এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • এই ফাটকাবাজির দেশে স্বপ্নের পাখিগুলো বেঁচে নেই: মেটিকুলাস ডিজাইনে নির্বাচন 

    জোনাকি পোকা ৭১ লেখকের গ্রাহক হোন
    ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৭৫ বার পঠিত
  • | | | | | | | |
    আগমীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। রোজ বৃহস্পতিবার। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সংগঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন এখানে যেন ঈদের ছুটির আমেজ নিয়ে এসেছে। নির্বাচনকে এমন ভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে ৪ দিনের টানা ছুটি হস্তগত হয়। সকল শ্রেণির শ্রমজীবী মানুষ নিজ নিজ গ্রামে ফিরছে। মানুষগুলো ভোট দেয়ার তাগিদে গ্রামে ফিরছে নাকি ছুটির আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামে ফিরছে, তা উনারাই ভালো জানেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে এখানে আমি নিজের এবং অন্য মানুষের থেকে শোনা ৪টা অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরবো। এবং এই নির্বাচন ঠিক কতটা ফলপ্রসূ হতে পারে, সে সম্পর্কে নিজস্ব ধারণার কথা উল্লেখ করবো। 

    ঘটনা ১
    সেদিন ময়মনসিংহ থেকে সিএনজি করে ফিরছি। সিএনজিতে বসে চালকের সাথে আমার আলাপ হচ্ছিল। কেননা আমরা পরপর ২ বার বিএনপি দল কর্তৃক নির্বাচনী প্রচারণার মিছিলের জন্য ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়েছিলাম। আমাদের সেই আলাপটাকে আমি এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। 

    - কী মনে হয়?  উনারা কি জিতবে? 
    - তা জানি না। তয় ভুটটা এইবার পাল্লায়ই দিয়াম।
    - কেন? 
    - আম্লীগ তো নাই। আর দেড়ডা বছর তো দেখলাম বিম্পিরে। ক্ষমতায় না যায়াই যে তাফালিংডি করলো। 
    - কী রকম? 
    - চান্দাবাজি
    - আচ্ছা
    - আম্লীগ আমলে সিএনজি ড্রাইভার সমিতির রেজিষ্ট্রেশনে দেওন লাগতো ১০০ টেকা।  অহনকা দেওয়া লাগে ৩৫০ টেকা। 
    - আচ্ছা
    - আম্লীগের সময় সমিতির থিকা গাড়ির সিরিয়াল নম্বর নিতে দেয়া লাগতো ৫০ টেকা, অহন দেয়া লাগে ১০০ টেহা। লুটপাট চলতাছে। 
    - তা কি শুধু ধানের শীষ মার্কাই এসব করে বেড়াচ্ছে? 
    - যাই কন, দাঁড়িপাল্লাই এইবার ভরসা। আমগো ড্রাইভাররা জামাত ইসলামের  পাল্লাতেই সিল দিয়াম। ৯০% পাল্লার ড্রাইভার। ধানের শীষের তাফালিং ছুডায়ালবাম।
    - কিন্তু পাল্লা তো ৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ছিল। ওরা তো রাজাকার। 
    - আরে ৭১ চইলা গেছে সেই কব্বে। আবর যহন ৭১ আইবো তহন দেখবাম নে। খালি ৭১ লইয়া পইড়া থাকলে কাম চইলতো না। আমগোরে যারা এট্টু আরাম দিব, আমরা তাগোরেই ভোট দিয়াম। আর পাল্লা কহনো চান্দা তুলে না।
    - ওরা তো হাদিয়া তোলে।
    - আরে চান্দা আর হাদিয়া কি এক হইলো? চান্দা তো উডায় দুনিয়ায় কামে। আর হাদিয়া যারা তুলে তারা তো দ্বীনের পথের লোক। দ্বীনের পথে দান করলে সোয়াব আছে। জান্নাত নসিব হইবো। 

    প্রিয় পাঠক, আমাদের বাংলাদেশ এখন এক গভীর সংকটের সম্মুখীন। আমাদের আলোচনা আজ এই সংকটকে কেন্দ্র করেই। বাংলাদেশ কি তবে সত্যি সত্যি উগ্র ডানপন্থীদের হাতে চলে যাবে? এই প্রশ্নটাই এখন মিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন! 
     
    নির্বাচনী আবহাওয়া ঘোলাটে। কেন ঘোলাটে? মূলত বাংলাদেশের সংবিধান বলে, এই ইন্টেরিম সরকার বেআইনি। কেননা সংবিধান মতে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা মূলত পার্লামেন্টারি। অর্থাৎ সরকার হবে ইলেকটিভ। সিলেক্টিভ নয়। এবং নির্বাচন হতে হবে ইলেক্টিভ সরকারের তত্ত্বাবধানে।  অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালিত হলো সিলেক্টিভ ইন্টেরিম সরকারের অধীনে। আর এই সংকট নিরসনেই তারা গণভোটের আয়োজন করলেন। 
     
    অর্থাৎ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হতে চলেছে। গণভোট সম্পর্কে সাধারণ মানুষ খুব অল্পই জানে। কতগুলো বিষয়ের ফয়সালা এই গণভোটে করা হবে সে সম্পর্কে শ্রমজীবী মানুষ ওয়াকিবহাল নয়। এমনকি যারা নির্বাচনে প্রতিযোগী, তারাও সম্পূর্ণ জানে না। শুধুমাত্র গণভোটকে কেন্দ্র করে যে প্রচারণাটা সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে, তা হলো: গণভোটে 'হ্যা' জয়যুক্ত হলে সংস্কার হবে, সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হবে, স্বপ্নের বাস্তবায়ন হবে, জুলাইয়ের স্পিরিট রক্ষা পাবে। 
     
    আর অপরদিকে 'না' জয়যুক্ত হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে, আম্লীগ ফিরে আসবে। এরকম প্রচারণাই সরকারি মাধ্যমগুলোতে চালানো হয়েছে। 
     
    হাদি-হত্যার নীলনকশায় নির্বাচনের বার্তা 
     
    ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর 'ইনকিলাব মঞ্চ'র মুখপাত্র এবং ঢাকা ৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী শরীফ ওসমান বিন হাদি'কে গুলিবিদ্ধ করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর হাদি মারা যান। এবং সরকার হাদির এই মৃত্যুকে খুব সুন্দর ভাবে নীলনকশায় অন্তর্ভূক্ত করে ফেলে। হাদি-হত্যার পুরো দায় চাপানো হয় রাজনৈতিক কর্মকান্ডে নিষিদ্ধ ঘোষিত আম্লীগের উপর। হাদি'র জীবনের বিনিময়ে সরকার তাঁর পরিবারে রহমতের ধারা বর্ষণ করে। জাতীয় শোক পালন করে। হাদির ভাইকে পররাষ্ট্র বিভাগে চাকরির ব্যবস্থা করা হয়। মানে সেই কোটাব্যবস্থাই এখানে বহাল তবিয়তে থাকে। হাদি মূলত তাঁর ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন ইস্যুর বিষয়ে বিতর্কে মুখর ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ছিলেন ঘোর আম্লীগবিরোধী এবং জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির তরুণ নেতা। এই হত্যাকান্ডের বিচার এখনো প্রক্রিয়াধীন। বলা হচ্ছে মূল হত্যাকারী নাকি ভারতে পালিয়ে গেছে। তবে হত্যাকারীর সহযোগী এবং তাদের পরিবারকে পুলিশের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। আমরা জানি না কেউ পরিবারের সাথে শলাপরামর্শ করে হত্যাকারী হয় কিনা? আমাদের পুলিশি ব্যবস্থায় পরিবারকে ইন্টারোগেশন করা এক ভীষণ প্রহসন। আর ঠিক এই ভাবেই নির্বাচনী আবহাওয়ার সূচনা হয়েছিল।
     
    পোশাকশ্রমিক দিপু চন্দ্র দাস হত্যাকান্ড
     
    হাদির মৃত্যুর দিনেই ময়মনসিংহের ভালুকায় এক হিন্দু পোশাকশ্রমিককে হত্যা করে পুড়িয়ে ফেলা হয়। কেন হত্যা করা হয়? দীপুর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে তারই সহকর্মীরা তাকে পুড়িয়ে মারে। মূলত দীপু দাশের সাথে তার অফিসের সহকর্মীদের সাথে অফিস-পলিটিক্সে শত্রুতা সৃষ্টি হয়েছিল। আর সেই শত্রুতার জের ধরে তাকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। এই অভিযোগে প্রথমে তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। তারপর সেই পুলিশের হেফাজত থেকে মোল্লাদের প্ররোচনায় মব সৃষ্টি করে ছিনিয়ে এনে তাকে হত্যা করা হয়। অভিযোগ ছিল ফেসবুক মাধ্যমে সে অবমাননা করেছে।  অথচ দীপু'র কোনো স্মার্টফোন তো ছিলই না, একাউন্টও ছিল না। 
     
    কিন্তু হাদি পেল জাতীয় সম্মান। দীপু মরলো মিথ্যা অভিযোগে। মবের হাতে। রাষ্ট্র তাঁর জন্য ১ ফোঁটা চোখের জলও খরচ করলো না। কারণ দীপুর মৃত্যুতে সরকারের মেটিকুলাস ডিজাইনে কোনো লাভ হয় না। উল্টো প্রশ্নের জন্ম হয়। এদেশ এমনি আজব দেশ। ধর্ম অবমাননার কথা বলে যে কেউ যে কাউকে মেরে ফেলতে পারে। আর এভাবেই নির্বাচনী আবহাওয়ায় হাওয়া লাগতে শুরু করে। 
     
    নৌকা ছাড়া ভোট
     
    যেহেতু নৌকা মার্কার দল আম্লীগকে ফ্যাসিস্ট দল হিসাবে দেখানো হচ্ছে, তাই এই নির্বাচনে নৌকা নেই। শেখ হাসিনাকে তো অবশ্যই, পাশাপাশি আম্লীগ দলটাকেও ফ্যাসিস্ট হিসাবে ইন্টারপ্রিটেশন করে, এক ধরনের ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে। আর সেই ফলশ্রুতিতেই জুলাইয়ের ঘটনা বিচার প্রক্রিয়াধীন থাকায়, বিচার শেষ হবার আগে নিষিদ্ধ ঘোষিত আম্লীগ কোনো রকম রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। যার ফলে নির্বাচন ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক হচ্ছে না। নৌকা থেকে যাচ্ছে ব্যালট পেপারের বাইরেই। নৌকার ভোটাররা কাকে ভোট দিবে কিংবা ভোট আদৌ দিতে যাবে কিনা এসব ব্যাপারে আপামর জনগোষ্ঠী অনেকটুকু দ্বিধায় ভুগছে। অনেকেই শঙ্কিত। ভোট দিতে গিয়ে কেন্দ্রে লাঞ্ছনার শিকার হতে হবে কি? তাছাড়া নৌকা মার্কার লোকেরা কোন মার্কায় ভোট দিবে? প্রচলিত ধারণা মতে সংখ্যালঘুরা নৌকার ভোটার, তাহলে এই নির্বাচনে তারা কী করবে? ভোটের পর আবার মব ভায়োলেন্সে পড়তে হবে না তো? 
     
    ঘটনা ২
     
    রাস্তায় দুই বন্ধুর দেখা হয়েছে। এক বন্ধু মুসলিম। অন্য বন্ধু হিন্দু। ভোট বিষয়ক কথা উঠেছে।
     
    - তাইলে দোস্ত কী খবর? ভোট দিবা না? 
    - খবর আরকি। দিবার তো চাই কিন্তু মার্কা তো নাই। 
    - আরে কী কও? আছে তো... 
    - কোনটার কথা বলতাছ বন্ধু? 
    - কেন?  পাল্লা? এইবার পাল্লায় সিল মাইরো। একবার দিয়াই দেখো... 
    - হ। তাছাড়া উপায়ও তো দেখি না। 
    - এই তো বুঝছো তাইলে।  যাই। আস্লামুয়ালাইকুম... 
    - ওয়ালাইকুম 
     
    এখন কথা হচ্ছে দাঁড়িপাল্লা হচ্ছে জামাতের মার্কা। জামাত শরিয়ার কথা বলে এবং তাই বিশ্বাস করে। একজন হিন্দু/ বৌদ্ধ/ খ্রিষ্টানও কি তবে শরিয়া আইনের প্রতিই আস্থাশীল হবে? 
     
    গণভোটের ফাঁকফোকর 
     
    যেহেতু বাংলাদেশের সংবিধান বলে,  ইন্টেরিম অবৈধ সরকার, তাই তাদের সকল কৃতকর্মকে আইনের উপায়ে স্বীকৃতি দিতে এই গণভোটের আয়োজন। কেননা সংবিধান সংস্কার কেবল পার্লামেন্ট করতে পারে। আর বর্তমানে কোনো সংসদীয় ব্যবস্থা নেই। নির্বাচনের পরই কেবল সংসদীয় ব্যবস্থা শুরু হবে। আর ইন্টেরিম চাচ্ছে, নির্বাচনের পর যে দলই সরকার গঠন করুক, সেই দলের ক্ষমতা গ্রহণের ১৮০ দিনের মধ্যে ইন্টেরিমের সহযোগিতায় নির্বাচিত দলের তত্ত্বাবধানেই সকল সংস্কার সম্পন্ন করে নিজেদের 'দেশদ্রোহী' দায়কে ঘুচিয়ে একরকমের Safe exit আদায় করে ইন্টেরিম শান্তিতে নোবেল গ্রহণ করবে!   
     
    যেসব বিষয়গুলো গণভোটে সবচেয়ে বেশি চর্চিত হয়েছে সেগুলো হলো: 
     
    ক. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ
    খ. ১ জন ব্যক্তির সর্বোচ্চ ২ বার প্রধানমন্ত্রী হবার বিধান
    গ. রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য সৃষ্টি 
    ঘ. জুলাইয়ের স্পিরিটকে ধারণ 
     
    এগুলো ছাড়া আরো ৮০টির উপর বিষয় আছে, যা সম্পর্কে আমজনতা কিছুই জানে না। এমনকি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোও বলতে পারে না। এখানে কেবল প্রচারিত হচ্ছে যারা গণভোটে 'না' তে সিল দিবে, তারা দেশবিরোধী তারা নাকি ভারতের দালাল। আর যারা 'হ্যা' তে ভোট দিবে তারাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক। অর্থাৎ বাংলাদেশের বিশাল সংখ্যক নিরক্ষর মানুষকে গণভোটের আসল বিষয়ে না জানিয়ে, কেবল আংশিক ধারণা দিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উনারা দারুণ তৎপর। এখন আমাদের দেখার বিষয় ১টাই। আগামীকাল কত শতাংশ ভোট কাস্টিং হবে? কেন্দ্রগুল কতটুকু নিরাপদ থাকবে? 
     
    প্রতিদ্বন্দ্বী 
     
    ১৩তম সংসদ নির্বাচনে প্রধান ২টি প্রতিযোগী দল হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল(বিএনপি) এবং জামাতে ইসলাম। এছাড়াও বহু দল ও মার্কা আছে। তবে তাদের জোটে জোর কম। জামাতের সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে তরুণদের দল এনসিপি। তাদের মার্কা শাপলাকলি। তারা অভ্যুত্থানের সময় বহু স্বপ্নের কথা বলে, অবশেষে ১টি প্রতিক্রিয়াশীল দলের সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে, যে দলের ১টি ঘৃণিত ইতিহাস আছে। তাদের এমন আচরণে আমরা বুঝতে পারি, এ জাতির রক্তে রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিশ্বাসঘাতকতা! 
     
    ২০২৪'র অভ্যুত্থানের পর ১টা কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে। এদেশের রাজনীতিতে মূলত ২টি শক্তি সক্রিয়। স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি। এবং স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি। আমার জানা নেই,  বাংলাদেশই হয়তো সর্বশেষ এমন দেশ যেখানে স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরেও স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজনীতিতে তৎপর আছে। রাজনীতি করার অধিকার সকলেরই থাকা উচিত। এটা নাগরিক অধিকার। কিন্তু তাই বলে বিশ্বাসঘাতক ১টা দলকে এইভাবে কেন জিইয়ে রাখা হলো, তা আমার এই মোটা মাথায় ঢুকছে না। কিংবা আমি আর সবার মতন ততটা উদার হতে পারছি না, যে কারণে প্রতিক্রিয়াশীল দলটাকে আমি ঘৃণা করি।
     
    ঘটনা ৩
     
    একটি হিন্দু বাড়িতে মা এবং ছেলের মধ্যে কথা হচ্ছে। সেই কথোপকথনের একাংশ এরকম: 
     
    - বাবু... 
    - হু মা 
    - কালকে ভোট দিতে যামু নাকি? 
    - মন চাইলে যাবা
    - সমস্যা হবো না? 
    - কী জানি? 
    - যদি গ্যাঞ্জাম হয়? 
    - বুঝতেছি না তো
    - কোন মার্কায় দিমু
    - কেন?  যা খুশি দিবা
    - নৌকা তো নাই
    - কী আর করবা? 
    - ধুর যামু না
    - আইচ্ছা 
     
    এই হচ্ছে সংখ্যালঘুদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা। এরকম আতঙ্ক নিয়ে তারা ভোটকেন্দ্রে কীভাবে যাবে?  এই কথা আমিও আদতে বুঝতে পারছি না। 
     
    ইতিহাস বিস্মৃত জাতি
     
    ধরা যাক, কাল জামাত জিতে গেল। দাঁড়িপাল্লায় ভোট পড়লো প্রচুর। তাতে আমরা কী ধারণা করতে পারবো? আমরা তখন বলতে পারবো, বাঙাল আদতেই ইতিহাসকে ধারণ করে না। গোল্ডফিশের মস্তিষ্ক নিয়ে এই বাঙাল জাতি মহাভারত এমনকি মহাবিশ্ব জয় করার স্বপ্ন দেখছে। কিংবা বলতে পারি, বাঙালের আদতে তেমন কোনো আদর্শ চরিত্র নেই, যে চরিত্রে বলীয়ান হয়ে তারা নিজেদের ইতিহাসকে লালন করবে। তারা হয়তো তাদের চরিত্রকে ১০০০ টাকার নোটে কিংবা বিরিয়ানির প্যাকেটে বিক্রি করে দিয়েছে। 
     
    বাঙাল কেন ইতিহাস বিস্মৃত হলো? এ প্রশ্নের উত্তরে পুরো সাত কান্ড রামায়ণের আখ্যান লেখা সম্ভব। তবে সবচেয়ে জরুরি এবং যুক্তিসঙ্গত কারণ হলো বাঙাল অশিক্ষিত জাতি। বাঙালকে একবেলা খাবার খাইয়ে কিনে ফেলা যায়! ইতিহাস তারা বোঝে না। কেননা বাঙাল গরীব জাতি। অনটনে তারা নিজের পেট এবং মগজ বিক্রি করতে পিছপা হয় না। 
     
    ঘটনা ৪ 
     
    আওয়ামী লীগের এক কর্মী অজ্ঞাতবাসে আছে। ধরা যাক, তার তুষার। তুষার তার এলাকার এক বন্ধুকে ফোন করেছে। তার বন্ধু সাধারণ ভোটার। নৌকারই ভোটার। তাদের মাঝে কথা হচ্ছে: 
     
    - দোস্ত কেমন আছিস? 
    - চলতেছে। তোর কী খবর? 
    - আমারো চলে।
    - ভোট দিবি কারে? 
    - নৌকা তো নাই।
    - হ। ধানের শীষে কিন্তু দিস না। 
    - তাইলে কারে দিমু? 
    - ধানের শীষ ছাড়া যে কোনো মার্কা। পাল্লায় দিতে পারস। হাতপাখায়। স্বতন্ত্র তালা মার্কায়। 
    - কী কস? দাঁড়িপাল্লায় কেমনে দিব? পাগল নাকি? 
    - শীষ যদি জিতে মামলার অত্যাচারে টিকতে পারমু নারে। পাল্লায় পড়লে আমগোরই সুবিধা। নির্বাচনডা বানচাল করতে সমস্যা হবো না। আর সবচেয়ে বেশি সুবিধা মানুষজন যদি ভোটই না দেয়। 
    - তাইলে ভোটকেন্দ্রে যাইতে মানা করতাছস? 
    - হ। না যাওয়াই তোর জন্য ভালো। 
    - আইচ্ছা। রাখি এখন। 
    - হ। কথা হইবো। 
     
     
     উপরের ঘটনা থেকে বুঝলাম আম্লীগের অনেক কর্মী চায় পাল্লা জিতুক। পাল্লা জিতলে তবু তারা শক্ত এক রকমের ন্যারেটিভ তৈরি করতে পারবে। স্বাধীনতা- বিরোধীদের দিকে আঙুল উচিয়ে নিজেদের সকল দোষ ওদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারবে। এমনকি মামলাব্যবসার ব্যাপারটাও এদিকে লীগের কর্মীদের মাথায় আছে। 
     
    মেটিকুলাস ডিজাইনে নির্বাচন
     
    প্রবাসী ভোট থেকে শুরু করে নানান অভিনব কৌশলে ইন্টেরিম সরকার এই নির্বাচনটা আয়োজন করেছে। কার সাথে কার কীরকমের চুক্তি হয়েছে তা আমরা জানি না। সারাদেশে এক রকমের থমথমে পরিবেশ। টানটান উত্তেজনা। কী হয় কী হয়? 
     
    সেদিন সোস্যাল মিডিয়াতে দেখলাম জামাতের নেতা শাহরিয়ার কবির এক বৃদ্ধের সাথে কথা বলছে। কথায় কথায় সে জান্নাতের প্রলোভন দেখাচ্ছে। দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে নাকি বেহেশত নসিব হবে। 
     
    এখন কথা হচ্ছে, ভোট দিয়েই যদি বেহশত নসিব হতো, মানে এরকম সুব্যবস্থা যদি থেকেই থাকে, সারা বিশ্বেই তো মানুষ ভোট দিয়ে স্বর্গলাভ করে নিত। নাকি? আরেকটা প্রশ্ন, আল্লাহ'র ইচ্ছা যদি তাই হতো, পাল্লায় ভোট দিলেই বেহেশত পাওয়া যেত, তাহলে তো নামাজরোজার ব্যবস্থা তিনি বিলুপ্ত করে দিতেন, নাকি? আচ্ছা বিধর্মীদের কী হবে? 

    এবারের নির্বাচনে ধর্মকে সবচেয়ে বড় ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। সকল দলের নেতারাই ধর্মকে তাদের নিজের সুবিধা মতন ব্যবহার করেছে। 

    কাল ভোটের পর আমরা বুঝতে পারবো,  ৯০'র দশকে রাষ্ট্রধর্মের কথা বলে বাংলাদেশের যেভাবে খৎনা করা হয়েছিল, সেই খৎনা শেষে সাবালক বাংলাদেশ এবার সহি মুসলিম হয়ে উঠেছে কিনা! 
     
    নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশ 
     
    আমরা স্বপ্ন দেখি। গাঁজা খেয়ে স্বপ্নটা খুব সুন্দর দেখি। নির্বাচনের পর বাংলাদেশ ১টা উন্নত দেশ হয়ে যাবে। পরশু সকাল থেকে বাঙালগুলা চুরি করা ভুলে যাবে। ব্যাংকিং খাতে অর্থের প্রবাহ স্ফীত হবে। বাঙালগুলা দূর্নীতি ছেড়ে দেবে। ধর্মান্ধরা উদারচেতা হয়ে যাবে। বাংলাদেশের সকল ঋণ শোধ হয়ে যাবে। মূল্যস্ফীতি দূর হবে। নারীদের অধিকার সুসংজ্ঞায়িত হবে। বাংলাদেশের শিল্পখাত কোমড় সোজা করে দাঁড়াবে। রোহিঙ্গারা নিজ দেশে চলে যাবে। এলপিজি গ্যাস সংকট দূর হবে। চাকরির বাজার চাঙা হবে। কোনো বেকার থাকবে না। প্রত্যেক ঘরে ঘরে উন্নতমানের খাদ্য, শিক্ষা, বস্ত্র, চিকিৎসা পৌঁছে যাবে। সকল বৈষম্য ভুলে যাবে বাংলাদেশ।  পরশু সকাল থেকে  বাংলাদেশ হবে স্বর্গরাজ্য!

    [ আগামী পর্বে আবার কথা হবে] 

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | | | | | | |
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন