পুরো গল্পটাই হয়তো বলতে হবে। যাবতীয় খুঁটিনাটিতে না গেলেও গল্পের মূল শিরদাঁড়াটাকে খাড়া করতেই হয়। তা না হলে এ ছবি নিয়ে আলোচনারই কোন অর্থ নেই। তবে গল্প এ ছবির সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নয়। বরং জরুরী হল তলেতলে চলতে থাকা এ ছবির দর্শন, এবং ভিনদেশী তারার মতই মানসলোকে জ্বলে ওঠা একেবারে নতুন কিছু জীবনবোধ। কারণ এ ছবি দেখতে বসে ঘেঁটে যায় নৈতিকতার পাঠশালায় এ যাবৎ মুখস্ত করে আসা সমস্ত ছড়া-কবিতাই। ঘোরলাগা চোখে খুঁটিয়ে দেখতে হয় অনুভূতিদের প্রবল দাপাদাপি।
"ব্রেকিং দ্য ওয়েভস" এমনই এক গল্প শোনায় যেখানে যৌনতা এবং আধ্যাত্মিকতা, বিশ্বাস এবং উন্মাদনা একে অপরের সাথে দুরন্ত সংঘর্ষে লিপ্ত।
উপকূলবর্তী একটা স্কটিশ গ্রাম। বাকি বিশ্বের থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকা একটা অন্তরীক্ষের মত। সেখানকার মানুষজন অর্থোডক্স ক্রিশ্চান। এমনই এক গ্রাম যেখানে চার্চের মাথাদের অনুমতি ছাড়া কারোর বিয়ে হবারও জো নেই। অনাচার দেখলেই তাদের এক কথায় একঘরে হয়ে যেতে হয় এক একটা পরিবারকে। কোন পতিতার মৃত্যু হলে, কবর দেওয়ার সময় চার্চের ফাদার সেখানে সদর্পে ঘোষণা করতে পারেন – “তোমাকে নরকে নিক্ষেপ করা হল। ” এমনই গোঁড়া ক্রিশ্চান আবহাওয়া সেখানে।
সেই গ্রামেই বেড়ে উঠেছে ‘বেস’ নামের এক সরল গ্রাম্য যুবতী। ঈশ্বর বিশ্বাস এবং তাঁর একনিষ্ঠ সাধনাই যার জীবনের মূলধন। সে শুধু ঈশ্বর ভক্তই নয়, বলা চলে তার শয়নে স্বপনে ধ্যানে গ্যানে বিরাজ করছেন শুধুই ঈশ্বর। ঈশ্বরকে সে ভালবাসে তার নিজস্ব নিয়মে। ভগভান ভক্তি তার এতই তীব্র যে, তার ধারণা উনি তার সাথে গোপনে কথোপকথন চালান। শাসন করেন বেসকে একটু বেচাল হতে দেখলেই, আবার ভালোবেসে মঞ্জুর করেন একাধিক প্রার্থনা।
নারী হিসেবে বেস যতটা ভঙ্গুর এবং ছেলেমানুষ, ততটাই সংবেদনশীল। সেই যুবতী প্রেমে পড়ল এক তীক্ষ্ণ, সুদর্শন যুবকের। ইয়ান একজন শ্রমজীবী মানুষ, স্কটল্যান্ড উপকূলের তেলকর্মী। ছবির শুরুতেই তাদের বিয়ে। ছেলেমানুষি স্বপ্নের বাইরে এই প্রথম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রেমে পড়ছে বেস। প্রথম স্বাদ নিচ্ছে যৌনতার। এই প্রারম্ভিক দৃশ্যের একাধিক খোলামেলা শারীরিক দৃশ্যগুলো দর্শকের কাছে যৌন উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে না, বরং সেই শিশুসুলভ যুবতীর সাথে আমাদের খুব দ্রুত এক মানসিক সংযোগ ঘটিয়ে দেয়। আমরা বেসকে বারবার নগ্ন দেখি, তাও তার সেই নগ্নতায় এক অপাপবিদ্ধতা ছড়িয়ে থাকে। উদ্ভিন্নযৌবনা বেসের দেহপটে জড়িয়ে থাকে শুধুই এক স্নিগ্ধ অব্যক্ত পবিত্রতা। পরিচালক জেনেবুঝেই এই নগ্ন দৃশ্যগুলোতে বেসের শুদ্ধাচারকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। কারণ সেই তরুণীর প্রতি আমাদের জমে ওঠা সব অনুভূতির উপর তিনি মোক্ষম একটা ঘা বসাবেন, আর তাতেই আমাদের দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া বোধ বিবেচনাকে পড়ে ফেলতে হবে নতুন কোন আঙ্গিকে। হ্যাঁ, যৌনতা বেসের জীবনে ক্ষণিক সুখবিলাসের সম্পূর্ণ পরিসীমা প্রকাশ করেছে ঠিকই, তবে পরবর্তী সময়ে সেই যৌনতাই এক সর্বগ্রাসী ট্র্যাজেডি হয়ে উঠেছে। নির্দোষ নিষ্কলুষ যুবতীকে আবেগপ্রবণ স্ত্রী হয়ে উঠতে দিতে হয়েছে অনেকটা আত্মত্যাগ।
ইয়ান সমুদ্রে তার কাজে ফিরে যেতেই, বেস একেবারে মুষড়ে পড়ল। মনমরা দিন কাটে তার। পাংসু মুখে ঈশ্বরের দোরেই ধর্না দিয়ে পড়ে রইল রাতদিন। চার্চের নিভৃত কোণায় ঈশ্বরের সাথে কথোপকথন চালাল একটানা। স্বামীর অনুপস্থিতির জন্য সে দায়ী করল নিজেকেই। যেন ঈশ্বর তাকেই অযোগ্য, ভালবাসার অনুপযুক্ত বলে ভরতসনা করছেন। সে মনপ্রান ঢেলে প্রার্থনা করল যেন ইয়ান ফিরে আসে খুব তাড়াতাড়ি।
ইয়ান ফিরল। তবে দুর্ঘটনায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে। চলাফেরার ক্ষমতা হারাল। এমনকি যৌনতা করার সামান্য শক্তিটুকুও। বেস আবারো দায়ী করল সেই নিজেকেই। শুধু দায়ীই করল না, সে মনে করল তার প্রার্থনা এতটাই জোরালো ছিল যে ঈশ্বর দুর্ঘটনা ঘটিয়ে তার স্বামীকে সময়ের আগেই ফিরিয়ে আনলেন। বেঁচে থাকার সমস্ত ইচ্ছেই মুছে যাচ্ছিল ইয়ানের। যৌন অক্ষমতায় সে হয়ে উঠছিল মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত এবং বিপর্যস্ত। ঠিক সেই সময় নিজের হৃত যৌনশক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করার একটা উপায় বের করল সে। ইয়ান তার স্ত্রীকে অনুরোধ করল সে যেন কোন ভালবাসার মানুষ খুঁজে বের করে। তারপর সেই প্রেমিকের সাথে করে চলা প্রতিটা যৌনাচারের আগাপাস্তলা বর্ণনা যেন তাকে শুনিয়ে যায় হাসপাতালের বিছানায়। তবেই ইয়ান বেঁচে থাকার কোন উপলক্ষ খুঁজে পাবে। জানবে তার বেঁচে থাকাটা বেসের জীবনে কোন বঞ্চনা ডেকে আনছে না।
আর বেসও বিশ্বাস করল এভাবেই তার স্বামী ভালো হয়ে উঠবে একদিন। শুরু হল এক উদ্ভট এবং বিপজ্জনক আধ্যাত্মিক খেলা। একের পর এক যৌন সম্পর্কে জড়াতে থাকল বেস। সে মনে করল দেহ অন্য পুরুষের হলেও, যৌন ক্রিয়ার সময় ইয়ানের সাথেই তার এক আধ্যাত্মিক যোগাযোগ তৈরি হয়। অচিরেই পুরো এলাকায় বেশ্যা বলে বদনাম হয়ে গেল তার। ক্ষেপাতে লাগল এলাকার শিশু কিশোররাও। ইয়ানের শারীরিক অবস্থা কখনো উন্নতি হয়, কখনো অবনতি। অবস্থার অবনতি হলে বারাঙ্গনার সাজে বেস চলে যায় কোন বার বা পাবে। সাথে করে নিয়ে আসে কোন পুরুষ। দাঁতে দাঁত চেপে ঊরুসন্ধি প্রসারিত করে চেয়ে থাকে ইয়ানের নিরাময় হয়ে ওঠার দিকে। এভাবেই একদিন ইয়ানের অবস্থার একেবারে অবনতি ঘটল। রাত কাটে কি কাটে না। বেস চলে গেল জাহাজ কর্মীদের কাছে নিজের শরীর বিলোতে। সেখানে ঘটে গেল আরেক বিপর্যয়। জাহাজ কর্মীদের সাথে বচসায় জড়িয়ে পড়তেই তার উপর নৃশংস ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল সকলে। বেসের আধমরা দেহটা ফিরল হাসপাতালে। তারপর সে রাতেই সাঙ্গ হল খেলা। আলোটা নিভে গেল আচমকা। বেসের কবরে ধর্মের মাথারা বললেন – তোমাকে নিক্ষেপ করা হল নরকের আগুনে।
তারপর …
তারপর কীভাবে যেন ইয়ান সুস্থ হয়ে উঠল। কাকতালীয়ই বোধহয় !
পুরো ছবিটা জুড়েই ব্রেকিং দ্যা ওয়েভস এ বিষাদের যে থমথমে অনুভূতির উদ্ধত উপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করি মূলত তা আসে এক জোরালো বৈপরীত্য থেকে। এক নৈরাজ্যবাদী যেন নিয়ম ভাঙা নান্দনিকতার সাথে শর্তহীন ঈশ্বর বিশ্বাসের গল্প কথা ফেঁদে বসেন। তবে সব কিছুর উপরে এই ছবি একটি প্রচলিতভাবে কঠোর ধর্মীয় ব্যবস্থার ফ্যাসিবাদী দমনকেই নিন্দা করে যায়।
কিন্তু এর আরেকটা দিকও রয়েছে। ছবিতে ঘুরেফিরে আসা অপ্রতিরোধ্য আবেগগুলোর মঞ্চায়ন এতটাই বহমান এবং সহজাত যে গল্পটি একজন আধুনিক নারীর সন্ত হয়ে ওঠার কাহিনীকে ব্যাক্ত করে। প্রচলিত ধারনায় সাধু সন্তদের আমরা ব্যাখ্যা করে থাকি ভারী ভারী শব্দে। মানুষের অসাধ্য এবং অনধিগম্য দিকগুলো দিয়েই আমরা তাদের দৈবিক অস্তিত্বকে ব্যাখ্যা করি। ছবিতে ‘লারস ভন ট্রিয়ার’ দেখালেন একজন প্রকৃত সন্তকে অস্তিত্বের কী ভয়ঙ্কর টালবাহনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ছবিতে বেস হল আমাদের সেই সন্ত। যার আধ্যাত্মিক এবং শারীরিক মৃত্যু ঘটল। এক পৃথিবী যন্ত্রণা নিয়ে বিলীন হয়ে গেল সে। অথচ তার সেই অলৌকিক কৃতিত্বকে স্বীকৃতি তো দিতেই পারলাম না, উল্টে তার পেল্লায় সমালোচনা করলাম। কারণ কোথাও যেন যুক্তিতে আমাদের বাধছিল। উপহাস করে বললাম ইয়ানের বেঁচে ওঠাটা নেহাতই কাকতালীয়। ভন ট্রিয়ার যুক্তির ঊর্ধ্বে গিয়ে ঠিক সেই বিদ্রূপটাই করে গেছেন। বেস তার স্বামীর জীবন বাঁচাতে সমস্ত দিক দিয়ে প্রতিটি অর্থে নিজেকে ধ্বংস করে দিচ্ছে অথচ সামাজিক ভাবে আমাদের তা মনে হচ্ছে অর্থহীন। মজার ব্যাপার হল যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে বেসের এই কাজকে সত্যিই ব্যাখ্যা করা যায় না। মনে হয় অন্ধ বিশ্বাস এবং নির্বুদ্ধিতা ছাড়া এ কাজ কেউ করতেই পারে না। ঠিক এখানেই পরিচালক দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন ব্যাপারটা কেমন হবে যদি ভাবা যায় যে বেস ঠিক, আর আমরা সকলে ভুল। আমাদের সীমাবদ্ধতার জন্যই আমরা তাকে বুঝে উঠতে পারলাম না।

পরিচালক এ ছবির শেষে কোন মীমাংসা টানেন না। প্রেমকে কখনো এক আশ্চর্য স্নিগ্ধতায়, কখনো ততোধিক ক্রুরতায় প্রেম দিয়েই ভেঙ্গেচুরে দেখান। পরিচালক বিশ্বাসের ঐতিহ্যগত ধর্মীয় আধিপত্যকে তীব্র ভালবাসার সাথে এক জটিল মানস্তাত্তিক গিঁটে বেঁধে ফেলেন। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র বেসকে দিয়ে দেখান অধিকাংশ ধর্মীয় মতবাদ, এবং তীব্র প্রেম আসলে একটাই জিনিস দাবী করে - যুক্তিকে জলাঞ্জলি দিয়ে শর্তহীন বিশ্বাসকে গ্রহন এবং আত্মসমর্পণ। তবে পরিচালক এর বাইরেও আরও একটি কথা বলেন। বেস সব ধরনের কর্তৃত্বের কাছে নিজেকে এতটাই সমর্পণ করে যে তার ঈশ্বর ভক্তির প্রশ্নাতীত বিশুদ্ধতা এবং প্রেমের শুদ্ধতা সমস্ত যুক্তিতর্ককে অতিক্রম করে গেল।
আপাতদৃষ্টিতে বেসের এই অদ্ভুত বিশ্বাসের বৈধতা বা যৌক্তিকতা আছে কিনা সেটা বড় প্রশ্ন নয়, আসল প্রশ্ন হল তার মনেপ্রানে সেই বিশ্বাসের অস্তিত্ব থাকাটা। কারণ বেসকে ঘিরে থাকা সমাজের সব ভণ্ডামি, সকল দুর্নীতি নির্বিশেষে, বেসের এই নিঃস্বার্থতা এক বিস্ময়কর বাস্তবের মতই জেগে থাকে।
প্রশ্ন ওঠে বেস কি আদপেই এক শুদ্ধচিত্ত সন্ত নাকি সে শুধুই এক দু-কানকাটা ভ্রষ্টাচারিণী?
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।