এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • বহ্নি মধুময় অথবা মধু বহ্নিময়ঃ (উপন্যাসিকা ঃ অন্তিম পর্ব) 

    রানা সরকার লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ৬ বার পঠিত
  • | | | | | | | |
    শীত এবার যেন একটু আগেই এসে উপস্থিত হয়েছে। সবার গায়েই হয় চাদর নয়ত হাফহাতা সোয়েটার। বৃহস্পতিবার থেকে পুরুতমশাই এর বাঁ চোখ কাঁপতে শুরু করেছে। তিনি সে কথা বললেন অনাদিবাবুকে। অনাদিবাবু তখন শব্দজব্দ করতে ব্যস্ত। বললেন, “কাঁপুক। কাঁপুনি বেড়ে গিয়ে যদি পাখির ডানার মতো ঝাপটায় তখন বলবেন”।

    ব্যাজার মুখ করে একটা পুরনো রবিবারের কাগজ খুলে তাতে রাশিফল দেখতে থাকলেন পুরুতমশাই। বাইরে পাখি ডাকছে। রাস্তা দিয়ে সাইকেল এবং গাড়ি যাবার আওয়াজ আসছে থেকে থেকে। হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে মংকার প্রবেশ। হাঁফাচ্ছে।

    মংকাকে দেখে অনাদিবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, “বলত, অচিনের সাথে কী বসবে ...., দু’অক্ষর”।

    মংকা এই শীতেও বেশ ঘেমে গেছে। রুমাল দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বলল, “সর্বনাশ হয়েছে অনাদি জ্যেঠু, পাখি হাওয়া ..”।

    “এই তো পাওয়া গেছে, অচিনপাখি .., অচিন..., পাখি”, তখনও শব্দজব্দের থেকে বোরোতে পারেননি অনাদিবাবু, বললেন, “বাঃ, আর তিনটে বাকী রইল”।

    “আর কিছু বাকী নেই। সব হাওয়া। সব প্ল্যান গোত্তা খেয়ে পড়ল”।

    পুরোহিত মশাই প্রথমে খেয়াল করেননি কিন্তু দ্বিতীয়বার মংকা যখন বলল তখন একটা গোলমালের গন্ধ পেয়ে শুঁকতে শুঁকতে চলে এলেন মংকার কাছে। ইশারায় জানতে চাইলেন ব্যাপারটা কী। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল মংকা। বিলাপের করে বলতে থাকল, “মধুর কী হবে গো......, মধুর!”।

    “মধুর আবার কী হবে?”, অনাদিবাবু চোখ তুলে জরীপ করলেন মংকাকে। কাছে এসে কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বললেন, “কী রে? অমন করছিস কেন?”

    “আর কেন? কাল থেকে বহ্নিরা সবাই বেপাত্তা; সব হাওয়া! চাকরটাকে রাস্তায় ধরলাম, বলল, সে ব্যাটা কিছুই জানে না”।

    “নিন, আমার বাঁ চোখের পাতা সকাল থেকে পাখির ডানার মতো কাঁপছিল”, পুরুতমশাই অনাদিবাবুর দিকে সরে এলেন।

    “ইয়ার্কির ব্যাপারে সিরিয়াস একদম ভালো লাগে না। এই মংকা কী হয়েছে খোলসা করে বল তো!”।

    মংকা যা বলল তার সারমর্ম এই যে গত মঙ্গলবার থেকে বহ্নিদের বাড়ির কাউকে দেখা যাচ্ছে না। কখন যে বাপ-মা-মেয়ে বেড়িয়ে গেছে তা কেউ জানে না। প্রতিবেশীরাও কোনও সাড়াশব্দ নাই পায় নি। আজ বৃহস্পতিবার হয়ে গেল অথচ এখনও ফিরে আসেনি। কোথাও যে বেড়াতে যাবে সে কোনো খবর ছিল না। খবর থাকলে বহ্নি মধুকে নিশ্চয়ই জানাত। চাকরটাকে জিজ্ঞাসা করে কোনো কুলকিনারা পাওয়া যাচ্ছে না। কথা শেষ হওয়ার আগেই পলতেদা আর ফচকা এসে হাজির। ওরাও কোথা থেকে যেন খবর পেয়েছে। হঠাৎ এইরকম একটা খবরে সব চুপ করে গেল। মনে হচ্ছিল সবার মুখে আর মনে কে যেন তালা লাগিয়ে দিয়েছে যার চাবি আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ওদিকে মধুকে যে খবরটা কীভাবে দেবে তার উপায়ও পাওয়া যাচ্ছে না খুঁজে।

    খবরটা অবশ্য মধু পেল দিন দুই পরে। তবে পলতেদাদের থেকে নয়, পাড়ার একজন লোকের কাছ থেকে শুনতে পেয়েছে। সে কানাঘুসো শুনেছে যে বহ্নি না কী পাড়ার এক ওচাটে ছেলের প্রেমে পড়েছিল। ব্যাপারটা চারুবাবুর স্ত্রীর তেমন পছন্দ হয় নি। চারুবাবু অবশ্য নিমরাজী ছিলেন কিন্তু বউ-এর রুদ্রমূতির্র সামনে হার স্বীকার করে নেন। বহ্নিকে নিয়ে ওরা যে কোথায় গেছেন কেউ জানে না আর এই ব্যাপারে যথেষ্ট গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে। শোনা গেছে যেখানে গেছে সেখানে নাকী কোনো ফোন নেই। ফোন মানে আজকের ল্যান্ডলাইন। মোবাইলের চল তখনও হয় নি। বহ্নি অবশ্য প্রথমে যেতে চায় নি। শেষে মা তার মাথার দিব্যি দিয়ে নিয়ে গেছে।

    এসব শুনে একদম মন মরা হয়ে গেছিল মধু। বাবা শান্তনা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে ভুলে যেতে। পয়সাওয়ালা বাপের মেয়ে তো, তোকেও দেখবি ক’দিন পরে ভুলে গেছে। শুনেছিলাম যে ব্যানার্জী পাড়ার কিশলয়ের সঙ্গে নাকি বহ্নির বিয়ের কথাবার্তা চলছে। কিশলয় এমনিতেই বাইরে কাজ করে। বিদেশে। আর ও হল ওঁর মায়ের বান্ধবীর ছেলে। ফলে...

    মা জুগিয়েছিল সাহস, ভরসা। বলেছিল, “তোর বাবার কথা ছাড় তো। আমি তো মেয়ে। একটা মেয়ের মনের কথা তোরা জানবি কী করে? মেয়েরা যাকে একবার মন দেয় তাকে আর ভুলতে পারে না। তুই পলতেকে বল। উপায় ঠিক একটা বেরোবেই”।

    তাই বড় আশা নিয়ে চলে এসেছে অনাদিবাবুর বাড়িতে। ডেকেও এনেছে সবাইকে। সবাইতো ভীষন হতোদ্যম হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তারা যখন দেখল মধুর মধ্যে একটা লড়াই, একটা সংগ্রামের শিখা জ্বলছে, তখন সেই আগুণের তাপ তাদের মধ্যেও বিকিরিত হল।

    মংকা তেতে গেল সবচেয়ে বেশি। বলল, “চলতো, একবার চারুবাবুকে চমকে দিয়ে আসি....”।

    অনাদিবাবু এমনভাবে মংকার দিকে তাকালেন যেন এক্ষুনি ভস্ম করে দেবেন। বললেন, “তুই কী গোটা ব্যাপারটা কেঁচিয়ে দিবি না কি? অ্যাঁ? চারুবাবুকে চমকালে উনি ছেড়ে কথা বলবেন? জানিস না পার্টি করেন। এলাকায় একটা প্রভাব প্রতিপত্তি আছে?”

    “হয়ে গেল”, বলে হাল ছেড়ে দিল মংকা।

    “হুম। তাই ক’দিন ধরে দেখছিলাম, রাস্তায় আমার সাথে দেখা হলে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন। সুতরাং অন্য প্ল্যান ......”, বলে হাতড়াতে থাকলেন অনাদিবাবু।

    “কিন্তু বুঝতে পারছি না কথাটা চারুকাকীমার কানে দিল কে? তুই কিছু আঁচ করতে পেরেছিস মধু?”, পলতেদা মধুর দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল।

    মাথা ঝাঁকিয়ে মধু বলল, “ঠিক বুঝতে পারছি না...”।

    “শালা, একবার পেলে না ..”, মংকা আবার ফর্মে ফিরে এল।

    “আচ্ছা, পারমিতার বাড়িতে একবার গেলে হয় না..”, ফচকা যেন একটা আলোর রেখা পেয়ে গেছে।

    পলতেদা তাতে অন্ধকার ঢেলে দিয়ে বলল, “ধুর, এসব হচ্ছে রেজিমেন্টেড পার্টির সিক্রেট ব্যাপার। মনে হচ্ছে না যে মেয়েটা কিছু জানে। তাছাড়া ও মধুকে লাইক করতো না। কি রে মধু?”

    “হ্যাঁ”, ইতস্তত করল মধু, “ও আমাকে পছন্দ করে না। ও গিয়ে কিছু হবে না..। মনে হচ্ছে ওই কিছু কলকাঠি...”

    “তবে?”

    “তবে, ভাব। মাথাটা পেয়েছ কী জন্যে ..?”

    কিন্তু সময় দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে রাতের দরজায় কড়া নাড়তে থাকলেও কারো মাথা থেকে কোনো উপায় বেরোল না। শুকনো মুখে ফিরে গেল যে যার বাড়ি।

    রবিবারের আলস্যি সকালে ঘুম ভাঙতে একটু দেরীই হয় মধুর। কালকে রাত্রে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছে সে। দেখেছে সে বহ্নির বাড়িতে গেছে। নীচের ঘর সম্পূর্ন ফাঁকা, অন্ধকার। দোতলায় একটা আবছা আলো দেখা যাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় আস্তে আস্তে উঠে দেখল চারুবাবু আর তার বউ রাক্ষসের ভঙ্গীতে কী যেন খাচ্ছে। কাছে গিয়ে দেখে চারুবাবু খাচ্ছে তার মেয়ের হারমোনিয়াম আর প্রমীলাদেবী খাচ্ছেন মধুর সরোদখানা। ধড়ফড় করে উঠে দেখে রাত প্রায় সাড়ে তিনটে বাজে। তারপর ঘুম আসেনি অনেকক্ষন। চোখে মুখে জল দিয়েও ঠায় বসেছিল মধু।

    তারপর ভোরের আলো ফুটলে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল কে জানে। ঘুম ভাঙল পলতেদার ধাক্কায়। যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব হাতমুখ ধুয়ে বাথরুম সেরে চলে এলো অনাদিবাবুর বাড়ি। ফচকা, মংকাও হাজির। অনাদিবাবু ট্রেতে করে কাপ ভর্তি চা এনে হাজির করল। নিঃশব্দতার আড়মোড়া ভাঙল মংকা। পলতেদাকে বলল, “কী ব্যাপার? সাতসকালে টেনে নিয়ে এলি যে বড়। তোর প্ল্যানটা কী?”

    পলতেদা মুখ তুলল না। চোখ বন্ধ করে চায়ে চুমুক দিয়ে চলেছে। সকালের প্রথম চায়ের আমেজে মনটাকে সারাদিনের জন্য কিক-অফ করে নিচ্ছে। চা শেষ করে বলল, “বন্ধুগণ, কাল রাতে স্বপ্নে আমি একটা প্ল্যান পেয়েছি। যদি খবরগুলো ঠিকঠাক হয়, মানে যদি ....”

    “হেয়ালী কোরো না তো পলতেদা। যদি যদি করে কি নদীতে ডুবিয়ে মারবে?”, ফোঁড়ন কাটল ফচকা।

    “আহ, তোমরা শুনতে দেবে। তোমাদের দোষ কী জান, কোনো ব্যাপারে তোমরা সিরিয়াস নও। বল পলতে, কী প্ল্যান?”, অনাদিবাবু যেন তার নিজের যৌবনে ফিরে গেছেন।

    “আমাদের একটা চারচাকা লাগবে”।

    “ও নিয়ে ভাবতে হবে না। আমার বন্ধুর থেকে ধার চেয়ে নেব ক’দিনের জন্য”।

    “ব্যাস, যদি বহ্নিকে যেখানে আটকে রেখেছে সেখানে কোনো ফোন না থাকে তাহলেই ....”

    “তাহলে কী?”, মধুও থাকতে না পেরে জিজ্ঞাসা করল।

    গোল হয়ে বসল সবাই। পলতেদা তার প্ল্যান সবাইকে ধীরে ধীরে বুঝিয়ে বলতে থাকল। আস্তে আস্তে আশঙ্কার মেঘ কেটে গিয়ে সবার মুখে ফুটে উঠল রোদের হাসি।

    ************************************

    ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ। একে তো ঠান্ডা পড়েছে হাঁড়কাঁপানো তার সাথে সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা। মাংকি ক্যাপ, পুলওভার আর ভারী চাদরে মানুষেরা ঢেকে নিয়েছেন নিজেদের। শীতকাতুরেরা তার সাথে পায়ে পড়েছেন মোজা আর গলায় জড়িয়েছেন মাফলার। বেলা ১০টাতেও মনে হচ্ছে সন্ধ্যে।

    পলতেদা, মংকা, মধু আর অনাদিবাবু বসে আছে একটা অ্যাম্বাস্যাডারের ভিতর। এমন দূরত্বে গাড়িটা দাঁড়িয়ে রাখা আছে যাতে বহ্নিদের বাড়ির রাস্তা দেখা যায়, আবার বহ্নিদের বাড়ি থেকে গাড়িটাকে দেখা না যায়। বহ্নিদের বাড়ির সামনে দাড়িয়ে আছে চারুবাবুদের অ্যাম্বাস্যাডারটা।

    পলতেদা বলল, “ওয়েদারটা একদম সিচুয়েশনের সংগে ফিট করে গেছে”। সবাই সম্মতি জানাল।

    মংকা একটু অধৈর্য, “আর কতক্ষন যে অপেক্ষা করতে হবে কে জানে রে বাবা?”।

    কিছুক্ষণ পড়েই অবশ্য একটা অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াল বাড়ির সামনে। মংকা টেনশনে মুখে অদ্ভূত একটা শব্দ করল। অনাদিবাবু সবাইকে সাবধান করে দিলেন যে অতি উৎসাহে যেন আসল কাজটা পন্ড না হয়ে যায়। গাড়ি দুটোর নম্বর দেখে মুখস্ত করে নিতে বললেন সবাইকে আর ড্রাইভারকে বললেন কোনো মতেই দুটো গাড়ীর একটারও পিছু ছাড়া যাবে না।


    ওরা দেখল যে দুদ্দার করে প্রমীলাদেবী আর চারুবাবু নিজেদের গাড়িতে উঠে বসলেন। দেখে প্রচন্ড উদ্বিগ্ন লাগল ওদের। দু’একজন উৎসাহী পাড়া প্রতিবেশী বেরিয়ে এসেছিলেন। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে কী ব্যাপার? চারুবাবু তাদের ভুজুংভাজুং দিয়ে এড়িয়ে গেলেন। নিজের গাড়িতে বসবার আগে অ্যাম্বুলেন্সের চালককে কী যেন বোঝালেন। তারপর গাড়িতে উঠে ইশারা করলেন। প্রমীলাদেবী হাত মাথায় ঠেকিয়ে করল প্রার্থনা। বহ্নিদের গাড়ি আর অ্যাম্বুলেন্স স্টার্ট দিল, সাথে মধুদের গাড়িও।

    তিনটে গাড়িই চলেছে। কলকাতা থেকে দ্বিতীয় হুগলী সেতু দিয়ে বম্বে রোড পেরিয়ে এসে পড়ল দিল্লী রোডে। মধুদেরটা একটা দূরত্ব বজায় রাখছে। প্রায় এক ঘন্টা হয়ে গেছে। বাঁশবেড়িয়া ব্রিজ ধরে পড়ল হাইওয়েতে। মধু জিজ্ঞাসা করল, “কল্যানী না কি?”

    পলতেদা উত্তর দিল, “হবে হয়ত”।

    গাড়ি অবশ্য কল্যানীর দিকে না ঢুকে কাঁচরাপাড়া হয়ে জয়েশপুর ঢুকল। এখানে বেশির ভাগ বাড়ি টালির। পাকা বাড়ির সংখ্যা বেশ কম তবে গাছগাছালি প্রচুর। চারুবাবুর গাড়ি আর অ্যাম্বুলেন্সটা মাঠের পাশে একটা পাকা বাড়ির সামনে এসে থামল। অনাদিবাবু দূরবীন বের করে দেখলেন। দূর থেকে দোতলার ব্যালকনিতে দেখা গেল বহ্নিকে। গাড়ি আর অ্যাম্বুলেন্স দেখে পাড়া প্রতিবেশীরাও এগিয়ে এলেন।

    অনেকটা দূরত্বে গাড়ি পিছিয়ে পলতেদাকে দেখে আসতে বললেন অনাদিবাবু। ওদিকে গাড়ি থেকে নেমে চারুবাবু প্রতিবেশীদের বললেন, “আপনাদের এখানে ভীষণ আন্ত্রিক আর ম্যালেরিয়া হচ্ছে শুনে এলাম। ক্লাবের কে এক বল্টু ফোন করে আমায় জানালো!”।

    প্রতিবেশীরা তো অবাক। তাদের থেকে যেটা জানা গেল যে গতবছরও আণ্ত্রিকের প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। তবে এবছর প্রায় নেই বললেই চলে। পঞ্চায়েত থেকে বার বার প্রচার করে সবাইকে সাবধান করা হয়েছিল। ফলে লোকজন এবার বেশ সতর্ক। ক্লাবের ছেলেদের ডেকে আনা হল। কিন্তু বল্টুর হদিশ পাওয়া গেল না।

    একজন বলল যে পুবপাড়ায় একজন বল্টু আছে বটে তবে সে তো এখনও হামা দেয়, আর মাথায় চুলই গজায় নি। সে কী করে ফোন করবে? পাড়ার লোকজনদের মধ্যে কোথায় কত বল্টু আছে তাই নিয়ে বাগবিতন্ডা লেগে গেল। প্রমীলাদেবী অবশ্য মেয়েকে সুস্থ পেয়ে আশ্বস্ত হলেন। গায়ে মাথায় বুলিয়ে দিলেন হাত।

    বহ্নি তো এইসব দেখে বেশ অবাক। শুনল যে এখান থেকে বাড়িতে কে যেন ল্যান্ডলাইনে ফোন করে বলেছেন যে তার আন্ত্রিক আর ম্যালেরিয়া – দুটোই ভীষণ রকম হয়েছে। প্রায় মর মর অবস্থা।


    শুনে হাসি পেল না বহ্নির। গোঁসা করে থাকল সে। মুখ ফুটে কথা বলল না কারুর সাথে। কেন তাকে মিথ্যে কথা বলে এখানে আটকে রাখা হবে? কী করেছে সে? সে অ্যাডাল্ট। আর ভালোমন্দ বোঝবার একটা ক্ষমতা তার হয়েছে। এই জয়েশপুরে ক’টা দিন আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতে থাকতে মাঝেমধ্যে মনে হয়েছিল নিজের মা-বাবা যদি তাকে এভাবে আটকে রাখতে পারে, তবে তার পালিয়ে যাওয়াতেই বা দোষ কোথায়? তবে অপেক্ষা করেছিল, যদি মধুর দিক থেকে কোনো সিগন্যাল পাওয়া যায়। কিন্তু কে ফোন করে বলল? কে?

    ওদিকে সব শুনে চারুবাবু ভ্রু কোঁচকাল। অর্ন্তঘাত নয়ত? কেউ কি তাদের সাথে মশকরা করল। কেউ কি? .....

    ওদিকে বেশিক্ষন দাঁড়াল না পলতেদারা। যদি ধরা পড়ে যায় তাহলে গোটা প্ল্যানটাই ভেস্তে যাবে। কেঁচে গন্ডুস করতে হবে, তাও আবার করা যাবে নাকী কে জানে?

    মধুর খুব বহ্নিকে দেখতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু অনাদিবাবু বললেন, “এখন দেখলে আর জীবন ভর দেখতে পাবি না। চল, আমাদের হয়ে গেছে। ড্রাইভার গাড়ি ঘোরাও”।

    অনাদিবাবুদের গাড়ি ফিরে চলল। গ্রামে প্রাইভেট গাড়ি নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আসা এবং এক অজ্ঞাত পরিচয় বল্টুর ফোন করা ব্যাপারটা নিয়ে এতো হইচই হল যে অন্য একটা গাড়িও যে গ্রামে ঢুকেছিল সেই খবরটা খুব একটা পাত্তা পেল না। ফলে
    চারুবাবুর কানে গিয়ে পৌঁছল না যে তাদেরকে অনুসরণ করে কারা এসেছিল।

    এরপরে যা ঘটার তাই ঘটল। বহ্নি ক’দিন পরে গায়েব হয়ে গেল জয়েশপুরের বাড়ি থেকে। ক্লাবের ছেলেদের সাহায্য অবশ্য ছাড়া এ সম্ভব ছিল না। এই বিষয়ে তাদের বোঝাতে গিয়ে বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে পলতেদাদের। এর মধ্যে অবশ্য মধু একটা ছোটোখাটো চাকরী জুটিয়ে ফেলেছে। ব্যাস চারহাত এক। রেজিস্ট্রী করে আসবার পর অনাদিবাবুর ক্লাবঘরে এখন চলছে খাবারদাবারের আয়োজন।।

    ওদিকে ফচকা আর মংকা একটা আশ্চর্যরকম গোলমালে পড়েছে। যে ঘরে খাওয়া হবে সেখানে তারা মধু আর বহ্নিকে নিয়ে কিছু একটা লিখে দেওয়ালে সাঁটাবে ভেবেছিল। কিন্তু কী লিখবে ঠিক করে উঠতে পারছে না। ‘মধু বহ্নিময়’? না ‘বহ্নি মধুময়’?।

    এই, আপনারাই বলুন না, কী লিখবে? ...

    (সমাপ্ত)
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | | | | | | |
  • ধারাবাহিক | ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু প্রতিক্রিয়া দিন