এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • বহ্নি মধুময় অথবা মধু বহ্নিময় ঃ (উপন্যাসিকা ঃ পর্ব ৪) 

    রানা সরকার লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ৩১ জুলাই ২০২৬ | ২০ বার পঠিত
  • | | | |
    ক’দিন ধরে মধুর যে কী হয়েছে কে জানে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই উদাস হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকছে। বারে বারে হয়ে যাচ্ছে ভুল। বুকের ভেতরটা থেকে থেকে ‘মোৎসার্ট’ মোচড়াচ্ছে। মাঝরাতে ভেঙে যাচ্ছে ঘুম। বহ্নিকে দেখলেই বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে। মনটা থেকে থেকেই গুনগুন করে উঠতে চাইছে। আর সব সময় যেন হাওয়ায় ভাসছে সে।

    পলতেদা এইসব লক্ষণগুলো শুনে বলল যে ব্যাটা নির্ঘাৎ প্রেমে পড়েছে। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও মধুর মুখ থেকে বের করা গেল না যে ঘটনাটা ঠিক কী বা সে কার প্রেমে পড়েছে। এর ক’দিন পর অনাদিবাবুর ক্লাব ঘরে পাড়ার মেয়েরা কে কেমন তাই নিয়ে তর্ক উঠল। পলতেদা বলল যে কোনো মেয়ের ব্যাপারে কিছু বলবার পরে তাকে পয়েন্ট দিতে হবে। বড়রা সেদিন কেউ উপস্থিত ছিলেন না। আর অনাদিবাবু গেছিলেন কলকাতায় কী একটা ব্যক্তিগত কাজে।

    কথা হচ্ছিল মেয়েদের ধরণ-ধারণ, ব্যবহার আর আকৃতি নিয়ে। কে যেন বলল অর্চিতার কথা। ওর নাকী হেভী আমাশা। এখন দেখতে ভালো হলেও পরে অচিরেই রোগা হয়ে যাবে। সুতরাং সাড়ে-পাঁচ। এরপর উঠল পারমিতার নাম। দেখতে সুন্দর হলেও সে নাকী দারুণ ঝগরুটে। কে আবার গায়ে পড়া, কার মাথায় আবার উকুন ঘোরে, কার দুটো প্রেম গেছে কাটা, কে মাথামোটা, কে কাটপিস এইসব বলতে বলতে এসে গেল বহ্নির নাম।

    ভুতো বলে উঠল, “খারাপ নয়। তবে একটু মোটা আর চুলটা ঘোড়ার লেজের মতো”।

    “ওটাকে পনি টেল বলে”, মধু ভুল শুধরে দিল।

    ভুতো সে কথায় আমল না দিয়ে বলে চলল, “আর যখন গান গায়, ওমা! যেন ভাঙা কাঁসর ...। হ্যান্ডল উইথ কেয়ার টাইপ”।

    পলতেদা আড়চোখে মধুকে দেখছিল। ওদিকে মধুর মুখে একরাশ বিরক্তি। রেগে গিয়ে বলল, “যাও না। যাও, বল না সামনে গিয়ে একবার, দেখব তখন মুরোদ। সব ক্যাদরানী এই ঘরের ভিতর”।

    অনেকে মধুর এই কথায় রেগে গেল। পকাই বলে উঠল, “ব্যাটা কী ফেমিনিস্ট হয়ে গেল নাকী রে?”।

    পলতেদা মধুর মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, “না। মধু আসলে এক বিশেষ ফেমিনিস্ট হয়ে গেছে! তাই না রে?”। তারপর সবার দিকে চোখ টিপে হেসে উঠল। মধু অপ্রস্তুত। পলতেদা সান্তনা দিয়ে বলল, “আরে মেয়েরাও জানবি আমাদের নিয়েও আড়ালে আবডালে কথা বলে ...”। মধু অবাক হয়ে তাকাল পলতেদার দিকে। ভাবল যে এসব তো তার জানা ছিল না, এসব আবার সত্যি নাকী?।

    পলতেদা মধুর এই অবাক হওয়ার দৃষ্টি পড়ে ফেলে হেসে উঠল খানিকটা। সবাই কথা বলছিল। তাদেরকে থামিয়ে বলল, “মেয়েগুলো জানবি এক একটা ঐ যাকে বলে কচি ঠাকুমা; শালা ডিকশনারী বলতে পারিস। ধরে ঝাঁকালেই না দেখবি পাড়ার সব খবর শীতের পাতার মতো ঝরে ঝরে ঝরে ঝরে পড়ছে”।

    সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে পলতেদার কথা শুনছে। আর পলতেদা কলেজের লেকচারারের মতো বলে চলেছে, “আর বেচারারা করবেটাই বা কী। কাজকর্ম বলতে তো ওই বাড়ির কাজ। থোর-বড়ি-খাড়া আর খাড়া-বড়ি-থোর। ব্যাস, কাজ শেষ হলেই বসে পড়ল। এই যে চর্চা, এর কাছে টিভি সিরিয়াল, সিনেমা সব তুশ্চু। পুকুরঘাটে, মুদীর দোকানে, সকালে ময়লা ফেলতে গিয়ে...। দেখবি হঠাৎ হঠাৎ একটা জটলা, একটা ফিসফাস। গুজগুজ আর ফুসফুস! আর হাসি। ঢলে পড়া। হয়ত যে কাজটা করতে এসেছিল সেটাই গেছে ভুলে। কোথায় লাগে চন্ডু, চরস, এল.এস.ডি.। এর এমন নেশা কী বলব তোদের ....”।

    বেশ কিছু নবীন ছোকরাদের চোখ ছানাবড়া। বমকে গিয়ে অনেকে বেশ কিছু সিগারেট আর বিড়ির করল ভুষিনাশ। পলতেদা সবাইকে একবার জরিপ করে নিয়ে সবজান্তা মার্কা হাসি দিল। বলল, “দেখ ভাই, এমনি এমনি এতোগুলো বছর তো কাটালাম না। তোদের মতো অতো পড়াশুনার ডিগ্রি নেই বটে। তবে এই ব্যাপারে না পি.এইচ.ডি. করে ফেলেছি, হ্যাঁ। তোরা তো আর বুঝলি না, কদরও করলি না”।

    সবাইকে মেপে নিলো একবার। মধুর দিকে তাকিয়ে বলল, “আর এইসব জ্ঞান নিয়ে তোদের জন্যই বসে আছি রে। যাতে, আমার ভাইগুলো ল্যাং না খায়, ঘরে বসে না কাঁদে”।

    মধুর চোখেমুখে দ্বিধা।বলবে নাকী পলতেদাকে? বহ্নির কথা? দিন কতক চোখা চোখি হয়েছে বটে। মুখ টিপে ঠিক কতটা হেসেছে সেটা মাপেনি। কিন্তু তাতেই মধু কাত। পলতেদা মধুকে আড়চোখে দেখে নিয়ে অন্য সবাইকে চলে যেতে ইশারা করল। তারপর আস্তে আস্তে এসে মধুর কাঁধে রাখল হাত। হেসে ফেলল মধু।

    * * * * * * *

    কমপিউটার ক্লাসে যেতে গিয়ে আজ বেশ দেরী হয়ে গেছে বহ্নির। বাবা না থাকায় সারদাপ্রসাদকে বাজার যেতে হয়েছিল। বাজারের সবাইকে অবাক করে দিয়ে মাছ, মাংস আর আনাজের ছবি দেখিয়ে দেখিয়ে এখন বাজার করেছে সে। ফলে দেরী হওয়া স্বাভাবিক। বলে দিলে আবার কী এক বিপত্তি হত কে জানে। রাগে গজগজ করছিল বহ্নি, “ক্লাসে দেরী করে ঢুকলে ফ্যাকাল্টি ইন্সাল্ট করে। এতো লজ্জা করে...। সবার সামনে...। দেব নাকী বাবাকে বলে ...?”।

    প্রমীলাদেবী বললেন, “এনেছে যে এই ঢের। আর তোর বাবাকে বলে কাজ নেই। সেই ঘটনার পর থেকে ওর সুগার আর প্রেশার বেড়ে গেছে। শেষে কী একটা করে বসবে কে জানে”। ডাইনিং টেবিলে ভাত বেড়ে দিলেন বহ্নিকে, বললেন, “নে, খেতে বস। ক’দিন আগে তো পার্টির ক’টা ছেলেকে এমন ধমকাল না, কী বলব”।

    হুড়মুড় করে খেয়ে উঠল বহ্নি। পারমিতা মিনিট দশ হল বসে রয়েছে। ওরা একসাথেই কমপিউটার ক্লাসে যায়। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল বহ্নি। বাড়িতে থাকলেই কাঞ্জাল। হয় বাবার চিৎকার নয়তো মায়ের খ্যাচখ্যাচ, তার ওপর আছে সারদাপ্রসাদ। বহ্নির বন্ধুরা মাঝে মধ্যে ক্ষেপিয়ে বলে যে সারদাপ্রসাদকে জিন্দা মিউজিয়ামে দান করা হবে। হাঁটতে হাঁটতে কথা হচ্ছিল যে আজ কার ক্লাস আছে, কী কী ক্লাস আছে, কোনো নোটস্ বাকী আছে না কী। বাস স্ট্যান্ডের কাছে আসতেই বহ্নিকে খোঁচা দিল পারমিতা। ইশারায় দেখাল।


    মধু। পরণে জিন্স আর একটা লাল গেঞ্জী। চোখে সানগ্লাস। চুলটা বিষন্ন। শ্রীকৃষ্ণ স্টাইলে দাঁড়িয়ে আছে। চুলটাকে ঠিক করে নিচ্ছে মাঝেমধ্যে। টেনশনে ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে। বহ্নিকে দেখেই স্ট্রেট।পেটের ভিতর গুড়গুড় শুরু হয়ে গেল। এইমাত্র কে যেন ফুসফুসে পিন ঢুকিয়ে দিল। বুকে যেন র‍্যাম্বো হাতুড়ি পিটাচ্ছে। হেল্পের জন্য পেছনে তাকাতেই এক বকা। পলতেদা। বলল, “আহ!বুক সোজা করে তাকা।হ্যাঁ, এবার সানগ্লাসটা খুলে একটা প্রেমিক লুক দিয়ে রজনীকান্তের মতো আবার পর। রজনীকান্ত!”।

    রোবোটের মতো তাই করতে গিয়ে সানগ্লাসটা হাত ফসকে পড়ল মাটিতে। পাশ দিয়ে কে যেন যাচ্ছিল, দেখতে না পেয়ে দিল মাড়িয়ে। চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল মধুর। ঝাপসা হয়ে গেল বহ্নি। পলতেদা বলল, “রাবিশ”। মধুর কান্না দেখে হেসে ফেলল বহ্নি।

    পারমিতা লাগাল এক ধমক। বলল, “হাসিস না। হাসিস না। এইসব লোফার ছেলেরা লাই পেয়ে যাবে”।

    ওদিকে বহ্নি হেসেই চলেছে। হাসতে হাসতে বলল, “তুই কী করতিস?”

    সমস্ত শরীর ঝাঁকিয়ে পারমিতা উত্তর দিল, “দিতাম ঠাসিয়ে এক চড়”। কথাটা মধুকে শোনানোর জন্য বেশ জোরেই বলল।

    পলতেদা আগেই লুকিয়ে পড়েছে পানের দোকানের পেছনে। মধু একা দাঁড়িয়ে আছে চাঁদমারি হয়ে। বাস আসতেই উঠে গেল ওরা।

    অনাদিবাবুর ঘর। হাউ মাউ করে কাঁদছে মধু। অনেকেই বুঝতে পারছে না হলটা কী। এইতো সকালবেলায় বেশ সাজগোজ করে বেরিয়েছিল দুজনে। বেরোনোর আগে বেশ ঘটা করে দিয়ে পুজো দিয়েছিল শ্রী শ্রী গণেশের। সিদ্ধিদাতা। কার্যসিদ্ধি হবেই। ৫০ টাকার দানাদার এনেছিল। ভাগ করে খেয়েছিল সবাই। বড়রা দিয়েছিল আশীর্বাদ, ছোটোরা জুগিয়েছিল ভরসা। তা প্রথম দিনেই কার্যসিদ্ধি হবে এমন দুরাশা বোকারাও করে না। কিন্তু তা বলে এমন কী হবে যে তার জন্য হাউ হাউ করে কাঁদতে হবে! জুতো পেটা বা চড়-থাপ্পর খায়নি তো? বড়রা বাবা, বাছা করল। বন্ধুরা মাথায় বুলিয়ে দিল হাত। কেউ কেউ কোথায় কোথায় লেগেছে বা লাগতে পারে তার ফিরিস্তি দিতে শুরু করল।

    ঠাকুরমশাই বললেন যে শ্রীকৃষ্ণের পুজো না দিয়ে বেরিয়েই এই বিপত্তি নাকি হয়েছে। প্রেমের ঠাকুর কী না! জয়ন্তদা বলতে যাচ্ছিল যে মাক্সীর্য়ান পদ্ধতিতে মেয়েদের মার কত রকমের। সবাইকে চুপ করিয়ে দিয়ে পলতেদা বলল, “কেউ একে মারেনি”।

    “তবে?”

    “তবে”!

    “তবে”!

    “ওর সানগ্লাসটা চোখ থেকে খুলে পড়ে গিয়েছিল। কে যেন দেখতে না পেয়ে মাড়িয়ে দিয়েছে”।

    মধুর কান্নার বেগ গেল বেড়ে। কাঁদতে কাঁদতে বলল, “ওটা আমার সানগ্লাস ছিল নাকী? কত করে হাতে পায়ে ধরে মাসতুতো দাদার কাছ থেকে নিয়ে এসেছিলাম।বলেছিল, দিচ্ছি। কিন্তু সানগ্লাসে যদি একটাও আঁচড় লাগে, মেরে ঠ্যাং ভেঙে দেবে। এখন ...?”, আবার কাঁদতে থাকল মধু।

    “আরে, আমি তো আগেই বলেছিলাম যে আজকে দিনটা ভালো না। মেয়েটার কোনো কিছু হয়ত বক্রী হয়ে ছিল”। পুরোহিতমশাই নিজের কৃতিত্ব জাহির করতে চাইলেন।

    “থামুন তো আপনি। লক্ষণ আর অলক্ষণ ছাড়া ওনার কোনো যেন কথা নেই”। বেশ রেগে গেছে পলতেদা।

    বারিণবাবু থাকতে না পেরে আনাদিবাবুকে বললেন, “বুড়ো বয়সে এইসব হুজ্জুতি কেন করছেন অনাদিদা? ..., শেষে হয় সব শুদ্ধু জেলে যাব নয়ত পাড়ার লোকের ঝাঁটা পেটা খাব”।

    ঠাকুরমশাইও সায় দিলেন। মধুর যেন পায়ের তলা থেকে মাটি খসে পড়ে গেল। পলতেদারা সবাই কটমট করে তাকাল।

    অনাদিবাবু বারিনবাবুর কথা ধর্তব্যের মধ্যে আনলেন না। মধুকে আশ্বস্ত করলেন। বললেন, “অতো ভেঙে পড়ার মতো কিছু হয় নি। এই মধু স্টেডি, স্টেডি। কালকে আবার যাবি”।

    “কিন্তু সানগ্লাসটা?”, কান্না কিছুটা থেমেছে মধুর।

    “মডেলটা খেয়াল আছে?”

    মাথা নেড়ে সায় দিল মধু।

    “তবে কিনে আনবি। আমি টাকা দেব, ... মানে আমরা টাকা দেব”।

    সবাই অনাদিবাবুর নামে হিপ হিপ হুররে করতে থাকল।

    পরদিন মধু আবার হাজির। এইভাবে পরপর বেশ কয়েকদিন। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। বহ্নি এক আধবার তাকাচ্ছে বটে কিন্তু তারপরেই সিরিয়াস। পারমিতা ঠ্যালা মেরে বলল, “মালটাকে দেখে তো তোর প্রেমে পড়ে গেছে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে কী রকম নিরীহ, কিন্তু খবরদার! লাই দিবি না।দেখি বাছাধনের কত সাহস?”

    বহ্নি বাসে উঠতে উঠতে বলল, “হ্যাঁ। আমিও দেখছি, ও আমাকে ভালোবেসে কী কী করতে পারে। কাছে এসে যদি বলতেই না পারে তবে আর কী ভালবাসল ?”

    “তুইও কী?”, চোখ পাকাল পারমিতা। তারপর হেসে বলল, “ছেলেগুলো প্রেমে পড়লে কেমন গিনিপিগ গিনিপিগ মনে হয় না? শুধু গিলোটিনে ফেলা বাকী। উৎসর্গ হয়েই আছে”।

    দুজনেই এই কথায় নিজে নিজেই হাসতে থাকল। তাদের হাসিতে রেগে গিয়ে বাসের সিটে বসে থাকা এক প্রৌঢ়া এমনভাবে চোখ পাকিয়ে তাকালেন যেন ভস্ম করে দেবেন। ওরা চুপ করে গেলেও চোখে চোখে ইশারা করছিল আর হাসছিল মুখ টিপে টিপে।

    ওদিকে মধু বাসস্ট্যান্ডে মুখ ব্যাজার করে দাঁড়িয়ে ছিল। রুমাল দিয়ে ঘাম মুছল। ভাবছিল, এভাবে যে আর কতদিন আসতে হবে কে জানে? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঠ্যাং ব্যাথা হয়ে গেছে। পলতেদা কে বলায় জবাব এল যে ওটা হল প্র্রেমের সাইড এফেক্ট। আরো বলল যে এই রকম আরও অনেক সাইড এফেক্ট তৈরী হবে। মধু আঁতকে উঠল। পলতেদা মধুকে বলল, “চল। তোকে বেশ কিছু প্রেমের সিনেমা দেখাব। তাহলে তুই বুঝবি ..”

    “কী বুঝব?”

    “যে প্রেম একটা সাধনা। একটা জার্নি; একটা, একটা সংগ্রাম”।

    “সংগ্রাম!”

    “আজ্ঞে”।

    “ধুর! এইরকম আর ভালো লাগছে না পলতেদা ..”

    “ভালো না লাগলে হবে? এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে তোমার যাকে ভালো লাগছে, তারও তোমাকে ভালো লাগবে”।

    “তাহলে? কী হবে গো আমার?”, বলেই মধু রাস্তার ওপর বসে পড়ল।

    হাত ধরে মধুকে তুলে পলতেদা বলল, “শোনো, মেয়েরা অতো সহজে ধরা দেয় না। কত করে বল্লাম চল, মাছ ধরাটা শেখ...

    “মাছ ধরা!”, আবার হাঁটতে থাকল দুজনে।

    “হ্যাঁ চাঁদু। মাছেদের অতো হেলা ফেলা কোরো না। মাছধরা হল প্রেমের নেট প্র্যাকটিস ...”

    “প্রেমের নেট প্র্যাকটিস!”

    “হ্যাঁ। তুমি কেমন মাছ ধরতে পার তার ওপর নির্ভর করছে তুমি কেমন মেয়ে তুলতে পার”।

    “মেয়ে তুলব কী গো!”

    “হ্যাঁ। সঠিক চাড়, বড়শি, ছিপ আর টোপের দরকার ..”

    “কিন্তু আমি তো ওকে ভীষন ভালোবাসি। ভীষন ..”

    “সেটা তো বোঝাতে হবে ..”

    “কিন্তু, আমি যে রোজ এখানে এসে দাঁড়াই। ওর জন্য ...”

    “দাঁড়াস?”

    “হ্যাঁ”।

    “তোর যুক্তিতে চললে দেখা যাবে, যে ছেলেরা যেখানে যেখানে দাঁড়িয়ে থাকবে, সেইই তাহলে কোনো না কোনো মেয়ের জন্য, আই মিন তার প্রেমের জন্য দাঁড়িয়ে আছে?”

    “ঠিক বুঝলাম না”।

    “হাঁদা গঙ্গারাম কোথাকারের! ধর, যে যে ছেলে দুধ বা রেশনের দোকানে বা ট্রাম-বাসের লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, পানের দোকানে, চা খেতে..., সেটা কী তবে প্রেমে পড়ে?”

    মাথা চুলকে মধু উত্তর দিল, “তাইতো? এটা তো আগে ...”

    “সেই জন্যই বোঝাতে হবে”, বলেই মধুর মাথায় একটা টোকা মারল পলতেদা।

    “কী?”

    “যে তুই ওর জন্য এই জীবনও দান করতে পারিস!”

    “মানে! মরে যাব?”

    পার্কে ঢুকে পড়ল দুজনে। দুপুরের দিকে জায়গাটা প্রায় ফাঁকাই থাকে। একটা পরিস্কার বসার জায়গা দেখে বসল। বিড়ি ধরিয়ে কিছুক্ষণ টান মেরে পলতেদা বলল, “আচ্ছা, তুই কমপিউটার ক্লাসে ভর্তি হয়ে যা না। বেশ একসাথে কমপিউটার করবি, সময় পাবি কাছে থাকবার ...”

    “বাবাকে বলেছিলাম। বাবা সাফ মানা করে দিয়েছে। বলেছে যে মন দিয়ে কমপিটিটিভ এক্সাম দিতে। কমপিউটারে ভর্তি করবার টাকা দিতে পারবে না”।

    “তো টিউশনি কর। টাকা জমা”।

    “ব্যবসা করতে গিয়েই তো জমান টাকা, ফুটুস। আর তাতেও হবে না। হিসেব করেছি। এরা যে ইন্সটিউটে শেখে তার ফীস বেশ হাই”।

    “হু। বুঝলাম। কিন্তু ..”

    “কিন্তু, কী গো? তুমিও ফেল পড়ে গেলে। এখন আমার কী হবে গো ?”, বলে কান্না জুড়ে দিল মধু।

    “এই থামতো”। ধমক লাগালো পলতেদা। বিড়ি ধরিয়ে পায়চারি করতে থাকল। একটা, দুটো, তিনটে। মধুর মনে হল আস্তে আস্তে তার ভালোবাসা, ভালোবাসার পৃথিবী আর তার মধ্যেকার লোকজন পলতেদার বিড়ির মতো পুড়ে যাচ্ছে। হয়ে যাচ্ছে ছাই। চার নম্বরটা ধরাতে গিয়ে ধরাল না পলতেদা। মধুর পাশে বসে বলল,
    “মনে হচ্ছে প্ল্যান বি কাজে লাগাতে হবে। শোন, তুই ওদের সাথে বাসে চাপবি। তারপর ....”

    “তারপর! ধরা পড়ে পাবলিকের মার খেয়ে সোজা ..”।

    “কেন?”

    “কেন? দেখোনি ওরা লেডিস স্পেশালে যায় ..”।

    “হ্যাঁ। ঠিক হয়েছে ..”

    “কী?”।

    “তুই পাবলিকের মার খাবি আর ও তোকে বাঁচাবে”।

    উঠে পড়ল মধু। বলল, “দরকার নেই। আমার মার খাওয়ারও দরকার নেই, ওকেও দরকার নেই”। হাঁটুতে মুখ গুঁজে পার্কের দেওয়ালে পিঠ দিয়ে বসে পড়ল।

    “আরে। এতো আচ্ছা ছেলে। শোন, তুই না ......, তুই না.....,হ্যাঁ, বোরখা পড়ে উঠবি”।

    “বোরখা পড়ে! ওরে ধরা পড়লে আর বেরোতে পারব না গো। সন্ত্রাসবাদী হয়ে সারাটা জীবন .....। পারবো না”

    “শোন, তোর দ্বারা কিসসু হবে না। তুই বহ্নিকে ভুলে যা”। বলে চলে গেল পলতেদা।

    আগ্নেয়গিরির অন্ত্ঃস্থল থেকে যেমন লাভা বেরিয়ে আসে সেইরকম দমকে দমকে কান্না বেরিয়ে আসতে থাকল মধুর। সব্বাই শত্রু, সব্বাই। কেউ তাকে বুঝতে চাইছে না, কেউ না। এমনকী পলতেদাও পর্যন্ত। ধরনী দ্বিধা হও। যতবার ইচ্ছে ততবার দ্বিধা হও যতক্ষণ না মধু তার সমস্ত ভালোবাসা নিয়ে তার ভেতরে ঢুকে যায়।

    (চলবে)
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | | |
  • ধারাবাহিক | ৩১ জুলাই ২০২৬ | ২০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন