এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মা ও মৃত্যু- অরিত্র আহমেদ 

    Aritra Ahamed লেখকের গ্রাহক হোন
    ২২ আগস্ট ২০২৬ | ৩৭ বার পঠিত
  • মা ও মৃত্যু
    অরিত্র আহমেদ

    ১।
    আমার মা ঘুমের মধ্যেও
    জীবনের সঙ্গে কীরকম লেপ্টে থাকে,
    আর দুনিয়ায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়-
    আমি সারা জীবন জেগে থেকেও
    এবং সারা দুনিয়া হাতের মুঠোয় নিয়েও
    দুনিয়াকে একটুও ভালোবাসতে পারবো না,
    নিজ আত্মাকে একটি বারও চুমো দিয়ে
    বলতে পারবো না, সাব্বাশ!
    আত্মহত্যার লোভ সামলাতে পারবো না;
    ফলত মায়ের পাশে শুয়ে থেকে থেকে
    ঘুমের অযোগ্য মনে হচ্ছে নিজেকে।

    ২।
    আমার মা কখনো জানবে না যে
    তাকে নিয়েও আমি কবিতা লিখেছি
    রাত জেগে, তার পাশে শুয়েই;
    জানবে না যে অজস্রবার মৃত্যুর কথা ভেবেছি
    শুধু তার কথা ভেবেই পেরোনো হয়নি চৌকাঠ,
    আজও যখন আমি ভীষণ রকম বিভ্রান্ত,
    আজও যখন আমি মৃত্যুর কথা ভাবছি,
    আমার মা আমারই পাশে ঘুমিয়ে আছে,
    জানেও না যে, আমি তলে তলে
    বহুবার মরে গেছি; বহুবার তার পাশ থেকে
    উঠে গিয়ে পায়চারি করেছি, আর ভেবেছি
    পঁচিশ বছর বড়ো দীর্ঘ সময়
    বেঁচে থাকবার জন্য;
    মা আমার কখনোই জানবে না যে,
    তারই পেটের ছেলে পঁচিশ বছর বয়সে
    অসম্ভব ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলো।

    ৩।
    দু’চোখে যারে দেখতে পারি না,
    তার কবিতাও ভালো লাগে মাঝেমাঝে;
    তার ফুল, তার কাঁটা, তার কল্পনা
    নিজের বলে মনে হয়-
    মনে হয়, সুযোগ পেলে আমি তার মতো করেই
    তার জীবনটাও কাটায়ে ফেলতে পারতাম-
    এর মধ্যেই আম্মা রোজেলা টি বানায়ে নিয়ে আসে,
    আর আমিও ফিরে আসি নিজ অস্তিত্বে-
    আর মনে হতে থাকে যে আমি কক্ষনো পারবো না
    আমার মায়ের মতো একটাই জীবন, একটাই গন্তব্য নিয়ে বেঁচে থাকতে-
    উল্টো গন্তব্যের পর গন্তব্য, জীবন পেরিয়ে জীবন, মৃত্যুর পরও মৃত্যুর হাতে
    নাজেহাল হতে হতে কেটে যাবে আমার অদহনীয় অস্তিত্বের রোজেলা মুহুর্তগুলি!

    ৪।
    আমি কেউ না তোমার, শুধু
    পঁচিশ বছর আগে
    বয়ে এনেছিলে বলে
    ধৈর্য্য ধারণ করে টিকে আছি,
    মা গো, আমি তোমার অস্তিত্ব নই;
    তোমার হৃদয় নই;
    তোমার ভিতরে যে উৎসব, যে আলোর
    প্রচণ্ড চিৎকার, মা গো,
    তা-ও নই; আমি শুধু তোমার আঙুল বেয়ে
    ঝরে পড়া একফোঁটা ঘাম, মা গো,
    তোমার সন্তান, শুধু তোমার সন্তান!

    ৫।
    এপস্টিন ফাইলের ব্যাপারে আমার মা কিছুই জানে না;
    সারা দুনিয়া তোলপাড় হয়ে গেলেও
    মা'র দুনিয়াটা একদম ইনট্যাক্টই আছে-
    আর আমিও আসলে এমন মা’কেই কল্পনা করি,
    আমার পুরুষতান্ত্রিক মা-ভাবনা এমন মা’কেই দাবি করে,
    যে মা এপস্টিন ফাইল নিয়ে কখনো কিছু জানবে না, ভাববে না।

    ৬।
    পৃথিবীর সমস্ত মায়ের কাছে
    তাদের ছেলেরা
    একদিন ক্ষমা চাবে, ‘মা, আমরা পারলাম না
    তোমাদের মতো না-হওয়া, না-পাওয়াগুলি মেনে নিয়ে
    হাজার বছর ধরে বেঁচে থাকবার বন্দোবস্ত করতে;
    মা, আমরাও আজ তোমাদের না-পাওয়াগুলির মতো
    স্নিগ্ধ হয়ে রয়ে যেতে চাই-
    তোমাদের কল্পনায় বেঁচে থাকা অনেক সহজ আর অনেক সুখের,
    মা, আজ মরতে গিয়েও তাই মনে হচ্ছে আমরা যেনো পুনরায় ভূমিষ্ঠ হচ্ছি!

    ৭।
    একটা শব্দ ঘোরে মাথায়: গণমরীচিকাতন্ত্র
    শব্দটার চারপাশে ঝাপসা কিছু ভাবনা,
    কিছু সম্ভাবনা ঝিমায় বসে বসে-
    একবার মনে হয় এই শব্দটা নিয়ে আমি বহুদূর যেতে পারবো,
    আবার মনে হয় শব্দটা খুবই চটকদার,
    না লিখলেও চলে-
    আমার মনের মধ্যে গণ আর মরীচিকা নিয়ে তর্ক চলতে থাকে
    আর এক পর্যায়ে মরীচিকার মতোই সামনে এসে দাঁড়ায় আমার মা,
    যে কিনা আর দশটা মায়ের মতোই
    ছেলের সামনে এসে দাঁড়ায় নিতান্ত মামুলিভাবে;
    আমার নাকে গন্ধ আসে রান্নাঘরের- আমি ভাবি, মা আমার কোনো তন্ত্র বোঝে না,
    তবু একটা বিশাল জীবন কাটিয়ে দিলো কিছু সুদূর মুহূর্তের আকাঙ্খায়-
    যে মুহূর্তগুলি আমার কাছে কিছুই মিন করে না,
    অথচ আমি ছাড়া মুহুর্তগুলি অচল-
    আমার জীবনের কোনো চিন্তা, কোনো নীতি, কোনো রাজনীতির কোনো স্থান নেই
    ওই মুহূর্তগুলির মাঝে- কেননা, মা আমাকে চান, শুধু আমাকে, তার মতে,
    নিপাট নিশ্ছিদ্র আমাকে- এবং সারা জীবন আমার এই আফসোস থেকে যাবে
    যে, আমি আমার মায়ের পছন্দের ওই আমি-টা হতে পারি নাই, কক্ষনো পারবো না।

    ৮।
    ঘুম আসে।
    আবার আসে না।
    মা তার ছেলের পাশে
    শুয়ে শুয়ে নাক ডাকে-
    ছেলে খালি ভাবে,
    আমার কি নাক নাই?
    চোখ নাই ঘুমানোর মতো?
    খোদা কি আমার মা’র
    দু’টো চোখ আমারে দেবে না?
    আমি রাতে নাক ডাকবো না?

    ৯।
    ফিসফিস করে মা গো
    যতই বলো না কেনো, ঘুমো;
    ঘুম আমার আসবে না-
    আমি সেই কচি খোকা নই;
    আমি আজ অনেক অনেক দূরে
    চলে এসে বুঝেছি, মা,
    আর বাকি নেই;
    আজ অথবা কাল
    আমি মুছে যাবো
    মিহিন ক্ষতের মতো;
    পুষি বিড়ালের মতো
    আমি চলে যাবো বাড়ি ছেড়ে,
    মা আমার, ফিসফিস করে আজ
    যতোই কপালে দাও চুমো,
    ঘুম আমার আসবে না,
    আমি সেই কচি খোকা নই;
    আমার তো চলে যেতে হবে।

    ১০।
    মা, তোমার প্রিয় গন্ধের মতো
    আমি ফিরে এসেছি তোমার কাছে-
    যদিও আমার গায়ে এখনো কুয়ার শ্যাওলা,
    যদিও এখনো প্রাণে ঢের সলিচ্যুড,
    মা, তোমার প্রিয় গন্ধের মতো
    তোমার নিঃসঙ্গ ছেলে তবুও এসেছে ফিরে
    ঋতুচিহ্ন খুঁজে, শিশুকালে!

    ৭-৮.০২.২০২৬

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে প্রতিক্রিয়া দিন