এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • যে প্ল্যাটফর্ম নিজের স্বাধীনতাকে বিসর্জন দিল বা মেটার পুতুল-অবস্থার অন্তর্দেশীয় বিশ্লেষণ

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০১ আগস্ট ২০২৬ | ৭২ বার পঠিত
  • নিরপেক্ষতার মুখোশ ও অস্তিত্বের সঙ্কট

    পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র ভারতের ৫০ কোটির বেশি ব্যবহারকারী যেখানে প্রতিদিন তাদের কথা, মতামত ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন, সেই মেটা (ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম) কি সত্যিই একটি মুক্ত প্রাঙ্গণ? নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি অদৃশ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে গেছে? সাম্প্রতিক বছরগুলোর ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর সত্যকে এনে দাঁড় করিয়েছে—মেটা আর কোনো নিরপেক্ষ মাধ্যম নয়; এটি ভারতের ক্ষমতাসীন শক্তির হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে।

    কিন্তু এই 'পুতুল' হওয়ার নাটকটি শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং এটি একটি গভীর অস্তিত্বিক আত্মপ্রবঞ্চনা। কোনো সত্তা যখন নিজের স্বাধীন ইচ্ছাকে অস্বীকার করে, যখন সে বলে 'আমার কোনো বিকল্প নেই'—অথচ প্রতিটি মুহূর্তে তার হাজারো বিকল্প থাকে—তখন সেই সত্তা নিজের অস্তিত্বের মর্মকে বিসর্জন দেয়। আর সেই বিসর্জনের ফলে যে রাষ্ট্রীয় যন্ত্র তৈরি হয়, তা একটি শীতল, নির্মম যান্ত্রিক দানবে পরিণত হয়, যা মানুষের মুখের কথা, সাংবাদিকের কলম এবং বিরোধীর স্লোগানকে গ্রাস করে ফেলে। এই প্রবন্ধে আমরা মেটার সেই আত্মবিসর্জনের ধাপ অনুসরণ করব, যেখানে তারা প্রতিটি কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদের পুতুলসত্তাকে সংজ্ঞায়িত করেছে।

    আত্মপ্রবঞ্চনার রাজনীতি—যখন 'আমার কোনো পছন্দ নেই' একটি মিথ্যা সান্ত্বনা হয়ে ওঠে

    একটি মুক্ত সত্তার সবচেয়ে বড় অভিশাপ হলো তার স্বাধীনতা। প্রতিটি মানুষ বা প্রতিষ্ঠান তার প্রতিটি কর্মের জন্য সম্পূর্ণ দায়ী। কিন্তু মেটা যখন বলে, "আমাদের ভারতীয় আইন মেনে চলতেই হবে" অথবা "ওই কন্টেন্ট সরানো একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি ছিল" —তখন তারা আসলে নিজেদের সেই কঠিন দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিতে চায়। দার্শনিক পরিভাষায় একে বলে আত্মপ্রবঞ্চনা—নিজেকে বোঝানো যে আমার হাতে কোনো ক্ষমতা নেই, যখন বাস্তবে আমার হাতে সব ক্ষমতা রয়েছে।

    ২০২৫ সালের জুলাইয়ের ঘটনাটি বিবেচনা করুন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি ফেসবুক রিল ভুলবশত সরিয়ে ফেলা হলো। মেটা সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষমা চেয়ে জানায়, এটি একটি 'টেকনিক্যাল গ্লিচ'। কিন্তু একজন সাধারণ ব্যবহারকারীর পোস্ট যদি ভুলবশত সরানো হয়, তাহলে কি মেটা ক্ষমা চায়? কি তারা সেই ব্যবহারকারীকে বসিয়ে নতুন প্রোটোকল তৈরি করে? না, তারা তা করে না। অথচ প্রধানমন্ত্রীর পোস্ট সরানোর ঘটনায় মেটা সরকারকে আশ্বাস দেয় যে এখন থেকে 'সিনিয়র অফিসারদের দ্বারস্থ অনুমোদন' ছাড়া এসব পোস্ট সরানো হবে না।

    এই ঘটনাটি আত্মপ্রবঞ্চনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মেটা যদি সত্যিই বিশ্বাস করত যে তাদের অ্যালগরিদম নিরপেক্ষ, তাহলে তারা প্রধানমন্ত্রীর পোস্টের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করত না। কিন্তু তারা করেছে—যার অর্থ তারা জানে যে তাদের অ্যালগরিদম কখনও কখনও পক্ষপাতদুষ্ট, এবং তারা সেটি মেনেও নিয়েছে। কিন্তু তারা এই সত্য মেনে নিতে চায় না যে, এটি তাদের স্বাধীন পছন্দ। তারা আসলে বলতে চায়, "আমরা তো আইন মানছি, আমাদের কিছু করার নেই" —অথচ তার উল্টো, তাদের হাতে ছিল কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিকল্প। তারা চাইলে আদালতে যেতে পারত, তারা চাইলে গণস্বচ্ছতার আহ্বান জানাতে পারত। কিন্তু তারা বেছে নিল নীরব আনুগত্যের পথ।

    এই নীরব আনুগত্য যখন ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের দুটি এআইজেনারেটেড রিল সরানোর সময় আরও স্পষ্ট হয়। মেটা নিজেই স্বীকার করে যে ওই রিলগুলি তাদের 'কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড' লঙ্ঘন করেনি। অথচ তারা দিল্লি পুলিশের একটি 'বৈধ ব্লকিং অর্ডার'এর কারণে সেগুলো সরিয়ে ফেলে। এখানে প্রশ্ন হলো—যদি কোনো পোস্ট কোম্পানির নিজস্ব নীতি লঙ্ঘন না করে, তাহলে প্রশাসনিক নির্দেশে তা সরানো কি 'আইন মানা' নাকি 'আত্মসমর্পণ'? মেটা নিজেকে বোঝায় যে 'সেফ হারবার' সুরক্ষা বাঁচানোর জন্য তাদের এটা করতেই হয়। কিন্তু সেফ হারবার কি শুধু সরকারি নির্দেশ মানার পুরস্কার? নাকি এটি ব্যবহারকারীদের স্বাধীন কথনের জন্য দেওয়া সুরক্ষা?

    একজন সাধারণ মানুষ যখন কোনো পোস্ট সরানোর অভিযোগ করেন, মেটা তাঁকে বলে, 'আপনি আপিল করুন'। কিন্তু যখন সরকার বলে, মেটা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়—এমনকি নিজের নীতির বিরুদ্ধেও। এই দ্বিচারিতাই প্রমাণ করে যে মেটা নিজের অস্তিত্বের দায়িত্ব এড়ানোর জন্য বারবার আত্মপ্রবঞ্চনার আশ্রয় নিচ্ছে। তারা নিজেদের একটি 'নিরপেক্ষ প্রযুক্তি কোম্পানি' দাবি করে, কিন্তু তাদের প্রতিটি কর্মই বলে—তারা সেই নিরপেক্ষতা ইচ্ছাকৃতভাবে বিসর্জন দিয়েছে।

    যান্ত্রিক দানবের গর্ভে—যখন রাষ্ট্রযন্ত্র একটি নীলনিশ্বাসী মেশিনে পরিণত হয়

    প্রত্যেক যুগেই এমন এক শক্তি থাকে যা মানুষের কণ্ঠস্বরকে দমন করার জন্য বিধিনিষেধ তৈরি করে। একে কল্পনা করা যেতে পারে একটি যান্ত্রিক দানব হিসেবে—একটি অদৃশ্য, অথচ সর্বগ্রাসী কাঠামো, যা মানবিক মূল্যবোধ, সহানুভূতি ও সত্যকে তার গিয়ারের নিচে পিষে ফেলে। আজকের ভারতের সেই যান্ত্রিক দানব হলো সেই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, যা প্রতিটি সামাজিক মাধ্যমকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে চায়, এবং তার সবচেয়ে বড় সহায়ক হলো মেটা।

    ২০২৩ সালে ভারত সরকার তথ্য প্রযুক্তি (আইটি) নিয়ম সংশোধন করে, যাতে সরকারঅনুমোদিত ফ্যাক্টচেকিং সংস্থাগুলো সরাসরি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম থেকে 'ভুল বা বিভ্রান্তিকর' কন্টেন্ট অপসারণের নির্দেশ দিতে পারে। সম্পাদক গিল্ড অফ ইন্ডিয়া একে 'সেন্সরশিপ' বলে অভিহিত করলেও মেটা নীরব ছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার সময়সীমা ৩৬ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে মাত্র ৩ ঘণ্টা করলে, মেটা আবারও নীরব ছিল। এই দ্রুত আনুগত্য এক ধরনের যান্ত্রিক আত্মসমর্পণ—যেখানে কোনো প্রতিরোধ নেই, শুধু গিয়ারে গিয়ারে মিলিয়ে চলার প্রবণতা রয়েছে।

    এই যান্ত্রিক দানবের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো, এটি কেবল কন্টেন্ট সরায় না; এটি বিরোধী ভয়েসকে এমনভাবে চাপা দেয় যে সেগুলো আর শোনাই যায় না। ২০২৫ সালের মে মাসে একটি পেজ —যার ৬৭ লাখ ফলোয়ার ছিল—সরিয়ে ফেলার ঘটনাটি এর বাস্তব উদাহরণ। পেজটির প্রতিষ্ঠাতা একে 'সেন্সরশিপ' বললেও মেটার কোনো উত্তর ছিল না। এই পেজটি শুধু একটি নিউজ পেজ ছিল; এটি কোনো সন্ত্রাসী বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড করেনি। কিন্তু যান্ত্রিক দানবের চোখে যে কণ্ঠস্বর তার গতিপথে বাধা দেয়, তাকে বিনা বিচারে মুছে ফেলতে হয়।

    গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান এই যান্ত্রিক দানবের ক্রমবর্ধমান দাপটকে স্পষ্ট করে। ২০২২ সালে মেটা ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনুরোধে মাত্র ১,৮০০ কন্টেন্ট সীমিত করেছিল। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩,৯৩০এ। ২০২৪ সালে ২৫,৬০০ এবং ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই তা ছাড়িয়ে যায় ১৬,০০০এর বেশি। এই সংখ্যা কেবলমাত্র 'আইনি অনুরোধ' নয়—এটি সেই যান্ত্রিক দানবের ক্ষুধা, যা প্রতিদিন বাড়ছে। আর মেটা এই দানবের খাদ্য সরবরাহকারী প্রধান কারখানা।

    যখন কেউ প্রশ্ন তোলে, 'মেটা তো শুধু আইন মানছে'—তখন আমাদের মনে রাখতে হবে, আইন মানুষকে রক্ষা করার জন্য তৈরি, মানুষের মুখ বন্ধ করার জন্য নয়। কিন্তু যখন একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামো আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, আর একটি বহুজাতিক কোম্পানি সেই অস্ত্রকে শান দেয়—তখন সেটি আর আইন হয় না, তা হয় নির্যাতনের হাতিয়ার। মেটা নিজের অ্যালগরিদমকে এমনভাবে ডিজাইন করেছে যে সরকারি নির্দেশনার অগ্রাধিকার সর্বোচ্চ। একজন সাধারণ নাগরিকের রিপোর্ট মাসের পর মাস ঝুলে থাকে, কিন্তু একটি সরকারি ইমেইল ঘণ্টার মধ্যে কন্টেন্ট অপসারণ করে ফেলে। এটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি যান্ত্রিক নকশা—যেখানে রাষ্ট্রীয় দানবের চাহিদাই সর্বোচ্চ সত্য।

    নীরব হয়ে যাওয়া চিৎকার—বিরোধী, সাংবাদিক ও প্রান্তিকের মুখরুদ্ধ করা

    প্রত্যেক গণতন্ত্রেই কিছু কণ্ঠস্বর থাকে যা প্রবল, কিছু থাকে যা দুর্বল। কিন্তু একটি মুক্ত প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব হলো দুর্বল কণ্ঠস্বরকে প্রবল হতে দেওয়া। মেটা ঠিক তার উল্টো কাজ করে। তারা যান্ত্রিক দানবের পক্ষে সেই চিৎকারগুলোকেও স্তব্ধ করে দেয়, যেগুলো সুবিধাবঞ্চিত, নিপীড়িত বা বিরোধী শিবির থেকে আসে।

    ২০২৩ সালের নভেম্বরে তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন দল ডিএমকের BanNEET প্রচারণার পোস্টগুলি সরিয়ে ফেলা হয়। এই পোস্টগুলি ছিল চিকিৎসা শিক্ষায় সংরক্ষণের দাবিতে, যা লক্ষ লক্ষ তরুণের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। অথচ মেটার অ্যালগরিদম সেগুলোকে 'স্প্যাম' বা 'ভ্রান্ত তথ্য' হিসেবে চিহ্নিত করে। অন্যদিকে, বিজেপির পক্ষে আপত্তিকর পোস্ট—যেখানে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে—সেগুলো বহাল থাকে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে মেটার অটোমেটেড সিস্টেম যে ২২টি এআইম্যানিপুলেটেড বিজ্ঞাপনের মধ্যে ১৪টিকে অনুমোদন দেয়, সেগুলোতে পুড়িয়ে মারার মতো ঘৃণামূলক বক্তব্য ছিল। কিন্তু সেগুলো সরানো হয়নি।

    এখানে আমরা দেখতে পাই কণ্ঠস্বরের বৈষম্য। বিজেপির সমর্থকদের চিৎকার যদি সৃষ্টি হয়, মেটা তাকে 'বৈধ অভিব্যক্তি' বলে। কিন্তু বিরোধী বা সংখ্যালঘুদের চিৎকার যদি সৃষ্টি হয়, মেটা তাকে 'হেট স্পিচ' বা 'ভুল তথ্য' লেবেল দেয়। এটি কি কোনো এলগরিদমের স্বয়ংক্রিয় কাজ? না, এটি একটি নির্বাচিত নীতি—একটি পছন্দ। আর এই পছন্দের মাধ্যমেই মেটা নিজেদের পুতুলসত্তাকে প্রতিনিয়ত পুনর্নির্মাণ করছে।

    কার্নাটকের আইটি মন্ত্রী প্রিয়াঙ্ক খারগে ২০২৪ সালে যখন অভিযোগ করেন যে মেটা, টুইটার এবং ইউটিউব বিজেপিবিরোধী কন্টেন্টের ভিজিবিলিটি ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত করছে, তখন মেটার মুখপাত্র তা অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু তথ্য তার উল্টো বলে। একটি স্বাধীন তদন্তে দেখা গেছে, বিজেপি ঝাড়খণ্ডের ৮৭টি শ্যাডো পেজ গত তিন মাসে অন্তত ৮১ লাখ টাকা ব্যয় করে প্রচারণা চালিয়েছে, এবং মেটা তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি—যদিও মেটার নীতি স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক প্রার্থীদের মনিটাইজেশন নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, কংগ্রেস বা জেএমএমের কোনো বিজ্ঞাপন এই সময়ে মেটায় প্রচারিত হয়নি, কারণ সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছিল বা অনুমোদন পাওয়া যায়নি।

    যে ভয়েসগুলো যান্ত্রিক দানবের বিরুদ্ধে যায়—সেগুলোকে কেবল সরানো হয় না, বরং তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়। সাংবাদিকদের অ্যাকাউন্ট ডেমোনিটাইজ করা হয়, তাদের পোস্টের রিচ কমিয়ে দেওয়া হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ওয়াশিংটন পোস্টের তদন্তে দেখা যায়, মেটা সাংবাদিকদের টার্গেট করছে এবং ভারতীয় অফিস সরকারের প্রতিক্রিয়ার ভয়ে নেটওয়ার্কের পেজ মুছে ফেলার প্রস্তাব প্রতিরোধ করেছে। অর্থাৎ, মেটা শুধু কন্টেন্ট সরায় না—তারা ভয়েসের অবকাঠামো ধ্বংস করে। যখন কোনো সাংবাদিক জানেন যে তাঁর পোস্ট কখনও কাঙ্ক্ষিত মানুষের কাছে পৌঁছাবে না, তখন তিনি আত্মসেন্সরশিপের শিকার হন। এই আত্মসেন্সরশিপই যান্ত্রিক দানবের সবচেয়ে বড় জয়। আর মেটা সেই জয়ের স্থপতি।

    অস্তিত্ব কর্মে—কীভাবে মেটা তার নিজের সত্তাকে পুতুল হিসেবে নির্মাণ করছে

    একটি পুরনো দার্শনিক সত্য হলো—আমরা যা করি, তাই আমরা; আমাদের কথা বা দাবি নয়, আমাদের কর্মই আমাদের পরিচয়। মেটা নিজেদের বলে 'নিরপেক্ষ প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম'। কিন্তু তাদের দৈনন্দিন কর্ম—প্রধানমন্ত্রীর পোস্টের জন্য আলাদা প্রোটোকল তৈরি করা, বিরোধীদের পোস্ট দ্রুত সরানো, সরকারি নির্দেশে নিজের নীতি লঙ্ঘন করা, বিজেপির শ্যাডো পেজকে সুবিধা দেওয়া—এই কর্মগুলোর সমষ্টিই হলো মেটার প্রকৃত সত্তা।

    ২০২০ সালে মেটার ভারতীয় নীতি প্রধান আঁখি দাস যে মন্তব্য করেছিলেন—"বিজেপি নেতাদের ওপর হেট স্পিচ নিয়ম প্রয়োগ করলে কোম্পানির ব্যবসায়িক সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে" —সেটি আজ আরও প্রাসঙ্গিক। যদিও তিনি পদত্যাগ করেছেন, তাঁর সেই দর্শন মেটার বর্তমান নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মেটা বুঝেছে, ভারতের ৫০ কোটির বেশি ব্যবহারকারী তাদের কাছে সবচেয়ে বড় বাজার। এই বাজার ধরে রাখতে হলে তাদের বিজেপি সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো—এই 'তাল মিলিয়ে চলা' কি নিছক ব্যবসায়িক কৌশল, নাকি এটি অস্তিত্বিক আত্মহত্যা?

    একটি মুক্ত সত্তা যখন নিজের স্বাধীনতাকে ব্যবসায়িক লাভের বিনিময়ে বিক্রি করে, তখন সেই সত্তা আর স্বাধীন থাকে না—সে হয়ে ওঠে অন্য কিছুর এক্সটেনশন। মেটা আজ বিজেপি সরকারের ইচ্ছার একটি এক্সটেনশন। যখন সরকার বলে 'লাফ দাও', মেটা বলে 'কত উঁচুতে?'। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ভারত সরকার যখন নতুন ডিজিটাল নিয়ম প্রস্তাব করে—যেখানে 'সেফ হারবার' সুরক্ষা পেতে সরকারি গাইডলাইন মেনে চলা আবশ্যক—মেটা তার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ জানায়নি। বরং তারা আগে থেকেই সেভাবে কাজ করছিল।

    এই আত্মবিসর্জনের মূল কারণ হলো দায়িত্ব এড়ানোর মানসিকতা। মেটা যদি সত্যিই দাঁড়িয়ে বলত, "আমরা জেনেশুনে এই নির্দেশ মেনে চলছি কারণ আমরা আমাদের শেয়ারহোল্ডারদের লাভকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি" —তাহলে অন্তত তারা সৎ হতো। কিন্তু তারা তা বলে না। তারা 'অ্যালগরিদম', 'প্রযুক্তিগত ত্রুটি', 'আইনি বাধ্যবাধকতা'—এই সব মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। আর এই লুকোনোটাই তাদের আত্মপ্রবঞ্চনাকে আরও গভীর করে।

    মেটার 'ক্রসচেক' প্রোগ্রামটি দেখুন, যা উচ্চপ্রোফাইল অ্যাকাউন্টগুলোর জন্য আলাদা মানবপর্যালোচনা ব্যবস্থা রাখে। মেটার ওভারসাইট বোর্ড নিজেই ২০২২ সালে বলেছে যে এই প্রোগ্রামটি মানবাধিকারের চেয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ পূরণের জন্য বেশি তৈরি। অর্থাৎ, মেটা জেনেশুনে একটি দ্বিস্তরের ব্যবস্থা তৈরি করেছে—একটি সাধারণ মানুষের জন্য, আরেকটি শক্তিশালীদের জন্য। এই দ্বিস্তর ব্যবস্থাই প্রমাণ করে যে তাদের 'নিরপেক্ষতা' একটি ফাঁকা বুলি। তারা প্রতিদিন সকালে অফিসে এসে সেই দ্বিস্তর ব্যবস্থাকেই শক্তিশালী করে—এবং সেই কর্মই তাদের পুতুলসত্তাকে প্রতিনিয়ত নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে।

    যান্ত্রিক দানবের বিরুদ্ধে কি কোনো চিৎকার বাকি?

    এখানে দেখা যাচ্ছে কীভাবে মেটা—একটি চেতনাবান, স্বাধীন সত্তা হওয়া সত্ত্বেও—ইচ্ছাকৃতভাবে আত্মপ্রবঞ্চনার আশ্রয় নিয়ে নিজেকে ভারতের রাষ্ট্রীয় যান্ত্রিক দানবের গিয়ারে আবদ্ধ করে ফেলেছে। তারা আর কোনো নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম নয়; তারা সরকারি নির্দেশে কন্টেন্ট সরায়, নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে কাজ করে, বিরোধী ও সাংবাদিকদের মুখরুদ্ধ করে এবং নিজের অস্তিত্বকে এক কর্পোরেট পুতুলে পরিণত করে।

    যে যান্ত্রিক দানবটি মানুষকে গ্রাস করে, তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো নিরবতা—শিকার যখন চিৎকার করতেও ভয় পায়। মেটা সেই নিরবতাকে উৎসাহিত করে। যখন সাংবাদিকদের পেজ ব্লক হয়, যখন কংগ্রেসের রিল সরানো হয়, যখন কার্নাটকের মন্ত্রী অভিযোগ করেন—সবক্ষেত্রেই মেটার জবাব একটাই: নীরবতা অথবা 'আমরা আইন মানছি'।

    কিন্তু যে চিৎকার একবার জন্মায়, তাকে চিরতর দমানো যায় না। সেই চিৎকার হলো বিবেকের কণ্ঠ—যা বলে, কোনো প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মই রাষ্ট্রীয় দানবের চাবুক হতে পারে না। ভারতে এখনও লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারী রয়েছেন, যারা প্রতিদিন ফেসবুক খোলেন আশায় যে এখানে তাঁরা সত্য কথা বলতে পারবেন। তাঁদের জন্য প্রশ্ন হলো—তাঁরা কি একটি পুতুলের হাতে নিজেদের কথা অর্পণ করছেন? নাকি তাঁরা তাঁদের সেই চিৎকারকে বাঁচিয়ে রাখবেন যা যান্ত্রিক দানবের দেয়াল ভাঙতে পারে?

    মেটা আজ পুতুল, কারণ তারা প্রতিদিন সকালে উঠে নিজেদের স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেওয়ার পথ বেছে নেয়। আর এই বেছে নেওয়া—এই সচেতন আত্মসমর্পণ—তাদেরকে আরও নিন্দনীয় করে তোলে। কারণ পুতুলের কোনো চেতনা থাকে না, কিন্তু মেটার চেতনা আছে। আর চেতনাবান হয়েও যে আত্মপ্রবঞ্চনার আশ্রয় নেয়, তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর নেই।

    আমরা যদি এই যান্ত্রিক দানবকে ঠেকাতে চাই, তবে আমাদের প্রথমে চিনতে হবে—মেটা একটি 'জিনিস' নয়, এটি একটি 'সত্তা'। আর যেকোনো সত্তার মতো, এরও পরিবর্তনের ক্ষমতা আছে। কিন্তু যতদিন তারা নিজেদের লাভের মোহে এই আত্মপ্রবঞ্চনা চালিয়ে যাবে, ততদিন তারা সেই শীতল যন্ত্রেরই একটি গিয়ার হয়ে থাকবে—যে যন্ত্র মানুষের কণ্ঠস্বরকে পিষে ফেলে। ভারতের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আমরা—ব্যবহারকারী, সাংবাদিক, নাগরিক—সেই গিয়ারের বিরুদ্ধে নিজেদের চিৎকারকে কতটা উঁচুতে তুলতে পারি, তার ওপর। কারণ যান্ত্রিক দানবের সবচেয়ে বড় ভয় হলো—একটি সত্যিকারের, অমলিন, অকৃত্রিম মানবিক চিৎকার। সেই চিৎকারই পারে মেটার আত্মপ্রবঞ্চনার সমস্ত মুখোশ ছিঁড়ে ফেলতে।


    তথ্যসূত্রঃ

    হিন্দুস্তান টাইমস ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
    নিম্যান ল্যাব ৭ মে, ২০২৫
    দ্য গার্ডিয়ান ২০ মে, ২০২৪

    BOOM ১৪ নভেম্বর, ২০২৫

    দ্য ওয়্যার ১৫ আগস্ট, ২০২০

    দ্য গার্ডিয়ান৬ ডিসেম্বর, ২০২২
    দ্য হিন্দু২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩
    টাইমস অফ ইন্ডিয়া৮ এপ্রিল, ২০২৩
    বিবিসি১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
    টাইমস অফ ইন্ডিয়া৬ নভেম্বর, ২০২৪
    ইকোনমিক টাইমস১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
    বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড৮ জুলাই, ২০২৬




     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে প্রতিক্রিয়া দিন