেই কঙ্কালের খোলসটাও গেল ফেটে।
তখন আর তার আগেও কয়েকবার মনে হয়েছে এই নশ্বর শরীরটাকে শেষ করে দিই।কিন্তু তাতে ও নিজেকে দোষী মনে করত,বা অন্যেরা জানতে পারলে ওকে দোষ দিত।আমি সেটা চাইনি।
কয়েকদিন যোগাযোগ বন্ধ রাখলে তারপর যদি আত্মহত্যাটা করা যায়,তাহলে ওর উপর আর কোনো দোষ আসবে না।সেই কদিনটা আসলে কয়েক বছর।
নিজের সমস্যা নিয়ে বড্ড ভাঁটাচ্ছি।আপনারা তো গল্প শুনতে বা পড়তে এসেছেন,এসব ফালতু ব্যক্তিগত সমস্যা কেন শুনবেন!
একটা গল্পই বলি তাহলে!কিন্তু আমি গল্প ভালো বলতে পারি না।ওই যে বললাম না!
একটা ছোট ছেলের জন্ম হল,তার একটা না,একটা বাবা,যেমন হয়।
তার বাবা নিজেকে বিশাল বড় হিরো মনে করে,ভাবে পুরুষ হিসেবে সে বাচ্চার জন্ম দিয়েছে,তার দায়িত্ব শেষ।ছেলে মানুষ করবে মা।
সে নিজের জগৎ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।আর মা,সেও নিজেকে ধর্মপরায়ণা,পতিব্রতা স্ত্রী হিসেবেই ভেবে এসেছে জ্ঞান হওয়া ইস্তক,তাই সে মেনে নিল এই ব্যবস্থা।তার স্বামী তাকে মারধর করত না,কিন্তু তার প্রচণ্ড রাগ।রাগে গালাগালি করত অকথ্য,অশ্রাব্য ভাষায়। মারতেও যে পারে সেই আশঙ্কাও ছিল।তাই সেও বেশিদূর এগোয়নি,প্রতিবাদ করেনি।
তো ছেলেটা বড় হতে লাগল।তার চোখে অনেক স্বপ্ন।পড়াশোনায় ভালো,বই পড়তে ভালোবাসে,মায়ের কাছে গল্প শুনে।তার মনে হয় বড় হয়ে বিপ্লবী হবে। বাঘাযতীনের মতো।যে ছোটবেলায় একাই একটা বাঘের সাথে লড়াই করেছিল।তারপর যখন সে(বাঘাযতীন) বড় হল,সে বিপ্লবী হল।জার্মানি থেকে আসা বন্দুকের চালান নিতে গিয়ে ব্রিটিশদের সাথে লড়াইয়ে শহীদ হল।
কিন্তু সেই ছোট ছেলেটা এই কথাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারত না।যে অত ছোট হয়ে একটা বাঘকে মারতে পারল,সে বড় হয়ে কয়েকটা ইংরেজকে মারতে পারল না!
সে বারবার মাকে জিজ্ঞেস করত,"বাঘাযতীন সত্যি মরে গিয়েছিল!"
মা প্রতিবার একই উত্তর দিত।তবু ছেলেটির মনে হত,মা বোধহয় ভুল বলছে।মিথ্যা নয়,ভুল।যেমন হয় না, মা নুন আন বলতে গিয়ে চিনি আন বলে দেয়;সেরকম।
কিন্তু মা প্রতিবারেই বাঘাযতীনকে মেরেই ফেলতেন।তখন তার মনে হত,বড় হয়ে এর উত্তর খুঁজতে হবে,অনেক বই পড়তে হবে।সেখানে নিশ্চয় লেখা থাকবে বাঘাযতীন মরেননি।
তারপর সূর্য সেন,প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার,ক্ষুদিরাম বসু এদের গল্প শুনতে।মনে হত বড় হয়ে এদের মতো হতে হবে।
কিন্তু তারপর জানতে পারল,ইংরেজরা আর এদেশে নেই।খুব দুঃখ হল,কী হবে তাহলে!কাদের সাথে লড়াই করবে!
পড়াশোনা চলতে থাকল,কিন্তু সমস্যা হল,ভালো হলেও খুব ভালো আর হয়ে ওঠা হল না।
একদিন তার স্কুলের সামনে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হল।একটা ছেলে তার হাত ধরে রাস্তা পার হচ্ছিল,একটা লরি এসে ধাক্কা মারল,অন্য ছেলেটা ছিটকে গিয়ে পড়ল প্রায় দশ হাত দূরে।গাড়িটা এত গতিতে যাচ্ছিল,যে ব্রেক মেরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ছেলেটার মাথা আর বুক পিষে দিল।
তার কিছু হয়নি,কারণ সে লরিটা দেখতে পেয়ে একটু আগেই পিছিয়ে এসেছিল।কিন্তু ওকে টানতে পারেনি।সেটা করার কথা মাথায় আসেনি,বা প্রতিবর্ত ক্রিয়ার কারণে - যেটাই হোক না কেন,সে ভেবে পায় না কারণ কী ছিল।
তবে তার নিজেকে দোষী মনে হয়।ঘটনাটা আজ থেকে বাইশ বছর আগের।কিন্তু এখনও তার ছেলেটার মুখটা মনে পড়ে,সে এখনো তার প্রতিটি কথা স্পষ্ট মনে করতে পারে।
তার মাঝে মাঝে মনে হয়,যদি ওকে টেনে সরিয়ে আমি লরির সামনে পড়তাম!
পরক্ষণেই মনে হয়,সেও একই মনোকষ্টে ভুগত।তার থেকে যা হয়েছে সেটাই সবচেয়ে ভালো।
কিন্তু তাও মনে পড়ে,নিজেকে দোষী মনে হয়,তারপর তার সমাধান মনে পড়ে,যুক্তি দিয়ে বোঝায়।চক্র চলতে থাকে।
প্রায়ই তাকে দেখে সে।তখন ভাবত,ভুলতে পারেনি,তাই আসে।প্রতিশোধের কথা কখনও মনে হয়নি।
তাছাড়া যখন সবকিছু ঠিকঠাক চলে তখন এসব কিছু মনে হয় না।কিন্তু যখন প্রতিকূল সময় চলে,মনে হয় সবকিছুই অন্যায় করে এসেছে এতদিন,সব দোষ তার।
পাঁচ
মাথায় এখন আম্মা,রুচিরা,আরমান(সেই বাচ্চা ছেলেটা),আব্বু(সেও ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মরেছিল।লোকে বলে,আম্মা নাকি ঠেলে ফেলে দিয়েছিল।) সবাই বৈঠক করে।প্রতিদিন,রাত্রে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে ওরা খুব হট্টগোল করছে।এ ওকে দোষ দিচ্ছে।সব শেষে ওদের মনে পড়ে,একজন আছে,যে ওদের মধ্যে নেই,কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে অন্যায়ভাবে সব দেখছে,শুনছে।
এরকম তো হতে পারে না!
ওরা সবাই মিলে ছুটে আসে আমার দিকে।বলা ভালো আমার গলা লক্ষ্য করে।
যদিও সবার প্রিয় দেহাংশ আলাদা।যেমন আব্বু পছন্দ করে মাথার পেছনের অংশ,আরমান পুরো মাথা আর বুক পিষে দিতে চায়,রুচিরা আমার বুক চিরে হৃদপিন্ডটা বের করে নিবে,আম্মা গলা টিপে বা ছুরি দিয়ে ফালাফালা করে দিতে চায়।
আর ওরা সবাই যে আমার গলা লক্ষ্য করে ছুটে আসছে,ওটা আম্মার সিদ্ধান্ত।আম্মা এখানে সর্বংসহা ছিল, অধোবদনে সব মেনে নিত,কিন্তু ওখানে গিয়ে সে এসবের অসারতা বুঝেছে।এখন আর গোবেচারাটি নেই।অতি দম্ভের সাথে হুকুম করে,কেউ ফেলতে পারে না।
পরের দিন চারিদিকে একটা হুলস্থূল পড়ে গেল।
আম্মা বলল,"চলো,একটা বৈঠক করি।"
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।