এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ৯/ ১১ এর ডায়েরির পাতা থেকে : 

    Saheli Bandyopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮৬ বার পঠিত
  • ৯/ ১১ এর ডায়েরির পাতা থেকে :

    আজ রাতে ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমেছে আবার, যে রকম নেমেছিল বছর একুশ আগে এই রকম একটা রাতে l আজ ১০ ই সেপ্টেম্বর এর রাত ভারতে, হিসেব মত এখনও আমেরিকায় ১০ ই সেপ্টেম্বর এর সকাল l তবু সেই রাতের কথা.. সে রাত ২০০১ এর রাত বার বার মনে আসছে আজ ও। আমি অনির্বাণ,
    আমার একটা ডায়েরি আছে সেই ডায়েরি তে লিখছি তো লিখছি।। রাত প্রায় শেষ হতে চললো, মুষলধারে বৃষ্টি পড়ে চলেছে তো চলেছেই, ঝোড়ো হওয়ার দাপট জানালার শার্শিতে এসে লাগছে আর মাঝে মাঝে ঘন মেঘের বুক চিরে বিদ্যুৎশিখা ঝলকে উঠেই আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। বাজের শব্দে কান পাতা দায়। আজ এতো দিন পর কি লিখবো জানি না | অনেক খান সময় পেরিয়ে গেছে, ব্ল্যাক কফি কতবার ঠান্ডা হয়ে গেলো, আর কিছুক্ষন পরেই ভোর হয়ে যাবে, তবু কোনো কথা এখনো গুছিয়ে লিখে উঠতে পারি নি আমি, কতবার লিখলাম আর কতবার যে কাটলাম, মনের ভিতর ছন্নছাড়া এতগুলো কথা কোনটাকে যে আগে পাতায় স্থান দি বুঝতে পারছি না। আচ্ছা, আমি কি অপরাধবোধে ভুগছি ?

    সেই অভিশপ্ত রাত।। আমার এখনো মনে আছে আমার ভয়ঙ্কর জ্বর হয়েছিল, গায়ে ব্যাথা, মাথা টিপটিপানি। নাসির এলো আমার কাছে, বললো একটু ওষুধ খাও দোস্ত, ওষুধ এনে দিলো | সঙ্গে জল। নাসির ওরফে নাসির আলি আমার রুম মেট, আমরা একটা apartment শেয়ার করে থাকি, NewYork খুব ই costly জায়গা, আমরা দুজনেই ব্যাচেলর ছেলে সে জন্য কাজের জায়গার কাছাকাছি একটা apartment ভাড়া করেছি, আর আমাদের দুজনেরই কাজের জায়গা ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এর ৯৫তম তলা। আমরা দুজনেই শিফট এ কাজ করতাম, যেমন আমার যদি হয় সকালে ডিউটি, নাসির নিতো রাত্রে। নাসির সেই রাত্রে ডিউটি করে এসে ফিরে বললো, তোমার তো জ্বর হয়েছে দোস্ত, তুমি কি কাল কাজে যেতে পারবে ? আমি বলেছিলাম ওষুধ খেলাম তো, ভালো লাগলে সকালে যাবো। পরদিন সকালে ও মাথা দেখি ভার হয়ে আছে, জ্বর কমেছে বটে কিন্তু বিছানা থেকে নামার ক্ষমতা নেই। নাসির বললো, চিন্তা করো না, আমি কাজে চলে যাবো তোমার হয়ে। আমার মন ক্রমশ আরো দুর্বল পড়ছে, একটা বিধস্ত অতীত আমাকে ঘিরে রেখেছে, যার থেকে পরিত্রাণ বা মুক্তি যাই বলো, সে বোধহয় এ জন্মে নেই।

    নাসির কাজে চলে গেলো | ঘড়িতে সকাল ৮ :৩০ টা বোধহয়বা আরো একটু বেশি, সবে একটা ব্ল্যাক কফি নিয়ে বিছানা তে একটু মাথা তুলে বসেছি, হঠাৎ করে মারাত্মক কোনো একটা শব্দে কান মাথা যেন ধাঁদিয়ে গেলো, এমন শব্দ যে শব্দের বর্ণনা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়, শুধু বলতে পারি এ শব্দ আমি আমার জীবনে কোনো দিন শুনি নি। কিছুই বুঝতে পারলাম না, কেন, কোথা থেকে বা কিসের জন্য ? কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই দেখি আমার ব্যালকনি র ওপাশ দিয়ে দূরে সারা আকাশ জুড়ে শুধু ঘন কালো ধোঁয়া কুন্ডলি পাকিয়ে আকাশে উড়ছে। এতো ঘন কালো ধোঁয়া মনে হলো সারা শহর কে গ্রাস করবে।।। দূর থেকে শুনছি সাইরেন বাজছে। ধোঁয়াটার উৎসস্থল কোন কো---- ন দিকে ? অজানা আশঙ্কায় মন কেমন কেঁপে উঠলো। আবার আবার আরো একটা ওই রকম শব্দ।। কি হচ্ছে ? বুঝতে পারছি না।।। এ শব্দের উৎসস্থল কি ? শুধু মনে হচ্ছে গা মাথা সব ঝিমঝিম করছে।। কোনো একটা অতল গভীরে আমি কি তলিয়ে যাচ্ছি ?

    মুহূর্তের জন্য বোধহয় চেতনালুপ্ত হয়েছিলাম। একটু ধাতস্থ হয়ে ঘরের টিভি টা চালিয়ে দিলাম।
    এ কি দেখছি ? ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এর দুটি পিলার কে ধাক্কা মেরেছে দুটি প্লেন। BBC বলছে hijacked প্লেন। আগুন লেগে গেছে, ধোঁয়ার কুন্ডলি পাকিয়ে পাকিয়ে উঠছে, আর ঝড়ের কুটোর মতো ঝরে পড়ছে বাড়ির বিভিন্ন অংশ বা মানুষের দেহ। জানি না এসময় আমার কি করা উচিত ? নাসির তো ওখানে ই আছে। অফিস এ ফোন করলাম বার কয়েক, নাসির কেও। কোথায় কি ? কোথায় বা কে ? বেরিয়ে পড়লাম জ্বর গায়ে, তবে এগোবো কোথায় ? পুলিশ চারিদিক বন্ধ করে দিয়েছে। শুনলাম, ওখানে যারা আটকে পড়ে গেছে তাদের বের করে আনার চেষ্টা চলছে। এখন কি করবো আমি ? নাসির এর জন্য অপেক্ষা ? সেই দিন কেটে গেলো অপেক্ষা করে করে, এই ভাবি নাসির এসে দরজায় বেল দেয় বা ফোন করে ? কিন্তু কোথায় কি ? হঠাৎ করে যেন সব চোখের সামনে ধূসর ধূলিস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে।

    US Govt. একটা লিস্ট বার করে। মৃতদের নামের লিস্ট। সেই লিস্ট এ আছে নাসিরের নাম। তবে, দেহটা টা আর সেই ভাবে পাওয়া যায় নি। ৯৫ তলায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এ সব ই ধ্বংস হয়ে গেছিলো। আমি মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ি। অনেক কাল হাসপাতালে ছিলাম, যখন ছাড়া পাই হাসপাতাল থেকে তখন ও আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারি নি। আজ ১১ ই সেপটেম্বর, ১৮৯৩ সালের এই দিনটিতে স্বামীজী শিকাগো তে ভাষণ দিয়েছিলেন, শুনিয়েছিলেন মানবতার মন্ত্র, জানিয়েছিলেন সর্ব ধর্মকে সম্মান |

    আজ এতো বছর পরে ও আমি রিক্ত, ক্লান্ত।। জীবনে র অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি, তবে নাসির কে ভুলতে পারি নি এক দিনের জন্য। ২০o২ তে গ্রাউন্ড জিরো তে স্মরণ সভায় যাই বন্ধু কে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে, সেখানে আমার লেখা একটা কবিতা পাঠ করি প্রেসিডেন্ট এর সামনে। এর পর খুব বেশি দিন আমেরিকা তে বসবাস সম্ভব হয় নি, ভালোই লাগে নি, মনে প্রাণে আমি একেবারে শেষ সীমানায় পা রেখেছিলাম। নাসির অন্য ধর্মের লোক ছিল, কিন্তু তার সাথে আমার কখনো বন্ধুত্বের অভাব ঘটে নি, এখনো মনে পড়ে একই সাথে রান্নাঘরে রান্না করা, খাবার ভাগ করে নেওয়া, অফিস এ কাজ ভাগাভাগি করা। সে বিলীন হয়ে গেলো কোথায় কত দূরে অনন্তলোকে, মিশে গেলো বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে, রেখে গেলো কিছু কিছু মুহূর্ত যে গুলো এখনো আমার হৃদয়ে প্রজ্বলিত, অমলিন। ডায়েরি তে কিছুই লেখা হলো না এই ভাবে, আমার চোখের জল কালো কালিতে পড়ে সে এখন ঝাপসা। শুধু মনের গভীরে লেখা হয়ে আছে যে ক্ষত এখনো তার দাগ রইলো চিরকালীন |
    (Based on a true story)

    কলমে, কথায় ও সুরে আমি সহেলি
    কপিরাইট সেপ্টেম্বর ১০, ২০২২, আমেরিকা
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে মতামত দিন