এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আলুথালু চিন্তাভাবনা: স্তানিসোয়াভ ইয়েজি লেস; ভূমিকা, অনুবাদ, ভাষ্য: অরিত্র আহমেদ 

    Aritra Ahamed লেখকের গ্রাহক হোন
    ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ৮৫ বার পঠিত
  • আলুথালু চিন্তাভাবনা: একটি ভূমিকা

    দস্তয়েভস্কি’র গল্প আমরা সবাই জানি। সেই যে তিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলেন যুবক বয়সে, ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড়ালেন। কিন্তু সৈন্যরা বন্দুকের ট্রিগারে চাপ দেওয়ার আগেই ঘোষণা আসলো যে, মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করা হয়েছে। অর্থাৎ মৃত্যুকে খুব কাছে গিয়ে, মৃত্যুকে খুব ভালোমতো চেখে দেখা সত্ত্বেও সেবারের মতো মৃত্যুর স্বাদ পাওয়া লাগেনি দস্তয়েভস্কির। বলাই বাহুল্য, এই বিস্ময়কর ঘটনা তাঁকে সারা জীবন তাড়া করে বেড়িয়েছে। দস্তয়েভস্কি হয়তো দস্তয়েভস্কিই হতেন না, যদি এই বিশেষ ঘটনাটি না ঘটতো।

    ঠিক এইরকমই মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছিলেন আরো একজন লেখক। তার গল্পটা আরো নাটকীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে তখন। জার্মান কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী এক পোলিশ যুবক দ্বিতীয় বারের মতো পালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়লো। ফলাফল: মৃত্যুদণ্ড। যুবকটির হাতে একটি ব্যালচা দিয়ে বলা হলো কবর খুঁড়তে। কবরটা তার নিজের জন্যই। মৃত্যুর পর জার্মানরা তাকে ওখানেই পুঁতে ফেলবে। তার কবর খোঁড়া তত্ত্বাবধানের জন্য একজন গার্ড নিয়োগ করা হলো সেখানে। কিন্তু হাতে লোহার ব্যালচা পেয়ে যুবক তখন এক মওকা পেয়ে গেছে। বাঁচার মওকা। সম্ভবত শেষ মওকা। সুযোগ বুঝে ব্যালচার বাড়িতেই গার্ডকে খুন করলো যুবকটি। তারপর গেলো পালিয়ে। যুবকটির নাম: স্তানিসোয়াভ ইয়েজি লেস। জীবনের এই চরম অভিজ্ঞতা স্মরণ করে যুবকটি পরবর্তীকালে একটা কবিতায় লিখেছিলো:
    যে নিজের হাতে নিজের কবর খুঁড়েছে, সে খুব মনোযোগ দিয়ে গোরখোদকদের কবর খোঁড়া দেখে। অবশ্য খুব একটা নীতিবাগীশ সে হয় না এ ব্যাপারে: কারণ সে জানে, এই গোরখোদকেরা কবর খুঁড়ছে অন্যের জন্য। নিজের জন্য নয়।
    বাঙলা ভাষাভাষী পাঠকের কাছে যুবকের নামটা একটু অদ্ভুত ঠেকবে। এর একটা কারণ সম্ভবত এই যে, বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার সুবাদে ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, স্প্যানিশ, কিংবা ইতালীয় নাম ও পদবির সঙ্গে আমাদের কমবেশি পরিচয় আছে। হুট করে নতুন একটা ফরাসি কিংবা ইংরেজি নাম শুনলে আমাদের কানে সেটা অতোটাও অদ্ভুত শোনায় না। কিন্তু মধ্য ইউরোপ কিংবা পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কারণ ওই এলাকার সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের যে যোগাযোগ, তাকে কোনোভাবেই যথেষ্ট বলা যায় না। ভাষাগত দুর্বোধ্যতারও একটা ব্যাপার আছে। পূর্ব ও মধ্য ইউরোপের বেশির ভাগ ভাষাই, অন্তত আমাদের কানে, বেশ খটোমটো ও দুর্বোধ্য।

    সে যাই হোক। যাঁর ‘আলুথালু চিন্তাভাবনা’-র সংকলন এই বই, তিনিই সেই মৃত্যুর পেটের ভিতর থেকে ঘুরে আসা যুবক, যার নাম: স্তানিসোয়াভ ইয়েজি লেস। পোল্যান্ডের এই বিখ্যাত কবি, ব্যঙ্গকার ও প্রবচনকারের জন্ম ১৯০৯ সালের ৬ মার্চ, তৎকালীন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের লেমবার্গ শহরে (বর্তমানে লুভিউ নামে পরিচিত এই শহরটি ইউক্রেনের মানচিত্রের অন্তর্ভুক্ত)। লেসের বাবা-মা উভয়েই ইহুদি ধর্ম ছেড়ে প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একদম গোড়ার দিকে তারা ভিয়েনায় আসেন। লেসের প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয় সেখানেই। যুদ্ধ শেষে তারা আবার লুভিউ শহরে ফিরে যান এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। লুভিউয়ের ইয়ান কাজিমির বিশ্ববিদ্যালয়ে পোলিশ ভাষা ও আইনশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করেন লেস।

    লেস তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন এমন এক যুগে এবং এমন এক প্রতিবেশে, যেখানে চাইলেও রাজনীতির ডামাডোল থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা যায় না, বরং নিজের অজান্তেই এক তীব্র রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে ওঠে মানুষের ভেতরে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন চলছে, তখন লেস নিতান্তই বালক; যুদ্ধের কার্যকারণ বোঝার মতো বোধবুদ্ধি তখনো তার হয়নি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে লেস সাক্ষী হলেন অনেক ইতিহাসের। তাঁর চোখের সামনেই পতন হলো অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ লাগলো পোল্যান্ডের, তার কিছুদিন পরেই পোল্যান্ডের সঙ্গে যুদ্ধ বাঁধলো সোভিয়েত ইউনিয়নের। ক্রমাগত যুদ্ধ আর ডামাডোলের মধ্যে একটা বালকের যুবক হয়ে ওঠা কোনো সুখকর অভিজ্ঞতা নয়, ফলে কৈশোরের এইসব ঘটনা সুনিশ্চিতভাবেই লেসের মানস-গঠনে খুব গভীর প্রভাব রেখেছে।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় লেস লেখালেখি শুরু করেন। যতোদূর জানা যায়, সাহিত্যজগতে তাঁর প্রবেশ ঘটে ১৯২৯ সালে। এরপর থেকে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য-পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। ফলাফল: লুভিউ শহর ছেড়ে ওয়ারশ-তে চলে যেতে বাধ্য হন লেস। ওয়ারশ-তে আসার পর দু’টো জিনিস ঘটে- একদিকে লেখক হিসেবে লেস ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন, অন্য দিকে জড়িয়ে পড়েন বেআইনি সাম্যবাদী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে। ঠিক এইরকম একটা অবস্থায় শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লেসের ভূমিকা নিয়ে, বিশেষ করে তাঁর সোভিয়েত-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে, কিছু বিতর্ক আছে। যুদ্ধের শুরুতে লেস ওয়ারশ ছেড়ে তাঁর জন্মভূমি লুভিউ-তে চলে যান। ১৯৪১ সাল পর্যন্ত সেখানেই তিনি অতিবাহিত করেন। ইত্যবসরে সোভিয়েত ইউনিয়ন পোল্যান্ডের একাংশ দখল করে নেয় এবং সেখানে নিপী্ড়ন চালাতে থাকে। লেস আগে থেকেই সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন; রাজার সঙ্গে রাজার লড়াইয়ের এই বিভীষিকাময় সময়ে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষাবলম্বন করেন। এমনকি স্ট্যালিনের প্রশংসা করে কবিতাও লেখেন। এ-ও জানা যায় যে, ১৯৩৯ সালের নভেম্বর মাসে পোল্যান্ডে সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলদারিত্ব বজায় রাখার পক্ষে এক দলিলে স্বাক্ষর করেন লেস। তবে আসলেই তিনি সোভিয়েত দখলদারিত্বের পক্ষে ছিলেন কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। যাই হোক, ১৯৪১ সালে নাৎসী বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করার পর লেস জার্মানদের হাতে গ্রেফতার হন। জার্মানদের হাত থেকে তার বেঁচে যাওয়ার গল্প আমরা আগেই শুনেছি। পালানোর পর পোল্যান্ডের কমিউনিস্ট গ্রুপগুলোর সঙ্গে তিনি জার্মানদের বিরুদ্ধে মুক্তির যুদ্ধে শামিল হন।

    যুদ্ধ শেষ হলেও লেসের জীবনের নাটকীয়তা তখনো শেষ হয়ে যায়নি। যুবক বয়স থেকে তিনি সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পুরোটা সময় তিনি সাম্যবাদের পক্ষেই লেখালেখি করেছেন, এমনকি যুদ্ধও করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কমিউনিস্ট পার্টি যখন পোল্যান্ডের শাসনভার গ্রহণ করলো, তখন পোল্যান্ডে থাকতে তার আর ভালো লাগলো না৷ বোধ হয়, কমিউনিজমের উপর থেকেই তার আস্থা উঠে গেলো অনেকটা। শান্তিতে থাকার জন্য বউ-বাচ্চা নিয়ে চলে গেলেন ইসরাইলে। কিন্তু সেইখানেও মানিয়ে নিতে পারলেন না। ফলে দু'বছর বাদেই পুত্রকে নিয়ে ফিরে এলেন পোল্যান্ডে, বিশ্বযুদ্ধের সময় যে শহরে আত্মগোপন করেছিলেন, সেই শহরেই আশ্রয় নিলেন পুনরায়। স্ত্রী-কন্যা পড়ে রইলো ইসরাইলেই। এই যে, বারংবার মোহভঙ্গ, ঘরহীনতা, আর কোনোখানেই মানিয়ে-নিতে-না-পারা- মধ্য ইউরোপের আরো অনেক লেখক-দার্শনিকের মতো লেসকেও সারাজীবন তাড়িত করেছে এই সমস্ত অনুভূতি।

    পোল্যান্ডে ফিরে আসার পর লেস পুনর্বিবাহ করেন এবং পুনরায় শুরু করেন লেখালেখি শুরু। কিন্তু সরকারের সঙ্গে বনিবনা না থাকার কারণে, এবং লেখায় কমিউনিজম-বিরোধী উপাদান থাকার কারণে, পঞ্চাশের দশকের প্রায় পুরোটা সময় জুড়ে লেস তার লেখালেখি প্রকাশ করার ক্ষেত্রে সরকারি নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন হন। পঞ্চাশের দশকের শেষের দিকে লেস তার অধিকার ফিরে পান, এবং তাঁর রচনাবলী, বিশেষ করে তার প্রবচনগুলোর মাধ্যমে পোল্যান্ডে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর স্মরণীয়তম রচনা, ‘The Unkempt Thoughts', বাঙলায় আমরা যাকে বলছি ‘আলুথালু চিন্তাভাবনা’, প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সালে। ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রবচনের আরো একটি সংকলন, ‘More Unkempt Thoughts'। ১৯৬৬ সালের ৭ মে লেস মৃত্যুবরণ করেন।

    লেসের রচনাসম্ভারের একটা বড়ো অংশ জুড়ে রয়েছে কবিতা। লেখক-জীবনের প্রথম দিকে লেস কবিতাই লিখতেন মূলত। কিন্তু লেস স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর প্রবচনগুলোর জন্য। একটি বা কয়েকটি বাক্যে সমাপ্ত ছোটো ছোটো প্রবচন; প্রথম দৃষ্টিতে অনেকের মনে হবে কোনো নীতিকথার সংকলন হয়তোবা। তাহলে কী আছে এই প্রবচনগুলোতে যার জন্য মানুষ সেগুলো আর ভুলতে পারলো না? উত্তরে অনেক কথাই বলা যায়। প্রথমত, লেস হচ্ছেন বিশ শতকের মানুষ। আশা আর নিরাশায়, স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গে, বিপ্লব আর প্রতিবিপ্লবে ভরপুর বিশ শতক! মানবজাতির ইতিহাসে এর চেয়ে বেশি রক্তাক্ত ও যুদ্ধক্লান্ত শতক আর এসেছে কিনা সন্দেহ। দু’টি বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে এই শতকে। মারা গেছে কোটি কোটি মানুষ। রক্তাক্ত হয়েছে ইউরোপসহ অন্যান্য মহাদেশ৷ পারমাণবিক বোমার আবিষ্কারের ফলে চোখের পলকে মানবসভ্যতার ধ্বংস ও মানবজাতির বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। শুধু তাই নয়। সমাজতন্ত্র কিংবা গণতন্ত্রের মতো যে সমস্ত মতবাদ মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করবে বলে ধরে নেওয়া হয়েছিলো, সেই মতবাদগুলোকেও মানুষ ধীরে ধীরে রক্তখেকো হয়ে উঠতে দেখেছে। মানুষের মুক্তির হাতিয়ারগুলো পরিণত হয়েছে ক্রমবর্ধমান শোষণের হাতিয়ারে। মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে ধর্মের প্রভাব কমেছে ক্রমাগত; ধর্মের শূন্যস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেছে রাষ্ট্র ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ভাবাদর্শ। একের পর এক মোহভঙ্গের ফলে সংবেদনশীল মানুষেরা আর নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস পাননি। অনেকে হতাশ হয়েছেন। সেই হতাশা প্রকাশ করেছেন কোনোরকম আবরণ ছাড়াই। নিরাশ হয়ে অনেকে ধর্মের কোলে ফিরে যেতে চেয়েছেন। অনেকেই আবার হতাশা থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় নিয়েছেন কৌতুকের। স্তানিসোয়াভ ইয়েজি লেস এই তৃতীয় গোত্রেরই একজন নামজাদা প্রতিনিধি, ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে যিনি লেখেন,
    ‘ক্যালেন্ডারটা কি এমন কোনোভাবে ঢেলে সাজানো সম্ভব, যাতে বিশ শতকে আমাদের বাস করা না লাগে?

    যা কিছু একদা মানুষকে মুক্তি দিতে চেয়েছিলো, লেস তাকে তার ব্যঙ্গ ও কৌতুকের লক্ষ্যে পরিণত করেছেন। ঈশ্বর, ধর্ম, রাজনীতি, নৈতিকতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, প্রগতি- কোনো কিছুই লেসের আক্রমণ থেকে মুক্তি পায়নি। এমনকি মানুষ যে মানুষের ভালো চায়, মানুষের ভেতরেও যে এক শুভ ইচ্ছার অস্তিত্ব আছে- এটাও বোধ হয় লেস বিশ্বাস করতেন না (অনেক মানবদরদীই প্রকৃত প্রস্তাবে মানুষের উপর আস্থা রাখেন না)। যে সমস্ত অশুভ আজ আমাদের চারপাশে, সারা বিশ্ব জুড়ে, রাজত্ব করছে, লেসের প্রবচনগুলোতে আমরা দেখা পাবো সেই সমস্ত অশুভের। আধুনিক মানুষের আশাভঙ্গের বেদনা লেসের প্রবচনগুলোকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। তাই পাঠকদের প্রতি অনুরোধ থাকবে লেসের প্রবচনগুলোকে বিশ শতকের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করে দেখার। তাতে লাভ বৈ ক্ষতি নেই, কারণ অবস্থাদৃষ্টে একুশ শতককেও অনেকাংশে বিশ শতকেরই সম্প্রসারণ মনে হয়; ফলে পাঠক নিজের চারদিকে যতো তাকা্বেন, ততোই লেসের প্রবচনগুলোর স্বচ্ছতা ও প্রাসঙ্গিকতা আবিষ্কার করতে সক্ষম হবেন।

    একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয়৷ সর্বাত্মক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অধীনে যারা বাস করেন, লেসের প্রবচনগুলো তাদের কাছে অনেকটাই বেদবাক্যের মতো মনে হবে। স্বৈরতান্ত্রিক আবহাওয়ায় মানুষের বাকস্বাধীনতা হারিয়ে যাওয়া সরকার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমশ অত্যাচারী ও বাগাড়ম্বর-সর্বস্ব হয়ে ওঠা, ব্যক্তির বিলোপ, এবং তার বদলে অ-চিন্তাশীল, মিথ্যাপ্রেমী জনতার উত্থান, ইত্যাদি বিষয়গুলো লেসের লেখালেখিতে এমন নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে যে লেসের কিছু কিছু প্রবচনকে মনে হয় সার্বজনীন, শাশ্বত। লেস যখন লেখেন,
    আইনের চোখে আমরা সবাই সমান। তবে আইন যারা প্রয়োগ করে, তাদের চোখে নয়।
    কিংবা,
    কোনো দেশের সংবিধানের উচিত নয় সেই দেশের নাগরিকদের সংবিধানকে লঙ্ঘন করা।

    তখন এই সুদূর বাঙলাদেশে বসেও মনে হয়, এ আসলে আমাদেরই কথা, আমাদেরই বাস্তবতা। বাঙলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বৈরাচার ও গণতন্ত্রহীনতার যে অভিজ্ঞতা আমরা লাভ করেছি, সেই অভিজ্ঞতার সাথে সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রের নাগরিক লেসের অভিজ্ঞতা অনেকটাই মিলে যায়। কারণ আমাদের বাস্তবতা হলো, এখানে আইন যাদের হাতে, তারাই জনগণের সবচেয়ে বড়ো শত্রু। আইন ব্যবহার করেই এখানে নাগরিকদের দমন করা হয়। আবার, সেই তারাই লেখে রাষ্ট্রের সংবিধান, যেখানে জনগণের প্রত্যাশাগুলো এমনকি কাগজে-কলমেও ঠিকমতো উঠে আসে না৷ ফলে দেশের সংবিধানের ও দেশের নাগরিকদের মধ্যে এক অমোচনীয় দুরত্ব তৈরী হয়, যা গণতন্ত্রহীনতাকেই আরো শক্তিশালী করে।

    আবার,
    পৃথিবীর দিককার জানালাটা সংবাদপত্র দিয়ে ঢেকে রাখা সম্ভব।

    এই প্রবচনে লেস সংবাদপত্রকে বিদ্রূপ করছেন। যে রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকে না, বা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করে না, সেই রাষ্ট্রে সংবাদপত্রও প্রায়ই স্বৈরাচারের সহযোগী হয়ে ওঠে। মানুষের সামনে দেশ ও দুনিয়ার সত্যিকার চিত্র তুলে ধরার বদলে সংবাদপত্রগুলো তখন তোষামোদ ও প্রোপাগান্ডা তৈরীগে মনোযোগ দেয়। তখন সেখানে তথ্য থাকলেও সত্য থাকে না, কিংবা তথ্য দিয়েই সত্যকে ঢেকে ফেলা হয়। সংবাদপত্র পড়লে তখন সত্যটা জানা যায় না, বরং সত্যের থেকে দূরে চলে আসতে হয় আরো। শুধু সংবাদপত্রই না অবশ্য, একুশ শতকে গণমাধ্যম বলতে আমরা যা কিছু বুঝি, তার সিংহভাগই এই দোষে দুষ্ট।

    দাসদের স্বাধীনতা পরিমাপ করা হয় তাদের শিকলের দৈর্ঘ্যের ভিত্তিতে।
    কিংবা,
    কিছু শব্দ এতোটাই অন্তঃসারশূন্য যে একটা গোটা জাতিকেই তাদের ভেতরে বন্দী করে রাখা যায়।

    গণতন্ত্র থাকে না যে দেশে, দাসত্ব সেই দেশের মানুষের নিয়তি। সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার উপর নির্ভর করে কার দাসত্ব কম হবে, আর কার দাসত্ব হবে বেশি। কিন্তু শিকল জড়ানো আছে সবার পায়েই। সীমাতিক্রম করলে ঠিকই শিকলে টান পড়ে। দুঃখের বিষয় হলো, মানুষ মাঝেমাঝে জিনিসটা বোঝে, আবার মাঝেমাঝে বোঝে না। কিছু গালভারি শব্দের মোহে পড়ে সে নিজের দাসত্বকে মেনে নেয়। ফলে দেখা যায় গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, প্রগতি, ইসলাম, হিন্দুত্ব, জাতীয়তাবাদ, প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করে একেক জায়গায় একেক শাসক মানুষের পায়ে কখন শিকল পরিয়ে দেয়, মানুষ সেটা টেরও পায় না। মানুষ প্রতিশ্রুতি ভালোবাসে, নেহাত বাধ্য না হলে সে কখনোই চায় না যে তার মোহভঙ্গ হোক। এজন্যই মানুষকে বড়ো বড়ো শব্দের কারগারে ঢোকানো খুব সহজ। ইতিহাস ঘুরেফিরে এই ঘটনাই ঘটে।

    আধুনিক যুগে স্বৈরতন্ত্রের প্রভাবে মানুষের বাকস্বাধীনতা রহিত হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটাও লেস-কে ভাবিয়েছে। বেশ কিছু প্রবচনে লেস এই বিষয়টাকে বিদ্রূপ করেছেন। যেমন,

    নির্বাক ( তথা, বাক-স্বাধীনতাহীন) মানুষকে দেখলেই চেনা যায়। এমনকি যখন তারা জাতীয় সঙ্গীত গায়, তখনও।
    আদিতে ছিলো শব্দ। পরে সৃষ্টি হলো নীরবতা।
    কথার মূল্য তারা তখনই দেয়, যখন নীরবতার জন্য মূল্য চোকাতে হয়।

    স্বৈরতন্ত্রের সহিংস রূপটাও লেসের আক্রমণের বিষয়বস্তু হয়েছে। স্বাধীন ও সাহসী মানুষ মাত্রই যে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নিপীড়িত, এবং মানুষ যাতে কোনোক্রমেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস না করে, সেইজন্য রাষ্ট্র যে আগাগোড়া একটা ভয় আর নির্যাতনের শাসন কায়েম করতে উৎসুক হয়ে ওঠে, এই বিষয়টা লেসের বহু প্রবচনে উঠে এসেছে। যেমন:

    কোনো কোনো দেশে নির্বাসন হলো সবচেয়ে বড়ো শাস্তি। আবার কোনো কোনো দেশে মহত্তম মানবদরদীরাও নির্বাসিত হওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করেন।
    কিংবা,
    উর্বর জমি পেলে চাবুকও শিকড় বিস্তার করে।

    রাষ্ট্রের চাবুক জীবনের গভীরে শিকড় বিস্তার করলে তার ফল কী হয়, বাঙলাদেশের নাগরিক হিসেবে সেটা আমাদের ভালো করেই জানা আছে। হাসিনার শাসনামলে আমরা এতো বেশি চাবুক খেয়েছি যে এই দেশে চাবুকের বাম্পার ফলন নিয়ে আমাদের মনে সন্দেহ থাকার কোনো কথা নয়। আবার গত পনেরো বছরে বিভিন্ন কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, এমন নাগরিকদের তালিকা করলে আসলেই মনে হবে যে, এই দেশে বিবেকবান মানুষেরা নির্বাসিত হতে পারলেই বেঁচে যান। এটা লেসের কোনো তত্ত্ব নয়৷ লেস নিজে ভুগে দেখেছেন বলেই নিজের ভোগান্তি নিয়েও কৌতুক করতে পারেন।

    স্তানিসোয়াভ ইয়েজি লেসের প্রবচনের অনুবাদ, আমার ধারণা, বাঙলা ভাষায় এর আগে হয়নি। আমি চেষ্টা করেছি, ইংরেজি ভাষায় অনূদিত লেসের প্রবচনগুলো থেকে কয়েক শত প্রবচন বাঙলাভাষী পাঠকের সামনে হাজির করতে। রাজনৈতিক ও দার্শনিক গুরুত্ব বেশি, এমন প্রবচন একটিও বাদ দিতে চাইনি। তবে অনুবাদক হিসেবে আমাকে সতর্ক থাকতে হয়েছে, যাতে কোনোভাবেই শব্দের আশপাশ হয়ে প্রবচনের অর্থ পাল্টে না যায়। আর যে কথাটি না বললেই নয়, সেটা হচ্ছে, লেসের প্রায় প্রত্যেকটা প্রবচন পড়ার পরই আমার মাথায় কিছু না কিছু ভাবনা খেলে গেছে। পাঠকদের সামনে নিজের সেই ভাবনা কিছুটা তুলে ধরার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। একেকটা প্রবচনের পাশে ব্রাকেটের মধ্যে নিজের ভাবনা ও কৌতুকও ভাগ করে নিয়েছি পাঠকদের সঙ্গে। পাঠকরা আমার এই স্পর্ধাকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি।

    একটা কথা বলে শেষ করি। পূর্ব ইউরোপের জনগণ যে রাজনেতিক অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে গেছে, তার সঙ্গে আমাদের, তথা বাঙলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে। তাই পূর্ব ইউরোপের সাহিত্য ও দর্শন আমাদেরকে হাসিনা-পরবর্তী বাঙলাদেশে আত্ম-বিশ্লেষণ ও আত্ম-সমালোচনায় সহযোগিতা করতে পারে। স্তানিসোয়াভ ইয়েজি লেসের এই প্রবচনগুলি পড়ার পর যদি কেউ পূর্ব ইউরোপের সাহিত্য ও দর্শন সম্পর্কে নতুন করে আগ্রহ অনুভব করতে শুরু করেন, তো অনুবাদক হিসেবে আমি নিজেকে সার্থক মনে করবো।



    আলুথালু চিন্তাভাবনা

    কিছু এস্কিমো তুমি সবসময়ই পাবে, যারা কঙ্গোর লোকজনকে গরমের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া শেখায়। [যেটা বুঝি না, যেটা নিয়ে কোনো জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা নেই, সেটা নিয়েই মানুষকে জ্ঞান দেওয়ার প্রবণতা অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। মাঝেমাঝে মায়ের কাছে মাসির গল্প শোনানোর পর্যায়ে চলে যায় ব্যাপারটা।]

    ঈশ্বরের কাছে স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা সম্পর্কে জানতে চেয়ো না: উনি সবচেয়ে কঠিন রাস্তাটা দেখিয়ে দেবেন। [স্বর্গে যেতে হলে তো দুনিয়ার এই জীবনটা আগে পার করতে হবে। তো, এর চেয়ে কঠিন আর কী আছে?]

    অশুভের সামর্থ্য আছে সকল শুল্ক মেটানোর। [এই কারণেই পৃথিবীর যাবতীয় অশুভ যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে।]

    পৃথিবীর দিককার জানালাটা সংবাদপত্র দিয়ে ঢেকে রাখা সম্ভব। [সংবাদপত্রগুলো মাঝেমাঝে এতো বেশি মিথ্যা প্রচার করে যে মনে হয় আমাদের চোখ থেকে বাস্তবতাকে ঢেকে রাখাই তাদের উদ্দেশ্য। একবিংশ শতাব্দীতে সংবাদপত্রের এই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ফেসবুক, ইউটিউব-সহ অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া।]

    সেন্ট হেলেনায় মৃত্যুবরণ করার জন্য নেপোলিয়ন হওয়া লাগে না। [ কথাটা বিপরীত দিক থেকেও বলা যায়। ফাঁসিকাঠে ঝুললেই কেউ বিপ্লবী হয় না। অবশ্য রাজা-রাজড়া-বিপ্লবীদের জন্য ফাঁসিকাঠ কিংবা নির্বাসনে মৃত্যুই ভালো। তাতে মহিমা বাড়ে।]

    অনেক বুমেরাংই আর ফিরে আসে না। তারা স্বাধীনতাই বেছে নেয়। [শত্রুকে অভিশাপ দেওয়ার সময় এই কথাটা মনে রাখা ভালো। কখন কার ঘাড়ে কোন জিনিস বুমেরাং হয়ে ফিরে আসবে, তার অপেক্ষায় জীবন পার করে দেওয়া অনুচিত ]

    জিরাফের ঘাড়ে বসে এক মাছি অমরত্বে বিশ্বাস করা শুরু করলো।

    ‘দীর্ঘজীবী হও' এ কথা যে বলে, শেষকৃত্যের খরচ তারই বহন করা লাগে। [খুবই সমস্যাজনক একটা ব্যাপার। তবে কি কারো দীর্ঘায়ু কামনা করবো না আমরা?]

    যদি মনোচিকিৎসক না হও, তো নির্বোধদের থেকে দূরে থাকো। কারণ তারা এতোটাই নির্বোধ যে সাধারণ কোনো মানুষ তাদেরকে সঙ্গ দিলে তারা তাকে কোনো পারিশ্রমিক দেয় না। [শুনেছি, অনেক মনোচিকিৎসক পাগলের সঙ্গে থাকতে থাকতে নিজেরাও কিছুটা পাগল হয়ে যান৷ নির্বোধদের সঙ্গে থাকলে এমন হবে না তো?]

    কোনো একটা রিভিউ থেকে: কবি তার চিন্তার সুমহান দারিদ্র্য প্রকাশ করেছেন।

    আমি একটা দুঃস্বপ্ন দেখলাম: সবেমাত্র নিরক্ষরতার অবসান ঘটেছে, এমন একটা দেশে আমলাতন্ত্রের আধিক্য। [এটা দুঃস্বপ্ন নয়, এটা বাস্তবতা। বাঙলাদেশের দিকে তাকান। হাড়ে হাড়ে টের পাবেন।]

    গলদা চিংড়ি মৃত্যুর পরে (লজ্জায়) লাল রং ধারণ করে; ভুক্তভোগী হয়েও কী বিরল সূক্ষ্ম রুচির পরিচয়!

    সবাই আমাদের কল্যাণ চায়। আমরা যেনো তাদেরকে ওটা চুরি করার সুযোগ না দিই। [‘আমি তোমার ভালো চাই'- এ কথা যারা বলে, তাদেরকে সন্দেহ করতে শিখুন। অন্তত, কাউকে কাউকে। ]

    ভেন্টিলেটরের সাথে যুদ্ধ করা প্রতিটা দুর্গন্ধই নিজেকে দন কিহোতো (Don Quixote) মনে করে। [নিতান্তই বাটপার যে ব্যক্তি, সে-ও মনে করে যে সে সংগ্রাম করছে। চারপাশের রাজনীতি ও সংস্কৃতির ময়দানে তাকান। প্রত্যেকেই যুদ্ধরত, দন কিহোতো।]

    কেবল মৃতদেরকেই পুনরুজ্জীবিত করা যায়। জীবিতদের ক্ষেত্রে সেটা খুব কঠিন। [জীবন্মৃতরা নিজের কথায় চলে কম, অন্যের কথায় নাচে বেশি। পুতুলের মতো। পুতুলের নাচকে পুনরুজ্জীবন বলে ভুল করে অনেকেই। ]

    তুমি একটা ডালে বসে আছো। যতক্ষণ না সেই ডালে তোমাকে ঝুলিয়ে মারা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেই ডাল কেটো না। [গভীর দার্শনিক মন্তব্য। যে যেমন খুশি ভাবতে পারেন।]

    নৈতিকতা ব্যাপারটা হলো এরকম: হয় কোনো সামাজিক চুক্তিতে আসো, নয়তো নগদ টাকা দাও। [জরিমানার ব্যাপারটা তো এরকমই। ভুল করলেও টাকা দিয়ে ছাড়া পাওয়া যায়। ]

    যেসব দেবতা একটু অদ্ভুত আর তার-ছেঁড়া ধরনের, তাদের দিকেই মনোযোগ দাও। তারা এমনকি অসময়েও তোমার ডাকে সাড়া দেবে।

    মধ্যযুগের ডাইনীরা স্বীকার করতো যে শয়তানের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে। এ কথা শুনলে আমাদের রক্ত গরম হয়ে যায়- শয়তানই যখন নেই, তখন তার সাথে যোগাযোগ আবার কী করে থাকে? কিন্তু যুক্তি আমাদের বলে যে, এটা সত্যি নয়। শয়তান অবশ্যই আছে। আসলে ইনকুইজিটরই তো শয়তান।

    সত্য সর্বদা নগ্নই থাকে- এমনকি সে যখন সাম্প্রতিকতম ফ্যাশনে মোড়ানো থাকে, তখনও। [সত্য সবসময় নবজাত শিশু, সবসময়ই উলঙ্গ। বিশ্লেষণ পাল্টায়, প্রমাণে বৈচিত্র্য আসে। সত্য পাল্টায় না। প্রশ্ন হলো, সত্য আসলে কী?]

    যে জিহ্বা সে এতোদিন দুনিয়াকে দেখিয়ে এসেছে, সেই জিহ্বার আড়ালেই সে এখন লুকিয়ে আছে।

    স্বপ্ন দিয়েও খুব ভালো জ্যাম বানানো সম্ভব। খালি চিনি আর ফলমূল যোগ করলেই হয়৷ [দুঃস্বপ্নে যতোই চিনি মেশান, লাভ নেই। স্বাদ তিতেই থেকে যাবে।]

    মাশরুমের স্যুপে জঙ্গলের সৌন্দর্যের খুব কমই অবশিষ্ট থাকে।

    কিছু মানুষ নিজেদের ডানা কেটে ফেলে দেয় খালি একটা কুঁজ লাভের আশায়৷ [চারপাশে এরকম হাজারো মানুষ দেখবেন। কেউ কবি, কেউ চিত্রকর, কেউ অধ্যাপক, কেউ অভিনেত্রী, কেউ বুদ্ধিজীবী, কেউ হয়তো নিতান্তই সাধারণ মানুষ: ক্ষমতার কাছে সবাই নিজেকে বিক্রি করে দিয়েছে। উড়বার ডানার চেয়ে দালালির কুঁজ তাদের কাছে প্রিয়তর। ]

    আমাদের স্বপ্নকে সত্যি করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ঘুম থেকে জেগে ওঠা। [ঘুম থেকে না উঠলে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। সুতরাং সবার আগে দেখতে হবে ঘুমটা ভাঙলো না। ঘুমটা হতে পারে ব্যক্তির, হতে পারে কোনো জাতির। ]

    হৃদয়কে বিশ্বাস কোরো না। সে চায় তোমার রক্ত।

    সৃষ্টির শুরুতে ছিলো শব্দ। আর শেষে কেবলই ক্লিশে। [মানুষের উচ্চারিত প্রতিটা শব্দই শেষ পর্যন্ত ক্লিশে হয়ে যায়। এমনকি মানুষ নিজেও। বিলুপ্ত মানবজাতির ইতিহাস যদি কখনো লেখা হয়, তো ক্লিশেই দেখা যাবে তার ইতিহাসের অর্ধেক। ]

    স্বপ্নকে সুযোগ দেওয়া হলে সে সবসময়ই বাস্তবতাকে হারিয়ে দেবে। [স্বপ্ন কিংবা স্বাপ্নিক- কেউই এই সুযোগ পায় না। দুনিয়া চালায় ধান্ধাবাজ বাস্তববাদীরা। ]

    অন্ধকার যতো গাঢ়, নক্ষত্র হওয়া ততো সহজ। [ঘুটঘুটে অন্ধকার একটা টর্চও নক্ষত্রের মর্যাদা লাভ করে ফেলতে পারে। অন্ধকারের চর্চা বেড়ে গেলে অবশ্য এমনই হওয়ার কথা। ]

    একটা যথার্থ প্রবচন অর্ধেক মারে আর অর্ধেক অমর করে।

    স্রোতের উৎসে যে যেতে চায়, তাকে স্রোতের বিপরীতেই সাঁতরাতে হয়। [দার্শনিক-চিন্তকদের ক্ষেত্রে এ কথা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। স্রোতে ভেসে যাচ্ছে যারা, তাদের উপকারের জন্য হলেও মাঝেমাঝের স্রোতের বিপরীতে সাঁতরানোর দরকার হয়। স্রোতটাই তো বড়ো নয়। কোথা থেকে স্রোত এলো আর কোথায়ই বা তার গন্তব্য, কাউকে না কাউকে তো এটা নিয়ে ভাবতেই হবে। ]

    আইনের চোখে আমরা সবাই সমান। আইন যারা প্রয়োগ করে, তাদের চোখে নয়। [আইন নিজে নিজেকে প্রয়োগ করতে পারে না। যদি পারতো, তো দুনিয়াব্যাপী এতো দুঃশাসন দেখা লাগতো না আমাদের। আইন যারা প্রয়োগ করে, তারাই নষ্টের গোড়া। সমস্যা হলো, আইন বানানোর কাজটাও প্রায়শই তাদের হাত ধরেই সম্পন্ন হয়। ]

    সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে কঠিন। বাদবাকি সব তো নিছক ফলাফল। [সিদ্ধান্তহীনতায় যারা ভোগে, তারাই বুঝবে এ কথার মর্মার্থ। সিদ্ধান্তেই কাজের আরম্ভ। আর আরম্ভই কাজের অর্ধেক। ]

    এই খুদে প্রবচনগুলি কেনো লিখি আমি? কারণ আমি শব্দের সংকটে ভুগি।

    একটা গভীর চিন্তায় পৌঁছানোর জন্য অনেক উঁচুতে আরোহণ করা লাগে।

    ‘আমি ওকে কিচ্ছু বলবো না। খালি আমার আঙুলটা একটু নাড়াবো’, এ কথা বলেই সে ট্রিগারে আঙুল রাখলো।

    সিজাররা সাধারণত তাদের বন্ধুদের হাতেই খুন হয়। কারণ তারা তো আসলে শত্রু।

    যৌবন হলো প্রকৃতির উপহার। কিন্তু বয়োঃবৃদ্ধি হলো একটা শিল্পকর্ম। [সবাই ঠিকঠাক বুড়ো হতে পারে না। মানে প্রকৃতির নিয়মে বুড়ো হয় নিশ্চয়ই, কিন্তু বার্ধক্যের প্রজ্ঞা ও স্থিরতা আয়ত্ত করতে পারে কয়জন?]

    যাত্রাপথে আমেরিকার দেখা না মিললে কলম্বাস শেষ পর্যন্ত কী আবিষ্কার করতো কে জানে।

    স্মৃতিস্তম্ভ আর সমাধিফলকের পার্থক্য আমরা ভুলে গেছি।

    প্রবেশের পথই প্রস্থানের পথ।

    ধরা যাক, দেয়ালে মাথা কুটতে কুটতে তুমি দেয়ালটাই ভেঙে ফেলতে সক্ষম হলে। কিন্তু তারপর? এর পরের কুঠুরিতে গিয়ে কী করবে তুমি?

    কোনো জঙ্গল যখন কেটে ফেলা হয়, তখনই সেখানে পথ হারিয়ে ফেলা সবচেয়ে সহজ।

    যে মুহুর্তে তুমি তোমার ট্যালেন্টের অভাবটা উপলব্ধি করতে পারো, ঠিক সেই মুহুর্তে তুমি একটা জিনিয়াস। [এই মুহূর্তটি অবশ্য খুবই ক্ষণস্থায়ী। পরমুহূর্তেই দেখা যায় নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবার অভ্যাসের মধ্যেই ঢুকে পড়ি আমরা। আবার ট্যালেন্টের অভাব বুঝতে পারার পরও সেই অভাব মেটানোর সামর্থ্য হয়ে ওঠে না প্রায়ই।]

    তুমি যখন কোনো থলে কিনবে, তখন থলের ভেতরের যে বিড়ালটা তারা বিক্রি করতে চায়, সেই বিড়ালটাকেও কেনো। [থলের বিড়াল বের হওয়া মাত্রই থলের মালিকেরা বিড়ালের মালিকানা অস্বীকার করেন। এইটা খুবই বাজে অভ্যাস। থলে-প্রস্তুতকারকেরা অসৎ- এই অজুহাত দিয়ে আর কতোদিন?]

    মানুষের হাতেই সবকিছু। তাই ঘন ঘন হাত ধোওয়ার অভ্যাস করো। [ময়লা হাত দিয়ে যতো পবিত্র বস্তুই স্পর্শ করেন না কেনো, বস্তুটি ময়লা হয়ে যাবে। বাইবেল, কুরআন, বেদ-বেদান্ত, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র- সবক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। নিয়মিত হাত ধুই না বলেই আমরা যা কিছু ছুঁই, তাতেই কোনো না কোনো কলঙ্ক লেগে যায়। ]

    আত্মায় অবিশ্বাস করি বলে কি শাস্তি হিসেবে আমি আত্মাহীন হয়েই থেকে যাবো?

    অমরত্বের প্রথম শর্ত হচ্ছে মৃত্যু।

    কোনো দেশের সংবিধানের উচিত নয় সেই দেশের নাগরিকদের সংবিধানকে লঙ্ঘন করা।
    [রাষ্ট্রের সংবিধান আর নাগরিকের সংবিধান প্রায়শই আলাদা হয়। রাষ্ট্রের সংবিধানে নাগরিক রাষ্ট্রেরই দাসানুদাস হিসেবে গণ্য হয়। রাষ্ট্রের উপর মালিকানা ফেরত পাওয়ার জন্য নাগরিকদের নিজ দায়িত্ব ও তত্ত্বাবধানে একটা সংবিধান লেখা জরুরি। ]

    এক পুরাণ যখন আরেক পুরাণের মুখোমুখি হয়, তখন সংঘর্ষটা হয় সত্যিকার। [মিথ সাধারণ নিজ নামে লড়াই করে না। লড়াইয়ে নামার আগে সাধারণত সে সত্যের রূপ ধারণ করে। ফলে, সত্যের সাথে মিথ্যার লড়াই নামে জগতে যা কিছু ঘটে, তার একটা বড়ো অংশই আদতে এক মিথের সঙ্গে আরেক মিথের লড়াই। ]

    তোমার যদি মেরুদণ্ড না থাকে তো চামড়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা কোরো না। [মেরুদণ্ড নেই যাদের, তারাই তো রাজ করছে। এজন্যই চারদিকে সবকিছুর ভগ্নদশা। শিরদাঁড়াহীনেরা ঘরবন্দী জীবন কাটালে মানবসভ্যতার বড়ো উপকার হতো। ]

    সব তোপধ্বনি বিপ্লবের ঘোষণা করে না। [কোনো কোনো তোপধ্বনি বিপ্লবের সমাপ্তি ঘোষণা করে। আবার কোনো কোনোটা প্রতিবিপ্লবের আগমনবার্তা জানায়। ]

    পতিতরা ঈশ্বরের প্রশংসা করে না। তারা আরো ইন্টারেস্টিং কিছু করার কথা ভাবে।

    সূর্যের আলো পড়লে কারাকক্ষের মেঝেতে কারাগারের লোহার শিকের ছায়া পড়ে। কয়েদীরা চাইলে সেই ছায়ার বর্গক্ষেত্রগুলোতে ক্রসওয়ার্ড পাজল (crossword puzzle) খেলতে পারে। তবে সেটা নির্ভর করে লোহার শিকের দৈর্ঘ্যের উপর।

    কোনো কোনো দেশে নির্বাসন হলো সবচেয়ে বড়ো শাস্তি। আবার কোনো কোনো দেশে মহত্তম মানবদরদীরাও নির্বাসিত হওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি করে।

    লাশ যখন তার খুনীর মুখোমুখি হলো, তখন খুনীকে সে চিনতেই পারলো না।

    ‘একটা খোজার (eunuch) সঙ্গে তুমি অনেকক্ষণ বসে গল্প করতে পারো', হারেম থেকে আগত এক রমণী বললো।

    যার কোনো দোষ নেই, তাকেই প্রথম ঢিলটা ছুঁড়তে দাও। একটা ফাঁদ আর কী। কারণ এরপর থেকে সে নির্দোষ থাকবে না।

    হও, নিজের মতো হও। পিঠে অশ্বারোহী না থাকলেও ঘোড়া ঘোড়াই থাকে। কিন্তু ঘোড়া না থাকলে অশ্বারোহী কেবলই একজন মানুষ।

    যুক্তির চৌহদ্দি পেরিয়ে আমরা চিন্তার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করবো কবে?

    আহা! আমি যদি ঈশ্বরের ব্যক্তিগত ঠিকানা জানতাম! [তাহলে কী করতেন লেখক? ঈশ্বরের কাছে গিয়ে প্রশ্ন করতেন, ‘এই মহজগত তুমি কেনো সৃষ্টি করলে?’ কিংবা ‘আমাকে কেনো মানবজন্ম দিলে?’ করা তো উচিত। ]

    ‘একটা ক্রুশ থেকে দু’টো ফাঁসিকাঠ তৈরী করা সম্ভব', অবজ্ঞার সঙ্গে বললেন বিশেষজ্ঞ।

    প্রকৃত জ্ঞান কখনো মস্তিষ্ক থেকে হারিয়ে যায় না। [জ্ঞান আর তথ্যের ফারাক মনে হয় এইখানেই। তথ্য তার তাৎপর্যসমেত মস্তিষ্কে হাজির থাকলে সবচেয়ে ভালো হয়। কিন্তু খালি তথ্যের ভাণ্ডার হয়ে কী লাভ? গুগল ঘাটলেই তো বহু তথ্য পাওয়া যায়। ]

    বাস্তবতাকে নিয়ে একটা স্বপ্ন দেখলাম। জেগে উঠে কী যে ভালো লাগলো!

    বিচালি খায় যে ঘোড়া, তার কাছে বিচালির গন্ধ এক। আর সেই বিচালির উপর শুয়ে যে প্রেমিক-প্রেমিকা প্রেম করে, তাদের নাকে বিচালির গন্ধ আরেক।

    যেখানে কঠোর আইনের শাসন চলে, সেখানে মানুষ আইনহীনতা কামনা করে।

    কোনো চিন্তা জীর্ণ কিনা, সেটা নির্ভর করে চিন্তাটা যে মাথায় আঘাত করছে, সেই মাথার উপর।

    সত্য চিনতে পারার ক্ষমতা নেই অনেক মানুষের। তবে তাদের মিথ্যাগুলো খুবই আন্তরিক হয়ে থাকে।

    সব দেবতাই অমর ছিলেন

    ভবিষ্যতের তালে তাল মিলিয়ে সবাই নাচতে পারে না।

    জাতীয় সংকট চলাকালীন সময়ে অনেকেই খালি আঙুল দিয়ে নাক খোঁচাতে থাকে। তাদের বেশির ভাগই আসে এমন সব পরিবার থেকে, যেখানে নাক-খোঁচানোই নিষিদ্ধ বলা যায়।

    রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া ছাড়া আমাদের ট্রামগুলো আর কোনো কাজেই আসবে না- এ আমরা কিছুতেই হতে দেবো না।

    আমার পরিচিত এক লোক আছে, যার গানের রুচি এতো খারাপ যে সে যদি এ বিষয়ে কোনো তত্ত্ব নির্মাণ করতো, তো সে বিখ্যাত হয়ে যেতো।

    হে সুন্দরী ললনা, তুমি জিজ্ঞেস করছো আমার চিন্তাভাবনা পরিপক্ব হতে কতোদিন সময় লাগলো। মাত্র ছয় হাজার বছর, প্রিয়তমা।

    আমরা যদি খালি বলির পাঁঠার দুধও দুইতে পারতাম! [কাউকে বলির পাঁঠা বানালাম মানেই সে একদম বাতিল হয়ে গেলো, ব্যাপারটা তো এমন না। বলির পাঠাকে আরো কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটা একটু ভেবে দেখা উচিত। ]

    ‘আপনি অমুক ঘটনাটিকে কেনো যুগান্তকারী আখ্যা দিয়েছেন?’ ‘কোন ঘটনা?’ জিজ্ঞেস করলো সাংবাদিক।

    একটা কথা মনে রেখো: শিকারীকেই পজিশন নিতে হয়, শিকারকে নয়। [পজিশন নেওয়ার ব্যাপারটা কষ্টসাধ্য। পজিশনে ভুল হলে, বা নিরিখ ভুল হলে, শিকার ফসকে যেতে পারে। যদিও পৃথিবীর অবস্থা পাল্টাচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো এমন দিন আসবে, যখন শিকারকেই পজিশন নিতে হবে শিকারীর হাতে কুপোকাত হওয়ার জন্য। সমাজ-রাষ্ট্রের গতিক ওইদিকেই। ]

    লোড-না-করা রাইফেলকে আমি সবসময়ই ভয় করি। কারণ এই রাইফেল দিয়েই তো তারা মানুষের মাথা গুড়িয়ে ফেলতো। [রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করতে কোন পুলিশ ভালো না বাসে? স্বৈরতন্ত্রের যারা বাস করেছেন, তারা রাইফেলের বহুমুখী ব্যবহার সম্পর্কে অবগত আছেন। ]

    দ্বিধা করবো কি করবো না, এটাও কিন্তু একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপার। [আধুনিক জীবনের এই এক সমস্যা। প্রতিটা সেকেন্ডে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এমনকি মাঝেমাঝে অনেক ভেবেচিন্তে কোনো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এতো চাপ নিয়ে কি বাঁচা যায়?]

    হায় নিঃসঙ্গতা, তুমি কতোই না জনাকীর্ণ! [সবাই তো কমবেশি নিঃসঙ্গই। নিঃসঙ্গতা যদি একটি দেশ হতো, তো সেই দেশের নাগরিক হতাম আমরা সবাই।]

    ক্যালেন্ডারের কোনো সংস্কারই গর্ভাবস্থাকে সংক্ষিপ্ত করতে পারবে না। [৬০ দিনে এক মাস ধরলে গর্ভকালীন সময় ১০ মাসের জায়গায় ৫ মাসে নেমে আসবে বটে। কিন্তু তাতে গর্ভবতী নারীর আদৌ কোনো উপকার হবে না। তার কষ্ট সমানই থেকে যাবে। আধুনিক যুগের অনেক সংস্কার অবশ্য এই ধাঁচেরই হয়। ]

    প্রত্যেক আবেলেরই তো আর নিজস্ব কেইন জোটানোর সামর্থ্য নেই। অনেককেই যৌথ কেইনদের দিয়েই কাজ চালাতে হয়৷ [দুনিয়ার অবস্থা বড্ড বেগতিক। কাবিলের চেয়ে হাবিলের সংখ্যা বেশি হয়ে গেছে। ফলে মাথাপ্রতি একজন কাবিল জোটানোও মুশকিল হয়ে পড়ে। ফলে মাঝেমাঝে মৈত্রীর দরকার হয়। দুই বা ততোধিক হাবিল একজোট হয়ে কোনো এক হতভাগ্য কাবিলকে খতম করে। মানুষের সঙ্গে মানুষের লড়াইয়ে তো বটেই, দেশের সঙ্গে দেশের লড়াইয়েও এই হাবিল-কাবিল ফর্মুলা প্রযোজ্য। ]

    রাতে এক বিছানায় ঘুমানোর পর কেউ যদি সকালে জেগে ওঠার পর নিজেকে অন্য কোনো বিছানায় আবিষ্কার করে, তো তার উচিত তৎক্ষণাৎ নিজের আইডি কার্ড চেক করা।

    যদি মুখ লুকাতে চাও, তো নগ্ন হয়ে হাঁটো। [কারণ সেক্ষেত্রে মানুষের নজরটা খালি মুখের উপর সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষ অন্য কিছু দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।]

    পায়ে জুতো নেই যার, তার উচিত নয় গোলাপের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া। [গোলাপ আছে, মানে গোলাপের কাটাও নিশ্চয়ই আছে। গোলাপ-বিছানো পথে খালি পায়ে পায়ে হাঁটতে গেলে পায়ে কাটা ফোঁটার সম্ভাবনা প্রবল। সুতরাং গোলাপ দেখে আশ্বস্ত হলেই চলবে না। ]

    নগ্ন নারীরা কি বুদ্ধিমান?

    সে মারা গেছে মানেই এটা প্রমাণিত হয় না যে সে বেঁচে ছিলো। [বেঁচে থাকা অনেক বড়ো একটা ব্যাপার। খালি নিঃশ্বাস নিলেই এবং ভরপেট খেলেই বেঁচে থাকা যায় না। সত্যিকারের বেঁচে থাকাট জন্য স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার দরকার হয়। ]

    পতাকা যেদিকে উড়ছে, পতাকাবাহক সেদিকে না-ও উড়তে পারে। [পতাকাবাহকরা ভণ্ডই হয় সাধারণত। তারা সাম্যের পতাকা উড়িয়ে অসাম্য কায়েম করে। গণতন্ত্রের পতাকা উড়িয়ে স্বৈরাচারের মহোৎসব বসায়।]

    ক্ষমতার দুর্বলতাগুলো খুবই ভয়ানক।

    অশুভও চায় আমাদেরকে সুখী করতে।

    পৃথিবীর বুকে স্বর্গ থাকার ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারো না কেনো যখন তুমি জানো যে পৃথিবীর বুকেই একটা নরক রয়েছে? [পৃথিবীতে নরক একটা না। একাধিক। স্বর্গের সংখ্যা কয়টা জানি না, কিন্তু নরকের চেয়ে নিশ্চিতভাবেই কম। ]

    উল্টো করে ঝোলানো এক বন্দী স্বীকার করলো যে, ‘বৃষ্টি উপরদিকে ঝরছে'। কর্তব্যরত অফিসার ব্যাপারটা নিশ্চিত করলেন। [আইন-আদালতের ব্যাপারটাই এরকম। যেমন, এই দেশে রিমান্ডে নিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় আসামির কাছ থেকে। সবাই মনে করে, এটাই স্বাভাবিক। ভাবেও না যে, যন্ত্রণার চোটে কেউ মিথ্যা বলতে পারে। ]

    সকল জ্ঞান ভক্ষণ করেছে যারা, সকল পেটের ক্ষুধাও তাদেরই মেটানো উচিত।

    এমনকি আত্মারও দরকার হয় মাঝেমাঝে ডায়েটে যাওয়ার।

    ক্যালেন্ডারটা কি এমন কোনোভাবে ঢেলে সাজানো সম্ভব, যাতে বিশ শতকে আমাদের বাস করা না লাগে?

    কেবল একজন কবিই পারে ঈশ্বরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রশ্নপত্র তৈরী করতে। [ঈশ্বরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোটা কবিদের পুরনো বদভ্যাস। যদিও ঈশ্বর আজ পর্যন্ত মুখ খোলেননি। ]

    বহুল-ব্যবহৃত পথে হেঁটো না- পিছলে যেতে পারো কিন্তু। [ ফ্রস্টই ঠিক কাজ করেছিলেন। ‘Two roads diverged in a wood and I/ I took the one less travelled by. সবাই যে পথে যায়, সেই পথে গিয়ে সবাই কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছে, এমন কোনো প্রমাণ আছে?]

    ভেন্টিলেটরের সঙ্গে যুদ্ধ করা প্রতিটা দুর্গন্ধই নিজেকে দন কিহোতো (Don Quixote) মনে করে।

    বাস্তবতা দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিও না কখনো। কারণ সে তোমার চারপাশেই আছে। হায় ভগবান!

    একবার এক অলৌকিক ঘটনা দেখতে পেয়েছিলাম আমি- কিন্তু তখন তার আর কোনো দরকার ছিলো না।

    একটা কথা মনে রেখো। শয়তান কাউকে লাথি মারতে চাইলে খুর দিয়ে মারবে না, পা দিয়েই মারবে।

    এমনকি বিবেকের কণ্ঠস্বরও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়।

    খেয়াল রাখো, যেনো অন্যের আবেগ তোমার গলা টিপে ধরতে না পারে।

    কল্পনার আগুন দিয়ে যেকোনো ঝোপই জ্বালিয়ে দেওয়া সম্ভব।

    দু’টো প্রজন্ম: আমরা সবাই মিলে স্বপ্ন দেখি; তারা সবাই মিলে ঘুমায়৷

    নির্বাক ( তথা, বাক-স্বাধীনতাহীন) মানুষকে দেখলেই চেনা যায়। এমনকি যখন তারা জাতীয় সঙ্গীত গায়, তখনও।

    কোনো কোনো রাত একটু বেশিই অন্ধকার। কিচ্ছু দেখা যায় না।

    তলদেশ তলদেশই। এমনকি উল্টো করে ধরলেও। [বোতল উল্টো করে ধরলেই বোতলের তলাকে বোতলের মুখ বলা যায় না। তলা তলাই থাকে। নৈতিকভাবে হীন যারা, তারা ক্ষমতার চূড়ায় গেলেও কার্যত হীনই থাকে। এটা অবশ্য একটা দিক মাত্র। আরো অনেক দিক থেকে প্রবচনটিকে ভাবা যায়। পাঠকেরা স্বাধীনতা নিতে পারেন। ]

    দেবতা না পাল্টেও তুমি তোমার বিশ্বাস পাল্টাতে পারো। কিংবা বিশ্বাস না পাল্টেও তুমি তোমার দেবতা পাল্টাতে পারো।

    মতামতের ভিন্নতা তো থাকবেই- শক্তিশালীদের মধ্যে আর কী। [দুর্বলের তো মতামতই নেই কোনো। থাকলেও সেটা শোনা যায় না। আমরা শুনতে চাই না। শুনতে দিই না। আমরা কি শ্রমিকের মতামত শুনি? সংখ্যালঘুর? ]

    ডেভিড গোলিয়াথকে একটা বীণা দিয়ে হত্যা করলেই আমি আরো বেশি খুশি হতাম।

    একই মনিবের অধীনে বহু দাস থাকাটা যেমন ভয়ানক, একই দাসের বহু মনিব থাকাটাও তেমনই ভয়ানক।

    মাথাটাই যে হারিয়েছে, তার অনেক ধরনের মাথা ব্যাথা থাকে।

    ক্ষত সেরে যায়, থেকে যায় ক্ষতচিহ্ন। আমরা যতো বড়ো হই, আমাদের ক্ষতচিহ্নও ততো বড়ো হতে থাকে।

    ধরা যাক, কোনো পায়ুকামী একটা প্রাণিবিদ্যার বই দেখে খুব উত্তেজিত হয়ে গেলো। এর জন্য কি বইটাকে পর্নোগ্রাফি বলা চলে?

    সব রাত ঊষালগ্নে শেষ হয়ে যায় না।

    একটা মূর্তি কিন্তু চমৎকার সূর্যঘড়ি হিসেবে কাজ করতে পারে। কারণ পরবর্তীকালে, এমনকি মূর্তিটা যখন আর থাকবে না তখনও, আমরা মূর্তির দিকে তাকালে বুঝতে পারবো এখন কোন প্রহর চলছে।

    এমন কোনো নারীকে কি কল্পনা করতে পারো যে তার প্রেমিককে আরব্য রজনীর গল্প শোনাতে বলে?

    ঈশ্বরের আঙুল কখনো একই ছাপ দু’বার ফেলে যায় না। [হয়তো এই কারণেই তার সৃষ্টি ও অনাসৃষ্টির জগতে এতো বৈচিত্র্য!]

    এমনকি হাতি মারার সময়ও আপনাকে মাছি মারতেই হবে। [রাজায় রাজায় লড়াই হলে উলুখাগড়া তো মরবেই।]

    মানুষ যাতে তোমাকে শুনতে পায়, সেজন্য মাঝেমাঝে তোমাকে নীরব হতে হবে।

    আমেরিকানরা তো আমেরিকা আবিষ্কার করেনি- লজ্জা হয় না ওদের? [লজ্জা তো হয়ই না, উল্টো উগ্র দেশাত্মবোধের জয়জয়কার চলছে আমেরিকায়।]

    সময় স্থির। আমরাই ভুল দিকে অগ্রসরমান। [পিছনে ফিরে যাওয়া কিংবা মধ্যযুগে ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই আসলে। আমরাই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করি বা ধ্বংস করি।]

    দুই শত্রুর যদি কোনো যৌথ শত্রু থাকে, তো সে তাদের মধ্যকার ঘৃণা আরো বাড়িয়ে দেয়। দুই পক্ষই চায় একমাত্র বিজয়ী হতে।

    অক্ষম ক্রোধ অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।

    নিজেকে তার মনে হলো এখনো-না-দেখা এক দুঃস্বপ্নের মতো। [নিজের দিকে তাকালে এই গ্রন্থের অনুবাদকেরও একই কথা মনে হয়।]

    একটা সময় মানুষ বুঝতে পারে যে, জীবন আসলেই একটু বেশিই সময়-সাপেক্ষ।

    সময়ের ভূত এমনকি নাস্তিকদেরও তাড়া করে ফিরতে পারে। [সময়ের ভূত নাস্তিকদেরই তাড়া করে বেশি। বিশ্বাসীদের তো ঈশ্বর রয়েছে। সময় আর মানুষের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান তিনি। ফলে সময়ের নিষ্ঠুরতা বিশ্বাসীরা টের পায় না। নাস্তিকরা পায়। ]

    শত্রুর মুখ দেখে আমি কেবল তখনই ভয় পাই, যখন দেখি তার মুখের সঙ্গে আমার মুখের সাদৃশ্য কতো বেশি৷ [আমিও তো কারো না কারো শত্রুই। আমি যার শত্রু, সে-ও হয়তো আমার মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। চেহারার মিল দেখে। ]

    শাস্তি হিসেবে তুমি একজন মানুষকে বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দিতে পারো- কিন্তু এ ক্ষেত্রে শাস্তিটা কার্যকর করা লাগবে অন্য লোকজনের উপরে, যারা অনেক কিছু মনে রাখতে পারে।

    কোনো গরুর মুখে ইংরেজি শুনলে তুমি হতবাক হবে নিশ্চয়ই। কিন্তু বিশ্বাস করো, দশ বার কোনো গরুর মুখে ইংরেজি শোনার পর তুমি অনুযোগ করা শুরু করবে, গরুটা অক্সফোর্ডের উচ্চারণরীতি মেনে ইংরেজি বলছে না কেনো। মানে যদি উচ্চারণরীতির পার্থক্যটা তোমার জানা থাকে আর কী।

    যুদ্ধ হয় আদর্শের, কিন্তু মরে মানুষই।

    সেই শয়তানের কী হয়, যে ঈশ্বরে বিশ্বাস করা ছেড়ে দেয়?

    জন্মনিরোধক ওষুধের জন্য একটা স্লোগান দেওয়ার স্বপ্ন দেখি আমি: যারা জন্মালো না, তাদের আশীর্বাদ রইলো আপনার উপর!

    বাদ্যযন্ত্র থেকে নির্গত শব্দ কখনো বাদ্যযন্ত্রে ফিরে যায় না।

    এতো বড়ো মেঘ, আর এতো ক্ষুদ্র তার ছায়া। অদ্ভুত।

    অসীমের কোনো জায়গায় দু’টি সমান্তরাল লাইন একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়... এবং তারা সেটা বিশ্বাস করে।

    দৈত্যদের মধ্যে থাকলে বামন হওয়ার চেষ্টা করো৷ বামনদের মধ্যে থাকলে দৈত্য হওয়ার চেষ্টা করো। কিন্তু সবাই সমান হলে চেষ্টা করো সমান হওয়ার।

    স্বদেশপ্রেম কোনো সীমানা মানে না... (এখানে সীমানার অর্থঃ) পরদেশের সীমানা।

    দাসের আঙুলের উচিত মনিবের আঙুলের ছাপ ফেলে যাওয়া।

    শৈল্পিক সততা কখনো কখনো একজন শিল্পীর জন্মগ্রহণকেই বানচাল করে দেয়৷

    নিজেই নিজের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার যে ব্যাপারটা! আহা!

    হাইনরিখ হাইনের সাফল্য- ‘অখ্যাত কবি' হিসেবে ভুবনবিখ্যাত হওয়া।

    মানুষ আত্মশ্রাঘী নয়- কেউ তার নিজের মৃত্যুর জন্য শোক করে না।

    কিছু চরিত্র আছে, যাদেরকে ভাঙা যায় না, কিন্তু টেনেটুনে প্রসারিত করা যায়।

    প্রত্যেকটা মানুষই জ্ঞানার্জনের এক সহজাত সক্ষমতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কেবল সবজান্তা শমসেররাই সেই সক্ষমতাকে শল্যচিকিৎসা করে কেটে ফেলে দেয়।

    যখন যেখানেই থাকো না কেনো, নিজের মনকে শক্তিশালী করো।

    উপদেশ হলো তুষারের মতো; বর্ষণ যতো ধীরে হয়, স্থায়িত্ব ততো বেশি হয়, এবং ততোই মানুষের মনে মনের গভীরে প্রবেশ করতে থাকে।

    কোনো ডিমের আকার জানার একমাত্র উপায় হচ্ছে ডিমটাকে গরম পানিতে ছেড়ে দেওয়া।

    সত্য এবং গল্পের মধ্যে একমাত্র পার্থক্য হচ্ছে গল্পকে বোধগম্য হতে হয়৷ সত্যের সেটা হওয়া লাগে না।

    নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন থাকাটা জ্ঞানেরই এক লক্ষণ।

    একটা শিশুর মৃত্যু মানে যেনো আমাদের যৌবনেরই মৃত্যু।

    ক্ষমতার লালসা মানুষ ভেতর থেকে যতো গোপন কামনাকে টেনে বের করে আনে, কোনে তর্কুয়েমাদার পক্ষেও ততোটা সম্ভব না [তর্কুয়েমাদা (১৪২০-১৪৯৮) হচ্ছেন একজন কুখ্যাত স্প্যানিশ ইনকুইজিটর। আসামীদের স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য অবর্ণনীয় অত্যাচার এবং প্রায় ২০০০ মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে মারার জন্য দায়ী তর্কুয়েমাদা-কে নিষ্ঠুরতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অসহিষ্ণুতার এক প্রতীক মনে করা হয়- অনুবাদক]

    তোমাদের নীতি তো আমি দেখতেই পাচ্ছি: প্রাচ্যদেশ থেকে আসবে আলো; আর পাশ্চাত্য থেকে আসবে ভোগবাদ।

    উদ্দীপনার ম্রিয়মাণ আগুনের উচিত আমাদের জন্য কিছু ছাই রেখে যাওয়া, যাতে আমরা সেগুলো মেক-আপ হিসেবে ব্যবহার করে ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারি।

    কিছু মানুষ এতো নিপুণভাবে বেঁচে থাকে যে তাদেরকে দেখলে মনেই হয় না যে এই জীবনই তাদের একমাত্র জীবন, তারা এর আগে আর কখনো বেঁচে থাকেনি। [এইরকম মানুষ সংখ্যায় হয়তো খুবই কম, তবে তাদের কেউ না কেউ সবসময়ই আমাদের পাশে থাকে। আমাদের কারো কারো বাবা হয়তো এরকম। মনে হয়, অন্তত কয়েকটা জীবন যাপন করার পর একদম ঝানু হয়ে গেছেন তারা, বেঁচে থাকার আর্ট এখন তাদের দখলে। এমনই নিখুঁত তারা। আর আত্মবিশ্বাসী! ]

    ভুলে যেও না যে মাইক্রোস্কোপের অপর প্রান্ত থেকে ব্যাকটেরিয়াও কিন্তু আমাদের দিকে তাকায়। [ব্যাকটেরিয়াদের দিক থেকে দেখলে পুরো ব্যাপারটা খুবই কষ্টদায়ক। কারণ তাতে তাদের প্রাইভেসি বলে কিছু থাকে না। রাষ্ট্রীয় মাইক্রোস্কোপের তলে বাস করতে করতে আমাদের অবস্থাও ব্যাকটেরিয়ার মতোই হয় কিনা কে জানে। ]

    স্রোতের বিপরীতে সাঁতরাচ্ছে যে, কোনোমতেই তার আশা করা উচিত নয় যে, স্রোত তার দিক বদলাবে।

    মৃতরা খুব সহজেই তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস পাল্টায়।

    এটা খুবই দুঃখের বিষয়ে, শবযানে ওঠা ছাড়া স্বর্গে যাওয়ার আর কোনো পথ নেই।

    সত্যিকারের অত্যাচার বোধ হয় একেই বলে। আমার চারপাশে নগ্ন নারী ছাড়া কিছু নেই, অথচ গই নগ্ন নারীরা তাদের গ্রীবা অব্দি পোশাকে ঢাকা।

    দণ্ডিতের বাড়িতে বসে ফাঁসিকাষ্ঠ নিয়ে কথা না বলাই ভালো- কিন্তু জল্লাদের বাড়িতে?

    অনেকে সত্যকে লুকিয়ে রাখে, কারণ তারা সত্যকে ভয় পায়। আবার অনেকে সত্যকে লুকায় সঠিক সময়ে সত্যকে কাজে লাগানোর জন্য। দু’টো সত্য কিন্তু একদম একই।

    মানুষকে সবসময় ইস্পাত দিয়েই তৈরী করা লাগবে কেনো? আমার তো মাঝেমাঝে মনে হয়, তাদেরকে রক্ত-মাংস দিয়ে তৈরী করা উচিত।

    এটা হয়তো ঈশ্বরেরই সিদ্ধান্ত যে আমি নাস্তিক হবো। [কে নাস্তিক হবে আর কে হবে- সর্বজ্ঞানী ঈশ্বর এটা তো আগে থেকেই জানেন। এরপরও নাস্তিকতা শাস্তিযোগ্য অপরাধ! কী যে রহস্য কে জানে!]

    চিন্তারাও মাছির মতোই এক মানুষ থেকে আরেক মানুষের দেহে ঘুরে বেড়ায়৷ তবে সবাইকে কামড়ায় না।

    মাঝেমাঝে বড়শির সঙ্গে মাছ স্বয়ং জেলেকেও গিলে খেয়ে ফেলে।

    মানুষকে বিভক্ত করার উপায় অনেক। এক বিস্ময়াবিষ্ট জল্লাদ বলেছিলো, ‘আমি মানুষকে ধড় আর মুণ্ডুতে বিভক্ত করি।‘

    মানুষের উচিত তার চিন্তার সংখ্যা এতো বেশি বৃদ্ধি করা যাতে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যথেষ্ট পুলিশই আর না থাকে।

    সব মানুষ সমান- তাদেরকে সমান বানানোর পরে।

    দাসদের স্বাধীনতা পরিমাপ করা হয় তাদের শিকলের দৈর্ঘ্যের ভিত্তিতে।

    বাতাস আসে কোন দিক থেকে? আর আমি উড়ে যাই কোন দিকে?

    পরিস্থিতি বোঝার চাবি সবসময় ঝুলে থাকে প্রতিবেশীর ঘরের তালায়।

    এসব মুগুর-টুগুর আসলে খেলনা ছাড়া কিছুই না। এমনকি যারা মুগুরের ঘা খেয়ে মরেছিলো, তাদেরও এটা জানা থাকার কথা।

    আপনি একটা হায়েনাকে চিনতেন। বহু বছর সে ফিরো এলো কাঠবিড়ালি হয়ে... এই যে আপনি তাকে চিনতে পারলেন, এটা কিন্তু ভাবনার বিষয়।

    জালের ফুটো দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় কোনো ছোটো মাছ কি হীনম্মন্যতায় ভোগে?

    ব্যঙ্গকাররা সাবধান হোন। ১৯৩১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রেনে ক্লেয়ারের ‘Vive la Liberte' মুভিতে একটা গান ছিলো ‘কাজই হলো মুক্তি’ শিরোনামে। আর ১৯৪০ সালে আউশভিৎসের ফটকেও লেখা থাকতো একই কথা: কাজই আনে মুক্তি (Arbeit Macht Frei)।

    এমনকি হাতি শিকার করার সময়ও মাছি ঠিকই মারা লাগে।

    বেঁচে থাকা অস্বাস্থ্যকর। যে বেঁচে থাকে, সে মরে।

    এমনকি একটা কাচের চোখও নিজের অন্ধত্বকে দেখতে পায়।

    গালগল্প পুরাতন হয়ে গেলে রূপান্তরিত হয় পুরাণে। [কথা সত্য। আজকের জনপ্রিয় গুজবই ভবিষ্যতের পুরাণ ও রূপকথার রূপকার।]

    কোনো মানুষকে নির্যাতন করতে হলে আগে তার আনন্দের জায়গাগুলো জেনে নিতে হয়।

    কাদের বিরুদ্ধে তুমি? যারা বিরোধিতাকে নিষিদ্ধ করে, তাদের বিরুদ্ধে। [গণতন্ত্রের প্রাণরক্ষার জন্য এইটা আবশ্যক। বিরোধী মতের জায়গা দেয় না যারা, তাদের বিপক্ষে সক্রিয় থাকা জরুরী। ]

    কবিদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আছে, কিন্তু প্রথম পাঁচটি ইন্দ্রিয় তাদের নেই।

    স্যাটায়ার কখনোই তার পক্ষে রায় পায় না- কারণ স্যাটায়ারের লক্ষ্য যারা, তারাই তো বসে থাকে বিচারকের আসনে।

    জল্লাদ ও দণ্ডিত- একই ঘড়ির দুইটি কাটা। [একটা কাঁটা দিয়ে সময় বোঝা যায় না। অপরাধ আর শাস্তির ক্ষেত্রেও একই কথা জরুরী। একটার ধরণ-প্রকার-মাত্রার আলোচনা আরেকটাকে ছাড়া সম্ভব হয় না। ]

    যার বিছানায় ঘুমাচ্ছো, তার স্বপ্নগুলোই দেখো। [এটা কিভাবে সম্ভব? এটা করাই বা লাগবে কেনো? বাঙলার বিখ্যাত প্রবাদটার কথাই ধরা যাক: ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখা। তো, আমি বড়োলোক হয়েও যদি গরিবের ছেঁড়া কাঁথায় শুই, তো আমাকে কি লাখ টাকার স্বপ্ন শুধরে নিতে হবে? বা, এক বিছানায় ঘুমাই বলেই কি আমার স্বপ্ন আর আমার বাবার স্বপ্ন একই হবে? বিছানার দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখলে স্বপ্নের আর মর্যাদা থাকলো কই?]

    মনে রেখো যে তুমি এই মহাবিশ্বের এক প্রতিস্থাপনযোগ্য অংশই মাত্র। [নক্ষত্রই থাকে না, আর তো আমরা! তবু আমাদের এতো অহংকার।]

    ক্লান্ত, মাথা ঝুঁকে পড়া বিস্ময়সূচক চিহ্নকেই আমরা প্রশ্নবোধক চিহ্ন বলে থাকি। [প্রশ্ন আর বিস্ময় মনে হয় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। বিস্ময় থেকেই প্রশ্ন আসে।]

    আগেই শান্তিতে নোবেল প্রাইজ দিয়ে দিও না। আগে দেখো পরবর্তী যুদ্ধে বিজয়ী কে হচ্ছে। [শান্তিতে নোবেল পায়, এমন অনেকের হাতেই প্রচুর রক্তের দাগ লেগে আছে। অনেকেই নোবেল পদওয়ার পরও রক্তারক্তির মধ্যে জড়িয়ে যায়। কী একটা অবস্থা!]

    শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিপক্ষে আমি। তেমনি মৃত্যুকে পুরষ্কার হিসেবে ব্যবহারকেও আমি সমর্থন করি না। [মৃত্যু কাদের জন্য পুরষ্কার? জানি না।]

    শুধু যদি কোনো দেবতা ‘আমাতে বিশ্বাস করো' না বলে ‘আমাকে বিশ্বাস করো' বলতো!

    কথার মূল্য তারা তখনই দেয়, যখন নীরবতার জন্য মূল্য চোকাতে হয়।

    নিজেই নিজের পুরাণ সৃষ্টি করো। দেবতাদের শুরু এভাবেই হয়। [দেবতা তো হয় না আধুনিক যুগে। মহামানব হয়। দেখেন যদি মহামানব হওয়া যায়!]

    যতো কাছে মক্কার, পাপ ততো কম।

    মটরশুঁটি দিয়ে যদি মানুষ মারা যেতো, তো বারুদ আবিষ্কার করার কথা ভাবতো কেউ?

    রাজনীতি: ট্রোজান ঘোড়াদের দৌড়-প্রতিযোগিতা। [ট্রোজান ঘোড়ার ব্যাপারে একটু খোঁজখবর নিন, তাহলেই বুঝবেই এই প্রবচনের তাৎপর্য!]

    সবাই যখন এক সুরে গান গায়, তখন সেই গানের লিরিকের আর তেমন কোনো গুরুত্ব থাকে না।

    সুশিক্ষিত তোতাপাখি কিছুই বলে না। [আমলা, অধ্যাপক ও কর্পোরেট কর্মকর্তাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। এই প্রবচন দেখলে তাদের কথাই মনে পড়ে সবার আগে। ]

    আমি এমন অনেক ফলাফল দেখেছি, যেগুলো প্রত্যেক বছর নতুন নতুন কারণের জন্ম দিয়ে গেছে।

    বিদূষকেরা সবসময় সিংহাসনের পায়ার কাছেই বসে থাকে। তাই সিংহাসন নড়ে গেলে তারাই সবার আগে টের পায়।

    কোনো কোনো দেশে জীবন এতোটাই মুক্ত যে সেখানে সব জায়গায় প্রকাশ্য দিবালোকে সিক্রেট পুলিশ দেখতে পাওয়া যায়। [একসময়ের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোয় এটা দেখা যেতো। যথেষ্ট ব্যঙ্গবিদ্রুপও হয়েছে সিক্রেট পুলিশ নিয়ে। এখন পশ্চিমের লিবারেল সমাজেও ভয়ানক নজরদারি দেখতে পাওয়া যায়। রাষ্ট্রের নের্তৃত্বে নজরদারির চর্চা চালাচ্ছে সেইখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্যাপারটা আর সিক্রেট পুলিশে সীমাবদ্ধ নেই। ]

    গুহায় ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয় আমাদের পক্ষে। আমরা সংখ্যায় অনেক বেশি হয়ে গেছি। [সাড়ে আটশো কোটি মানুষকে জায়গা দেওয়ার মতো গুহা মনে আসলেই নেই পৃথিবীতে। আধুনিক সভ্যতার উপর বিরক্তি আসা স্বাভাবিক, কিন্তু পেছনে ফিরে যাওয়া যে কোনো সমাধান না, সেটা এমনকি পৃথিবীর জনসংখ্যার দিকে তাকালেও টের পাওয়া যায়। ]

    কিছু শব্দ এতোটাই অন্তঃসারশূন্য যে একটা গোটা জাতিকেই তাদের ভেতরে বন্দী করে রাখা যায়। [ যেমন, উন্নয়ন। উন্নয়নের কথা বলে একটা জাতিকে ইচ্ছামতো আগডুম-খেলানো যায়। বাঙলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা তার সাক্ষী। ‘নিরাপত্তা’ শব্দটাও উদাহরণ হিসেবে একশোতে একশো। দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে দিনে-দুপুরে সারা দেশে ভয়ের রাজ্য কায়েম করার ঘটনা আজকের দুনিয়ায় প্রতিনিয়তই ঘটছে। মানুষ এক সময় সব ফাঁকিবাজিই বুঝতে পারে বটে। কিন্তু ততক্ষণে প্রায়ই দেরী হয়ে যায়।]

    কোনো ভাবনাকে রক্ষা করতে চাইলে তাকে শব্দ-বাক্য দিয়ে আবৃত কোরো না। [ভাবনার নিখুঁত অনুবাদ অসম্ভব। ভাষা ভাবনাকে প্রকাশ করতে গিয়েই ভাবনাকে খানিকটা বিকৃতও করে ফেলে।]

    তারা যে স্বর্গের দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে, এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু চাবির ছিদ্রগুলোও কেনো বন্ধ করা লাগবে?

    ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে বিপুল্ বিতর্ক চলমান। উভয় পক্ষই অবশ্য এই ব্যাপরাটা গোপন করতে চায় যে তারা ঈশ্বরকে হত্যা করেছে- এমনকি তিনি অস্তিত্বশীল হওয়ার আগেই।

    ভাবিয়া করিয়ো ভাবনা।

    পরাবাস্তব যদি বাস্তব হয়ে ওঠে, তো সে কি আর পরাবাস্তব থাকে না?

    এমনকি অন্ধদেরকেও কানামাছি খেলার সুযোগ দেওয়া উচিত৷ [অন্ধের হাতি-দর্শনের চেয়েও ভয়ঙ্কর হবে ব্যাপারটা। একবার খালি কল্পনা করে দেখুন।]

    আমার অনেক বন্ধু আমার শত্রু হয়ে গেছে, আবার অনেক শত্রু হয়েছে আমার বন্ধু- কেবল যারা কোনোটাই হতে চায়নি, তারাই তাদের পুরনো জায়গায়ই থেকে যেতে পেরেছে।

    সবগুলো মুখকে খাওয়ানোর মতো যথেষ্ট শব্দ আছে কি?

    প্রতিটা কাকতাড়ুয়ারই ত্রাস সৃষ্টি করার একটা গোপন বাসনা আছে। [কথা ঠিক। তবে আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রে কাকতাড়ুয়ার ভূমিকায় আছে যারা, তারা কাকেরই মিত্র। তাদের দেখে ত্রাসিত হয় মানুষ। যেমন, পুলিশ। ]

    উন্মত্ত জনতা (mob) একটাই বিশাল মুখ দিয়ে গর্জন করে, কিন্তু খায় হাজার হাজার ছোটো মুখ দিয়ে। [মবের ব্যাপারটাই এরকম। এদের স্লোগানে বৈচিত্র্য নেই। সবাই একই সুরে একই কথা বলে। কিন্তু লুটপাটের সময় নিজের ভাগটা বড়ো করার চেষ্টা করে। ]

    হে মাংসাশী প্রাণীরা, আর যা-ই করো, গিনিপিগ খেয়ে শেষ করে ফেলো না। জানোই তো, গিনিপিগ শেষ হয়ে গেলে মানুষের কতো বড়ো ক্ষতি হয়ে যাবে। [গিনিপিগ শেষ হয়ে গেলেও সমস্যা নেই। মানুষকেই তো গিনিপিগ বানানো হচ্ছে। ভবিষ্যতেও হবে। ]

    তারা আমাকে অমুকের ব্যাপারে সতর্ক করে দিলো। বললো, ‘লোকটার সামাজিক বিবেক বলে কিছু নেই।‘ আমি লোকটার সঙ্গে দেখা করলাম। দেখলাম যে তারা মানবিক বিবেক আছে।

    তুমি যদি কোনো বিদেশীর ভাষা না বোঝো, তুমি তার নীরবতাকেও বুঝতে পারবে না। [কথা সত্যি। ভাষা আর নীরবতা- একটা আরেকটাকে সার্থক করে তোলে। একটা না বুঝলে আরেকটাও গুলিয়ে যায়। ]

    পুরাণ যখন বাস্তবতায় পরিণত হয়, তখন কে জেতে? ভাববাদী নাকি বস্তুবাদী? [কেউই জেতে না। জেতে খালি পুরাণ। ]

    সেইসব স্বৈরশাসকের কপালে দুঃখ আছে, যারা মনে করে যে তারা স্বৈরশাসক নয়। [এরকম কোনো স্বৈরশাসক আছে কি? মনে তো হয় না। স্বৈরশাসকের ভক্তদের ক্ষেত্রেই বরং এ কথা বেশি প্রযোজ্য। ]

    বাস্তবতার দিকে চোখ বুজে থাকা যায়, কিন্তু স্মৃতির ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। [স্মৃতি থাকে ভিতরে। আমাদের আত্মায়। যখন মোচড় দেয়, ব্যথা না পেয়ে উপায় থাকে না। ]

    মর্মবেদনায় ভুগলাম, কিন্তু কবি হলাম না? কেনো?

    তার জীবনটা ভেঙে দু'টুকরো হয়ে গিয়েছিলো। এখন সে দু’টো আলাদা এবং খুব সুখী জীবন যাপন করে।

    তুমি কোনো চূড়ায় উঠেছো মানেই তুমি দাঁড়িয়ে আছো এক অতল গহ্বরের কিনারায়।

    কোনো মাছের যদি আমাদের মতো এতো গোপন কথা থাকতো, তো মাছটা কি চুপ করে থাকতো?

    নরখাদকদের মধ্যেও নিরামিষাশী আছে নাকি? [আছে নিশ্চয়ই। মানুষের জীবন নিয়ে যারা প্রতিনিয়ত ছিনিমিনি খেলে, মানুষের মাংসের উপর তাদের কারো কারো ঘেন্না ধরে গেলে, সেটা আসলে অন্যায় হবে না। ]

    আমার মস্তিষ্ক এতোটাই ক্লান্ত ছিলো যে কোনো মিথ্যা সৃষ্টি করা তার পক্ষে সম্ভব ছিলো না।

    মধুতে চুবানো মিথ্যা খুবই ভয়ানক। [তিক্ত মিথ্যা তো মানুষ খায় না। মানুষ সেই মিথ্যাটাই খায়, যেটায় মধু-মাখন আছে, যেটা সুস্বাদু। এই কারণেই তিক্ত মিথ্যার চেয়ে মিষ্টি মিথ্যা অনেক বেশি ক্ষতিকর। ]

    ছাই থেকে উঠে আসা প্রতিটা ফিনিক্সই তার অতীতকে স্বীকার করে নিতে চায় না। [ওইসব ফিনিক্স পাখি হয়তো চায় না তাদের গায়ে পুরনো ছাইয়ের গন্ধ লেগে থাকুক। তারা তাদের ছাইজন্মের কারণে লজ্জিত। ]

    খুবই গুমোট লাগছে এখানে: জানালা খুলে দাও এবং বাইরের লোকজনকেও এই গুমোট ভাবটা অনুভব করতে দাও। [এটা একটা মজার জিনিস বটে। জানালা খুলে দিলে বাইরের হাওয়া ভিতরে ঢোকে নিশ্চয়ই, কিন্তু ভিতরের গুমোট ভাবটা কোথায় যায়? বাতাসে উড়ে গিয়ে অন্যের ঘাড়ে ও অন্যের ঘরে গিয়ে পড়ে না তো আবার?]

    মানুষের অন্তত একটা সুবিধা আছে, যেটা যন্ত্রের নেই: মানুষ নিজেকে বিক্রি করে দিতে পারে। [মানুষ নিজেকে তো বটেই, এমনকি যন্ত্রকেও বিক্রি করে দিতে পারে দরকার হলে। যন্ত্রের সে সুবিধা নেই। যদিও ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা'-র এই যুগে যন্ত্রের সামর্থ্যের ব্যাপারে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করা একটু ঝুঁকিপূর্ণই বলা যায়। ]

    বিরক্তিকে হত্যা করার জন্য পুলিশকে ব্যবহার কোরো না।

    গুহাবাসী তো আসলে গুহাবাসী ছিলো না (অর্থাৎ গুহাবাসী বললে সে ‘অসভ্য’ মানুষের কথা মনে পড়ে, সে সেটা ছিলো)। সে তার সময় ও সভ্যতার মাপে ঠিকঠাকই ছিলো।

    নিজেই নিজের বজ্রবহ হওয়া কতোই না কঠিন!

    ব্যঙ্গকারদের জন্ম হয় তখনই, যখন চারিদিকে হাসার মতো কিছু থাকে না। [শেখ হাসিনার শাসনামলের কথা চিন্তা করুন। এ কথার প্রমাণ পাবেন।]

    বিশ্বাসীরা বিশ্বাস করে অমরতায়। নাস্তিকেরা বিশ্বাস করে ফিরে আসায়। [যেমন, নীৎশে।]

    ব্যাপারটা খুবই হাস্যকর যে, তারা সত্যকে সবসময় এমন সব জায়গায় পাচার করে চলেছে, যেখানে সত্যের মূল্য সবচেয়ে কম।

    ভুলে যেও না যে তোমার স্বপ্নের ধ্বংসস্তূপ অন্যের নির্মাণের কাঁচামাল হতে পারে।

    স্বাধীনতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব: আমরা ক্রিয়াপদ পর্যন্ত কিভাবে পৌঁছাবো? [ক্রিয়াপদ পর্যন্ত পৌঁছালেও সেটা হবে ঘটমান ক্রিয়া। পুরোপুরি সংঘটিত কখনোই হবে না।

    পুনর্জীবন: কারো জন্য এটা পুরস্কার, আবার কারো জন্য শাস্তি।

    তুমি কার সঙ্গে ঘুমাও, সেটা বলো। আমি বলে দেবো, কার স্বপ্ন তুমি দেখো।

    ধৈর্য্য ধরা শেখার জন্য তোমার অনেক ধৈর্য্য ধরা লাগবে।

    মানুষ: ভালোবাসার উপজাত।

    ন্যায়বিচারের পথ থেকে সরে দাঁড়াও। সে অন্ধ।

    তোমার হাসিই যখন নিষিদ্ধ, তখন কান্নার অধিকার বলেও তোমার কিছু থাকে না আর।

    তুমি একটা বর্বরের হাতে গুলি তুলে দিতে পারো, ছুরি তুলে দিতে পারো; কিন্তু কলম তাকে কখনোই দিতে পারো না। কলম পেলে সে তোমাকেও বর্বর বানিয়ে ছাড়বে।

    আদিতে ছিলো শব্দ। পরে সৃষ্টি হলো নীরবতা।

    সাবানের ব্যবহার বাড়াতে চাইলে করমর্দনকে উৎসাহিত করুন।

    দন্তহীন স্বৈরাচারকে হাসতে বাধ্য করা অনুচিত। [বলা যায় না, সেই হাসি হয়তো বীভৎস লাগবে দেখতে।]

    সেই সমস্ত ভাঁড় থেকে সাবধান, কৌতুকবোধ বলে যাদের কিছু নেই। [অনেক স্বৈরশাসক ও স্বৈরপ্রশাসক এই জাতীয় ভাঁড়ের কাতারে পড়েন।]

    ক্রুশকাঠে না দাঁড়ালে মানুষের শিরদাঁড়া সোজা হয় না- এই ব্যাপারটা খুবই বেদনাদায়ক।

    গণিতবিদ্যার সঙ্গে আমি একমত নই; আমি মনে করি, অনেকগুলো শূন্যের যোগফল খুবই ভয়াবহ একটা সংখ্যা।

    অনিদ্রা: এ এমন একটা যুগের রোগ, যে যুগ মানুষকে অনেক কিছুর প্রতিই চোখ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়।

    তারা সত্য খুঁজেছিলো শুধু সত্যকে আরো গভীরে লুকিয়ে রাখার জন্য।

    অনেক উর্বর বালু আছে, যেখানে উটপাখির মাথা জন্মায়। [আসন্ন বিপদ দেখে বালুতে মাথা গোঁজা উটপাখির স্বভাব। তবে মাঝেমাঝে বালুর ধরণই ঠিক করে দেয় বিপদ দেখে কেউ মাথা গুঁজবে কি গুঁজবে না।]

    মানুষ কবে আন্তঃমানবিক দুরত্বকে জয় করবে? [কখনো করবে না। নৈকট্যের মতোই দূরত্বও মানবিক।]

    কিছু ইমারত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেই সুন্দর দেখায়।

    তার বিবেক খুব পরিস্কার ছিলো। কারণ সে কখনো ওটা ব্যবহারই করেনি। [অব্যবহৃত বিবেকে অবশ্য জং ধরে যাওয়ার কথা। আমাদের দেশে যেমন অনেক জংধরা বিবেক দেখা যায়।]

    চিৎকার করে ওঠো! দেখবে তোমার বয়স এক মিলিয়ন বছর কম মনে হচ্ছে।

    রুটি দেখলে সকল মুখ খুলে যায়। [শুধু খাদকই খাদ্যের সৃষ্টি করে না। মাঝেমধ্যে খাদ্যও খাদক তৈরী করে।]

    আরো বেশি উপরে উড়তে চাইলে আগে ডানা ভাজ করে নাও।

    নগ্ন সত্যকে যারা ভয় পায়, তারা সাধারণত জীবন্ত অবস্থায়ই সত্যের ছাল ছাড়িয়ে নেয়।

    মানচিত্রে এখন আর শূন্যস্থান দেখা যায় না: ওগুলো ইতিহাসের পাতায় বিলীন হয়ে গেছে।

    প্রকৃতিতে কিছুই হারায় না- মানুষ ছাড়া। [মানুষ তাহলে হারিয়ে যায়? এর চেয়ে কষ্টকর কিছু আছে? নজরুলের গানটাই সান্ত্বনা, ‘তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো, প্রভু’। মানুষও হারায় না নিশ্চয়ই। হারাতে পারে না। ]

    উর্বর জমি পেলে চাবুকও শিকড় বিস্তার করে। [বাঙলাদেশের দিকে তাকালে বোঝা যাবে কথাটা কতোটা মূল্যবান। আমরা তো চাবুকের চাষই করছি। আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি একটু বেশিই চাবুক-নির্ভর। নিপীড়ন ছাড়া ওগুলি টিকতে পারে না।]

    যে দেশে মানুষ কারাগারের ভেতরে নিরাপদ বোধ করে না, সে দেশে মানুষ কারাগারের বাইরেও (মুক্ত অবস্থায়) অনিরাপদ।

    কতোগুলো কোকিলকে গিলে খাওয়ার পর একটা বাজপাখি গান গাইতে শেখে? [কখনোই শেখে না। সোনার ডিম-পাড়া হাঁসের মাংস খেয়ে মানুষ কি সোনার ডিম পাড়ে?]

    বিরাট একটা তুষারধ্বসের কোনো তুষারকণাই নিজেকে তুষারধ্বসের জন্য দায়ী মনে করে না। [একটা জাতি যখন ধ্বংসের পথে এগোয়, তখনও একই অবস্থা হয়। প্রত্যেকেই নিজেকে নির্দোষ মনে করে, অথচ প্রত্যেকেরই দায় আছে। কমবেশি।]

    কোনো নরখাদক যদি চিমটা দিয়ে খাবার খেতে শেখে, তবে কি সেটাকে প্রগতি বলা যাবে? [যাবে। নিশ্চয়ই যাবে। পৃথিবীর সভ্য দেশগুলোর দিকে তাকান। খুনোখুনিতে তারাই এগিয়ে। অথচ সভ্যতার কাণ্ডারী তারাই।]

    অপরাধের উপর কোনো ট্যাক্স জারি নেই।

    মনের আনন্দে লাফ দেওয়ার সময় খেয়াল রাখবে যেনো তোমার পায়ের তলার মাটি কেউ সরিয়ে না নেয়৷

    খোঁড়াচ্ছে যে, সে-ও কিন্তু হাঁটছেই।

    আমি কি বিশ্বাসী? ঈশ্বরই শুধু জানেন সেটা।

    আমরা সবই বুঝি: এই কারণেই আমরা কিছুই বুঝি না।

    দীর্ঘশ্বাসের অনুবাদ কিভাবে করবে তুমি?

    সবকিছুই মায়া। এমনকি এই বাক্যটাও।

    মুখ না খুলেও তুমি নিজের গায়ে থুতু দিতে পারো।

    যখনই তারা চিৎকার করে বলে, ‘প্রগতি দীর্ঘায়ু হোক’, তখনই তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, ‘প্রগতিটা কিসের?’

    এটা খুবই আশ্চর্যজনক যে, শূন্য মস্তিষ্কে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করা বড়োই কঠিন।

    নাগরিক যতো নগণ্য হয়, সাম্রাজ্যকে মনে হয় ততোই বিশাল।

    ‘এ তো এক উল্কা মাত্র’, অবজ্ঞার সহিত কহিলো মোমবাতি। [দূর থেকে উল্কাকে দেখে ছোটোই মনে হয়। মোমবাতির আর দোষ কী?]

    সাবধানে থেকো। অন্যের ভাগ্যের চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে যেও না যেনো।

    আমাদের সকলের আলাদা আলাদা গল্প মিলেই তৈরী হয় বাস্তবতা।

    তোমার কল্পনা যতো সমৃদ্ধ হবে, নিজেকে তোমার মনে হবে ততোই হীন। [এই হীনতার বোধ যেমন ভালো, তেমনই খারাপ। প্রথমত, এই হীনতার বোধ না থাকলে মানুষ চরম আত্মম্ভরী হয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, হীনতার বোধ যদি এতো বেশি হয় যে নিজের অস্তিত্বকেই আজগুবি ও অদরকারী মনে হওয়া শুরু করে, তো সেটাও খারাপ। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ না, আবার নিকৃষ্টও না- এটা বুঝতে হবে। ]

    কোনো জিনিয়াস যদি নিজেই না জানে যে সে একটা জিনিয়াস, তো সে সম্ভবত জিনিয়াস নয়। [স্বঘোষিত জিনিয়াসের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে চারপাশে। এই প্রবচনটা মোড়ে মোড়ে ঝুলিয়ে রাখা উচিত।]

    এক সারি শূন্য থেকে সহজেই একটা শিকল বানানো সম্ভব। [বিষয়টা হয়তো এভাবে দেখা যায়: মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা যদি না থাকে, তো তাদেরকে শিকল পরিয়ে স্বৈরাচারের দাসানুদাসে পরিণত করা খুবই সহজ।]

    হিটলারের আমলের ওয়ারশহ নগরী, ঘটনাটা এক ভোরবেলার। জার্মান হেডকোয়ার্টারের দেয়ালে কেউ তাড়াহুড়ো করে ‘স্বাধীনতা হোক দীর্ঘজীবী’ স্লোগান লিখে গেছে। নিরাপদ গুপ্তস্থানে সারা রাত এক চমৎকার ঘুম দেওয়ার পর এক প্রখ্যাত যুক্তিবিদ সেটা দেখতে পেয়ে বললেন, ‘যতো সব বস্তাপচা কথাবার্তা!’।

    যার স্মৃতিশক্তি ভালো, অন্যদের তুলনায় সে আরো সহজে ভুলে যেতে পারে।

    যে দড়ি গলায় দিয়ে মরবে, সেই দড়ির রংটা বাছাই করার অধিকার প্রত্যেকেরই আছে।

    ন্যায়পরায়ণতা ও নিরপেক্ষতা এক জিনিস নয়- ন্যায়পরায়ণতা হলো ন্যায়ের প্রতি পক্ষপাত।

    এমনকি পয়গম্বরের দাড়িও চেঁছে ফেলা যায়।

    অনেক ব্যাপার আমি নিজের থেকেই গোপন রেখেছি। এগুলো গোপন রেখে যেতে পারবো তো?

    আমরা লাল বালিশের কাভার দিয়ে পতাকা বানিয়েছি। অন্যরা পতাকা দিয়ে বালিশের কাভার বানিয়েছে।

    চিন্তাহীনতা হত্যা করে- অন্যকে।

    তলদেশ বলে কিছু নেই। তা নিতান্তই গভীরতার প্রতিবন্ধক। [খাঁটি গভীরতায় তলদেশ বলে কিছু হয় না। খাঁটি গভীরতা মহাশূন্যের মতো।]

    এমনকি আইনস্টাইনের সময়ও নির্ভর করতো টাউন-ক্লকের উপর।

    আমরা ব্যতিক্রমদের অধিকার নিয়ে লড়াই করি। ব্যতিক্রমরা যদি চায়, তো ‘তাদেরকে কোনো নিয়ম প্রমাণ করা’র অধিকার নিশ্চিৎ করা হোক। লেট এক্সেপশন প্রুভ দ্য রুল।

    পুতুলনাচের পুতুলকে ফাঁসিতে ঝোলানো খুবই সহজ। কারণ দড়ি তো তার সাথেই থাকে।

    উন্নাসিক হয়ো না। সত্য বলা যদি লাভজনক হয়, তো মিথ্যা বোলো না কখনো।

    আমি পৃথিবীকে বলতে চেয়েছিলাম একটিমাত্র শব্দ। না পেরে হয়ে গেলাম লেখক। [সেই শব্দটি কী? কোনো লেখকই হয়তো ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না তাকে।]

    এই নোংরা কাদাজলও একদা বিশুদ্ধ তুষার ছিলো। যথাযথ সম্মান রেখেই আমি তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাই।

    তাদের দেহ পরস্পরের এতোটাই কাছে ছিলো যে সত্যিকার ভালোবাসার জন্য কোনো জায়গা খালি ছিলো না সেখানে।

    লেখকদের প্রতি উপদেশ: মাঝেমাঝে আপনার একমাত্র কর্তব্য হলো লেখা বন্ধ করে দেওয়া। এমনকি লেখা শুরু করার আগেই।

    সন্দেহের ছায়া পড়লো তার উপর। আর সেই থেকে সে সেই ছায়ার মধ্যেই আত্মগোপন করে বেড়াচ্ছে।

    মানুষকে আলো দিতে চেয়েছিলো, এমন অনেককেই ল্যাম্পপোস্টে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো। [এই ঝুঁকি নিয়েই মানুষকে আলোর পথ দেখিয়ে যেতে হবে। তাতে যদি হানাহানি একটু কমে।]

    কেবল জিনিয়াস আর নির্বোধরাই মানসিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

    বোকামি হচ্ছে সকল অপরাধের জননী। তবে জিনিয়াসরাই সাধারণত অপরাধের জনক হয়ে থাকে।

    এই জীবন সবার জন্য মানানসই নয়৷

    আমরা একে অন্যের চোখের দিকে তাকালাম। আমি দেখলাম আমাকে। সে (নারী) দেখলো নিজেকে। [ভালোবাসার মধ্যেও আছে সূক্ষ্ম আত্মপ্রেম ও স্বার্থপরতা। তবু ভালোবাসা দরকার।]

    রাতের বেলায় সাহায্য চেয়ে চিৎকার কোরো না। প্রতিবেশীদের ঘুম ভেঙে যেতে পারে।

    চিন্তা না করার পক্ষে নির্বুদ্ধিতা কোনো অজুহাত হতে পারে না।

    অনেকেই কখনো কোনো আশা করে না- বাকিরা ক্রমশই আশা হারিয়ে ফেলতে থাকে। [আপনি কোন দলে পড়েন, পাঠক?]

    ‘সিংহটাকে জ্বালাতন কোরো না।‘ ‘কেনো?’, আমি জিজ্ঞেস করলাম পালককে। ‘ওর ডায়রিয়া হয়েছে', বললো সে।

    আশাবাদী আর নৈরাশ্যবাদীদের দ্বিমত কেবল একটা ব্যাপারেই: পৃথিবীর শেষ দিন কবে, সেটা নিয়ে। [আশাবাদীরাও জানে, দেরীতে হলেও দুনিয়াটা ধ্বংস হয়ে যাবে একদিন। নিরাশাবাদীরা মনে করে, ব্যাপারটা খুব তাড়াতাড়িও ঘটে যেতে পারে। এটুকুই পার্থক্য আর কী।]

    মাঝেমধ্যে শয়তানই আমাকে ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে প্ররোচিত করে।

    নিহত মানুষ যে প্রতিবাদ করে না, আবেলই এটা প্রথম আবিষ্কার করেছিলো। [এরপর থেকে পৃথিবীতে হাবিল আর কাবিলের মধ্যকার খুনোখুনি লেগেই আছে।]

    অন্ধকার জানালা প্রায়ই স্পষ্ট প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

    গরুকে কোকোয়া খাওয়ালেও তো দুধের বদলে চকোলেট মিলবে না।

    শোষণের বাদ্যযন্ত্রে স্বাধীনতার বাজনা বাজানো যায় না। [খুবই মূল্যবান কথা। বাঙলাদেশের দিকে তাকান।]

    কাদাজলকে আমরা মাঝেমাঝে গভীরতা ভেবে ভুল করি।

    স্বাধীনতার ভেক ধরা অসম্ভব।

    মানুষের দেহ একই সঙ্গে অ্যালকোহল আর ইহুদিবিদ্বেষ ধারণ করতে পারে না। একটু অ্যালকোহল খাওয়ান। শরীর থেকে ইহুদিবিদ্বেষ বের হয়ে যাবে।

    আমি জানি সবাই ইহুদিদেরকে ধনী বলে কেনো। ইহুদিরা সবকিছুর জন্য দাম দেয়, তাই।

    মাঝেমাঝে ঘণ্টাই চৌকিদারকে বাজায়।

    এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার স্ত্রীর প্রেমিককে যদি তোমার বিছানায় অন্য কোনো নারীর সঙ্গে শুয়ে থাকতে দেখো, তো কী করবে?’

    'একটা সুন্দর মিথ্যে?’ তাহলে শুনুন। এটাই সৃষ্টিশীলতা।

    এমনকি তার নীরবতার মধ্যেও ব্যকরণগত ভুল থাকে।

    কোনো কথাই যখন বলি না, এমনকি তখনও আমরা নীরব থাকি না। [আমাদের নীরবতাও আসলে একটা উক্তি, একটা বার্তা, একটা অবস্থান। আমরা নীরব থাকি কোনো কিছুর পক্ষে অথবা বিপক্ষে দাঁড়ানোর জন্যই। নীরবতা এতো নিরীহ কোনো ব্যাপার নয়। এর রাজনীতিটা খুবই বীভৎস।]

    আপনার স্বপ্নের কথা কাউকে বলবেন না। ফ্রয়েডপন্থীরা ক্ষমতায় এলে কী হবে বুঝতে পারছেন?

    নৈরাজ্য (Chaos) কী? সৃষ্টির (Creation) কালে ভেঙে-পড়া শৃঙ্খলাকেই (Order) বলে নৈরাজ্য। [নতুন কিছু সৃষ্টির পূর্বশর্ত হলো নৈরাজ্য। তবে নৈরাজ্য মানেই যে নতুন কিছু সৃষ্টি হবে- এমন না-ও হতে পারে। বাঙলাদেশে নৈরাজ্যই হয়। নতুন কিছু সৃষ্টি হয় না।]

    স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙ্গো, কিন্তু পাদবেদী অক্ষত রাখো- ওগুলো সবসময়ই কাজে লাগে।

    রক্ত-প্রদান সচরাচর ঘটে থাকে এক পকেট থেকে আরেক পকেটে।

    কথোপকথনের শিল্পকলা যদি আরেকটু সমৃদ্ধ হতো, তো আমাদের জন্মহার অনেকটাই কমে যেতো।

    ঈশ্বরের চোখ থেকে কি কখনো মানুষের অশ্রু ঝরেছে? [না, ঝরেনি। কারণ মানুষের দুঃখ ঈশ্বরকে বিচলিত করে না।]

    হে মনুষ্যসন্তান, যথেষ্ট বিনয় দেখিয়েছো। এখন সিংহ সাজা বন্ধ করো।

    স্বাধীনতার বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীনতাকে কার সঙ্গে বিয়ে দেওয়া যায়? [দুঃখিত, স্বাধীনতার বংশবৃদ্ধি সম্ভব নয়। প্রতিটি প্রজন্মকেই স্বাধীনতা অর্জন করে নিতে হয়]

    শিকলের সবচেয়ে দুর্বল কড়াটাই আসলে সবচেয়ে শক্তিশালীও বটে। কারণ সে শিকলটা ভেঙে ফেলতে পারে।

    আমি সুন্দর, আমি শক্তিশালী, আমি জ্ঞানী, আমি উত্তম। আর এইসবই হলো আমারই আবিস্কার।

    আমি তোমাকে চিনির প্রলেপ দেওয়া তেতো বড়ি খেতে দিলাম। বড়িটা নিরাপদ, কিন্তু চিনিটা হলো ক্ষতিকর।

    ‘একে অন্যকে হত্যা কোরো না'- এই উপদেশের আসল অর্থ আমরা প্রায়শই বুঝতে পারি না। আসল ব্যাপার হচ্ছে, সবাই চায় খুনখারাবির অধিকার কেবল তারই থাকুক, আর কারো নয়।

    যে দেশের অর্ধেক মানুষ পুলিশ, আর বাকি অর্ধেক কারাগারে বসে জেলের ভাত খায়, সেই দেশের উন্নতি কিভাবে সম্ভব?

    সংজ্ঞা এবং সমাপ্তি- এ দু’টোই শিকড় একই, এটা যেনো আমরা ভুলে না যাই।

    খেয়াল রেখো- ছাপার ভুল ছাড়াও আরো অনেক কিছু যুক্তিবাদকে (rationalism) জাতীয়তাবাদে (nationalism) রূপান্তরিত করতে পারে।

    অধিকার যখন ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যায়, তখন তার (অধিকারের) পিঠে গুলি খাওয়ার একটা ঝুঁকি তৈরী হয়।

    “মনে হচ্ছে আমার ডানা গজাচ্ছে’, বললো ইঁদুর। ‘তো কী হয়েছে, বাদুড়?’

    কিস্তিতে কিস্তিতে ঘুমিয়ে মৃত্যুবরণ করার মাধ্যমে মৃত্যুর হাত থেকে যদি মুক্তি পাওয়া যেতো! [মৃত্যু তো ঘুমই। ঘুমও মৃত্যুই। আরো ভালো করে বললে, ঘুম হয়তো মৃত্যুর ট্রায়াল। আমরা মরি একবার, প্রস্তুতি নিই সারা জীবন ধরে।]

    ‘নো এক্সিটে'র চেয়ে ‘নো এন্ট্রি’ চিহ্নটাই বরং আমার বেশি পছন্দের।

    মহাকর্ষ ছাড়া আর কোন বল আমাদেরকে এই পৃথিবীতে ধরে রেখেছে? [হাজার সমস্যা সত্ত্বেও এই দুনিয়াকে তো আমরা ভালোবাসি। হয়তো দুনিয়ার উপর কিছুটা মায়াও আছে- মহাকর্ষের পাশাপাশি। নইলে আমরা শূন্যে ভেসে যেতাম।]

    তোমার শত্রুকে ভালোবাসো- এতে তার সুনাম নষ্ট হবে। [শত্রুকে ঘৃণা করলে শত্রুকেই শক্তিশালী করা হয়। তার চেয়ে শত্রুকে উপেক্ষা করা ভালো। ভালোবাসা আরো ভালো।[

    মোটা মানুষ বাঁচে কম, খায় বেশি।

    ‘সে একজন চিন্তাশীল মানুষ'- এই কথাটার মধ্যে কি মানবজাতিকে কোনো ধরনের প্রশংসা করা হয়েছে?

    আমার মাথাকে সম্মান করো- এর ভেতরের চিন্তাভাবনা তোমাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে।

    ক্লান্ত বিপ্লবীরা ক্ষমতার আরামকেদারায় বসে বিশ্রাম নেয়। [চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরে এই ঘটনাই ঘটতে দেখলাম আমরা।]

    মানুষের চোখ খুলে দেয় যে চাবি, তাকে আমরা খুঁজে পাবো কি?

    নির্যাতন করলে এমনকি মর্ষকামীরাও সবকিছু বলে দেয়। কৃতজ্ঞতা থেকেই এটা করে বোধ হয়৷

    কিছু মানুষের চিন্তাভাবনা এতোটাই অগভীর যে তারা এমনকি তাদের মাথা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না।

    মানুষ উৎসর্গের যোগ্য- তবে মানুষের উৎসর্গের যোগ্য নয়। [কোনো মানুষই এতো মহান নয়, বা মূল্যবান নয়, যে তার জন্য অন্য কোনো মানুষ তার প্রাণ উৎসর্গ করবে। আমরা সবাই বাঁচার জন্য এসেছি।]

    ঈশ্বরের জিনিস ঈশ্বরের কাছে ফিরে যায়, সিজারের জিনিস সিজারের কাছে ফিরে যায়। মানুষের কাছে কি কিছু ফিরে যায়?

    আমি স্বপ্ন দেখি এমন এক নোঙ্গরের, যেটা সাথে করে পুরো ডাঙ্গাকেই টেনে আনতে পারবে। [তাহলে তো নাবিকেরা ঘরবাড়ি নিয়েই সমুদ্রে ভেসে বেড়াতে পারতো।]

    জুডাসের চুমো কবিদের চোখ বন্ধ করে দেয়।

    একটা নতুন সমস্যা। মানুষ যদি লম্বা থেকে আরো লম্বাই হতে থাকে, তাহলে কী হবে? আমরা কি তাদেরকে কেটেছেটে ছোটো করে দেবো? নাকি পৃথিবীটাকেই এমনভাবে বদলে দেবো যাতে তারা নির্বিঘ্নে বসবাস করতে পারে?

    প্রাচীন পুরাণের নায়কেরা প্রায় নগ্নই থাকতেন। আর বর্তমানের নায়কেরা সবসময়ই নগ্ন থাকেন।

    রাষ্ট্রের ভিত্তি সবসময়ই আন্ডারগ্রাউন্ডে নির্মাণ করতে হয় কেনো? [রাষ্ট্র চায় লুকায়িত থাকতে। অর্থাৎ স্বরূপে হাজির না হয়েই সে কাজ হাসিল করতে চায়। হয়তো সে কারণেই আন্ডারগ্রাউন্ড তার এতো পছন্দ।]

    বুকে ঘা দিয়ে দেখো: যদি পদকের ঝনঝনানি শুনতে পাও, তো তুমি নিষ্পাপ।

    গালে দাঁত না থাকলে জিহ্বার স্বাধীনতা তো একটু বাড়ারই কথা।

    যে দেবতা আয়নার দিকে তাকাতে ভয় পায়, তার উপাসনা কোরো না৷

    মানুষ যেদিন সত্যি সত্যিই নীতিবান হবে, সেদিন সে যাযাবরদের জন্য ভ্রাম্যমাণ জেলখানা তৈরী করবে।

    হে ভদ্রমহিলাগণ, পুরুষদের ব্যাপারে নালিশ করবেন না: তাদের ধান্ধা আপনাদের কাপড়ের মতোই স্বচ্ছ।

    জীবনকে নাটকে পরিণত কোরো না। তোমার চেয়ে ভালো কোনো অভিনেতা যদি তারা খুঁজে পেয়ে যায়? [আমার জীবনে তো আমিই অভিনেতা- নাকি আমার জীবনের দখলও অন্য কারো হাতে চলে যাবে?]

    প্রথম ঢিলটা তুমিই ছোড়ো- নইলে তোমাকে ওরা রক্ষণশীল বলবে।

    কেউ কেউ যেটা বিশ্বাস করে, সেটা বুঝতে চায়। আর কেউ কেউ যেটা বোঝে, সেটাই বিশ্বাস করতে চায়।

    বাঁধা-বিঘ্নহীন, মসৃণ পথেই সবচেয়ে শক্তিশালী ব্রেকগুলো ফেইল করে।

    জীবনকে দীর্ঘায়িত করবে তখনই, যখন জীবনের ভোগান্তিকে কমানোর সামর্থ্য তোমার থাকবে।

    চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত: এই বিচার তো এক ধরনের বিনিময়প্রথা; একে কেনাও যাবে, আবার বেচাও যাবে।

    ডেমোস্থিনিস মুখের মধ্যে একটা পাথর নিয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলতেন। যেনো সেটা কতো বড়ো বাঁধা!

    দাসেরা স্বপ্ন দেখে এমন এক বাজারের যেখানে তারা মালিক কেনা-বেচা করতে পারবে।[দাসেরাও হয়তো দাসত্বের বিলুপ্তি চায় না। মজলুমও চায় জালেম হতে।]

    মনে রাখা কিংবা ভুলে যাওয়া- কোনো ক্ষেত্রেই তুমি মানুষের উপর নির্ভর করতে পারো না।

    অমরত্ব: অন্যের জীবন থেকে গড়ে ওঠা একটা জিনিস৷

    জুডাসরাও শেখে কিভাবে ক্রুশ বহন করতে হয়৷

    কেইনরা দিন দিন আরো স্মার্ট হচ্ছে। তারা এখন অ্যাবেলদের কপালে তাদের চিহ্ন রেখে যায়।

    সাবধান। ভুলক্রমে অমর কিছু সৃষ্টি করে ফেলো না। পরে সেটাকে ধ্বংস করার জন্য কতো মানুষকে প্রাণ দিতে হবে, সেটা ভেবে দেখো একটু।

    অন্ধকার কেটে ঊষার আলো ফুটবে কখন, সেটা নির্ভর করে ভৌগোলিক অবস্থানের উপর।

    অনেকেই চেষ্টা করেছিলো চিন্তাকে শিলীভূত করে পরশ পাথর তৈরী করতে।

    অস্তিত্বের প্রমাণ রেখে যাওয়ার জন্য আমাদের কার্বন কাগজে বেঁচে থাকতে হবে।

    জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি সভাসদদেরকে তার পশ্চাৎদেশ দেখানোর জন্যই সর্বদা শাসককে কুর্নিশ করতেন।

    ভেবেচিন্তে কথা বলো। শত্রুরা শুনছে।

    ভয় যখন মলিন হয়ে যায়, তখন এর রক্তের দরকার পড়ে।

    পৃথিবীকে জনাকীর্ণ করা যেমন সহজ, জনশূন্য করাও তেমনই সহজ। সমস্যাটা কোথায় তাহলে? [সমস্যা হলো, কোনোটাই যথাযথ পরিমাণে করা যায় না। কমবেশি হয়ে যায়।]

    আমি যদি খালি জানতে পারতাম জেরিকোর প্রাচীরের সামনে দাঁড়িয়ে তারা কী সুর বাজিয়েছিলো!

    শীর্ষ পুরোহিতরাই যতো দাবি-দাওয়া করে; দেবতাদের কোনো দাবি-দাওয়া নেই। [এই কারণেই পুরোহিতদেরকে দেবতাদের প্রতিনিধি হতে দেওয়া উচিত নয়। কারণ, পুরোহিতের দোষে শেষ পর্যন্ত দেবতারই নাম খারাপ হবে।]

    তারা এতো ব্যাখা-বিশ্লেষণ না করলে আমি বিষয়টা বুঝতে পারতাম।

    গুহাশিল্পীরা কি আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতো? আমার তো তেমনই মনে হয়৷

    তারা যখন এতো জোরে প্রাচুর্যের সানাই বাজাচ্ছে, তখন ভেতরটা নিশ্চয়ই খালি। [খালি কলস বাজে বেশি। অন্তঃসারশূন্যদের বৈশিষ্ট্যই এটা। তারা গলার জোরে সবকিছু চাপা দিতে চায়। ]

    বাহু আলগা করো মানুষকে আলিঙ্গন করে যেও না। খালি খালি নিজের ক্রুশবিদ্ধ হওয়াটাকে সহজ করে দেওয়ার কী দরকার?

    প্রত্যেক ধর্মেরই নিজস্ব মরণ-খুঁটির (stake) দরকার।

    শীর্ষ পুরোহিতরা যখন বদহজমে ভোগে, তখন দেবতাদের উদ্দেশ্যে দুষ্পাচ্য খাবার উৎসর্গ কোরো না। [কারণ সেক্ষেত্রে খাবার নষ্ট হবে। দেবতারা তো কিছু খান না। পুরোহিতরাই গপগপ করে গেলে। ]

    তারা পৃথিবীকে ধ্বংস করে ওঠার আগেই যদি পৃথিবীর অবসান ঘটে যায়, তো আমার সত্যিই খুব হাসি পাবে।

    একটা সময় ছিলো, যখন আইন মেনেই দাস ক্রয়-বিক্রয় করতে হতো।

    এমন অনেকেই আছে যারা জলের অনেক গভীরে গিয়েও মামুলি বুদ্বুদ ছাড়া আমাদেরকে কিছুই দিতে পারে না।

    অপরাধ থেকে কতোটা দূরে আছে- মাঝেমাঝে এটাই হলো মানুষের মহত্ত্বের একমাত্র পরিমাপক।

    মেসায়ারাও (Messiah) অধৈর্য্য হয়ে উঠেছে- তারাও অপেক্ষা করছে আগমনের জন্য। [আদৌ কি আসবে কোনো মেসায়া? সময় তো পার হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন পরেই আমরা হয়তো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবো।]

    আমাদের দাবি: আট ঘণ্টার চিন্তা-দিবস!

    নির্দোষ ব্যক্তির কি কোনো নৈতিক অধিকার আছে লুটের মালে ভাগ বসানোর?

    নরখাদকরা সেইসব মানুষ খেতেই বেশি পছন্দ করে, যাদের কোনো মেরুদণ্ড নেই। [স্বাভাবিক। মাছে কাটা বেশি হলে সেই মাছ খেতে কষ্ট হয়। কোনো মানুষের মেরুদণ্ড থাকলে তাকে চিবিয়ে খাওয়া একটু কঠিন হয়ে যায়। এইজন্য নরখাদক স্বৈরশাসকেরা দেশের মেরুদণ্ডওয়ালা লোকজনকে হয় মেরে ফেলেন, দাবিয়ে রাখেন, নয়তো ঘাড় ধরে দেশের বাইরে বের করে দেন। শিরদাঁড়া যাদের নেই, তারা তো স্বেচ্ছায় ও সানন্দে স্বৈরাচারীর মুখের মধ্যে গিয়ে বসে থাকে। যাদের কিছু না কিছু শিরদাঁড়া আছে, তাদেরটা উপড়ে ফেলার প্রয়োজন হয়। ]

    তারা ওকে নির্যাতন করলো- ওর ভেতরে নিজেদের চিন্তাভাবনা খুঁজে পাওয়ার জন্য। [মানুষের আত্মার ভিতরে ঢুকে চাবুক চালানো গেলে তারা সেটাই করতো। সমস্যা হলো, সেটা সম্ভব নয়। মানুষের আত্মা অবিনশ্বর হয়তো নয়, কিন্তু চরম শক্তিশালী।]

    মানুষকে যখন আগুনে পুড়িয়ে মারা হচ্ছিলো, তখন সে খুব কষ্ট পাচ্ছিলো। কারণ আগুনের ধোঁয়ায় তার অ্যালার্জি ছিলো।

    একবার প্যান্ট খুলে পড়ে গেলে মর্যাদার সঙ্গে প্যান্টটা আবার পরে নেওয়া খুবই কঠিন। [সেটাই। যতো সহজে মানসম্মান চলে যায়, ততো সহজে ফিরিয়ে আনা গেলে তো মানুষের এতো দুঃখ থাকতো না।]

    তাদের কপালে দুঃখ আছে, যাদের মনে ঘৃণা তাদের শত্রুর চেয়ে বেশি। [ঘৃণা মানুষের আত্মাকে ধ্বংস করে ফেলে। শত্রুকে ঘৃণা করলে নিজেরই ক্ষতি করা হয় বেশি।]

    অনেক জেব্রাই গরাদের আড়ালে বসে থাকতে ভালোবাসে শুধু এ কারণেই যে তাতে তারা শাদা ঘোড়া সাজার একটা সুযোগ পায়। [জেব্রার গায়ের কালো দাগগুলো শিকের সাথে মিলে গেলে তাকে শাদা ঘোড়াই মনে হবে, তাই না?]

    পৃথিবী সৃষ্টি করেছে কে? এখন পর্যন্ত ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ দায় স্বীকার করেনি। [পৃথিবীর যে দুর্দশা, তাতে ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ এই দায় স্বীকার করলে তার সমূহ বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।]

    এমন অনেক সময়ও আসে যখন একজন দার্শনিক তার মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বলে উঠতে পারে, ‘বেঁচে গেছি, ভগবান! ভাগ্যিস মানুষ আমাকে বুঝতে পারেনি।’ [হে পাঠক আপনি তো এতক্ষণ ধরে স্তানিসোয়াভ ইয়েজি লেসে-র প্রবচন পড়লেন। কিছু কি বুঝতে পারলেন?]

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে প্রতিক্রিয়া দিন