এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  •   ফেয়ারওয়েল

    Manali Moulik লেখকের গ্রাহক হোন
    ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৩১ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • আজ বুধবার। ৩১ শে মার্চ। রৌদ্রজ্জ্বল দিনে বেলা ঠিক  ১০ টায় রিকশাটা থামলো বিরজাসুন্দরী বালিকা বিদ‍্যালয়ের সামনে। আজকেও সামনের রাস্তায় জল ভরার ট‍্যাঙ্কগুলো এসে দাঁড়িয়েছে, পাশের ফুটপাতে গ্রাম থেকে আসা সবজি-বিক্রেতা মহিলারা গল্পে মশগুল। গরম পড়লেও ঝিরঝিরে বাতাস হিল্লোল তুলছে নিমগাছের পাতায়। রিকশা থেকে নেমে সুরঙ্গমা এগিয়ে গেলেন স্কুল গেটের দিকে। দোতলা  স্কুলের বিল্ডিংগুলো হলুদ- মেরুন রঙের, দাঁড়িয়ে রয়েছে চৌকো স্কুল মাঠটাকে ঘিরে। সকালে প্রার্থনা সংগীত শুরু হলে সাদা স্কুলের পোশাকে বিভিন্ন ক্লাসের মেয়েরা যখন দাঁড়ায় মনে হয় ছোট-বড়ো সাদা ফুল ফুটে রয়েছে। এই ফুলগুলিকে ফোটানোর দায়িত্ব এতদিন সযত্নে পালন করে এসেছেন সুরঙ্গমা মৈত্র। এই বালিকা বিদ‍্যালয়ের ভূগোলের শিক্ষিকা। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ দিনটি আজ উপস্থিত হলো। আজ তাঁর অবসর গ্রহণের দিন। সহকর্মী ও ছাত্রীরা আয়োজন করেছে বিদায়-সম্বর্ধনার, যার পোশাকি নাম - ফেয়ারওয়েল। মাঠের গা ছুঁয়ে একতলার করিডোর পেরিয়ে হাঁটতে শুরু করেন তিনি। প্রতিটা ক্লাসরুম, ব্ল‍্যাকবোর্ডের শীতলতা, চকের স্পর্শ তাঁর মনে গাঁথা রয়েছে। আর এসবের সঙ্গে রয়ে গেছে কতো মুখ…কতো অদেখা ভবিষ্যৎ, চিন্তিত চোখে স্বপ্নকে ছুঁতে চাওয়ার কিশোরী মুখাবয়ব হঠাৎ চলচ্চিত্রের পর্দার মতো ওনার চোখে ভেসে ওঠে। 

    – “সুরঙ্গমাদি, আসুন। ফেয়ারওয়েল শুরু হবে সাড়ে এগারোটা থেকে।”  কথাগুলো বলে আপ‍্যায়ন করলো ইংরেজির শিক্ষিকা দেবলীনা।
    ঈষৎ লজ্জিত হলেন সুরঙ্গমা। তাঁর ফেয়ারওয়েল আজকে, আর তিনিই কিনা তাড়াতাড়ি এসে পড়েছেন! কিন্তু কী করা যাবে, বিগত বছরগুলিতে কোনোদিন যাঁর একমিনিট সময় এদিক-ওদিক হয়নি তিনি শেষদিনটাতেও সময়জ্ঞানকে পরাজিত করতে পারবেন না, এটাই স্বাভাবিক। ভূগোলের ক্লাসে পৃথিবীর আহ্নিক ও বার্ষিক গতি বোঝানোর সময় কত বলেছেন ছাত্রীদের এই সময়জ্ঞানের কথা। যাক, এখনো দেড়ঘন্টা সময় আছে। রুমালে চশমা আর মুখটা একবার মুছে নিয়ে টিচার্স রুমে গিয়ে  বসলেন সুরঙ্গমা। সহকর্মীরা অনেকেই এসে গিয়েছে। বর্ষীয়সী শিক্ষিকার বললেন তাঁদেরও কর্মজীবন শেষের দিকে, নবীনাদের প্রণাম, বাড়ি থেকে দেশ ও রাষ্ট্রের কথা, গল্প, টুকটাক…
    বাংলার বর্ণালী রায় ইশারায় বলেছিলো একটু কথা আছে। দরজার বাইরে এলেন সুরঙ্গমা। হালকা নীল শাড়ি আর মার্জিত সাজে আজকে তাঁকে গাম্ভীর্যপূর্ণ অথচ অপরূপা লাগছে। বর্ণালী হাতের ফোনটা দেখিয়ে বলে, – “দিদি, একটা দারুণ খবর আছে! রুপা NET clear করেছে!”

    চকিতে মুখটা আলোয় ভরে উঠলো ওনার। 
    – “মানে আমাদের রূপা? রূপা দত্ত? NET -এর প্রথম পর্ব পেরিয়ে যাওয়া মানে তো অধ‍্যাপনার দিকে একধাপ এগিয়ে গেল !”

    – “সে তো বটেই,দিদি।” বর্ণালী হাসে।
    – “আপনার নাম্বারটা ওর কাছে নেই তাই আমাকেই জানিয়েছে। বারবার করে বলে দিয়েছে, সুরঙ্গমাদিকে যেন জানিয়ে দিই।”

    বাইরের রোদের জন‍্য ঘাম  হচ্ছে। আবছা হয়ে ওঠা চশমার কাঁচে একটি দিন ভেসে ওঠে সুরঙ্গমার। একটি সদা-নির্বাক কিশোরীকে ভৃগোলের শিক্ষিকা বলছেন, “ভারতের প্রাকৃতিক মানচিত্রটা নিয়ে এসো ম‍্যাপঘর থেকে। যাও।”

    ম‍্যাপঘর। আসলে ভূগোলের ল‍্যাবরেটরি এটা। কাঠের খোপ কাটা একটা চওড়া তাকের মধ‍্যে বিভিন্ন ম‍্যাপ পাকিয়ে রাখা থাকে। গ্রীষ্মকালে বন্ধ জানালার ফাঁকফোকর দিয়ে দু-একটি আলোর রশ্মি অনেক ধুলোকণা নিয়ে প্রবেশ করে। আলো-আঁধারি ঘরটায় তখন আন্দিজ পর্বত,লা প্লাটা নদী, কলোরাডোর গিরিখাত সব যেন কাঠের খোপ থেকে বাস্তবে নেমে আসে। ম‍্যাপঘর তাই ছাত্রীদের কাছে এক রূপকথা। সুরঙ্গমার স্কেল ম‍্যাপের ওপর দিকনির্দেশ করে, তাঁর চোখ থাকে ক্লাসের দিকে।
      –  “রূপা, মনটা কোথায় আছে?”
    তারপর একে একে জানতে পেরেছিলেন তার সন্ধান। বাড়িতে মা একা। বাবা নেই বহুদিন। দাদা-বৌদির সংসারে নিত‍্য সমস‍্যা তাদের নিয়ে। মনে আছে, কত মানসিক সহায়তা আর পড়ার সাহায‍্য নিয়ে স্কুলের শেষে পৌঁছে যেতেন ওর কাছে। ওনার নিজের বাড়ির কাজও তখন কম নয়। সেই রূপা আজ অধ‍্যাপনার পথে চলেছে। মার্চ মাসের রৌদ্রেও শান্তির শীতলতা অনুভব করলেন সুরঙ্গমা।  

    – “দিদি, এবার তাহলে…মানে সব তৈরী আমাদের।” বর্ণালীর ডাকে সচেতন হলেন তিনি। এরপর মঞ্চে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা বলা, ছাত্রী ও শিক্ষিকাদের উৎসাহ দেওয়া, পুস্পস্তবক গ্রহণ,উত্তরীয় গ্রহণ আর যা যা হয়ে থাকে নিয়মমাফিক সবই হলো। বিরজাসুন্দরী বালিকা বিদ‍্যালয়ে আজকেও মেয়েদের কোলাহলে মুখর। শুধু বড্ড নিঃশব্দ মনে হচ্ছে সবকিছু সুরঙ্গমার। নিমগাছে ইতিমধ‍্যে বিকেলের ছাপোষা রোদ এসে পড়েছে, একটা ক্লান্ত চাতকের ক্ষীণ ডাক শুধু। দীর্ঘ শেখানোর আর শেখার জীবনে কি কিছু বাকি থেকে গেল? কিছু শেখা হলো না? 
    ফুটপাত থেকে সবজির পসরা তুলে ফেলেছে গ্রাম‍্য মহিলারা। স্কুলের সামনে থেকে তার আচার-ঝালমুড়ির ঠেলাগাড়িটা নিয়ে ধীরগতিতে রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছে মোহনকাকা । পিচের রাস্তায় নিজের প্রলম্বিত ছায়ার দিকে তাকাতেই সুরঙ্গমা শুনলেন,

    – “দিদিমণি!”  শীর্ণ বৃদ্ধ রফিকের ডাক। তাঁর রিকশাচালক। দীর্ঘ চাকুরী জীবনে যে একটি দিন তাঁর দেরী হয়নি, সেই গর্বের অংশীদার এই মানুষটিও। রোদ,ঝড়,বৃষ্টি যাই হোক না কেন, দিদিমণির স্কুলে বেরোবার আর ফেরার সময়টা তার কন্ঠস্থ। সুরঙ্গমা মজা করে বলতেন,
     –  “রফিক, মেয়েগুলোর যদি তোমার মতো সময়জ্ঞান থাকতো !”
    আজকের সময়টা যদিও ওকে বলা ছিলো আগে থেকে। বাড়ির সামনে নামতেই ছুটে আসে ওনার তৃতীয় শ্রেণীতে পাঠরতা নাতনি,মিমি।

    –  “ঠামি, ঠামি, এত গিফট কীসের? ফুল কে দিলো?”
    ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, “আজকে আমার ফেয়ারওয়েল ছিলো তো, তাই স্কুল থেকে দিয়েছে।”
    – “ফেয়ারওয়েল মানে?”
    – “ফেয়ারওয়েল মানে বিদায় - অনুষ্ঠান। আমি তো আর স্কুলে যাবো না, তাই দিনটাকে memorable করে রাখা।”

    – “ও। বুঝেছি।”  মাথা নেড়ে বলে মিমি। তারপর সহসা প্রশ্ন করে,
    – “ঠামি, তুমি স্কুলে না গেলে তো রফিকদাদুও আর আসবে না তোমাকে নিয়ে যেতে। তাই না?”
    – “হ‍্যাঁ তো”

     – “তাহলে রফিকদাদুর ফেয়ারওয়েল হবে না?”

    কোমল কন্ঠের কথাটা শুনে চকিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখলেন সুরঙ্গমা। ঠা-ঠা রোদে শীর্ণদেহ রিকশাচালক রফিক কুঁজো হয়ে টেনে চলেছে তার বাহনটিকে। রাস্তার বাঁকে সে অদৃশ‍্য হওয়ার পর সুরঙ্গমার মনে হলো, গোটা জীবন শিক্ষকতা করেও কত কী শেখা হলো না তাঁর।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • MP | 115.187.***.*** | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৫৭738673
  • অসাধারণ মর্মস্পর্শী গল্প | আয়রনি ব্যাপক ফুটিয়ে তুলেছেন আপনি |
  • Manali Moulik | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৫৮738674
  • ধন‍্যবাদ ধন‍্যবাদ
  • Anindya Rakshit | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৯:০৬738685
  • বাঃ!
    ম্যাপঘরের চিত্রকল্প yes
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন